কুরআনে বৈপরীত্যের সত্যাসত্য-ওয়ান

একটা প্রশ্ন করতে পারি?

‘অবশ্যই অবশ্যই’ বলল মঈনুল।

‘আরিফ একটু আগে বলল, তুমি নাকি নাস্তিক হয়ে গেছ। আমি অবশ্য জানতে চাইব না যে, কেন তুমি নাস্তিক হয়ে গেছ। আমি শুধু এটুকু জানতে চাচ্ছি, কোন জিনিসটা তোমাকে নাস্তিক হতে অনুপ্রাণিত করেছে?

‘আমি কুরআন নিয়ে পড়াশোনা করেছি। পড়াশোনা করে বুঝতে পেরেছি যে, এটা কখনোই স্রষ্টার বাণী হতে পারে না। স্রষ্টাকে যদি আমরা আউট অব মিসটেক হিশেবে ধরে নিই, তাহলে স্রষ্টার বাণীর মধ্যে কোনোরকম অসামঞ্জস্য কিংবা বৈপরীত্য থাকতে পারে না; কিন্তু কুরআনে এরকম অসামঞ্জস্য, বৈপরীত্য রয়েছে।’—বলল মঈনুল।

আমি ধৈর্য ধরে চুপ করে আছি। সাজিদ হাসিমুখে বলল, ‘বুঝতে পেরেছি তোমার কথা। আচ্ছা, তুমি কুরআন নিয়ে কোথায় বা কার কাছে পড়াশোনা করেছ?

চুপ করে আছে মঈনুল। কুরআন নিয়ে কোথায় বা কার কাছে পড়েছে সে তার কোনো উত্তর দিতে পারল না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সাজিদ আবার বলল, ‘আচ্ছা, বাদ দাও সেটা। তুমি বললে যে কুরআনে অসামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছ। দয়া করে আমাকে একটু বলবে কি, সেগুলো কীরকম? আমিও আসলে কুরআনকে বোঝার চেষ্টা করি। এজন্যেই জানতে চাইছি।

মঈনুল কিছুটা সময় নিল। এরপর বলতে লাগল, যেমন ধরো, কুরআনের এক জায়গায় বলা হচ্ছে আল্লাহর একদিন হলো একহাজার বছরের সমান। আবার অন্য জায়গায় বলা হচ্ছে আল্লাহর একদিন হলো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ব্যাপারটি কি পরস্পরবিরোধী নয়? এখান থেকে আমরা কোনটা বুঝব? আল্লাহর একদিন মানে দুনিয়ার একহাজার বছর নাকি পঞ্চাশ হাজার বছর?

এবার আমি কথা বলে উঠলাম, কুরআনের কোন জায়গায় এই কথাগুলো বলা আছে রেফারেন্স দেখা। তুই নিজের মতো করে কথা বললে তো আর হবে না।

সাজিদ বলল, ‘আরিফ, মঈনুল কিন্তু ঠিকই বলেছে। কুরআনের এক জায়গায় বলা আছে আল্লাহ তাআলার একদিন, একহাজার বছরের সমান। আবার অন্য জায়গায় বলা হয়েছে তার একদিন হলো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।

সাজিদের কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। মঈনুলের এই নাস্তিক্যধর্মী কথাকে সে ডিফেন্ড করল কি না বুঝতে পারলাম না। তাকে প্রশ্ন করলাম, কুরআনের কোথায় বলা হয়েছে এরকম কথা?

সাজিদ উত্তর দিল, “সূরা হজ, সাজদা এবং মাআরিজে।

মঈনুল বেশ উৎফুল্ল গলায় বলল, “রাইট রাইট। এই সূরাগুলোতেই আছে। আমি পড়েছিলাম; কিন্তু রেফারেন্সগুলো মনে নেই।

সাজিদ মঈনুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু মঈনুল ভাই, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এই ব্যাপারগুলোতে আমি তোমার সাথে মোটেও একমত নই।

অবাক হলো মঈনুল। বলল, “কেন?”

‘আমার দৃষ্টিতে এই ব্যাপারগুলোতে আসলে কোনোরকম অসামঞ্জস্য বা বৈপরীত্য নেই।

‘কী অদ্ভুত!’ বলল মঈনুল। স্পষ্টভাবে দু-জায়গায় দু-রকম ইনফরমেশান দেওয়া আছে। তারপরেও তুমি বলছ এখানে কোনোরকম বৈপরীত্য নেই?

“হ্যাঁ। আমি আমার বিশ্বাসের জায়গা থেকে শক্তভাবেই বলছি, এই জায়গাগুলোতে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য নেই।’- সাজিদ বলল।

সকালের রোদ চড়ে বসতে শুরু করেছে। বেড়ে চলেছে কর্মমুখী মানুষের আনাগোনা। গাড়ির হর্ন আর মানুষের আওয়াজে এলাকাটি কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা পাশের একটি রেস্টুরেন্টে এসে বসলাম। চা-পরোটা অর্ডার করে সাজিদ আর মঈনুল আবারও তর্কে জড়িয়ে পড়ল। মঈনুল বলল, ‘তার-মানে তুমি বলতে চাচ্ছ, এই আয়াতগুলো বৈপরীত্য নির্দেশ করে না, তাই তো?’

“হ্যাঁ”

‘তোমার দাবির পক্ষে প্রমাণ কী?’

নড়েচড়ে বসে সাজিদ বলল, তোমার আপত্তির ব্যাপারটা আছে সূরা হজের ৪৭ নম্বর আয়াতে, সূরা সাজদার ৫ নম্বর আয়াতে এবং সূরা মাআরিজের ৪ নম্বর আয়াতে। প্রথম দুই আয়াত, অর্থাৎ সূরা হজ এবং সূরা সাজদার আয়াতে বলা হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একদিন হলো একহাজার বছরের সমান। আবার, সূরা মাআরিজের আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর একদিন হলো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। এখন, এই আয়াতগুলোতে সত্যি কোনো বৈপরীত্য আছে। কি না—তা জানতে হলে একটি বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। তোমার হাতে কি সময় আছে শোনার জন্য?

সম্মতি জানিয়ে মঈনুল বলল, অবশ্যই আছে।

সাজিদ বলল, “ঠিক আছে। ব্যাপারটি আমি দুইভাগে বোঝনোর চেষ্টা করব। প্রথমে আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে দলীল টেনে ব্যাখ্যা করব। এরপরে আয়াতগুলো দিয়েই আয়াতগুলোকে পর্যালোচনা করব। ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে আমরা কুরআনের সেই আয়াতগুলো দেখে নিই যেগুলো নিয়ে আজকের আলাপ।

এতটুকু বলে সাজিদ তার ফোন থেকে কুরআনের এ্যাপস ওপেন করে সেখান থেকে সূরা হজের ৪৭ নম্বর আয়াতটি তিলাওয়াত এবং অর্থ পড়ে শোনাল আমাদের।

‘তারা আপনাকে তাড়াতাড়ি শাস্তি নিয়ে আসতে বলে (কিন্তু শাস্তি তো আসবে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে); কেননা, আল্লাহ কক্ষনো তাঁর ওয়াদার খেলাফ করেন না। তোমার প্রতিপালকের একদিন হলো তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।

এরপর সে তিলাওয়াত করল সূরা সাজদার ০৫ নম্বর আয়াত

“তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উখিত হবে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছর।

এরপর সূরা মাআরিজের ০৪ নম্বর আয়াত

‘ফেরেশতা এবং রূহ (অর্থাৎ জিবরীল) আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রথম আয়াত এবং দ্বিতীয় আয়াতে সময়কাল দেখানো হচ্ছে এক হাজার বছর করে; কিন্তু তৃতীয় আয়াতে সময়কাল দেখানো হচ্ছে পঞ্চাশ হাজার বছর। তাহলে কোনটি সঠিক? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ১ দিন সমান ১০০০ বছর? নাকি ৫০,০০০ বছর? মূলত, আল্লাহর ১ দিন সমান ১০০০ বছর। এর পক্ষে হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিঃস্ব মুসলিমরা ধনীদের তুলনায় অর্ধেক দিন অর্থাৎ ৫০০ বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে।(১)

‘এখানে অর্ধেক দিন হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একদিনের অর্ধেক সময়। আর এই সময়টা কত? তা হলো ৫০০ বছর। অর্ধেক দিন যদি ৫০০ বছরের সমান হয়, তাহলে পুরো দিন সমান কত বছর হবে? সোজা অঙ্ক। পুরোদিন সমান এক হাজার বছর। অর্থাৎ আল্লাহর একদিন সমান বান্দাদের অর্থাৎ পৃথিবীর ১০০০ বছরের সমান। মঈনুল বলল, ‘পঞ্চাশ হাজার বছরের সময়টা কোত্থেকে এলো তাহলে?

‘ভালো প্রশ্ন। পঞ্চাশ হাজার বছরের সময়টা তাহলে কীভাবে এলো, তাই না? এই সময়টা আসলে আল্লাহ এবং বান্দার মাঝের সময় নয়। এই সময়টা মূলত কিয়ামত দিবসের একটা সময়। এই আয়াতে ‘পঞ্চাশ হাজার বছর’ বলে যে সময়টা উল্লেখ করা হয়েছে সেটি কিয়ামত দিবস-বিষয়ক। যাকাত প্রদান করে না এমন ব্যক্তির শাস্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তার (যে যাকাত দেয় না) শাস্তি চলতে থাকবে এমন একদিন পর্যন্ত—যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। তারপর তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।[২]

এখান থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, উল্লিখিত দিন হলো কিয়ামতের দিন এবং উল্লিখিত সময় হলো ৫০,০০০ বছর, যা সূরা মাআরিজে উল্লিখিত আছে। তা ছাড়া, সূরা মুত্তাফফিফীন এর ৬ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হচ্ছে, যেদিন সৃষ্টিকুলের মানুষ দাঁড়াবে তাদের রবের সামনে, এটার ব্যাখ্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তা হবে এমন একদিনে, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। তারা তাদের কান পর্যন্ত ঘামে ডুবে থাকবে।’(৩)

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]
রিফারেন্স
১ জামি তিরমিযী, হাদীস : ২৩৫৩, ২৩৫৪
২ সহীহ মুসলিম, ৯৮৭, মুসনাদে আহমদ, ০২ / ৩৮৩
৩ মুসনাদে আহমদ, ০২/১১২

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন