ঈমান

মূল:ঈমানের রুকনসমূহ

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম  সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

রাসূলগণের প্রতি আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনা ঈমানের তৃতীয় রুকন বা মৌলিক অঙ্গ।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছেন এবং তাদের ওপর কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছেন, মাখলুকাতের হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ; যাতে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যশালী হয় এবং যাতে তাদের চলার একটি সুন্দর পথ হয়। আর মানুষ যে বিষয়ে মতনৈক্যে লিপ্ত তার সমাধানকারী বা ফায়সালাকারী হয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِۖ﴾ [الحديد: ٢٥]

“অবশ্যই আমরা আমাদের রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মীযান (মানদন্ড); যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্টা করে।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২৫]

তিনি আরো বলেন,

﴿كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِۚ﴾ [البقرة: ٢١٣]

“সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নবীদেরকে পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে। আর তাদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২১৩]

(১) কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনার মূলকথা:

কিতাবসমূহের ওপর ঈমান হচ্ছে, এ কথার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহর অনেক কিতাব রয়েছে। যা তিনি তাঁর রাসূলগণের ওপর নাযিল করেছেন। আর তা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর বাণী। আর তা হল জ্যোতি ও হিদায়াত। আর নিশ্চয় এ কিতাবসমূহের মধ্যে যা রয়েছে তা সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠ, এর অনুসরণ করা ও তদানুযায়ী আমল করা ফরয। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এ কিতাবসমূহের সংখ্যা কেউ জানে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَكَلَّمَ ٱللَّهُ مُوسَىٰ تَكۡلِيمٗا ١٦٤﴾ [النساء: ١٦٤]

“আর আল্লাহ মূসার সাথে কথোপথন করেছেন যথাযথভাবে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَإِنۡ أَحَدٞ مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٱسۡتَجَارَكَ فَأَجِرۡهُ حَتَّىٰ يَسۡمَعَ كَلَٰمَ ٱللَّهِ﴾ [التوبة:٦]

“আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দিবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬]

(২) কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনার বিধান:

সকল কিতাবের ওপর ঈমান আনা যা আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের ওপর অবতীর্ণ করেছেন, আল্লাহ তা‘বারাকা ও তা‘আলা সত্যিকার অর্থে কিতাবসমূহের মাধ্যমে কথা বলেছেন এবং তা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) অবতীর্ণ, মাখলুক বা সৃষ্ট নয়, আর যে ব্যক্তি কিতাবসমূহ অথবা তাঁর কিছুকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا ١٣٦ ﴾ [النساء: ١٣٦]

“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর এবং বিশ্বাস স্থাপন কর তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের ওপর, যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন স্বীয় রাসূলের ওপর এবং সে সমস্ত কিতাবের ওপর যেগুলো অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইতোপূর্বে। যে আল্লাহর ওপর, তাঁর ফিরিশতাদের ওপর, তাঁর কিতাবসমূহের ওপর এবং রাসূলগণের ওপর ও কিয়ামত দিবসের ওপর ঈমান আনবে না, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ مُبَارَكٞ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُواْ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ ١٥٥﴾ [الانعام: ١٥٥]

“এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, খুব মঙ্গলময়। অতএব, এর অনুসরণ কর এবং তার তাকওয়া অবলম্বন কর; যাতে তোমরা করুনাপ্রাপ্ত হও।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৫]

(৩) এসব কিতাবের প্রতি মানুষের প্রয়োজনীয়তা এবং তা অবতীর্ণ করার পিছনে হিকমাত বা রহস্য:

প্রথমত: যাতে রাসূলের ওপর অবতীর্ণ কিতাব তাঁর উম্মাতের জন্য জ্ঞানকোষস্বরূপ হয়। ফলে তারা তাদের দীন সম্পর্কে জানার জন্যে এর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।

দ্বিতীয়ত: যাতে রাসূলের ওপর অবতীর্ণ কিতাব তাঁর উম্মাতের প্রত্যেক মতনৈক্যপূর্ণ বিষয়ে ইনসাফভিত্তিক বিচারক হয়।

তৃতীয়ত: যাতে অবতীর্ণ কিতাব রাসূলের ইন্তেকালের পর দীন সংরক্ষণকারী হিসেবে দাঁড়াতে পারে, স্থান ও কালের যতই দুরত্ব হোক না কেন। যেমন, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরবর্তী দাওয়াতের অবস্থা।

চতুর্থত: যাতে এ অবতীর্ণ কিতাবসমূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে হুজ্জাত তথা পক্ষ বিপক্ষের দলীলস্বরূপ হয়। যেন সৃষ্টজীব এ কিতাবসমূহের বিরোধিতা করা এবং এর আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা না করে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِ﴾ [البقرة: ٢١٣]

“সকল মানুষ একই জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নবীদেরকে পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসাবে। আর তাদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২১৩]

(৪) কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনার নিয়ম:

আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনা যায়।

সংক্ষিপ্ত ঈমান: এ ঈমান আনা যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণের ওপর অনেক কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।

বিস্তারিতভাবে ঈমান:

  • এ ঈমান আনা যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কারীমে যে সকল কিতাবের নাম উল্লেখ করেছেন, তার ওপর ঈমান আনা। তা থেকে আমরা জেনেছি কুরআন, তাওরাত, যাবুর, ইনজীল এবং ইবরাহীম ও মূসা আলাইহিমাস সালামের প্রতি অবতীর্ণ পুস্তিকাসমূহ।
  • আরো ঈমান আনা যে, ঐ সকল কিতাব ছাড়াও আল্লাহর অনেক কিতাব রয়েছে, যা তিনি তাঁর নবীগণের ওপর অবতীর্ণ করেছেন। আর আল্লাহ ছাড়া ঐ সকল কিতাবের নাম ও সংখ্যা কেউ জানে না।
  • আরও ঈমান আনা যে, এ কিতাবগুলো অবতীর্ণ হয়েছে যাবতীয় সৎকর্ম ও ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিমিত্তে সম্পাদনের মাধ্যমে তাঁর তাওহীদ বাস্তবায়ন এবং পৃথিবী থেকে শির্ক ও অন্যায়-অনাচার দূরীভূত করার জন্য। মূলত সকল নবীদের দাওয়াত এক মূলনীতির (তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শির্ক বর্জনের) ওপর ছিল, যদিও তারা নিয়ম কানুন ও বিধি-বিধানে কিছুটা ভিন্ন রকম ছিলেন।
  • এ ঈমানও রাখা যে, পূর্ববর্তী রাসূলদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল। আর আল-কুরআনের ওপর ঈমান আনার অর্থ হলো, তা অন্তরে ও মুখে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কুরআনে যা রয়েছে তা অনুসরণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِ﴾ [البقرة: ٢٨٥]

“রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুমিনরাও। সকলেই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৫]

তিনি আরো বলেন,

﴿ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَۗ﴾ [الاعراف: ٣]

“তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করো না।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৩]

পূর্ববতী কিতাবের চেয়ে কুরআনের কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

(১) আল-কুরআন স্বীয় শব্দ, অর্থ এবং ওতে যে জ্ঞান ও পার্থিব তথ্য রয়েছে তা সর্ববিষয়ে এক অলৌকিক শক্তি।

(২) আল-কুরআন সর্বশেষ আসমানী কিতাব, কুরআনের মাধ্যমে আসমানী কিতাবের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। যেমন, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের দ্বারা সকল রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

(৩) সকল প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন হতে আল্লাহ কুরআনকে হিফাযত করবেন। আর তাই অন্যান্য কিতাব থেকে তা স্বতন্ত্র। কেননা সে সব কিতাবে বিকৃতি ও পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটেছে।

(৪) আল-কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়ন ও সংরক্ষণকারী।

(৫) কুরআন পূর্ববর্তী সকল কিতাবের রহিতকারী।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَا كَانَ حَدِيثٗا يُفۡتَرَىٰ وَلَٰكِن تَصۡدِيقَ ٱلَّذِي بَيۡنَ يَدَيۡهِ وَتَفۡصِيلَ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ لِّقَوۡمٖ يُؤۡمِنُونَ ١١١﴾ [يوسف: ١١١]

“এটা কোনো মনগড়া কথা নয়, কিন্ত যারা ঈমান রাখে তাদের জন্য পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হিদায়াত।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১১১]

(৫) পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সংবাদ গ্রহণ করা:

আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, পূর্ববর্তী কিতাবে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের নিকটে অহীর মাধ্যমে যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য, তাতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। এর অর্থ এ নয় যে, বর্তমানে আহলে কিতাব তথা ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদের নিকট যে কিতাব রয়েছে তা গ্রহণ করবো। কারণ তা বিকৃত করা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের নিকট যেভাবে অবতীর্ণ করেছেন সেভাবে নেই। পূর্ববর্তী কিতাব থেকে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কিতাবে (কুরআনে) যে সংবাদ দিয়েছেন তা থেকে আমরা নিশ্চিতভাবে জেনেছি যে, ‘কেউ কারও গুনাহ বহন করবে না। মানুষ তাই পায় যা সে করে, তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।’ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَمۡ لَمۡ يُنَبَّأۡ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَىٰ ٣٦ وَإِبۡرَٰهِيمَ ٱلَّذِي وَفَّىٰٓ ٣٧ أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰ ٣٨ وَأَن لَّيۡسَ لِلۡإِنسَٰنِ إِلَّا مَا سَعَىٰ ٣٩ وَأَنَّ سَعۡيَهُۥ سَوۡفَ يُرَىٰ ٤٠ ثُمَّ يُجۡزَىٰهُ ٱلۡجَزَآءَ ٱلۡأَوۡفَىٰ ٤١﴾ [النجم: ٣٦، ٤١]

“তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইব্রাহীমের কিতাবে যে তার দায়িত্ব পালন করেছিল? কিতাবে আছে যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। আর তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ-প্রতিদান দেয়া হবে।” [সূরা আন-নজম, আয়াত: ৩৬-৪১]

তিনি আরো বলেন,

﴿بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا ١٦ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٧ إِنَّ هَٰذَا لَفِي ٱلصُّحُفِ ٱلۡأُولَىٰ ١٨ صُحُفِ إِبۡرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ ١٩﴾ [الاعلا: ١٦، ١٩]

“বস্তুত তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে, ইবরাহীম ও মূসার কিতাবসমূহে।” [সূরা আল-আ‘লা, আয়াত: ১৬-১৯]

পূর্ববর্তী কিতাবের বিধান: কুরআনে যে সকল বিধান রয়েছে তা মেনে চলা আমাদের অপরিহার্য। তবে পূর্ববর্তী কিতাবে যা রয়েছে তা নয়। কারণ আমরা দেখবো পূর্ববর্তী কিতাবে যে বিধান রয়েছে তা যদি আমাদের শরী‘আতের পরিপন্থী হয়, তবে আমরা তা আমল করবো না, তা বাতিল এ জন্যে নয় বরং তা সে সময় সত্য ছিল এখন তা আমল করা আমাদের ওপর অপরিহার্য নয়। কারণ, তা আমাদের শরী‘আত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। আর যদি তা আমাদের শরী‘আতের অনুরূপ হয়, তবে তা সত্য বলে বিবেচিত হবে। আমাদের শরী‘আত তা সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

(৬) কুরআন ও হাদীসে যে সকল আসমানী কিতাবের নাম উল্লেখ হয়েছে তা হলো:

(১) কুরআনে কারীম: কুরআন হলো আল্লাহর বাণী যা তিনি শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিল করেছেন।

কুরআন সর্বশেষ অবতীর্ণ কিতাব। আল্লাহ কুরআনকে বিকৃতি ও পরির্বতন থেকে হিফাযত করার দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেছেন এবং সকল আসমানী কিতাবের রহিতকারী করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]

“আমরা স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلۡكِتَٰبِ وَمُهَيۡمِنًا عَلَيۡهِۖ ﴾ [المائ‍دة: ٤٨]

“আর আমরা আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৮]

(২) তাওরাত: তাওরাত ঐ কিতাব যাকে আল্লাহ মূসা আলাইহিস সালামের ওপর নূর (জ্যোতি) ও হিদায়াতস্বরূপ নাযিল করেছিলেন। বনী ইসরাঈলের নবী ও আলেমগণ এর দ্বারা ফায়সালা করতেন। সুতরাং মূসা আলাইহিস সালামের ওপর আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তাওরাত-এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, বর্তমান তথাকথিত ইয়াহূদীদের হাতে বিকৃত তাওরাতের ওপর নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَا ٱلتَّوۡرَىٰةَ فِيهَا هُدٗى وَنُورٞۚ يَحۡكُمُ بِهَا ٱلنَّبِيُّونَ ٱلَّذِينَ أَسۡلَمُواْ لِلَّذِينَ هَادُواْ وَٱلرَّبَّٰنِيُّونَ وَٱلۡأَحۡبَارُ بِمَا ٱسۡتُحۡفِظُواْ مِن كِتَٰبِ ٱللَّهِ﴾ [المائ‍دة: ٤٤]

“নিশ্চয় আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে, আল্লাহর আনুগত্যশীল নবী, আল্লাহভক্ত ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইয়াহূদীদের ফায়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে আল্লাহর এই গ্রন্থের দেখাশোনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৪]

(৩) ইঞ্জীল: ইঞ্জীল ঐ কিতাব যা সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর নাযিল করেছিলেন, যা পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবের সত্যায়নকারী। সুতরাং ঐ ইঞ্জীলের ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, যা সঠিক মূলনীতিসহ আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর নাযিল করেছিলেন। খৃষ্টানদের নিকট বিকৃত ইঞ্জীলসমূহের ওপর নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَفَّيۡنَا عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِم بِعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلتَّوۡرَىٰةِۖ وَءَاتَيۡنَٰهُ ٱلۡإِنجِيلَ فِيهِ هُدٗى وَنُورٞ وَمُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ مِنَ ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَهُدٗى وَمَوۡعِظَةٗ لِّلۡمُتَّقِينَ ٤٦﴾ [المائ‍دة: ٤٦]

“আর আমরা তাদের পেছনে মারিয়ামের পুত্র ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাকে ইঞ্জীল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের-সত্যায়ন করে, পথ প্রদর্শন করে এবং এটি মুত্তাকীদের জন্যে হেদায়াত ও উপদেশবানী।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৬]

তাওরাত ও ইঞ্জীলে যা রয়েছে তন্মধ্যে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের সুসংবাদ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِيَّ ٱلۡأُمِّيَّ ٱلَّذِي يَجِدُونَهُۥ مَكۡتُوبًا عِندَهُمۡ فِي ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَٱلۡإِنجِيلِ يَأۡمُرُهُم بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَىٰهُمۡ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَٰلَ ٱلَّتِي كَانَتۡ عَلَيۡهِمۡۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُواْ ٱلنُّورَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٥٧﴾ [الاعراف: ١٥٧]

“যারা আনুগত্য করে এ রাসূলের, যিনি নিরক্ষর নবী, যার সম্পর্কে তাদের নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে, তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন নিকৃষ্ট বস্তুসমূহ, আর তাদের ওপর থেকে সে বোঝা নামিয়েছেন এবং সে বন্দীত্ব অপসারণ করেন যা তাদের ওপর বিদ্যমান ছিল।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭]

(৪) যাবুর: যাবুর ঐ কিতাব যা আল্লাহ দাউদ আলাইহিস্ সালাম-এর ওপর নাযিল করেছিলেন। সুতরাং ঐ যাবুরের ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব যা আল্লাহ দাউদ আলাইহিস সালামের ওপর নাযিল করেছিলেন। সে যাবুর নয় যা ইয়াহূদীরা বিকৃত করে ফেলেছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَءَاتَيۡنَا دَاوُۥدَ زَبُورٗا ٥٥﴾ [الاسراء: ٥٥]

“আর দাউদকে দান করেছি যাবুর।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৩, সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৫]

(৫) ইবরাহীম ও মূসা আলাইহিস সালামর সুহুফ বা পুস্তিকাসমূহ: তা ঐ সকল পুস্তিকা যা আল্লাহ ইবরাহীম ও মূসা আলাইহিস্ সালামকে দিয়েছিলেন। কুরআন ও হাদীসে যা উল্লেখ হয়েছে তা ছাড়া এ সকল পুস্তিকা হারিয়ে গেছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَمۡ لَمۡ يُنَبَّأۡ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَىٰ ٣٦ وَإِبۡرَٰهِيمَ ٱلَّذِي وَفَّىٰٓ ٣٧ أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰ ٣٨ وَأَن لَّيۡسَ لِلۡإِنسَٰنِ إِلَّا مَا سَعَىٰ ٣٩ وَأَنَّ سَعۡيَهُۥ سَوۡفَ يُرَىٰ ٤٠ ثُمَّ يُجۡزَىٰهُ ٱلۡجَزَآءَ ٱلۡأَوۡفَىٰ ٤١﴾ [النجم: ٣٦، ٤١]

“তাকে কি জানানো হয় নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে যে, তার দায়িত্ব পালন করেছিল? কিতাবে আছে যে, কেউ কারো গুনাহ বহন করবে না এবং মানুষ তা পায় যা সে করে। আর তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।” [সূরা আন-নজম, আয়াত: ৩৬-৪১]

তিনি আরো বলেন,

﴿بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا ١٦ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٧ إِنَّ هَٰذَا لَفِي ٱلصُّحُفِ ٱلۡأُولَىٰ ١٨ صُحُفِ إِبۡرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ ١٩ ﴾ [الاعلا: ١٦، ١٩]

“বস্তুতঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে। ইবরাহীম ও মূসার কিতাব বা পুস্তিকাসমূহে।” [সূরা আল-আ‘লা, আয়াত: ১৪-১৯]

আরকানুল ঈমান বা ঈমানের মৌলিক অঙ্গসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন:

প্রথম রুকন: মহান আল্লাহর ওপর ঈমান
দ্বিতীয় রুকন: ফিরিশতাদের ওপর ঈমান
তৃতীয় রুকন: আসমানী গ্রন্থসমূহের ওপর ঈমান
চতুর্থ রুকন: রাসূলদের ওপর ঈমান
পঞ্চম রুকন: শেষ দিবসের ওপর ঈমান
ষষ্ঠ রুকন: তাকদীরের ওপর ঈমান

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন