মূল:ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি

আবুল কালাম আযাদ আনোয়ার

আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আল্লাহ তা‘আলা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন :―

﴿ وَٱلَّذِينَ يَصِلُونَ مَآ أَمَرَ ٱللَّهُ بِهِۦٓ أَن يُوصَلَ﴾ [الرعد: ٢١] 

এবং যারা বজায় রাখে ঐ সম্পর্ক, যা বজায় রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন।[1]

তিনি নিকট আত্মীয়দের অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন :

﴿ وَءَاتِ ذَا ٱلۡقُرۡبَىٰ حَقَّهُۥ ﴾ [الاسراء: ٢٦]                          

“আত্মীয়-স্বজনকে তার হক দান কর।”[2]

আল্লাহ তা‘আলা হাদিসে কুদসীতে ‘সম্পর্ক’-কে লক্ষ্য করে বলেন :―

«من وصلك وصلته، ومن قطعك قطعته».

“যে ব্যক্তি তোমাকে ঠিক রাখবে, আমি তাকে মিলিয়ে রাখব আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমি তাকে ছিন্ন করব।”[3]

আর সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে খুব সর্তক করেছেন এবং একে পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি বলে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন:

﴿ فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ ﴾ [محمد: ٢٢] 

“ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত: তোমরা পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে ।”[4]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :―

«لا يدخل الجنة قاطع».

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।[5]

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ফযিলত :

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অনেক ফযিলত রয়েছে। তন্মধ্যে কিছু উল্লেখ করা হল।

সম্পর্ক বজায় রাখা রিজিক বৃদ্ধি এবং দীর্ঘজীবী হবার কারণ এবং উভয়ের মাঝে বরকতের কারণ। আনাস রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন—

«من أحب أن يبسط له فى رزقه وينسأ له فى أثره فليصل رحمه».

“যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেওয়া কামনা করে, তার উচিত আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।”[6]

এ কাজ জান্নাতে প্রবেশের কারণ হবে। আবু আইয়ুব আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন আমল বলে দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তখন রাসূল বললেন―

«تعبد الله ولا تشرك به شيئاً وتقيم الصلوة وتؤتي الزكاة وتصل الرحم».

“আল্লাহর ইবাদত কর, তার সাথে কোনো কিছু শরিক করো না। নামাজ ভালো করে আদায় কর এবং যাকাত দাও। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখ।”[7]

দুনিয়া এবং আখেরাতে সৌভাগ্য এবং তাওফীক পাওয়ার কারণ হল আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।

সম্পর্কের স্তর :

এ সম্পর্ক বজায় রাখার কিছু স্তর রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তর হল : জান-মাল দ্বারা সাহায্য করা এবং কল্যাণ কামনা করা। আর সর্বনিম্ন স্তর হল, সালাম দেওয়া। এই দুইটির মাঝখানে আরো অনেক স্তর রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—

«بلوا أرحامكم ولو بالسلام».

সালাম-এর মাধ্যমে হলেও তোমরা তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ।[8]

আর অপর দিকে এর উঁচু স্তর হল, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়বে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন―

«ليس الواصل بالمكافئ ولكن الواصل الذي إذا قطعت رحمه وصلها».

“সমান সমান আচরণ দ্বারা সম্পর্ক স্থাপনকারী হওয়া যায় না। কিন্তু, তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলে, তখনও যদি সে সম্পর্ক ঠিক রাখে, তাহলেই তাকে প্রকৃত সম্পর্ক স্থাপনকারী বলা যাবে।”[9] অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক পূর্ণ বজায় রাখা তখনই হবে, যখন কোনো সম্পর্ক ছিন্ন করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখা হবে।

সম্পর্কের সীমারেখা বা সংজ্ঞা :

আত্মীয়তার সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সংজ্ঞা নেই। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তা নির্ধারিত হয়। প্রচলিত রীতি যেটাকে সম্পর্ক বজায় রাখা মনে করে সেটা ধর্তব্য। আর যেটাকে সম্পর্ক ছিন্ন করা মনে করে সেটা বর্জনীয়।

আত্মীয়তার পার্থক্য ও মর্যাদা অনুযায়ী সম্পর্কের মাঝে পার্থক্য হয়ে থাকে, পিতার সম্পর্ক আর দূর সম্পর্কের চাচাত ভাইয়ের সম্পর্ক এক হয় না।

অবস্থা অনুযায়ী এ সম্পর্কের পার্থক্য ঘটে। রুগী এবং অভাবীর সম্পর্ক সুস্থ এবং ধনীর সমান হয় না। বড়-ছোটর সম্পর্কও এক হয় না। অনুরূপভাবে স্থান অনুযায়ী সম্পর্কের মাঝে পার্থক্য ঘটে। যে দেশের মাঝে আছে আর যে দেশের বাইরে আছে, তাদের সম্পর্ক এক রকম হয় না।

সম্পর্কের নিদর্শন হল পরস্পর সাক্ষাৎ এবং অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া, সালাম দেওয়া, ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা, পত্র লেখা ইত্যাদি।


[1] সূরা আর-রা‘দ: ২১।

[2] সূরা আল-ইসরা: ২৬।

[3] বুখারী, ৫৯৮৮।

[4] সূরা মুহাম্মাদ: ২২।

[5] বুখারী, ৫৯৮৪।

[6] বুখারী: ৫৫২৭।

[7] বুখারী, ১৩৯৬।

[8] তাবারানী, ৮/১৫২।

[9] বুখারী, ৫৯৯১।