আব্দুর রহিম গ্রিনের নওমুসলিম হবার গল্প-ফাইভ

না হলে আপনাদের হয়তো হাসি পাচ্ছে। ভাবছেন একদিকে মুসলিম আবার অন্যদিকে নাস্তিক ; দুটো এক হয় কী করে? মূলত তিনি মুসলিম বলতে তার জাতিসত্তা কে বুঝিয়েছেন।

অনেক মুসলিমকে পাবেন যারা মাদক ব্যবসাসহ আরও নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। অথচ তাদের কারও কারও মুখে দাড়ি আছে, আবার কেউবা হিজাবও পালন করেন। অনেকেই দাড়ি রাখেন, হিজাব পালন জন, কারণ, এটা তদের সংস্কৃতির একটা অংশ।

অনেক সৌদি নারীদের কথা শোনা যায়, যারা বিদেশগামী প্লেনে উঠে তাদের হিজাব খুলে ফেলেন। আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, এটা আমাদের সৌদি পোশাক। হয়তো তাদের জানাও নেই, ইসলাম হিজাব সম্পর্কে কি বলে। তারা এতটুকুই জানেন, এটা তাদের সংস্কৃতির অংশ।

এরকম অনেক মুসলিমদের পাবেন যারা বলে, ‘আমি মুসলিম। মূলত এটা দ্বারা নিজেরা কোনো দেশের কিংবা কোনো সংস্কৃতির মানুষ, সেটাকেই তারা বুঝায়। সুতরাং বোঝা গেল কেউ যদি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে থাকেন, তবে তার আমলও সে অনুযায়ী ভালো হবে।

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর থেকে প্রায় এক বছর হতে চলল, আমার মা-বাবা। আমার সাথে কথা বলছেন না। আমি তাদের সাথে একত্রেও থাকতে পারছি না। আমি জানি, একজন মেয়ে হিসেবে ইসলামি বিধান অনুযায়ী একা একা থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে, ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ত্যাগ করা নিষেধ। এ অবস্থায় আমার কী করণীয়?

আব্দুর রহিম গ্রিন : বোন একা থাকার বিষয়ে বলি। আপনার সমস্যা থাকলে আপনি একা একাও থাকতে পারেন। কোনো মেয়ের জন্য একাকী বসবাস করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়।

মা-বাবার সাথে সমস্যা কেন্দ্রিক আমার অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি।

ইসলাম গ্রহণের পর আমি আমার মা-বাবাকে ইসলামের কথা বলতে থাকি। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছিল, ইসলাম এত সুন্দর একটি ধর্ম, এত চমৎকার। তার বিধিবিধান, সঠিকভাবে উপস্থাপন করলে যেকোনো মানুষেরই সেটি ভালো। লাগার কথা, গ্রহণ করার কথা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মা-বাবা আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি। আমি ছিলাম পার্টি পাগল মানুষ। আমি খুব ভালো নাচতেও পারতাম। ভালোভাবে ইসলাম অনুসরণ করার পর থেকে আমি মদ খাওয়া, পার্টিতে যাওয়া ছেড়ে দিই। খাবার দাবারের ক্ষেত্রেও আমি হালাল খাবার বেছে নিই।

ধর্মকে এতটা কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করতে দেখে আমার মা একদিন আমাকে বললেন, ‘এন্থ! তুমি যখন এতই ধার্মিক হতে চাইছ, তবে ঘর বাড়ি ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন বেছে নিলেই পার।’

আমি উত্তর দিলাম, এটা ইসলামের শিক্ষা নয়, মা। ইসলাম বলে, তুমি দুনিয়ায় থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন কর। এর মধ্যেই স্রষ্টার বিধি-নিষেধ মেনে চল এবং তার অনুসরণ কর। আমার ধর্ম বলে না, তুমি ঘর বাড়ি ছেড়ে পাহাড়ে কিংবা জংগলে চলে যাও। এটা ইসলামি শিক্ষার বিপরীত।

মা বললেন, ঠিক আছে, তুমি যেহেতু আমাদের সঙ্গ পছন্দ করছ না, আমাদের খাবার-দাবার, উৎসব-অনুষ্ঠান সবকিছুকেই যেহেতু তোমার অপছন্দ, আমরা ঠিক করেছি তোমাকে আমাদের সম্পত্তির উইল থেকে বাদ দিব। তুমি এর এক কানাকড়িও পাবে না।’

“ঠিক আছে, তবে তাই হোক আমি উত্তর দিয়েছিলাম। আমি মায়ের কথায় বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে যাইনি। আমার বিশ্বাস ছিল, আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে আমার রিযিকের অভাব হবে না।

বাবার অনুভূতিও ছিল মায়ের মতো। বাবা আমাকে এ কথাও বলেছিলেন, ‘তোমার লন্ডনে ফিরে যাওয়াই ভালো। সেখানে তুমি তোমার নিজের মতো করে চলতে পারবে। আমাদের সাথে তোমার ঠিক মিলবে না।

বুঝতেই পারছেন, মা-বাবা আমার উপর মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না।

আমি বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের পরে মায়ের সাথে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একদিন মা কথায় কথায় নবি মুহাম্মাদ সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলেছিলেন। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। প্রচণ্ড রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম। এমনকি হাতের কাছে থাকা দুয়েকটা জিনিসও আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেছিলাম।

পরের দিনই আমি বাসা ছেড়ে চলে যাই। এক বছর পর্যন্ত আমাদের কথা বলা বন্ধ ছিল।

ভাবতে পারেন, কখন এ অবস্থার পরিবর্তন হলো?

যখন আমার ছেলে আব্দুল্লাহর জন্ম হলো, তখনই পরিবেশটা অনেক সহজ হয়ে এলো।হাজার হোক, আব্দুল্লাহ তার নাতি। নাতি নাতনীর প্রতি দাদা-দাদির ভালোবাসা অন্যরকম। চাইলেও দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। প্রিয় বোন, আমার মনে হয় আপনার যদি বিয়ে হয় এবং সন্তান হয়, তখন আপনার মা-বাবা আর দুরও রাখতে পারবেন না। আর এরপরেও যদি তারা আপনার কাছে না আসেন,তবে বুঝতে হবে তাদের হৃদয়টা পাথর দিয়ে গড়া।

আমি ইসলাম গ্রহণকারী অনেক ভাইবোনদের ক্ষেত্রেই এমনটা হতে দেখেছি। আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর স্ত্রী, যিনি অন্য ধর্ম থকে মুসলিম হয়েছিলেন, তাকেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তার মা তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কোনোভাবেই সম্পর্কটা জোড়া লাগছিলো না। তারপর যখন তাদের প্রথম বাচ্চাটা হলো, আস্তে আস্তে সব সহজ হয়ে এল।

আমার মা-বাবার সাথে আমার সম্পর্ক এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে চমৎকার। আমি সব সময় চেষ্টা করেছি, ইসলামের সৌন্দর্য তাদের সামনে তুলে ধরতে আমার আচরণ দিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি, ইসলাম মা-বাবার সে যে কী চমৎকার ব্যবহার করার কথাই না বলে!

আমি আমার মাকে একটা বই দিয়েছিলাম। বইয়ের নাম ‘মা’। সে বইতে আল হাদিসের পাশাপাশি অনেক সুন্দর সুন্দর কবিতা ছিল, যাতে একজন মানুষ বুঝতে পারে, ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মায়ের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে।

একটা হাদিসে এসেছে, এক লোক এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, হে রাসূল! কে আমার কাছ থেকে সবচেয়ে সুন্দর ব্যবহার পাবার অধিকারী? তিনি। বললেন, “তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল ‘তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল তারপর কে? তিনি বললেন তোমার মা। লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন, “তোমার বাবা।

অর্থাৎ রাসূলু ﷺ বোঝাতে চেয়েছেন, তুমি কখনোই তোমার মায়ের ঋণ শোধ করতে পারবে না। যদি কেউ তার বাবাকে দাস হিসাবে পায়, আর নিজের টাকা দিয়ে বাবাকে মুক্ত করে, সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, সে তার বাবার ঋণ শোধ করতে পেরেছে। কিন্তু মায়ের ঋণ? এ জনমেও শোধ করা সম্ভব নয়।

আরেকটি হাদিসে এসেছে, উমর (রা.) তখন ছিলেন খলিফা। এক লোক তার মাকে কাঁধে বয়ে নিয়ে হজ্ব করে এসেছেন। তিনি খলিফাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“হে উমর! তুমি কি মনে কর আমি আমার মায়ের ঋণ শোধ করতে পেরেছি? হযরত উমর (রা.) উত্তর দিলেন, “তোমাকে জন্মদানের সময় ব্যথায়, যন্ত্রণায় ঝরে পড়া মায়ের এক ফোটা অশ্রুর ঋণও তুমি শোধ করতে পারনি।

এই হলো ইসলামের শিক্ষা। আমি মাকে বললাম, তাহলে মা তুমি কী করে বলতে পার- ইসলাম নারীদের কোনো মর্যাদা দেয়নি!’

আপনাদের সবাইকে বলি, কোনো অবস্থাতেই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিনষ্ট করা যাবে না। এমনকি যদি সন্তান জন্মদানের পরেও আপনার মা-বাবা আপনাকে সহজভাবে গ্রহণ না করে। সর্বাবস্থায় মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণ করে যেতে হবে। হালছাড়া যাবে না। সম্ভব হলে তাদেরকে ফোন দিবেন, সময়ে সময়ে মেসেজ পাঠাবেন, তাদের সাথে দেখা করতে যাবেন।।

তারা খুশি হয়, এমন যেকোনো কিছু করার চেষ্টা করবেন; যদি কাজটা হারাম না হয়। এমন যদি হয়, কাজটা সুন্নাত কিংবা মুস্তাহাব, তাদের মন জয় করতে প্রয়োজনে সেটিও ছেড়ে দিন। শুধু খেয়াল রাখবেন, কোনো অবস্থাতেই যাতে ফরজ তরক না হয়, হারাম কোনো কাজে জড়িয়ে না পড়েন।

বোন, ধৈর্য ধরুন, চেষ্টা চালিয়ে যান। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। আমরাও দোয়া করি, যাতে এই বোনের মা-বাবার মনকে আল্লাহ নরম করে দেন। তাদেরকে ইসলামের জন্য কবুল করেন। আমিন।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন