কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।। সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

হাদীস: لو دليتم بحبل من  الأرض السابعة لوقع على الله “যদি তোমরা একটি রশিকে আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তা আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।”

হাদীস- ‌ لو دليتم بحبل من  الأرض السابعة لوقع على الله “যদি তোমরা একটি রশিকে আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তার আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।” এর  বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো। হাদীসটি শুদ্ধ কিনা? হাদীসটির অর্থ কি?

উত্তর: হাদীসটির শুদ্ধতা নিয়ে উলামাদের মধ্যে মত প্রার্থক্য রয়েছে। যারা হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, তারা বলেছেন, হাদীটির অর্থ, যদি তোমরা রশি ছাড় তা আল্লাহর উপর পড়বে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। প্রতিটি বস্তু আল্লাহর হাতের মুঠে। কোন কিছুই আল্লাহ থেকে অনুপুস্থিত নয়। এমনকি সাত স্তর বিশিষ্ট আসমানসমূহ ও জমিন আল্লাহর কবযিতে একটি দানার মতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدۡرِهِۦ وَٱلۡأَرۡضُ جَمِيعٗا قَبۡضَتُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَٱلسَّمَٰوَٰتُ مَطۡوِيَّٰتُۢ بِيَمِينِهِۦۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٦٧﴾ [الزمر: ٦٦]  “আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৬] এ দ্বারা কোন অবস্থাতেই এ কথা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা সর্বত্র বিরাজমান, অথবা আল্লাহ তা‘আলা সপ্ত জমিনের নীচে আছে। কারণ, এটি শরীআত, যুক্তি ও ফিতরাতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, ইজমা, যুক্তি ও মানব স্বভাব আল্লাহ তা‘আলা উপরে হওয়াকে প্রমাণ করে।

আল্লাহর কিতাব যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَهُوَ ٱلۡقَاهِرُ فَوۡقَ عِبَادِهِۦۚ وَهُوَ ٱلۡحَكِيمُ ٱلۡخَبِيرُ ١٨﴾ [الانعام: ١٨] “আর তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর ক্ষমতাবান; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  ﴿سَبِّحِ ٱسۡمَ رَبِّكَ ٱلۡأَعۡلَى ١﴾ [الاعلى: ١]“তুমি তোমার সুমহান রবের নামের তাসবীহ পাঠ কর।” [সূরা আল-আ‘লা, আয়াত: ১] এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহর আয়াত অনেক। প্রতিটি আয়াত এ কথা প্রমাণ করে যে, প্রতিটি বস্তু আল্লাহর দিকে ওঠে, বস্তুকে আল্লাহর দিকে তুলে নেওয়া হয় এবং আল্লাহ উপর থেকে নিচে অবতরণ করেন। ফলে আয়াতগুলো আল্লাহ তা‘আলার উপরে হওয়াকেই প্রমাণ করে। বিভিন্ন আয়াতের মর্মবাণীগুলো দ্বারা আল্লাহর উপরে হওয়াই প্রমাণিত।

আর সুন্নাত: আল্লাহ তা‘আলা যে, উপরে এ বিষয়ে সুন্নাতগুলো মুতাওয়াতের পর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম ও স্বীকৃতি আল্লাহর উপরে হওয়াকে প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,ألا تأمنوني أنا أمين من في السماء ‍‌ “তোমরা কি আমাকে আমানতদার মনো করো না, আমি যিনি আসমানে রয়েছেন তার পক্ষ থেকে আমানতদার।” এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের কথা যদ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা উপরে। আরাফার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের মধ্যে ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন, ألا هل بلغت؟  “আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিঁয়েছি”? উত্তরে তারা বললেন হ্যাঁ। তারপর আকাশের দিকে আঙ্গুল উঠালেন এবং বললেন, اللهم اشهد “হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাক” এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম যা আল্লাহর উপর হওয়াকে প্রমাণ করে। আর রাসূলের স্বীকৃতি সম্পর্কে হাদীস- বাদীর হাদীস, যখন বাদীকে জিজ্ঞাসা করা হলো أين الله আল্লাহ কোথায়? সে বলল, في السماء “আল্লাহ আসমানে।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, أعتقها فإنها مؤمنة “তুমি তাকে আযাদ করে দাও কারণ সে মু’মিন।”[1]

সাহাবীগণ এবং ইহসানের সাথে তাদের অনুসারী উম্মতের তাবেঈগণ এবং উলামায়ে কেরামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর উপর। তাদের কারো থেকে এ বিষয়ে একটি শব্দও বর্ণিত নয় যে, তারা বলেছেন আল্লাহ তা‘আলা আসামানে নয়, অথবা তিনি মাখলুকের সাথে সংমিশ্রণ, অথবা তিনি জগতের ভিতরেও নয় বাহিরেও নয়, তিনি মিলিতও নয় এবং আলাদাও নয়, তিনি পৃথকও নয় কাছেও নয় ইত্যাদি। তাদের থেকে যত বর্ণনা এ পর্যন্ত পাওয়া যায়, তা থেকে জানা যায় যে, তারা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহ তা‘‌আলা উর্ধ্বে এবং তিনি সবকিছুর উপর।

যুক্তি দ্বারা প্রমাণ: যুক্তিও এ কথা প্রমাণ করে যে আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর উপর। যেমন আমরা যদি জিজ্ঞাসা করি যে, উর্ধ্বে থাকা এ পরিপূর্ণতার সিফাত নাকি অপরিপূর্ণতার? তখন জাওয়াব হবে উর্ধ্বে থাকাই পরিপূর্ণতা। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেছেন, ﴿وَلِلَّهِ ٱلۡمَثَلُ ٱلۡأَعۡلَىٰۚ ٦٠﴾ [النحل: ٦٠] “এবং আল্লাহর জন্য রয়েছে মহান উদাহরণ।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৬০] যে সব সিফাত পূর্ণতার অর্থকে বহন করে, সে সব সিফাত আল্লাহর জন্য অবশ্যই সাব্যস্ত হবে। যখন উপরে বা উর্ধ্বে হওয়া পূর্ণতা বলে যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত, তখন তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করাই ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা হয়তো উপরে হবেন অথবা নীচে হবেন অথবা মাঝখানে হবেন। নীচে হওয়া অসম্ভব। কারণ, তাতে রয়েছে অসম্পূর্ণতা। আর মাঝখানে হওয়াও অসম্ভব। কারণ, এটিও একটি অসম্পূর্ণ সিফাত যাতে আল্লাহ তা‘আলা ও তার মাখলুক বরাবর হওয়াকে বাধ্য করে। দু’টি সিফাত যখন আল্লাহর জন্য হওয়া অসম্ভব হয়ে গিয়েছে বাকীটা অর্থাৎ উর্ধ্বে হওয়া তার জন্য অবধারিত। সুতরাং, আল্লাহ তা‘আলা উর্ধ্ব হওয়া প্রমাণিত, তিনি প্রতিটি বস্তুর উর্ধ্বে।

মানব স্বভাব দ্বারা প্রমাণ: আল্লাহ তা‘আলা উর্ধ্বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিটি মানুষের স্বভাব ও সৃষ্টির সাথে জড়িত। প্রতিটি মানুষ যখন বলে ‘হে আল্লাহ’ তখন সে আকাশের দিক তাকায়। তার অন্তরে উপরের দিক মনোযোগী হয়, তার অন্তরে আর কোন দিক ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন অনুভুত হয় না। সুতরাং আমরা এ কথা নির্বিঘ্নে বলতে পারি যে, আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি বস্তুর উপর। আল্লাহ তা‘আলা প্রতি বস্তুর উপর হওয়া প্রমাণিত হওয়ার পর হাদীস—لو دليتم بحبل من  الأرض السابعة لوقع على الله  —“যদি তোমরা একটি রশিকে আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তার আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।” -টি দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা জমিনে এ কথা প্রমাণ করার কোন সুযোগ নেই।

যদি বলা হয়, আল্লাহ তা‘আলা এ বাণী: ﴿وَهُوَ ٱلَّذِي فِي ٱلسَّمَآءِ إِلَٰهٞ وَفِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَٰهٞۚ وَهُوَ ٱلۡحَكِيمُ ٱلۡعَلِيمُ ٨٤﴾ [الزخرف: ٨٤] “আর তিনিই আসমানে ইলাহ এবং তিনিই জমিনে ইলাহ; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা‘আলা যেমনিভাবে আসমানে এমনিভাবে তিনি জমিনেও।” [সূরা আয-যুখরফ, আয়াত: ৮৪]

উত্তর: না, আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নিজের ইলাহ হওয়া বিষয়ে সংবাদ দেন। তিনি আকাশ বা জমিনে তার অবস্থান জানানো সংবাদ দেননি। বরং তিনি বলছেন তিনি আসামানেও ইলাহ এবং জমিনেও ইলাহ। যেমন আমরা বলে থাকি অমুক মক্কায়ও গভর্নর এবং মদীনায়ও গভর্নর। এর অর্থ, তার কর্তৃত্ব মক্কা ও মদীনা উভয় শহরেই বিস্তৃত। যদিও সে যে কোন একটি শহরে সুনিদির্ষ্ট স্থানে বসবাস করে থাকে। দু’টি শহরে সে থাকে না। এ আয়াতটিও এ কথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর উলুহিয়্যাত জমিন ও আসমান উভয় স্থানে বিস্তৃত। যদিও তিনি থাকেন আসমানে। আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন।

শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.

[1] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১২২৭

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন