আব্দুর রহিম গ্রিনের নওমুসলিম হবার গল্প-টু

আমি মাথা নাড়লাম, অবশ্যই।

তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন, তুমি বিশ্বাস কর, যিশুখ্রিষ্ট ক্রসে জীবন দিয়েছেন?

আমি দৃঢ় গলায় বললাম, “নিঃসন্দেহে।

তিনি আমার চোখে চোখ রাখলেন। তারপর বললেন, তাহলে তুমি বিশ্বাস কর ঈশ্বর মারা গিয়েছেন?

বক্সিং খেলার নিয়ম জানেন তো? ইয়া বড় এক ঘুষি খেয়ে কোনো  খেলোয়াড় যদি পড়ে যায়, আর রেফারি ১-১০ গােনার ফাঁকে উঠতে না পারে, তবে সে খেলোয়াড় সাথেই সাথেই হেরে যায়। যাকে বলে নকআউট’।

তার প্রশ্ন শুনে আমার মনে হলো, বিখ্যাত বক্সার মাইক টাইসনের এক ওজনদার ঘুষি খেয়ে আমি একেবারে চিৎপটাং হয়ে গেছি। আমার কাছে তার এই প্রশ্নের কোনো  উত্তর ছিল না। কারণ, মনে মনে আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম, আমাদের এই ধারণাগুলো  কতটা অযৌক্তিক। ঈশ্বর আবার মারা যায় কী করে! অথচ এত দিন ধরে আমাকে যা শেখানো  হয়েছিল, তাতে তো সারমর্ম এটাই দাঁড়ায়। মনে মনে আমার ভেতর দ্বিধা ছিল, দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আজ একজন একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে আমাকে সেটি দেখিয়ে গেলেন।

অবশ্য, আমি তখন তা মুখে স্বীকার করিনি।

‘আমার খুব জরুরি একটা কাজ আছে। আমি বাসায় যাচ্ছি। আপনার সাথে পরে কথা হবে। আমি কোনো  রকমে কিছু একটা বলে, তার কাছ থেকে সরে এসেছিলাম। তবে তার সে যুক্তি আমার মাথার মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। বিশ বছর বয়স হতে হতে ক্যাথলিক ধর্ম থেকে আমার মন প্রায় উঠেই গিয়েছিল। আমি তখন হিপি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি নিজেই নিজের একটা ধর্ম বানিয়ে নিয়েছিলাম। সেটা কেমন? এযাবৎকাল যতগুলো  ধর্ম নিয়ে যাই কিছু পড়েছি, সেগুলো থেকে বেছে বেছে আমার মনের মতো  করে একটা পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছিলাম। সেটাকেই মানার চেষ্টা করতাম। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারলাম, এটার চেয়ে ফালতু এবং নিকৃষ্ট আর কিছুই হতে পারে না।

‘ধুর ছাই! এত ধর্ম-কর্ম, আধ্যাত্মিক চিন্তা আর জীবনের মানে খোঁজার কী দরকার?’ আমি নিজেকে প্রবোধ দিলাম, তার চেয়ে নিজেকে সুখী রাখতে টাকা কামানোর দিকে মনো যোগ দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আমার টাকা পয়সার অভাব ছিল না। বলা চলে আমার মা-বাবা স্বচ্ছলই ছিলেন। গাড়ি, বাড়ি, ঘর ভর্তি কাজের লোক…আমাদের সবই ছিল। পকেট খরচ হিসেবে আমি বাবার কাছ থেকে যা পেতাম, তা দিয়ে অনেক মানুষ তাদের গোটা সংসার চালায়। তাহলে আমার আসলে কী পরিমাণ টাকা দরকার?

‘আমার কমপক্ষে এত টাকার দরকার যাতে নিজের একটা প্রাইভেট জেট প্লেন থাকে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আচ্ছা, টাকা না হয় রোজগার করব বুঝলাম, কিন্তু তা কীভাবে? কঠোর পরিশ্রম করে? উহু, এর কোনো মানেই হয় না। ছোট  একটা  জীবন  এত  কষ্ট  করে  কী  লাভ? তার  চেয়ে  দেখা যাক, কম পরিশ্রমে কী করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া যায়?

আমি  এবার  বিভিন্ন  জাতি  আর  মানুষদের  নিয়ে  গবেষণা  করা  শুরু  করলাম। দেখি, পৃথিবীতে কারা কারা ধনী? প্রথমে আমি ইংল্যান্ড নিয়েই ভাবা শুরু করলাম। হ্যা, ইংল্যান্ডের মানুষদের টাকা-পয়সা ভালোই  আছে। কিন্তু  তার  পেছনে পরিশ্রমও তো কম নয়। শিল্প বিপ্লব ঘটেছে, অনেক অনেক মিল কারখানায় মানুষ রাতদিন পরিশ্রম করেছে। এত কিছুর পরেই না তারা ধনী হতে পেরেছে। আমেরিকা? তাদের ইতিহাসও ঘুরে ফিরে সেই পরিশ্রমের। জাপান? ও বাবা! তারা তো মহা কাজ পাগল। কাজ ছাড়া কিছুই বোঝে না।।

‘ইউরেকা!” আমি মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম ‘পেয়েছি! সৌদি আরব। সেই দেশের মানুষদের বিশেষ কোনো কাজ নেই। উটে করে ঘুরে বেড়ায় আর আল্লাহু আকবার বলে বারবার মাটিতে চুমু খায়। অথচ তাদের দেশে টাকা পয়সা, তেল সম্পদের অভাব নেই। সবচেয়ে কম পরিশ্রমে সবচেয়ে বেশি রোজগার। আচ্ছা তাদের জীবনযাপন কেমন? তাদের ধর্মই-বা কী?

