মূল: ড. মাজহার কাজি । অনুবাদ: মাওলানা ফয়জুলাহ− মুজহিরী । সম্পাদনা: এম মুসলেহ উদ্দিন

কুরআন মাজিদ একটি উলেখযোগ্য− সংখ্যক প্রাকৃতিক বিস্ময়ের বর্ণনা দেয়, যা তার অবতরণকালে মানুষের কাছে অজানা ছিল । তবে কুরআন মাজিদ এসব ঘটনাবলির এমন ভাষায় বর্ণনা দেয় যা স্থান-কাল-পাত্র বেধে সবার কাছে বোধগম্য। যদি কুরআন মাজিদ এসব বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিভাষা ব্যবহার করত, যেমন : গ্রহসমূহের কক্ষপথে বৃত্তাকার পরিভ্রমণ, অসংখ্য গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের উপস্থিতি, মহাবিশ্বের নিত্য সম্প্রসারণ ইত্যাদি- তাহলে কয়েক শতাব্দী পূর্বের মানুষেরাও তা পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হত না। এমনকি এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, এতে পূর্বের অজানা অনেক প্রাকৃতিক ঘটনা ও তথ্য এমন ভাষায় সন্নিবেশিত হয়েছে যা একটি সার্বজনীন বার্তা বহন করে। প্রাকৃতিক
এটি অতীত প্রজন্মের মানুষের মধ্যে কোনো দ্বিধার উদ্রেক করে নি। পাশাপাশি এটি প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের একটি চলমান উৎসে পরিণত হয়েছে। নিরন্তর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারে চৌদ্দশ বছরের ক্রমাগত সমৃদ্ধি দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রকৃতির রহস্য সম্পর্কে কুরআন মাজিদ যা-ই বর্ণনা দিয়েছে তা চিরসত্য। প্রকতিৃ সম্পর্কে সাম্প্রতিক আবিষ্কারসমূহ মানুষকে কুরআন মাজিদের বার্তাসমূহ নতুন আগ্রহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে উপলব্ধি করতে সক্ষম করেছে। প্রাকৃতিক
কুরআন মাজিদের বাণীসমূহ এমন যে, তা প্রত্যেক নতুন প্রজন্মের সঙ্গে জ্ঞান ও বোধশক্তির মান অনুযায়ী সরাসরি কথা বলে। এই আবিষ্কারসমূহ সব ধরনের সহজলভ্য বৈজ্ঞানিক ডাটা ব্যবহার করে মানুষকে কুরআন মাজিদের আয়াতসমূহ অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম করেছে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, এ সকল প্রাকৃতিক আবিষ্কারের কোনোটিই কুরআন মাজিদের একটি সাধারণ আয়াত, এমনকি একটি শব্দের মধ্যেও, কোনো অসঙ্গতি খুঁজে পায় না। পক্ষান্তরে এই আবিষ্কারসমূহ কুরআন মাজিদের বিষয়বস্তুর সত্যতার সপক্ষে সাক্ষ্য বহন করে। প্রাকৃতিক
কুরআন মাজিদের বৈজ্ঞানিক তথ্য, যা আগত পৃষ্ঠাগুলিতে উপস্থাপিত হয়েছে- তার অধিকাংশই মানুষ বিগত দুই শতাব্দীর মধ্যে আবিষ্কার করেছে। অথচ এই তথ্যগুলি মানুষের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে চৌদ্দশ বছরেরও অধিককাল পূর্বে এমন এক নবীর মাধ্যমে যিনি নিরক্ষর, যিনি না জানতেন পড়তে, না জানতেন লিখতে। এমনকি জানতেন না নিজের নামটি পর্যন্ত স্বাক্ষর করতে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় এই বিষয়সমূহ এই নিরক্ষর বা উম্মি নবী সা-এর কল্পনা কিংবা রচনা হতে পারে না। এ কথা বিশ্বাস করা ব্যতীত গত্যন্তর নেই যে, কুরআন মাজিদ সেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি গ্রন্থ যিনি মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। তা কোনোভাবেই চৌদ্দশ বছরের অধিককাল পূর্বের একজন ব্যক্তির রচনা হতে পারে না। নিম্নে কুরআন মাজিদের মুজিজাধর্মী বিস্ময়কর কিছু আয়াত তুলে ধরা হল : প্রাকৃতিক

মুজিজা-১৩
একটি গ্যাসীয় পিণ্ডরূপে মহাবিশ্বের সূচনা

তিনি মনোনিবেশ করলেন আসমানের (সৃষ্টির) প্রতি, যখন তা ছিল (কেবল) একটি ধুম্রকুঞ্জ। (ফুসসিলাত, ৪১ : ১১)

এই আয়াত নির্দেশ করে, গ্রহ-নক্ষত্র সমেত বিভিন্ন ছায়াপথ গঠিত হওয়ার পূর্বে, সূচনালগ্নে মহাকাশ ছিল কেবল একটি ধুম্রকুঞ্জ। Big Bang (মহা বিস্ফোরণ) তত্ত্বের একটি পরিমার্জিত রূপ, যার নাম Inflationary theory (স্ফীতি তত্ত্ব)। এটি একটি শূন্যস্থান থেকে আদি ঘনীভূত বস্তুর উদ্ভব হওয়ার বর্ণনা দেয়। বর্তমানে জ্যোতির্বিদদের কাছে অন্যান্য ছায়াপথগুলি মহাজাগতিক স্বর্পিল বাষ্পকুণ্ডলী ঘনীভূত হওয়ার মাধ্যমে গঠিত হওয়ার ছবি রয়েছে। সাম্প্রতিককালের এই দুই আবিষ্কার কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যা হোক, এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, জ্যোতির্বিদরা যাকে Mist বা ‘বাষ্প’ বলেছে, কুরআন মাজিদ তাকে বলেছে Smoke বা ‘ধুম্র’। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘বাষ্প’ হল পানির একটি শীতল ও শান্ত উড়ন্ত ধারা বা স্প্রে। পক্ষান্তরে ধুম্র হল একটি উষ্ণ বায়বীয় পিণ্ড যা কিছু উড়ন্ত অনুকণা ধারণ করে। মূলত: এটিও কুরআন মাজিদের একটি সাহিত্যগত মু’জিজার দৃষ্টান্ত যে, এটি আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে যথোপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করে তার যথার্থ বর্ণনা পেশ করে।

মুজিজা-১৪
একক বস্তুরূপে মহাবিশ্বের উদ্ভব

কাফেররা কি দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ছিল একত্রে সংলগ্ন (একটি টুকরার মত), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করলাম। (আম্বিয়া, ২১ : ৩০)

এই আয়াতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা এমন একটি রহস্যের বর্ণনা দিয়েছেন যা বহু শতাব্দী পর্যন্ত বড় বড় প্রকতিৃ বিজ্ঞানী ও মহাকাশ বিজ্ঞানীদের অগোচরে ছিল। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্যকে ব্যক্ত করেছে দু’টি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে : ‘ফাতাক্ব’ ও ‘রাতাক্ব’। আরবি ভাষায় ‘রাতাক্ব’ শব্দের অর্থ হল বস্তুর বিভাজন ও ভাঙনের প্রক্রিয়া এবং ‘রাতাক্ব’ শব্দের অর্থ হল, একটি সমজাতীয় ক্ষেত্রে কিছু পদার্থকে একত্রিতভাবে বাঁধা ও গ্রথিত করা। যাহোক, আয়াতে বলা হয়েছে, মহাকাশ ও পৃথিবী প্রথমে একত্রে সংলগ্ন ছিল এবং পরবর্তীতে সেগুলি পৃথক হয়ে যায়।
মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা, বিশেষত মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কিত Big  Bang তত্ত্ব কুরআন মাজিদের এই বর্ণনাকে সমর্থন করে। Big  Bang তত্ত্বটি সর্বপ্রথম ১৯৫০ সালে রাল্প আলফার, হ্যান্স বিথ ও জর্জ গ্যাস্মো কর্তৃক প্রস্তাবিত হয়। এই তত্ত্বানুসারে, গোড়াতে এই মহাবিশ্ব বস্তু ও শক্তির একটি অতি ঘন পিণ্ডের আকতিতেৃ একক ইউনিটরূপে কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রায় পনের বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি বিস্ফোরণ সংগঠিত হয়। যখন কেবল ১০-৩২ সেকেন্ডের মধ্যে মহাবিশ্ব তার পূর্ব আয়তনের ১০ থেকে ৩০ কিংবা তারও অধিক গুণ বেশি প্রসারিত হয়। এই আকস্মিক মহা-বিস্ফোরণের ফলে বস্তু ও শক্তির অতি ঘন পিণ্ডটি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ও ভিন্ন ভিন্ন দিকে ঘুরতে থাকে। অবশেষে বর্তমান মহাকাশের (মহাবিশ্বের) রূপ পরিগ্রহ করে। কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি এ কথারই বর্ণনা দেয়- ‘আকাশ ও পৃথিবী ছিল একত্রে সংলগ্ন, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করলাম।’

মুজিজা-১৫
আদি পিণ্ড বিভাজন ও বিক্ষেপনে সময় উপাদান

নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি পরিমিতরূপে, আমার কাজ তো এক মুহূর্তে, চোখের পলকের মত। (ক্বাসাস, ২৮ : ৪৯-৫০)

উপরোক্ত আয়াতের বর্ণনার অনুরূপ, বিজ্ঞানীরা মনে করে, আদি পিণ্ড বিভাজন ও বিক্ষেপনে সময় লেগেছিল ১/১০-৩২ সেকেন্ডেরও কম। এই আয়াত বলে আল্লাহ তাআলার আদেশ, চোখের পলকের মত। অন্যকথায় বলা যায়, আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব গঠনে সময় লেগেছিল শূন্য সেকেন্ডের একটি ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল এই আবিষ্কারের জন্যে। অথচ কুরআন মাজিদ রহস্যের জট উম্মোচন করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা-১৬
একাধিক বিশ্বের উপস্থিতি

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, যিনি সকল বিশ্বের প্রতিপালক। (ফাতিহা, ০১ : ০১)

এটি কুরআন মাজিদের প্রথম সুরার প্রথম আয়াত। চৌদ্দশত বছর পূর্বে মানুষের মন, পৃথিবী, সৌর জগৎ কিংবা ছায়াপথসমূহ সম্পর্কে কোনো ধরনের স্বচ্ছ ধারণা করতে অক্ষম ছিল। এমতাবস্থায় কুরআন মাজিদের সর্বপ্রথম আয়াত বলে যে, আল্লাহ তাআলা সকল বিশ্বের অধিপতি, যা পৃথিবী ব্যতীত আরও একাধিক বিশ্বের উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। বস্তুত ‘সকল বিশ্বের অধিপতি’ কথাটি কুরআন মাজিদে সর্বমোট ৭৩ বার দেখা যায়। যেমন : সুরা ও আয়াত নং ২: ১৩১; ৬: ৪৫,৭১; ২৬: ১৬; ৩২: ০২; ৪১:০৯; ৪৩: ৪৬; ৬৯: ৪৩ ইত্যাদি। বর্তমানে মানব সমাজ এ ব্যাপারে সম্যক অবহিত যে, পৃথিবী ছাড়া আরও গ্রহ রয়েছে। এই বিষয়টি জানা গেছে কেবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে। অথচ সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা তার প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এই জ্ঞান অবতীর্ণ করেছেন মানুষ টেলিস্কোপ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের অনেক পূর্বে।

মুজিজা-১৭
বিংশ শতাব্দীর একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার

কুরআন মাজিদ তিন প্রকারের সৃষ্টির কথা বারবার উল্লেখ করেছে : যেসব বিষয় বা বস্তু নভোমণ্ডলে রয়েছে, যেসব বস্তু ভূমণ্ডলে রয়েছে এবং যেসব বস্তু নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের মাঝখানে রয়েছে।

আমি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে তা যথার্থভাবেই সৃষ্টি করেছি। (হিজর, ১৫ : ৮৫)

নভোমণ্ডলে, ভূমণ্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে তা তাঁরই। (ত্বাহা, ২০ : ০৬)

নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে, তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। (আম্বিয়া, ২১ : ১৬)

কুরআন মাজিদের আরও কিছু আয়াত সেসব বস্তুর নির্দেশ করে যা আল্লাহ তাআলা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের মাঝখানে সৃষ্টি করেছেন। যেমন : ২৫:৫৯; ৩২:০৪; ৪৩:৮৫; ৪৪:০৭, ৩৮; ৪৬:০৩; ৫০:৩৮; এবং ৭৮:৩৭। মহাকাশ বিজ্ঞান সংক্রান্ত আমাদের সাম্প্রতিক জ্ঞানের ভিত্তিতে আমরা বর্তমানে কুরআন মাজিদে বারংবার উল্লিখিত এসব বিষয়ের ব্যাখ্যার একটি পর্যায়ে রয়েছি। বৈজ্ঞানিকগণ সাম্প্রতিক সময়ে মহাশূন্যে ছায়াপথ বহির্ভূত বস্তুর উপস্থিতি আবিষ্কার করেছে। আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন প্রক্রিয়ায় সংযুক্তি ও একীভূত হওয়ার পর বিভাজন ও বিক্ষেপণের সংশিষ্টতা− রয়েছে। যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কুরআন মাজিদ মহাবিশ্বের গঠন প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়েছে সর্বাধিক উপযুক্ত আরবি শব্দ ‘ফাতাক্ব’ (বিভাজন) ও ‘রাতাক্ব’ (সংযুক্তি)- এর মাধ্যমে। ‘রাতাক্ব’ (সংযুক্তি)- এর প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সময় কিছু টুকরো মহাশূন্যের বাইরে থেকে গিয়েছিল। এগুলিকেই বর্তমানে আন্তঃছায়াপথীয় বস্তু বলা হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অতি সম্প্রতিই সেসবের উপস্থিতি সনাক্ত করতে পেরেছে। পক্ষান্তরে কুরআন মাজিদ এসব বিক্ষিপ্ত টুকরার উপস্থিতির স্বীকতিৃ দিয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা-১৮
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ

আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে নভোমণ্ডল বিনির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয় আমি (নিরন্তর) প্রসারণকারী। (যারিয়াত, ৫১ : ৪৭)

১৯৩৭ সালে রেডিও টেলিস্কোপের (দূরদর্শন যন্ত্রের) উন্নয়নের পরই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ডাটা-উপাত্ত প্রত্যক্ষ করা গেছে এবং তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রত্যক্ষণের বাইরে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা উপস্থাপন করেছেন, যাকে বলে ‘Hubbel  Control’ তত্ত্ব। যা সেই পরিমাণ সরবরাহ করে সম্প্রতি মহাবিশ্বের প্রসারণের মাত্রা অনুমানের জন্য যা ব্যবহৃত হয়েছে। এখন বিষয় এই নয় যে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণ হচ্ছে কি-না। বরং বিষয় হল, তা কী মাত্রায় সম্প্রসারিত হচ্ছে? মহাকাশ বিজ্ঞানীগণ এই ব্যাপ্তিকে বিশ বিলিয়ন আলোকবর্ষের একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পরিভাষায় ব্যক্ত করেছেন। রেডিও টেলিস্কোপ সম্প্রতি এই প্রমাণ সরবরাহ করেছে যে, এই মহাশূন্য প্রায় আলোর গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ ধরনের মহাকাশ বিজ্ঞানসংক্রান্ত সাম্প্রতিক জ্ঞান কিভাবে চৌদ্দশ বছর পূর্বের কুরআন মাজিদে বর্ণিত হতে পারে? তা এ কথাই প্রমাণ করে যে, কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত আসমানি গ্রন্থ।

মুজিজা-১৯
সপ্তস্তর বিশিষ্ট আসমান

তিনিই সে সত্তা (আল্লাহ) যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্যে যা কিছু রয়েছে জমিনে, তারপর তিনি মনসংযোগ করেছেন আকাশের প্রতি। বস্তুত তিনি তৈরি করেছেন সাত আসমান। আর তিনি সর্ববিষয়ে অবহিত। (বাকারা, ০২ : ২৯)
আর আমি তোমাদের ওপর সৃষ্টি করেছি সপ্তপথ। (মুমিনূন, ২৩ :১৭)

আর আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের ওপর মজবুত সপ্ত আকাশ। (নাবা, ৭৮ : ১২)

এই আয়াতগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রহস্য হয়েই থেকে গেছে। এমনকি এই বিজ্ঞানের যুগের মানুষদের কাছেও। সাম্প্রতিক সময়ে একজন তুর্কি মহাকাশ বিজ্ঞানী ডক্টর হালুক নূর বাকি মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে এই আয়াতগুলির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যে মহাশূন্য আমাদের পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তা নিম্নলিখিত সাতটি সমকেন্দ্রিক চৌম্বক স্তরে গঠিত।
১. মহাশূন্যের যে ক্ষেত্র সৌরজগত দ্বারা গঠিত তা প্রথম আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
২. সম্প্রতি ‘মিল্কিওয়ে’ বা আকাশগঙ্গার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আমাদের ছায়াপথের এই বিস্ততৃ ক্ষেত্রটি দ্বিতীয় আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
৩. ছায়াপথসমূহের দখড়পধষ ঈষঁংঃবৎদ মহাকাশীয় ক্ষেত্র তৃতীয় আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
৪. ছায়াপথসমূহের সমন্বয়ে গঠিত মহাবিশ্বের কেন্দ্রীয় চৌম্বক ক্ষেত্র চতুর্থ আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
৫.  অতি দূর থেকে আগত আলোকতরঙ্গের উৎসসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী মহাজাগতিক বলয় পঞ্চম আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
৬. মহাবিশ্বের প্রসারমান ক্ষেত্র ষষ্ঠ আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
৭.  মহাবিশ্বের প্রান্তহীন অসীমত্বের নির্দেশক সর্ববহিরস্থ ক্ষেত্র সপ্তম আসমানের প্রতিনিধিত্ব করে।
আসমানের এই স্তরসমূহ অকল্পনীয় স্থান জুড়ে আছে। প্রথম আসমান স্তরের পুড়ত্ব আনুমানিক ৬.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। দ্বিতীয় স্তর তথা আমাদের ছায়াপথের ব্যাস হল ১৩০ হাজার আলোকবর্ষ। তৃতীয় স্তরের বিস্তার ২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। চতুর্  স্তরের ব্যাস ১০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। পঞ্চম স্তরটি ১ বিলিয়ন আলোকবর্ষের দূরত্বে। ষষ্ঠ স্তরটি অবস্থিত ২০ বিলিয়ন আলোকবর্ষের দূরত্বে। একথা বলা বাহুল্য যে, সপ্তম স্তরটি বিস্ততৃ হয়ে আছে অসীম দূরত্ব পর্যন্ত সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা সেই আল্লাহ তাআলার জন্যে যিনি এই সুবৃহৎ ও অসীম মহাবিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। এই হল সেই সপ্তস্তর আসমান যার ঘোষণা দিয়েছে কুরআন মাজিদ আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে।
মুজিজা-২০
পৃথিবীর ক্রমবিকাশে চারটি ধাপ

আর তিনি পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দান করেছেন এবং চারদিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, তাদের জন্যে (তথ্যস্বরূপ) যারা জিজ্ঞাসা করে। (ফুসসিলাত, ৪১ : ১০)

বর্তমান বিজ্ঞানীগণ পৃথিবীর ইতিহাসকে নিম্নবর্ণিত প্রধান চারটি ভাগে বিভক্ত করেন-
১.  Pre-Cambrian যুগ : ৬০০ থেকে ৩৩০০ মিলিয়ন বছর। এই যুগে পৃথিবী তার আদি পিণ্ড থেকে বিকশিত হয় এবং একটি স্বতন্ত্র গ্রহের রূপ ধারন করে। জীবনের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যের মাধ্যমে এ যুগের সমাপ্তি ঘটে।
২.  Paleozoic  যুগ : ২৩০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন বছর। এই যুগে সর্বপ্রথম ভূমিজ লতা-পাতা, উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ দৃষ্টিগোচর হয়। এটি হল প্রাচীন প্রাণ যুগ।
৩.  Mesozoic যুগ : ৬৩ থেকে ২৩০ মিলিয়ন বছর। এটিকে মধ্যপ্রাণ যুগ বলে বিবেচনা করা হয়। মৌসুমী পরিবর্তনের সঙ্গে বৃক্ষ-লতা ভালভাবে খাপ খেয়ে গিয়েছিল। মেরুদণ্ডী প্রাণী, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিও এ যুগে গোচরীভূত হয়। আর ডাইনোসর ছিল প্রচুর।
৪.  Conozoic যুগ : বর্তমান সময় থেকে ৬৩ মিলিয়ন বছর। এই যুগ জীবনের বর্তমান ধাপকে অন্তর্ভুক্ত করে।
পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসকে এই চার ভাগে বিভাজন অবিন্যস্ত কিংবা বিশৃঙ্খল নয়, বরং তা করা হয়েছে দৈহিক গঠন প্রক্রিয়ার ক্রম-বিকাশের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে। এই যুগগুলি বিশ্ব বিস্ততৃ পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সার্বজনীনভাবে গৃহীত হয়েছে। এগুলি প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতের ক্রমোন্নতি এবং মহাদেশগুলির গতিপ্রবাহ, মহাসাগর ও পর্বতমালার রূপ পরিবর্তনের রেকর্ডেরও প্রতিনিধিত্ব করে। এটিই সম্ভবত সেই চার যুগ যা কুরআন মাজিদ বর্ণনা করে-
‘এবং তিনি (আলাহ) পৃথিবীর  উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন……….তাতে খাদ্যের সংস্থান করেছেন চারদিনের মধ্যে (চারটি সুষম সময়ের মধ্যে)।’
এখানে লক্ষণীয় যে, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের এই চারটি সময়কাল আকাশ, পৃথিবী ও পুরো মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয় সময়কাল থেকে ভিন্ন। সেগুলি অতীত হয়ে গেছে পাঁচ বিলিয়ন বছরেরও অধিককাল পূর্বে যেখানে মহাবিশ্বের বয়স বর্তমানে ১০ বিলিয়ন বছরেরও অধিক।

মুজিজা-২১
মহাশূন্য বিজয়

‘হে জিন ও মানবকুল, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের প্রান্ত অতিগম করা যদি তোমাদের সাধ্যে কুলোয় তবে অতিগম কর। তবে (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) ক্ষমতা ব্যতিরেকে তোমরা তা অতিগম করতে পারবে না। (রহমান, ৫৫ : ৩৩)

এই আয়াতের প্রকতৃ অনুবাদ বুঝার জন্যে কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় ‘যদি’ (ইংরেজিতে if ) শব্দটি এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে যা, হয়তো সম্ভব কিংবা অসম্ভব —। আরবি ভাষায় ‘যদি’ বুঝানোর জন্যে একাধিক শব্দ ব্যবহৃত হয়। যখন ‘লাও’ শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে যা অসম্ভব। আর যখন ‘ইন’ (نإ) শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে, যা সম্ভব। উপরিউক্ত আয়াতে কুরআন মাজিদ (نإ) ‘ইন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘লাও’ শব্দ ব্যবহার করে নি। অতএব কুরআন মাজিদ ইঙ্গিত করছে, এক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা বিদ্যমান রয়েছে যে, মানুষ একদিন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্তরসমূহ ভেদ করতে পারবে। আরও লক্ষণীয় যে, নিম্ন লিখিত আয়াতেও মহাশূন্য ভেদ করার কথা উল্লেখ করে। কিন্তু তাতে ‘লাও’ ব্যবহৃত হয়েছে-
‘আর যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোনো দরজাও খুলে দিই, আর তারা তাতে দিনভর আরোহনও করতে থাকে, তবুও তারা একথাই বলবে, আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে, না- বরং আমরা যাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’ (হিজর, ১৫ : ১৪-১৫)
এই আয়াতটিতে মক্কার কাফিরদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এমনকি যদি তারা নভোমণ্ডল ভেদ করতেও সক্ষম হয়, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীকে বিশ্বাস করবে না। এই আয়াতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে ‘লাও’ (   ) যা এমন সম্ভাবনার কথা বলে, যা বাস্তবায়িত হওয়ার নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, মক্কার কাফিররা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য মুজিজা প্রত্যক্ষ করেছে। তথাপি তারা তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে নি।
ইতোপূর্বে উদ্ধৃত আয়াত সম্পর্কে আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করার আছে। তাতে আরবি শব্দ ‘তানফুযু’ (او ) ব্যবহৃত হয়েছে, যার ক্রিয়ামূল হল ‘নাফাজা’ (  ) যার পরে আরবি শব্দ ‘মিন’ () এসেছে। আরবি অভিধান অনুসারে এই বাকরীতির অর্থ হল, ‘সোজা অতিক্রম করা এবং একটি বস্তুর একদিকে প্রবেশ করে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে আসা। অতএব এটি নির্দেশ করে একটি গভীর অনুগমন এবং একটি বস্তুর অপরপ্রান্ত দিয়ে নির্গমন। এটি হুবহু তা-ই, যে অভিজ্ঞতা বর্তমানে মহাশূন্য বিজয়ের ক্ষেত্রে মানুষ লাভ করেছে। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি একটি বস্তু ছেড়ে দেয় এবং তা মহাশূন্যে তার বাহিরে নির্গমন করে। এভাবে কুরআন মাজিদ মহাশূন্য বিজয়ের বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করেছে। অধিকন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিকতথ্য, সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দে, চৌদ্দশ বছরেরও পূর্বের এমন একজন নিরক্ষর মানুষের নিছক কল্পনা বলে আরোপিত হতে পারে না, যিনি তার পুরো জীবন কাটিয়েছেন একটি মরুময় এলাকায়।

মুজিজা-২২
পৃথিবীর ডিম্বাকার কিংবা বর্তুলাকার আকৃতি

‘অতঃপর তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে দান করেছেন ডিম্বাকৃতি (নাজিয়াত, ৭৯ : ৩০)

এই আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘দাহাহা’ ‘     ‘। পুরনো অনুবাদগুলিতে এই আয়াতের অর্থ  রয়েছে- ‘অতঃপর তিনি পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছেন।’ যেহেতু তারা পৃথিবীর আকৃতি-প্রকতিৃ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না তাই তারা দাহাহা (     ) শব্দটিকে ‘দাহবুন’ (    ) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন এবং তার অর্থ  করেছিলেন ‘প্রসারিত করা বা বিছিয়ে দেওয়া।’ ‘দাহা’ শব্দের প্রকতৃ অর্থ ‘উটের ডিম’। নিম্নে তার কিছু সাধিত শব্দ দেওয়া হল-
=   আল-উদহিয়্যু (     ) ! উটপাখির ডিম।
=   আল-উদহুয়্যাতু (      ) ! উটপাখির ডিমের স্থান।
=   তাদাহহিয়ান (    ) : গর্তের মধ্যে একটি পাথর পতিত হওয়া।
আয়াতটি এভাবে পৃথিবীর গোলাকতিৃ হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণের ব্যাসের তুলনায় নিরক্ষীয় ব্যাসের আপেক্ষিক পার্থক্য এটিকে একটি বর্তুল আকৃতি কিংবা ডিম্ব আকৃতি দান করেছে। আরও পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীর প্রকতৃ আকৃতি গঠনে এই আকৃতিটি কিছুটা বিকতৃ হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘ Geoid’, যা একটি নাশপাতির অনুরূপ। পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ্য হল ৬৩৭৮ কিলোমিটার, যেখানে তার মেরু অঞ্চলীয় ব্যাসার্ধ্য হল ৬৩৫৬ কিলোমিটার।
এই আয়াত থেকে একথাও বুঝা যায়, আদিকালে পৃথিবী এই আকৃতির ছিল না। পরবর্তীতেই এই আকৃতি প্রাপ্ত হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানে পৃথিবীর বর্তমান আকার সম্পর্কে দুটি মতবাদ রয়েছে। প্রথম মতানুসারে, পৃথিবী ছিল সূর্য থেকে ছিটকে পড়া একটি টুকরো। দ্বিতীয় মতানুসারে, সূর্য ও পৃথিবী উভয়টিই একটি নীহারিকা থেকে গঠিত হয়েছে। উভয় মতই স্বীকার করে, প্রথম যখন পৃথিবী সৃষ্টি হয় তখন তার বর্তমান আকার ছিল না। পরবর্তী সময়েই এটি ডিম্বাকার লাভ করেছে। এই আয়াতটি উভয় মতের সঙ্গে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই আয়াতের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি সুরা ‘আন নাযিয়াত’-এরই একটি অংশ, যাকে ‘ Extractors’ বা উৎপাটনকারীগণ শব্দে ভাষান্তরিত করা যেতে পারে। এই সুরায় সৃষ্টি সম্পর্কিত আরো কিছু রহস্য বর্ণিত হয়েছে। ২৮ থেকে ৩২ নং আয়াত পর্যন্ত আছে পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত তথ্য।
৩১ নং আয়াতে আছে, ‘আর তিনি তা থেকে নির্গত করেছেন পানি ও চারণভূমি।’ অন্য কথায়, এই আয়াত বলে, পৃথিবী তার ডিম্ব আকৃতি লাভ করার পর তাতে পানি প্রদান করা হয়েছিল। ফলে তা পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর উদ্ভিদ যেমন- তণৃ বা ঘাস উৎপন্ন করেছিল। আধুনিককালের ভূতত্ত্ববিদরাও এখন এ কথা বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী বর্তুলাকতিৃ লাভ করার পর বারিমণ্ডল গঠিত  হয়। সৃষ্টি হয় সাগর-মহাসাগর। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উদ্ভিদরাজি উদ্গত হয়।
৩২ নং আয়াতে আছে, ‘আর পর্বতমালা, তিনি স্থাপন করেছেন সুদৃঢ়ভাবে।’ মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে ক্রম পর্যায় কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে ভূবিদ্যাসংক্রান্ত অধুনা ধারণাসমূহ তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

মুজিজা নং– ২৩
বিচার দিবসে পৃথিবীর স্বরূপ

যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এই পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহকে (অনুরূপভাবে) এবং লোকেরা একক, পরাগমশালী আল্লাহর সামনে পেশ হবে। (ইবরাহিম, ১৪ : ১৮)

যখন পৃথিবী (-এর আকৃতি) সম্প্রসারিত করা হবে এবং তা নিক্ষেপ করবে তার গর্ভস্থিত সবকিছু আর তা হয়ে যাবে শূন্যগর্ভ। (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ০৩-০৪)

প্রথম আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘মুদ্দাত’ (    ) যার অর্থ  করা যেতে পারে : প্রসারিত, সমতল বা চ্যাপ্টাকৃত কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চওড়াকৃত এই আয়াত বলে, বিচার দিবসে পৃথিবী হয়ে যাবে সমতল। অন্য কথায় এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, বর্তমানে পৃথিবী সমতল অবস্থায় নেই। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল হতে পারে ৬০৯ থেকে ৬২২ ঈসায়ি সালের মধ্যে। সে সময় একথা সার্বজনীনভাবে বিশ্বাস করা হত যে, পৃথিবী সমতল। প্রায় এক হাজার বছর পর পঞ্চদশ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস এই তথ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন যে, পৃথিবী আমাদের গ্রহজগতের কেন্দ্রবিন্দু নয়। পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি কোপার্নিকাসের তথ্যকে সমর্থন করে ঘোষণা দেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে পরিভ্রমণ করে এবং তা সমতল নয়; বরং গোলাকার। কুরআন মাজিদে এই বাস্তবতা অবতীর্ণ হয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। পৃথিবী তার গোলাকতিরৃ কারণে, কখনো তার সমগ্র অংশে একই সময়ে দিন হয় না। তার যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে তাতে দিন হয় এবং তার বিপরীত অংশে হয় রাত। পক্ষান্তরে, বিচার দিবসে একই সময়ে সারা পৃথিবীতে দিন থাকবে। এটি তখনই সম্ভব যখন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার থেকে সমতলে পরিবর্তিত হবে। এটা হুবহু তা-ই যা উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কুরআন রচনা করে থাকেন, তবে তিনি কিভাবে এ ধরনের জটিল প্রাকৃতিক রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হলেন?

মুজিজা নং– ২৪
ভূমির সংকোচন

তারা কি দেখে না যে, আমি ভূভাগকে তার প্রান্তসীমা থেকে গমাšয়ে সংকোচিত করে আসছি? আল্লাহ নির্দেশ দেন। তার নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (রা’দ, ১৩ : ৪১)

যেমনটি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পূর্ব যুগের মুসলমানরা এই আয়াতটিকে কুরআন মাজিদের একটি রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যতদিন তাদের যথাযথ জ্ঞান ছিল না, তারা এই আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে চেষ্টা করে নি। অধুনা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আজ আমাদেরকে এই আয়াতের অর্থ অনুধাবন করতে ও ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম করেছে।
এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মেরু অঞ্চলে জমাট বরফের স্তুপগুলি গলতে শুরু করেছে এবং সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা পর্যায়ক্রমে আরও ভূভাগকে ঢেকে ফেলছে। আয়াতে উল্লিখিত প্রান্তসীমা হল সমুদ্র উপকুলসমূহ। মেরু অঞ্চলের গলিত বরফের ফলে যতই সমুদ্রের উপকুল পানির নিচে তলিয়ে যাবে, ততই ভূভাগ বা পৃথিবী সংকোচিত হয়ে পড়বে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীরা চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরব উপদ্বীপের মত একটি মরুভূমিতে বসে এই বিস্ময়কর তথ্য নিশ্চয় কল্পনা করতে সক্ষম ছিলেন না।

মুজিজা নং– ২৫
ভূ-গর্ভস্থ তৈলসম্পদের গঠন

আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের মহিমা বর্ণনা করুন। যিনি সৃষ্টি করেছেন (সবকিছু) এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন ও পথ প্রদর্শন করেছেন। আর যিনি উৎপন্ন করেছেন তণৃ-লতা। অতঃপর তাকে পরিণত করেছেন কাল ‘গুছা’। (আল-আলাক, ৮৭ : ০১-০৫)

অধিকাংশ অনুবাদের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘গুছা’       -এর জন্যে খড়কুটা বা আবর্জনা (ইংরেজিতে  stubble) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যে ব্যক্তি ভূতত্ত্ববিদ্যা সম্পর্কে ধারণা রাখে, সত্বরই সে জানতে পারবে, এই আয়াতটি তৈলজাত সম্পদ গঠনের রহস্যের বর্ণনা দেয়। তূতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম উদ্ভিদ ছিল প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও সামুদ্রিক শৈবাল। যদি এ সকল তৃণশ্রেনী যেমনটি ছিল তেমনটি বিদ্যমান থাকত, তবে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যেত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলে আগুন ধরে যেত। উল্লিখিত আয়াতটি এ কথারই ব্যাখ্যা প্রদান করে : ‘আপনার পালনকর্তা প্রত্যেক বস্তুকে তৈরি করেছেন সুপরিমিতভাবে।’ এভাবে প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও শৈবালদাম পরবর্তীতে প্রবল ভূতাত্ত্বিক আলোড়নের মাধ্যমে মাটির নিচে চলে যায় এবং বিশেষ রাসায়নিক লঘুকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেলে পরিণত হয়।
বর্তমানে এটা জ্ঞাত বিষয় যে, তৈলজাত খনিজ পদাথগুর্লি প্রধানত গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন জাতের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ সকল পর্ণাঙ্গ ও শৈবালের বিগলন ও পচনের মাধ্যমে, যা শিলাস্তরের ফাঁকে আটকে পড়ে। বর্তমানে একথাও আমাদের অজানা নয় যে, তৈলজাত পদার্থ কষ্ণৃ তরল পদার্থের রূপে ভূগর্ভস্থ নদীতে প্রবাহিত হয়। এই ভূ-অভ্যন্তরীন প্রবাহকে বর্ণনা করার জন্যে ‘বন্যার পানি’ই সবচেয়ে পরিষ্কার অভিব্যক্তি। এ কারণে এই আয়াত তৈলনদীর প্রবাহেরও বর্ণনা দেয়, যাকে ভূতত্ত্ববিদ্যার পরিভাষায় ‘oil migration’ বলা হয়।

মুজিজা নং– ২৬
বৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের জাগরণ

আর (আল্লাহ) যিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিত পরিমাণে। অতঃপর আমি (আল্লাহ) তা দ্বারা পুনরুজ্জীবিত করি মৃত ভূভাগকে। তেমনিভাবেই তোমরা উত্থিত হবে। (যুখরুফ, ৪৩ : ১১)

আর আমি তৈরি করেছি পানি থেকে প্রাণবন্ত সবকিছুকে। এরপরেও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? (আম্বিয়া, ২১ : ৩০)

সজীব বস্তুর মৌলিক রাসায়নিক উপাদান হল হাইড্রোজেনের সেতুবন্ধন, যাকে বলা হয় ‘হাইড্রোজেন বন্ড’। এই হাইড্রোজেন কেবল পানির আয়োনাইজেশানের মাধ্যমেই প্রতিস্থাপিত হতে পারে। এ কারণেই প্রাণের জন্যে পানি অপরিহার্য। একটি পানিশূন্য বস্তু জমাট কঙ্কালের মত, যদিও তা তার জেনেটিক কোডসহ   DNA সংরক্ষণ করে থাকে। এটি প্রয়োজন পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করা ব্যতীত না পুনরুৎপাদন করতে পারে, আর না পারে ক্রিয়াশীল হতে। যখন পানি পৌঁছে এবং হাইড্রোজেন-আয়ন প্রদান করে, তখন প্রাণের জেনেটিক কোড সক্রিয় হয়। এটি ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে অতি সাধারণ ঘটনা। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে এ তথ্য আবিষ্কৃত হয় যে, বিভিন্ন ধরনের প্রাণ সত্তা দ্বারা মাটি গঠিত। প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে আবিষ্কৃত হয়, মাটির ৮০ ভাগ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা গঠিত। তারা বৃষ্টির পানি পাওয়া মাত্রই প্রয়োজন পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন পুনরুৎপাদনশীল কর্মতৎপরতা শুরু করে। বৃষ্টির পানি এভাবে মৃত ভূমিতে পুনরুজ্জীবন নিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে কুরআন মাজিদ তার বর্ণনা দিয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। ধারণা করা হয়, আদম আলাইহিস সালাম থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় দশ বিলিয়ন মানুষ বসবাস করেছে। প্রত্যেক ব্যক্তির জেনেটিক কোডের আকার প্রায় এক মাইক্রন (এক মিলিমিটারের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ)। যদি আমরা তাদের সকলের জেনেটিক কোড সংগ্রহ করি, তবে তাতে একটি চায়ের পেয়ালাও পূর্ণ হবে না। এসব জেনেটিক কোড এখনও মাটির নিচে সংরক্ষিত আছে। এটি তেমনি সুনিশ্চিত যে, যখন আল্লাহ তাআলা এক ছিটা বৃষ্টির ফোটায় মৃত ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন, তেমনি তাঁর ক্ষমতা রয়েছে জেনেটিক কোডসমূহকে সাধারণ হাইড্রোজেন বন্ডের যোগান দেয়া। তখন কিয়ামত দিবসে সকল মানুষ জেগে ওঠবে। কুরআন মাজিদ তারই বর্ণনা প্রদান করে, ‘তেমনিভাবেই তোমরা পুনরুত্থিত হবে।’

মুজিজা নং– ২৭
পর্বতমালার গঠন-কাঠামো ও ভূমিকা

তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমানসমূহ কোনো খুঁটি ব্যতীত, যা তোমরা দেখছ। আর তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা, পাছে যেন তা তোমাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে। (লোকমান, ৩১ : ১০)

আমি কি করিনি ভূমিকে বিছানা এবং পর্বতমালাকে পেরেক? আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়। (নাবা, ৭৮ : ৬-৮)

সম্প্রতি ভূতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেছেন, গাছের শিকড়ের মত পর্বতমালার সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে, যা মাটির সুগভীর পর্যন্ত প্রোথিত। অধিকন্তু তা পৃথিবীর স্থিতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছে তা হল ‘আওতাদ’ (اد وأ)। আব্দুলাহ− ইউসুফ আলী এবং ড. মুহসিন খান ইংরেজিতে তার অনুবাদ করেছেন, Peg ইংরেজি অভিধানগুলি Peg শব্দের অর্থ করতে গিয়ে লিখে- A pin or a nail that is used to bold something or to fasten part of a thing together. (একটি পিন কিংবা পেরেক যা কোনো কিছু ধরে রাখতে বা একটি বস্তুর দুটি অংশকে দৃঢ়ভাবে একত্রে আটকানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়)। এই আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ তাআলা পর্বতমালাকে করেছেন সুবৃহৎ পেরেক সদৃশ, যা মাটির সুগভীরে প্রোথিত এবং এসবের কাজ হল পৃথিবীর স্থিতি প্রতিষ্ঠা করা। এটি হুবহু তা-ই, যা বর্তমানে ভূতত্ত্ববিদরা পর্বতমালার গঠনপ্রকতিৃ ও তার ভূমিকা সম্পর্কে আবিষ্কার করেছেন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, আরব উপদ্বীপে কোনো সুবৃহৎ পর্বত নেই। অধিকন্তু তার অধিকাংশ পর্বতই বালিময়, শিলাবিশিষ্ট নয়। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তিনি আর কে হতে পারেন, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর কুরআন মাজিদে এই তথ্য অবতীর্ণ করেছেন?

মুজিজা নং– ২৮
আলোর একমাত্র উৎস হিসেবে সূর্য

আর আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের ওপর সুদৃঢ় সপ্ত (আকাশ) এবং স্থাপন করেছি (তন্মধ্যে) একটি উজ্জ্বল প্রদীপ। (নাবা, ৭৮ : ১২-১৩)

তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে এবং তন্মধ্যে চন্দ্রকে স্থাপন করেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে। (নূহ, ৭১ : ১৫-১৬)

এই আয়াতগুলিতে কুরআন মাজিদ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা দেয় যে, আমাদের সৌরজগতের জন্যে সূর্যই একমাত্র আলোর উৎস। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, চন্দ্র আলোর উৎস নয়, বরং সূর্যের আলোর প্রতিফলন মাত্র। কুরআন মাজিদ এই সত্যের বর্ণনা দিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার মাধ্যমে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা নং– ২৯
চন্দ্র ও সূর্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রকতিৃ

তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি সূর্যকে বানিয়েছেন একটি জ্যোতিষ্ক এবং চন্দ্রকে আলোকরূপে। আর নির্ধারণ করেছেন তার জন্য মনজিলসমূহ। যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা ও (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ তা সৃষ্টি করেন না, তবে যথার্থভাবে। তিনি (এভাবে) বিবৃত করেন (তাঁর) নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে, সেসব লোকের জন্যে যারা অনুধাবন করে। (ইউনূস, ১০ : ০৫)

শপথ, সূর্যের এবং তার কিরণের। শপথ, চন্দ্রের যখন তাকে প্রতিফলিত করে। (শামস, ৯১ : ১২)

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, বাইবেল চন্দ্র ও সূর্যকে সব সময় সমজাতীয় শব্দে উল্লেখ করেছে। যথা Light  (বাতি)। এটি সূর্যের আগে greater (বৃহত্তর) বিশেষণ যোগ করে এবং চন্দ্রের আগে Lower  (ক্ষুদ্রতর)। তাতে আছে, ‘বৃহত্তর বাতি দিন নিয়ে আসে এবং ক্ষুদ্রতর বাতি নিয়ে আসে রাত।’ (জেনেসিস, ১ : ১৭)
যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদ বাইবেল থেকে নকল করতেন, যেমনটি কিছু খৃস্টান অপবাদ দিয়ে থাকে, তিনিও সূর্য ও চন্দ্রের জন্য একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতেন। যাহোক, কুরআন মাজিদ এই সূর্য ও চন্দ্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছে। একটিকে বলা হয়েছে, ‘নূর’ (আলো), যা চন্দ্রকে নির্দেশ করে। অন্যটিকে বলা হয়েছে ‘জিয়া’ (জ্যোতিষ্ক), যা নির্দেশ করে সূর্যকে। এভাবে কুরআন মাজিদ এ কথার স্বীকতিৃ দিয়েছে যে, সূর্য হল আলোর উৎস এবং চন্দ্র কেবল তার আলোকেই প্রতিফলিত করে। বিজ্ঞানীরা এই সত্যকে আবিষ্কার করেছে মহাকাশ বিজ্ঞানের জ্ঞান-ভাণ্ডারের উৎকর্ষ সাধনের পর। অথচ কুরআন মাজিদ এই বর্ণনা প্রদান করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা নং– ৩০
তাপের একমাত্র উৎসরূপে সূর্য

কল্যাণময় তিনি, যিনি নভোমণ্ডলে সৃষ্টি করেছেন নক্ষত্রপুঞ্জ এবং তাতে স্থাপন করেছে সূর্য ও দীপ্তিময় চন্দ্র। (ফুরকান, ২৫ : ৬১)

তোমরা কি দেখতে পাও না কীভাবে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আসমান, একটির ওপর আরেকটি এবং তাতে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোকরূপে এবং সূর্যকে প্রদীপরূপে। (নূহ, ৭১ : ১৫-১৬)

কুরআন মাজিদের প্রতিটি শব্দেরই রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ। প্রয়োজন আমাদের সতর্ক মনোযোগ। সূর্য ও চন্দ্রের জন্য দু’টি ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করার পাশাপাশি-যেমনটি ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে- কুরআন মাজিদে একটি বিশেষ পারিভাষিক শব্দ ‘মিসবাহ’ ও ব্যবহৃত হয়েছে, যার ভাষান্তর করা হয়েছে Lamp বা প্রদীপ শব্দের মাধ্যমে। জেনে রাখা উচিত, কুরআন মাজিদ শব্দটি ব্যবহার করেছে কেবল সূর্যের জন্যে, চন্দ্রের জন্যে নয়। আমাদের জানা মতে, একটি Lamp বা প্রদীপ, যার থাকে কিছু জ্বালানি, যা জ্বলে এবং আলোর পাশাপাশি তাপ প্রদান করে। কুরআন মাজিদ এভাবে বর্ণনা করে যে, সূর্য কেবল আলোরই উৎস নয়, বরং তাপেরও একটি উৎস। আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি মাত্রেই লক্ষ্য করবেন, সুরা বাকারার (২য় সুরা) ১৭ নং আয়াতে আগুন থেকে নির্গত আলোর বর্ণনা দেয়ার জন্যে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হল ‘আজাআত’ (      ) , তা ঠিক একই ধাতু বা ক্রিয়ামূল থেকে নির্গত হয়েছে, সূর্যের আলোর বর্ণনা দেয়ার জন্যে যে ‘জিয়া’ (     ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা যেখান থেকে উৎকলতি হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, সূর্য থেকে যে আলোক-রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় তা আলো ও তাপ উভয়ই ধারণ করে। পক্ষান্তরে চন্দ্র থেকে যে রশ্মি (নূর) আসে তা কেবল আলোই ধারন করে। কুরআন মাজিদের এই বিস্ময়কর শব্দ নির্বাচন দেখে যে কাউকে পুনর্বার বিস্মিত হতে হবে।

মুজিজা নং– ৩১
সূর্যের গতি

সূর্য তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে। এটা পরাগমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। (ইয়াসিন, ৩৬ : ৩৮)

নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যের আবর্তন, যেমনটি উপরের আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে- বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। আমাদের ছায়াপথ একটি থালার আকতিতেৃ বহু সংখ্যক নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে গঠিত। এই ছায়াপথে সেই থালার কেন্দ্র থেকে দূরে সূর্য একটি অবস্থান দখল করে আছে। ছায়াপথটি তার আপন অক্ষরেখার ওপর পরিক্রমণ করে, যা তার কেন্দ্র। ফলে তা সূর্যকে একই কেন্দ্রের চারপাশে একটি বৃত্তাকার কক্ষপথে আবর্তিত করে। ছায়াপথটি তার আপন অক্ষরেখায় তার আবর্তন শেষ করতে সময় নেয় ২৫০ মিলিয়ন বছর। সূর্য, এই আবর্তন সম্পন্ন করার প্রাক্কালে প্রতি সেকেন্ডে মোটামুটিভাবে ১৫০ মাইল বেগে পরিভ্রমণ করে। এটি সূর্যের নির্দিষ্ট গতিপথ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে- এতে কোনো সন্দেহ নেই যেমনটি কুরআন মাজিদের এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এটি সুনিশ্চিত যে, না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর, আর না যারা তার চারপাশে ছিলেন তাদের কাছে সূর্যের পরিভ্রমণের এই সুনির্দিষ্ট জ্ঞান ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই তথ্যটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে মানুষ তা আবিষ্কার করারও বহু পূর্বে। যা এ কথার অন্য একটি সাক্ষ্য যে, সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলাই এই জ্ঞানের উৎস।

মুজিজা নং– ৩২
সূর্যের ভিন্ন ভিন্ন উদয়াচল ও অস্তাচল

তিনিই অধিপতি দুটি উদয়াচল ও দুটি অস্তাচলের। (রহমান, ৫৬ : ১৭)

নিশ্চয় তোমাদের মাবুদ এক। আসমানসমূহ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা এবং পালনকর্তা উদয়াচলসমূহের। (সাফফাত, ৩৭ : ০৫)

আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলসমূহের পালনকর্তার। (মাআরিজ, ৭০ : ৪০)

কুরআন মাজিদের উদ্ধৃত প্রথম আয়াত সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আব্দুলাহ− ইউসুফ আলি বলেন, দু’টি উদয়াচল হল সারা বছর সূর্য উদয়ের দু’টি প্রান্ত সীমা। অনুরূপভাবে দু’টি অস্তাচল হল সূর্যাস্তের দু’টি চূড়ান্ত সীমা। কুরআন মাজিদের এই সুরায় উল্লিখিত দ্বৈত সংখ্যার সঙ্গে দ্বৈততার সাধারণ আবহ সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্য দুইটি আয়াত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থান নির্দেশ করে। বিষুবরেখা থেকে কোনো ব্যক্তি যতই দূরে বসবাস করবে তার কাছে সূর্যের উদয়াচল ও অস্তাচলগুলি ততই সুস্পষ্ট হবে। উল্লেখ্য যে, আরব উপদ্বীপ বিষুবরেখা থেকে ততদূরে অবস্থিত নয়, তাই এই বিভিন্নতার রহস্যটি সেখানে সহজে নির্ণয় করা যায় না। এ কথা বলাবাহুল্য যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদয়াচল ও অস্তাচলের এই বিভিন্নতা প্রত্যক্ষ করেন নি। তবে কুরআন মাজিদে এই সার্বজনীন বিস্ময়ের সত্যতা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

মুজিজা নং– ৩৩
সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথে পরিভ্রমণ

তিনিই (আল্লাহ তাআলা) সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই (নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। (আম্বিয়া, ২১ : ৩৩)

সূর্যের জন্যে অনুমতি নেই যে তা চন্দ্রকে অতিগম করে যাবে। আর না রাত আগে চলে দিনের। তারা প্রত্যেকেই (নিজ নিজ) কক্ষপথে সন্তরণ করে। (ইয়াসিন, ৩৬ : ৪০)

এসব আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ফালাক ( )। কুরআনের অধিকাংশ অনুবাদক এই শব্দের অনুবাদ করেছেন ‘কক্ষপথ’ (ইংরেজিতে Orbit)। স্মর্তব্য যে, মহাশূন্যে অবস্থানরত বস্তুসমূহ সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত হয়েছে টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কল্যাণে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবদের কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না। তথাপি একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা, সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথে পরিভ্রমণ, যা কি-না কুরআন মাজিদে বিদ্যমান রয়েছে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মুজিজা যে, তা গ্রহ-নক্ষত্রের বৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছে, মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় তা আবিষ্কার করার বহু পূর্বে।

মুজিজা নং– ৩৪
সন্তরণের ভঙ্গিতে গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ

উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথীয় পরিভ্রমণের বর্ণনা দিতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘সাবাহা’ (صباح)। আরবিতে তা এমন গতিকে নির্দেশ করে যা নিজে নিজে হয়ে থাকে। অধিকাংশ কুরআনের অনুবাদক তার অনুবাদ করেছেন সাঁতার কাটা (ইংরেজিতে Swimming )। সূর্য ও চন্দ্রের এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতির এই ধারণাটি সাম্প্রতিক মহাকাশ বিজ্ঞানের তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা অভাবনীয় যে, একজন আরবি ব্যক্তি শত শত বছর আগে, বিশ্বের সবচে পশ্চাৎপদ অংশে বসে বিশ্বস্রষ্টার কাছে থেকে কোনো আসমানি নির্দেশনা ছাড়া গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণের বর্ণনার ক্ষেত্রে ‘صباح ‘ -এর মত এমন একটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে পারেন।

মুজিজা নং– ৩৫আবিষ্কার
সূর্য ও চন্দ্রের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ

ইতোপূর্বে উল্লিখিত আয়াতসমূহে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করেছে যে, সূর্য ও চন্দ্র পরিভ্রমণরত অবস্থায় রয়েছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, যদি এই পরিভ্রমণ চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হত তবে কুরআন মাজিদ তার বর্ণনা এই বলে দিত যে, ‘উভয়েই ঘূর্ণায়মান’। পক্ষান্তরে, এক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ যে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছে তা হল ‘কুল্লুন’ (كل) ।  যার অর্থ, সকলেই ঘূর্ণায়মান।
পূর্বেকার তাফসিরবিদগণ এই ‘কুল্লুন’ শব্দের অর্থ পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারেন নি। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, মহাবিশ্বে সূর্য ও চন্দ্রের পাশে আরো কিছু গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে। এবং সেসব গ্রহ-উপগ্রহ পরিভ্রমণ অবস্থায় রয়েছে। কুরআন মাজিদ এই সত্যের স্বীকতিৃ দিয়েছে বহু বছর পূর্বে। আরো লক্ষণীয় বিষয় হল, প্রত্যেক বস্তুই স্ব-স্ব কক্ষপথে সন্তরণ করে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় এও জানা যায়, কেবল গ্রহ-নক্ষত্রগুলিই নয় বরং তাদের কক্ষপথগুলিও সন্তরণ করে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তিনি আর কে হতে পারেন যিনি এমন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান কুরআন মাজিদে সরবরাহ করেছেন?

মুজিজা নং– ৩৬আবিষ্কার
অন্যান্য গ্রহের জন্য চন্দ্র ও সূর্য

তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকে (মহাকাশীয় বস্তুসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণশীল। (আম্বিয়া, ২১ : ৩৩)

তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও না; আলাহকে− সিজদা কর যিনি এগুলি সৃষ্টি করেছেন। (ফুসসিলাত, ৪১ : ৩৭)

তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন, একটির ওপর একটি এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন (উজ্জ্বল) প্রদীপরূপে। (নূহ, ৭১ : ১৫-১৬)

ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণে দু’ধরনের সর্বনাম ও ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়- একবচন ও বহুবচন। পক্ষান্তরে আরবি ব্যাকরণে একটি তৃতীয় রূপের সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়, যা কেবল ‘দুই’ নির্দেশ করে। এই দ্বি-বচনের রূপটি বহুবচনের রূপ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (বহুবচন) যা ব্যবহৃত হয় দুইয়ের অধিক সংখ্যা নির্দেশ করার জন্যে। যারা আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত তারা স্বীকার করবেন যে, উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের জন্য যে ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদ ব্যবহৃত হয়েছে তা দ্বিবচনের রূপ নয়, বরং বহুবচনের রূপ। কুরআন মাজিদ এভাবে ইঙ্গিত করে যে, মহাকাশে সূর্য ও চন্দ্রের সংখ্যা কেবল দু’টি নয়, বরং অনেক। মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে, এমন অনেক গ্রহ রয়েছে যাদের আছে একাধিক চন্দ্র (উপগ্রহ)। এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মহাকাশে আরো অনেক গ্রহজগত রয়েছে। এবং এ সকল জগতেও তাদের নিজস্ব সূর্য ও চন্দ্র রয়েছে। এটি কুরআন মাজিদের আরো একটি মুজিজা যে, তা সূর্য ও চন্দ্রের গতি বর্ণনার জন্যে সর্বনাম ও ক্রিয়ার ক্ষেত্রে দ্বিবচনের শব্দ ব্যবহার করে নি। বরং বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রকৃতির সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও গবেষণা যার সাক্ষ্য বহন করে।

মুজিজা নং– ৩৭আবিষ্কার
পৃথিবীর বার্ষিক গতি

তুমি পর্বতমালাকে দেখে অবিচল মনে কর, অথচ এগুলি চলে মেঘমালার মত। এটা আল্লাহর কারিগরী। যিনি সবকিছুকে করেছেন সুসংহত। (নাহাল, ২৭ : ৮৮)

কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি মেঘমালার মত পর্বতমালার গতির উল্লেখের মাধ্যমে বর্ণনা দেয় যে, পৃথিবী নিজেও ঘুরে। কথিত আছে, পৃথিবী তার বর্তমান রূপ ও অবস্থা লাভ করেছে আনুমানিক পাঁচ বিলিয়ন বছর পূর্বে। যখন মাহবিশ্বের বয়স ছিল ১০ বিলিয়ন বছর। এর ব্যাস ৮,০০০ মাইল এবং তা সূর্য থেকে ৯৩ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত। এখন এটা প্রমাণিত যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয়। বিজ্ঞানীরা এই আবর্তনের গতিও হিসেব করেছেন। পৃথিবী চন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয় ঘণ্টায় ৬,০০০ মাইল বেগে এবং সূর্যের চারদিকে একটি আবর্তন সমাপ্ত করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা, ৪৬ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড। এবং বছরে বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তন ঘটায়। যখন কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়, তখন বিশ্বাস করা হত, সূর্যই ঘোরে, পৃথিবী স্থির। ষষ্ঠ শতাব্দীতে কোপানির্কাসই প্রথম বলেন, পৃথিবীও ঘোরে। অথচ কুরআন মাজিদে এই সত্য অবতীর্ণ হয়েছে বিজ্ঞানযুগের অনেক পূর্বে।

মুজিজা নং– ৩৮আবিষ্কার
পৃথিবীর আহ্নিক গতি

তিনি রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। প্রত্যেকটি একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। (আরাফ, ০৭ : ৫১)

তিনিই (আল্লাহ) রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। নিশ্চয় যে কওম চিন্তা- ভাবনা করে তাদের জন্য এতে নিদর্শনাবলি রয়েছে। (রা’দ, ১৩ : ০৩)

আর রাত তাদের জন্য একটি নিদর্শন। আমি তা থেকে দিনকে সরিয়ে নেই, ফলে তখনই তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। (ইয়াসিন, ৩৬ : ৩৭)

তিনি রাতকে দিনের ওপর এবং দিনকে রাতের ওপর জড়িয়ে দিয়েছেন। (ফাতির, ৩৯ : ০৫)

মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এখন জানেন, পৃথিবীর দু’ধরনের গতি রয়েছে। একটি হল সূর্যের চারদিকে তার বার্ষিক গতি, যা জলবায়ু ও ঋতুর পরিবর্তন ঘটায়। অন্যটি হল আপন অক্ষে তার আহ্নিক গতি, যা দিন-রাতের পবির্তন ঘটায়। কুরআন মাজিদ এই উভয় গতিকে স্বতন্ত্র ও পৃথকভাবে উল্লেখ করেছে। সুরা ‘নাম্ল’ এর ৮৮তম আয়াত, যা ইতোপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, পৃথিবীর বার্ষিক গতি নির্দেশ করে। উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ দিন-রাতের পরিবর্তনের বর্ণনা দেয়। এভাবে এই আয়াতগুলো পৃথিবীর তার অক্ষ বরাবর আহ্নিক গতির নির্দেশ করে। পৃথিবীর অক্ষ তার সমতল কক্ষপথের দিকে ২৩.৫ ডিগ্রি হেলানো। এই পরিবর্তনের ফলে যখন পৃথিবীর অর্ধেক অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, অন্য অংশ থাকে অন্ধকারে। এটি ২৪ ঘন্টার আবর্তনে দিন-রাতের পরিবর্তন নিয়ে আসে। এমন বাস্তব ঘটনায়-যেমনটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে- তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা চিন্তা-ভাবনা করে। অতএব এই বাণীর আলোকে প্রত্যেকের চিন্তা-ভাবনা করে দেখা উচিত যে, কুরআন মাজিদ কি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংকলিত, না সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

মুজিজা নং– ৩৯আবিষ্কার
নক্ষত্রসমূহের প্রকৃতি

আর আমি (আল্লাহ) নিকটবর্তী আসমানকে সুসজ্জিত করেছি ‘মাসাবিহ’ (প্রদীপমালা) দিয়ে। (ফুসসিলাত, ৪১ : ১২, মূলক, ৬৭ : ০৫)

কুরআন মাজিদ মানুষকে আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহে চিন্তা-ভাবনা করার দাওয়াত দেয়। উল্লিখিত আয়াতসমূহ নক্ষত্ররাজিকে একটি বিশেষ পারিভাষিক শব্দ ‘মাসাবিহ’-এর মাধ্যমে নির্দেশ করছে। যার অর্থ ‘প্রদীপসমূহ’। এ ক্ষেত্রে চিন্তা করে দেখা উচিত, এটা কি নক্ষত্ররাজির  কেবল এক বাহ্যিক বর্ণনা নাকি কুরআন মাজিদ আমাদেরকে নক্ষত্রসমূহের আনবিক ও রাসায়নিক প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে? মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উন্নয়ন, বিশেষত বিগত দুই দশকের অগ্রগতি দেখিয়েছে যে, নক্ষত্রগুলিতে এক ধরনের জ্বালানি জ্বলে আলো ও তাপ বিকিরণ করে, যেমনটি হয়ে থাকে একটি প্রদীপে।
এটা এখন জ্ঞাত বিষয় যে, নক্ষত্রগুলো অসংখ্য অণুর সমন্বয়ে গঠিত। এই অণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেক্ট্রনগুলো আবর্তিত হয়। ফলে নক্ষত্রগুলির রয়েছে একটি নির্দিষ্ট Volume আরও আছে বিচ্ছুরিত আলো ও শক্তি। একটি নক্ষত্রের মৃত্যু মানে তার সেই আলোর শক্তি নিঃশেষিত হওয়া, যা তার Volume নিয়ন্ত্রণ করে। মহাকাশে দুই ধরনের মহাকাশীয় অবস্থান রয়েছে। যাদের নাম ‘শুভ্র গহ্বর’ বা কাউসার এবং কষ্ণৃ গহ্বর। প্রথমটি অভাবনীয় পরিমাণ শক্তির উৎস। পরবর্তী অবস্থানটি হল সেই শূন্যস্থান যা নক্ষত্রের মৃত্যুর ফলে সৃষ্টি হয়। যখন কোনো নক্ষত্রের মৃত্যু হয় তখন তা তার মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। মৃত নক্ষত্রটি আয়তনে যত বড় হয়, তার মধ্যাকর্ষীয় সংকোচন ততই নিবিড় হয়, এমনকী তা তার নিউক্লিয় স্তরে গিয়েই ক্ষান্ত হয় না; বরং আরো সংকুচিত হয়ে এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়, যাকে বলা হয় Singularity এটি একটি কৃষ্ণ গহ্বর তৈরি করে যা কোনোভাবেই দেখা যায় না। নক্ষত্রের আলো বিচ্ছুরণ এবং পতনের সমগ্র প্রক্রিয়া নির্ভর করে তার শক্তির মাত্রা বা   Energy level-এর ওপর। এটিকে সেই কারণ বলে ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে, যার ফলে কুরআন মাজিদ এগুলিকে ‘প্রদীপসমূহ’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

মুজিজা নং– ৪০আবিষ্কার
বিপরীত বস্তুর উপস্থিতি

পবিত্র ও মহান সে সত্তা যিনি সবকিছু জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন, পৃথিবী যা উৎপন্ন করে তা থেকে, তাদের (মানুষের) নিজেদের মধ্য থেকে এবং সেসব কিছু থেকেও যা তারা জানে না। (ইয়াসিন, ৩৬ : ৩৬)

বলার অপেক্ষা রাখে না, পৃথিবী বিভিন্ন খনিজ পদার্থ উৎপাদন করে। বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, প্রত্যেক খনিজ পদার্থই হয়ত ধনাত্মক কিংবা ঋনাত্মক আধান (charge) বিশিষ্ট অতি পারমাণবিক কণিকা দ্বারা গঠিত। কুরআন মাজিদে এই সত্যটি অবতীর্ণ হয়েছে এই বলে, পৃথিবী থেকে উৎপাদিত সকল বস্তুই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে। খনিজ পদার্থের পাশাপাশি এমনকি পানিও যা পৃথিবী উৎপাদন করে, তাও বিপরীতধর্মী যৌগমূল দ্বারা গঠিত। পানি গঠিত হয় দুটি বিপরীতধর্মী উপাদনা দ্বারা। একটি ধনাত্মক উপাদানবিশিষ্ট হাইড্রোজেন অনু এবং অপরটি ঋনাত্মক উপাদানবিশিষ্ট অক্সিজেন অনু।
অধিকন্তু পৃথিবী থেকে উৎপন্ন জোড়া জোড়া বস্তুসমূহ আরও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে সেসব সমজাতীয় জোড়া, যা তাদের দৈহিক ও রাসায়নিক ধর্মের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন। যেমন- ধাতু ও অধাতু। অনুরূপ বিপরীতধর্মী উপাদানবিশিষ্ট জোড়া যেমন, ধনাত্মক ও ঋনাত্মক উপাদানবিশিষ্ট আয়ন থেকে ধনাত্মক ও ঋনাত্মক বৈদ্যুতিক উপাদানসমূহ চৌম্বকীয় বিপরীতধর্মী জোড়া, যেমন- চুম্বকের উত্তরপ্রান্ত ও দক্ষিণপ্রান্ত, আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তি, তেমনিভাবে কেন্দ্রনির্গত শক্তির মাধ্যমে মধ্যাকর্ষণ ভারসাম্য ইত্যাদি।
মানবিক জোড়ার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে- পুরুষ ও মহিলার লিঙ্গভেদ, পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রকাশক গুণ, যেমন- নিষ্ঠুরতা ও পরদুঃখ কাতরতা, সাহস ও ভয়, উদারতা ও কৃপণতা ইত্যাদি। অতঃপর যে কেউ সহজে উপসংহারে আসতে পারে যে, জোড়ার রহস্য পুরুষ ও মহিলা কিংবা বিপরীত বৈদ্যুতিক উপাদান ও বিপরীতধর্মী গুণ মানব জাতিসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক বিষয় ও শক্তিসমূহের মধ্যে বিদ্যমান। এ কথা উপরোক্ত কুরআনি আয়াতে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখন আমরা নিজেদেরকে আরো একবার প্রশ্ন করি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন মানুষ যিনি না লিখতে পারতেন, না পড়তে। এমনকি যিনি নিজের নামটি পর্যন্ত স্বাক্ষর করতে পারতেন না, তিনি কি কুরআন মাজিদের গ্রন্থকার হতে পারেন? না তা এমন একটি গ্রন্থ যা সর্বজ্ঞ ও জ্ঞানময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে?

মুজিজা নং– ৪১আবিষ্কার
অতি পারমানবিক কণিকার উপস্থিতি

আর কাফিররা বলে, ‘কিয়ামত আমাদের কাছে আসবে না’। বলুন, ‘অবশ্যই আমার রবের কসম! যিনি অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত, তা তোমাদের কাছে আসবেই। আসমানসমূহে ও জমীনে অনু পরিমাণ কিংবা তার চেয়ে ছোট অথবা বড় কিছুই তার অগোচরে নেই। বরং সব কিছু সুস্পষ্ট কিতাবে (লিপিবদ্ধ) রয়েছে। (সাবা, ৩৪ : ০৩)

এই আয়াতে যে আরবি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা হল, ‘যাররাহ’ (ةرذ) আব্দুলাহ− ইউসুফ আলী ও মারমাডিউক পিকথাল ইংরেজিতে ‘যাররাহ’ শব্দের অনুবাদ করেছেন  Atom (পরমাণু) শব্দ দ্বারা। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন ‘যাররাহ’ (পরমাণু) ছিল মানুষের জানা মতে সবচেয়ে ক্ষুদ্র কণিকা। এই আয়াতে কুরআন মাজিদ ‘যাররাহ’র চেয়েও ক্ষুদ্রতর কণিকার উপস্থিতির কথা বর্ণনা করে।পদার্থ  বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, পরমাণুকে আরও ক্ষুদ্রতর এককে বিভাজিত করা যেতে পারে। কুরআন মাজিদ এই বিষয়টির স্বীকতিৃ দিয়েছে পদার্থ  বিজ্ঞানীরা তা আবিষ্কার করার চৌদ্দশ’ বছরেরও অধিককাল পূর্বে।

মুজিজা নং– ৪২আবিষ্কার
সমুদ্রের পানির মাঝখানে অন্তরায়

কে পৃথিবীকে করেছে আবাসযোগ্য এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সৃদৃঢ় পর্বতমাল এবং দুই সাগরের মাঝখানে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায়। আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। (নামাল, ২৭ : ৬১)

তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিগম করতে পারে না। অতএব (হে মানব ও দানব) তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোনো নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (রহমান, ৫৫ : ১৯-২১)

এই আয়াতগুলি পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে ছিল এক রহস্য। সামুদ্রিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক গবেষণা ও আবিষ্কারের ভিত্তিতে আমরা এখন এই আয়াতগুলির ব্যাখ্যা দিতে পারি। উষ্ণ পানির স্রোতধারা বিশ্বের শীতল সাগরগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সাগরসমূহে এ ধরনের স্রোতের প্রবাহ সাধারণ। এ ধরনের স্রোত কেবল আরব উপদ্বীপের চারপাশেই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, তা নয়; বরং ভারতীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলসমূহেও। এ ধরনের স্রোতধারা সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৪২ সালে। বর্তমানে সেগুলিকে অত্যন্ত সুভেদী কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে চিহ্নিত করা গেছে। এটিও কুরআন মাজিদের অনন্য মুজিজা যে, তা এমন একটি রহস্যের বর্ণনা দিয়েছে, যা তৎকালে তথাকার কোনো আরব প্রত্যক্ষ করে নি, যেখানে বা যে সময়ে মুহ্ম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন।
কুরআন মাজিদের উপরে বর্ণিত আয়াতদ্বয় বলে, ‘আল্লাহ তাআলা দু’টি সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন এবং সেখানে দুই সাগরের মাঝখানে রয়েছে একটি আড়াল।’ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, পানির এই দুই স্রোতধারা তাদের লবণাক্ততা, ঘনত্ব ও উচ্চতার বিচারে ভিন্ন ভিন্ন। তারা এও আবিষ্কার করেছেন, যখন পানির বহিস্থ স্রোতধারা অন্তঃস্ত স্রোতধারার দিকে প্রবাহিত হয় কিংবা তার বিপরীত অবস্থা ঘটে, তখন তা তৎক্ষণাৎ অন্য স্রোতের পানি অনুসারে তার অবস্থা বদলে ফেলে। এভাবে সেখানে দুই ধরনের পানি স্বাধীনভাবে মিশে যায়, তথাপি উভয় প্রকৃতির পানি তাদের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে চলে। কুরআন মাজিদ এমন একটি জটিল রহস্য শনাক্ত করেছে, বিজ্ঞানীরা তা আবিষ্কার করার বহু শতাব্দী পূর্বে।

মুজিজা নং– ৪৩আবিষ্কার
বিচার দিবসে মহাশূন্যের সবকিছুর পরিসমাপ্তি

আর (যখন) শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। আসমানসমূহে (মহাশূন্যে) যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলে বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ তাআলা যাদেরকে ইচ্ছে করেন। অতঃপর আবার যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। (যুমার, ৩৯ : ৬৮)

যখন কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল তখন কেউ জানত না, মানুষ একদিন আকাশে উড়বে, এমনকি মহাকাশে স্টেশন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করবে। একজন নাস্তিক এ কথা বলে কুরআন মাজিদকে নিয়ে বিদ্রুপ করেছিল যে, যখন বিচার দিবস কায়েম হবে, পৃথিবীতে যারা আছে তারা মৃত্যু বরণ করবে; কিন্তু যারা মহাশূন্যে আছে তারা এই প্রলয় থেকে নিরাপদ থাকবে। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে দু’টি বিষয়ের ভবিষ্যতবাণী করেছে। প্রথমত, এমন একদিন আসবে যেদিন মানুষ আকাশে উড়বে এবং মহাশূন্যে বসবাস করবে। দ্বিতীয়ত, যখন বিচার দিবস কায়েম হবে, যারা মহাশূন্যে থাকবে তারা মৃত্যু বরণ করবে, যারা পৃথিবী-পৃষ্ঠে থাকবে তাদের মতোই। আবারও আমরা কুরআন মাজিদের প্রতিটি শব্দে বিস্ময়কর জ্ঞানগভীরতা প্রত্যক্ষ করি।
অতিক্রান্ত পৃষ্ঠাগুলি প্রাকৃতিক রহস্যের বহু প্রত্যক্ষণ প্রদান করে। এই প্রত্যক্ষণগুলি মানব-জাতির পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে রহস্য বলে বিবেচিত হত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চৌদ্দশ বছরের অগ্রগতি ও উন্নতি এই প্রত্যক্ষণগুলিকে এখন প্রকৃতির রহস্য নয়, বরং বাস্তব সত্য হিসেবে প্রমাণিত করেছে। স্মর্তব্য, এই প্রত্যক্ষণগুলি মানবজাতির কাছে প্রদত্ত হয়েছে একজন নিরক্ষর মানুষ তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে, যিনি লিখতে পড়তে জানতেন না। নাস্তিকরা বলে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদে এ সকল প্রত্যক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর তীব্র কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে। পক্ষান্তরে ইহুদি ও খৃস্টানরা অভিযোগ করে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব বিষয় বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old testament) ও নতুন নিয়ম (New testament) থেকে নকল করেছেন।আবিষ্কার
তবে বাস্তবতা হল এই প্রত্যক্ষণগুলি, এমনকি সেই সময়ের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট নয়, যখন কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়েছিল। অধিকন্তু এই প্রত্যক্ষণগুলো না পুরাতন নিয়মে বিদ্যমান, আর না নতুন নিয়মে। অতএব কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই জ্ঞানের উৎস কী? তিনি কি এ সকল প্রত্যক্ষণ তাঁর তীব্র চিন্তা ও কল্পনা-শক্তি ব্যবহার করে রচনা করেছিলেন, নাকি তা সর্বজ্ঞাতা ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল? তার যথার্থ উত্তর হল, আল্লাহ তাআলা এসব সত্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন।
‘নিশ্চয় তোমাদের কাছে চাক্ষুষ নিদর্শনাবলি এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। অতএব যে দেখবে (সত্য) তবে তা হবে তার নিজের (কল্যাণের) জন্যেই। আর যে অন্ধ সাজবে তবে তা (তার অনিষ্টতা) তার ওপরই (বর্তাবে)। আর বলুন, (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম)− আমি (এখানে) তোমাদের ওপর সংরক্ষক নই। (চাই তোমরা এই সত্যকে গ্রহণ কর কিংবা প্রত্যাখ্যান কর)।’ (আনআম, ০৬ : ১০৪)

আল কুরআনের ১৬০ মুজিজা ও রহস্য বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন