220px Nordiske Mediedager 2010 NMD 2010 4586424728 cropped ব্রিটিশ জার্নালিস্ট ইভন রিডলির নওমুসলিম হবার গল্প২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর।

দিনটার কথা মনে হলেই এক ভয়ংকর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দু-দুটো প্লেন এক এক করে ঢুকে গেল বিশাল টুইন টাওয়ারের পেটের ভেতর। ভোজবাজির মতো  ধ্বসে পড়ল আকাশছোঁয়া দুটি টাওয়ার। জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেল অনেক মানুষ। এই ঘটনাই যে আমার জীবনটা এমন করে পাল্টে দিবে,কে জানত!

ও হ্যা, আমার পরিচয়টা আগে দিয়ে নিই। আমার নাম ‘ইভন রিডলি’। পেশায় সাংবাদিক। আমি তখন কাজ করতাম লন্ডনের ‘সানডে এক্সপ্রেস’ পত্রিকায়।

আমাকে একজন ফোনে বলল, ‘জলদি তোমার টিভি ছাড়ো। টুইন টাওয়ারে হামলা হয়েছে। সব চ্যানেল ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে। টিভিতে যা দেখলাম, তা নিজের চোখেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। প্রথমটায় ভাবলাম, এটা বোধহয় কোন দুর্ঘট্না। কিন্তু না, আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় আরেকটি প্লেন সাজো ঢুকে গেল টাওয়ারে। নিমিষেই ধ্বসে পড়ল টুইন টাওয়ার, আমেরিকার অহংকার।

কিছু সময় পর সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল- এটি নিছক কোনাে দুর্ঘটনা নয়। এটি ছিল পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা। আমি উপলব্ধি করলাম, পেশাগত কারণে খবর সংগ্রহের জন্য আমার খুব দ্রুতই নিউইয়র্ক যাওয়া উচিত।

কিন্তু আমেরিকাগামী সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমেরিকার সীমান্ত। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে আমেরিকাতে ঢাকো এখন খুব কঠিন।

লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে তখন আমেরিকান মানুষদের ভিড়। নিজ দেশে স্বজনদের কাছে ফেরার জন্য সবাই ব্যাকুল। দ্রুত আমেরিকায় ফিরতে সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে তাদেরকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকেট দেয়া হচ্ছিল। অনেক চেষ্টায় চার দিন পর আমি নিউইয়র্কগামী প্লেনের টিকিট পেলাম।

বোর্ডিং পাসের জন্য অপেক্ষা করছি। এমন সময় আমার সম্পাদকের ফোন এল- রিডলি!

আমি তাকে সারপ্রাইজ দেয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলাম, ‘জানো, আমি টিকেট পেয়ে গেছি। অল্পক্ষণের মধ্যেই প্লেনে উঠতে যাচ্ছি।

ওপারে কিছু সময়ের নীরবতা।

তারপর উত্তর এল, ‘রিডলি! আমাদের পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তুমি সোজা পাকিস্তান চলে যাও। তারপর আফগানিস্তান।

‘কী’ আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আফগানিস্তান?

‘হুম! ঘটনার শুরু আফগানিস্তান থেকে। সারা পৃথিবীর চোখ এখন সেদিকেই থাকবে। তোমার যাত্রা শুভ হোক। লাইনটা কেটে গেল।

আমার বাক্স বোঝাই শীতের কাপড়। আমি দাঁড়িয়ে আছি নিউইয়র্কগামী প্লেনের লাইনে। আমাকে কিনা এখন যেতে হবে মরুর দেশ আফগানিস্তানে। অবিশ্বাস্য!

কী আর করা! আমেরিকার টিকিট বাতিল করে দুবাইয়ের টিকিট কাটলাম। দুবাই হয়ে পৌছালাম পাকিস্তানে।।

আফগানিস্তানের ভিসা পাওয়ার জন্য আমি তিন-তিনবার চেষ্টা চালালাম। ভিসা পেলাম না। অথচ সংবাদ সংগ্রহের জন্য আফগানিস্তানে না গেলেই নয়। এখন উপায়?

বিবিসির সাংবাদিক জন থমসন এক অভিনব বুদ্ধি বের করল।

জন আমদান একদিন আমার কাছে এসে বলল, “দেখ! আমি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছি।

জনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরোটাই কালো বোরকায় ঢাকা। সামনে বিরাট এক মূর্তি, অথচ তাঁর শরীরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

তাৎক্ষনিত  আমার মাথায় দারুণ বুদ্ধি খেলে গেল। আমি ভাবলাম, আরে এরকম বোরকা পরে তো আমিও অদশ্য হয়ে যেতে পারি। তারপর ঢুকে যেতে পারি আলতানে।আফগানিস্তানে  জন থমসন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারলে, আমি কেন নয়?

আমরা দুই গাইডের একজন পাকিস্তানি, আরেকজন জন্মসূত্রে আফগান। তাদের সাথে  বসে দারুণ এক বুদ্ধি আঁটলাম। ঠিক হলো, আমরা বিয়ে বাড়ির লোক সাজৰ আমি থাকব বোরকায় ঢাকা। তারপর কোনো  বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। এমন ভাব করে ঢুকে পড়ব আফগানিস্তানে।

যেই ভাবা সেই কাজ।

এক দিন আমরা পাকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষে আফগানিস্তানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমাদের গাড়ি তখন চলছিল ‘খায়বার পাস দিয়ে। খায়বার পাস প্রিথিবীর সবচেয়ে বড় গিরি উপত্যকা। দুপাশে পাহাড় আর সবুজ ভূমিঘেরা চমৎকার সব দৃশ্য। আমার ধারণাই ছিল না, খায়বার পাস এত বড়! আমি মনে করেছিলাম এটার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৩০ গজ হবে। আসলে এর দৈর্ঘ্য ৩৪ মাইল। ইস! কী বোকাই না ছিলাম আমি!

আমার মনে তখন চিন্তার ঝড়। আফগানিস্তান! না জানি সেখানকার মানুষগুলো  কেমন? বুশ-ব্লেয়ারের ভাষায় সেখানে ‘শয়তানের শাসন চলছে। মহিলারা চরম নির্যাতিত এবং নিষ্পেষিত জীবনযাপন করছে। অধিকার বলতে তাদের কিছুই নেই। তালেবান শাসকেরা এতই খারাপ, ছোট বাচ্চাদের ঘুড়ি উড়াতে দেয় না।

কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে যুদ্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ, সবচেয়ে গরিব দেশের উপর হামলা চালাবে। না জানি সেখানকার মানুষগুলো  কী ভাবছে? হঠাৎ ঝাঁকুনিতে আমার চিন্তার রেশ কেটে গেল। তাকিয়ে দেখি আমাদের গাড়ি থেমে গেছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’২। একটু দূরেই আফগানিস্তান সীমান্ত।

আমরা দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেলাম চেকপোস্টের দিকে। ভয়াল দর্শন সব প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। মাথায় পাগড়ি, ইয়া লম্বা আলখাল্লা, মুখে লম্বা দাড়ি। ভয়ংকর তাদের চাহনি। তাদের হাতের ‘কালাশনিকভ রাইফেল সূর্যের আলোয় চকচক করছে। আমার বুকের ভেতর তখন দুম দুম ড্রাম বাজছে। এতটাই জোরে যে, আমি নিজের কানে শুনতে পাচ্ছিলাম হৃদপিণ্ডের আওয়াজ।

একবার মনে হলো উল্টো দিকে ফিরে দৌড় দিই। কিন্তু তখন আর পেছন ফিরে যাবার উপায় ছিল না।

অবাক কাণ্ড! ওরা আমার দিকে ভালো করে তাকালই না। একবারের জন্যেও। হয়তো বিরাট বোরকার আড়ালে কোনো মহিলা ভেবেই। গাইডরা আমাকে ভিন্ন এক আফগান মহিলা বলে পরিচয় দিল। ভুয়া একটি আইডি কার্ডও দেখাল।

একটু পরে গাড়িতে চড়ে বসলাম। আমার তখন দারুণ রোমাঞ্চ অনুভব হচ্ছিল, ‘শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে চলে এলাম। পুরুষ শাসিত আফগানিস্তান… যা নিয়ে পাশ্চাত্যে দুর্নামের শেষ নেই।

আমরা এসে পৌছলাম ‘জালালাবাদ’। এটা আফগানিস্তানের অন্যতম বড় এক শহর। একটা বড় মার্কেটের সামনে এসে গাড়ি থামালাম। দেখি, পুরুষেরা কাঁধে করে বাজারের বড় বড় ব্যাগ নিয়ে বেরুচ্ছে। ভাবলাম, ‘বাহ, দারুণ তো! এখানে পুরুষেরা বাজার-সদাই করে। পাশ্চাত্যে তো শপিং মল থেকে বাজার-সদাই সব সময় আমাদের নারীদেরই করতে হয়।

পরে জানলাম এখানকার নিয়মকানুন খুব কড়া। মহিলারা মাহরম পুরুষ ছাড়া, অপরিচিত লোকদের সাথে কথা বলতে পারে না। নিয়ম নেই। আমি বোরকায় ঢাকা অনেক মহিলাকেও দেখতে পেলাম । তারা তাদের পুরুষ সঙ্গীদের সাথে। ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মানুষগুলারে মুখের দিকে তাকিয়ে আমি অবাক হলাম। সবার চেহারা কেমন হাসিখুশি। সবার মধ্যে সুখী সুখী ভাব। দুদিন পরে আমেরিকা উড়ে এসে এদের ঘাড়ে বোমা ফেলবে, সেটা নিয়ে এদের কোনো চিন্তাই নেই।

আমরা এলাম ছোট একটা গ্রামে। তখন কী এক উপলক্ষ্যে সেখানে বেশ আনন্দ ফুর্তি চলছিল। গ্রামের লোকজন গাইডের কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইল। গাইড পশতু ভাষায় বিড়বিড় করে কী বলে গেল, আমি তার এক বিন্দু বিসর্গও বুঝতে পারলাম না। তবে এতটুকু বুঝলাম, গাইডের উত্তর শুনে তারা মোটেও খুশি হয়নি। তারা ভাবছিল, চারদিকে এখন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। এর মধ্যে গাইড এক পশ্চিমা নারীকে নিয়ে এল এখানে। ব্যাটার আক্কেল জ্ঞানটা কী শুনি!

তার উপরে মাল্লো উমরের কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল ‘কোনো লোক পশ্চিমা বিদেশিকে সাহাজ্য করলে তার জন্য কঠিন শাস্তি পেতে হবে। স্বভাবতই তারা গাইডের উপর খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। ভেতরে ভেতরে ভয়ও পাচ্ছিল, না জানি কখন ধরা পরে যাই।

আফগানরা  জাতিগতভাবে ফুর্তিবাজ ও হাসিখুশি। খুব বেশিক্ষণ মনমরা হয়ে থাকা এদের ধাতে নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের ভয় কমে এল। দু-একজন মাহিল দোভাষীর মাধ্যমে আমার সাথে কথাও বলা শুরু করল। বিশ বছর বয়সী এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, এই যে দুদিন পরে যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, তোমার ভয় করছে না? বিরক্তিমাখা স্বরে সে উত্তর দিল আর বলবেন না। আমার খুব রাগ লাগছে।

আমি জানতে চাইলাম ‘কেন?”

সে বলা শুরু করল, আমি ছিলাম নার্সিং ইনিস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক নার্স বহর দুয়েক আগে তালেবানরা হঠাৎ করেই সে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিল। আমি  চলে এলাম গ্রামে। ভেবে দেখুন, আজ যদি আমি ঠিকভাবে আমার প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারতাম, তাহলে এই যুদ্ধের সময় আমি কত কাজ করতে পারতাম! আহতদের সেবা করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা….তা না, আমি এখন হাত পা টিমে এই অজপাড়া গাঁয়ে এসে পঁচে মরছি।

কথার মাঝখানে এক বয়স্ক মহিলা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চেহারায় তাচ্ছিল্য, দুহাত কোমরে রাখা। আমাকে ভালোমতো নিরীক্ষণ করে জানতে চাইলেন, এই মেয়ে! তোমার ছেলে-মেয়ে আছে?

আমি উত্তর দিলাম, ‘আছে। একটা মেয়ে।

“মোটে একটা?

‘জ্বি, মোটে একটা

তিনি আমার বুকের উপর সজোরে একটা ধাক্কা মারলেন, “তোমরা পশ্চিমা নারীরা আসলেই হতভাগা। তোমাদের বাচ্চা হয় মোটে একটা দুইটা। আমাকে দেখ । আমার সন্তান মোট পনেরো জন। যুদ্ধের মাঠে যখন তোমাদের সব সৈন্য মারা যাবে, আমি তখনো একে একে সন্তান জন্ম দিতে থাকব।’

এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, আফগান মহিলারা লাজুক লাজুক আর জড়সড় মাটির মূর্তি। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, বাপরে! এই যদি হয় মহিলার তেজ, তবে পুরুষেরা না জানি কেমন?

আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, এই যে আমেরিকা এসে আপনাদের উপর বামো ফেলবে, আপনাদের ভয় করছে না?

তিনি সমান তেজে উত্তর দিলেন, ‘আসুক না আমেরিকান সৈন্য! এই গ্রামে যদি আসে, আর আমি যদি হাতের কাছে পাই, তবে জামা কাপড় ছিড়ে নিজ হাতে আমি ওদের শায়েস্তা করব।

একটু শান্ত হয়ে তিনি আবার বললেন, “দেখ!তোমাদের ওখানে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য আমরা দুঃখিত। কিন্তু তাতে আমাদের কী দোষ! এর জন্য আমেরিকানরা কেন আমাদের উপর বোমো মারতে চাইছে? আমরা কি কিছু করেছি? আমি তখন মনে মনে ফুঁসছিলাম। কী? টুইন টাওয়ার হামলা এদের কাছে নেহায়েত একটা দুর্ঘটনা? যেখানে ছয় হাজারের অধিক মানুষ জ্বলে পুড়ে মারা গেল, যেখানে সুবিশাল টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়ল, প্রাণ বাঁচাতে একশ তলা থেকে মানুষ স্বেচ্ছায় লাফিয়ে পড়ল… এত বড় ঘটনাকে এরা দুর্ঘটনা বলে কী করে?

পরে ভেবে দেখলাম, আসলে এদের দোষ নেই। তালেবান শাসনে বিদেশি টিভি দেখা বারণ। এরা তো জানেই না সে দৃশ্য, সে ঘটনা কতটা ভয়াবহ ছিল!

গ্রামে থাকতে থাকতে বিকেল হয়ে এল। আমাদেরকে নিয়ে ভয়, উৎকণ্ঠা আবার মানুষগুলোর চেহারায় ফিরে এল। অনেক বলে কয়ে তাদের কাছ থেকে দু-চারটা ছবি নিলাম। বিদায় নিয়ে একটু এগুতেই দেখি গ্রামের অদূরে গেইট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুনতে পেলাম, পাকিস্তান তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। কাউকে আসতেও দিচ্ছে না, যেতেও দিচ্ছে না। পরদিন সকালে গিয়ে দেখি একই অবস্থা।

আমি পড়লাম মহা ঝামেলায়। আমার সম্পাদক যদি জানেন, আমি আফগানিস্তানে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছি, তাহলে বিশ্ব মিডিয়ায় হইচই পড়ে যাবে। চারদিকে আতঙ্ক ছড়াবে। আমাকে যে করেই হোক এখান থেকে বের হতে হবে।।

কিন্তু উপায়?

গাইড বলল, ‘উপায় একটা আছে। আমাদেরকে চোরাচালানের রাস্তা (Smuggling Route) ধরে ফিরতে হবে।

এটাও! আমি মনে মনে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম, চোরাচালানের রাস্তা

নিয়ে পালানো? এটা তো দারুণ রোমাঞ্চকর আর শিহরণ জাগানো  ব্যাপার হবে। আমি আমার পত্রিকার জন্য ভালো একটা স্টোরি লিখতে পারব।’

আমি  ভেবেছিলাম স্মাগলিং রুট হবে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গোপন কোনো রাস্তা। মাঝে মাঝে ঝোপ জঙ্গলেও লুকিয়ে থাকতে হবে। ওমা! অবাক কাণ্ড । যে রাস্তা ধরে সীমান্তের কাছে গেলাম, সেখানে দেখি বিরাট বাজার বসেছে। কেও উট বিক্রি করছে, কেউ বিক্রি করছে কার্পেট। আবার কারও হাতে বিক্রির জন্য, বিনোদনের বিভিন্ন জিনিসপত্র। অনেক পুরুষকে দেখলাম। তারা এসেছেন যুদ্ধের জন্য নাম লিখাতে; যেন বড় সয়তান  আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায়।। আমার পায়ে ছিল আফগান জুতা। পথ চলতে চলতে তা ছিড়ে পা ফেটে রক্ত ঝরছিল। আমি গাইডকে বললাম, “দেখ! সীমান্ত তো আর মাত্র দশ মিনিটের পথ। কোনো বহন নেয়া যায় না? আর হাঁটতে পারছি না। সে আমার দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাল, আপনি কি গাধায় চড়তে পারবেন? গাধা! মনে মনে ভাবছিলাম ‘আরে ব্যাটা! আমি ঘাড়োয় চড়েছি, ঘোড়া নিয়ে দৌড়েছি আর সে আমি এই পিচ্চি গাধায় চড়তে পারব না!’ |

আমার  ইশারা পেয়ে সে একটা গাধা নিয়ে এল। গাধার পিঠে যেই না বসেছি,অমনি তা উল্কার বেগে বিদ্যুৎ গতিতে আমাকে নিয়ে দৌড় দিল। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রন রাখতে পারছিলাম না। আমার হাত পা উপরে-নিচে বাতাসে ঢেউয়ের মতো  উঠানামা করছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা নিয়ন্ত্রণহীন বাদুড়। যে নিজের  ভারসাম্য ধরে রাখতে সমান তালে তার পাখা নাড়ছিল।

চিন্তা  করুন, বিরাট আলখাল্লার মতো  বোরকা পরা একজন গাধার উপরে বসে হাত-পা ছুড়ছে। আর গাধা ছুটছে দিগবেদিক ভুলে…দূর থেকে নিশ্চয়ই আমাকে  কিম্বূতকিমাকার ভূতের মতোই লাগছিল।

গাধা  কে নিয়ন্ত্রণ করতে যেই না নিচের দিকে ঝুঁকেছি, অমনি আমার বোরকার ভেতর  থেকে ক্যামেরা পড়ে গেল। ক্যামেরা তালেবান শাসনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আমিও  তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে গেলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা তুলে দেখি, একজন ভয়ালদর্শন তালেবান সৈনিক জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন…

আমি যখন লন্ডন ফিরে বান্ধবীদের এই ঘটনা বলেছিলাম, ওরা তখন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা সেই মুহূর্তে তোমার অনুভূতি কী হয়েছিল? যখন লোকটা তো তোমার দিকে অমন করে তাকিয়ে ছিল, আর তুমি বুঝে গেলে তোমার খেলা শেষ?

আমি হেসে বলেছিলাম, মনে হয়েছিল, বাহ! লোকটা তো  দেখতে দারুণ আর হ্যান্ডসাম! তার ছিল সবুজ ঝকঝকে চোখ, চকচকে দুটি গাল আর ঘন কালো  দাড়ি।

অবশ্য এমন অনুভূতি ছিল সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য।

আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা থাকায় সে আমার চেহারা দেখতে পায়নি। আমি তার হাতে ক্যামেরাটা দিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাবলাম, এক্ষুনি আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে। মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম, কখন একটা বুলেট এসে আমার কপাল ফুটো করে দেয়।

কয়েক সেকেন্ড পরে চোখ মেলে লোকটাকে দেখতে পেলাম না। একটু খেয়াল করতেই দেখি, সে অদূরে আমার দুই গাইডের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে। আর জিজ্ঞেস করছে, কোন সাহসে ক্যামেরা এখানে নিয়ে আসা হয়েছে?

মার খেয়ে গাইডদের একজনের নাক দিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছে। আরেকজন চেষ্টা করছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে। তাদের ঘিরে অন্তত শ খানেক লোকের ভিড়।

‘এই তো সুযোগ!’ আমি আনন্দচিত্তে ভাবছিলাম, আমি তো সহজেই সীমান্তঘেঁষা লোকগুলারে সাথে মিশে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে পারি। আগেই ঠিক করা ছিল, পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে যে যেভাবে পারা যায় পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে।

আমি কয়েক পা বাড়িয়েছিলাম। পরক্ষণেই চোখের সামনে গাইডের রক্তাক্ত চেহারা ভেসে উঠল। মনে হলো, ওদের এভাবে পেছনে রেখে আমি পালিয়ে যেতে পারি না। আমার কিছু একটা করা উচিত। আমি সোজা লোকগুলোর ভেতর দিয়ে সেই সৈনিকের কাছে যেতে চাইলাম। কিন্তু লোকেরা আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিচ্ছিল। ভাবখানা এমন, “এই পুরুষ মানুষের কাজ কারবারের ভেতর মহিলাদের আবার কী?

আমি এবার আমার চেহারা থেকে বোরকা সরিয়ে ফেললাম। চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম, কেউ কি আমাকে যেতে দিবেন?

সমস্ত কোলাহল থেমে গেল। চারদিকে তখন শুনশান নীরবতা। মনে হলো একটা দিন পড়ে গেলেও কেউ তার শব্দ শুনতে পাবে।। মুসা (আঃ) এর সময় যেমন নীল দরিয়া দুধারে সরে গিয়ে রাস্তা তৈরি হয়েছিল, লোকেরা তেমনি দুপাশে সরে গিয়ে আমাকে রাস্তা করে দিল। আমি সোজা চলে এলাম সেই সৈনিকের সামনে। হাত পেতে বললাম, আমার ক্যামেরা কি ফেরত পেতে পারি? তার চেহারা হয়েছিল দেখার মতো। চোয়াল নিচের দিকে ঝুলে পড়েছিল, দুচোখ। বিস্ফোরিত। নীল নয়না, স্বর্ণকেশী এক পশ্চিমা নারী এভাবে বোরকার আড়াল থেকে বের হয়ে আসবে- এ ছিল তার চিন্তারও অতীত। ভূত দেখলেও বোধহয়। এতটা চমকে যেত না। আমি মনে মনে ভাবলাম, যাক! সমস্যার সুন্দর সমাধান হয়ে গেল। এখন নিশ্চয় তারা পশ্চিমা কোনো  নারীর উপর হাত তুলবে না। আর আমার গাইড দুজনও বেঁচে যাবে। তাকিয়ে দেখি, গাইডদের মুখে রাজ্যের অন্ধকার। ব্যাপার কি? সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আমি কি আরও বিপদ ডেকে আনলাম?

একটু আত্মস্থ হতেই সেই সৈনিক গাইডদের দিকে তাকিয়ে আবার চিৎকার দেয়া শুরু করল। একটু পরে আমাদের তিনজনকে একটা গাড়িতে আলাদা করে তুলল। গাড়ি চলতে শুরু করলে কী নিয়ে যেন তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হল। কথার মাঝখানে ড্রাইভার হঠাৎ করে গাড়ি থামিয়ে দিল। সেই তালেবান। দৈনিক আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে গেল এক নির্জন জায়গায়। আমাকে উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়াতে বলে লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি তো  অবাক! কী ব্যাপার ব্যাটা গেল কোথায়? আমি যেখানটায় ছিলাম, তার চারদিকে ছিল অসংখ্য নুড়ি পাথর। আমার সারা। শরীর দিয়ে আতঙ্কের হিম স্রোত বয়ে গেল। “সর্বনাশ! দেখে মনে হয় এটা কোনো বধ্যভূমি। সেই লোক নিশ্চয় আশেপাশের গ্রামে গিয়ে মানুষদের ডেকে বলছে, একটা পশ্চিমা মহিলা ধরা পড়েছে। দশ মিনিটের মধ্যে তাকে পাথর মারা হবে। কে কে যাবে এসো! আমরা পাথর মেরে তাকে খতম করে দিই।

আফগানিস্তানে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। এই দেখি কোথাও কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই। আবার এই দেখি একগাদা মানুষের ভিড়।

কয়েক মিনিট পরে দেখলাম, এক দল ভয়ংকর দর্শন মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসছে। সংখ্যায় অন্তত ৭০-৮০ জনের কম হবে না। তারা আমার দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসছিল। আমার মনে হলো, নিশ্চয় তারা কাছে আসছে।

নিশানা ঠিক করার জন্য। যাতে পাথর মারলে ঠিকঠাক আমার গায়ে এসে লাগে। আমার বুকের ভেতর তখন একরাশ ভয়, আতঙ্ক। মনে চিন্তার ঝড়, এখান থেকে বেঁচে কি ফিরতে পারব কখনো?

আসলে ব্যাপার ছিল ভিন্ন। আফগানিস্তানে পুরুষের জন্য মাহরাম মহিলা ছাড়া অন্য মহিলাদের চেহারা দেখা ছিল নিষিদ্ধ। তাই আমার মতো একজন পশ্চিমা নারীকে তারা অবাক চোখে দেখছিল। তারা এগিয়ে আসছিল, যাতে আমাকে ভালো করে দেখা যায়। নিজেকে তখন মনে হচ্ছিল, চিড়িয়াখানার খাঁচায় বন্দি আজব কোনো  প্রাণী।

একটু পরে সেই আফগান সৈনিক বোরকা পরা এক মহিলাকে নিয়ে ফিরে এল। আমার বোরকা আগেই খুলে গিয়েছিল। পরনে ছিল সালোয়ার আর হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কামিজ। মহিলা এসে আমার সারা শরীর সার্চ করা শুরু করল।

আমার এতক্ষণের ভয় উদ্বেগ কেটে গিয়ে এবার প্রচণ্ড রাগ লাগছিল। ‘ও! এই তাহলে ব্যাপার! তারা নিশ্চয়ই এখন আমাকে মারবে না। মারলে নিশ্চয় সার্চ করত না। শুধু শুধু এই ভয়ালদর্শন লোকগুলো আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। আর সৈনিকটা চাইলে নিজেই তো আমাকে সার্চ করতে পারত। যেমনটা ব্রিটিশ পুলিশ করে থাকে। আলাদা করে এই মহিলাকে আনার কী দরকার ছিল?

সত্যি কথা বলতে, আফগান সৈন্যরা অন্তত পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক বেশি শালীন আর ভদ্র ছিল।

আমার মেজাজ তখন সপ্তমে। প্রচণ্ড রেগে গিয়ে কামিজ মাথা পর্যন্ত উঠিয়ে তাদের বললাম, এই দেখ! আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই। এত সার্চ করার কী হলো?

‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা…’মুহূর্তের মধ্যে লোকগুলো সব উল্টো দিকে ফিরে দাঁত মুখ খিচে এমনভাবে দৌড় দিল, যেন ভূতে তাড়া করেছে।

পরে বুঝেছিলাম, আফগানিস্তানে কোনো মহিলার জন্য এমন আচরণ অত্যন্ত অশোভন। বোরকা পরা সে মহিলা আমার গালে থাপ্পড় মেরে বসল। আমার এমন অশালীন, অসভ্য আচরণ দেখে সে মহিলা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।

যখন নিশ্চিত হওয়া গেল আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, তারা আবার আমাকে গাড়িতে তুলে নিল।

এবার গন্তব্য জালালাবাদ। তাদের গোয়েন্দা সদর দফতর।

জালালাবাদ পৌছার পর আমি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানের মুখোমুখি হলাম। তিনি কিছুটা ইংরেজি বুঝতে পারেন। আমার বিস্তারিত ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর লিখে দিতে বললেন। যাতে নিশ্চিত হওয়া যায়, আমি আসলেই সাংবাদিক কিনা। আমি সব লিখে দিলাম। কোন খাবারের সময় হয়ে এসেছিল। তিনি আমাকে খাবারের টেবিলে আমন্ত্রণ জানালেন,

আসুন আমরা খাবার খাই।। আমি দূর  স্বরে বললাম, আমাকে আগে পরিচিতদের কাছে টেলিফোন করতে দিতে হবে।

তিনি  মাথা নাড়লেন ‘দুঃখিত। এই মুহূর্তে সেটি সম্ভব নয়। আমিও অনড় ‘যতক্ষণ না আমাকে ফোন করতে দেয়া হবে, ততক্ষণ আমি কোনো খাবার স্পর্শ করব না।’ পিথিবির  সবচেয়ে নিকৃষ্ট, নিষ্ঠুর, বর্বর শাসকগোষ্ঠীর কাছে একজন মহিলার এমন আবেদন-নিবেদন বিশেষ কোনো গুরুত্ব পাবার কথা না। আমি খাচ্ছি কি খাচ্ছি। না, তা নিয়েও তাদের কোনো মাথা ব্যাথা থাকার কথা নয়।।

কিন্তু অবাক করার মত  বিষয় হল আমি খাব না জেনে তিনি খুব হতাশ হলেন।একটু কী খারাপও লাগছিল তার?

আমি  আমার সিদ্ধান্ত থেকে একটুও নড়িনি। প্রতিদিন তিনবেলা তারা আমার জন্য খাবার নিয়ে আসত। সামনে পাটি বিছিয়ে দিত। তাতে থাকত রুটি, ভাত ও মান্য খাবার। সাথে এক জগ পানি। তারা আগ বাড়িয়ে আমার হাত ধুয়ে দাত ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তাদের কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ত ‘বোন! এমন করে থাকবেন না। আপনি আমাদের বোন, আমাদের অতিথি। আপনি না খেয়ে থাকলে আমরা কষ্ট পাব।

আমার মনে হতো, পৃথিবী খ্যাত নিষ্ঠুর গোষ্ঠীর এ কেমন আচরণ? তারা কি আমার কথা বুঝতে পারছে না? নাকি এসবই আমার মনটাকে নরম করার জন্য তাদের অভিনয় মাত্র?

সত্য কথা বলতে, ধারণা করেছিলাম আমার সাথে হয়তো আবু গারিব ও। গুয়ান্তানামো বে কারাগারের বন্দিদের মতোই চরম নিষ্ঠুর আচরণ করা হবে। এমনকি ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির মতো পরিস্থিতিরও মুখো মুখি হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

এখন ভাবি, আল্লাহকে ধন্যবাদ আমি পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম গোষ্ঠীর হাতে পড়েছিলাম। সুসভ্য আমেরিকানদের হাতে নয়।। তৃতীয় দিন সকালে তারা একজন ডাক্তার নিয়ে এলেন। ডাক্তার ছোটখাটো মানুষ। জার্মানিতে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি এসে আমার চোখ দেখলেন, নাড়ি দেখলেন। কান, মুখ গহ্বর ভালো করে পরীক্ষা করলেন। আমি ভাবছিলাম, কাউকে ফাঁসির দণ্ড দেয়ার আগে যেভাবে ডাক্তাররা পরীক্ষা করেন সব ঠিক আছে কিনা, ইনিও বোধহয় সেভাবেই আমার পরীক্ষা করছেন।

এরপর তিনি প্রেশার মাপলেন। একবারের জায়গায় দুবার। তার চেহারা কিছুটা চিন্তিত।

আমি তাকে আস্বস্ত করতে চাইলাম, ‘প্রেশার নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নেই। দীর্ঘদিন ধরেই আমার প্রেশার অনেক হাই।

তিনি মাথা নাড়লেন ‘আপনার প্রেশার একদম নরমাল। যে মানুষের একটু পরে তালেবানের হাতে ফাসি হবে, তার প্রেশার স্বাভাবিক হয়। কী করে! তিনি আমার অবিশ্বাসী চাহনি দেখে বললেন, এই যে আপনিই দেখুন। আমি দেখলাম আসলেই তাই।।

আমি বললাম, খুব ভালো। এটা তালেবানের মহত্ত্ব যে তারা আমার প্রেশার ভালো করে দিয়েছে।

ডাক্তারের এক ছেলে ছিল। নাম হামেদ। সে আমার আর তালেবানের মধ্যে দোভাষীর কাজ করত। পঞ্চম দিন সকালে সে খুব উৎফুল্লচিত্তে আমার কাছে দৌড়ে এল। তার হাতে জালালাবাদ থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। বলল ‘ম্যাডাম! এই দেখুন। পত্রিকায় আপনার খবর ও ছবি বেরিয়েছে।

পত্রিকার প্রথম পাতায় রয়টার্স থেকে নেয়া আমার দুটো ছবি। প্রথম পাতার অর্ধেকটা জুড়ে লাল কালির বিশাল শিরোনাম। তার নিচে অল্প একটু খবর। মূলত খবরের চেয়ে শিরোনামই কয়েক গুণ বড়।।

আমি জানতে চাইলাম, ওখানে কী লেখা আছে?

হামেদ আমাকে পড়ে শোনাল সেই শিরোনামে লেখা ‘তালেবান ইভন রিডলির ব্লাড প্রেশার ভালো করে দিয়েছে। আর এজন্য সে খুবই খুশি।’

দিন উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা দলবল নিয়ে আমার রুমে এলেন। তার চেহারা গম্ভীর,ভয় জাগানিয়া। তার নেতৃত্বে আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। তারা অবশ্য কখনোই আমাকে শারীরিক নির্যাতনের ভয় দেখায়নি।তারা শুধু আমাকে বলত, তাদের কথামতো কাজ না করলে, তাদেরকে সাহায্য না করলে বছরের পর বছর এখানে বন্দি হয়ে থাকতে হবে।

আমি ভাবতাম, এই লোকগুলো সম্পর্কে আমি এ যাবৎকাল যা শুনে এসেছি,তাতে তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করি আর নাই করি, তারা ঠিক ঠিক তাদের ইচ্ছেমত কোনো একদিন আমাকে মেরে ফেলবে। তাই ঠিক করলাম, মরতে বাধন হবেই তখন আর ভালো আচরণ করে লাভ কী। আমি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাদের সাথে কথা বলা শুরু করলাম।

হমেদ আমাদের মাঝে দোভাষী হয়ে কথা আদান-প্রদান করত।

আমি যতই উত্তেজিত আর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলতাম, তারা ততই আমার সাথে নরম আচরণ করত। আমাকে বলত, ‘আরে বোন! আপনি এত খেপে যাচ্ছেন কেন? আপনি আমাদের বোন, আমাদের অতিথি।

মাঝে মাঝে তো হামেদ আমাকে বলত, আপনি এত বেশি আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলেন, তা আমি আফগান ভাষায় তাদের কাছে অনুবাদ করতে প্রচণ্ড ভয় পাই।

একদিন সকালে হামেদ খুব ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আমার কাছে এল। তার চোখ মুখ কেনো। চেহারায় সুস্পষ্ট ভয়ের ছাপ, আপনার কাছে আজ অত্যন্ত সম্মানিত একজন ভিআইপি গেস্ট আসবেন। দয়া করে তার সাথে সম্মানের সাথে কথা বলবেন। তার সাথে কোনো ধরনের অসভ্য আচরণ করবেন না।

আমি জানতে চাইলাম ‘কে সেই লোকে? কে এমন ভিআইপি যার নাম নিতেও হামেদ ভয় পাচ্ছে? মোল্লা ওমর?’

হামেদ মাথা নাড়ল, ‘একটু পরেই দেখতে পাবেন।

আমার মনে চিন্তার ঝড়। আমার সাথে দেখা করতে কে এমন আসতে পারে?

আমর ভাবনার মাঝেই দরজার কড়া নড়ে উঠল।

যদিও আমি ছিলাম বন্দি, কিন্তু দরজার চাবি আমার কাছেই থাকত। তারা দেখা করতে আসলে দরজার কড়া নাড়তেন। আমি ভেতর থেকে খুলে দিতাম।

দরজা খালোর পর যে লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়াল, তাকে দেখে আমার শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য রক্ত চলাচল গেল বন্ধ হয়ে।

বিগত ছয় ছয়টি দিন আমি ধর্ম নিয়ে আলোচনা সযত্নে এড়িয়ে চলেছি। আর এখন কিনা আমি একজন শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় গুরু, মাওলানার মুখোমুখি।

আফগান দেশটা ধূলি ধূসরিত মরু অঞ্চল। কিন্তু লোকটার পরনে সুন্দর পরিষ্কার আইভরি রঙয়ের লম্বা আলখাল্লা। লম্বায় মাটি ছুঁই ছুঁই। এতটাই বড়, তার পা যেন তার মধ্যে পুরো অদৃশ্য হয়ে গেছে। মুখে মার্জিত, সুন্দর করে ছাটা ঘন দাড়ি। মাথায় আইভরি রঙয়ের সুন্দর পাগড়ি। চোখ দুটো হালকা বাদামি। চোখে মুখে ব্যক্তিত্বের প্রখর দীপ্তি। হাতে ছিল তাসবিহ। তিনি অনবরত তাসবিহ জপে চলেছেন। আরও একটা বিষয় ছিল যা একটু অন্যরকম, একটু অদ্ভুত। তার চেহারায় ছিল আলোর দ্যুতি। যেন ভেতর থেকে আসা কোনো আলোকচ্ছটা তার চোখেমুখে নাচছে। আমি যখন পরে মুসলিমদের সাথে এই অনুভূতি শেয়ার করি, তারা উত্তর দিয়েছিল, ‘সুবহানাল্লাহ! এটা হলো ‘নূর’, যা পুণ্যবান মানুষদের চেহারা থেকে বের হয়।

একটু আত্মস্থ হতেই আমি তাকে বসার জন্য অনুরোধ করলাম। ঠিক হাঁটা নয়, তিনি যেন ভেসে ভেসে এসে বসলেন। তার হাতের তাসবিহ তখনো চলমান। মুখে মুচকি হাসি।।

তিনি এবার মুখ খুললেন, আপনার ধর্ম কী? এইরে, শুরু হয়ে গেল! উত্তর দিলাম, ‘আমি খ্রিষ্টান।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন ধরনের খ্রিষ্টান? রোমান ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, অ্যাংলিক্যান, না ব্যাপটিস্ট?

‘আমি প্রোটেস্ট্যান্ট।

‘ইসলাম সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? তার তাসবিহ এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।

ওহ, ইসলাম! আমি বলে চললাম, ‘ইসলাম একটা চমৎকার ও অসাধারণ ধর্ম। আসলে ইসলাম সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। যেটুকু জানতাম,তাও ভুল-ভাল, মিডিয়া থেকে জানা। আমি প্রায় দুই মিনিট ধরে ইসলামের বড়ত্ব ও মহত্ত্ব নিয়ে কথা বলে গেলাম।তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিলেন আর এক মনে তাসবিহ জপে যাচ্ছিলেন।

আমি থামতেই তিনি বললেন, ‘ইসলাম হলো সুন্দরতম ধর্ম।

একদম ঠিক বলেছেন’ আমি আবারও মনের মাধুরী মিশিয়ে ইসলাম নিয়ে সুন্দর কার কথা বলে চললাম। হামেদ আমার কথাগুলোকে পশতু ভাষায় অনুবাদ করে দিচ্ছিল।

তিনি আগের মতোই মুচকি মুচকি হেসে তাসবিহ জপে যাচ্ছিলেন।

এখন বুঝি, তিনি হয়তো তখন মনে মনে ভাবছিলেন এই মহিলা আস্ত একটা হাদারাম! জানে না কিছুই, আবার আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।

আমি কথা শেষ করলে হাসি হাসি মুখে তিনি বললেন, তাহলে আপনি নিশ্চয় এখন ইসলাম গ্রহণ করতে চান?

আমি দেখলাম, এ তো মহাবিপদ! নিজের ফাদে এখন নিজেই আটকা পড়েছি।

যদি এখন ‘হ্যা’ বলি, তাহলে দুদিন পরে এরা আমায় নিয়ে পাথর মেরে হত্যা করবে। বলবে, এই মহিলা ইসলামের কিছুই মানে না। আবার যদি না বলি, তাহলেও আমাকে মেরে ফেলবে। বলবে, তুমি ইসলামের অবমাননা করেছ।

আমার মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল, সুন্দর জবাব কী হতে পারে।

শেষে বললাম, “দেখুন! বন্দি অবস্থায় থেকে আমি এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারি। তবে কথা দিচ্ছি, যদি আপনারা আমাকে ছেড়ে দেন, আমি কুরআন পড়ব আর ইসলাম নিয়ে গবেষণা করব।’

তিনি একটি কথাও বললেন না। মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালেন এবং আগের মতোই দৃশ্যত হাওয়ায় ভেসে ভেসে বেরিয়ে গেলেন। হামেদ তার পেছন পেছন ছুটল।

কয়েক মিনিট পরে হামেদ ফিরে এল ‘আপনি মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। রেড ক্রিসেন্টের একটি প্লেনে করে আপনাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে।’ ‘ইয়েস!’ আমি তখন আনন্দে আত্মহারা। কী চমৎকার বুদ্ধি খাটিয়ে মাওলানাকে কাবু করে আমি মুক্তির পথ বের করে নিয়েছি।’

বেলা গড়ালে কাবুলগামী একটি ট্রাকে চড়ে বসলাম। সাত ঘণ্টার ধূলি ধূসরিত এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা ধরে চলার পর আমরা কাবুল পৌছালাম। কাবুল থেকে আমাদের গাড়ি এয়ারপোর্ট পার হয়ে সামনের দিকে চলতে লাগল।

আমি ভাবছিলাম, নিশ্চয় তালেবানের হাতে আরও বিদেশি বন্দি আছে। সবাইকে নিয়ে একসাথে রেড ক্রিসেন্টের প্লেনে করে আমরা ফিরে যাব।

সে রাতে আফগান চরিত্রের আরেকটি দিক আমার কাছে পরিষ্কার হলো। আফগানরা সরাসরি কোনো খারাপ খবর আপনাকে দিতে চাইবে না, যাতে আপনি কষ্ট পান। তারা বিষয়টিকে অন্যভাবে উপস্থাপন করবে।

গাড়ি আমাকে নিয়ে পৌছল এক জেলখানার সামনে। তৃতীয় বিশ্বের কোনো কারাগার যেমন হয়। অন্ধকার, স্যাতস্যাতে। একটা রুমে দুজন মহিলা আমাকে অভ্যর্থনা জানাল আজ রাতে আপনি এখানেই থাকবেন।

না না! আপনাদের কোথাও কোনো  ভুল হচ্ছে, আমি প্রতিবাদ করলাম আমার তো রেডক্রসের প্লেন ধরে দেশে ফিরে যাবার কথা।’

অবশেষে খারাপ সংবাদটা আমাকে দেয়া হলো। আমি একজন বিদেশি মহিলা। কোনো পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই এখানে এসেছি। তাই আমাকে এর জন্য শাস্তি পেতে হবে।

‘তোমরা কোনোভাবেই আমার সাথে এ আচরণ করতে পার না। আমি চিৎকার করে বললাম, আমি একজন ব্রিটিশ!’

তারা একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের রুমের দরজা খুলে গেল। দেখি, হিজাব পরা ছয় জন মহিলা। তাদের একজন আমার দিকে এগিয়ে এলেন ‘আপনি কি রেডক্রসের?

‘আরে আপনি তো  ইংরেজিতে কথা বলছেন! আমি অবাক। ‘হ্যা। কারণ, আমি অস্ট্রেলিয়ান’ তিনি উত্তর দিলেন এই তিনজন জার্মান আর ওই দুজন আমেরিকান।

তার মানে আপনারা তো খ্রিষ্টান, যারা সমাজ সেবামূলক কাজ করেন।

মুসলমানদের মাঝে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার ও ধর্মান্তকরণের অপরাধে যাদের আটক করা হয়েছে।তারা উত্তর দিলেন ‘আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি জানো উৎসাহ নিয়ে বললাম দেখুন তো কাণ্ড! আমাকে রেড ক্রসের লাল করে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা। ভুল করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি এই মহিলাদের সেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু তারা কিছুতেই বুঝছে না।তারা এগিয়ে গিয়ে দুজন আফগান মহিলার সাথে কথা বলা শুরু করলেন। একটু আজ এর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় আর চেহারার মুখভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলাম, আমার কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। অন্তত আজ রাতে নয়।।অস্ট্রেলিয়ান তরুণী আমার দিকে এগিয়ে এলেন, আপনি চাইলে আমাদের সাথে রুমে থাকতে পারেন।’ আমি রাজি হলাম বিগত কয়েক দিনের মধ্যে এই প্রথম আমি কোনো নারী সঙ্গী পেলাম।তার উপর তারা ছিলেন ইংরেজিভাষী। তাদের সাথে কথা বলে আমি একটু হালকা হতে পারব।তাদেরদের সাথে রুমে ঢুকলাম। তৃতীয় বিশ্বের আর দশটা জেলখানার মতোই রুমটা ছিলো শ্রীহীন।

হটাত কি হলো জানি না, দারুণ এক অবসাদ আমাকে পেয়ে বসল। আমি নিদারুন কান্নায় ভেঙে পড়লাম। এ ছিল আমার বন্দি জীবনের প্রথম অশ্রু। মনে হলো, আমার ভেতরের এত দিনকার সব প্রতিরোধ তালেবানরা সফলতার সাথে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

নিজেকে শান্ত করতে আমি সিগারেট ধরাতে চাইলাম। তালেবান শাসনে। এমনিতে সিগারেট নিষিদ্ধ। তবে যখন তারা বুঝল আমি সিগারেট খাই, আমাকে বেশ কয়েকটা এনে দিয়েছিল।

গাল বেয়ে তখনো আমার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আমি কাঁপাকাঁপা হাতে ঠোটের কোণে সিগারেট রেখে লাইটার দিয়ে ধরানোর চেষ্টা করছি। আমি আমার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি একটা সিগারেট ধরালে কিছু মনে করবেন না তো?

‘অবশ্যই মনে করব’ উত্তর শুনে ধাক্কা খেলাম। এই রুমটা ধূমপান মুক্ত, ধূমপান করতে হলে বাইরে চলে যান।

পােড়া কপাল আমার! ধূমপানমুক্ত রুমেই কিনা আমার ঠাই হলো! পরক্ষণেই তারা জানালেন এই রুমে তারা এখন মিটিং করবেন। ‘মিটিং!’ আমি চমকে উঠলাম। “হ্যা। আমরা রোজ দুবার মিটিং করি।

হঠাৎ করে আমার মাথায় অন্য চিন্তা খেলে গেল। দুবার মিটিং! পালানোর কোনো  মতলব নেই তো? হয়তো তারা কোন প্ল্যান করেছেন। এখন আলোচনা করবেন, কী করে প্ল্যান মোতাবেক কাজ করা যায়।

নিকোটিনের নেশা আমার মাথা থেকে উবে গেল। আমি বেশ উৎসাহ নিয়ে বললাম, আমি কি আপনাদের সাথে থাকতে পারি?

তারা সম্মতি দিলেন। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের কাজ দেখছিলাম। ছয়জন মহিলা গোল হয়ে নিচে বসলেন। একজন তার ব্যাগ থেকে কী একটা বের করলেন।

কী ওটা? এই কারাগারের কোনো স্কেচ; যাতে কী করে পালান যায়?

যা দেখলাম, তাতে আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। ব্যাগ থেকে বের করে আনা বস্তুটি আসলে একখণ্ড বাইবেল।’

অবিশ্বাস্য! যে মহিলাদের ধর্মান্তরিত করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের শরিয়া আইনে বিচার হবে, তারা কিনা তালেবানের জেলে বসে প্রকাশ্যে বাইবেল পড়ছে। আমার মনে হলো, যেকোনো মুহূর্তে তালেবানের প্রহরী বিপুল বেগে ছুটে আসবে আর মহিলাদেরকে আচ্ছামতো পেটাবে।।

কিন্তু না, তেমন কিছুই হলো না। পরে আমি কুরআন পড়ে বুঝেছিলাম, মুসলিমরা ভিন্ন ধর্মালম্বীদের বিশেষ করে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সম্মান করে। তাদের ধর্ম পালনে কোনো বাধা দেয় না। আর তালেবান ঠিক এই কাজটাই করেছিল। অবশ্য সে সময় আমি তা বুঝিনি। আর বোঝার কথাও নয়।

ইজন প্রায় বিশ মিনিট ধরে বাইবেল থেকে পড়ে গেলেন। এরপর হাতে লেখা একটা কাগজ বের করলেন। শুরু হলো ধর্মীয় গীত গাওয়া। আস্তে আস্তে নয়, একেবারে উচ্চস্বরে। খুবই হাসি-খুশি, প্রাণচঞ্চল আর প্রাণবন্ত সে গানের সুরে অত্র রুম যেন গম গম করছিল।

আমি বাইরে এসে পর পর তিনটি সিগারেট শেষ করলাম।

সে রাতে আমি কংক্রিটের উপর পাতলা মাদুর বিছিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। পরদিন সকালে আমাকে এক প্রস্থ পরিষ্কার কাপড় দেয়া হলো।

তালেবানদের হাতে বন্দি থাকা অবস্থায় কেউ আমাকে ধর্ষণ করেনি। শ্লীলতাহানি করেনি। এমনকি আবু গারিব কারাগারের মতো উলঙ্গ করে চোখ বন্ধ অবস্থায় কেউ আমার ভিডিও করেনি। বুঝতেই পারছেন, আমেরিকানদের হাতে বন্দি মানুষগুলোর চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।।

রুমের বাইরে খোলা চত্বরের একদিকে পানির ব্যবস্থা ছিল। আমি আমার কাপড় চোপড় ধুয়ে দড়িতে শুকাতে দিলাম। একপাশে বসে আমি তখন আমার পুরোনো দিনের কথা ভাবছি। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে জেলার এলেন। জেলার ছিলেন লম্বা চওড়ায় বিশাল মানুষ। মুখভর্তি ঘন লম্বা দাড়ি। চেহারা যথারীতি গুরুগম্ভীর, ভয়ংকর।।

তিনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বেশ জোরে চেঁচিয়ে বললেন, “ওই সব কাপড় সরান।

আমি বললাম, ‘সমস্যা কী? ওগুলোতো আমার কাপড়। শুকাতে দিয়েছি।’ তিনি আবারও বললেন, ‘ওই কাপড় সরান। আরে ভাই, সমস্যা কী আপনার? দেখছেন না, আমি কাপড় ধুয়ে শুকাতে দিয়েছি। এখান থেকে সরালে কাপড় কি শুকাবে? তিনি আবারও বললেন, ‘ওই কাপড়গুলো ঢাকুন।

লোকটার কী মাথা খারাপ নাকি! বারবার কেবল এক কথাই বলে যাচ্ছে। আরে কাপড় ঢেকে রাখলে শুকাবে কী করে? আজব!’

এবার লোকটি একটা কাপড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ওটা সরান’। মুখ তখনো তার অন্যদিকে ফেরানো।

এতক্ষণে আমি বুঝলাম, তিনি আমার অন্তর্বাসের দিকে ইঙ্গিত করছেন। আমি বললাম, সমস্যা কী? এটা তো মহিলাদের ওয়ার্ড। এখানে কাপড় সরাতে হবে কেন?’

লোকটি রাগ করে বলল, ‘আমি বলছি, সরান।

আমিও সমান তেজের সাথে বললাম, ‘পারলে আপনি নিজে সরান, নয়তো এখান থেকে ভাগেন!’

আমি ভাবলাম, লোকটা মনে হয় রাগে ফেটে পড়বে। তা নয়, লোকটা হনহন করে বেরিয়ে গেল। অন্তত পনেরো মিনিট পরে আবার ফিরে এলো। সাথে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। আমি ভাবলাম, এই লোকগুলোর উপর দুদিন পরে আমেরিকা এসে বোমা ফেলবে। এটা নিয়ে এদের মধ্যে কোনো বিকার নেই। সামান্য একটা অন্তর্বাস নিয়ে এখানে রীতিমতো পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসে হাজির।

মন্ত্রী আমাকে অনুরোধ করলেন, দয়া করে আপনি কি এটা সরাবেন?

আমি উত্তর দিলাম, আচ্ছা, এই মহিলা ওয়ার্ডে আপনারা ছাড়া আর তো কোনো পুরুষ মানুষ নেই। বারবার এটা সরাতে বলছেন কেন? আপনারা চলে গেলেই তো হয়। এটা নিয়ে এত হইচইবা কেন করছেন?

তিনি ব্যাখ্যা দিলেন ‘মহিলা ওয়ার্ডের উপরেই তালেবান সৈনিকেরা থাকে। তারা যদি জানালা দিয়ে উঁকি দেয় আর আপনার ‘ওই’ জিনিস তাদের চোখে পড়ে, তবে তাদের মনে পাপ ঢুকবে।’

আমি বললাম, তাদের বলেন, তারা যেন বাইরে না তাকায়। তাহলেই তো ঝামেলা চুকে যায়! তিনি বললেন, এটা সম্ভব নয়।’ আমি ভাবলাম, আমেরিকা খামোখাই বি-৫২ বোমারু বিমান নিয়ে আফগানিস্তানের উপর বোমা ফেলতে আসছে। এত কিছু না করে এক প্লেন ভর্তি নারী সৈন্য পাঠিয়ে দিত। তারা প্রত্যেকেই তাদের অন্তর্বাস আকাশে-বাতাসে নাড়া দিত। ব্যস! তালেবান সব কই পালাত, তাদের টিকিও খুঁজে পাওয়া যেত না। আসলে গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে এই মানুষগুলোর মনের পবিত্রতা, চরিত্রের সুন্দর দিকটি যে কারও কাছেই পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

যাহোক, আমাদের তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকল। কে জিতল, কে হারল, জানি না।ইতোমধ্যে আমার কাপড়-চোপড় সব শুকিয়ে গেল। ৯ম দিনের মাথায় সেই মন্ত্রী আমার এখানে আবার এলেন। সাথে আরেকজন আয। দেখলে মনে হয়, এই মানুষটির পক্ষে ঠান্ডা মাথায় হাসতে হাসতে যে কাউকে খুন করা সম্ভব।তারা এসে আমাকে বললেন, আপনাকে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে। যথেষ্ট হয়েছে। আমি বিরক্তি মাখা স্বরে উত্তর দিলাম, আপনাদের অসংখ্য প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। আর নয়। নতুন করে আমার কিছু বলারও নেই। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। আবার শুরু হলো তর্ক-বিতর্ক। দুপক্ষের একে অন্যের প্রতি শাপ-শাপান্ত চলল। শেষে আমি মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে এমন দুঃসাহসিক কাজ করে বসলাম, যা আমি জীবনেও করিনি। আমি সেই তালেবান অফিসারের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিলাম। আমার ভেতরটা এতটাই তেঁতে ছিল। সে অফিসার দ্রুত চলে গেলেন। পরক্ষণেই, এক নারী অফিসার ছুটে এলেন “এ আপনি কী করলেন? আপনার সাহস তো কম নয়! এভাবে একজন অফিসারের মুখে থুথু মেরেছেন! আপনাকে বেত্রাঘাত করা হবে। আপনি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন।ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও হতভম্ব। ভেবে পাচ্ছিলাম না, আমার কী করা উচিত। মনের ভেতর দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমাকে কি জনসম্মুখে বেত্রাঘাত করা হবে? আল জাজিরা টিভিতে কি তা প্রচার হবে? বেত্রাঘাতের ব্যাথা না জানি কেমন!

চিন্তায় আমার মুখ শুকিয়ে আসছিল।

দশ-পনেরো মিনিট পর গেইট খোলার আওয়াজ পেলাম। আমার সঙ্গী খ্রিষ্টান বোন উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন ‘ওরা ফিরে এসেছে!

তিন তিনজন খ্রিষ্টান বোন আমাকে আড়াল করে ঘিরে ধরলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন ‘প্রভু যিশু! করুণা করে।ইভন যেন কোনো ব্যথা অনুভব না করে।

তাতে আমার ভয় বাড়ল বৈ কমলো না। নিজেকে আমি মনে মনে এমন কাণ্ডের জন্য অভিশাপ দিচ্ছিলাম।

শুনতে পেলাম, একটু একটু করে তাদের পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসছে…।

খানিক পরেই সেই হাসি মুখের ঠান্ডা মাথার খুনি ফিরে এলেন। তার হাতে সেই জিনিস যার জন্য বিগত নয়টি দিন আমি অনশন করে চলছি।

তিনি হাতে থাকা স্যাটেলাইট মোবাইল ফোন আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বললেন, ‘যারা যারা চাও মোবাইল ব্যবহার করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কথা বলতে পার। কেবল এই ব্রিটিশ মহিলা ছাড়া। সে আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে। আমাদের গায়ে থুথু ছিটিয়েছে।’ চিন্তা করা যায়! এই ছিল পৃথিবীর নিকৃষ্ট নিষ্ঠুর শাসকগােষ্ঠীর আমাকে দেয়া শাস্তি ও নির্যাতনের নমুনা!

ফোন হাতে পেয়ে আমার সাথের মহিলারা খুব খুশি হলেন। মাসের পর মাস তাদের পরিবার-পরিজনের সাথে কথা হয়নি। এই সুযোগ বলতে গেলে তারা লুফে নিলেন।

আমার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছিল। বলতেই হয়, তালেবানের বুদ্ধিবৃত্তি অত্যন্ত উন্নতমানের। তারা খুব সূক্ষ্মভাবে আমাকে আহত করতে পেরেছিল।

আমার সাথে এক আমেরিকান বোন এগিয়ে গেলেন সেই হাসি হাসি মুখের মানুষটির দিকে, দেখুন! আজ নয় দিন হলো ইভন এখানে বন্দি। দয়া করে তাকেও একটু কথা বলতে দিন। অন্তত তার মেয়ের সাথে কথা বলুক প্লিজ।

সেই হাসি হাসি মুখ দৃঢ় স্বরে উত্তর দিলেন, ‘উহু! সে আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।

সেদিন বিকেলে কোনো রকম আগাম ঘোষণা ছাড়াই তালেবানরা আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলল। আমার সমস্ত কাপড়-চোপড়সহ আমাকে দোতলার একটি রুমে নিয়ে এল। সেখানে একজন সিনিয়র অফিসার থাকতেন। আমার জন্য তা খালি করা হলো। রুমটি আফগানিস্তানের স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ভালোই।

অফিসার আমার দিকে ফিরে বললেন, আপনি নিচের রুমগুলো নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। আজ রাতে এখানেই থাকবেন। কাল সকালে আপনাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

আমি কিছুটা বিরক্তি সহকারে বললাম, ‘সব কথার শেষে কি একটা ইনশাআল্লাহ, ইনশাআল্লাহ বলেন, কিন্তু কখনোই তা ঘটে না?

আসলে  আমি ইনশাআল্লাহ শব্দের মানে জানতাম না। এখন আমি জানি।ইনশাআল্লাহ’ মানে ‘আল্লাহ যদি চান।

তারা আমাকে রুমে রেখে আমার হাতে চাবি দিয়ে গেল। আমি ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিলাম।

আমার রুম থেকে কাবুল শহরের বিরাট অংশ দেখা যেত। আমি বিছানায় আধাশোয়া হয়ে জানালা দিয়ে দূরের নয়নাভিরাম পর্বতমালা দেখছিলাম।

মন আমার নানা চিন্তায় বিক্ষিপ্ত। কত বারই তো আমাকে বলা হলো, ইনশাআল্লাহ তুমি বাড়ি যাচ্ছ। কিন্তু সেই ইনশাআল্লাহ তো আজও আসেনি। এবারেও কি তাই? তারা কী বুঝে আমাকে খ্রিষ্টান বোনদের থেকে আলাদা করে নিলেন? তাদের আসলে মতলব টা কী? তারা কি সত্যিই আমাকে মুক্তি দিবে? নাকি সকাল হতেই মেরে ফেলবে?হটাত আমার খাট টা দুলে উঠল। প্রচণ্ড শব্দে আমার চিন্তার জট ছিড়ে গেল। বাইরে তাকিয়ে দেখি, আলোর ঝলকানিতে গোটা আকাশ আলোয় আলোকিত।

বুঝতে পারলাম যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেই রাতে ইঙ্গ-মার্কিন জোট পঞ্চাশ টার উপরে ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করেছিল কাবুলের উপর।

ক্রুজ মিশাইলের আওয়াজ অন্তত ২০ মাইল দূর থেকেও শোনা যায়। একটি বোমা এসে পড়ছিল আমাদের জেলখানার আধ মাইলের মধ্যে।

আমি এর আগেও অনেক যুদ্ধের সংবাদ কাভার করেছি। জানি না, এত দিন। কেন বিষয়টা খেয়াল করিনি।

সেই রাতে এক নতুন উপলব্ধি হলো আমার এমন নির্বিচার বোমা বর্ষণ থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না। পালানোর কোনো পথ নেই। এই বোমা নারী শিশু বৃদ্ধকে আলাদা করতে পারে না। এই বোমাতে যেমন শাসকগোষ্ঠী মরবে, ঠিক তমনি মুহর্তেই বেসামরিক অতি সাধারণ নারী-পুরুষ-শিশুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

হতে পারে ব্রিটিশ কোনো বোমার আঘাতে এই আমি ব্রিটিশ নাগরিকও মারা পড়েছি। টনি ব্লেয়ার হয়তো সব দায়ভার চাপাবে তালেবানের ঘাড়ে। ব্যাস! মিটে গেল সব।

আমি সত্যিই খুব ভয় পেয়েছিলাম। ভাবলাম, ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ। এখন আর আমাকে ছেড়ে দেয়ার কোনো  কারণই নেই।

পরের দিন সকালে আমার দরজার কড়া নড়ে উঠল।

আমাকে বলা হলো, আপনি জলদি আসুন। আপনার জন্য নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে। আপনাকে পাকিস্তান পৌছে দেয়া হবে।

আমি এক বিন্দুও বিশ্বাস করিনি।

নিচে নেমে দেখি, আসলেই একটা গাড়ি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি গাড়িতে চড়ে বসলাম। জালালাবাদ হয়ে আমার গাড়ি এসে পৌছল পাকিস্তান সীমান্তে।

আমাকে পাকিস্তানি সীমান্ত রক্ষীদের হাতে হস্তান্তর করে দেয়া হলো। আমি যখন ‘নো ম্যান্স ল্যান্ডে এসে পৌছালাম, মুহুর্তে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। অসংখ্য সাংবাদিক আমার দিকে ছুটে এল ‘আপনার সাথে তালেবান কেমন আচরণ করেছিল? আমি এক মুহূর্ত ভাবলাম। তারপর মুখ খুললাম ‘অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ।

পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম আমার উত্তরে ভীষণ হতাশ হলো। তারা এমন কিছু মোটেও আশা করেনি। তারা চাইছিল আবু গারিব’ টাইপের কিছু একটা। তাদের প্রত্যাশা ছিল, আমার দুই গালে থাকবে আঘাতের চিহ্ন। দুচোখে থাকবে অশ্রুধারা।।

তারা ভেবেছিল, আমি এসে বলব ‘আমার সাথে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে, আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে কিংবা আমাকে অত্যন্ত বর্বরোচিতভাবে পেটানো হয়েছে।’

আফসোস! সে রকম কিছুই হয়নি। সত্যি কথাটাই আমাকে বলতে হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, কিছু মানুষের জন্য এই সত্যটা হজম করা কঠিন।

দু সপ্তাহ পরে আমি লন্ডন ফিরে এলাম। একদিন আমার পাকিস্তানি গাইড পাশা আমাকে ফোন করল, ‘ম্যাডাম! জালালাবাদের সেই ছোট গ্রামটির কথা কি আপনার মনে আছে? সেই গ্রামটি বোমার আঘাতে পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’ আমি সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বললাম, “দেখ পাশা! যুদ্ধ যখন চলে তখন এরকম অনেক ঘটনাই ঘটে যা ঠেকানো যায় না। এটা একটা দুর্ঘটনা মাত্র।

পাশা উত্তর দিল, ‘ম্যাডাম! টানা তিন দিন ধরে যখন একটা গ্রামের উপর নির্বিচারে বোমা ফেলা হয়, তখন আপনি তাকে দুর্ঘটনা বলেন কী করে?

আমার কাছে এর কোনো জবাব ছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম, ইচ্ছে করেই বেসামরিক লোকদের টার্গেট করে নির্বিচারে বোমা ফেলা হচ্ছে। যাতে এক ইঞ্চি পরিমান জায়গাও সে বোমার বাইরে না থাকে।

অবশ্য এর কিছু দায় তালেবানেরও ছিল।

যুদ্ধ শুরু পরপরই তালেবান সকল পশ্চিমা সাংবাদিকদের দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। সাংবাদিক যে দেশেরই হোন না-কেন, তাদেরকে তাদের মত করেই তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। পশ্চিমা সাংবাদিকরা না থাকাতে গোটা বশ্ব বুঝতেই পারেনি, নির্বিচারে বোমা মেরে ইঙ্গ-মার্কিন জোট কী পরিমাণ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

এই ঘটনা আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। আমি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠলাম।

একই সময়ে তালেবানকে দেয়া আমার প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে গেল। তারা তাদের কথা রেখেছে। আমাকে নিরাপদে মুক্তি দিয়েছে। আমি তো কথা দিয়েছিলাম, মুক্তি পেলে আমি কুরআন পড়ব। ইসলাম নিয়ে গবেষণা করব।

এবার আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার পালা।

আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম।

কিন্তু মুসলিম আমার এই কুরআন পড়ার কথা জানতে পারল। তাদেরই একজন আমাকে দিলেন আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলির ইংরেজি অনুবাদ। এই অনুবাদের শেষের দিকে ইনডেক্স দেয়া ছিল। এই যেমন; নারী বিষয়ে কুরআনে কোথায় কি বলা হয়েছে, আল্লাহ সম্পর্কে কী আছে, নবি, ফেরেশতা ও পরকাল সম্পর্কে

কুরআনের ভাষ্য কী, ইত্যাদি।

ভাবলাম, যাক ভালোই হলো। খুব সহজেই নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানতে পারব। আমি প্রথমে ভাবলাম, নারী সম্পর্কিত আয়াতগুলো পড়া যাক। দেখা যাক,

কোরআনে নারীদের সম্পর্কে কী বলে? বিশেষ করে কুরআন কীভাবে নারীদেরকে পুরুষদের অধীনস্থ করে রাখতে, অবদমিত করে রাখার কথা বলে?

আমি নারী সম্পর্কিত আয়াতগুলো পড়া শুরু করলাম। পাশাপাশি এ সম্পর্কে আরও ভালো করে বুঝার জন্য ইসলামিক বই-পত্রও হাতের কাছে রাখলাম।

অবিশ্বাস্য! আমি যা পেলাম, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। কুরআন কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করছে, আল্লাহর কাছে আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী পুরুষ একই মর্যাদার এবং একই কাতারের।

প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন একজন নারী (হযরত খাদিজা রা.)। ইসলামের পথে প্রথম শহিদও ছিলেন একজন নারী (হযরত সুমাইয়া রা.)। ইসলামের প্রথম দিন থেকেই নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছিলেন। এমনকি পুরুষদের পাশাপাশি তারা যুদ্ধও করেছিলেন।

উহুদ যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছিলেন, আমি আমার সামনে পেছনে যেদিকেই তাকাচ্ছিলাম, দেখলাম এক নারী বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে আমাকে শত্রুদের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।

বুঝতে পারছিলাম না, ইসলামে নারীরা নির্যাতিত, নিষ্পেষিত…এই ধারণা আমরা কোথায় পেলাম? কে আমাদের মনে এই বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে? আমি তো কোথাও এমন কিছু খুঁজে পেলাম না। শিক্ষা, সম্পত্তি, তালাক সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশ আছে, আছে অধিকার। আজ আমরা নারী অধিকারের কথা বলি। দৃশ্যত মনে হয়, আধুনিক নারীদের আইন-কানুনগুলো যেন ইসলামিক আইনের দ্বারাই অনুপ্রাণিত।

আমি ইসলামকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু করলাম। আমার মনে হলো, ইসলাম ও নারী সম্পর্কে জানা হলো, এবার দেখা যাক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষগুলো কেমন? বিশেষত নারীরা।

আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই গিয়েছি সেটা হোক পাকিস্তান, সৌদি আরব, কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ড… আমি মুসলিম বোনদের পেয়েছি। বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন যোগ্যতার অধিকারী হিসেবে।

কয়েক বছর আগেও হিজাবধারী কোনো মহিলাকে দেখলে আমার করুণা হতো। মনে হতো, আহা বেচারি! কত নির্যাতিত আর পরাধীন অবস্থার ভেতরেই না আছে! ঘর থেকে বাইরে আসতে তাদের কী কষ্টই না করতে হয়েছে!

এখন আমি হিজাবধারী বোনদের দেখলে বোঝার চেষ্টা করি, এদের মধ্যে কে ডাক্তার,কে ইঞ্জিনিয়ার? কে আইনজীবী, কে শিক্ষক? কে পিএইচডি করছেন,কে এমফিল করছেন? কে তার পেশার পাশাপাশি তার পরিবার, সমাজ গড়াতে সময় দিচ্ছেন? আমি এখন আর তাদের বাহ্যিক পোশাক দিয়ে বিচার করি না।ভাবি পর্দার আড়ালের মানুষটি আসলে কেমন।

আমার মনে আছে, কানাডার এক বোন আমাকে বলেছিলেন, ‘Yvonne, My head might be covered, but mind is not. (ইভন! আমার মাথা ঢাকা থাকতে পারে, কিন্তু আমার মন-মনন-চিন্তা অবরুদ্ধ নয়, স্বাধীন’।) আমি তার কথায় এত বিশাল শিক্ষা পেয়েছিলাম।

মুসলমানদের আরেকটা বিষয় খুব চমৎকার। তাদের রয়েছে চমৎকার সামাজিক বন্ধন।

যা হোক, তখনো আমি শাহাদাহ উচ্চারণ করিনি। ইসলাম নিয়ে গভীর পড়াশোনা করছিলাম। যদিও বাজারে জোর গুঞ্জন ছিল, আমি বোধহয় ইসলাম কবুল করেছি।

একদিন আমার কাছে একটা ফোন এল ‘সিস্টার ইভন! আপনাকে ইসলামে স্বাগতম। তিনি ছিলেন প্রিন্সটাউনের চরম মতাদর্শী ইমাম, আবু হামজা আল মাসরি।

আমি উত্তর দিলাম, আপনাকে ধন্যবাদ। তবে আপনার ধারণা সঠিক নয়। আমি এখনো শাহাদাহ উচ্চারণ করিনি। আশা করি ইনশাআল্লাহ স্বল্প সময়ের মধ্যে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’

তিনি বললেন, ‘সমস্যা নেই বোন। আপনি আপনার মতো করে সময় নিন। ভালোমতো অধ্যয়ন করুন, জানুন, বুঝুন। ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত হবে আপনার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। আমরা আপনার জন্য দোয়া করি, যাতে আল্লাহ আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন। আপনাকে হিদায়া দেন।

আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, তিনি এই ভাষায় কথা বলছেন। এক চোখে পট্টি বাধা এই ইমামের বদনামের শেষ ছিল না। ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো ছিল তার নানা কিচ্ছা কাহিনিতে ভরপুর।

আমি উত্তরে বললাম, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি সময়ে সময়ে আমার অগ্রগতি সম্পর্কে আপনাকে জানাব’- আমি ফোনটা রেখে দিচ্ছিলাম।

তিনি বললেন, ‘এক মিনিট! শুধু একটা বিষয় আপনাকে বলতে চাই। আপনি যদি আগামীকাল বাইরে বের হন, আর মুসলিম হওয়ার আগে কোনো বাসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান’… তার কণ্ঠ এবার মেঘের মতো গর্জে উঠল ‘তাহলে আপনার জায়গা হবে…সোজা জাহান্নামে!’

‘ধন্যবাদ!’ আমি ফোনটা রেখে দিলাম। ভেতরে ভেতরে আমার খুব নার্ভাস লাগছিল। আমি জলদি শাহাদাত পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলাম।

অবশেষে ২০০৩ সালের ৩০ই জুন, সকাল ১১:৩০ এ আমি আমার শাহাদাহ উচ্চারণ করলাম, “আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ ও তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি যোগ দিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে আপন এক বিশাল পরিবারে।

আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর যে প্রান্তেই আমি থাকি না কেন, আমার মুসলিম ভাইবোনেরা আমাকে আপন করে নিবেন।

পরিচিতি

ব্রিটিশ সাংবাদিক ইভনের জন্ম ২৩ই এপ্রিল ১৯৫৮ ইংল্যান্ডের ডারহামে। তার পেশাগত জীবন শুরু হয় Stanley News পত্রিকার মাধ্যমে। এরপরে তিনি The Sunday Times, The Independent on Sunday, The Observer, the Daily Mirror সহ বিশ্ববিখ্যাত বেশ কয়েকটি পত্রিকায় রিপোর্টার ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর তিনি আফগানিস্তানে ছদ্মবেশে প্রবেশ করেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। এক পর্যায়ে তালেবানের হাতে তিনি বন্দি হন। তার বন্দি হবার খবরে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। তার প্রতি তালেবানদের মার্জিত ব্যবহার তাকে ইসলাম নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে। একসময় ইসলাম নিয়ে গভীর অধ্যয়ন শেষে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তী জীবনে তিনি ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। বিভিন্ন মিডিয়া, প্রচার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সোচ্চার হন। তালেবানের হাতে বন্দি হওয়া ও তার আগে পরের সময়কাল নিয়ে তার লেখা বই In the Hands of Taliban সারা বিশ্বে দারুণ আলোচিত হয় ও সাড়া ফেলে। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে আরও আছে Ticket to Paradise, Torture-Does it work? ইত্যাদি। উপরে বর্ণিত কাহিনি ২০০৩ সালে নিউজিল্যান্ডে দেয়া এক বক্তৃতার রূপান্তর।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা সন্তানের জননী।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন