মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

আত্মা বিষয়ে  আলোচনা করার আগে  কিছু কথা বলে নেওয়া জরুরি মনে করছি । ‘আত্মা’ হচ্ছে কি এমন জিনিস, যেটা সৃষ্টি সবচেয়ে কঠিন রহস্যগুলো একটি । এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না । বিজ্ঞান এবং দর্শনেও বহু আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো এই ‘আত্মা’ । এই বিষয়ের উপর অনেক বই লেখা হয়েছে, অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে । ধর্মীয় কিতাবাদিতে আত্মার ব্যাপারে অসংখ্য কথা পাওয়া যায় । কুরআনুল কারীমের অনেক জায়গায় ‘আত্মা’ সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে । তবে কোথাও এ এই কথা বলা নেই যে, এই ‘আত্মা’ আসলে কিসের তৈরি । তবে আরজ আলী মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান বইতে একটা অধ্যায় ‘আত্মা’ সম্পর্কে যে ধারণাগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো খুবই হাস্যকর, শিশুসুলভ । আত্মা, প্রাণ সম্পর্কে কোনো রকম পড়াশোনা বা জানাশোনা না থাকলেই মানুষ কেবল এ জাতীয় প্রশ্ন করতে পারে ।

আরজ আলী সাহেব উনার প্রশ্নের মধ্যে ‘আত্মা’ এবং ‘প্রাণ’ শব্দদ্বয়কে সমার্থক ধরে নিয়ে এগিয়েছেন । প্রশ্ন করেছেন । কিন্তু কুরআনুল কারীমে যেটা ‘আত্মা’, সেটা আবার ‘প্রান’ নয় । আবার কুরআন অনুসারে যেটা ‘প্রান’ সেটা ‘আত্মা’ নয় । কুরআনুল কারীমের সঠিক জ্ঞান, কোরআনের সঠিক অর্থ না জানলেই এরকম জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলা সম্ভব । যাহোক, এ অধ্যায়ে আমরা দেখব আরজ আলী সাহেব ‘আত্মা’ বিষয়ে উনার প্রশ্ন নিয়ে কিভাবে এগিয়েছেন ।

‘আত্মা’ বিষয়ে উনার প্রথম প্রশ্ন হল-

“এই রক্ত-মাংস, অস্থিমজ্জায় গঠিত দেহটাই কি আমি ? তাই যদি হয়, তবে মৃত্যুর পরে যখন দেহের উপাদান সমূহ পচিয়া-গলিয়া অর্থাৎ, রাসায়নিক পরিবর্তনের কতগুলি মৌলিক ও যৌগিক পদার্থে রূপান্তরিত হইবে, তখন কি আমার আমিত্ব থাকিতে না ? যদি নাই থাকে, তবে স্বর্গ-নরকের সুখ-দুঃখ ভোগ করিবে কে ?”

মাতব্বর সাহেব এই জায়গায় ভুল করেছেন । যেনতেন কোন ভুল নয় । মারাত্মক ভুল । ধর্মগুলো যে ‘পারলৌকিক’ অর্থাৎ, ইহজগতের পরে আরও একটা জগত সম্পর্কে ধারণা দেয়, সে ব্যাপারে সম্ভবত উনার জানা নেই । অথবা হতে পারে যা জানেন, তা পরিপূর্ণ না । অবশ্য মাতুব্বর সাহেবকে দোষ দিয়ে লাভ নেই । এমন নয় যে, এই প্রশ্ন ঘুম থেকে উঠে আমরা নতুন দেখছি । এটা প্রশ্নটা বহু বহু পুরনো । আজ থেকে সাড়ে চোদ্দশ বছর আগে মক্কার কাফির-মুশরিকরাও ঠিক এই প্রশ্নগুলোই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করতো ।

একবার একজন মুশরিক ব্যক্তি (উবাই ইবনে খালাফ মতান্তরে ওয়ায়েল ইবনে সাহম বা তাদের উভয়েই) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দুটো পুরনো হাড় নিয়ে এসে ঘষা দিল । ঘষার ফলে হাড়গুলো গুড়ো হয়ে নিচে পরতে লাগলো । এরপর ওই মুশরিক ব্যক্তি রাসূল সাঃ কে বলল, ‘হে মুহাম্মদ, এ রকম গুড়ো হয়ে যাওয়ার পরও কি এগুলো আবার জীবিত হবে ?’

মুশরিক ব্যক্তির উদ্দেশ্য ছিল ‘জানা’ নয়, ‘ব্যঙ্গ’ করা । এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সূরা ইয়াসিনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল করলেনঃ

“আর সে আমার উদ্দেশ্যে উপমা পেশ করে অথচ সে তার নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় । সে বলে হাড়গুলো জরাজীর্ণ হওয়া অবস্থায় কে সেগুলো আবার একত্র করে জীবিত করবে?”

“ বলুন (হে মুহাম্মদ) তিনি জীবিত করবেন যিনি এগুলোকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন আর তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সর্বজ্ঞাত ”

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরজ আলী সাহেবেরা যে প্রশ্নগুলো এখন বসে করছেন, তা নতুন কিছু নয় । এই প্রশ্নগুলো চৌদ্দশ বছর আগে মক্কার মুশরিক, কাফেররা করেছিলে ।

এগুলোর উত্তর তখনই দেয়া হয়েছে । আবার প্রতি যুগের আলেম, ফকিহ, ইমামগণ দিয়েছেন । কিন্তু বাতিল তথা মিথ্যার একটি রূপ এমন যে, সে বারবার ভিন্ন ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে সত্যানুসন্ধানীদের বিভ্রান্ত করতে চায় ।

আমরা এবার আরজ আলী সাহেবের প্রশ্ন ফিরে যাই । আবারও তিনি বলতে চেয়েছেন- মৃত্যুর পর যেহেতু আমাদের শরীর পচে গলে মাটির সাথে মিশে যাবে, তাহলে পরকালের সুখ-দুঃখ, শাস্তি-পুরস্কার ভোগ কে করবে ?

পাঠক একটি ঘটনা কল্পনা করার চেষ্টা করুন । ধরুন, আপনার হাতে এই মুহূর্তে যে মোবাইল ফোনটি আছে সেটা হল iphone 8 ।ধরুন , এই মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়ে আপনি রিকশা করে বাসায় ফিরছেন । রিকশায় বসে বসে আপনি মনের আনন্দে ফেসবুক চালাচ্ছেন । বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধবের পোস্টে, ফটোতে লাইক দিচ্ছেন, কমেন্ট দিচ্ছেন, রিপ্লে দিচ্ছেন । হঠাৎ পিছন থেকে আরেকটি রিক্সা জোরে আপনাকে রিক্সাটাকে ধাক্কা দিল । এর ফলে কি হলো ? আপনি পড়তে পড়তেই বেঁচে গেলেন, কিন্তু আপনার হাতে থাকা স্যামসাং ব্র্যান্ডের ফোনটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে গেল । আপনি মন খারাপ করে বাসায় ফিরে আসলেন । বাসায় ফিরে আপনি আপনার ল্যাপটপ ওপেন করে ফেসবুকে লগিন করলেন ।

আচ্ছা বলুন তো, আপনার হাতে থেকে মোবাইল ফোনটি পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কি আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটিও নষ্ট হয়ে গেছে ? আপনার ফেসবুক প্রোফাইল গায়েব হয়ে গেছে ? আপনার সব রকম ফেসবুক অ্যাক্টিভিটি হাওয়া হয়ে গেছে ? না এ কোনটাই হয়নি । আপনি যখনই নতুন মাধ্যমে, নতুন ডিভাইসে আপনার মেইল এবং পাসওয়ার্ড দিয়েছেন, আপনার পূর্বের সকল একটিভিটি আবার চলে এসেছে ।

এখানে ব্যাপারটাও কিছুটা সেরকম । আমাদের এই দেহটা হচ্ছে স্যামসাং ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোনটার মতোই । এটা নষ্ট হয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু আমার সকল ভার্চুয়াল অ্যাক্টিভিটি হারিয়ে যাওয়া নয় । আর আমাদের ‘আত্মাটা’ হচ্ছে ফেসবুক একাউন্ট এর মত । যে মাধ্যমেই এটার মেইল পাসওয়ার্ড দেওয়া হবে, আমার সকল ভার্চুয়াল অ্যাক্টিভিটি হুবহু ফেরত আসবে ।

আরজ আলী সাহেবদের বলতে চাই, এ জীবনপরবর্তী জীবনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন বলবেন, ‘হও’, তখন আমাদের পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যাওয়া হাড়গুলো পুনরায় একত্র হয়ে যাবে । আর তাতে যখন আমাদের রুহটাকে প্রবেশ করানো হবে, তখন আমরা আবার প্রাণ ফিরে পাবো । তখনই আমাদের ওপরে শেষকালের শাস্তি-পুরস্কার নির্ধারিত হবে এবং আমরা তা ভোগ করব ।

আরজ আলী সাহেবের দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো ‘প্রানের রূপ’ নিয়ে । তিনি প্রশ্ন করেছেন-

‘প্রাণ যদি অরূপ বা নিরাকার হয়, তবে দেহাবসানের পরে বিশ্বজীবের প্রানসমুহ একত্র হইয়া একটি অখণ্ড সত্তা বা শক্তিতে পরিণত হইবে না কি ? অবয়ব আছে বলিয়াই পদার্থের সংখ্যা আছে । নিরাবয়ব বা নিরাকারের সংখ্যা আছে কি ? আর সংখ্যা না থাকিলে তাহার স্বাতন্ত্র্য থাকে কি ? পক্ষান্তরে প্রাণ যদি স্বরূপ বা সাকার হয়, তবে তাহার রূপ কি ?’

এই প্রশ্নটিই থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, আরজ আলী সাহেব আসলে বিজ্ঞান সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না । অবশ্য তিনি যে সময়ে বসে কথাগুলো বলছেন, সেই সময়ে বিজ্ঞান আজকের সময়ের মতো এতো বেশি এডভান্সড ছিলনা । এজন্যই বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেতে নেই ।

যাহোক, আমরা আরজ আলী সাহেবের এই প্রশ্নটার শেষদিকে থেকে আগাব । তিনি এই প্রশ্নের একদম শেষে লিখেছেন,

‘প্রান যদি স্বরূপ বা সাকার হয়, তবে তার রূপ কি?’

আরজ আলী সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, প্রাণ দৃশ্যমান নয় তবে তারও একটি অস্তিত্ব আছে; যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ও বের হয় । [যাকে বলা হয় জিসমে লাতিফ বা সূক্ষ্ম শরীর]

এখন উনার প্রশ্ন-

‘নিরাবয়ব বা নিরাকারের সংখ্যা আছে কি?’

জি । নিরাকার জিনিসেরও সংখ্যা আছে । পরিমাণ আছে । বিজ্ঞান নিয়ে হালকা-পাতলা জানে এমন লোকও এখন জানে যে,পৃথিবীতে দুই ধরনের পদার্থ আছে । দৃশ্য এবং অদৃশ্য । দৃশ্যমান  পদার্থগুলো আমরা আমাদের চোখে দিয়ে দেখি । যেমন, আকাশ, সাগর, পাহাড়, গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি । আবার আরেক ধরনের পদার্থ আছে যেগুলো আমরা দেখি না । এমনকি শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও পদার্থগুলো দেখা যাবে না  । এগুলো যে দেখা যাবে না, সেটা স্বয়ং বিজ্ঞানও স্বীকার করে । বিজ্ঞানীরা এই অদৃশ্য পদার্থের নাম দিয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা ‘অদৃশ্য বস্তু’ । নাসার রিপোর্ট মতে, আমাদের মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থের পরিমাণ হলো মাত্র ৫ % । বাকি ৯৫% পদার্থ আমরা দেখি না বা দেখতে পাবো না । এটাকে বলা হচ্ছে, ‘ডার্ক ম্যাটার’ ।

এখন দেখা যায় না বা নিরাকার বলে কি এগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই ? নিরাকার বলে কি এগুলোর কোনো পরিমাপ, পরিমান করা যায় না ? যায় । ডার্ক ম্যাটারের অবশ্যই অস্তিত্ব আছে এবং এটা এখন বিজ্ঞান মহলে আলোচিত হটকেকগুলোর একটি । ডার্ক ম্যাটার ও অদৃশ্য বস্তু । কিন্তু বিজ্ঞান এটাকে পরিমাপ করতে পেরেছে । বিজ্ঞান জানিয়েছে মহাবিশ্বের ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ ৯৫% । অদৃশ্য হলেই যে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়, অদৃশ্য হলেই যে পরিমাপ বা সংখ্যাহীন হয়ে পড়ে এই ধারণা এখন বাতিল । আরজ আলী সাহেবদের সেই পুরনো ধ্যান-ধারণায় বিজ্ঞান এখন আর বসে নেই ।

আরজ আলী সাহেবের তৃতীয় প্রশ্ন ছিলো –

“সাধারণত আমরা জানি যে, মন ও প্রাণ এক নহে । কেননা উহাদের চরিত্রগত পার্থক্য বিদ্যমান । আমরা আমাদের নিজেদের উপলব্ধি হইতে জানিতে পাইতেছি যে ‘মন’ প্রাণের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু ‘প্রান’ মনের উপর নির্ভরশীল নয় । মন নিষ্ক্রিয় থাকিলেও প্রাণের অভাব পরিলক্ষিত হয় না । কিন্তু প্রান নিষ্ক্রিয় হইলে মনের অস্তিত্বই থাকে না ।”

এতটুকুতে আরজ আলী সাহেব বক্তব্য রেখেছেন । প্রথমটি হলো, ‘মন’ ও ‘প্রান’ এক নয় । এই কথাটির সাথে একশ ভাগ একমত । মন ও প্রাণ কখনোই এক নয় । দুটোই আলাদা জিনিস । তাছাড়া আরজ আলী সাহেবের উপযুক্ত বক্তব্য দিয়ে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারবেন না । কারণ, ইসলাম মন ও প্রান আলাদা বলে থাকে । একটির নাম ‘ক্কালব’, আরেকটির নাম ‘নাফস’ ।

কিন্তু, এর পরেই আরজ আলী সাহেব আবার একটি ভুল করে বসেছেন । তিনি বলেছেন, ‘মন নিষ্ক্রিয় থাকলেও প্রাণের অভাব পরিলক্ষিত হয় না । কিন্তু প্রান নিষ্ক্রিয় থাকলে মনের অস্তিত্বই থাকে না ।’

প্রান নিষ্ক্রিয় থাকলে মনের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবার কথা আদৌ ঠিক নয় । বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা একদম অবৈজ্ঞানিক কথা । বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষের ‘প্রাণ’ অবর্তমান থাকা অবস্থাতেও ‘মন’ বর্তমান থাকে ।  Near death experiences Research Foundation  নামে বিজ্ঞানী Jeffery Long  এর একটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন আছে । এই ফাউন্ডেশনটি বিগত ২৫ বছর ধরে ‘মৃত্যুপরবর্তী জীবন’ নিয়ে গবেষণা করছে ।

কোন মানুষ যখন গুরুতর অ্যাক্সিডেন্ট করে বা হার্ট অ্যাটাক করে, তখন ডাক্তাররা ওই ব্যক্তিকে ক্লিনিক্যালি ডেড বলে ঘোষনা দিয়ে দেন । অর্থাৎ, ডাক্তারদের ভাষায় ওই লোক মৃত । কিন্তু ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষিত হবার পরেও এই রকম কিছু কিছু ব্যাক্তি আল্লাহর ইচ্ছায় আবার প্রাণ ফিরে পায় । বিজ্ঞানী Jeffery Long  এর এই সংগঠনটি মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের এরকম ক্লিনিক্যালি ডেড থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে গবেষণা করে । তারা ঐসব ব্যাক্তিদের কাছে জানতে চায় ক্লিনিক্যালি ডেড হয়ে যাবার পরে তারা কোথায় ছিল, কি করছিল, আর কি দেখছিল ?

এরকম অবস্থা থেকে ফিরে আসা সকলের বক্তব্য প্রায় একই রকম দেখা যায় । তারা বলে, ক্লিনিক্যালি ডেড হবার পরেও, অর্থাৎ, ডাক্তারদের ভাষায় ‘প্রাণ ত্যাগ’ করার পরেও তারা চারপাশের সবকিছু দেখতে পায় । কে কি বলে তা শুনতে পায় । এ সময় তারা যেখানে ইচ্ছে চলে যেতে পারে । অর্থাৎ, ওই সময়টাতে তারা আর নিজেদের শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না । এসময় তারা বিশেষ করে তাদের জীবনের একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখতে পায় ।

এ বিষয়ে Jeffery Long  এর একটি বিখ্যাত বইও আছে । বইটির নাম Evidence of the Afterlife । তাদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি হল http://www.nderf.org

অর্থাৎ, এই সমস্ত বিজ্ঞানীদের যাবতীয় কাজ, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এটাই প্রমাণ করে যে, মন অবশ্যই তার ওপর নির্ভরশীল নয় । মানুষের প্রাণ না থাকা অবস্থাতেও তার মন বর্তমান থাকতে পারে । সুতরাং ‘প্রাণ নিষ্ক্রিয় হলেই মনের অস্তিত্ব থাকে না’ মর্মে আরজ আলী সাহেবের দেওয়া বক্তব্য অসত্য এবং অবৈজ্ঞানিক ।

অধ্যায়ের চতুর্থ প্রশ্নে এসে আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,

“দেহ জড় পদার্থ । কোন জীবের দেহ বিশ্লেষণ করিলে কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, লৌহ, ফসফরাস ইত্যাদি নানা প্রকার পদার্থের বিভিন্ন অনুপাতে অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায় । পদার্থসমূহ নিষ্প্রাণ । কাজেই পদার্থসমূহের যথানুপাতে সংমিশ্রিত অবস্থাকেই প্রাণ বলা যায় না । পদার্থসমূহের যথানুপাতে সংমিশ্রন এবং আরো কিছুর ফলে দেহে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায় । ওই আরো কিছুকে আমরা মন বলিয়া থাকি । কিন্তু মানুষের দেহ, মন ও প্রাণে কিছু সম্পর্ক বা বন্ধন আছে কি ? থাকিলে তাহা কিরুপ ? আর না থাকিলেই বা উহারা একত্র থাকে কেন?”

আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের কথাগুলোকে একটু খুঁটিয়ে দেখলে ওনার প্রতিটা প্রশ্ন থেকেই খুঁত বের করা যাবে । এসব নিয়ে লিখতে বসলে পাতার পর পাতা হয়তো শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু উত্তর লেখা শেষ হবে না । তিনি আবারও প্রাণ ও মনকে গুলিয়ে ফেলেছেন ।

এই যেমন, চতুর্থ নম্বর প্রশ্নের প্রথম লাইনেই একটি ভুল তথ্য উনি বলেছেন, ‘দেহ জড় পদার্থ’ ।

অথচ হালকা বিজ্ঞান বোঝে এমন লোক মাত্রই জানেন যে, মানব শরীর গঠিত হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষ এর মাধ্যমে । প্রতিটি কোষের রয়েছে স্বতন্ত্র জীবনপ্রক্রিয়া । প্রতিটি কোষেরই প্রাণ আছে । তাহলে প্রানসম্পন্ন কোষ দিয়ে গঠিত দেহটাকে জড় পদার্থ বলাটা কতটুকু যৌক্তিক বা বিজ্ঞানসম্মত ?আত্মা

তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক যে, মানুষের কোষগুলোকে বিশ্লেষণ করলে কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, লৌহ, ফসফরাস ইত্যাদি পাওয়া যায় । কিন্তু, বিজ্ঞানমনস্ক যে কোন ব্যক্তি মাত্রই জানে যে, বিজ্ঞানের পরমাণুগুলো কখনোই ঠিক থাকে না এবং পরমাণু কখনোই জড়বস্তুর মতন আচরন করে না । আমরা জানি, প্রতিটি পরমাণুর তিনটি মৌলিক কণিকা থাকে । সেগুলো হলো ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন । এই তিনটি কনিকা আবার বিভিন্ন অনুপাতে একত্র হয়ে আবার ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু গঠন করে । প্রোটন এবং নিউট্রন মিলে তৈরি হয় নিউক্লিয়াস এবং একটি ফ্রি ইলেকট্রন সার্বক্ষণিক ঘুরতে থাকে । সুতরাং মানুষের শরীরের কোষগুলো ভেঙে যখন পরমাণুতে পরিণত হয়, তখন কি তাকে জড়বস্তু দাবি করা যায় ? তাহলে চিন্তা করুন, পুরো দেহটাকে জড়পদার্থ বলে দেওয়াটা কতটা অবৈজ্ঞানিক ।

পঞ্চম প্রশ্নে আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,

“প্রান চেনা যায় কি ? কোন মানুষকে ‘মানুষ’ বলিয়া অথবা কোন বিশেষ ব্যক্তিকে আমরা তাহার রূপ বা চেহারা দেখেই চিনিতে পাই । প্রাণ দেখিয়া নয় । পিতা-মাতা ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন সকলকে রূপ দেখিয়াই চিনি, সম্বোধন করি । তাদের সাথে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম নিষ্পন্ন করি । প্রাণ দেখিয়া কাহাকেও চিনিবার উপায় নাই..”

আগেই উল্লেখ করেছি, আরজ আলী সাহেব জীবন ও আত্মা শব্দগুলোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছেন । শব্দগুলোর অর্থ কাছাকাছি, কিন্তু এক নয় । প্রাণ বলতে মানুষের জীবনকে বোঝানো হলেও কুরআনের পরিভাষাতেও যা জীবন, তা আত্মা নয় । আবার যা আত্মা, তা জীবন নয় । কুরআনে কারিমে ‘জীবন’ শব্দটার জন্য ব্যবহার করেছে ‘হায়াত বা হাই’ অন্য দিকে ‘আত্মার’ জন্য ব্যবহার হয়েছে ‘রূহ’ ।

দুটোকে গুলিয়ে ফেলাটা নিতান্তই বোকামি এবং অজ্ঞতা । আরজ আলী সাহেব যদি উপরের প্রশ্নে ‘প্রান’ বলতে প্রাণী কোষের প্রাণ, নিউক্লিয়াসে যে ‘প্রাণ’, সে প্রাণকে উদ্দেশ্য করে থাকেন, তাহলে ঠিক আছে । যদি তিনি ‘প্রান’ বলতে সেই প্রাণটাকে বুঝিয়ে থাকেন তো আমার কোন আপত্তি নেই । আমরাও স্বীকার করি যে সেই প্রান দেখে আসলেই চেনার কোনো সুযোগ নেই । কিন্তু আরজ আলী সাহেব যদি ওনার প্রশ্ন প্রান বলতে ‘রুহ’ বা ‘আত্মা’ কে বুঝে থাকেন, তাহলে আমাকে আবারও এই কথাটা বলতে হচ্ছে যে, আত্মা সম্পর্কে আরজ আলী সাহেবের ন্যূনতম ধারণা নেই । আত্মা বলতে কিছু প্রোটিন অণু একসাথে হয়ে কোষ গঠন এবং সেখান থেকে জীবনের উৎপত্তিকে বোঝায় না । আত্মা হচ্ছে আলাদা সূক্ষ্ম সত্তা, যা মানুষের চোখে দেখা না গেলেও সেটা মানুষের শরীরে অবস্থান নেয় এবং  যখন সময় হয় তখন সেটা বের হয়ে যায়; সেটার থাকার জায়গা নির্দিষ্ট করা আছে । সেটার সাথে শরীরের আবার সম্পর্ক তৈরি হয় । সেটার অস্তিত্ব বোঝা যায় ও অনুভব করা যায় ।

এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেবের আরো দুটি প্রশ্ন আছে । এ দুটি প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে বিস্তারিত আলাপ করা হবে, ইনশাআল্লাহ ।

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন