খালেদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-মুসলেহ

অনুবাদ: আব্দুন নূর ইবন আব্দুল জব্বার সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ভূমিকা

إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا وسيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله، وصفيه وخليله وخيرته من خلقه، بعثه الله بالهدى ودين الحق بين يدي الساعة بشيراً ونذيراً، فبلَّغ الرسالة، وأدّى الأمانة، ونصـح الأمة، وجاهد في الله حقّ الجهاد حتى أتاه اليقين وهو على ذلك، فصلَّى الله عليه وعلى آله وصحبه ومن اتبع بإحسان سُنّته إلى يوم الدين، أما بعد:

“নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি এবং তাঁরই কাছে সাহায্য কামনা করি আর তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের অন্তরের অনিষ্ট এবং নিজেদের অন্যায় কার্যাদির অশুভ পরিণতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন তাকে বিভ্রান্তকারী কেউ নেই এবং যাকে তিনি বিভ্রান্ত করেন তাকে হিদায়াত প্রদানকারী কেউ নেই। আমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ ব্যতীত (সত্য) কোনো মা‘বুদ নেই, তিনি একক এবং তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল, তাঁর দোস্ত, তাঁর বন্ধু এবং তাঁর সৃষ্টিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে হিদায়াত এবং সত্য দীন দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী করে পাঠিয়েছেন। তিনি রিসালাতের মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অর্পিত দায়িত্বকে তিনি যথাযথভাবে আদায় করেছেন এবং উম্মতকে তিনি সকল বিষয়ে উপদেশ প্রদান প্রদান করেছেন এবং তাঁর মৃত্যু আসা পর্যন্ত আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে গেছেন এবং তিনি তারই ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতি এবং তাঁর পরিবার পরিজন, তাঁর সাহাবায়ে কেরাম এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করবে তাদের সকলের প্রতি রহমত নাযিল করুন।

অতঃপর, যদি কোনো দর্শক ও পর্যবেক্ষক আজ অধিকাংশ মানুষের অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে তিনি আজব বা বিস্ময়কর এক বিষয় লক্ষ্য করতে পারবেন, তিনি দেখতে পাবেন যে, মানুষ বাহ্যিক বিষয়ে উন্নয়ন, সুন্দর ও সজ্জিতকরণে অধিক যত্নবান ও মনোযোগী। তিনি দেখতে পাবেন তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার রূপসজ্জার সামগ্রী দ্বারা সজ্জিত ও সৌন্দর্যচর্চায় যত্নবান হতে। একই সময়ে পর্যবেক্ষক ব্যক্তি মানুষকে আভ্যন্তরীণ বিষয়ের সজ্জিতকরণে ও তার শুদ্ধি এবং সংশোধনে সম্পূর্ণভাবে অমনোযোগী দেখতে পাবেন। বাহ্যিক বিষয়কে সুন্দর করার জন্যে সে কত যে সময়, চেষ্টা ও শক্তি ব্যয় করছে অথচ অন্তরের সংশোধন ও আভ্যন্তরীণ বিষয়ের সংশোধনে সম্পূর্ণভাবে গাফিল। এমনকি অনেক মানুষের মাঝে বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং তার শোভা প্রকাশ করা ছাড়া অন্য কোনো আগ্রহই দেখা যায় না। তাই আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় সত্যই বলেছেন:

﴿وَإِذَا رَأَيۡتَهُمۡ تُعۡجِبُكَ أَجۡسَامُهُمۡۖ وَإِن يَقُولُواْ تَسۡمَعۡ لِقَوۡلِهِمۡۖ كَأَنَّهُمۡ خُشُبٞ مُّسَنَّدَةٞۖ يَحۡسَبُونَ كُلَّ صَيۡحَةٍ عَلَيۡهِمۡۚ هُمُ ٱلۡعَدُوُّ فَٱحۡذَرۡهُمۡۚ قَٰتَلَهُمُ ٱللَّهُۖ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٤﴾ [المنافقون: ٤] 

“(হে রাসূল!) তুমি যখন মুনাফিকদের দিকে তাকাও তখন তাদের দেহাকৃতি তোমার নিকট প্রীতিকর মনে হয় এবং তারা যখন কথা বলে তখন তুমি সাগ্রহে তাদের কথা শ্রবণ কর, যেন তারা দেওয়ালে ঠেকানো কাঠর স্তম্ভসদৃশ। তারা যে কোনো শোরগোলকে মনে করে তাদেরই বিরুদ্ধে। তারাই শত্রু। অতএব, তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! বিভ্রান্ত হয়ে তারা কোথায় চলছে?” [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৪]

অতএব, এই হলো সেই সকল জাতি যারা দৃশ্যত সুন্দর ও মনোরম এবং তাদের কথায় প্রতারক। তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা দেওয়ালে ঠেকানো কাঠের সাথে তুলনা করেছেন, যে কাঠের মধ্যে কোনো উপকারিতা নেই এবং এ সমস্ত এমন দৃশ্য যার কোনো মূল্য নেই এবং এমন অপরাধ ও অন্যায় যা অনুভব করা ও বুঝানো যায় না। এগুলো এমন নিকৃষ্ট অবস্থা যা কোনো ঈমানদার তার নিজের জন্য পছন্দ করতে পারেন না বরং কোনো ঈমানদারের ঈমান তার আভ্যন্তরীণ বিষয়ের সংশোধন এবং তার অন্তরের পবিত্রতা ও সুবাসিত করা ব্যতীত পরিপূর্ণ হতে পারে না। তাই বান্দার আভ্যন্তরীন বিষয় এবং অন্তর যদি নষ্ট, কুৎসিত ও নোংরা হয় তাহলে বাহ্যিক সৌন্দর্য ও উন্নয়ন কোনোই উপকারে আসবে না। আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল লোক বা জাতির কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছেন, যাদেরকে তাদের বাহ্যিক সৌন্দর্য ও তাদের অবস্থার উন্নয়ন প্রতারিত করেছিল এবং তারা তাদের এই অবস্থাকে তাদের আখেরাতের উত্তম পরিণতির প্রমাণ জ্ঞান করেছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَكَمۡ أَهۡلَكۡنَا قَبۡلَهُم مِّن قَرۡنٍ هُمۡ أَحۡسَنُ أَثَٰثٗا وَرِءۡيٗا ٧٤﴾ [مريم: ٧٤] 

“তাদের পূর্বে আমরা কত মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি যারা তাদের অপেক্ষা সম্পদ ও বাহ্যিক দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭৪]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অবহিত করেছেন যে, তিনি এমন অনেক জাতিকে পূর্বে ধ্বংস করেছেন, যারা আকৃতিতে উত্তম এবং অর্থে অধিক আর গঠনে সুন্দর ছিল এবং তারা যে সম্পদ ও সমৃদ্ধি দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল তা তাদের কোনোই উপকারে আসে নি।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَفَلَمۡ يَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَيَنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۚ كَانُوٓاْ أَكۡثَرَ مِنۡهُمۡ وَأَشَدَّ قُوَّةٗ وَءَاثَارٗا فِي ٱلۡأَرۡضِ فَمَآ أَغۡنَىٰ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ ٨٢﴾ [غافر: ٨٢] 

“তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমন করে নি ও দেখে নি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণতি হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারা যা করতো তা তাদের কোনো কাজে আসে নি।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৮২]

অতএব, অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য এবং অন্তরের যথার্থতা ও পরিশুদ্ধতাই হলো মূলবিষয় এবং এর ওপরই নির্ভর করবে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞۚ ذَٰلِكَ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ لَعَلَّهُمۡ يَذَّكَّرُونَ ٢٦﴾ [الاعراف: ٢٦] 

“হে বানী আদম! আমি তোমাদেরকে লজ্জাস্থান আবৃত করার ও বেশভুষার জন্যে তোমাদের পোশাক-পরিচ্ছদের উপকরণ অবতীর্ণ করেছি, তাকওয়ার পরিচ্ছদই সর্বোত্তম পরিচ্ছদ। এটা আল্লাহর নির্দশনসমূহের অন্যতম নিদর্শন, যাতে মানুষ এটা থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২৬]

আল্লাহ তা‘আলা অবহিত করেছেন যে, তাকওয়ার পোশাক ও তার সজ্জিতকরণই হলো বাহ্যিক সাজসজ্জা, প্রাচুর্য ও ইত্যাদি থেকে উত্তম। বান্দা তার অন্তরের সংশোধন, সজ্জিতকরণ, সুবাসিত ও সুগন্ধযুক্ত করা ছাড়া তার তাকওয়ার পোশাকে সজ্জিতকরণ সম্ভব নয়। কারণ, তাকওয়ার স্থান হলো অন্তর। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ذَٰلِكَۖ وَمَن يُعَظِّمۡ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقۡوَى ٱلۡقُلُوبِ ٣٢﴾ [الحج: ٣٢] 

“এটাই আল্লাহর বিধান আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করলে এটাতো তার হৃদয়ের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৩২]

আল্লাহ তা‘আলা দীন ইসলামের নিদর্শন ও অনুষ্ঠান-এর সম্মান প্রদর্শন করা বান্দার অন্তরে তাকওয়ার বিদ্যমানতা ও অবস্থান এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহীহ মুসলিমে (সাহাবী) আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রব থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

«يا عبادي، لو أن أولكم وآخركم وإنسكم وجنَّكم كانوا على أتقى قلب رجل واحد منكم ما زاد ذلك في مُلكي شيئاً، يا عبادي، لو أن أولكم وآخركم وإنسكم وجنَّكم كانوا على أفجرقلب رجل واحد منكم ما نقص ذلك من ملكي شيئاً»

“হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও সকল জিন্ন যদি তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তির সবচেয়ে অধিক সংযমশীল বা পরহেজগার হৃদয়ের মতো হয়ে যায়, তবে তা আমার রাজত্বের মধ্যে কোনো কিছু বৃদ্ধি ঘটাবে না। আর পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন্ন যদি তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তির সবচেয়ে অধিক পাপী ব্যক্তির হৃদয়ের মতো হয়ে যায় তবুও আমার রাজত্বের কিছুই কমাতে পারবে না।”[1]

হাদীসটি এ কথার প্রমাণ করে যে, তাকওয়ার মূল হলো অন্তরের পরহেজগারী এবং একইভাবে অন্যায় ও ব্যভিচারের স্থানও হলো অন্তর। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকওয়া বা পরহেজগারীকে এবং অন্যায় ও ব্যভিচারকে তার স্বস্থানেই যুক্ত করেছেন আর উক্ত স্থান হলো অন্তর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যা ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«التقوى هاهنا، التقوى هاهنا، التقوى هاهنا، وأشار إلى صدره r»

“তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে এবং (তৃতীয়বারে) তিনি তাঁর বক্ষের বা অন্তরের দিকে ইশারা করলেন।”[1]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বুকের দিকে ইশারা করার কারণ হলো যে, অন্তরই হলো তাকওয়ার স্থান ও তার মূল।

প্রিয় পাঠক! আপনার অন্তরের বিষয়টি হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তার প্রভাবও হলো বিরাট গৌরবময়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা অন্তরের ইসলাহ বা সংশোধনের জন্য কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন এবং অন্তরের সংশোধন, সজ্জিতকরণ এবং সুবাসিত ও সুগন্ধযুক্ত করার জন্য রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡكُم مَّوۡعِظَةٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَشِفَآءٞ لِّمَا فِي ٱلصُّدُورِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٧﴾ [يونس: ٥٧] 

“হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এমন এক বস্তু সমাগত হয়েছে যা হচ্ছে নসীহত এবং অন্তরসমূহের সকল রোগের আরোগ্যকারী, আর ঈমানদারদের জন্য এটি পথ-প্রদর্শক ও রহমত।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৫৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ﴾ [ال عمران: ١٦٤] 

“নিশ্চয় আল্লাহ ঈমানদারগণের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের নিজেদেরই মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যে তাদের নিকট আল্লাহর নিদর্শনাবলী পাঠ করে ও তাদেরকে পবিত্র করে এবং তাদেরকে গ্রন্থ এবং প্রজ্ঞা শিক্ষা দান করে।”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহত্তর ও সুমহান যা নিয়ে এসেছেন তা হলো অন্তরের সংশোধন ও পরিশুদ্ধতার ব্যবস্থাপত্র। এ কারণেই একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ ও পদ্ধতি ব্যতীত তা পরিশুদ্ধ করার কোনো উপায় নেই। অন্তরের বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার আবশ্যকতার কারণ হলো যে, অন্তর এমন একটি সূক্ষ্ম বা কমনীয় মাংসখণ্ড যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞান ও বিচক্ষণতার দ্বারা মনোনীত করেছেন এবং তাকে তার আলোর স্থান এবং হিদায়াতের জন্যে মূলকেন্দ্র বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে অন্তরের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেছেন:

﴿ٱللَّهُ نُورُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ مَثَلُ نُورِهِۦ كَمِشۡكَوٰةٖ فِيهَا مِصۡبَاحٌۖ ٱلۡمِصۡبَاحُ فِي زُجَاجَةٍۖ ٱلزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوۡكَبٞ دُرِّيّٞ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٖ مُّبَٰرَكَةٖ زَيۡتُونَةٖ لَّا شَرۡقِيَّةٖ وَلَا غَرۡبِيَّةٖ يَكَادُ زَيۡتُهَا يُضِيٓءُ وَلَوۡ لَمۡ تَمۡسَسۡهُ نَارٞۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٖۚ يَهۡدِي ٱللَّهُ لِنُورِهِۦ مَن يَشَآءُۚ وَيَضۡرِبُ ٱللَّهُ ٱلۡأَمۡثَٰلَ لِلنَّاسِۗ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ ٣٥﴾ [النور: ٣٥] 

“আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও যমীনের জ্যোতি, তার জ্যোতির উপমা যেন একটি দীপাধার, যার মধ্যে আছে এক প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাঁচের আবরণের মধ্যে স্থাপিত, কাঁচের আবরণটি উজ্জ্বল নক্ষত্রসদৃশ; এটা প্রজ্জ্বলিত করা হয় পাক-পবিত্র যয়তুন বৃক্ষের তৈল দ্বারা, যা প্রাচ্যের নয়, প্রতিচ্যের নয়, অগ্নি একে স্পর্শ না করলেও যেন এর তৈল উজ্জ্বল আলো দিচ্ছে, জ্যোতির উপর জ্যোতি! আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করেন তাঁর জ্যোতির দিকে। আল্লাহ মানুষের জন্যে উপমা দিয়ে থাকেন এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৫]

অন্তর হলো পরিচয়ের স্থান, তাই এই অন্তর দিয়েই বান্দা তার রব ও মনিবের পরিচয় লাভ করে থাকে। এর মাধ্যমেই মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে পরিচয় লাভ করে থাকে এবং এরই মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর শর‘ঈ আয়াত বা আল্লাহ তা‘আলা যা তার বান্দার প্রতি অহী আকারে নাযিল করেছেন তা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে থাকে ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَ أَمۡ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقۡفَالُهَآ ٢٤﴾ [محمد: ٢٤] 

“তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবন্ধ?” [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪]

বরং তাদের অন্তরে এমন তালা লাগানো, যা চিন্তা ভাবনা করতে বাধার সৃষ্টি করে এবং এ অন্তর দিয়েই বান্দা আল্লাহ তা‘আলার মাখলুকাত (যেমন, দিন-রাত এবং চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি) এবং দিগন্ত ও সুদূর প্রান্তের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَفَلَمۡ يَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَتَكُونَ لَهُمۡ قُلُوبٞ يَعۡقِلُونَ بِهَآ أَوۡ ءَاذَانٞ يَسۡمَعُونَ بِهَاۖ فَإِنَّهَا لَا تَعۡمَى ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَلَٰكِن تَعۡمَى ٱلۡقُلُوبُ ٱلَّتِي فِي ٱلصُّدُورِ ٤٦﴾ [الحج: ٤٦] 

“তারা কি দেশ ভ্রমণ করে নি? তাহলে তারা জ্ঞান বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতি শক্তিসম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারতো। বস্তুতঃ চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত হৃদয়।” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৪৬]

আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ নিজের মধ্যে এবং আল্লাহর মাখলুকাত, দিগন্ত ও সুদূর প্রান্তের নিদর্শন নিয়ে অন্তর ও বোধশক্তি দ্বারাই চিন্তা ও গবেষণা করে থাকে এবং অন্তরের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আবশ্যকতার তাকিদের কারণ হলো যে, তা এমন এক বাহন যার মাধ্যমে বান্দা তার আখিরাতের পথকে অতিক্রম করতে পারে। কেননা আল্লাহর দিকে ভ্রমণ বা গমন করার অর্থ হলো অন্তরের ভ্রমন, শরীর ও কায়ার ভ্রমন নয়। কবি বলেন:

قطع المسافة بالقلوب إليـه لا

                                بالسير فـوق مقاعـد الرُّكبـانِ

“তাঁর (আল্লাহর) দিকে পৌঁছতে পথের দূরত্ব ও ব্যবধান অন্তরের দ্বারা অতিক্রম করার মাধ্যমে সম্ভব। সাওয়ারীর গদিতে বসে (তাঁর কাছে) ভ্রমণ সম্ভব নয়।”

ইমাম বুখারী স্বীয় সহীহ বুখারীতে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, আমরা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন:

«إنّ أقواماً خلفنا بالمدينة ما سلكنا شِعباً ولا وادياً إلا وهم معنا، حبسهم العذر»

“এমন লোকজন আছে যাদেরকে আমরা মদীনায় পিছনে ছেড়ে এসেছি, আমরা এমন কোনো উপত্যকা ও গোত্রকে অতিক্রম করি না যে, তারা আমাদের সাথে অন্তরের দিক থেকে উপস্থিত থাকেন। তাদেরকে ওযর বা কারণ আটকিয়ে রখেছে।”[1]

ইমাম মুসলিম জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে বর্ণনা করেন,

«إلا شركوكم في الأجر، حبسهم المرض»

“কিন্তু তারা সাওয়াবে তোমাদের সাথে শরীক, যাদেরকে অসুস্থতা আটকে রেখেছে।”[2]

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তারা এমন লোক যাদের দেহ বা শরীর মদীনায় ওযর বা অসুস্থতার কারণে আটকে রাখা হয়েছে, যার ফলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উক্ত যুদ্ধে বের হতে পারেন নি, তবে তারা অন্তরের দিক থেকে ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ে বের হয়েছিলেন। তারা আল্লাহর রাসূলের সাথে আত্মা এবং অস্পষ্ট ছায়ামূর্তির ন্যায় উপস্থিত থাকেন এবং এটিই হলো অন্তরের দ্বারা জিহাদ। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন: “এবং এটি হলো অন্তর দিয়ে জিহাদ করা, আর তা হলো জিহাদের চার স্তরের একটি। স্তর চারটি হলো নিম্নরূপ: অন্তর, জিহ্বা, অর্থ-সম্পদ এবং শরীর”। হাদীসে বর্ণিত আছে:

«جاهدوا المشركين بألسنتكم وقلوبكم وأموالكم»

“তোমরা মুশরিকদের সাথে জিহ্বা, অন্তর এবং অর্থ-সম্পদ দিয়ে সংগ্রাম করো।”[3]

তাই ঐ সকল সাহাবায়ে কেরাম যারা মদিনা থেকে অসুস্থতা বা ওযরের জন্য (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে) বের হতে পারেন নি বটে, তবে তারা সাওয়াবে তাদের সমান যারা জান ও মালসহ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে) যুদ্ধে বের হয়েছিলেন। আর এটা হলো আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, যাকে চান তিনি তাকে তা দান করেন। আল্লাহ তা‘আলার দিকে অগ্রবর্তিতার ইচ্ছা, অভিপ্রায়, খাঁটি আগ্রহ এবং চূড়ান্ত সংকল্প দ্বারা সম্ভব যদিও ওযরের কারণে আমলে পশ্চাদগামী হউক না কেন।

ইবন রজব রহ. বলেন,

ليست الفضائل بكثرة الأعمال البدنية، لكن بكونها خالصة لله عز وجل، صواباً على متابعة السنة، وبكثرة معارف القلوب وأعمالها

“শারিরীক অধিক আমলের ওপরই শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে আল্লাহর জন্য খাঁটি ও বিশুদ্ধ নিয়ত এবং সুন্নাত বা হাদীসের সঠিক অনুবর্তীতার মাধ্যমে এবং অন্তরের দ্বারা অধিক পরিচয় এবং তার আমলের মাধ্যমে”। এজন্যেই বাকর ইবন আব্দুল্লাহ আল-মুযানী রহ. আবু বাকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর অন্য সকল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি তার অগ্রবর্তীতার রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আবূ বকর তাদের থেকে অগ্রবর্তীতা সালাত ও সাওমের আধিক্যের জন্যে নয়, বরং তার অন্তরে এমন এক বস্তুর মাধ্যমে, যা তার অন্তরকে বিদীর্ণ করেছিল। কবি বলেন,

مـن لـي بمثـل سيـرك المدلـَّل

                                  تمشـي رويـداً وتجـي في الأول

“আমার কাছে তোমার ন্যায় ভ্রমনকারী এমন কে আছে? কারণ, তুমি আস্তে আস্তে চল কিন্তু সবার পূর্বে (গন্তব্যে) পৌঁছে যাও।

প্রিয় পাঠক!

প্রকৃতপক্ষে অন্তরের তাকওয়া হলো মূল বিষয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের তাকওয়া নয়। আল্লাহ তা‘আলা কুরবানীর পশু এবং (হজে) হাদী কুরবানী করা সম্পর্কে যা বলেন তা এ বিষয়ের প্রমাণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ﴾ [الحج: ٣٧] 

“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের (অন্তরের) তাকওয়া।” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৩৭]

আল্লাহ তা‘আলার কাছে অন্তরের তাকওয়াই শুধু পৌঁছে থাকে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِلَيۡهِ يَصۡعَدُ ٱلۡكَلِمُ ٱلطَّيِّبُ وَٱلۡعَمَلُ ٱلصَّٰلِحُ يَرۡفَعُهُ﴾ [فاطر: ١٠] 

“তাঁরই (আল্লাহর) দিকে পবিত্র বাণীসমূহ আরোহণ করে এবং সৎকর্ম সেটাকে উন্নীত করে।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০]

যে কোনো প্রকার আমলের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া এবং তা সম্ভব হবে ভালোবাসা এবং সম্মানের সাথে একমাত্র আল্লাহর জন্য অন্তরের ইবাদতের মাধ্যমে।

কবি বলেন,

فالفضـل عنـد الله ليـس بصـورة الـ

 أعمـال بـل بحقائـق الإيمـان

وتفاضـل الأعمـال يتبـع مـا يقـو

                       م بقلـب صاحبـها مـن البرهـان

حتـى يكـون العامـلان كلاهمـا

                      فـي رتبـة تبـدو لنــا بعيــان

هـذا وبينهمـا كمـا بين السمـا

                       والأرض في فضـل وفـي رجحـان

“আল্লাহর কাছে আমলের (প্রকাশ্য) আকৃতির কোনো মর্যাদা নেই, বরং তাহলো ঈমানের বাস্তবতার প্রতি নির্ভরশীল। আমলের শ্রেষ্ঠতা ব্যক্তি বা দলীল বা প্রমাণসহ অনুসরণ করে থাকে তার প্রতি। এমন কি আমরা উভয় প্রকার আমলকারীর মর্যাদার স্বচক্ষ দর্শনকারী। এই হলো তাদের দু’জনের মধ্যে মর্যাদায় ও অগ্রাধিকার এবং প্রাধান্যে আসমান ও যমীনের মধ্যে যে পার্থক্য।”

অন্তরের সংশোধন, পবিত্রতা, সকল প্রকার মহামারী থেকে মুক্ত করা এবং মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বে সজ্জিত ও অলংকৃত করার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতি তাগিদ করে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বান্দার অন্তরকে তাঁর দেখার স্থান বানিয়েছেন।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إن الله لا ينظر إلى أجسادكم ولا إلى صوركم، ولكن ينظر إلى قلوبكم، وأشار بأصبعه إلى صدره»

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও ধন-দৌলতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন না, বরং তিনি লক্ষ্য করে থাকেন তোমাদের অন্তরের দিকে এবং তিনি তাঁর আঙ্গুল দিয়ে বুকের বা অন্তরের দিকে ইশারা করলেন।”[1]

ঈমান ও কুফুরী এবং হিদায়াত ও গোমরাহী, ভ্রষ্টতা ও সততার মূল হলো যা বান্দার অন্তরে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এ কারণেই উম্মতের সাধারণ ওলামায়ে কেরামের রায় হলো যে, কোনো বক্তিকে যদি কুফুরী কথার প্রতি বাধ্য করা হয় তাহলে তাকে উক্ত বিষয়ের জন্য পাকড়াও করা হবে না, যদি ইসলামের প্রতি তার অন্তর ঈমানের সাথে নিশ্চিন্ত থাকে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَن كَفَرَ بِٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِهِۦٓ إِلَّا مَنۡ أُكۡرِهَ وَقَلۡبُهُۥ مُطۡمَئِنُّۢ بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِٱلۡكُفۡرِ صَدۡرٗا فَعَلَيۡهِمۡ غَضَبٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ١٠٦ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ ٱسۡتَحَبُّواْ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا عَلَى ٱلۡأٓخِرَةِ وَأَنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡكَٰفِرِينَ ١٠٧﴾ [النحل: ١٠٦،  ١٠٧]   

“কেউ ঈমান আনার পরে আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফুরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্যে আছে মহাশাস্তি, তবে তার জন্যে নয়, যাকে কুফুরীর জন্যে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু তার অন্তর ঈমানে অবিচল। এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয় এবং এই জন্যে যে, আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১০৬-১০৭]

এ আয়াতটি অধিকাংশ মুফাসসিরের রায় অনুযায়ী আম্মার ইবন ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন মুশকিরা তাকে শাস্তি দেয় এবং তার বিরাট ক্ষতি সাধন করে, কষ্টের কারণে তিনি কাফিরদেরকে আল্লাহর সাথে কুফুরীর এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসম্মান করার স্বীকৃতি প্রদান করেন। আম্মার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কাঁদতে কাঁদতে তার সাথে যে ব্যবহার করা হয়েছিল সে অভিযোগ ব্যক্ত করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মারকে জিজ্ঞাসা করেন, كيف تجد قلبك؟ “তোমার অন্তরকে তুমি কী অবস্থায় পেয়েছিলে?”

আম্মার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু উত্তরে বলেন, আমার অন্তর ঈমানের সাথে প্রশান্তচিত্ত ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মারকে সহজভাবে সুসংবাদ জানালেন, তোমাকে কোনো কুফুরী কথায় বাধ্য করলে তোমার গোনাহ হবে না। “যদি তারা আবারও তোমাকে অনুরূপ করতে আসে আবারও তা করবে”। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি প্রশংসিত ও মহান।

অন্তরের বিষয়ে অধিক মনোযোগের প্রয়োজনীয়তার তাগিদের কারণ হলো যে, মানুষের অন্তরই হলো তার দেহের বাদশাহ এবং অনুসৃত রাষ্ট্রপ্রধান। কাজেই অন্তরের যথার্থতা, সুস্থতা ও পরিশুদ্ধতাই হলো সব কল্যাণের মূল এবং দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির মাধ্যম। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে নো‘মান ইবন বাশীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ألا وإن في الجسد مضغة إذا صلحت صلح الجسد كله، وإذا فسدت فسد الجسد كله، ألا وهي القلب»

“সাবধান! শুনে রেখো, দেহে বা শরীরে একটি মাংসখণ্ড আছে, মাংসখণ্ডটি যখন সুস্থ ও ভালো থাকে তখন সমস্ত দেহ ও শরীর সুস্থ ও ভালো থাকে এবং তা যখন নষ্ট ও বিকৃত হয়ে যায় তখন সমস্ত দেহ ও শরীর নষ্ট হয়ে যায় এবং জেনে রেখো যে, সেই মাংসখণ্ডটি হলো ক্বালব বা অন্তর।”[1]

একথা স্পষ্ট ও পরিষ্কার যে, অন্তরের ইবাদতই হলো মূল, যার ওপরই সমস্ত ইবাদত দাঁড়াবে। তাই শারীরিক পরিশুদ্ধতা নির্ভর করবে অন্তরের পরিশুদ্ধতার ওপর। অন্তর যখন তাকওয়া ও ঈমানের মাধ্যমে যথাযথ ও সঠিক হবে সমস্ত তখন শরীরও আনুগত্য ও আজ্ঞানুবর্তী থাকবে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لا يستقيم إيمان عبد حتى يستقيم قلبه»

“বান্দার অন্তর সঠিক ও সোজা না হওয়া পর্যন্ত তার ঈমান খাঁটি হবে না।”[2]

তাই বান্দার ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক এবং মুক্ত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তর সোজা ও সঠিক না হবে। এ কারণেই মহাজ্ঞানী সর্বজ্ঞ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামতের দিনের নাজাতকে অন্তরের পরিশুদ্ধতা, সততা এবং পরিচ্ছন্নতার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَوۡمَ لَا يَنفَعُ مَالٞ وَلَا بَنُونَ ٨٨ إِلَّا مَنۡ أَتَى ٱللَّهَ بِقَلۡبٖ سَلِيمٖ ٨٩﴾ [الشعراء: ٨٨،  ٨٩] 

“যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। সে দিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।” [সূরা আশ- শু‘আরা, আয়াত: ৮৮-৮৯]

অন্তরের বিষয়ে মনোযোগের প্রয়োজনীয়তা ও এর প্রতি তাগিদের কারণ হলো, তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হলো যে, সে পরিবর্তনশীল। কবি বলেন,

ومـا سمـي الإنسـان إلا لأنسـه

                          ولا القلـب إلا أنـه يتقلَّـب

“মানুষকে ইনসান নামকরণ করা হয়েছে তার বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার জন্য, আর অন্তরকে ক্বলব এ জন্যে বলা হয় যে তা পরিবর্তনশীল।”

অন্তর হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং অত্যন্ত স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ গ্রন্থে মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لقلب ابن آدم أشد انقلاباً من القِدر إذا اجتمعت غلياناً»

“আদম সন্তানের অন্তর হাড়ির উথলানো বা টগবগ করে ফোটা পানি থেকেও অধিক দ্রুত পরিবর্তনশীল।”[1]

অতঃপর মিকদাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যার থেকে ফিতনা দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি উক্ত বাক্যটি তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন এবং এর দ্বারা এদিকেই ইঙ্গিত করেন যে, অন্তরের এ পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে অন্তরের ওপর ফিতনা আপতিত হওয়া। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক দো‘আ ছিল:

«اللهم مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك»

“হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দীনের প্রতি স্থির রাখ।”

মুসনাদ ইমাম আহমাদে উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দো‘আয় পাঠ করতেন:

«اللهم مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك»

“হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দীনের প্রতি স্থির রাখ।”

এবং তাঁর দো‘আর তালিকায় নিম্নের দো‘আটিও থাকতো:

«وأسألك قلباً سليماً»

“হে আল্লাহ! তোমার কাছে নিরাপদ অন্তর কামনা করছি।”[1]

এর কারণ হলো, অন্তরের পদস্খলন খুবই মারাত্মক এবং তার ভ্রষ্টতা ও বক্রতা ভয়াবহ ও গুরুতর। আর তার সবচেয়ে নিকৃষ্টতর হলো আল্লাহ থেকে বিমুখ হওয়া এবং তার সমাপ্তি হলো অন্তরে সীলমোহর ও ছাপ এবং পরিশেষে মৃত্যু। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿كَذَٰلِكَ يَطۡبَعُ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِ ٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَ ٥٩﴾ [الروم: ٥٩] 

“যাদের জ্ঞান নেই আল্লাহ তাদের অন্তর এভাবে মোহর করে দেন।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৫৯]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿أَفَرَءَيۡتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَٰهَهُۥ هَوَىٰهُ وَأَضَلَّهُ ٱللَّهُ عَلَىٰ عِلۡمٖ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمۡعِهِۦ وَقَلۡبِهِۦ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِۦ غِشَٰوَةٗ فَمَن يَهۡدِيهِ مِنۢ بَعۡدِ ٱللَّهِۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ٢٣﴾ [الجاثية: ٢٣] 

“(হে রাসূল!) তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশিকে নিজের মা‘বুদ বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও অন্তরে মোহর করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ নির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? “ [সূরা আল-জাসিয়াহ, আয়াত: ২৩]

এ সবই অন্তরের মর্যাদা এবং অন্তরের বিপদ ও ভয়াবহতা বর্ণনা করে।

* কাজেই এই মাংসখণ্ডটি কি মনোযোগ ও চিন্তা-ভাবনার, দাবি রাখে না?!

* এই অন্তরটি কি পরীক্ষা নিরীক্ষা ও অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই?!

* এই অন্তরটি কি পরিষ্কার, পরিশোধন এবং পরীক্ষার উপযুক্ত নয়?!

প্রিয় পাঠক!

তোমার অন্তরের প্রতি দৃষ্টি দাও সে দিন আসার পূর্বে যে দিন অন্তর তাতে জমাকৃত সবই জানিয়ে দিবে, সেদিন আসার পূর্বে যে দিন গোপনীয়তা প্রকাশ পাবে, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন অন্তরসমূহ বিদীর্ণ হবে, এবং সে দিন আসার পূর্বে যে দিন হৃদয়ের লুকায়িত ও আচ্ছাদিত যাবতীয় বিষয় প্রকাশিত হবে (অর্থাৎ কিয়ামতের দিন)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَفَلَا يَعۡلَمُ إِذَا بُعۡثِرَ مَا فِي ٱلۡقُبُورِ ٩ وَحُصِّلَ مَا فِي ٱلصُّدُورِ ١٠ إِنَّ رَبَّهُم بِهِمۡ يَوۡمَئِذٖ لَّخَبِيرُۢ ١١﴾ [العاديات: ٩،  ١١] 

“তবে কি সে ঐ সম্পর্কে অবহিত নয় যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত করা হবে এবং অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করা হবে? সেদিন তাদের কী ঘটবে, তাদের রব অবশ্যই তা সবিশেষ অবহিত।” [সূরা আল-‘আদিয়াত, আয়াত: ৯-১১]

প্রিয় পাঠক! তোমার অন্তরের হিফাযত করার চেষ্টা করো এবং কোনো প্রকার ক্লান্তি ও বিরক্তি ছাড়া তার সংশোধন ও তাতে উৎকর্ষতার জন্য যত্নবান হও। কারণ, তোমার অন্তর হলো তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি অংশ। অন্তর হলো শরীরের সবচেয়ে প্রভাবিত অংশ, যা তার সবচেয়ে সূক্ষ্ম স্থান এবং সংশোধনের দিক থেকে সবচেয়ে কঠিন।

প্রিয় পাঠক! তুমি জেনে রাখো যে, অন্তরের সততা, যথার্থতা এবং পরিশুদ্ধতা অন্তরকে সমস্ত রোগমুক্ত না করে এবং অন্তরকে সমস্ত আপদ থেকে রক্ষা করা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। এ সমস্ত রোগ আর সেই সমস্ত আপদ বা দূর্যোগগুলো মোট পাঁচটি মহামারীর আকার ধারণ করেছে, আর এগুলোই হলো রোগের মূল এবং প্রত্যেক বিপদ ও বালাই এর উৎস। যে ব্যক্তি তা থেকে রক্ষা পেল সে নিরাপদ থাকলো।

কবি বলেন:

فـإن تنـج منهـا تنج مـن ذي عظيمة

وإلا فإنـي لا إخــالك ناجيــا

“তুমি যদি সেই সমস্ত আপদ থেকে নাজাত বা রক্ষা পাও তাহলে তুমি বিরাট সফলতা অর্জন করলে, কিন্তু তুমি যদি তা অর্জনে ব্যর্থ হও তাহলে আমি তোমাকে নাজাতপ্রাপ্ত বলে মনে করবো না।”

* প্রথম আপদ:

আল্লাহর সাথে শির্ক করা, তা সূক্ষ্ণ হউক বা বৃহৎ হউক এবং তা ছোট হউক বা বড় হউক। কারণ, শির্ক হলো বড় যুলুম এবং তা হলো সব ফাসাদ ও অন্যায়ের মূল যার দ্বারা অন্তরের ওপর যুলুম করা হয়ে থাকে এবং মৃত্যু ও ধ্বংস অনিবার্য করে দেয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَمَن يُرِدِ ٱللَّهُ أَن يَهۡدِيَهُۥ يَشۡرَحۡ صَدۡرَهُۥ لِلۡإِسۡلَٰمِۖ وَمَن يُرِدۡ أَن يُضِلَّهُۥ يَجۡعَلۡ صَدۡرَهُۥ ضَيِّقًا حَرَجٗا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي ٱلسَّمَآءِۚ كَذَٰلِكَ يَجۡعَلُ ٱللَّهُ ٱلرِّجۡسَ عَلَى ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ ١٢٥﴾ [الانعام: ١٢٥] 

“এতএব, আল্লাহ যাকে হিদায়াত করতে চান, ইসলামের জন্যে তার অন্তঃকরণ খুলে দেন, আর যাকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তার অন্তঃকরণ খুব সংকুচিত করে দেন, এমনভাবে সংকুচিত করেন যে মনে হয় যেন সে আকাশে আরোহণ করছে। এমনিভাবেই যারা ঈমান আনে না আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর কলুষ চাপিয়ে দেন।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,  

﴿ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ ٨٢﴾ [الانعام: ٨٢] 

“প্রকৃতপক্ষে তারাই শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত, যারা নিজেদের ঈমানকে যুলুমের সাথে (শির্কের সাথে) সংমিশ্রিত করে নি।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮২]

যে সমস্ত ঈমানদার তাদের ঈমানের সাথে সত্যবাদী এবং ঈমানের সাথে তারা শির্ককে মিশ্রিত করে নি ঐ সকল লোকদের জন্যই রয়েছে বিশ্বজাহানের রবের পক্ষ থেকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ও হিদায়াত। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿سَنُلۡقِي فِي قُلُوبِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلرُّعۡبَ بِمَآ أَشۡرَكُواْ بِٱللَّهِ مَا لَمۡ يُنَزِّلۡ بِهِۦ سُلۡطَٰنٗاۖ وَمَأۡوَىٰهُمُ ٱلنَّارُۖ وَبِئۡسَ مَثۡوَى ٱلظَّٰلِمِينَ ١٥١﴾ [ال عمران: ١٥١]

“যারা অবিশ্বাস করেছে, আমরা সত্বর তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করবো, যেহেতু তারা আল্লাহর সাথে সে বিষয়ে শির্ক করেছে, যে বিষয়ে তিনি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি। আর যালেম তথা শির্ককারীদের পরিণাম কতই না মন্দ!”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫১]

তাই অন্তরের নিরাপত্তা ও যথার্থতা একমাত্র আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদ ছাড়া সম্ভব নয়, যার কোনো শরীক নেই। মানুষের মধ্যে যে পরিমাণ তাওহীদের সত্যতা এবং বিশ্বাসের যথার্থতা থাকবে সে পরিমাণ তার জন্য অন্তরের নিরাপত্তা ও সততা হাসিল সম্ভব হবে। অন্তর সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো যে, সে তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনবে এবং তাঁকে ভালোবাসবে এবং তাঁর তাওহীদকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং আল্লাহই তার কছে একমাত্র প্রিয় হবে এবং অন্য সবকিছু থেকে অধিক সম্মানের ও মর্যাদাবান হবে। অতএব, অন্তরের পরিশুদ্ধতার মাধ্যমেই আল্লাহর পরিচয়, তাঁর ভালোবাসা ও মর্যাদা অর্জিত হবে, যে উদ্দেশ্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর অন্তর নষ্ট হবে এর বিপরীত কর্ম দ্বারা। তাই তাওহীদ ছাড়া আদৌ অন্তরের সততা ও পরিশুদ্ধতা অর্জিত হবে না।

* দ্বিতীয় আপদ: বিদ‘আত এবং রাসূলের সুন্নাতের বিরোধিতা।

কারণ, বিদ‘আত বিদ‘আতীকে আল্লাহ থেকে দূরত্বই সৃষ্টি করে দেয়। বিদ‘আত অন্তরকে নষ্ট করে দেয় এবং অন্তর যা থেকে উপকৃত ও পবিত্র হবে তা হতেও কর্মহীন করে দেয়। অতএব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত বা পথই উত্তম পথ এবং নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে ইসলামে নব-প্রবর্তন এবং প্রত্যেক নব-প্রবর্তনই হচ্ছে বিদ‘আত আর প্রত্যেক বিদ‘আতই হলো ভ্রষ্টতা। তাই অন্তর যখন বিদ‘আতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন তা অন্ধকারে পরিণত হয় এবং তার চিন্তা ও কল্পনা নষ্ট হয়ে যায়। তখন কীভাবে তার জন্য নিরাপত্তা হাসিল হওয়া সম্ভব? এ কারণেই সালাফ থেকে বিদ‘আতের অনুসারীদের সহচর্য গ্রহণ করা থেকে কঠোর ভাষায় সাবাধান করা হয়েছে। কারণ, তাদের সাহচার্যতা অন্তর নষ্টের কারণ হতে পারে। ফুদ্বাইল ইবন আইয়াদ্ব রহ. বলেন,

من جلس إلى صاحب بدعة أورثه الله العمى

“যে ব্যক্তি বিদ‘আতীর সথে বসবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে অন্ধত্বের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিবেন”। অর্থাৎ তার অন্তর (সত্য গ্রহণ করা থেকে) দৃষ্টিহীন হয়ে যাবে। আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে এ থেকে রক্ষা চাই।

কবি বলেন,

إذا أنت لم تسقم و صاحبت مسقماً

وكنت لـه خدنـاً فأنت سقيـم

“যদি তুমি রোগী না হও কিন্তু পীড়িত ও রোগীর সঙ্গী-সাথী হয়ে থাকো এবং তার একান্ত সহচর হও, তাহলে তুমিও পীড়িত ও অসুস্থ হয়ে পড়বে।”

এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তরের সবচেয়ে বড় রোগ বিদ্বেষ ও প্রবৃত্তির কামনা ও বাসনা থেকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম বানিয়েছেন মুসলিমদের জামা‘আতের সাথে মিলেমিশে থাকাকে, আর তা হলো বিদ‘আত বা ভ্রষ্টতা বা বিচ্ছিন্নতা বা ঝগড়া-বিবাদ করার মাধ্যমে মুসলিমদের জামা‘আত থেকে বের না হওয়া।

* তৃতীয় আপদ: প্রবৃত্তি অনুসরণ ও গুনাহের কাজে পতিত হওয়া।

প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং গুনাহের কাজ অন্তর নষ্ট এবং তা ধ্বংস ও সর্বনাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলা প্রবৃত্তির কামনা বাসানার প্রভাব এবং তাঁর অনুসরণ করা সম্পর্কে বলেন,

﴿أَفَرَءَيۡتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَٰهَهُۥ هَوَىٰهُ وَأَضَلَّهُ ٱللَّهُ عَلَىٰ عِلۡمٖ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمۡعِهِۦ وَقَلۡبِهِۦ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِۦ غِشَٰوَةٗ فَمَن يَهۡدِيهِ مِنۢ بَعۡدِ ٱللَّهِۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ٢٣﴾ [الجاثية: ٢٣] 

“(হে রাসূল!) তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজের মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয় মোহর করে দিয়েছেন এবং তর চক্ষুর উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ-নির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” [সূরা আল-জাছিয়াহ, আয়াত: ২৩]

অতএব, লক্ষ্য কর কীভাবে প্রবৃত্তির অনুসরণ অন্তরের উপর সীলমোহরের কারণ হয়ে থাকে। অতঃপর মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য কর, চিন্তা ও গবেষণা কর এবং (আরও) গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ যে, কীভাবে এই সীলমোহরের প্রভাব ও ছাপ এবং অন্তরের প্রতি যে পর্দা ও আবরণ তা শরীরের সমস্ত অংশে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَفَرَءَيۡتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَٰهَهُۥ هَوَىٰهُ وَأَضَلَّهُ ٱللَّهُ عَلَىٰ عِلۡمٖ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمۡعِهِۦ وَقَلۡبِهِۦ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِۦ غِشَٰوَةٗ فَمَن يَهۡدِيهِ مِنۢ بَعۡدِ ٱللَّهِۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ٢٣﴾ [الجاثية: ٢٣] 

“(আল্লাহ) তার কর্ণ ও হৃদয়ে মোহর করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ নির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” [সূরা আল-জাছিয়াহ, আয়াত: ২৩]

যে ব্যক্তি অন্তরের পরিশুদ্ধতা কামনা করে, সে যেন সাবধান হয় এবং প্রবৃত্তির অনুসরণের মাধ্যমে অন্তরের রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে সাবধান হয়। কারণ, তা ধ্বংসের কাছে পৌঁছে দিবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿كَلَّاۖ بَلۡۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُواْ يَكۡسِبُونَ ١٤﴾ [المطففين: ١٤] 

“না এটা সত্য নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনের উপর মরিচারূপে জমে গেছে।” [সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৪]

গুনাহ অন্তরকে অন্ধ করে দেয়। তাই গুনাহ থেকে সাবধান এবং সাবধান। কারণ, এর পরিণতি খুবই মারাত্মক ও ভয়াবহ।

কবি বলেন,

رأيت الذنـوب تمـيت القلـوبَ

وقـد يـورث الذَّل إدمانـها
وتـرك الذنـوب حيـاة القلوب

وخـير لنفسـك عصيانهـا

“গুনাহ বা পাপ অন্তরগুলোকে মৃত্যুতে পরিণত করতে দেখেছি এবং তা করতে থাকলে অন্তরগুলোকে তা লাঞ্ছিত করে দেয়। গুনাহ পরিত্যাগ করা হলো অন্তরের প্রাণ। তাই তোমার নিজের জন্য গুনাহের বিরোধিতাকে বেছে নেওয়াই উত্তম।”

ইমাম মুসলিম হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন:

«تُعرض الفتن على القلوب كالحصير عوداً عوداً، فأيّ قلبٍ أُشربها نُكت فيه نكتة سوداء، وأيُّ قلبٍ أنكرها نُكت فيه نكتة بيضاء، حتى تصير على قلبين: على أبيض مثل الصفا فلا تضره فتنة ما دامت السماوات والأرض، والآخر أسود مُربادّاً كالكوز مجخِّياً، لا يعرف معروفاً ولا ينكر منكراً إلا ما أشرب من هواه»

“ফিতনাসমূহ (মানুষের) অন্তরসমূহে এমনভাবে আসতে থাকবে যেভাবে মাদুর বা চাটাই বুনার খেজুর পাতাগুলো একটির পর একটি (সংলগ্ন) হয়ে থাকে। সুতরাং যে অন্তর উক্ত ফিতনার মধ্যে জড়িত হবে সে ফিতনা তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো নকশা সৃষ্টি করে দিবে। আর যে অন্তর উক্ত ফিতনাকে প্রত্যাখ্যান করবে (এবং গ্রহণ করতে অস্বীকার করবে) তা তার অন্তরের মধ্যে একটি একটি সাদা (নূরানী) নুকতা লেগে যাবে। এমনিভাবে (কালো-সাদা নুকতা পড়ে অন্তরের বিশ্বাসের অবস্থার গুণগ্রাহীতায় মানুষ) দুই অন্তরের (মধ্যে বিভক্ত) হয়ে যাবে। একটি শ্বেত পাথরের ন্যায় (ধবধেবে) সাদা। যতদিন আকাশ ও ভূ-মণ্ডল প্রতিষ্ঠিত থাকবে ততদিন (অর্থাৎ আজীবন) কোনো ফিতনা তাকে ক্ষতি করতে পারবে না। আর অপরটি ধুসর কালো উল্টানো পেয়ালার ন্যায়, যা (জ্ঞান ও বিবেক থেকে খালি হবে) না বুঝবে কোনো ভালো কথাকে ভালো, আর না বুঝবে কোনো মন্দ কথাকে মন্দ। তবে তাই সে বুঝবে যা প্রবৃত্তি তার অন্তরে দৃঢ় ও বদ্ধমূল করে দিয়েছে (অর্থাৎ সে ভালো ও মন্দের পার্থক্যকরণ ছাড়া এবং বিনা চিন্তা-ভাবনায় নিজ প্রবৃত্তির আনুগত্য করবে)। বস্তুত গুনাহ অন্তরকে সব দিক থেকে বেষ্টন করে নিয়ে থাকে। কোনো ব্যক্তি যখন তার প্রবৃত্তি ও কামনার অনুসরণ করে এবং গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় তার অন্তরে প্রতিটি গুনাহের দ্বারা অন্ধকার প্রবেশ করে তা অন্ধকার করে তুলে এবং যখন সে গুনাহের কাজে অনবরত লেগে থাকে এবং তাওবা করে না, তখন তা তার প্রতি ক্রমাগতভাবে অন্ধকার সৃষ্টি করতে থাকে এবং তা বৃদ্ধি হতে থাকে এবং বৃদ্ধি হয়ে এক পর্যায়ে তাকে হতবুদ্ধি ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলে এবং তার দুর্ভাগ্য আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে ও সে এমনভাবে ধ্বংসে পতিত হয় যে সে তা

বুঝতেও পারে না। আর অন্তরের অন্ধকারকে আরও শক্তিশালী করে তুলে, এক পর্যায় গুনাহকারীর মুখে তা পরিস্ফুট হয়ে উঠে এবং তা কালো হয়ে যায় এবং প্রত্যেকেই তা দেখতে পায়।”
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন,

«إن للحسنة لنوراً في القلب، وضياءً في الوجه، وقوة في البدن، وسعةً في الرزق، ومحبةً في قلوب الخلق، وإن للسيئة لظلمة في القلب، وسواداً في الوجه، ووهناً في البدن، وبغضاً في قلوب الخلق»

“নিশ্চয় নেক কাজের প্রভাবে অন্তরের জ্যোতি তৈরী হয়, চেহারার আলো পড়ে এবং দেহ বা শরীরে শক্তির সঞ্চার হয়, রিযিক বা জীবিকার প্রশস্ততা বা প্রাচুর্যতা আসে এবং সৃষ্টিজীবের অন্তরের ভালোবাসার উদ্রেক করে। আর খারাপ কাজের প্রভাবে অন্তরে অন্ধকার তৈরী হয়, চেহারায় কালছে ভাব আসে, দেহে আসে শীর্ণতা আর সৃষ্টিজীবের অন্তরে আসে তার প্রতি ঘৃণা বা শক্রতা”।

এই সকল কর্ম এবং এই উজ্জ্বলতা ও সেই কালো দাগ যে দু’টি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে উল্লেখ করেছেন, এগুলো এমন আলামত বা চিহ্ন যা কোনো কোনো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি এই দুনিয়াতেই অবলোকন করে থাকে, তবে তা সেসব লোকদের মুখে স্পষ্ট ও পরিপূর্ণভাবে কিয়ামতের দিন প্রকাশিত হবে, যে দিন সমস্ত গোপনীয়তা প্রকাশ হবে এবং অন্তরের গোপন রহস্য উন্মোচিত হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَيَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ تَرَى ٱلَّذِينَ كَذَبُواْ عَلَى ٱللَّهِ وُجُوهُهُم مُّسۡوَدَّةٌۚ أَلَيۡسَ فِي جَهَنَّمَ مَثۡوٗى لِّلۡمُتَكَبِّرِينَ ٦٠ وَيُنَجِّي ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ بِمَفَازَتِهِمۡ لَا يَمَسُّهُمُ ٱلسُّوٓءُ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦١﴾ [الزمر: ٦٠،  ٦١] 

“যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, তুমি কিয়ামতের দিন তাদের মুখ কালো দেখবে। উদ্ধতদের আবাসস্থল কি জাহান্নাম নয়? এবং আল্লাহ মুত্তাকিদেরকে উদ্ধার করবেন তাদের সাফল্যসহ; তাদেরকে অমঙ্গল স্পর্শ করবে না এবং তারা দুঃখও পাবে না।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬০-৬১]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿يَوۡمَ تَبۡيَضُّ وُجُوهٞ وَتَسۡوَدُّ وُجُوهٞۚ فَأَمَّا ٱلَّذِينَ ٱسۡوَدَّتۡ وُجُوهُهُمۡ أَكَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡ فَذُوقُواْ ٱلۡعَذَابَ بِمَا كُنتُمۡ تَكۡفُرُونَ ١٠٦ وَأَمَّا ٱلَّذِينَ ٱبۡيَضَّتۡ وُجُوهُهُمۡ فَفِي رَحۡمَةِ ٱللَّهِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ١٠٧﴾ [ال عمران: ١٠٦،  ١٠٧] 

“সেদিন কতকগুলো মুখমণ্ডল হবে শ্বেতবর্ণ এবং কতকগুলো মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণবর্ণ। অতঃপর যাদের মুখমণ্ডল কৃষ্ণবর্ণ হবে (তাদেরকে বলা হবে) তবে কি তোমরা ঈমান আনার পর কাফের হয়েছো? অতএব, তোমরা শাস্তির আস্বাদ গ্রহণ কর, যেহেতু তোমরা কুফরি করেছিলে। আর যাদের মুখমণ্ডল শুভ্র (সাদা) হবে তারা আল্লাহর করুণার অন্তর্ভুক্ত হবে। তারা তন্মধ্যে সদা অবস্থান করবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৬-১০৭]

গুনাহ ছোট হোক বা বড় হোক তা অন্তরকে নষ্ট করে দেয় এবং অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও নির্মলতাকে কর্দমক্ত ও পঙ্কিলতায় পরিপূর্ণ করে তুলে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা গুনাহ ত্যাগ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَذَرُواْ ظَٰهِرَ ٱلۡإِثۡمِ وَبَاطِنَهُۥٓۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡسِبُونَ ٱلۡإِثۡمَ سَيُجۡزَوۡنَ بِمَا كَانُواْ يَقۡتَرِفُونَ ١٢٠﴾ [الانعام: ١٢٠] 

“আর তোমরা প্রকাশ্য পাপকার্য পরিত্যাগ কর এবং পরিত্যাগ কর গোপনীয় পাপকার্যও।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২০]

তাই প্রত্যেক ঈমানদারের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে প্রকাশ্য এবং গোপনীয় সকল প্রকার গুনাহ ত্যাগ করা। বিশেষ করে অন্তরের গুনাহ ও ভুল-ক্রটি। কারণ, তা খুবই মারাত্মক ও গভীর প্রভাব বিস্তারকারী।

এর মধ্যকার অন্যতম হলো, *রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা, যা সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। *অনুরূপ অহমিকা ও আত্মপ্রসাদ, যা আমলকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণায় পরিণত করে। *তদ্রূপ হিংসা, বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা যা সাওয়াবকে নিঃশেষ করে দেয় এবং গুনাহের পরিমাণই কেবল বৃদ্ধি করে।

আরও যে সকল গুনাহ অন্তরকে নষ্ট করে দেয় এবং অন্তরের আলো নিভিয়ে দেয় তাহলো, হারামকৃত জিনিসের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে তাদের দৃষ্টিকে সংযত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُل لِّلۡمُؤۡمِنِينَ يَغُضُّواْ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِمۡ وَيَحۡفَظُواْ فُرُوجَهُمۡۚ ذَٰلِكَ أَزۡكَىٰ لَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا يَصۡنَعُونَ ٣٠﴾ [النور: ٣٠] 

“(হে রাসূল!) মুমিনদেরকে বলো: তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্যে উত্তম। তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ অবহিত।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০]

আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে তারা কীভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের সাথে সম্বোধন করে কথা বলবেন তার প্রতি উপদেশ প্রদান করে বলেন,

﴿وَإِذَا سَأَلۡتُمُوهُنَّ مَتَٰعٗا فَسۡ‍َٔلُوهُنَّ مِن وَرَآءِ حِجَابٖۚ ذَٰلِكُمۡ أَطۡهَرُ لِقُلُوبِكُمۡ وَقُلُوبِهِنَّ﴾ [الاحزاب: ٥٣] 

“তোমরা তাঁর (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) পত্নীদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্যে অধিক পবিত্র।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩]

যে ব্যক্তি তার নজর বা দৃষ্টিকে হারামে পতিত হওয়া থেকে সংরক্ষণ করলো, আল্লাহ তা‘আলা তার দৃষ্টিকে কার্যকর এবং অন্তরকে নির্মল, সুস্থ্য, শুদ্ধ ও শক্তিশালী করে দিবেন। তাই তোমার নজরকে হারাম থেকে হিফাযত রাখো। কারণ, কোনো কোনো দৃষ্টি, দৃষ্টি নিক্ষেপকারীর অন্তরের জন্য বিপদের কারণ হয়েছে। আরও যে সকল গুনাহর কাজ অন্তর নষ্ট করে দেয় এবং অন্তরের নির্মলতা ও পরিচ্ছন্নতা কর্দমাক্ত করে তুলে তাহলো, বাদ্যযন্ত্র এবং সূর

শ্রবণ করা। গান, সূর এবং সঙ্গীত অন্তরকে নষ্ট করে দেয়। ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

«إن الغناء ينبت النفاق في القلب كما ينبت الماء البقل»

“গান, সূর ও সঙ্গীত অন্তরে মোনাফেকীর চারা অঙ্কুরিত করে যেমন, পানি তৃণ ও উদ্ভিদ অঙ্কুরিত করে।”

বস্তুত বাদ্যযন্ত্র, সূর ও সঙ্গীত তোমার অন্তরে আল্লাহর আয়াত বা নির্দশন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে বাধার সৃষ্টি করে থাকে। তোমার অন্তরে কুরআন শুনাকে ও অর্থ জানা কঠিন করে তোলে এবং তোমার শরীরে আনুগত্য, ও ইহসানকে বোঝা করে তোলে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشۡتَرِي لَهۡوَ ٱلۡحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًاۚ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٞ مُّهِينٞ ٦﴾ [لقمان: ٦] 

“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশতঃ (মানুষকে) আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবার জন্যে অসার বাক্য ক্রয় করে নেয় এবং আল্লাহ প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে; তাদেরই জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” [সূরা লোকমান, আয়াত: ৬]

সালাফদের অনেকেই এই আয়াত (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর ব্যাখ্যা গান, সূর ও সঙ্গীত বলে উল্লেখ করেছেন। তাই বাদ্যযন্ত্র ও গান-বাজনা শোনা থেকে বারবার সাবধান করছি।

এবং তোমাকে আবারও সাবধান করছি তুমি যেন অধিকাংশ মানুষের অবস্থা দেখে ধোকা ও প্রতারিত না হও। কারণ, তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার এ কথা যথার্থ, যাতে তিনি বলেন,

﴿وَإِن تُطِعۡ أَكۡثَرَ مَن فِي ٱلۡأَرۡضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنۡ هُمۡ إِلَّا يَخۡرُصُونَ ١١٦﴾ [الانعام: ١١٦] 

“(হে রাসূল) তুমি যদি দুনিয়াবাসীদের অধিকাংশ লোকের কথা মতো চলো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১১৬]

আর নিম্নের দো‘আ বেশি বেশি পাঠ করবে:

«اللهم طهرني من خطاياي بالماء والثلج والبرد»

“হে আল্লাহ! আমার গুনাহকে পানি বরফ ও শিশির দ্বারা ধুয়ে পবিত্র কর।”

কারণ, গুনাহ ছোট হোক বা বড় হোক তা অন্তরকে নোংরা এবং আবর্জনাযুক্ত করে তুলে। তাই অন্তরকে পবিত্র করা প্রয়োজন।

* চতুর্থ আপদ: সন্দেহ ও সংশয় যা অন্তরকে হক্ক বা সত্য (গ্রহণ করা) থেকে অন্ধ করে দেয় এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দেয়।

বস্তুত সন্দেহ মারাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক এক রোগ, যা ঈমানের স্বাদ নিয়ে যায় এবং শয়তানের কুমন্ত্রনা বৃদ্ধি করে দেয় এবং তার অনুসারীকে কুরআন ও হাদীস থেকে উপকৃত হতে বাধার সৃষ্টি করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَأَمَّا ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمۡ زَيۡغٞ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَٰبَهَ مِنۡهُ ٱبۡتِغَآءَ ٱلۡفِتۡنَةِ وَٱبۡتِغَآءَ تَأۡوِيلِهِ﴾ [ال عمران: ٧] 

“অতএব, যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে ফলতঃ তারাই অশান্তি সৃষ্টি ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে অস্পষ্টের (অস্পষ্ট আয়াতের) অনুসরণ করে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭]

এ শ্রেণির মানুষ তারা আল্লাহ তা‘আলার কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত বা হাদীস থেকে উপকৃত হতে পারে না। কারণ, তাদের তাদের দৃষ্টি কুরআন এবং হাদীসের দিকে হিদায়াত-এর জন্য থাকে না, বরং সন্দেহ ও অন্যকে বিভ্রান্ত করা এবং উপমা দেওয়া ছাড়া আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ অবস্থায় তোমাকে সন্দেহ এবং তাদের অনুসারীদের থেকে সাবধান থাকা অপরিহার্য। কারণ, তা অন্তরে আপতিত হতে থাকে অবশেষে তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে তা অন্তরকে হয়তো কুফুরীর দিকে নতুবা নিফাকের দিকে নিয়ে ছাড়বে।

কবি বলেন:

مازالت الشبهات تغزو قلبه             حتى تَشَحَّطَ بينهن قتيلا

“এভাবেই সন্দেহ তার অন্তরকে আক্রমণ করতে থাকে পরিশেষে তা অন্তরকে রক্তাক্ত লাশে পরিণত করে।”

প্রিয় পাঠক! সন্দেহ এবং তার অনুসারীদের থেকে তুমি সাবধান থাকবে এবং তুমি সন্দেহের কথা শুনবে না, তার অনুসারীদের কথাও শুনবে না, তাদের পুস্তিকাদিও পাঠ করবে না এবং তাদের কাছে বসবেও না; বরং তাদের সাথে সে ভাবে আচরণ করবে, যেভাবে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে তোমাকে আচরণ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَدۡ نَزَّلَ عَلَيۡكُمۡ فِي ٱلۡكِتَٰبِ أَنۡ إِذَا سَمِعۡتُمۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ يُكۡفَرُ بِهَا وَيُسۡتَهۡزَأُ بِهَا فَلَا تَقۡعُدُواْ مَعَهُمۡ حَتَّىٰ يَخُوضُواْ فِي حَدِيثٍ غَيۡرِهِۦٓ إِنَّكُمۡ إِذٗا مِّثۡلُهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ جَامِعُ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ وَٱلۡكَٰفِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا ١٤٠﴾ [النساء: ١٤٠] 

“নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) তোমাদের গ্রন্থের মধ্যে নির্দেশ করেছেন যে, যখন তোমরা শ্রবণ কর (কারও দ্বারা) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি অবিশ্বাস করতে এবং তার প্রতি উপহাস করতে, তখন তাদের সাথে উপবেশন করো না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথার আলোচনা করে, অন্যথা তোমরাও তাদের সদৃশ হয়ে যাবে, নিশ্চয় আল্লাহ সে সকল মুনাফিক ও কাফিরদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪০]

যারা সন্দেহের অনুসারী, তারা বাতিল ও অসত্য পদ্ধতিতে আল্লাহর আয়াত নিয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থহীন তর্ক করতে থাকে। ফুদ্বাইল  ইবন আইয়াদ্ব রহ. বলেন,

إياك أن تجلس مع من يفسد عليك قلبك، ولا تجلس مع صاحب هوى، فإني أخاف عليك مقت الله

“তোমাকে সাবধান করছি তাদের সাথে বসতে যারা তোমার অন্তরকে নষ্ট করবে এবং যারা প্রবৃত্তির অনুসারী তাদের সাথেও বসবে না। কারণ, আমি তোমার প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয় করছি।”

আর এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ সন্দেহের অনুসারীরা ঈমানদারদের দীনে এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে যে সংবাদ জানিয়েছেন তাতে সন্দেহের সৃষ্টি করে দেয় এবং তারা তাদের বাতিল বা ভ্রান্ত মতামত, দুর্বল সন্দেহ ও মিথ্যা ধারণা দ্বারা আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের বিরোধিতার বিষয়টি সুশোভিত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকে। অথচ আল্লাহ বলেন,  

﴿فَلَوۡ صَدَقُواْ ٱللَّهَ لَكَانَ خَيۡرٗا لَّهُمۡ ٢١﴾ [محمد: ٢١] 

“যদি তারা আল্লাহর প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার পূরণে সত্য হতো, (মিথ্যাচার ও ইসলামবিরোধী সন্দেহ তৈরী ও প্রচার-প্রসার কাজে লিপ্ত না হয়ে সত্যিকার ঈমানদার হতো) তবে তা তাদের জন্যে অবশ্যই মঙ্গলজনক হতো।” [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২১]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَۚ وَلَوۡ كَانَ مِنۡ عِندِ غَيۡرِ ٱللَّهِ لَوَجَدُواْ فِيهِ ٱخۡتِلَٰفٗا كَثِيرٗا ٨٢﴾ [النساء: ٨٢] 

“তারা কেন কুরআনের প্রতি মনঃসংযোগ করে না? আর যদি এটা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট থেকে হতো তবে এতে বহু মতানৈক্য প্রাপ্ত হতো।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِنَّهُۥ لَكِتَٰبٌ عَزِيزٞ ٤١ لَّا يَأۡتِيهِ ٱلۡبَٰطِلُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَلَا مِنۡ خَلۡفِهِۦۖ تَنزِيلٞ مِّنۡ حَكِيمٍ حَمِيدٖ ٤٢﴾ [فصلت: ٤١،  ٤٢] 

“এটা অবশ্যই এক মহিমাময় গ্রন্থ। কোনো মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না -অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪১-৪২]

* পঞ্চম আপদ: গাফলতি বা অবহেলা করা।

আর তা এমন এক ভুল যা অন্তরের ওপর ছেয়ে বসে, ফলে তার জন্য যা উপকারী তা গ্রহণ করতে এবং যা ক্ষতিকারক তা বর্জন করতে অন্তরকে অন্ধত্বের অতলে নিক্ষেপ করে। বস্তুত গাফলতি বা অবহেলা অধিকাংশ অন্যায়ের মূল কারণ এবং এর পরেও তা মানুষের মঝে এই বৈশিষ্টটি অধিক প্রসার ও বিস্তার লাভ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন,

﴿فَٱلۡيَوۡمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنۡ خَلۡفَكَ ءَايَةٗۚ وَإِنَّ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلنَّاسِ عَنۡ ءَايَٰتِنَا لَغَٰفِلُونَ ٩٢﴾ [يونس: ٩٢] 

“আর প্রকৃতপক্ষে অনেক লোক আমার উপদেশাবলী থেকে উদাসীন রয়েছে।” [সূরা ইউনূস, আয়াত: ৯২]

আল্লাহর শপথ, গাফলতি এমন মারাত্মক ও ভয়াবহ এক রোগ যা থেকে আল্লাহ তা‘আলা সাবধান করেছেন এবং এর অনুসারীদের সান্নিধ্যতা গ্রহণ করা থেকে হুশিয়ার করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلۡغَٰفِلِينَ ٢٠٥ ﴾ [الاعراف: ٢٠٥] 

“(হে নবী) তুমি গাফিল তথা উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ২০৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَلَا تُطِعۡ مَنۡ أَغۡفَلۡنَا قَلۡبَهُۥ عَن ذِكۡرِنَا وَٱتَّبَعَ هَوَىٰهُ وَكَانَ أَمۡرُهُۥ فُرُطٗا ٢٨﴾ [الكهف: ٢٨] 

“যার অন্তরকে আমরা আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, সে তার খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে, তুমি তার অনুসরণ করো না।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ২৮]

অতএব, গাফলতি বা অবহেলা অন্তরকে পরিষ্কার ও পবিত্র করা থেকে এবং যা তার উপকার, বিকাশ, উন্নয়ন, তাকে সুন্দর ও সংশোধন এবং পবিত্র করবে তা থেকে অমনোযোগী ও ভুলিয়ে রাখে।

প্রিয় পাঠক!

উল্লিখিত বিষয়সমূহ হচ্ছে মৌলিক আপদ ও রোগ যা তোমার সামনে (আজ সমাজে) বিস্তার লাভ করেছে এবং তোমার দৃষ্টির দরজায় যা কড়া নেড়েছে। তা থেকে রক্ষার জন্য দৃঢ় ইচ্ছা এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সকল মাধ্যমে ও উপকরণ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে। কারণ, অন্তর সঠিক পথে থাকা ও দৃঢ় থাকার জন্য এমন উপকরণ ও উপায় গ্রহণ করা অবশ্যই দরকার যা ছাড়া তা অর্জন সম্ভব নয় এবং এমন দরজায় কড়া নাড়া প্রয়োজন যা না করলেই ও প্রবেশ না করলেই নয়। কেননা, ফলাফল নির্ভর করে তার জন্য গ্রহণ করা পূর্ব উদ্যোগের ওপর। তাই যে ব্যক্তি এই সব মহা আপদ থেকে মুক্তি পেতে চায় তাকে অবশ্যই বাঁচার জন্য গ্রহণযোগ্য পথ অবলম্বন করতে হবে। কারণ নৌকা কখনও শুকনায় চলে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مِنۡ أَمۡرِهِۦ يُسۡرٗا ٤﴾ [الطلاق: ٤] 

“আল্লাহকে যে ভয় করে আল্লাহ তার সমস্যা সমাধান সহজ করে দিবেন।” [সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৪]

সুতরাং আল্লাহর হেফাযত করুন, আল্লাহ আপনাকে হেফাযত করবেন, আল্লাহর হিফাযত করুন, তাহলে আল্লাহকে আপনার সন্মুখে পাবেন।

ইমাম বুখারী স্বীয় গ্রন্থে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

«إذا تقرّب العبد إلىّ شبراً تقربت إليه ذراعاً، وإذا تقرب إلىّ ذراعاً تقربت إليه باعاً، وإذا أتاني يمشي أتيته هرولة»

“বান্দা আমার দিকে যখন এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই এবং বান্দা যখন আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক গজ অগ্রসর হই এবং বান্দা যখন আমার কাছে হেঁটে আসে আমি তার কাছে দ্রুত চলি।”[1]

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَا﴾ [العنكبوت: ٦٩] 

“যারা আমাদের উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে আমরা তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের হিদায়াত করবো।” [সূরা আল-‘আনকাবুত, আয়াত: ৬৯]

প্রিয় পাঠক! তোমাকে অবশ্যই এই সমস্ত রোগ ও আপদ থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ এবং সদা সজাগ ও অগ্রণী হতে হবে। যিনি সত্যবাদী এবং যার কথা সত্য বলে সত্যায়িত করা হয়েছে অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেছেন, যা ইমাম বুখারী রহ. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন:

«ما أنزل الله داءً إلا أنزل له شفاء»

“আল্লাহ তা‘আলা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেন নি, যার আরোগ্যের জন্য প্রতিষেধক অবতীর্ণ করেন নি।”[1]

আল্লাহর শপথ, যে ব্যক্তির কাছে তার দীনের বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং যে গাফলতির নিদ্রা থেকে সাবধান থাকতে চায় এবং আশা করে যে কিয়ামতের দিন কৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হবে, সে অবশ্যই তার অন্তর নিরাপদ রাখার যাবতীয় উপায় জানতে এবং তাতে পতিত হওয়ার পর তার চিকিৎসার সকল পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে এবং পূর্ব থেকেই অন্তরকে ধ্বংস ও বিনষ্টকারী যাবতীয় বস্তু ও বিষয় থেকে হেফাযত করতে সচেষ্ট থাকে।

প্রিয় পাঠক! এখানে আমি তোমাকে কিছু ঔষধ বলে দিচ্ছি যা তোমাকে এই সমস্ত বড় রোগ ও আপদ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে:

প্রথম ঔষধ: মহান ও প্রজ্ঞাময় কুরআন অধ্যয়ণ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ঈমানদারদের অন্তরের সুস্থতার জন্য চিকিৎসা, হিদায়াত এবং রহমত হিসেবে কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা সমস্ত মানুষকে সম্বোধন করে বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡكُم مَّوۡعِظَةٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَشِفَآءٞ لِّمَا فِي ٱلصُّدُورِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٧ قُلۡ بِفَضۡلِ ٱللَّهِ وَبِرَحۡمَتِهِۦ فَبِذَٰلِكَ فَلۡيَفۡرَحُواْ هُوَ خَيۡرٞ مِّمَّا يَجۡمَعُونَ ٥٨ ﴾ [يونس : ٥٧،  ٥٨] 

“(হে মানুষ!) তোমাদের কাছে তোমাদের রবের তরফ থেকে এমন এক বস্তু সমাগত হয়েছে যা নসীহত এবং অন্তরসমূহের সকল লোগের আনোগ্যকারী, আর মুমিনদের জন্যে এটা পথ-প্রদর্শক ও রহমত। (হে রাসূল!) তুমি বলে দাও: আল্লাহর এই দান ও রহমতের প্রতি সকলেরই আনন্দিত হওয়া উচিৎ, তা এটা (পার্থিব সম্পদ) থেকে বহুগুণ উত্তম যা তারা সঞ্চয় করছে।” (পার্থিব সম্পদ) থেকে বহুগুণ উত্তম যা তারা সঞ্চয় করছে।” [সূরা ইউনূস, আয়াত: ৫৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ ٱلۡقُرۡءَانِ مَا هُوَ شِفَآءٞ وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا خَسَارٗا ٨٢﴾ [الاسراء: ٨٢] 

“এবং আমরা অবতীর্ণ করি কুরআন, যা ঈমানদারদের জন্য আরোগ্য ও রহমত, কিন্তু তা সীমালংঘনকারীদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।” [সূরা আল- ইসরা, আয়াত: ৮২]

তাই কুরআন হলো পূর্ণাঙ্গতর  উপদেশ, তার জন্য যার কাছে অন্তঃকরণ রয়েছে অথবা যে শ্রবণ করে নিবিষ্ট চিত্তে। আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, এই কুরআন হলো অন্তর ও হৃদয়ের আপদ এবং রোগের সবচেয়ে উপকারী ঔষধ এবং এই কুরআনে প্রবৃত্তির রোগেরও চিকিৎসা রয়েছে এবং এতে সন্দেহ রোগেরও আরোগ্যের ব্যবস্থাপত্র রয়েছে। যাদের অন্তর গাফিল এ কুরআন তাদের অন্তর জাগ্রত করে তুলে।

*ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, অন্তরের রোগের মূল কারণ হলো সন্দেহ ও প্রবৃত্তির রোগ। কুরআন তার দু’প্রকার রোগেরই ঔষধ। তাতে দলীল, প্রমাণ এবং সুস্পষ্ট যুক্তি রয়েছে যা সত্যকে মিথ্যা থেকে স্পষ্ট বর্ণনা করে দেয় এবং এর মাধ্যমে সন্দেহের রোগ দূর হয়ে যায়। আর কুরআন প্রবৃত্তির রোগেরও মহৌষধ, কারণ কুরআনে রয়েছে হিকমত, উত্তম উপদেশ, দুনিয়াবিমুখিতার প্রতি উৎসাহ, আখিরাতের প্রতি অনুরক্তকারী বিষয়সমূহ।

তবে প্রত্যেক পরিশুদ্ধ অন্তরের আকাঙ্খী ব্যক্তির এটা অবশ্যই জানা থাকা গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন দ্বারা আরোগ্য শুধু তেলাওয়াতের মাধ্যমে অর্জন হবে না, বরং কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করতে হবে এবং কুরআনে যে তথ্য ও খবর আছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, আর তাতে যে সকল হুকুম-আহকাম বিধি-বিধান রয়েছে তার প্রতি পূর্ণ অনুগত থাকতে হবে।

اللهم اجعل القرآن ربيع قلوبنا، وشفاء صدورنا، و ذهاب همومنا وغمومنا

“হে আল্লাহ! (তোমার নিকট এই কাতর প্রার্থনা জানাই যে) তুমি পবিত্র কুরআন মাজীদকে আমার অন্তরের জন্য প্রশান্তি, আমার বক্ষের জ্যোতি, আমার চিন্তা-ভাবনার অপসারণকারী এবং উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিদূরণকারী বানিয়ে দাও।”

দ্বিতীয় ঔষধ: বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে গভীরভাবে ভালোবাসা

কারণ, মহব্বত বা ভালোবাসা হলো অন্তরের চিকিৎসার সবচেয়ে উপকারী ঔষধ। কারণ, মহব্বত হলো ইবাদত বা দাসত্বের মূল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادٗا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبّٗا لِّلَّهِۗ ﴾ [البقرة: ١٦٥] 

“এবং মানবমণ্ডলীর মধ্যে এরূপ আছে যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে সদৃশ বা শরীক স্থির করে, আল্লাহকে ভালোবাসার ন্যায় তারা তাদেরকে ভালোবেসে থাকে আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা দৃঢ়তর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৫]

ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন

وصلاحـه وفلاحـه ونعيمـه

تجريـد هـذا الحب للرحمـن

“অন্তরের পরিশুদ্ধতা, তার সফলতা ও সুখ-শান্তি, তাতো কেবল এই ভালোবাসাকে রহমান (আল্লাহর) জন্যে একান্ত করার মধ্যে নিহিত।”

অর্থাৎ অন্তরের পরিশুদ্ধতা এবং সফলতা আর সুখ-শান্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসাকে খালিস করার মাধ্যমে অর্জিত হবে। তাই আল্লাহর ভালোবাসা হচ্ছে অন্তরের ঢাল ও রক্ষাবর্ম এবং শক্তি, জীবন ও বল। আল্লাহর শপথ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ছাড়া অন্তরের সুস্থতা, নাজাত, রক্ষা, খুশি, আনন্দ, স্বাদ ও একাগ্রতা অর্জন সম্ভব নয়। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ. আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«ثلاث من كن فيه وجد بهن حلاوة الإيمان: أن يكون الله ورسوله أحب إليه مما سواهما، وأن يحب الرجل لا يحبه إلا لله، وأن يكره أن يعود في الكفر بعد إذ أنقذه الله منه كما يكره أن يلقى في النار»

“যার মধ্যে তিনটি গুণ আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তার নিকট সবার চেয়ে প্রিয় হবে। সে মানুষকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ভালোবাসে এবং আল্লাহ কর্তৃক কুফুরী থেকে রক্ষা পাওয়ার পর সে তাতে ফিরে যাওয়াকে এমনভাবে ঘৃণা করে, যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে ঘৃণা করে।”[1]

এই হাদীসে ভালো করে দৃষ্টি প্রদান করলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এর বৃত্ত আল্লাহর ভালোবাসার সাথে সম্পৃক্ত ও তার সাথেই ঘূর্ণায়মান। তাই ভালোবাসা হচ্ছে দীন ইসলামের সবচেয়ে বড় কর্তব্য এবং তার মূলনীতিগুলোর অধিকাংশই এর সাথে জড়িত বরং ভালোবাসা হলো ঈমান ও দীন ইসলামের প্রতিটি আমলের মূল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ يَهۡدِ قَلۡبَهُۥۚ وَٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ ١١﴾ [التغابن: ١١] 

“যে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে আল্লাহ তার অন্তরকে সৎ পথে পরিচালিত করবেন। আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আত-তাগাবূন, আয়াত: ১১]

প্রকৃত মহব্বতের আলামত এবং তার সত্যের মানদণ্ডের কথা আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে বর্ণিত হয়েছে:

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١] 

“(হে রাসূল!) তুমি বল: যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন ও তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণময়।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

তোমার মধ্যে যে পরিমাণ ভিতরে ও বাহিরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ থাকবে, সে পরিমাণ তোমার মধ্যে আল্লাহর ভালোবাসা থাকবে, যার মাধ্যমে অন্তর সংশোধন সম্ভব হবে।

তৃতীয় ঔষধ: আল্লাহর যিকির বা স্মরণ:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَلَا بِذِكۡرِ ٱللَّهِ تَطۡمَئِنُّ ٱلۡقُلُوبُ ٢٨﴾ [الرعد: ٢٨] 

“আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত (অন্তর) প্রশান্ত হয়।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ২৮]

সহীহ হদীসে আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مثل الذي يذكر ربه والذي لا يذكر ربه كمثل الحي والميت»

“যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে, আর যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে না, তাদের উভয়ের দৃষ্টান্ত হলো জীবিত এবং মৃতের ন্যয়।”[1]

অতএব, অন্তরের জন্য আল্লাহর যিকির বা স্মরণ হলো যেমন, পানিতে মাছের অবস্থা। পানি থেকে মাছকে উপরে উঠানো হলে মাছের অবস্থা কেমন হতে পারে? অন্তরকে যদি যিকির থেকে বিরত রাখা হয় তাহলে তার অবস্থা উক্ত মাছের অবস্থার ন্যায় হয়ে যায়। তাই অন্তরকে আল্লাহর যিকির থেকে বিরত রাখা হলে অন্তর কঠিন ও শক্ত, অন্ধকার ও তমাসাচ্ছন্ন হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَوَيۡلٞ لِّلۡقَٰسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكۡرِ ٱللَّهِ﴾ [الزمر: ٢٢] 

“দুর্ভোগ সেই কঠোর হৃদয় ব্যক্তিদের জন্যে, যারা আল্লাহর স্মরণে পরন্মুখ।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২২]

ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর জন্য উজ্জ্বলতা প্রদানকারী বস্তু রয়েছে আর অন্তরের উজ্জ্বলতা বা আলো হলো আল্লাহর যিকির বা স্মরণ’।

এক ব্যক্তি হাসান বাসরীকে জিজ্ঞাসা করল: “হে আবু সাঈদ, আপনার কাছে আমার অন্তর শক্ত ও কঠিন হওয়া সম্পর্কে অভিযোগ করছি। এ কথা শুনে আবু সাঈদ হাসান বাসরী বললেন: আল্লাহর যিকির দ্বারা তা তরল ও গলিয়ে দাও। আল্লাহর যিকির এর ন্যায় এমন অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই, যার দ্বারা অন্তরের কঠিনতাকে তরল করা সম্ভব। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে অধিক মাত্রায় তাঁকে স্মরণ করার জন্য কুরআনে বিভিন্ন স্থানে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার বাণী হলো:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرٗا كَثِيرٗا ٤١ وَسَبِّحُوهُ بُكۡرَةٗ وَأَصِيلًا ٤٢﴾ [الاحزاب: ٤١،  ٤٢] 

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে এবং সকাল-সন্ধায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪১-৪২ আয়াত]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা জানিয়েছেন যে, নবী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জ্ঞানী বলে উল্লেখ করেছেন যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ قِيَٰمٗا وَقُعُودٗا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِم﴾ [ال عمران: ١٩١] 

“যারা দণ্ডায়মান, উপবেশন ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯১]

কমপক্ষে শর্তযুক্ত আযকারগুলো হিফাযত করা। যেমন, সকাল ও বিকালে পাঠ করার দো‘আ এবং সালাতের পর যে সমস্ত আযকার পাঠ করা হয় তার প্রতি যত্নবান হওয়া এবং ঐ সমস্ত দো‘আ যা কোনো কারণে অথবা বিশেষ অবস্থায় পাঠ করা হয়।

প্রিয় পাঠক! আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন, তুমি আল্লাহর যিকির করার ব্যাপারে যথাসাধ্য যত্নবান হবে। কারণ, আল্লাহর যিকির বা স্মরণ হলো অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের হয়ে আসার এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকে রহমত, দয়া ও অনুগ্রহের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ এবং সকাল এবং বিকাল তাঁর তাসবীহ পাঠ করার নির্দেশ প্রদান করার পর এর প্রতিদান উল্লেখ করে বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِي يُصَلِّي عَلَيۡكُمۡ وَمَلَٰٓئِكَتُهُۥ لِيُخۡرِجَكُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِۚ وَكَانَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ رَحِيمٗا ٤٣﴾ [الاحزاب: ٤٣] 

“তিনি (আল্লাহ) তোমাদের ওপর সালাত প্রেরণ করেন আর তাঁর ফিরিশতারাও; তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনার জন্যে এবং তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালূ।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪৩]

তাই আল্লাহকে স্মরণকারীর প্রতিদান হলো অন্ধকার থেকে বের করে আলোর পথে নিয়ে আসা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাত বা রহমত এবং ফিরিশতার পক্ষ থেকে ক্ষমার দো‘আ করা।

চতুর্থ ঔষধ: আন্তরিক তাওবাহ করা এবং অধিক মাত্রায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া

বস্তুত খাঁটি বা আন্তরিকভাবে করা তাওবা, যাতে তাওবার শর্ত পরিপূর্ণ থাকে, তা অন্তরকে উজ্জ্বলতা প্রদান করে এবং অন্তর থেকে পাপ ও খারাপ কাজের ময়লা দূরীভূত করে দেয়। কারণ, অনবরত পাপ ও অন্যায়ের কাজ করতে থাকলে তা অন্তরকে কালো করে তোলে, ফলে পাপী ও অন্যায়কারীর অন্তরকে ঘোর অন্ধকার, কঠোর নিষ্ঠুর প্রকৃতির ও নির্দয় দেখতে পাবে এবং তার মধ্যে স্বচ্ছতা, নির্মলতা ও আনন্দ খুঁজে পাবে না, বরং আল্লাহর শপথ সে অন্তর আযাব, দুর্ভাগ্য ও কষ্টের মধ্যে নিপতিত।

কাজেই তাওবা হলো অন্তরের এক প্রায়াস ও প্রচেষ্টার নাম। অন্তরের পরিশুদ্ধতা, সংস্কার, সংশোধন ও সুদৃঢ় করার জন্য তাওবার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তাই বেশি বেশি তাওবাহ করা এবং তাওবাকে বার বার নবায়ন করা ও সর্বদা ইসতেগফার করা অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তুলে এবং তাকে ভালো কাজের আগ্রহী করে তুলে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদীসে বলেন,

«إنه ليغان على قلبي، وإني لأستغفر الله في اليوم مائة مرة»

“অন্যমনস্কতা আমার অন্তরকে ঢেকে নেয়। তাই আমি দিনে আল্লাহর কাছে একশত বার ইসতেগফার করি।”[1]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর দিয়েছেন যে, ইসতেগফারের দ্বারা তাঁর অন্তর থেকে অন্যমনস্কতা দূর হয়ে যায়, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বের এবং পরের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হয়েছে। তাহলে অন্য যাদের গোনাহের বোঝায় স্কন্ধ ভারি হয়ে গেছে এবং অধিক অন্যায় ও পাপ বৃদ্ধি করেছে, তার কি অধিক মাত্রায় ক্ষমা চাওয়া দরকার নয়? যার মাধ্যমে তার অন্তরের ভ্রান্তি ও অন্যায় সংশোধন হয়ে যাবে? আল্লাহর শপথ অবশ্যই আমরা সকলেরই অধিক তাওবা করার মুখাপেক্ষী। কারণ, বান্দা যখন গুনাহ থেকে তাওবাহ করে এবং তার অন্তরে যে সমস্ত ভালো ও খারাপ আমলের মিশ্রিত হয়েছিল তা থেকে খালি করে নেয় এবং যখন সে গোনাহ থেকে তাওবাহ করবে তখন অন্তরের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সে ভালো কাজ করার ইচ্ছা খুঁজে পায়। আর তার অন্তরে যে সব নষ্ট ও বিকৃত বস্তু প্রবিষ্ট হয়েছিল তা থেকে মুক্তি পায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَوَ مَن كَانَ مَيۡتٗا فَأَحۡيَيۡنَٰهُ وَجَعَلۡنَا لَهُۥ نُورٗا يَمۡشِي بِهِۦ فِي ٱلنَّاسِ كَمَن مَّثَلُهُۥ فِي ٱلظُّلُمَٰتِ لَيۡسَ بِخَارِجٖ مِّنۡهَا﴾ [الانعام: ١٢٢]  

“এমন ব্যক্তি যে ছিল প্রাণহীন তৎপর তাকে আমরা জীবন প্রদান করি এবং তার জন্যে আমরা এমন আলোকের (ব্যবস্থা) করে দেই, যার সাহায্যে সে জনগণের মধ্যে চলাফেরা করতে থাকে সে কি এমন কোনো লোকের মতো হতে পারে যে, (ডুবে) আছে অন্ধকার পুঞ্জে, তা থেকে বের হওয়ার পথ পাচ্ছে না।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২২] এটি একটি উদাহরণ, যাদের অন্তর কুফুরী ও অজ্ঞতা দ্বারা মৃত আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা উক্ত কুফুরী ও অজ্ঞতা থেকে তাওবাহ করার মাধ্যমে হিদায়াত প্রদান করেন এবং তাকে ঈমান দ্বারা জীবিত করেন এবং তাকে আলো দান করেন যার দ্বারা

সে আলোকিত হয়ে চলতে পারে এবং তার মাধ্যমে সে মানুষের মাঝে পথ চলতে পারে।

পঞ্চম ঔষধ: আল্লাহকে ডাকা ও তাঁর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করা যাতে তিনি তোমার অন্তরকে সংশোধন করে দেন এবং হিদায়াত দেন।

কারণ, দো‘আ বা প্রার্থনা করা অন্তরের সংশোধনের দরজাসমূহের একটি বড় দরজা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَلَوۡلَآ إِذۡ جَآءَهُم بَأۡسُنَا تَضَرَّعُواْ وَلَٰكِن قَسَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَزَيَّنَ لَهُمُ ٱلشَّيۡطَٰنُ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٤٣﴾ [الانعام: ٤٣] 

“সুতরাং তাদের প্রতি যখন আমার শাস্তি পৌঁছলো তখন তারা কেন নম্রতা বিনয় প্রকাশ করলো না? বরং তাদের অন্তর আরো কঠিন হয়ে পড়লো, আর শয়তান তাদের কাজকে তাদের চোখের সামনে শোভাময় করে দেখালো।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৪৩]

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, আমি সবচেয়ে উপকারী দো‘আ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছি যে, তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সাহায্য কামনা করা। অতঃপর আমি তা সূরা ফাতিহায় নিম্নের আয়াতে খুজে পেয়েছি।

﴿إِيَّاكَ نَعۡبُدُ وَإِيَّاكَ نَسۡتَعِينُ ٥﴾ [الفاتحة: ٥] 

“হে আল্লাহ!) আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।” [সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৫]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে তাঁর আত্মার শুদ্ধি, হিদায়াত এবং হকের প্রতি অবিচল থাকার জন্য বেশি বেশি প্রার্থনা করতেন। ইমাম তিরমিযী সহীহ সনদে উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দো‘আটি বেশি বেশি পাঠ করতেন:

«يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك»

“হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দীনের প্রতি স্থির রাখ।”[1]

সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن قلوب بني آدم كلها بين إصبعين من أصابع الرحمن كقلب واحد يصرفه حيث يشاء»

“নিশ্চয় আদম সন্তানের সমস্ত অন্তর পরম করুণাময় আল্লাহর দু’আঙ্গুলের মাঝে এক অন্তরের ন্যায়, তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন।”

তিনি আরও বলেন,

«اللهم مصرف القلوب صرف قلوبنا على طاعتك»

“হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরকে তোমার আনুগত্যের দিকে পরিবর্তন করো।”

ষষ্ঠ ঔষধ: বেশি বেশি আখিরাতের কথা স্মরণ করা:

কারণ, আখিরাত সম্পর্কে গাফিল থাকা হচ্ছে, কল্যাণ ও সাওয়াবের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী এবং যাবতীয় ফিতনা ও অকল্যাণ আনয়নকারী। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«زوروا القبور فإنها تذكركم الموت»

“তোমরা কবর যিয়ারত করো। কারণ, কবর যিয়ারত তোমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিবে।”[2]

ইবন মাজাহ’র অন্য এক বর্ণনায় আছে:

«فإنها تزهد في الدنيا، وتذكر الآخرة»

“কবর যিয়ারত তোমাদেরকে দুনিয়াবিমুখ করবে এবং আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে।”[3] অন্তরের জন্য কবর যিয়ারত, আখিরাত ও মৃত্যুর স্মরণের চেয়ে অন্য কিছু অধিক উপকারী বিষয় নেই। কারণ, আখিরাত ও মৃত্যুর স্মরণ হলো প্রবৃত্তির দমন ও নিয়ন্ত্রণকারী এবং গাফলতি ও অসতর্কতা থেকে জাগরণকারী। এ কারণেই নবী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি

স্বাদ, সুখ, উপভোগ এর ধ্বংসকারী (আখিরাত ও মৃত্যুর) কথা স্মরণ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

সপ্তম প্রতিকার ও ঔষধ: সালাফে সালেহীনের সীরাত বা জীবন-চরিত পাঠ করা

তাদের জীবন চরিত এবং কিসসা ও ঘটনায় জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَكُلّٗا نَّقُصُّ عَلَيۡكَ مِنۡ أَنۢبَآءِ ٱلرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِۦ فُؤَادَكَ﴾ [هود: ١٢٠] 

“এবং রাসূলদের ঐ সব বৃত্তান্ত আমরা তোমার কাছে বর্ণনা করেছি, এর দ্বরা আমরা তোমার চিত্তকে দৃঢ় করি।” [সূরা হূদ, আয়াত: ১২০]

নবী, রাসূল শহীদ এবং সালেহীন ও অন্যান্য আল্লাহর আউলিয়াদের কিসসা ও ঘটনায় অন্তরকে স্থির রাখে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধতা ও সৎকর্মশীল এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেয়। তাই যে ব্যক্তি দূরদর্শিতা বুদ্ধিমত্তা এবং জ্ঞানের সাথে বিভিন্ন জাতির জীবন বৃত্তান্ত পর্যবেক্ষণ করবে আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তরে নতুন জীবন দান করবেন এবং তার অভ্যন্তর ভাগকে সংশোধন করে দিবেন। বিশেষ করে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সীরাত হলো ঈমান বৃদ্ধি, অন্তর ও হৃদয় সংশোধন করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।

অষ্টম চিকিৎসা ও ঔষধ: উত্তম এবং সৎ ও ধার্মিক লোকদের সহচর্য গ্রহণ করা:

কারণ, তারা এমন লোকজন যাদের সঙ্গী ও সাথীগণ কখনও দুর্ভাগা হন না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন:

﴿وَٱصۡبِرۡ نَفۡسَكَ مَعَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ رَبَّهُم بِٱلۡغَدَوٰةِ وَٱلۡعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجۡهَهُۥۖ وَلَا تَعۡدُ عَيۡنَاكَ عَنۡهُمۡ تُرِيدُ زِينَةَ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَلَا تُطِعۡ مَنۡ أَغۡفَلۡنَا قَلۡبَهُۥ عَن ذِكۡرِنَا وَٱتَّبَعَ هَوَىٰهُ وَكَانَ أَمۡرُهُۥ فُرُطٗا ٢٨﴾ [الكهف: ٢٨] 

“(হে রাসূল!) নিজেকে তুমি রাখবে তাদেরই সঙ্গে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহ্বান করে তাদের রবকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও না; যার চিত্তকে বা অন্তরকে আমরা আমাদের স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, সে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ২৮]

ইমাম আহমাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,

«المرء على دين خليله، فلينظر أحدكم من يخالل»

“একজন মানুষ তার বন্ধুর দীনের ওপরেই বড় হতে থাকে, কাজেই তোমাদের প্রত্যেকে যেন পর্যবেক্ষণ করে দেখে সে কার বন্ধুত্ব গ্রহণ করেছে।”

ইমাম মালিক ইবন দীনার বলেন,

إنك أن تنقل الحجارة مع الأبرار خير من أن تأكل الحلوى مع الفجار

“ধার্মিক লোকদের সাথে তোমার পাথর বহণ করাও পাপাচারী ও লম্পট লোকদের সাথে মিষ্টি খাওয়া থেকে উত্তম।” অতএব, ভালো, উত্তম, সৎ ও ধার্মিক লোকদের সহচর্য গ্রহণ করবে এবং তাদের সাহচর্য লাভের চেষ্টা করবে, যাদের দেখা হলে আল্লাহকে স্মরণ আসে। কারণ, তাদের সাহচর্য অন্তরের জীবন। একজন সালাফ বলেছেন:

إن كنت لألقى الرجل من إخواني فأكون بلقياه عاقلاً أياماً

“আমি কখনও কখনও আমার বন্ধুদের কারও সাথে সাক্ষাৎ করি, অতঃপর তার সাথে এ সাক্ষাতের মাধ্যমে অনেক দিন বুদ্ধিমান হয়ে থাকি।”

অন্য একজন সালাফ বলেছেন:

كنت أنظر إلى أخ من إخواني فأعمل على رؤيته شهراً

“আমি আমার বন্ধুদের মধ্য থেকে কোনো একজনের দিকে তাকিয়ে এক মাস আমল করতে সমর্থ হই।”

এ সব হচ্ছে অন্তরের প্রতিষেধক এর মূলনীতি এবং আত্মশুদ্ধির বিভিন্ন মাধ্যম। তাই তা উপলব্ধির চেষ্টা এবং তা ভালোভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা কর। কারণ, প্রকৃত সমৃদ্ধি ও কল্যাণ অন্তরের পরিশুদ্ধতা ও তার সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। যাদের অন্তর পরিশুদ্ধ হয়েছে এবং যাদের অভ্যন্তর ভাগ সুস্থ হয়েছে তাদের থেকে অধিক পরিপূর্ণ, অধিকতর সৌভাগ্যবান, অধিক উত্তম, অধিক সুখী, অধিক আনন্দময় ও অধিক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি আর কেউ নেই।

‘আরশে আযীমের মালিক মহান আল্লাহর কাছে আমরা প্রার্থনা করি, যারা তাঁর কাছে খাঁটি ও অটুট অন্তর নিয়ে আগমন করবেন, আমরা যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।

﴿يَوۡمَ لَا يَنفَعُ مَالٞ وَلَا بَنُونَ ٨٨ إِلَّا مَنۡ أَتَى ٱللَّهَ بِقَلۡبٖ سَلِيمٖ ٨٩﴾ [الشعراء: ٨٨،  ٨٩] 

“সেদিন, যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; সেদিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।” [সূরা আশ- শু‘আরা, আয়াত: ৮৮-৮৯]

আবারও ‘আরশে আযীমের মালিক মহান আল্লাহর কাছে দো‘আ করি, তিনি যেন আমাকে এবং আপনাদেরকে তাঁর শরী‘আতের ওপর সুদৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন এবং তিনি আমাদেরকে যেন একনিষ্ঠ অন্তর এবং সৎ আমল করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদের অন্তরে যেন তাকওয়া দান করেন এবং যেন তা পবিত্র করেন এবং তিনিই অন্তরের উত্তম পবিত্রকারী।

পরিশেষে আমাদের দাবী থাকবে যে, আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। আর আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের সুসংবাদদাতা এবং জাহান্নাম থেকে সতককারী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবার পরিজন এবং তাঁর সাহাবীগণের প্রতি রহমত নাযিল করুন। (আমিন)


[1] তিরমিযী হাদীস নং ২১৪০।

[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৮৭৬।

[3] সুনান  ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৫৭১।


[1] আহমাদ, হাদীস নং ১৮০০২।


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪০৭।


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২১; মুসলিম, হাদীস নং ৪৩।


[1] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৫৬৭৮।


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৪০৫।


[1] হাদীসটি ইমাম আহমাদ ৪র্থ খণ্ডের ১২৩, ১২৫ এবং ইমাম তিরমিযী ৩৪০৭ পৃষ্ঠায় এবং নাসাঈ ১৩০৫ বর্ণনা করেছেন।


[1] আল মুসনাদ, পৃষ্ঠা: ২৪৩১৭।


[1] সহীহ বুখারী পৃ. ৫২; সহীহ মুসলিম পৃ. ১৫৯৯।

[2] আল মুসনাদ হাদীস নং ১৩০৭৯।


[1] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৪।


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪২৩।

[2] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১৯১১।

[3] আবূ দাউদ হাদীস নং ২৫০৪; নাসাঈ ৬/৭; আহমাদ ৩/১২৫, ১৫৩; যাদুল মা‘আদ।


[1] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৫৬৪।


[1] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭৭।