HZ73iLXh 400x400 e1570020392463 ইউসুফ এস্টেস এর নওমুসলিম হবার গল্পএক
আমার নাম ইউসুফ এস্টেস। আমাকে চিনেছেন তো? আপনারা যারা পিস টিভি দেখেছেন তারা আমাকে চিনবেন। ঐ যে বিরাট জুব্বা গায়ে লম্বা দাড়িওয়ালা সাদা চামড়ার আমেরিকান। আমার দর্শকবৃন্দ বলে থাকে, আমি নাকি মজা করে কথা বলি। কী জানি!

আমার জীবনে মজার কিছু ঘটনা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, আপনি তো ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক। আপনার মতো মানুষ কী করে মুসলিম হলেন?

এ প্রশ্ন কেবল মুসলমানদেরই নয়, একই প্রশ্ন অনেক অমুসলিমরাও করেন। বিশেষ করে খ্রিষ্টানরা। তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কী করে ধর্ম ত্যাগ করলে? মনে হয় যিশুর বাণী তুমি ভালো করে বোঝনি। বুঝলে কী আর খ্রিষ্টধর্ম ছেড়ে মুসলিম হতে পারতে? যাহোক, আপনাদেরকে আমি আমার মুসলিম হবার গল্প শোনাই।

আমার বাড়ি আমেরিকার টেক্সাসে। আমি আর আমার বাবা দুজনেই ছিলাম গির্জার মিনিস্টার। আমরা একদিকে ধর্ম প্রচার করতাম। অন্যদিকে, পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করতাম। সত্যি বলতে কী, ধর্মপ্রচারের চেয়ে আমাদের ব্যবসার কাজই বেশি হতো। নানা ধরনের ব্যবসার সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল।

একদিন আমার বাবা আমাকে বললেন, আমি একজন নতুন মানুষের সাথে ব্যবসা করতে যাচ্ছি। লোকটার বাড়ি মিসর।’

আমি উত্তর দিলাম ‘বাহ! ভালো তো! আমরা এখন দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশি লোকের সাথে ব্যবসা করতে যাচ্ছি। আমাদের ভিজিটিং কার্ডে লেখা থাকবে, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। ভাবতেই ভালো লাগছে।’

বাবা বললেন, এই লোকের বাড়ি মিসরের কায়রোতে। ঐ যে নীল নদ, মমি আর স্ফিংসের শহর! আমি বললাম, হুম! তাহলে তো ওই লোকের সাথে দেখা করাটা বেশ হবে!

বাবা বললেন, তবে একটা কথা। মানুষটি মুসলিম।

সেদিনের কথা আমার আজও মনে পড়ে। আমাদের বাড়িতেই বাপ-ব্যাটার কথা হচ্ছিল। আমি কথা বলতে বলতে রান্নাঘর থেকে বসার ঘরে আসছিলাম। বাবার শেষের কথা শুনে আমি রীতিমতো  থমকে গেলাম। আমি যেখানটায় ছিলাম সেখানেই আটকে গেলাম, কী বললে? মুসলিম! এ অসম্ভব! আমরা টিভিতে জিমি সো গার্ট, প্যাট রবার্টসন…এরকম অনেক ধর্মযাজকের কথা শুনতাম। আমরা জানতাম, মুসলিমদের চেয়ে খারাপ মানুষ আর নেই। যত খারাপ কাজ সব তাদের দ্বারাই হয়। হাইজ্যাক, ছিনতাই, খুন…সব। আমাদেরকে বলা হতো মুসলমানরা এমন যে, এরা ঈশ্বরেও বিশ্বাস করে না। তারা মরুভূমির ভেতরে একটা কালো  বাক্সের পূজা করে আর দিনে পাঁচ বার মাটিতে চুমু খায়। এরকম একজন মুসলিমের সাথে কথা বলা, ব্যবসা করা! | আমি আবার জোর দিয়ে বললাম, এ অসম্ভব!’ বাবা বললেন, “সে আসলেই মানুষ হিসেবে চমৎকার। আগে তো  তার সাথে দেখা কর। আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগছিল না। আমি কোনােভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। বাবা অনেকটা আমার উপর জোরই খাটালেন, ‘দেখ! আমি চাই তুমি তার সাথে দেখা কর, কথা বল। ব্যস! শেষে আমি রাজি হলাম, ঠিক আছে। তবে তার সাথে দেখা করব রোববারে। তার সাথে দেখা করার আগে আমার ইচ্ছে আমি চার্চ থেকে ফিরব। হাতে থাকবে। ক্রুশ আর বগলের নিচে বাইবেল। আমার মাথায় থাকবে ‘যিশুখ্রিষ্টই আমার প্রভু সম্বলিত ক্যাপ। এ অবস্থায়ই আমি ওই অবিশ্বাসী মুসলিমটার সাথে দেখা করব। যাতে তার ভেতরের শয়তানটা আমাকে দেখে পালিয়ে যায়।

ঠিক রোববার দিন আমি চার্চ থেকে ফিরে আসলাম। বাসায় ফিরে আমি সেই মুসলিম লোকটার খোঁজ করলাম। আমার মনে হচ্ছিল, লোকটা হবে বিরাট আলখাল্লায় ঢাকা, বিশাল দাড়ির অধিকারী কেউ। তার মাথায় থাকবে আরবদের মতো রোব, কোমরে গুজে থাকবে বিরাট তলোয়ার।

আমি এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলাম। কই, তেমন কাউকে তো  দেখছি না। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, কই? সেই মুসলিম লোকটা কই?

বাবা আঙুল তুলে দেখালেন, ‘ঐ তো সে।’

এই লোক? আমি কিছুটা অবাক হলাম। এতো  খুবই সাধারণ সাদাসিধে একজন মানুষ। তার মুখে লম্বা দাড়ি নেই। এমনকি মাথাও চুলহীন, খালি। আমি হাত বাড়িয়ে তার সাথে পরিচিত হলাম। তার নাম মুহাম্মাদ। প্রাথমিক আলাপচারিতার পর শুরু হলো  প্রশ্নোত্তর। অনেকটা জেরার মতোই বলতে পারেন।

‘তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস কর?

‘ইবরাহিম, সুলেমান, দাউদ এদেরকে মাননা? ‘জি, মানি।

আরে এ তো  দেখি সবই মানে! প্রথমে ভেবেছিলাম, মুসলমানরা বোধহয় হিন্দুদের মতো। যখন দেখলাম এই লোক ইবরাহিম, সুলেমান, দাউদকে মানে, তখন ভাবলাম এরা বোধহয় ইহুদিদের মতোই।

তাই এবার জিজ্ঞাসা করলাম, আর যিশুকে মানো?

সে উত্তর দিল, ‘জি মানি।

আমি তো  মনে মনে মহাখুশি। যাক এই লোককে খুব সহজেই খ্রিষ্টান বানানো যাবে। আমি তাকে নিয়ে এবার চায়ের টেবিলে বসলাম। খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে ফাকে চলতে থাকল আমাদের আলাপচারিতা। বলতে গেলে সব কথা আমিই বলছিলাম। আমি তার সামনে বাইবেল থেকে পড়তে শুরু করলাম, আর তাকে খ্রিষ্টান ধর্মের বিভিন্ন কিছু বুঝানোর চেষ্টা করছিলাম।

তিনি একটি কথাও বলেননি। মনোযোগী শ্রোতার মতো  চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন। আমি ভাবলাম, তিনি স্বল্প শিক্ষিত এবং ধর্ম সম্পর্কে কম জানা একজন মানুষ।

আজ সেসব কথা ভাবলে মনে হয়, তখন কী ইডিয়টই না ছিলাম আমি! আসলে তিনি ছিলেন আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা একজন গ্র্যাজুয়েট। পরের রমজানে তিনি মসজিদে থাকা শুরু করলেন। মূলত তিনি ইতেকাফ করছিলেন। কিন্তু আমরা সেটা বুঝিনি। আমি বাবাকে বললাম, “দেখ, লোকটার থাকার ভালো  কোনো ব্যবস্থা নেই। বাবা বললেন, ‘কী বলো ! আমি তো জানি তার টাকা পয়সা ভালোই আছে। এমন তো  হবার কথা নয়। আমি বললাম, আমি নিজ কানে শুনেছি, তিনি মসজিদে থাকা শুরু করেছেন। আমাদের খ্রিষ্টানদের কাছে কোনো লোক চার্চে থাকা মানে, লো কটা অত্যন্ত হতদরিদ্র কিংবা অসহায়।। আমি বাবাকে বললাম, এক কাজ করি। আমি তাকে বলি যেন তিনি আমাদের সাথে থাকেন। বাবা বললেন, ‘শুধু শুধু এমন কিছু করতে যেও না। তিনি হয়তো মাইন্ড করতে পারেন।

আমি তাও জিদ ধরলাম ‘আহা! বলেই দেখি না!’

পরে একদিন আমি মুহাম্মাদকে আমাদের সাথে থাকার প্রস্তাব দিলাম। তিনি বললেন, ‘না! আমি মসজিদে ভালো ই আছি আর সেখানেই থাকতে চাই।’ আমি বললাম, আমাদের কোনো  অসুবিধা নেই। আপনি আমাদের সাথেই থাকুন। তিনি আবারও বললেন, “না না! আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি সেখানেই ভালো  আছি।

আহারে বেচারা! তার জন্য আমার মায়াই লাগছিল। কষ্ট করে মসজিদে থাকছে, কিন্তু আত্মসম্মানবোধের জন্য আমাদের সাথে থাকতে রাজিও হতে পারছেন না।

আমি তার আত্মসম্মানের দিকে চিন্তা করে প্রস্তাব করলাম, আপনি ইচ্ছে করলে এর জন্য আমাদের ভাড়াও দিতে পারেন।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কত?

আমি বললাম ‘সপ্তাহে পনেরো ডলার। আমেরিকার মতো  জায়গায় সপ্তাহে পনেরো  ডলার আসলে কিছুই না।।

তিনি টা ইতস্তত করছিলেন। আমি তার ইতস্তত ভাব দেখে বললাম সাথে খাবার ফ্রি।খাওয়াসহ একদিন থাকতে গেলেই যেখানে পনেরো  ডলারের বেশি খরচ হয়, সেখানে কিনা পুরো সপ্তাহের জন্য মাত্র পনেরো  ডলার।আমি ভাবছিলাম, আমাদের সাথে থাকলে তার সাথে আরও বেশি কথা বলা যাবে।কনভাবে হয়তো তাকে আমি খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে পারব। তিনি এবার সায় দিলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে। ফিরে এসে বাবাকে বললাম, “দেখলে তো, তাকে কীভাবে রাজি করিয়ে নিলাম!” আমি তো  আর জানতাম না, আসলে তিনিই মনে মনে আমাদের সাথে থাকতে চাইছিলেন। তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, আমেরিকানদের চলাফেরা, চাল-চলন,সাংস্ক্রিতি কেমন। বিশেষ করে যারা ধর্ম প্রচার করে তাদের।

দুই

আমরা একসাথে ব্যবসা শুরু করলাম।

কখনো  কখনো  আমরা টেবিল চেয়ার সাজিয়ে বিভিন্ন পণ্য সামনে নিয়ে বসতাম।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। যখনই কেউ সামনে থেকে কোনো  জিনিস নিতে চাইত, তিনি পেছন থেকে আরেকটি ভালো মানের জিনিস ক্রেতার দিকে এগিয়ে দিতেন।

আমি বললাম, মুহাম্মাদ,আমরা সাধারণত মানের দিক দিয়ে কিছুটা খারাপ জিনিসগুলো  সামনে রাখি। আর ভালো গুলো  রাখি পেছনে। যাতে একটু খারাপ মানের পণ্যগুলো  আগে বিক্রি হয়ে যায়। তুমি আবার আগ বাড়িয়ে মানুষকে পেছন থেকে দিতে গেলে কেন?

তিনি বললেন, এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়।’

“কেন?

কারণ, আমার ধর্ম আমাকে শিক্ষা দেয়, বিক্রির সময় ভালো টাই ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে। মন্দটা নয়।

আচ্ছা! তিনি তাহলে তার ধর্মকে সেরা বুঝাতে চাইছেন! আমি আপাতত চুপ করে গেলাম। তবে এতে আমাদের লাভের অঙ্ক কমে গেল।

তার সাথে থেকে থেকে আমি আরও অনেক কিছু শিখলাম। তিনি ছিলেন বিনয়ী, শিক্ষিত এবং খুব বুদ্ধিমান একজন মানুষ। আমাদের মধ্যে অনেক বিষয় নিয়ে কথা হতো।

তিনি চাইলে যেকোনো  বিতর্কে আমাকে খুব সহজেই নাস্তানাবুদ করে দিতে পারতেন। কিন্তু লোকটা এতটাই বুদ্ধিমান ছিলেন, তিনি বুঝতে পারছিলেন আমি কী করতে আর কী বুঝাতে চাইছি। তিনি ইচ্ছে করেই প্রায় সব বিতর্কে আমাকে জিতিয়ে দিতেন।

আমাদের এলাকায় একজন নামকরা খ্রিষ্টান পাদ্রি ছিলেন। তিনি বিশাল এক ক্রুশ হাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। যাতে লোকজন তার কাছে এগিয়ে আসে আর তার সাথে কথা বলে। তিনি এভাবে মানুষকে বাইবেলের বাণী শুনাতেন।

একবার তিনি খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। আমি হাসপাতালে তাকে দেখতে গেলাম। সেখানে তার পাশে আরেকজন মানুষের সাথে আমার দেখা হলো। এই মানুষটি ছিলেন খুব চুপচাপ। কারও সাথেই তেমন একটা কথা বলতেন না। দেখেই বুঝা যেত তার জীবনের উপর দিয়ে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেছে। দুখী দুখী আর হতাশায় ঢাকা যন্ত্রণা-ক্লিষ্ট চেহারা।

আমি তাকে সান্ত্বনা দিতে গেলাম, ‘মন খারাপ করবেন না। ইউনুস নবির ঘটনা জানেন তো ? তিনি গহীন সাগরে মাছের পেটে দিন কাটিয়েছিলেন। মাছের পেটে থাকা… ভাবা যায়! খাবার নেই, পানি নেই, নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস। এ অবস্থায়ও তিনি ঈশ্বরকে ভো লেননি। ঈশ্বর তাকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছেন। আপনার অবস্থা নিশ্চয় তার চেয়ে খারাপ নয়। ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখুন। তিনি নিশ্চয়ই আপনার সকল বিপদ-আপদ দূর করে দিবেন।

‘হুম’, যেন অনেক অনিচ্ছা নিয়ে জবাব দিলেন।

আমি জানতে চাইলাম, আপনার নাম কী?’ । কোনো জবাব নেই।

আমি আবার বললাম, আপনার বাড়ি কোথায়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘ভেনাস।

ভেনাস! বুঝতে পারলাম, তিনি আমার সাথে কথা বলতে চাইছেন না। তাই বিরক্তি নিয়ে বুঝাতে চাইলেন, তিনি ভিন গ্রহের মানুষ!

আমি হাসপাতালে গিয়ে প্রায়ই তার সাথে কথা বলতে চেষ্টা করতাম। তাকে নিয়ে এদিক-সেদিক হুইল চেয়ারে ঘুরতাম। একদিন দেখি তিনি কাঁদছেন। আমাকে দেখে বললেন, আমার কিছু দোষ স্বীকার করার আছে। খ্রিষ্টান ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী ক্যাথলিক ফাদারের সামনে মানুষজন দোষ স্বীকার করে থাকে। কিন্তু আমিত  প্রো টেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক নই। সে কথা তাকে বলতেই তিনি উত্তর দিলেন, আমি তা খুব ভালো  করে জানি। কারণ, আমি নিজেই একজন ক্যাথলিক ফাদার।

ইয়া খোদা! আমি মনে মনে ভালো ই লজ্জা পেলাম ‘ইনি নিজে একজন ক্যাথলিক ফাদার, আর আমি কিনা তাকে বাইবেল বুঝাচ্ছিলাম। এ যেন মায়ের কাছে নানা বাড়ির গল্প।

“দেখুন, আমি খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি। তিনি বলতে লাগলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকসহ জীবনের আরও নানা ঝড়-ঝঞার মধ্যে দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। আমার মনটা ভালো নেই। আমি দুঃখিত আপনার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছি, খারাপ ব্যবহার করেছি’ এ কথা বলে তিনি কাঁদতে থাকলেন। লোকটার জন্য আমার খুব মায়া হলো। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিলাম। দিন কয়েক পরে হাসপাতালে গিয়ে মানুষটাকে আমি আর দেখতে পেলাম না। কী ব্যাপার, গেল কোথায়? আমি হাসপাতালের রিসিপশনে গিয়ে খোঁজ নিলাম। রিসিপশনিস্ট মহিলা আমাকে জানালো, তিনি বাড়ি চলে গেছেন। ‘বাড়ি! তার তো কোনো  বাড়ি নেই, নেই কোনো পরিবার। মহিলা কিছুটা ঝাঁঝালো  কণ্ঠে উত্তর দিল, সে কথা আমাকে বলছেন কেন। তিনি কোথায় আছেন- সেটা দেখা নিশ্চয়ই আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ‘তাহলে তার ফাইলটা আমাকে দাও। সেখানে নিশ্চয় তার ঠিকানা দেয়া থাকবে। ওটা দেখে আমি খুঁজে নিতে পারব তিনি কোথায় গিয়েছেন।

‘যে কাউকে ফাইল দেখানোর নিয়ম নেই।’

আমি মহিলার চোখের দিকে তাকালাম। তারপর কঠিন স্বরে বললাম “দেখ, এই লোক অসুস্থ! তার যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে আমি কিন্তু তোমার আর তোমাদের এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করব। তখন কিন্তু তোমরা তার দায় এড়াতে পারবে না।’

মহিলা নিতান্ত অনিচ্ছা সহকারে ফাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। ফাইলে দেখলাম, একটা আশ্রয় শিবিরের নাম লেখা। যাদের কোনো  ঘর বাড়ি নেই, থাকার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই, তারা এমন আশ্রয় শিবিরে থাকে।

আমি তাকে সেখানেই পেলাম। তিনি তখনো  ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন। আমাকে দেখে তিনি আবার অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন, দয়া করে আমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও। এখানকার পরিবেশ আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

আমি তাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এলাম। আমার বাড়িতে তখন দুজন অতিথি। একজন ক্যাথলিক, আরেকজন মুসলিম। আমার চিন্তা ছিল ক্যাথলিক ফাদারকে দাওয়াত দিয়ে প্রো টেস্ট্যান্ট বানানো, আর মুসলিম মুহাম্মাদকে খ্রিষ্টান।

মানুষ কী ভাবে, আর কী হয়!

আমরা রাতে গোল হয়ে বসে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতাম। আমার বাবার বাইবেল ছিল কিংস জেমস সংস্করণ। আপনারা যারা জাকির নায়েক কিংবা আহমেদ দিদাতের লেকচার শুনেছেন, তারা হয়তো  এই বাইবেল সম্পর্কে শুনে থাকবেন।

আমার পছন্দ ছিল ১৯৫৩ সালের রিভাইসড স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন। আমার বাইবেলের ভূমিকায় আবার বলা ছিল, কিংস জেমস ভার্সনে মারাত্মক ভুল-ত্রুটি আছে। এই দুই বাইবেল নিয়ে আমাদের বাপ-ব্যাটার প্রায়ই তর্ক হতো। আমি বলতাম এটা ঠিক, তিনি বলতেন ওটা।

আমার বউয়ের হাতে ছিল জিমি সোগার্টের বাইবেল। সেটি আবার আমাদের চেয়ে পুরাদস্তুর আলাদা।

ক্যাথলিক ফাদারের বাইবেল ছিল আবার আরেক রকম। তার সাথে আমাদের অনেক কিছুই মিলে না। আমাদের বাইবেলে অধ্যায় ৬৬, আর তার বাইবেলে ৭৩। খাবার টেবিলে এই নিয়ে ভালোই একটা গোল বাধত। আমি একটা বলছি, তো বাবা বলছে আরেকটা। আমার বউ বলে অন্যটা, আর ক্যাথলিক ফাদার পুরো পুরি ভিন্ন কিছু। কারও সাথেই কারও অধ্যায়, লাইন, বাক্য… কিছুই মিলে না।।

আমাদের এই তর্ক-বিতর্কের মাঝে মুসলিম মুহাম্মাদ চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে থাকতেন। একদিন আমিই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “হে মুহাম্মাদ! তোমাদের কুরআনের সংস্করণ কয়টা?

তিনি জবাব দিলেন, কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন কোনো  সংস্করণ নেই। এর একটাই সাংস্করণ, যা তার আদি আরবি ভাষাতেই সংরক্ষিত আছে। এটি সেই কিতাব যার মধ্যে কোনো  সন্দেহ-সংশয় নেই, যা মুত্তাকিদের জন্য পথ প্রদর্শক।

আমি তো  অবাক! ব্যাটা বলে কী? কুরআন নাকি এখনো তার আদি ও আসল ভাষাতে সংরক্ষিত আছে। আমার মনে হচ্ছিল, ব্যাটা নিশ্চিতভাবেই গুল মারছে, না হয় মিথ্যা বলছে।

আমি আরবি জানতাম না। তাই পরীক্ষা করে দেখতেও পারছিলাম না, আসলেই তার দাবি সঠিক কিনা। তিনিও আর যুক্তি-তর্ক দিয়ে তা প্রমাণ করতে যাননি।

শুধু আমার চিন্তার সাগরে একটু ঢেউ তুলে গেলেন মাত্র।

তিন

আমাদের বাইবেলের মধ্যে এত বৈপরীত্য, এত সংস্করণ, অথচ কুরআনের কোনো সংস্করণ নেই। সত্যি কথা বলতে আমার এতদিনের বিশ্বাসের মূলে বড় ধরনের ঝকনি লাগল। প্রথমবারের মতো আমি আমার বিশ্বাস নিয়ে ভাবা শুরু করলাম।

খ্রিস্টান ত্রিত্ববাদ নিয়ে আপনাদের ধারণা আছে তো? তাহলে একটু বলে নেই। আর বিশ্বাস করে স্রষ্টা এক, তবে তার তিনটি রূপ। পিতা, পুত্র আর পবিত্র আত্তা পিতা বলতে মূলত স্বর্গে থাকা ঈশ্বরকেই বুঝায়। পুত্র হলেন যিশু। আর পবিত্র আত্মা হলো  পৃথিবীর সব কার্যকারণের পেছনের ঈশ্বরের নির্দেশনা। এই তিন মিলেই ঈশ্বর। তারা আলাদা আলাদা সত্তা, কিন্তু সবাই মিলে এক।

এত দিন আমি খুব সরল মনেই এই ত্রিত্ববাদের ধারণা বিশ্বাস করে এসেছিলাম। এখন আমার মধ্যে এ নিয়ে নানা প্রশ্নের উদয় হলো । ওই যে ক্রুশ হাতে নেয়া খ্রিষ্টান পাদ্রির কথা বলেছিলাম, বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে আমি তার কাছে গেলাম।

তাকে গিয়ে বললাম, আমি এই ত্রিত্ববাদের ধারণাটা আরও ভালো করে বুঝতে চাই।’

তিনি অবাক হলেন, তুমি তো তা খুব ভালো করেই জানো।

হ্যা, এই মতবাদের ইতিহাস ও ব্যাখ্যা জানি। কিন্তু আসলে আমি বলতে চাইছি, সহজ ভাষায় মানুষকে কী করে বুঝাতে পারি, ঈশ্বরের তিন অংশ, তিনটাই স্বতন্ত্র, কিন্তু তিনে মিলে তিন নয় বরং একই ঈশ্বর।

‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে বুঝাচ্ছি’ তিনি বলা শুরু করলেন ‘ধরে নাও, এটা একটা আপেলের মতো। আপেলের মধ্যে কী দেখতে পাও? আপেলের বাইরে লাল রঙয়ের চামড়া, ভেতরে সাদা অংশ। তারও ভেতরে থাকে আপেলের দানা। এই তিন মিলেই পুরো একটা আপেল। ক্লিয়ার?

বাড়ি ফেরার পথে আমি এই যুক্তি নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, আমি মুসলিম মুহাম্মাদকে কী করে এই ব্যাখ্যা দিব। মনে মনে তার সাথে আমার আলাপচারিতা কল্পনা করছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, এই ব্যাখ্যা তিনি কোনো ভাবেই মেনে নিবেন। তিনি হয়তো  বলবেন, আপেলের ভেতরে দানা তো  একাধিক থাকে। তবে কি ঈশ্বরও অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে না?

আমি আবার সেই পাদ্রির কাছে ফিরে এলাম, আপেলের ভেতরে যদি অনেকগুলো  দানা থাকে, তাহলে তিনে মিলে এক এটা বুঝাব কী করে? তিনি বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। আপেলের উদাহরণ ভুলে যাও। মনে কর একটা ডিম। তার বাইরে খোসা থাকে। ভেতরে সাদা অংশ। আর তার মধ্যে হলুদ কুসুম। এই তিনে মিলে হয় একটা ডিম। এবার ঠিক আছে?

আমি আবার ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা ডিমের ভেতরে তো  মাঝে মাঝে দুইটা কুসুম থাকে। তাহলে তো  ঈশ্বর চারজন হয়ে যাচ্ছে। নাহ, এই উদাহরণটাও ঠিক যুতসই হলো  না।

মুহাম্মাদ বলেছে, তার ধর্মে ঈশ্বর একজনই। আর আমাদের ধর্মে তিনজন মিলে। একজন; যুক্তির দিক দিয়ে আমাদেরটা ঠিক বুঝে আসছিল না।

দিন কয়েক পরে বাজারে এক পরিচিত ধর্ম প্রচারকের সাথে দেখা হলো। তাকে বললাম, “দেখ! এই ত্রিত্ববাদের ধারণাটা ঠিক আমার মাথায় ঢুকছে না।’

‘কী! তুমি একজন ধর্মযাজক, আর তুমিই কিনা ত্রিত্ববাদ বুঝতে পারছো না!” তিনি বলতে গেলে প্রায় আঁতকে উঠলেন। ‘হ্যা, সত্যি বলতে আসলেই তা আমার কাছে অযৌক্তিক ঠেকছে। তিনজন মিলে একজন হয় কী করে?

‘আচ্ছা ঠিক আছে। অন্যভাবে বুঝার চেষ্টা কর। ধর, আমি একজন। আমার আছে স্ত্রী আর পুত্র । এই তিনজন মিলে হয় একটি পরিবার। ঈশ্বরও অনেকটা তেমনই।

আদি আরেকটা সন্তান হয়, তাহলে তো  চারজন হয়ে গেল। কিংবা ধরো,

স্বামী স্ত্রী যদি ডিভোর্স হয়ে যায়, তাহলে তো পরিবার আর থাকল না। দুই জন ঈশ্বরের মধ্যে তালাক হয়ে যাওয়া, এটা কি ভালো শোনায়?

না কেনো  উত্তরই যুতসই মনে হচ্ছে না। আমি গেলাম মুহাম্মাদের কাছে।

জিগ্যাস করলাম, আচ্ছা! তোমাদের কাছে ঈশ্বরের রূপ কিংবা পরিচয় কী? ভাবুন তো, তিনি কী উত্তর দিয়েছিলেন? তিনি কুরআনের সূরা ইখলাস পাঠ করে গেলেন, ‘বলো, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তিনি কারও ঔরসে জন্মাননি। কোনো  একটা জিনিসও তার সমতুল্য নয়। আহ, কী সুন্দর আর সহজ-সরল বক্তব্য। আমার বিবেক-বুদ্ধি-মনও এমনটাই দামর্থন করে’- আমি মনে মনে ভাবছিলাম। যদিও সবার সামনে তা স্বীকার করতে পারিনি।

আপনাদের কিছু মজার কথা বলি। গোটা বাইবেলে ত্রিত্ববাদ (Trinity) শব্দটাই নেই, অথচ কুরআনে আছে। আল্লাহ কুরআনে সূরা নিসার ১৭১ নং আয়াতে বলে হেন, “তোমরা বলো না আল্লাহ তিনজন। বাইবেল শব্দটাও বাইবেলে নেই।গ্রিক শব্দ বাইবেলের মানে হলো বই। অথচ শব্দটার অস্তিত্ব কুরআনে খুঁজে পাওয়া যায়; যেমন আহলে কিতাব।

আমি কুরআনে এরকম আরও অনেক কিছুই খুঁজে পাই, যা যুক্তি ও বুদ্ধির দিক দিয়ে সহজ এবং গ্রহণযোগ্য। এমন অনেক কিছু আছে, যার সুন্দর ব্যাখ্যা বাইবেলে নেই, কিন্তু কুরআনে আছে। যদিও মুখে আমি কখনোই স্বীকার করিনি। একদিন আমার বাসায় থাকা সেই ক্যাথলিক ফাদার মুসলিম মুহাম্মাদের সাথে তাদের মসজিদে গেলেন। ফিরে আসার পরে আমরা তাকে ঘিরে ধরলাম, বলুন তো  দেখি, সেখানে আপনি কী দেখলেন? মুসলমানেরা মসজিদে কী করে? পশু জবাই দেয়? আনন্দ ফুর্তি করে?

না! তারা শুধু কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে। নামাজ শেষ হলে সবাই মসজিদ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কী! খালি নামাজ পড়ে আর কিছু হয় না? আচ্ছা বলুন দেখি, সেখানে কী বাদ্য বাজানো হয়?

“সেখানে কোনো বাদ্য বাজানো  হয় না।’

এই লোক বলে কী! গান বাদ্য ছাড়া আবার ঈশ্বরের উপাসনা হয় নাকি? আমরা খ্রিষ্টানরা চার্চে গান বাদ্য ছাড়া স্রষ্টার উপাসনা চিন্তাই করতে পারি না।।

আমি এবার মুহাম্মাদের দিকে ফিরলাম, “তোমরা মসজিদে বাদ্য বাজাও না? তিনি উত্তর দিলেন, ‘না’। ‘সারা পৃথিবীতে তোমাদের কতগুলো  মসজিদ আছে?

‘লক্ষ লক্ষ।

আমার মাথায় দারুণ এক বুদ্ধি এল। আমার নিজের বাদ্যযন্ত্র, পিয়ানো  ইত্যাদির ব্যবসা আছে। আমি যদি এই সব মসজিদে পিয়ানো  আর বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সরবরাহ করতে পারি, তবে তো  অল্প দিনেই বিরাট কোটিপতি হয়ে যেতে পারি।

যাকগে, কয়েক মাস পরের কথা। সেটা ছিল ১৯৯১ সালের জুলাইয়ের একদিন। সেই ক্যাথলিক ফাদার মুসলিম মুহাম্মাদের সাথে সেদিনও মসজিদে গিয়েছেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেল তাদের আর ফেরার নাম নেই। কী ব্যাপার, দুজনে গেল কই? নির্দিষ্ট সময়ের আরও অনেক পরে দেখি মুহাম্মাদ ফিরে এসেছে।

মুহাম্মাদ তো  এল, কিন্তু সাথের এই লোকটা কে? আরে…একি! এ আমি কী দেখছি? বিরাট সাদা জুব্বায় আবৃত লোকটা… ‘পিট! তুমি… তুমি…’ বিস্ময়ের ধাক্কা আমি কোনােভাবেই সামলে উঠতে পারছিলাম না। তুমি মুসলমান হয়েছ?

ক্যাথলিক সেই ফাদারের নাম ছিল পিটার জ্যাকবস। তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, “আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।’ সবকিছু কেমন এলোমেলো  লাগছিল। আমি নিজে মনের অজান্তে কুরআনের ব্যাখ্যা মানুষের সামনে তুলে ধরছি। এখানে এক ক্যাথলিক ফাদার মুসলিম হয়ে বসে আছেন। এদিকে আমার বাবাও দেখি ক্যাথলিক ফাদারের মুসলিম হবার খবর বেশ ভালো ভাবেই নিয়েছেন।

আসলে সব হচ্ছেটা কী? আমারই বা কী করা উচিত এখন। ভাবলাম, আমার বউয়ের সাথে এ নিয়ে কথা বলা দরকার।

অগো শুনেছ! ক্যাথলিক ফাদার পিটার মুসলিম হয়ে গেছে। কুরআন হাদিসের বানি নাকি তার কাছে সঠিক আর যৌক্তিক ঠেকছে’ আমি বউকে গিয়ে বললাম।

শুনলাম। এবার আমার কথা শোনো। বউয়ের পরের কথা শুনে আমার মাথায় কমা ভেঙে পড়ল। আমি তোমার কাছে ডিভোর্স চাই।।

বলতে এলাম কী, আর এ আমি কী শুনছি!

চার

আরে আরে, উল্টাপাল্টা কী বলছ এসব! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? তোমার কি ধারণা আমি ইসলামের গুণগান করতে এসেছি? নাকি ভেবেছ, আমি মুসলমান হয়ে যাব? আমি হব মুসলমান! ইয়াক! এ তুমি ভাবলে কী করে? সে বলল, আমি ডিভোর্স  চাইছি, কারণ কোনো  মুসলিম একজন খ্রিষ্টানের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারে না।’

আরে…আস্তে…আস্তে…বললাম তো…আচ্ছা, আমি খোদার নামে কসম করে বলছি,আমি জীবনেও মুসলিম হব না। তাহলে এই খ্রিষ্টান মুসলমানের বিয়ে হবার কথা আসছে কোথা থেকে? আর আমি যদি মুসলিম হতামও আমি যতদূর জানি, একজন মুসলিম পুরুষ একজন খ্রিষ্টান নারীকে বিয়ে করতে পারে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

“এখানেই তো  সমস্যা। একজন মুসলিম নারী ভিন্নধর্মী পুরুষকে বিয়ে করতে পারে না। সে খুব শান্ত স্বরে উত্তর দিল, আমি মুসলিম হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

আমার আজও মনে আছে, আমি খাটের কিনারে বসে কথা বলছিলাম। তার উত্তর শুনে খাট থেকে পড়েই গিয়েছিলাম প্রায়।

আমার মনে হলো আর ভয়ের কিছু নেই, নেই লুকোচুরির কিছু। আমার অন্তর বোধহয় এর জন্য অনেক আগ থেকেই প্রস্তুত হয়ে ছিল। হয়তো নিজের কাছে নিজে স্বীকার করে নিতে সাহস হচ্ছিল না। আমি উফুল্ল হবার ভঙ্গি করে বললাম, তাহলে আমিও তোমাকে সুংসবাদ দিই। আমি নিজেও মুসলিম হয়ে যাবার চিন্তা করছি।’

‘আমি তোমার কথা মোটেও বিশ্বাস করি না।

‘হ্যা! সত্যি বলছি। আমি নিজেও এ নিয়ে ভাবছিলাম। যাক ভালোই হলো, দুজন একইসাথে মুসলিম হওয়া যাবে। এখন স্বামী-স্ত্রী দুজনই তো  মুসলিম। তাহলে তো  আর কোনো  সমস্যা থাকল না, ডিভোর্সেরও দরকার হচ্ছে না। কী বল?

‘তুমিই তো  সেই লোক যে কিছুক্ষণ আগে কসম কেটে বলছিলে, জীবনেও মুসলিম হবে না। আবার এখন আমার সাথে তাল মিলিয়ে বলছ, তুমিও মুসলিম হবে। তোমার কোন কথাটা সত্যি? হয় তুমি এখন মিথ্যা বলছ, নয় আমাকে খুশি রাখতে একটু আগে মিথ্যা বলেছ। ঘুরেফিরে তুমি একটা মিথ্যাবাদী। আর আমি কোনো  মিথ্যাবাদীর সাথে ঘর করতে চাই না।’

আমি টলতে টলতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। আমি মুহাম্মাদকে ডাক দিলাম। বাইরে টেক্সাসের সুন্দর রাত। নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ইসলাম নিয়ে কথা বলছিলাম। আমি মুহাম্মাদের কাছ থেকে ইসলামের বিশ্বাস, নানা বিধি-বিধান জেনে নিচ্ছিলাম। এবারে আর কোনো বিতর্কের উদ্দেশ্য নয়, সত্যিই মন থেকে বোঝার জন্য।

আমার মনে আছে, কথা বলতে বলতে প্রায় ভোর হয়ে এসেছিল। আমি তখন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। যদিও এ ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ও কঠিন সিদ্ধান্ত। মুহাম্মাদকে এ কথা বলতেই সে বলল, “দেখ! এ তোমার নিজের সিদ্ধান্ত। ভালো মতো ভেবে দেখ তুমি কী করবে। তুমি কী সিদ্ধান্ত নিবে, এ ব্যাপারে আমার কিছু বলারও নেই, করারও নেই।

ফজরের সময় মুহাম্মাদকে দেখলাম, কিবলামুখী হয়ে নামাজ পড়তে। কী চমৎকার সে দৃশ্য! কী বিনয়ী, শান্ত সমুজ্জ্বল তার মুখ। মহান রাব্দুল আলামিনের সামনে মাথা নিচু করে নিজেকে সমর্পিত করার সে দৃশ্য আমাকে বিমোহিত করে দিল।

আমি সবার আড়ালে, যেন কেউ আমাকে দেখতে না পায়, এমন করে মহান প্রভুর উদ্দেশে ঠিক তেমনি মাটিতে নিজের মাথা ছোঁয়ালাম। আমার মন আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠেছিল। আমি কেবল একটি কথাই বলতে পেরেছিলাম, হে আল্লাহ! আমাকে পথ দেখাও। হে রব, আমাকে সঠিক পথ পেতে সাহায্য কর।

খানিকক্ষণ পরে আমি মাথা তুললাম। না, রূপকথার গল্পের মতো কোনো  অদ্ভুত কিছু ঘটেনি। এমন নয় যে, আকাশে হঠাৎ রংধনু উঠে হাসছে, কিংবা পরিরা গানের তালে তালে আমার চারিদিকে নাচছে। টেক্সাসের সেই দিনটাও ছিল, অন্য দশটা সাধারণ দিনের মতোই কোলাহল মুখর। কিন্তু আমার ভেতরে…

আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার ভেতরটা আর আগের মতো  নেই। কী যেন এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমি আমার স্ত্রীর সাথে কথা বললাম, কথা বললাম বাবার সাথে। তারপর গোসল করে ঠিক দশটার সময় আমি,মুহাম্মাদ আর ইয়াহিয়ার(প্রাক্তন ক্যাথলিক ফাদার পিটার জ্যাকবস) সামনে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলাম, “আশহাদু অন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।

এক তার কিছুক্ষণ পরে আমার স্ত্রীও তার শাহাদাহ উচ্চারণ করল। বাবাও মাসখানেক পরে মুসলিম হয়ে গেলেন।

এভাবেই দিনে দিনে আরও অসংখ্য মুসলিম ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন। আমার মনে হচ্ছিল, সারাবিশ্বের মানুষদেরকে আমাদের জানানো  দরকার, কী চমৎকার এই ধর্ম, কী চমৎকার এর বিধি-বিধান।। তাই এটা আমাদের সবার দায়িত্ব, অন্যকে ইসলামের পথে আহবান করা। যার যার নিজের ভাষায়, নিজের মতো  করে ইসলামের শিক্ষা আশেপাশের মানুষদের জানানো, মানতে উদ্বুদ্ধ করা ও বোঝানো । আল্লাহ আপনাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন না, তোমার ডাকে কারা শাহাদাহ উচ্চারণ করে মুসলিম হয়েছে, কারা হয়নি। আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, আপনাদের দায়িত্ব আপনারা ঠিকভাবে পালন করেছেন কিনা।

আল্লাহর রহমতে হাজার হাজার মানুষকে আমি ইসলামের দাওয়াত দিতে পেরেছি। শত শত মানুষ শাহাদাহ উচ্চারণ করেছেন। আমি কারও সাথে বিতর্কে জড়াইনি। অন্যকে বিতর্কে পরাভূত করে আপনি মানুষের মন জিততে পারবেন।। আমি একজন মুসলিম, সাবেক খ্রিষ্টান। আমি দুদিকের যুক্তি তর্কই খুব ভালো করে জানি।

১৯৯৯ সালে ভার্জিনিয়ার বাইরে মেরিল্যান্ডে এক চার্চে আমাকে লেকচার দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি খুব ভালো  করেই জানি, রোববারে চার্চে কী ধরনের কথা বলা হয় আর মানুষ কী শুনতে আসে। আমি সেভাবেই শুরু করেছিলাম। আমার বক্তৃতা শেষ হয়েছিল এই কথার মাধ্যমে আল্লাহ এক, তার কোনো শরীক নেই। কথাটা যুক্তিসঙ্গত ভেবে, উপস্থিত প্রায় সবাই আমার সাথে একমত হয়েছিলেন।

এমনকি দুজন মানুষও সেদিন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ভাবতে পারেন, চার্চের ভেতরে মানুষ ইসলাম কবুল করেছে, তাও আবার তাদের পাদ্রির সামনে! তাদের একজন ছিলেন, ওই পাদ্রিরই মেয়ে। সেদিন বিকেলে নওমুসলিম দুজনকে আমি আমার সাথে করে মসজিদে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারা সবার সামনে আবারও ইসলাম কবুলের সাক্ষ্য দেয়। পরে দুজন একে অন্যকে বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রী হয়ে যায়।

আচ্ছা, আপনাদের কী মনে হয়? কোনো এক চার্চের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দেয়ায় দুজন ইসলাম গ্রহণ করেছে তাও আবার তাদের পাদ্রির উপস্থিতিতে। এমন পরিস্থিতিতে তারা কী আবার আমাকে সে চার্চে আমন্ত্রণ জানাতে পারে? উত্তরটা হলো, মাস তিনেক পরে সে পাদ্রি আমাকে আবার সে চার্চে ডেকে নেয়।

আমি জানতে চাই, আপনার মেয়ের কী খবর?

তিনি উত্তর দিলেন ‘সে ভালোই আছে। এখন সে আগের চেয়ে আরও বেশি দায়িত্বশীল মানুষ। নিয়মিত আমাদের খোঁজ-খবর নেয়। আপনার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে। আশা করি আপনি আমাদের চার্চে এসে আগের মতোই লেকচার দিবেন।

ভেবে দেখুন, আমি যদি সেদিন চার্চে গিয়ে গির্জার ফাদারের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতাম, সবার সামনে তাকে যুক্তি-তর্ক দিয়ে নাস্তানাবুদ করে দিতাম, তবে কি তার সাথে আমার এই আন্তরিকতার সম্পর্ক হতো? নাকি পুনরায় তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানাতেন?

মূলত আমরা কাউকে হিদায়াত দিতে পারি না। হিদায়েতের মালিক আল্লাহ তায়ালা। আমাদের দায়িত্ব অন্যের কাছে ইসলামের দাওয়াত সুন্দরভাবে তুলে ধরা। গ্রহণ করা, না করা, সেটা তাদের বিষয়।

দোয়া করি, আল্লাহ যেন আপনাকে, আমাকে, আমাদের সকলকে হিদায়েতের পথে রাখেন। জাযাকুমুল্লাহ খাইর। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

পরিচিতি

আমেরিকার টেক্সাসে জন্ম নেয়া ইউসুফ এস্টেস ছিলেন প্রাক্তন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক। একজন মিসরিয় মুসলিমের সংস্পর্শে এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সমিনারে আলোচনায় ইসলামের উপর আলোচনা করে আসছেন। ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে ২০০০ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব শান্তি কনফারেন্সের তিনি ছিলেন একজন গর্বিত সদস্য।

ইউসুফ এস্টেস কথা বলেন খুব হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত ভঙ্গিমায়। তিনি Guide US টিভি নামে একট দাওয়াহ চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১২ সালে তার দাওয়াহ কার্যক্রমের জন্য দুবাই আন্তরজাতিক পবিত্র কুরআন পুরস্কার অনুষ্ঠানে তাকে বছরের সেরা ইসলামিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানিত করা হয়।

এ  কাহিনিটি ভারতে দেয়া তার এক লেকচারের রূপান্তর।

পদটিকা

বাইবেলের ভার্সন : খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেল শব্দের মূল অর্থ বই।মুলত বাইবেল যিশুখ্রিষ্টের আগে পরের বিভিন্ন বই/অধ্যায়ের সংকলন। যিশুর আগমনের পূর্বের এই অধ্যায়গুলোকে বলা হয় ওল্ড টেস্টামেন্ট আর পরের গুলোর নাম নিউ টেস্টামেন্ট। যার জন্ম হয়েছিল আজকের ফিলিস্তিনের বেথেলহেমে। মূলত তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন ইহুদিদের কাছে। তার সময়ে মাতৃভাষা ছিল সুরিয়ানি (Arameich)। যেহেতু সে সময়ের বেথেলহেম ছিল গ্রিক শাসকদের অধীন, তাই রাষ্ট্র ভাষা ছিল গ্রিক। আজকের বাইবেল লেখা শুরু হয়, যিশুর তিরোধানের অন্তত একশ বছর পর থেকে। সময়ে সময়ে বিভিন্ন লেখক বাইবেলের অধ্যায়গুলো লিখেন। পরে খ্রিষ্টান ধর্মীয় পণ্ডিতেরা আলোচনা করে ঠিক করেন, বাইবেলে কোন অধ্যায়গুলো রাখা হবে আর কোনটি বাদ দেয়া হবে। এক বাইবেল থেকে পরবর্তীকালে বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদ হয়। ইংল্যান্ডের চার্চগুলোতে দাপ্তরিক সংস্করণ হিসেবে রাজা কিং জেমসের সময়ে বাইবেলের একটা ইংরেজি অনুবাদ করা হয় ১৬১১ সালে। এই বাইবেল বিশ্বব্যাপী ইংরেজিভাষী লোকদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয় এবং গ্রহণযোগ্যতা পায়। বাইবেলের এই অনুবাদ King James Version কিংবা Authorised Version (AV) নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে যুগোপযোগী অনুবাদ ও বেশ কিছু ভুল-ভ্রান্তি দূর করার লক্ষ্যে আরও অনেকগুলো অনুবাদ হয় বাইবেলের। তন্মধ্যে Revised Standard Version (RSV) অন্যতম। এই সংস্করণটি করা হয় তকালীন সময়ের বেশ কিছু বিশ্ব বিখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিতদের তত্ত্বাবধানে। তারা এই বাইবেলের ভূমিকায় বলেছিলেন, আগের King James Version (authorised version) এ বেশ কিছু মারাত্মক ধরনের ভুল-ভ্রান্তি আছে। এমন অনেক সংযোজন-বিয়োজন ঘটেছে, যা মূল গ্রিক বাইবেলে নেই। আপাতত অনুবাদ মনে হলেও এগুলো শুধুই অনুবাদ ছিল না। ছিল সংস্করণ। এ জন্য দেখা যায় একটির সাথে অন্যটির অধ্যায়, লাইন ইত্যাদির বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, রয়েছে অমিল। এ নিয়ে খ্রিষ্টীয় ধর্মবেত্তাদের মধ্যে আজও মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

1 মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন