রাসূলের একাধিক বিবাহ

চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

বার্নাবাস বা বার-নেব শব্দটির অর্থ ‘সান্ত্বনার পুত্র’ বা ‘প্রেরণার পুত্র’। বার্নাবাস ছিলেন একজন ইয়াহূদী। তিনি সাইপ্রাসে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম ছিল জোসেস বা জোসেফ। তার বার্নাবাস নামটি যীশুর শিষ্যদের দেওয়া। যদিও ৪টি গসপেলে তার সম্পর্কে সামান্যই উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু নিউ টেস্টামেন্টের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য গ্রন্থ থেকে প্রমাণ মিলে যে, যীশুর অন্তর্ধানের পর তিনি তার শিষ্যদের নেতা হয়েছিলেন। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি সর্বোপরি যীশুর প্রকৃত শিক্ষা অবিকলভাবে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালান এবং বিশেষ করে টারসসের পলসহ অন্যান্যদের নতুন কিছু সংযোজনের বিরোধিতা করেন। লূক, যিনি ‘প্রেরিতদের কার্য’ (Acts of the Apostles) লিখেছিলেন, তিনি ছিলেন পলের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং তিনি পলের দৃষ্টিভঙ্গিই ব্যক্ত করেছেন। এ থেকেই বুঝা যায় কেন তিনি শুধু পলের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়েই বার্নাবাসের কথা উল্লেখ করেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে পলীয় চার্চ একসময় যখন ত্রিত্ববাদ গ্রহণ করে তখন এ মতবাদের বিরোধী সকল প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা কালে The Travels and teachings of the Apostles- এর মত গ্রন্থও ধ্বংস করে ফেলা হয়। ফলে বার্নাবাস ও আদি খৃষ্টানদের সম্পর্কে অধিকাংশ গ্রন্থই বিলুপ্ত হয়। ত্রিত্ববাদদের এই নীতির কারণেই ৪টি গৃহীত গসপেল থেকে আশ্চর্যজনকভাবে যীশুর ধর্মপ্রচার কালীন সময়ে বার্নাবাসের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এ কারণেই লূকের মতে যীশুর অন্তর্ধানের পর তার শিষ্য ও অনুসারীদের নেতৃত্বদানের যোগ্যতা যে বার্নাবাস ছাড়া দ্বিতীয় আর কারো ছিল না, সে বার্নাবাস নিজে, পলের সাথে মতবিরোধ ও সঙ্গত্যাগের পরপরই ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যায়।

যীশুর ধর্মপ্রচারের গোড়া থেকেই বার্নাবাস তার সঙ্গে ছিলেন। তার গসপেল থেকে যীশুর প্রতি তার অতুলনীয় আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়। বার্নাবাস শুধু যীশুর সার্বক্ষণিক সহচরই ছিলেন না- তিনি তার মহান শিক্ষা আত্মস্থ ও স্মরণ রেখেছিলেন। তিনি অত্যল্পকালের মধ্যেই বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন, কারণ তিনি যীশুর কাছ থেকে লব্ধ শিক্ষা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম ছিলেন। যীশুর শিষ্য ও অনুসারীরা তাঁকে নাম দিয়েছিলেন তা থেকে বক্তা হিসাবে তার শক্তিমত্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সান্ত্বনা ও উৎসাহের উৎস। তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ও উদার। যীশুর সাথে সাক্ষাতের পর তিনি তার সকল সম্পদ বিক্রি করে দেন এবং সে অর্থ যীশুর অনুসারীদের ব্যবহারের জন্য প্রদান করেন। তাঁকে যেসব নাম দেওয়া হয়েছিল তিনি তার সবগুলোতেই পরিচিত ছিলেন। এ থেকে তার প্রতি যীশু ও তার শিষ্যদের স্নেহ ও ভালোবাসার পরিচয় মেলে। যীশুর শিষ্যরা জুডাসের স্থলে এমন একজনকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন যিনি একবারে জনের দীক্ষিত করার সময় থেকে যীশুর সার্বক্ষণিক সহচর ছিলেন। তারা এ জন্য দু’জনকে মনোনীত করেন। একজন হলেন যোসেফ যাকে বার্নাবাস বলা হত। তার আর এক নাম ছিল জাষ্টাস (Justus) অন্যজন হলেন: ম্যাথিয়াস (প্রেরিত দূতদের কার্য ১ : ২২-২৩)। যীশুর জীবনকালে তার সঙ্গী হিসাবে নিউ টেস্টামেন্টে যে যোসেফের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বার্নাবাস ছাড়া আর কেউ নন। কারণ এসময় শুধুমাত্র তাকেই যোসেফ নামে ডাকা হত। গুডস্পীড বলেন, সুতরাং সকল সম্ভাবনা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বার্নাবাস, কেননা ভয়ংকর বিষ পান করেও তার কোনো অসুবিধা হয় নি। যদি তাই হয়, তাহলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বার্নাবাস যদি যীশুর প্রথম সারির ১২ জন শিষ্যের একজন নাও হয়ে থাকেন তবে প্রথম ৭০ জন শিষ্যের মধ্যে অবশ্যই তিনি একজন ছিলেন। আসল ঘটনা হলো, যীশুর মূল দ্বাদশ শিষ্যের মধ্যে প্রথম শিষ্যের মর্যাদা লাভের যথেষ্ট যোগ্যতা তার ছিল। এর সমর্থন মেলে নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে। যীশুর মাতা মেরী যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তিনি ১২ জন শিষ্যের সকলকেই ডেকে পাঠান। যারা এসেছিলেন, তাদের মধ্যে বার্নাবাস ছিলেন অন্যতম। আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লিমেন্ট ও (Clement of Alexandria) সব সময়ই বার্নাবাসকে ১২ জন শিষ্যের একজন হিসেবে উল্লেখ করে গেছেন। এমনটি হতে পারে যে, যীশু এসেনী সম্প্রদায় কর্তৃক লালিত পালিত হয়েছিলেন এবং জানা যায় যে বার্নাবাস সেকালের গোঁড়া ইয়াহূদীবাদের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক জামালিয়েল (Gamaliel)- এর একজন ছাত্র ছিলেন। সুতরাং যীশু বার্নাবাসের সাক্ষাতের অর্থ ছিল এই যে, এসেনীদের রহস্যময় অধ্যাত্মবাদী শিক্ষা ও মন্দিরের গোঁড়া ইয়াহূদীবাদের সমন্বয় ঘটেছিল। নিঃসন্দেহে তা উভয়ের মেধ্য সম্প্রীতি সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল। যেহেতু বার্নাবাস ছিলেন একজন লেভীয় পুরোহিত সে কারণে তিনি ধর্মপ্রাণ যোদ্ধাদের (Zealots) একটি ডিভিশনের কমান্ডার হয়ে থাকতে পারেন।

বার্নাবাস সম্পর্কে খুব সামান্যই জানা যায়। সর্বশেষ ঐতিহাসিক গবেষণায় ধীরে ধীরে তার ব্যাপারে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে যেহেতু তিনি ছিলেন যীশুর সার্বক্ষণিক সহচর। এখন একটা বিষয়ে সকলেই একমত যে, যীশুর ‘লাষ্ট সাপার’ বা শেষ সন্ধ্যা ভোজ বার্নাবাসের বোনের বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আলবার্ট শোয়েইটজার (Albert Sehweitzer) “দি কিংডম অব গড অ্যান্ড প্রিমিটিভক্রিশ্চিয়ান বিলিফ” গ্রন্থে লিখেছেন:

প্রেরিতদের কার্য (Acts) থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় যে, যীশুর শিষ্য ও গ্যালীলির বিশ্বাস স্থাপনকারীরা জন মার্কের মায়ের বাড়িতে মিলিত হয়েছিলেন যিনি বার্নাবাস ও পলের প্রথম ধর্মপ্রচার সফরে তাদের সঙ্গী হয়েছিলেন (প্রেরিতদের কার্য ১২ : ২৫) … তাদের সাক্ষাতের স্থানটি ছিল উপরের ঘর অর্থাৎ যেটি ছাদের ঠিক নীচেই অবস্থিত ছিল। (প্রেরিতদের কার্য ১ : ১২-১৪)। যীশুর সকল সহচরের উপস্থিতির ফলে সেটি ছিল এক বড় সমাবেশ। এটি ছিল সেই কক্ষ যে কক্ষে ইয়াহূদীদের পর্ব (Pentecost) উপলক্ষে একই স্থানে সকল বিশ্বাস স্থাপনকারী একত্র হয়েছিলেন (প্রেরিতদের কার্য ২ঃ১)। যীশু যে স্থানে তার শিষ্যদের নিয়ে “লাষ্ট সাপার” (Last Supper) এ মিলিত হয়েছিলেন, তার সাথে এ স্থানটি কি করে অভিন্ন বলে শনাক্ত করা গেল?

যীশু যখন বেথানী (Bethany) থেকে তার দু’জন শিষ্যকে তার জন্য ইয়াহূদী পর্বের ভোজ (Passover) আয়োজনের নির্দেশ দিয়ে শহরে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন যে পানিভরা কলস বহনকারী এক ব্যক্তি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তাদের তাকে অনুসরণ করতে হবে। সেই ব্যক্তি তাদের একটি বাড়িতে নিয়ে যাবেন যার ওপর তলাটি কম্বল বিছানো। সেখানেই তাদের খাবার প্রস্তুত করতে হবে। আমরা এই মূল্যবান তথ্যটি পাই মার্কের গসপেল থেকে (মার্ক ১৪ : ১৩-১৫), যার উৎস হলেন জন মার্ক। মথি শুধু এটুকু বলেছেন যে, যীশু শহরে কাউকে জানানোর জন্য দু’জন শিষ্যকে প্রেরণ করেন- “প্রভূ বললেন, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে; আমি ঐ বাড়িটিতে শিষ্যদের নিয়ে পর্বের দিন পালন করব” (মথি ২৬ : ৮)

থিওডোর যায়ন সেই মত পোষণকারীদের মধ্যে অন্যতম প্রথম যিনি বলেন যে, যীশু যে বাড়িতে শেষ খাবার গ্রহণ করেন তা মার্কের মায়ের বাড়িটির সাথে অভিন্ন ছিল এবং সেখানে যীশুর শিষ্যরা গ্যালীলি থেকে আগত বিশ্বাস স্থাপনকারীদের সাথে মিলিত হয়েছিলেন।

যদিও শোয়েইটজার বলেছেন যে, সেই বাড়িটি জন মার্কের মায়ের, তিনি কিন্তু একথা স্মরণ করিয়ে দেন নি যে, মার্কের মা ছিলেন বার্নাবাসের বোন। যেহেতু বার্নাবাস তার যা কিছু সম্পদ ছিল তার সবই বিক্রি করে দিয়েছিলেন, সেহেতু ধারণা করা হয় যে, তিনি জেরুজালেমে থাকার সময় তার বোনের বাড়িতে যথেষ্ট বড় ঘর ছিল যা সকল শিষের স্থান সংকুলানের উপযুক্ত ছিল। নিউ টেস্টামেন্টে এ সব বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না হওয়ার কারণ সম্ভবত এটাই যে, যীশুর শিষ্যরা তাদের সাক্ষাতের স্থানকে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কেননা সেটা ছিল এমন এক সময় যখন নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে তাদের ওপর নির্যাতন চলছিল।

এখন প্রশ্ন জাগে যে, বার্নাবাস সু্স্পষ্টভাবে তার বোনের বাড়িতে যে কোনো সমাবেশের মেজবান হওয়া সত্ত্বেও গৃহীত ৪টি বাইবেলের ‘লাষ্ট সাপারের’ বর্ণনায় তার নাম উল্লেখ হয় নি কেন? হয় তার নাম উল্লেখিত ছিল কিন্তু পরে অপসারণ করা হয়েছে অথবা সোজা কথায় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এটা সম্ভব যে, কারাগারে থাকার কারণে সেখানে উপস্থিত হওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। লিখিত বর্ণনায় দেখা যায়, বারাববাস (Barabbas) নামক এক ব্যক্তি একদল লোক নিয়ে রোমান পন্থী ইয়াহূদীদের আক্রমণ করেন। আর এ সংঘর্ষ ঘটেছিল ইয়াহূদী পর্ব উপলক্ষে আয়োজিত ভোজের অত্যল্পকাল পূর্বে। এ সংঘর্ষে ইয়াহূদীদের নেতা নিহত হন, কিন্তু বারাববাস আটক হন ও তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এ সংঘর্ষের ঘটনাবলী বিশদভাবে পরীক্ষাকারী হেইনরিখ হলোজম্যান (Heinrich Holtzman) বলেন, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে বিখ্যাত বারাববাসও ছিলেন যিনি ছিলেন নিশ্চিতভাবে একজন দেশপ্রেমিক ও একজন রাজনৈতিক ‘নবী’। যীশুর সাথে প্রায় একই সময় তারও বিচার অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু বার্নাবাস একজন লেবীয় পুরোহিত ছিলেন এবং যীশুর শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন প্রধান, সে কারণে তিনি ধর্মপ্রাণ যোদ্ধাদের একটি ডিভিশনের প্রধান হয়ে থাকতে পারেন। মরু সাগর পুঁথি (Dead Sea Serolls) থেকে আমরা জানতে পারি যে, এই ৪টি ডিভিশন ছিল এসেনী সম্প্রদায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তারা বিদেশি আগ্রাসনকারী ও তাদের সমর্থকদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। শুধু একদল ধর্মপ্রাণ যোদ্ধাদের পক্ষেই সে সময় রোমান পন্থী ইয়াহূদীদের ওপর সংগঠিত আক্রমণ চালানো সম্ভব। সুতরাং এটা হতে পারে যে, বারাববাস ও বার্নাবাস এক এবং অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এটা খুবই সম্ভব যে, পলের কাহিনীর অংশ নয় এমন কোনো ঘটনার সাথে জড়িত হিসেবে বার্নাবাসের নাম উল্লেখ থাকলে পলীয় চার্চ অন্যান্য সংশোধনীর সাথে তা হয় অপসারণ, নয় পরিবর্তন করেছে। তারা এ প্রক্রিয়া সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে পারে নি। কারণ, নিউ টেস্টামেন্টে বার্নাবাসের উল্লেখ্য রয়েছে। প্রেরিতদের কার্য থেকে জানা যায়, চার্চের গোড়ার দিকের দিনগুলোতে বার্নাবাস পলকে যে সমর্থন দিয়েছিল, তিনি সেটা না করলে খৃষ্ট ধর্মের ইতিহাসে পলের কোনো স্থান থাকত কিনা সন্দেহ। যীশুর অন্তর্ধানের পর তার নিকট অনুসারীদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল, সে ব্যাপারে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। মনে হয় যীশুর কথিত ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর তাদের অনেকেই বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। কিছুকাল পরে তারা জেরুজালেমে আবার জড়ো হতে শুরু করেন। ১২ জন শিষ্য এবং ৭০ জন ঘনিষ্ঠ অনুসারীর মধ্যে কতজন ফিরে এসেছিলেন তা জানা যায় না। এটা নিশ্চিত যে, যারা ফিরে এসেছিলেন তারা ছিলেন বিশ্বাসী, আন্তরিক ও সাহসী এবং যীশুর জন্য তাদের ছিল সুগভীর ভালোবাসা। যীশুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে বার্নাবাসের অবস্থান শিষ্যদের ছোট দলটির মধ্যে তাকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল। তারা ইয়াহূদী হিসেবেই জীবন যাপন করতেন এবং যীশু তাদের যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা পালন করতেন। তারা নবীগণের বিধান অনুসরণ করতেন যা “ধ্বংস নয়, পরিপূর্ণ করার জন্যই” যীশু আগমন করেছিলেন (মথি ৫ : ১৭)। সে কারণে তাদের কারো কাছেই যীশুর শিক্ষা নতুন কোনো ধর্ম ছিল না। তারা ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ ইয়াহূদী এবং প্রতিবেশীদের সাথে তাদের পার্থক্য ছিল যীশুর প্রচারিত বাণীতে তাদের বিশ্বাস। গোড়ার দিকের এই দিনগুলোতে তারা নিজেদের একটি পৃথক সম্প্রদায় হিসেবে সংগঠিত করেন নি এবং তাদের কোনো সিনাগগও (ইয়াহূদীদের উপাসনালয়) ছিল না। মূসা আলাইহিস সালাম প্রচারিত ধর্মেরই অব্যাহত ও পুনর্ব্যক্ত রূপ। যে সকল ইয়াহূদী মূসা আলাইহিস সালামের বাণীকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করছিল এবং যারা শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে, যীশুর অনুসারীদের সমর্থনের অর্থ হবে অনিবার্যরূপে নিজেদের সম্পদ, শক্তি ও অবস্থানের জন্য ক্ষতিকর, সে সব ইয়াহূদীদের কারণেই যীশুর অনুসারী ও ইয়াহূদীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। উচ্চ শ্রেণির ইয়াহূদীরা তাদের বিশেষ স্বার্থ ও শত শত বছর ধরে ভাগকৃত সুযোগ সুবিধা রক্ষার জন্য রোমানদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। এর ফলে তারা এমনকি নিজেদের ধর্ম থেকেও সরে গিয়েছিল। যাদের কথা ও কাজের ফলে তাদের কৃতকর্ম প্রকাশ হয়ে পড়ার আশংকা ছিল, এমন ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য এ সব ইয়াহূদী রোমানদের সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিয়েছিল। তাই দেখা যেত যে, যীশুর একজন অনুসারী যখন তাকে গ্রহণ করেছে, সেখানে একজন ইয়াহূদী তাকে প্রত্যাখ্যান করছে। একদিকে রোমানরা তাদের রাজনৈতিক শক্তির প্রতি হুমকি বলে তাদের তাড়া করে ফিরত,

অন্যদিকে নিজেদের ‘ধর্মীয় কর্তৃত্ব’ খর্ব হবে এ আশংকায় ইয়াহূদীরাও তাদের খুঁজে বেড়াত।

পরবর্তী বছরগুলোতে যীশুকে স্বীকার করতে অনিচ্ছুক ইয়াহূদী ও যীশুর অনুসারীদের মধ্যকার ব্যবধান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭০ সনে জেরুজালেম অবরোধের সময় যীশুর অনুসারীরা নগর ত্যাগ করে। ১৩২ সনে বার কোয়াচাবা (Bar Coachaba) বিদ্রোহের সময়ও একই ঘটনা ঘটে।

যীশুর আবির্ভাব তার বৈশিষ্ট্য ও ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কের বিষয় পরবর্তীকালে বিপুল আলোচনা-ব্যাখ্যার উৎস হলেও তার আদি অনুসারীদের মধ্যে এ সব ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন দেখা দেয়নি। যীশু ছিলেন একজন মানুষ যিনি ছিলেন একজন নবী এবং এমনই এক ব্যক্তি যিনি ঈশ্বরের কাছে থেকে অনেক কিছু লাভ করেছিলেন। তারা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। যীশুর কথায় বা পৃথিবীতে তার অবস্থানকালীন জীবনে এমন কিছু ছিল না যাতে এ ধারণার কোনো ব্যত্যয় হয়। আরিষ্টাইডস (Aristides) এর মতে, গোড়ার দিকের খৃষ্টানরা ইয়াহূদীদের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে একেশ্বরবাদী ছিল।

এই বিশ্বস্ত অনুসারী চক্রের মধ্যেই টারসসের পল বা পৌল (Paul of Tursus) বিচরণ করেছিলেন। তিনি কখনোই যীশুর সাথে সাক্ষাৎ করেন নি, কিংবা যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের কারো সাথেই তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। বরং যীশুর একজন বড় শত্রু হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি ষ্টিফেন (Stephen) এর প্রতি পাথর নিক্ষেপ সতর্ক দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ষ্টিফেন ছিলেন ধর্ম ও পবিত্র আত্মায়, (Holy ghost) পূর্ণ বিশ্বাসী (প্রেরিতদের কার্য ৬ : ৫) এবং সেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ভক্তদের একজন যিনি যীশুর অন্তর্ধানের পর তার অনুসারীদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। পলের নিজের শিক্ষক জামালিয়েল ষ্টিফেনকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তাকেও পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়। জানা যায় যে, পল, যাকে তখন সল (Saul) বলে ডাকা হত, সে সময় চার্চের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড অত্যাচার চালানোর জন্য দায়ী ছিলেন। তিনি গির্জাগুলো ধ্বংস করেন এবং ঘরে ঘরে প্রবেশ করে নারী ও পুরুষদের টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে কারাগারে বন্দী হিসেবে নিক্ষেপ করেন (প্রেরিতদের কার্য ৮ : ১-৩)। পলের নিজের স্বীকারোক্তি:

“আপনারা শুনেছেন ……… কি প্রচণ্ড অত্যাচার আমি চালিয়েছি ঈশ্বরের চার্চের ওপর এবং সেগুলোকে ধ্বংস করেছি- আমি আমার স্বদেশীয় অনেকের চাইতে ইয়াহূদী ধর্মের কাছ থেকে লাভবান হয়েছি, কারণ আমি আমার পূর্বপুরুষদের চাইতেও অনেক বেশি ধর্মান্ধ। (গালাতীয়ান্স (Galatians) ১ : ১৩-১৫)

এবং প্রেরিত পুরুষদের কার্য ৯ : ৪১- এ এ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

পল যীশুর অনুসারীদের হুমকি প্রদান ও হত্যা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি প্রধান পুরোহিতের কাছে গেলেন এবং তার কাছে দামেশকের সিনাগগ গুলোর কাছে চিঠি লিখে দেওয়ার আবেদন জানালেন যাতে যীশুর অনুসারী কাউকে পাওয়া গেলে তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, তাকে যেন জেরুজালেমে নিয়ে আসতে পারেন।

এই দামেশক যাত্রাপথে পল যীশুকে স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং পরিণতিতে তার অনুসারীতে পরিণত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে।

এসব ঘটনাবলী সংঘটিত হওয়ার কিছু দিন আগে পল পোপিয়া (Ppea) নামি এক মহিলাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই মহিলা ছিলেন ইয়াহূদীদের সর্বোচ্চ পুরোহিতের আকর্ষণীয় ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কন্যা। তিনি পলকে পছন্দ করা সত্ত্বেও তার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ও রোমে গিয়ে অভিনেত্রী হন।

মঞ্চ থেকে ধাপে ধাপে তার উন্নতি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তিনি সম্রাট নীরোর শয্যা পর্যন্ত পৌঁছে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি তাকে বিয়ে করেন ও রোম সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হন। সুতরাং ইয়াহূদী ও রোমান উভয়ের প্রতিই পলের বিতৃষ্ণা হয়ে ওঠার সংগত কারণ ছিল। মূলত পোপিয়া কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই পল ধর্মান্তরিত হন। সে সময় তিনি অত্যন্ত আবেগতাড়িত ও মানসিক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে ছিলেন। ইয়াহূদী ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমর্থক হওয়ার পরিবর্তে তিনি যে এক বিরাট শত্রুতে পরিণত হন তার পেছনে সম্ভবত তার জীবনের এই সংকটের একটি ভূমিকা ছিল।

ধর্মান্তরিত হওয়ার পর পল দামেশকে যীশুর অনুসারীদের সাথে অবস্থান করেন এবং “সরাসরি সিনাগগগুলোতে গমন করে যীশু ঈশ্বরের পুত্র” বলে প্রচার করতে থাকেন (প্রেরিতদের কার্য ৯ : ২০)। এর ফলশ্রুতিতে তিনি অত্যাচারের স্বাদ লাভ করতে শুরু করলেন যার সাথে নিকট অতীতে তিনি নিজেই জড়িত ছিলেন। যদি তিনি যীশুর বর্ণনা করতে গিয়ে সত্যই তাঁকে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন, তাহলে সম্ভবত তা ইয়াহূদীদের ক্রুদ্ধ করে তোলায় সহায়ক হয়েছিল। যেহেতু তারা ছিল ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাসী সে কারণে ঈশ্বরের একটি পুত্র থাকার ধারণাটি তাদের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য ছিল।

এরপর পল দামেশক ত্যাগ করেন। তিনি যীশুর অন্যান্য অনুসারীদের সাহচর্য সন্ধানের পরিবর্তে আরবের মরুভূমিতে গমন করেন। সেখানে তিনি ৩ বছর লুকিয়ে থাকেন। খুব সম্ভবত এ নির্জনবাসেই তিনি যীশুর প্রচারিত শিক্ষার ভিত্তিতে নিজস্ব একটি রূপ তৈরির কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে ছিল ইয়াহূদী আইন প্রত্যাখ্যান। যীশু তার জীবনব্যাপী একজন আচারনিষ্ঠ ইয়াহূদীই ছিলেন এবং তিনি মূসা আলাইহিস সালামের শিক্ষাকেই সর্বদা সমুন্নত রেখেছিলেন। কিন্তু পল এ সত্যকে অস্বীকার করেন।

মরুভূমির নির্জনবাস শেষে পল জেরুজালেমে ধর্ম প্রচারকদের কাছে আগমন করেন। তার আকস্মিক আগমনের ঘটনা বিস্ময় সৃষ্টির চাইতে সন্দেহ সৃষ্টি করে বেশি। পল যীশুর অনুসারীদের প্রতি যে নির্যাতন চালিয়েছিলেন, তার স্মৃতি তখনও তাদের মনে জাগরুক ছিল। একটি চিতাবাঘ কি তার শরীরের দাগ পরিবর্তন করতে পারে? যীশুর শিষ্যদের পক্ষে পলকে তাদের মধ্যে গ্রহণ করার কোনো কারণ ছিল না। তিনি যে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, তিনি আরো দাবি করেছিলেন যে, যীশুর শিক্ষা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত অথচ তিনি তাকে কোনো দিন দেখেন নি ও তার সাথে কখনোই অবস্থান করেন নি। এমনকি যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের সাথেও তিনি কখনো থাকেননি। যীশুর জীবিতকালে যারা তার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে কিছু জানা ও শেখার বদলে পল তাদের শিক্ষা প্রদান করতে চাইলেন। পল পরে গালাতীয়দের কাছে লেখা তার চিঠিপত্রে তার এ পদক্ষেপের যৌক্তিকতা বর্ণনা করে বলেন,

ভাইসব, আমি এ মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে আমার দ্বারা প্রচারিত গসপেল কোনো মনুষ্য রচিত নয়। আমি কোনো মানুষের কাছ থেকে এটি লাভ করিনি কিংবা কেউ আমাকে এটা শিক্ষাও দেয়নি, এটি হলো যীশুর প্রত্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত। (গালাতীয় ১ : ১০-১২)

এভাবেই পল যীশুর সাথে নিজের সম্পৃক্ততার দাবি করেন যা যীশুর জীবৎকালিন ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পল তাকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছি বলে দাবি করেন তা স্বয়ং যীশুর মুখ থেকে ধর্ম প্রচারকদের শোনা শিক্ষার সাথে মিলিয়ে দেখা হয় নি। এটা বোঝা যায় যে, তারা ধর্মান্তরের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন এবং তার কথিত “প্রত্যাদেশ”-কে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেন নি। অনেকে সম্ভবত সন্দেহ করেছিলেন যে, তিনি যীশু অনুসারীর ছদ্মবেশে গুপ্তচর চাড়া আর কিছু নন। পলকে গ্রহণ করা হবে কিনা এ নিয়ে এক তিক্ত বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলাফল ছিল পূর্ব নির্ধারিত। এমতাবস্থায় জামালিয়েলের ছাত্র হিসেবে বার্নাবাস তার সহপাঠী পলের পক্ষে হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা শুরু করেন। যীশুর অনুসারীদের তার সহপাঠী পলের পক্ষে হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা শুরু করেন। যীশুর অনুসারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি পলকে তাদের দ্বারা গ্রহণ করান। এ থেকে ধর্ম প্রচারকদের ওপর বার্নাবাসের প্রভাবের মাত্রা এবং যীশুর জীবিত থাকা অবস্থায় তার সাথে তার সুগভীর ঘনিষ্ঠতার আভাস পাওয়া যায়। পল অবশ্যই এ কথা উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধুমাত্র বার্নাবাসের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বলেই তিনি গৃহীত হয়েছেন, নিজের প্রচেষ্টায় নয়। এর ফলে সম্ভবত তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাই এ ঘটনার পর পরই তিনি যে তার নিজের শহর টারসসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সম্ভবত তার অন্যতম কারণ ছিল এটাই। অবশ্য এ কথাও জানা যায় যে, তার জীবন বিপদাপন্ন হওয়ার কারণেই তিনি জেরুজালেম ত্যাগ করেন।

রোমান ইয়াহূদীদের নির্যাতনের কারণে যীশুর বহু অনুসারী দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। পল ও তার অনুসারীদের নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ধর্ম প্রচারক এন্টিওকের (Antioch) উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে রোম ও আলোকজান্দ্রিয়ার পর এন্টিওক ছিল তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। এক সময় তা ছিল গ্রীক সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং ব্যবসা ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে নগরটি বিকশিত হয়েছিল। সম্পদের প্রচার্যে স্ফীত জনগণ বিলাসী হয়ে ওঠে। শিগগিরই তাদের অধঃপতন ঘটে এবং এন্টিওক নৈতিকতাহীন জীবনযাত্রার নগরী বলে কুখ্যাতি লাভ করে। এরকম একটি নগরে গায়ে শুধু কম্বল জড়ানো ক্ষুদ্র একদল আগন্তুক সহজ, সরল ও সততাপূর্ণ ঈশ্বর ভীতিপূর্ণ জীবন যাপন শুরু করে। নৈতিকতাহীন জীবন যাপনে ক্লান্ত নগরবাসীরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের কাছেই তারা ছিল অবজ্ঞা ও উপহাসের পাত্র। এসব নগরবাসী তাদের ‘খৃষ্টান’ বলে ডাকত। সামান্য কিছু লোকের কাছে এ শব্দটি ছিল শ্রদ্ধাব্যাঞ্জক, কিন্তু অন্যরা এ শব্দটিকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করত। এ সময় পর্যন্ত যীশুর অনুসারীরা নাজারিনি (Nazarene) নামেই পরিচিত ছিলেন। হিব্রু এ শব্দটির মূল অর্থ      “রক্ষা করা বা ‘প্রহরা দেওয়া।’ এভাবেই এ বিশেষণটি যীশুর শিক্ষার রক্ষক ও অভিভাবক হিসাবে তাদের ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করছিল।

লাইবেনিয়াস (Libanius) বলেছেন যে, এন্টিওকের ইয়াহূদীরা দিনে তিনবার প্রার্থনা করত, “নাজারিনিদের ওপর ঈশ্বরের অভিশাপ প্রেরণ করা।” অন্য এক ঐতিহাসিক প্রফেরী (Prophery), যিনি সবসময় নাজারিনিদের বিরোধী ছিলেন, তিনি তাদের জীবন পদ্ধতিকে “বর্বর, নতুন ও অদ্ভুত ধর্ম” বলেন বর্ণনা করেছেন। সেলসাস (Celsus) বলেন, জেরোমের (Jerome) মতে খৃষ্টানদের “গ্রীক ভন্ড ও প্রতারক” বলে আখ্যায়িত করা হতো। কারণ গ্রীক মন্দিরের পুরোহিতরা যে আলখেল্লা পরিধান করতেন তারাও সেই একই গ্রীক আলখেল্লা পরিধান করতেন।

যীশুর অনুসারীরা এ ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ অদ্ভুত নবাগতদের কাছে লোকজনের আসা যাওয়া অব্যাহত ছিল এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাদের আগ্রহ দেখে উৎসাহিত হয়ে এন্টিওকের যীশু অনুসারীদের চারপাশের পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সত্য বাণী ও যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্য একজন ধর্ম প্রচারককে প্রেরণের জন্য জেরুজালেমে ধর্মপ্রচারকদের কাছে খবর প্রেরণ করেন। যীশুর শিষ্যরা এ কাজের জন্য বার্নাবাসকেই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মনোনীত করেন। এভাবে বার্নাবাস হলেন খৃষ্টধর্মের ইতিহাস প্রথম মিশনারি বা ধর্ম প্রচারক। বার্নাবাস এন্টিওক গমন করেন এবং অকল্পনীয় সাফল্য লাভ করেন। তার প্রচেষ্টায় “বহু সংখ্যক লোক যীশুর প্রচারিত ধর্ম গ্রহণ করে” (প্রেরিতদের কার্য, ১১ : ১৪)। এর কারণ বার্নাবাস ছিলেন একজন সৎ লোক এবং ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। এক বছর পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, এন্টিওকের বাইরে তার কর্মকাণ্ড প্রসারিত করার সময় এসেছে। তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, এ কাজে পল তার ভালো সাহায্যকারী হবেন। তিনি টারসস গমন করেন এবং পলকে নিয়ে ফিরে আসেন। এভাবে পল সেসব লোকের কাছে ফিরে এলেন যারা তারই হাতে নির্যাতিত হয়েছিল এবং তিনি পুনরায় বৈরিতা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হন। আরেকবার বার্নাবাস হস্তক্ষেপ করলেন এবং এন্টিওকের যীশু অনুসারী সমাজে পল গৃহীত হলেন। এ ঘটনা থেকে যীশু অনুসারী সমাজে বার্নাবাসের গুরুত্ব ও মর্যাদার বিষয়টি পুনরায় প্রমাণিত হয়। মনে হয় বার্নাবাস তার সাবেক সহপাঠীর শুধু ভালোটুকুই দেখেতে পেয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন, যে ধর্মীয় আবেগ ও উদ্দীপনা পলকে একজন অত্যাচারীতে পরিণত করেছিল তা যদি যীশুর ধর্মীয় প্রচারের কাজে লাগানো যায় তাহলে তিনি অসাধারণ ও অমূল্য অবদান রাখবেন।

কিন্তু সকল যীশু অনুসারী এ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হতে পারেন নি। পিটার সরাসরি পলের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। পলের অতীত কার্যকলাপের কথা স্মরণ করে এ বৈরিতা আরো জোরালো হয়ে উঠার পাশাপাশি আরো দু’টি বিষয়ে মত পার্থক্য দেখা দেয়। যীশুর শিক্ষা কার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং শিক্ষা দেওয়া হবে সে ব্যাপারে তারা একমত হতে পারলেন না। পিটার মত প্রকাশ করেন যে, ইয়াহূদীদের কাছে প্রচারিত ধর্ম পুনরুজ্জীবনের জন্যই যীশুর আগমন ঘটেছিল। সে কারণে তার শিক্ষা শুধুমাত্র ইয়াহূদীদের মধ্যেই প্রচার হবে। অন্যদিকে পল শুধু যে ইয়াহূদী ও অন্যদেরসহ সকলের কাছেই ধর্ম প্রচারের পক্ষ মত প্রকাশ করেন তাই নয়, উপরন্তু বলেন যে যীশুর অন্তর্ধানের পর তিনি তার কাছ থেকে অতিরিক্ত নির্দেশনা লাভ করেছেন। তিনি আরো বলেন যে সময় ও পরিস্থিতির দাবির সাথে যীশুর শিক্ষার প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। বার্নাবাস উভয় পক্ষের মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মত দিলেন যে, তাদের শুধু সে শিক্ষাই দান করা উচিৎ যা যীশু শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তবে তিনি বলেন, এ শিক্ষা তার কাছেই প্রচার করা উচিৎ যার এতে কল্যাণ হবে এবং যে সাড়া দিবে, সে ইয়াহূদীই হোক আর অ-ইয়াহূদীই হোক। বার্নাবাস ও পিটার যীশুর কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তাকে তারা ইয়াহূদী ধর্মের (Judaism) অব্যাহত ও সম্প্রসারিত রূপ হিসাবেই গণ্য করতেন। তারা স্বয়ং যীশুর কাছ থেকে যা শুনেছিলেন তার সাথে পলের শিক্ষার যেখানে মিল ছিল না, সে অংশটি গ্রহণ করতে পারেন নি। তারা বিশ্বাস করতেন যে, পলের নয়া ধর্মমত সম্পূর্ণরূপেই তার একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। আলবার্ট শোয়েইটজার (Albert Shweitzer) তার ‘Paul and His Interpreters’ গ্রন্থে বলেছেন যে, পল কখনোই তার গুরুর (যীশু) বাণী ও নির্দেশ প্রচার করেন নি।

মনে হয়, বার্নাবাস আশা করেছিলেন যে, এ দুই চরমপন্থী নমনীয় হবেন এবং বিশেষ করে পল যীশুর অনুসারীদের সাহচর্য থেকে যীশুর শিক্ষার পূর্ণ উপলব্ধি ও রূপায়ণের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞানের স্বার্থে নিজের ধারণা পরিত্যাগ করতেন। পলের প্রতি এ পর্যায়ে বার্নাবাসের সমর্থন যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কারণ বার্নাবাস ধর্ম প্রচারকারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতার মুখে পলকে আশ্রয় প্রদান ও রক্ষা করেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই বার্নাবাসের জীবনের এ পর্যায়টি ধর্ম প্রচারকদের কর্মকান্ডে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রেরিতদের কার্য, ১৩ : ১-২ তে বার্নাবাস ও পলের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে বলা হয়েছে:

“এন্টিওকের চার্চে বার্নাবাস ও সিমেওনের মত কতিপয় ধর্মগুরু ও শিক্ষক ছিলেন যাদেরকে সাইরিনের নাইজার (Niger of Cyrene) ও মানায়েনের লুসিয়াস (Lucius of Manaen) বলে আখ্যায়িত করা হত যাদের কে হেরোদ দি টেট্রার্ক (Herod the Tetrarch) এবং সলের (Saul) সাথে প্রতিপালন করা হয়েছিল। যখন তারা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা ও উপবাস করলেন তখন পবিত্র আত্মা বললেন: বার্নাবাস ও সলকে আমার সে কাজের জন্য পৃথক কর যে কাজের জন্য আমি তাদের আহ্বান করেছি।”

এসব অনুসারীদের নামের তালিকায় লূক বার্নাবাসকে প্রথম ও পলকে শেষে স্থান দিয়েছেন। একত্রে কাজ করার জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর তারা বার্নাবাসের বোনের পুত্র জন মার্ককে নিয়ে যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্য গ্রীস যাত্রা করেন। যোসেফের ঔরসে জন্মলাভকারী মেরীর পুত্র জেমসকে এন্টিওকে যীশুর অনুসারীদের প্রধান নির্বাচিত করা হয়। পিটারও সেখানেই থেকে যান।

প্রেরিতদের কার্য-তে (Acts) আছে যে, কয়েকটি স্থানে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করা সত্ত্বেও এ দুই ধর্ম প্রচারক সামগ্রিকভাবে সফল হন। সত্যানুসারী ব্যক্তি হিসেবে তাদের খ্যাতি দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। তারা যখন লুকাওনিয়া (Lucaonia) পৌঁছে এবং একজন পঙ্গুকে রোগমুক্ত করেন তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মানুষের ছদ্মবেশে ঈশ্বরগণ আমাদের কাছে নেমে এসেছেন। তারা বার্নাবাসকে জুপিটার (Jupiter) নামে এবং পলকে মার্কারিয়াস (Mercurius) নামে আখ্যায়িত করে। তখন জুপিটারের পুরোহিতরা….. গরু ও মালা নিয়ে তোরণদ্বারে এল এবং সেগুলোকে জবাই করল। বার্নাবাস ও পল যখন এটা শুনতে পেলেন, তারা তাদের পোশাক ছেঁড়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে লোকজনের কাছে দৌড়ে গেলেন। তারা বললেন . তোমরা এ সব কী করছ? আমরা তোমাদেরই মত সাধারণ মানুষ, আমরা তোমাদের কাছে ঈশ্বরের কথা প্রচার করতে এসেছি যিনি স্বর্গ, পৃথিবী ও সমুদ্র সহ বিশ্বমণ্ডলের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন। (প্রেরিতদের কার্য, ১৪ : ১১-১৫)

গ্রীসের অধিবাসীদের এই প্রতিক্রিয়া যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তবে তা ছিল বাস্তব সমস্যার ইঙ্গিত বহনকারী যার সম্মুখীন হয়েছিলেন বার্নাবাস ও পল। একজন প্রকৃত ইয়াহূদী যীশুর শিক্ষাকে মূসা আলাইহিস সালামের প্রচারিত ধর্মেরই পুনর্ব্যক্ত রূপ বলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করবে। কিন্তু বহু মূর্তিপূঁজকের কাছেই সেটি নতুন ও অদ্ভুত এবং কিছুটা জটিল বলে মনে হবে। অধিকাংশ পৌত্তলিক তখন পর্যন্ত বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। তারা মনে করত, ঈশ্বরগণ মানুষের সাথে অবাধ মেলা মেশা করে, তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং মানব জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ছিল তাদের একজন ঈশ্বরের অনুরূপ এবং এ অর্থে তারা যীশুকে গ্রহণ করতে সম্ভবত প্রস্তুত ছিল। সেখানে আরো একজন ঈশ্বরের স্থান ছিল। যা হোক, যীশুর প্রকৃত শিক্ষা তাদের সকল ঈশ্বরকে নাকচ করে দেয় ও এক ঈশ্বরের কথা ব্যক্ত করে। বহু পুতুল পূঁজারির কাছেই এ কথা গ্রহণযোগ্য ছিল না। অধিকন্তু, যীশুর ধর্মশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল আচরণ বিধি যা কেউ অনুসরণ করতে চাইলে তার জীবনধারাই পালটে যেত। এটা একজন ইয়াহূদীর পক্ষেই সম্ভব ছিল, পৌত্তলিকের পক্ষে নয়। ইয়াহূদীদের সুদখোর জাতি হিসেবে গণ্য করা হত, অ-ইয়াহূদীদের সবাই তাদের পছন্দ করত না।

“ইয়াহূদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে ইয়াহূদীদের প্রতি ঘৃণা এতই প্রবল ছিল যে তাদের যৌক্তিক বা প্রয়োজনীয় কিছু করতে দেখলেও যেহেতু ইয়াহূদীরা সেটা করছে শুধু সে কারণেই জনসমাজ তা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করত। কোনো রকম আপোশ না করে গ্রীসে যীশুর প্রচারিত ধর্মের অনুসরণে জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বার্নাবাসের মত নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা আর কারো ছিল না। পল ইতিমধ্যেই যীশুর শিক্ষা পরিবর্তনে তার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এখন গ্রীক জনসাধারণের রুচি অনুযায়ী যীশুর শিক্ষার সমন্বয় সাধন অত্যাবশ্যক বলে মনে করলেন। গ্রীস তখন ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। রোমান দেবতা গ্রীকের দেবতাদের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ছিলেন এবং তাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ছিল গ্রীক দেবতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মতই একটি ভ্রান্ত ধারণা। পল এর আগে কিছু দিন রোমে কাটিয়েছিলেন এবং তিনি রোমান নাগরিক ছিলেন। সম্ভবত রোমান জীবনধারা তার নিজস্ব বিচারবোধকে প্রভাবিত করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে সাধারণ জনগণের ওপর গ্রেকো-রোমান (Graeco-Roman) ধর্মের জোরালো প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এটা সুস্পষ্ট যে, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, নিজেদের শিক্ষার পরিবর্তন ঘটানো ছাড়া তাদের ধর্ম রীতি পরিবর্তন করা সহজ হবে না। অন্য দিকে বার্নাবাস জানতে যে, তার স্রষ্টার ইচ্ছা নয় যে, তিনি তার আইনের এক বিন্দুমাত্র বিরূপ বা পরিবর্তন করেন। সে কারণে তিনি তার ধর্মমতের কোনো পরিবর্তনের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। খৃষ্টধর্ম প্রচারের এ পর্যায়ে বিতর্কের প্রধান উৎস অধ্যাত্ম দর্শন (Metaphysical) সম্পর্কিত ছিল না। বুদ্ধিজীবীদের সূক্ষ্ম যুক্তি, তর্ক ও চুলচেরা- বিশ্লে­ষণের বিকাশ আরো পরবর্তী কালের ঘটনা। বার্নাবাস ও পলের মধ্যে যেসব বিষয় নিয়ে মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে ছিল তা ছিল মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ও জীবন ধারা সম্পর্কিত। পল তার ও বার্নাবাসের গ্রীসে আগমনের পূর্বে সেখানে প্রচলিত ও পালিত আচার প্রথার আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তিনি পশুর

গোশত হালাল হওয়া সম্পর্কিত এবং পশু কুরবানি বিষয়ে মূসা আলাইহিস সালামের প্রচলিত বিধান পরিত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেন। এমনকি তিনি খতনা সংক্রান্ত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রতিষ্ঠিত নিয়মও বাতিলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যীশুর শিক্ষার এসব দিক প্রবর্তন ও বাস্তবায়নের বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রেক্ষিতে পল ও বার্নাবাসের মধ্যকার ব্যবধান বিদূরিত হওয়ার পরিবর্তে আরো ব্যাপকতর হয়ে ওঠে।

এ পর্যায়ে দু’জনের মধ্যে যেসব মতপার্থক্যের কথা বলা হয়েছে, সম্ভবত তা সঠিক নয়। পল ও বার্নাবাস উভয়েই যীশুর জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাস্তব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। একেশ্বরবাদের শিক্ষা সমর্থন করা অত্যাবশ্যক ছিল। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে পৌত্তলিকদের আচার অনাচরণের চাইতে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যময় আচার- আচরণের একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন ছিল। স্পষ্টতই দৈনন্দিন জীব নাচারের মধ্য দিয়েই সেই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত আচার- আচরণ পর্যায়ক্রমে গৃহীত ও আত্মকৃত হতে পারত। কোনো পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের পক্ষেই যীশুর সকল শিক্ষা ও আচরণ রাতারাতি গ্রহণ করে ফেলা সম্ভব ছিল না। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, পল ও বার্নাবাস কোনো স্থানেই দীর্ঘদিন অবস্থান করেন নি। স্বল্প সময়ের মধ্যে যীশুর সামগ্রিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। সে কারণেই তারা প্রথমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষা প্রদান করতেন। তাদের ইচ্ছা ছিল, পরবর্তীকালে ফিরে এসে পুনরায় তারা তাতে সংযোজন করবেন এবং আরো নির্দেশনা প্রদান করবেন। বার্নাবাস যেখানে যীশুর সমগ্র শিক্ষা প্রচার করতে আগ্রহী ছিলেন, পল সেখানে প্রয়োজন মত প্রচারের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তিনি তার নিজের যে নয়া ধর্মমত গড়ে তুলছিলেন, সেখানে সেগুলোর আর প্রয়োজন ছিল না। যা হোক, তারা জেরুজালেম প্রত্যাবর্তনের পর পৃথক যুক্তিতে নিজ নিজ কর্মকান্ডের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেন। তারা যৌথভাবে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তারও বর্ণনা দেন। তা সত্ত্বেও তাদের মতপার্থক্য বহাল রইল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের পথ পৃথক হয়ে যায়।

বলা হয়ে থাকে যে পল জন মার্ককে ভবিষ্যৎ কোনো সফরে সাথে নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে বার্নাবাস জনকে তাদের সফর সঙ্গী করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করেন। আর এ কারণেই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। প্রেরিতদের কার্য, ১৫ : ৩৯-৪০-এ বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে বিরোধ এত তীব্র হয়ে ওঠে যে, তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং এর পর বার্নাবাস মার্ককে নিয়ে সাইপ্রাস সফরে যান যেটি ছিল বার্নাবাসের জন্মভূমি। জন মার্কের বার্নাবাসের সফর সঙ্গী হওয়ার ঘটনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তার ও তার মামার ধর্ম বিশ্বাস একই রকম ছিল। পল যে তাকে সঙ্গী রাখতে চান নি, সম্ভবত এটা তার অন্যতম কারণ। বাইবেলে এ বিষয়ের পর বার্নাবাসের উল্লেখ করা হয় নি বললেই চলে।

কৌতূহলের বিষয় যে প্রেরিতদের কার্য-এ ­উল্লেখ আছে, “পবিত্র আত্মা” (Holy Ghost) বার্নাবাসকে মনোনীত করলেও পল তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মনে হয়, পল উপলব্ধি করেছিলেন যে, তার আর বার্নাবাসের প্রয়োজন নেই। তার প্রথম দিনকার দিনগুলোতে যখন জানাজানি হয়ে যায় যে, তিনি যীশুর সঙ্গী ছিলেন না তখন কেউ তার ওপর আস্থাশীল ছিল না। কিন্তু যখন তিনি খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তখন বিষয়টি আগের মত থাকে নি। তার খ্যাতি এতটাই হয়েছিল যে, তিনি কোনো ভীতি বা প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা ছাড়াই নিজের ধর্মমত প্রচার করতে পারবেন বলে উপলব্ধি করেছিলেন। এমনকি যীশুর শিক্ষা বহির্ভূত কিছু প্রচার করলে বার্নাবাস তার বিরোধিতা করতে পারেন, এ ধরনের সম্ভাবনাকেও তিনি আমলে আনেন নি। উপরন্তু পল ছিলেন একজন রোমান নাগরিক। তিনি অবশ্যই রোমানদের ভাষা শিখেছিলেন। সম্ভবত তিনি গ্রীক ভাষাতেও কথা বলতেন। কারণ, তিনি যে এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানকার সরকারী ভাষা ছিল গ্রীক। তিনি গ্রীসের খৃষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে যেসব পত্র লিখেছিলেন তা অবশ্যই তাদের মাতৃভাষায় লেখা হয়েছিল। এর অর্থ তিনি গ্রীস ও সম্ভবত ইতালিতেও ভাষার কোনো সমস্যা ছাড়াই সফর করেছিলেন। অন্যদিকে বার্নাবাস এ দু’ভাষার কোনোটিই বলতে পারতেন না। জন মার্ক গ্রীক ভাষা জানতেন। তাই, গ্রীসে বার্নাবাসের প্রথম ধর্মপ্রচার সফরে তিনি তার দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন। বার্নাবাস যদি সেখানে একা যেতেন, তাহলে তার কথা কেউ বুঝতে বা তিনিও কারো কথা বুঝতে পারতেন না। সুতরাং মার্কের সাথে সফরে যেতে পলের অস্বীকৃতি ছিল বার্নাবাস যাতে তার সাথে ভ্রমণে না যান, সেটা নিশ্চিত করার প্রয়াস। দু’জনের পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে ম্যাকগিফার্ট (Mc Giffert) তার The History of Christianity in the Apostolic Age গ্রন্থে বলেছেন:

বার্নাবাস, ইয়াহূদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে যার ধর্ম প্রচারের কাজ জেরুজালেমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল…. তার ফিরে আসা, নিজকে পৃথক করে নেওয়া ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। সকল প্রকার আইন থেকে খৃষ্টানদের মুক্তিদানের পলের মতবাদের প্রতি বার্নাবাসের পূর্ণ সমর্থন ছিল না….. প্রেরিতদের কার্য-এর এ লেখক, পল ও বার্নাবাসের মধ্যে সম্পর্কছেদের ঘটনাকে মার্ককে নিয়ে মত পার্থক্যের পরিণতি বলে উল্লে­খ করেছেন, কিন্তু প্রকৃত কারণ নিহিত ছিল আরো গভীরে…… খৃষ্টান হিসেবে পলের জীবন শুরুর পর গোড়ার দিকের বছরগুলোতে পলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ যিনি ছিলেন, তিনি বার্নাবাস। বার্নাবাস জেরুজালেমের চার্চের সদস্য ছিলেন……… তার বন্ধুত্ব পলের জন্য ছিল অনেক বেশি কিছু এবং নিঃসন্দেহে তা খৃষ্টানদের মধ্যে পলের সুনাম ও প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। খৃষ্টানদের মনে যখন পলের নির্যাতনের স্মৃতি জাগরূক ছিল সেই দিনগুলোতে বার্নাবাস পলের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

পলের প্রতি বার্নাবাসের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছিল পলের সাথে সফরকালে অর্জিত অভিজ্ঞতার কারণে। পল তার মত পরিবর্তন করবেন এবং যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী হবেন বলে বার্নাবাস যে আশা পোষণ করেছিলেন, প্রথম সফরেই তা অপসৃত হয়েছিল। সম্ভবত, শুধুমাত্র ইয়াহূদীদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত ধর্ম প্রচারের চেষ্টার অসারতা এবং তা যে ফলপ্রসূ হচ্ছে না, তা উপলব্ধি করতে পেরে বার্নাবাস তা ত্যাগ করেন। তবে তার আগে পর্যন্ত জনসাধারণের মধ্যে যীশুর ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু সে চেষ্টা চালানোর পর বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, তা সম্ভব ছিল না। সে তুলনায় এন্টিওকে তার সাফল্য ছিল অনেক বেশি। কেননা সেখানে জনসাধারণ যীশুর অনুসারীদের কাছে আগমন করে খৃষ্টধর্মে তাদের ধর্মান্তর করার অনুরোধ জানাচ্ছিল। পক্ষান্তরে তিনি ও পল গ্রীসে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের খৃষ্টান হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন।

বার্নাবাস সাইপ্রাসে ফিরে আসার পর তার কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে কোনো লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে জানা যায় যে, নয়া নবীর শিক্ষার অনুসারী অন্য বহু ব্যক্তির মত তিনি একজন শহীদ হিসেবেই ইন্তিকাল করেন। বাইবেলের বহু পৃষ্ঠা থেকে বার্নাবাসকে মুছে ফেলা সত্ত্বেও এটা পরিদৃষ্ট হয় যে, তিনি খৃষ্টধর্মের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবার মতো কেউ নন। চার্চের গোড়ার দিকে তিনি যীশুর কাছ থেকে যা শিখেছিলেন তা প্রকাশ্য সমর্থন ও শিক্ষাদানের জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছিলেন এমন এক সময় যখন যীশুর অতি ঘনিষ্ঠ শিষ্যগণও যীশুর সাথে তাদের সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে ভীত ছিলেন। যীশুর প্রতি বার্নাবাসের আনুগত্যের বিষয়টি তার শত্রু-মিত্র সকলেই স্বীকার করতেন। যীশু তার বোনের বাড়িতেই জীবনের শেষ আহার গ্রহণ করেন এবং সে বাড়িটি যীশুর অন্তর্ধানের পর তার অনুসারীদের সাক্ষাৎ ও সভাস্থল হিসেবেই ছিল। ধর্ম প্রচারকারী ও যীশুর অন্যান্য অনুসারীদের ওপর বার্নাবাসের প্রভাবের প্রমাণ খোদ বাইবেলেই রয়েছে। তাকে বলা হত একজন নবী, একজন শিক্ষক এবং লূক তাকে একজন ধর্ম প্রচারকারী হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। পলের প্রতি তার সমর্থন ছিল প্রশ্নাতীত। সর্বোপরি তাঁকে স্মরণ করা হয় এমন এক ব্যক্তি হিসেবে যিনি যীশুর বাণী সম্পর্কে কোনো আপোশ বা পরিবর্তনে রাজি হন নি।

বার্নাবাস সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর পল যা শুরু করেছিলেন, তা অব্যাহত রাখেন। তখন তার সাথে এমন অনেক খৃষ্টান ছিলেন যারা দীর্ঘদিন পলকে স্বীকার করে নেননি। পল তার দুর্বল অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ সময় তাকে যীশুর প্রেরিত ধর্ম প্রচারকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। অবশ্য তাতে যীশু জীবদ্দশায় তার সাথে তার সাক্ষাৎ না হওয়ার সত্যটির কোনো পরিবর্তন হয় নি। যদিও তিনি যীশুর কাছ থেকে বাণী লাভ করেছেন বলে দাবি করেছিলেন, তা সত্ত্বেও জনসাধারণের মধ্যে ধর্ম প্রচারকালে যীশুর সঙ্গী ছিলেন, এমন একজন ব্যক্তিকে তার সাথে রাখা প্রয়োজন ছিল। কারণ একজন প্রত্যক্ষদর্শী সঙ্গী তার জন্য এক অমূল্য সমর্থন এবং তার যুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করত। তিনি পিটারকে তার সাথে যোগ দিতে রাজি করান।

এই দু’ব্যক্তি, যারা অতীতে ছিলেন পরস্পর ঘোর বিরোধী, তারা কি করে, একত্র হলেন তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। যা হোক, পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছিল। অনেকেই পলকে একজন খৃষ্টান হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে আর সম্ভাব্য গুপ্তচর বা অত্যাচারী হিসেবে গণ্য করতেন না। গ্রীক দার্শনিক ও খৃষ্টানদের তীব্র সমালোচক সেলসাস (Celsus) বলেছেন যে, এন্টিওকে উভয়ের মধ্যে মতপার্থক্যের মূল কারণ ছিল পিটারের জনপ্রিয়তায় পলের ঈর্ষা। কিন্তু পরে পলের নিজের খ্যাতি বৃদ্ধি পাওয়ায় পিটারের প্রতি তার ঈর্ষার অবসান ঘটে। তা ছাড়া খৃষ্টানদের প্রতি নিপীড়নও সম্ভবত তাদের দু’জনকে এক করার পিছনে কাজ করেছিল। সে সময় খৃষ্টানদের প্রতি রোমান ও তাদের সমর্থক ইয়াহূদীদের নিপীড়নের মাত্রা ভয়াবহ রকম বৃদ্ধি পেয়েছিল। ইতিপূর্বে যীশুর কথিত বিচার ও ক্রুশবিদ্ধ করার সময় চাপের মুখে অথবা আশু বিপদের সম্মুখীন হওয়ার কারণে যীশুর সহচর থাকার কথা অস্বীকার করে পিটার তার দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এখন তিনি যীশুর বাণীর কিছুটা রদবদলের ব্যাপারে পলের পদক্ষেপ আগ্রহভরে সমর্থন করলেন। আর তা সম্ভবত এ কারণে যে, এ ধরনের পরিবর্তন নিপীড়নকে হ্রাস করবে।

সেই দিনগুলোতে পরিস্থিতি ছিল এমনই যে, যীশুর বাণীর পরিবর্তন ও তাতে নতুন কিছু সংযোজন করা হলো যাতে তা অ-ইয়াহুদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, উপরন্তু তা যেন দেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক বা হুমকি জনক না হয়। বিশ্বজগতের স্রষ্টার বিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ হোক বা না হোক, শাসকগণ ও তাদের আইনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে প্রণীত এই নীতির কথা পিটারের প্রথম পত্রে (৩ : ১৩-১৮) বিধৃত রয়েছে।

ঈশ্বরের দোহাই, তোমরা মানুষের আইন মান্য কর: সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী হিসেবে রাজা বা গভর্নর যারই সে আইন হোক না কেন, তোমরা তা মান্য কর যা অন্যায়কারীদের শাস্তিদানের জন্য এবং শাসকদের প্রশংসার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে রয়েছে কল্যাণ। এটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা। এভাবেই তোমরা মূর্খ ব্যক্তিদের মূর্খতা থেকে মুক্ত হতে পারবে। তোমরা তোমাদের স্বাধীনতাকে বিদ্বেষ পরায়ণতার জন্য ব্যবহার করনা। ঈশ্বরের ভৃত্য তোমরা সকল মানুষকে সম্মান কর। মানুষকে ভালোবাস। ঈশ্বরকে ভয় কর। রাজাকে সম্মান কর। ভৃত্যগণ! অন্তরে ভীতিসহ প্রভূর অনুগত হও, শুধু ভালো ও সৎ লোকদের প্রতিই নয়, অন্যায়কারীদের প্রতিও।

পল পিটারের সাথে পশ্চিমে ভ্রমণ করেছিলেন। আন্তরিকতা ছাড়া ও বার্নাবাসের প্রভাব দমন করে তারা নয়া ধর্মমত এবং আপোসরফা হিসেবে সংযোজনকৃত আচরণ ও ব্যবহার বিধির ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই স্বল্প প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলেন। রোমিয় ১৬ : ২০-২১- এ তিনি বলেছেন:

হ্যাঁ, এভাবেই আমি গসপেল প্রচারের জন্য সংগ্রাম করেছি, যেখানে খৃষ্টের নাম নেই, যাতে আমাকে অন্য কারো ভিত্তির ওপর নির্মাণ করতে না হয়। বরং যেমনটি লিপিবদ্ধ রয়েছে: যাদের কাছে তিনি বাণী প্রচার করেন নি তারা দেখবে এবং তারা যা শোনে নি তা বুঝতে পারবে।

পল যদি যীশুর প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতেন তাহলে অন্য ব্যক্তির ভিত্তি ঠিক তার মতই হত। তারা উভয়ে একই কাঠামো নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন। যেসব লোক প্রথমবারের মত পলের মুখ থেকে যীশু বা খৃষ্টের কথা জানতে বা শুনতে পারছিল, তাদের পক্ষে যেসব ধর্মপ্রচারকারী তখনও যীশুর শিক্ষা ধারণ করেছিলেন, তার সাথে তুলনা করে দেখা সম্ভব ছিল না। কার্যত তারা যা জানছিল, তা ছিল শুধু পলের শিক্ষা।

পল তার নিজের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে আপ্পোলোস নামক আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আগত এক জ্ঞানী ইয়াহূদীর ব্যাপক সাহায্য লাভ করেন। তিনি জনসাধারণের মধ্যে পলের মতবাদ প্রচারে বিপুল সাফল্য লাভ করেন। বলা হত, পল চারা রোপণ করেছিলেন এবং আপ্পোলোস (Appolos) তাতে পানি সিঞ্চন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এমনকি আপ্পোলোসও পলের সকল ধর্মীয় উদ্ভাবন মেনে নিতে পারেন নি এবং বার্নাবাসের মত তিনিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

পল যীশুর শিক্ষা থেকে ক্রমশই বেশি করে দূরে সরে যেতে থাকেন এবং তিনি স্বপ্নে যার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে দাবি করেন সেই খৃষ্টের প্রতি অধিকতর হারে গুরুত্ব আরোপ করতে শুরু করেন। যীশুর ধর্মের পরিবর্তন সাধনের অভিযোগে যারা তাকে অভিযুক্ত করেন তাদের বিরুদ্ধে তার যুক্তি ছিল এই যে, তিনি যা প্রচার করছেন তার মূল হলো যীশুর কাছ থেকে সরাসরি লাভ করা প্রত্যাদেশ। এটি পলকে ঐশী কর্তৃত্ব প্রদান করেছিল। এই কর্তৃত্বের সুবাদে তিনি দাবি করেন যে, গসপেলের আশীর্বাদ শুধু ইয়াহূদীদের জন্য নয়, বরং যারা এতে বিশ্বাস করবে তাদের সকলের জন্যই। উপরন্তু তিনি একথাও বলেন যে, মূসার ধর্মের চাহিদাসমূহ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, তা ঈশ্বরের কাছ থেকে তার কাছে সরাসরি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে তার বিরোধীও বটে। তিনি বলেন, আসলে এগুলো অভিশাপ। এভাবে পল যীশুর অনুসারীদের সহ সকল ইয়াহূদীকেই ক্রুদ্ধ করে তুললেন। কারণ তিনি তাদের উভয় ‘নবী’রই বিরুদ্ধাচরণ করছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, কেন তিনি শুধু তাদের মধ্যেই তার শিক্ষা প্রচার করছিলেন যারা ইয়াহূদীদের ঘৃণা করত এবং যীশুর সত্য সম্পর্কে অবগত ছিল না।

পল নিম্নোক্ত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তার মতবাদের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন:

ভাইসব, তোমরা কি জান না (আমি বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত লোকদের উদ্দেশ্যে বলছি) যে একজন মানুষ যতদিন জীবিত থাকে ততদিনই তার ওপর আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকে। স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে যার স্বামী আছে সে তার স্বামী জীবিত থাকা পর্যন্ত আইন দ্বারা তার সাথে বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু যদি তার স্বামী মারা যায় তখন মৃত স্বামীর সাথে তার আইনের বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। যদি তার স্বামী জীবিত থাকে এবং সে অন্য লোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন তাকে ব্যভিচারিণী বলে আখ্যায়িত করা হবে। কিন্তু যদি তার স্বামী মারা যায় তাহলে উক্ত আইন থেকে সে মুক্ত। তখন সে অন্য কোনো লোককে বিবাহ করলেও সে আর ব্যভিচারিণী হবে না। সুতরাং হে আমার ভ্রাতৃগণ! খৃষ্টের মৃত্যুর সাথে সাথে তার আইনও তোমাদের ক্ষেত্রে মৃত। তার অর্থ তুমি অন্যকে বিবাহ করতে পার, এমনকি সে ব্যক্তিকেও যিনি মৃত্যু থেকে পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন যাতে আমরা ঈশ্বরের জন্য ফলপ্রসূ কাজ করতে পারি।

এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, পল যীশু ও ‘খৃষ্ট’ এর মধ্যে একটি পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। তার যুক্তি অনুযায়ী যে আইন যীশু ও তার অনুসারীদের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করেছিল, তিনি মারা যাওয়ার পর তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। তারা আর যীশুর সাথে নয়, খৃষ্ট এর সাথে “বিবাহিত” যিনি অন্য এক আইন এনেছেন। সুতরাং এখন যীশু নয়, খৃষ্টের অনুসরণ প্রয়োজন। যদি কেউ যীশুর শিক্ষা মান্য করে তাহলে সে বিপথে চালিত হচ্ছে। এ যুক্তির সাথে তিনি প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিকারের নিজস্ব ধর্মমতের সংযোজন করে যে মতবাদ প্রণয়ন করেন তা যীশু কখনোই শিক্ষা দেন নি। এটা এক বিরাট সাফল্য এনে দেয় যেহেতু অন্য কথায়- এতে প্রচার করা হচ্ছিল যে, একজন মানুষ তার যা খুশি তাই করতে পারে এবং সে তার কৃতকর্মের জন্য অবশ্যম্ভাবী পরিণতির সম্মুখীন হবে না। যদি সে দিনের শেষে এ কথাটি বলে: “আমি খৃষ্টে বিশ্বাস করি।” যা হোক, যে মূল ভিত্তির ওপর পলের যুক্তি নির্ভরশীল ছিল তা ছিল মিথ্যা। কারণ যীশু ক্রুশবিদ্ধও হন নি কিংবা পুনরুজ্জীবিতও হন নি। পলের প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিকারের মতবাদ ছিল ভ্রান্তিপূর্ণ।

পলের যুক্তি প্রদর্শনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি দেখা গিয়েছিল। এর ফলে শুধু যীশুর শিক্ষারই পরিবর্তন ঘটে নি, উপরন্তু তা যীশু কে ছিলেন সে বিষয়ে জনসাধারণের ধারণারও সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। তিনি লোকের মনে একজন “মানুষ” থেকে একটি ধারণায় পর্যবসিত হন। কিছু লোক যীশুর পৃথিবীতে অবস্থান কালেই তার বাণী ও অলৌকিক কর্মকান্ডে বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে তার ওপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করেন। কেউ কেউ ভুল করে তাকে নবীদের চেয়ে বেশি কিছু বিবেচনা করতেন। তার কোনো কোনো শত্রু গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, তিনি ছিলেন “ঈশ্বরের পুত্র।” এর উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের সাথে তাঁকে সংশ্লিষ্ট­ করার জন্য গোঁড়া ইয়াহূদীদের তার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা। এভাবে তার অন্তর্ধানের আগেই তার প্রকৃত সত্ত্বার একটি অলৌকিক রূপদান এবং তার ওপর ঈশ্বরত্ব আরোপের একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। খৃষ্টের এই কাল্পনিক রূপ যা যীশুর প্রচারিত শিক্ষাকে হয়তো বাতিল করে দেওয়ার শক্তি রাখত, তা স্পষ্টতই কোনো সাধারণ ব্যাপার ছিল না এবং অনিবার্যরূপে বহু মানুষই ঈশ্বর সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এভাবে এই কাল্পনিক রূপই উপাসনার বস্তু হয়ে দাঁড়ায় এবং ঈশ্বরের সাথে সংশ্লি­ষ্ট হয়ে যায়। একজন মানুষ থেকে যীশুর খৃষ্টরূপী ঈশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এ ঘটনা গ্রীস ও রোমের বুদ্ধিজীবীদেরকে পল ও তার অনুসারীদের প্রচারিত ধর্মকে তাদের নিজস্ব দর্শনের সাথে অঙ্গীভূত করতে সক্ষম করে। তারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এখন পলীয় চার্চের ধর্মমতের “পিতা ঈশ্বর” ও “ঈশ্বরের পুত্র” এর সাথে ত্রিত্ববাদের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল শুধু “পবিত্র আত্মা” যোগ করার। কাল পরিক্রমায় এ দু’টি চিত্র একটিতে অঙ্গীভূত হলো এবং ত্রিত্ববাদের জন্ম ঘটল। এ সময় গ্রীসে বিরাজিত দার্শনিক ধারণা তাতে যেমন রং চড়াল, তেমনি

গ্রীকভাষাও এ শিক্ষার প্রকাশকে প্রভাবিত করে এর অর্থকে সীমাবদ্ধ করে দিল। গ্রীক ভাষা গ্রিকদের দর্শনকে ধারণ করতে সক্ষম ছিল, কিন্তু যীশু যা বলেছিলেন তা ধারণের মত বিশালতা বা গভীরতা এ ভাষার ছিল না। তাই যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী যদি স্বচ্ছন্দে গ্রীক ভাষা বলতেও পারতেন, তবুও এ ভাষাতে যীশুর শিক্ষার সার্বিকতা প্রকাশ করতে পারতেন না। এ জন্য তাকে বার বার উপযুক্ত শব্দের সন্ধান করতে হত। যখন হিব্রু গসপেলগুলো গ্রীকে ভাষান্তরের সময় এল, এ সীমাবদ্ধতা তখন স্থায়ী রূপ গ্রহণ করল এবং শেষ পর্যন্ত হিব্রুতে লিখিত সকল গসপেল যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তা মোহরাঙ্কিত হয়ে গেল।

যদিও পল প্রকৃত পক্ষে যীশুর ঈশ্বরত্ব বা ত্রিত্ববাদ প্রচার করেন নি, তার প্রকাশ ভঙ্গি এবং তার কৃত পরিবর্তন এ উভয়ই ভ্রান্ত ধারণার জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং ইউরোপে তার ধর্মমত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এটি সেই ধর্মমত যা মেরীকে “ঈশ্বরের মাতা” হিসেবে গণ্য করার মত এক অসম্ভব স্থানে তাকে অধিষ্ঠিত করেছিল।      

পল এ কথা বলে তার কর্মকান্ডকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যে, যীশু যে সময়ে বাস করতেন এবং তিনি নিজে (পল) যে সময়ের মানুষ- এ দুয়ের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে এবং এখন যে পরিস্থিতি বিরাজিত তাতে যীশুর শিক্ষা পুরোনো হয়ে গেছে, তা আর অনুসরণযোগ্য নয়। নৈতিকতার একটি নতুন ভিত্তি খুঁজে পাওয়ার জন্য তখন এ যুক্তি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। পল তখনকার বিরাজমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছিলেন এবং তখন প্রয়োজন অনুযায়ীই তিনি তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা প্রদান করেছিলেন:

আমার সব কিছুই আইন সম্মত, কিন্তু আমি কারো ক্ষমতার অধীন নই। (১ করিনথীয় ৭ : ১২)

পল শুধু মূসা ও যীশুকে প্রত্যাখ্যানই করেন নি, তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তার আইন তিনি নিজেই। স্বাভাবিকভাবেই বহু লোকই সে কথা মেনে নেয় নি। পল তাদের জবাব দিয়েছেন এ বলে:

যদি আমার মিথ্যার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সত্য ও গরিমা প্রকাশিত হয়ে থাকে তাহলে আমি কেন বিচারে পাপী হব? (রোমীয় ৩ : ৭-৮)

পলের এই বক্তব্য থেকে দেখা যায়, যদিও তিনি জানতেন যে, তিনি মিথ্যা বলছেন, পল মনে করতেন তর উদ্দেশ্যের জন্য এটা যৌক্তিক। কিন্তু এটা বুঝা মুশকিল যে মিথ্যার মধ্য দিয়ে সত্য কীভাবে প্রকাশিত হয়। এ যুক্তি অনুযায়ী মানুষ যীশু যদি ঈশ্বরের সমকক্ষ হন তাতে যীশুর অনুসারীদের আপত্তির কি আছে?

পল এমন এক ধর্মের জন্ম দিয়েছেন যা বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী উপাদান দ্বারা পরিবেষ্টিত। তিনি ইয়াহূদীদের একত্ববাদ গ্রহণ করেন এবং তার মধ্যে পৌত্তলিকদের দর্শন যুক্ত করেন। এই অদ্ভুত মিশ্রণের মধ্যে ছিল কিছু যীশুর শিক্ষা এবং কিছু ছিল যা পল খৃষ্টের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। পলের ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি ছিল সমকালীন গ্রীক চিন্তাধারার আলোকে ব্যাখ্যাকৃত তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। যীশুর ওপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করা হয়েছিল এবং তার পবিত্র মুখে বসিয়ে দেওয়া হয়েছি প্ল­টোর (Plato) কথা। প্রায়শ্চিত্তের তত্ত্ব ছিল পলের মস্তিস্কপ্রসূত যা যীশু ও তার শিষ্যদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। এগুলোর ভিত্তি ছিল ‘আদি পাপ’ ‘ক্রুশবিদ্ধকরণ’ ও ‘পুনরুজ্জীবন’- এ বিশ্বাস যার কোনোটিরই কোনো বৈধতা ছিল না। এভাবেই একটি কৃত্রিম ধর্মের সৃষ্টি হয়। তার নাম খৃষ্ট ধর্ম যা গাণিতিকভাবে উদ্ভট, ঐতিহাসিকভাবে মিথ্যা, তবুও মনস্তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয়। ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে পল ধর্মের যে জমকালো মন্দির তৈরি করেছিলেন তার সব দিকেই তিনি দরজা নির্মাণ করেছিলেন। এর ফল হয়েছিল এই যে, যারা প্রথমবারের মতো তার খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তারা ইয়াহূদী বা গ্রীক যাই হোক না কেন, তারা যখন সেই মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করল, তাদের এ ধারণাই দেওয়া হলো যে তারা সেই দেবতার প্রতিই শ্রদ্ধা নিবেদন করছে যাকে তারা সব সময় উপাসনা করে আসছে। পলের ভ্রান্ত ধারণার উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা লাভের পর যারা ভাবত যে, তারা যীশুর অনুসরণ করছে, তারা তাদের অজান্তে যীশুর পরিবর্তে পলের ধর্মমতের অনুসারীতে পরিণত হলো।

হেইনজ জাহরনট (Heinz Zahrnt) পলকে “যীশুর গসপেলের বিকৃতকারী” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ওয়ারডি (Werde) তাকে বর্ণনা করেছেন “খৃষ্টান ধর্মের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা” হিসেবে। উভয় বক্তব্যেরই কিছু যৌক্তিকতা আছে। ওয়ারডি বলেন, পলের কারণে:

ঐতিহাসিক যীশু ও চার্চে খৃষ্টের মধ্যে অসামঞ্জস্য এত বেশি প্রকট যে, তাদের মধ্যে কোনো ঐক্য খুঁজে পাওয়া একেবারেই কঠিন

শনফিল্ড (Schonfield) লিখেছেন:

গোঁড়ামির (Orthodoxy) পলীয় ধর্মমত খৃষ্টান ধর্মের ভিত্তিরূপে গণ্য হয় এবং বৈধ চার্চ ধর্মবিরোধী বলে পরিত্যক্ত হয়।১০

এভাবে বার্নাবাস পরিগণিত হন প্রধান ধর্ম বিরোধীরূপে।

যীশুর অনুসারীদের কাছে সত্যের পথ জ্যামিতির সরল রেখার মত- দৈর্ঘ্য আছে কিন্তু কোনো বিস্তার নেই। তারা যীশুর শিক্ষার কোনো পরিবর্তন করতে রাজি হন নি, কারণ এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল সুবিধা লাভ। তাদের কাছে যীশুর শিক্ষাই ছিল সত্য এবং পরিপূর্ণ সত্য। বার্নাবাস ও তার অনুসারীরা যীশুর কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তার প্রচার ও অনুসরণ অব্যাহত রেখেছিলেন। তারা সর্বদাই এবং এখন পর্যন্ত একটি শক্তি হিসেবেই গণ্য। তাদের মধ্য থেকেই “সন্ত” (Saint) ও পণ্ডিতদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তারা খৃষ্টানদের প্রতিটি সম্প্রদায়ের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

যীশুর অনুসারীগণ ও বার্নাবাস কখনোই একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলেননি যদিও নেতাদের সত্যনিষ্ঠার কারণে অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল দ্রুত। এসকল নেতা ছিলেন প্রাজ্ঞ ও জ্ঞানী যারা ঈশ্বরকে ভালোবাসতেন ও তার ভয়ে ভীত ছিলেন। তারা মরুভূমি ও পর্বতে গমন করেছিলেন। প্রতিটি সন্তকে ঘিরে একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। তারা সকলেই ছিলেন একে অপর থেকে পৃথক। এর কারণ ছিল তাদের বাসস্থানের চারপাশের দুর্গম অঞ্চল। সংগঠন কাঠামোর অনুপস্থিতি ছিল তাদের শক্তির একটি উৎস, করণ এর ফলে নিপীড়নকারীদের পক্ষে তাদের আটক করা সম্ভব ছিল না। পলের খৃষ্টধর্ম গ্রীস হয়ে ইউরোপে প্রসারিত হয়েছিল। পক্ষান্তরে এ ঈশ্বরপ্রেমীরা তাদের জ্ঞানের শক্তিতে দক্ষিণে, চূড়ান্ত পর্যায়ে উত্তর আফ্রিকা বরাবর বিস্তার লাভ করেছিলেন। তাদের প্রতিষ্ঠিত যুবসমাজ যীশুর অনুসারী ছিল। যারা তখনও যীশুর শিক্ষা ধারণ করেছিলেন তারা তাদের জ্ঞানের অধিকাংশই সরাসরি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে চড়িয়ে দিয়েছিলেন। আচার- ব্যবহার অনুকরণ করা হত এবং ধর্মশিক্ষা দেওয়া হত মৌখিকভাবে। তারা ঈশ্বরের একত্ব প্রচার অব্যাহত রেখেছিলেন। যীশুর অন্তর্ধানের পর প্রথম দিকের শতকগুলোতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় যেমন. এবোনাইটস (Ebonites), সেরিনথিয়ানস (Cerinthians), ব্যাসিলিডিয়ানস (Basilidians), যারা ঈশ্বরকে পিতা হিসেবে উপাসনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা ঈশ্বরকে বিশ্বজগতের সর্বশক্তিমান শাসক, সমকক্ষহীন সর্বোচ্চ সত্ত্বা হিসেবেই উপাসনা করত।

বর্তমানে যীশুর জীবন ও শিক্ষা বিষয়ে বহু ধরনের লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। যীশু যে ভাষায় কথা বলেছিলেন, তা ছিল আরবীর এক কথ্য রূপ- এরামিক। এ ভাষা সাধারণভাবে লিখিত হতো না। প্রথম গসপেল লিখিত হয় হিব্রুতে। সেই গোড়ার দিকের দিনগুলোতে কিছুই আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত বা বর্জিত হয় নি। প্রতিটি খৃষ্টান তার সম্প্রদায়ের নেতার ওপর নির্ভর করত যে, তিনি কোনো গ্রন্থ ব্যবহার করবেন। যার কাছ থেকে তারা শিক্ষা লাভ করবে তার ওপর নির্ভর করে প্রতিটি সম্প্রদায় একটি পৃথক সূত্রের কাছে গমন করত। যারা বার্নাবাসের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতেন তারা এক সূত্রের কাছে যেতেন, আবার যারা পলের অনুসারী ছিলেন তারা যেতেন অন্যের কাছে।

এভাবে পৃথিবী থেকে যীশুর অন্তর্ধানের পর পরই যীশুর অনুসারী ও পলীয় চার্চের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও ব্যাপকতর ব্যবধান সৃষ্টি হয়। উল্লে­খ্য, পলীয় চার্চ পরে রোমান ক্যাথলিক চার্চ নামে আখ্যায়িত হয়। এ পার্থক্য শুধু যে জীবনাচারণ ও ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই বিরাজিত ছিল তা নয়, ভৌগোলিকভাবেও এই পার্থক্য সুস্পষ্ট রূপ গ্রহণ করে। পলীয় চার্চ যত বেশি প্রতিষ্ঠা লাভ করে তা যীশুর অনুসারীদের প্রতি তত বেশি বৈরী হয়ে ওঠে। পলের অনুসারীরা রোমান শাসকদের সাথে ক্রমশ অধিক হারে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ফেলার প্রেক্ষিতে খৃষ্টান নামের পরিচয় দানকারীরা যে, নিপীড়নের শিকার হয়েছিল পরবর্তীতে একত্ববাদের সমর্থকরা সেই নিপীড়নের প্রধান শিকারে পরিণত হয়। একত্ববাদীদের ধর্ম বিশ্বাস পরিবর্তনের এবং ধর্মগ্রন্থ ধ্বংসসহ তাদের নির্মূল করারও চেষ্টা চলে। সে কারণে আদি শহীদদের অধিকাংশই ছিলেন একত্ববাদী। ত্রিত্ববাদের যত বেশি প্রসার ঘটতে থাকে তার অনুসারীরা তত বেশি একেশ্বরবাদ সমর্থকদের বিরোধী হয়ে উঠে। এ সময় সম্রাট জুলিয়ান (Julian) ক্ষমতাসীন হন। তার আমলে খৃষ্টানদের অন্তর্বিরোধ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে তিনি বলতে বাধ্য হন: “খৃষ্টান সম্প্রদায়গুলো সাধারণভাবে পরস্পরের যতটা বৈরী কোনো বন্য পশুও মানুষের প্রতি ততটা বৈরী নয়।”

স্বাভাবিকভাবেই, যীশুর শিক্ষা থেকে যারা সরে এসেছিল তারা বাইবেলের পরিবর্তন ঘটাতেও প্রস্তুত ছিল, এমনকি তাদের মতের সমর্থনে মিথ্যা বক্তব্য সংযোজন করতেও তারা পিছপা ছিল না। টোলান্ড (Toland) তার (The Nazarenes) গ্রন্থে আদি একেশ্বরবাদী শহীদদের অন্যতম ইরানিয়াসের (Iranius) এর এতদবিষয়ক ভাষা উদ্ধৃত করেছেন :

“সরল মানুষ ও সত্য ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের বিভ্রান্ত করতে তারা অন্যায়ভাবে তাদের ওপর নিজেদের রচিত মিথ্যা ও জাল ধর্মগ্রন্থের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।”

টোলান্ড আলো বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই জানি যে, খৃষ্টান চার্চের প্রাথমিক পর্যায়ে কী পরিমাণ প্রতারণা ঘটেছিল ও ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল। খৃষ্টান চার্চগুলোই সকল জাল ও ভুয়া ধর্মগ্রন্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে আগ্রহী ভূমিকা পালন করে।…… যখন যাজকরাই ছিল ধর্মগ্রন্থের একমাত্র প্রতিলিপি রচনাকারী এবং ভালো বা মন্দ সকল ধর্মগ্রন্থের একমাত্র হিফাযতকারী, সে সময়েই ব্যাপক মাত্রায় এ অপকর্ম সংঘটিত হয়। কিন্তু পরে সময়ের পালা বদলে খৃষ্টধর্মের সূচনা ও প্রকৃত রূপ উদ্ধার করা, কল্পকাহিনী থেকে ইতিহাসকে অথবা ভ্রান্তি থেকে সত্যকে চিহ্নিত করা প্রায় সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।….

প্রেরিতদের অব্যবহিত উত্তরসূরিরা কি করে তাদের গুরুদের প্রকৃত শিক্ষাকে তাদের ওপর আরোপিত মিথ্যা শিক্ষাগুলোর সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেললেন? অথবা তারা যদি এগুলো সম্পর্কে অন্ধকারেই থাকবেন তাহলে সেগুলো এত তাড়াতাড়ি কি করে তাদের অনুসরণের মধ্য দিয়ে অধিক গুরুত্ব লাভ করল? দেখা যায়, এ ধরনের মিথ্যা ও জাল ধর্মগ্রন্থগুলো গির্জার পুরোহিতদের ‘ক্যাননিকাল’ (Canonical) গ্রন্থসমূহের সাথে প্রায়ই সমমর্যাদায় স্থাপন করা হত এবং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবকটি গ্রন্থেই উদ্ধৃত হত ঐশী ধর্মগ্রন্থ হিসেবে অথবা কোনো কোনো সময় যেমনটি আমরা দেখি, তারা সেগুলোকে ঐশী হিসেবে অস্বীকার করত। প্রশ্ন করা যায়, কেন ক্লিমেন্ট অব আলেকজান্ডার, ওরিজেন, টারটালিয়ান ও এ ধরনের বাকি লেখকগণ কর্তৃক খাঁটি গ্রন্থ হিসেবে আখ্যায়িত সকল গ্রন্থই সমভাবে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য হবে না? এবং যেসব যাজক বা পুরোহিত, যারা শুধু একে অন্যের বিরোধিতাই নয়, উপরোন্তু একই ঘটনা সম্পর্কে তাদের বর্ণনার মধ্যে প্রায়ই স্বরিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়, তাদের সাক্ষ্যের ব্যাপারেই বা কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া যাবে?

টোলান্ড বলেন যে, এ সব ‘ভণ্ড পুরোহিত ও জালিয়াতি’ সম্পর্কে যখন প্রশ্ন তোলা হয় তখন তারা যুক্তি খণ্ডন করার চেয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীকে ধর্মবিরোধী ও আত্মগোপনকারী নাস্তিক বলে আখ্যায়িত কতে শুরু করে। তিনি বলেন, তাদের এ আচরণ তাদের প্রতি সকলের কাছে প্রতারক ও জালিয়াত হিসেবে সন্দেহ সৃষ্টি করে, কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তার দুর্বল স্থানে আঘাত লাগলে চিকিৎসা করবে।……. যার কাছে প্রশ্নের জবাব আছে সে ক্রুদ্ধ হবে না। ……….

অবশেষে টোলান্ডের প্রশ্ন:

সকল চার্চ ঐতিহাসিক সর্বসম্মতভাবে নাজারিনি (Nazarenes) অথবা এবিওনাইটসদের (Ebionites) খৃষ্টধর্ম গ্রহণকারী হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন, অথবা সেই ইয়াহূদীরা যারা তার নিজের লোক হিসেবে খৃষ্টের ওপর বিশ্বাস সহ তার জীবিত থাকা ও অন্তর্ধানের কথা বিশ্বাস করতেন, তারাই তার কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং তারা সবাই তার ধর্মের প্রচারকারী ছিলেন। এ সব বিষয় বিবেচনা করে আমার বক্তব্য যে তাদের পক্ষে কি করে (যাদের সবাইকে প্রথম ধর্মদ্রোহী বলে আখ্যায়িত ও অনেককেই দন্ডিত করা হয়েছিল) যীশুর ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা বা তা নিয়ে চক্রান্ত করা সম্ভব? এ কাজটি সেসব গ্রীকদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব যারা যীশুর অন্তর্ধানের পর প্রচারকারীদের মধ্যমেই তার অনুসারী হয়েছিল এবং তার প্রকৃত সত্য সম্পর্কে কখনোই অবহিত ছিল না অথবা ঈশ্বর বিশ্বাসী ইয়াহূদীগণ ছাড়া যখন তাদের কোনো তথ্য জানার কোনো উপায়ই ছিল না?১১