খুঁজতে খুঁজতে জানতে পারলাম তাদের পবিত্র গ্রন্থের নাম কুরআন। আমার মনে হলো, পড়ে দেখা দরকার কী আছে এতে। একদিন একটা বইয়ের দোকানে গিয়ে এক খণ্ড কুরআন কিনে নিয়ে এলাম।

কুরআন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কুরআনের মাঝে বিশেষ কিছু খুঁজতেও যাইনি কখনো। আমি ভোলা মন নিয়ে বুঝতে চেয়েছিলাম, কী আছে এতে। ব্যাস! এতটুকুই। আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম।

আমি ছিলাম খুব ভালো পড়য়া। মিসরে থাকতে আমাদের ড্রয়িং রুমের টিভিটা দেখাই হতো  না। যেসব অনুষ্ঠান দেখাত, কোনোটাই খুব একটা ভালো ছিল না।

দেখতে দেখতে টিভির উপর কয়েক ইঞ্চি পুরু ধুলো জমে গিয়েছিল। তেমন কিছু করার নেই, তাই বই পড়ে সময় কাটাতাম। আর আমি খুব দ্রুত পড়তেও পারতাম।

আপনাদের একটা ধারণা দিই। দাস প্রথা নিয়ে আলেক্স হ্যালির বিশ্ব বিখ্যাত উপন্যাস ‘Roots’-এর নাম শুনেছেন? ইয়া মোটা। আমার মনে আছে, এক রাতেই সে বইয়ের চার ভাগের তিন ভাগ পড়ে শেষ করেছিলাম।

কুরআন হাতে নিয়ে ভাবলাম, সে তুলনায় এই বইয়ের সাইজ খুব বড় নয়। একটা মাঝারি উপন্যাসের মতোই তো। পুরোটা শেষ করতে কতক্ষণই বা লাগবে! কিন্তু, টানা দু সপ্তাহ ধরে পড়েও আমি তার ইংরেজি অনুবাদ শেষ করতে পারিনি। এ এমনই এক বই, যে স্টাইলের বই, এর আগে কখনোই পড়িনি।

আমরা সাধারণত যে বইগুলো পড়ি; গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস, ভূগোল সেগুলো  সাধারণত কেমন হয়? এই বইগুলোর একটা শুরু থাকে, একটা শেষ থাকে। মাঝে কিছু কথা থাকে। কিন্তু কুরআন পুরো পুরি ব্যতিক্রম। এর বর্ণনা ভঙ্গির মধ্যে বিষয়বস্তুর, কোনো ধারাবাহিকতাই নেই। প্রথমে সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু। এরপরে সূরা বাকারা। সে সূরায় একবার মুনাফিকদের সম্পর্কে বলছে, আবার মুসা [আ] এর ঘটনা, গরুর ঘটনা নিয়ে আলাপ করছে। পরের সূরা আবার অন্যরকম। ঘন ঘন বিষয় পরিবর্তন, একেকবার একেক বিষয়ের আলোচনা-আমাদের গতানুগতিক বইগুলোর সাথে কোনোই মিল নেই।

শুধু পড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করলেও এবারে ভালো করে বুঝতে চাইলাম, আসলে কুরআন কী বলছে। আমি একেকটা আয়াত পড়ি আর বিভিন্ন ব্যাখ্যা জেনে বোঝার চেষ্টা করি। এভাবে কুরআন পড়তে গিয়ে আমার অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। দিনে দিনে আমার এত দিনকার অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে গেল।

আমার আজও পরিষ্কার মনে আছে সে দিনটার কথা। ট্রেনে করে টেমস নদীর উপর দিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছিলাম। আমার কোলে কুরআন মেলে ধরা। একবার কুরআনের দিকে চাইলাম, আরেকবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। টেমসের উপরের বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, যদি কোনো বই ঈশ্বরের কাছ থেকে এসে থাকে, তবে নিঃসন্দেহে এটাই সেই বই।

সে রাতে বাড়ি ফিরে মনে হলো, আমার নামাজ পড়া দরকার। কুরআন নামাজ পড়ার কথা বলেছে। যদিও কুরআনে নামাজ কীভাবে পড়ে তার নিয়মকানুন, খুঁটিনাটি বিস্তারিত বলা হয়নি। আমি সকাল-বিকাল সময় সুযোগমতো নামাজ পড়তাম। প্রতিদিন পাঁচবার পড়তে হয়, এটা আমার জানা ছিল না। নামাজের আগে অযু করে নিতাম। অযুর নিয়মটাও ভালো করে জানতাম না। আমি কুরআনে পড়েছি, হাত-পা-মুখ ভালো করে ধোয়া, মাথা মাসেহ করার কথা। পরিচিত এক মুসলিমকে নামাজ পড়তে দেখেছিলাম। আমি তার মতো করে নামাজ পড়ার চেষ্টা করতাম। সেভাবেই রুকু-সিজদা দিতাম। এভাবেই কেটেছিল দু সপ্তাহ।

একবার আমি কী একটা কাজে লন্ডন থেকে একটু বাইরে গেলাম। কী মনে করে জানি না, টিউব ট্রেন থেকে নেমে বামে না গিয়ে ডানে চলে গিয়েছিলাম। একটু হাঁটতেই একটা বইয়ের দোকান চোখে পড়ল। সে দোকানে আরবি ইংরেজিতে ইসলাম, মুহাম্মাদ (সাঃ) এর জীবনীসহ আরও অনেক বই ছিল।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন] পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন