মূল:চার ইমামের আকীদাহ

মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান

তাওহীদ বিষয়ে তার বাণী:

তাবকাতুল হানাবিলা গ্রন্থে এসেছে: ইমাম আহমাদকে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ফলে তিনি বললেন, মাখলুক থেকে আশাকে নিরাশের সাথে ছিন্ন করে দেওয়া।

হাম্বলের পরীক্ষার ওপর লিখিত “আল-মিহনাহ’ গ্রন্থে এসেছে, ইমাম আহমাদ বলেছেন: আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লা আদি থেকেই কথক (মুতাকাল্লিম)। আর কুরআন সব বিবেচনাতেই আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লার কালাম মাখলুক নয়। আল্লাহ তাঁর নিজের সত্তাকে যেসব গুণ দ্বারা বিশেষিত করেছেন তার চেয়ে বেশি কিছু দ্বারা তাঁকে বিশেষিত করা যাবে না।

ইবন আবী ইয়া‘লা আবূ বকর আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আহমদ ইবন হাম্বালকে সেসব হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, যেগুলো জাহমিয়ারা আল্লাহর সিফাত, দিদার, ইসরা ও আরশের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যান করে, তিনি সেগুলোকে সহীহ বললেন। আর বলেছেন, উম্মত এগুলোকে কবুল করে নিয়েছে। আর হাদীসগুলো যেভাবে আসছে সেভাবেই থাকবে।

কিতাবুস সুন্নাহতে আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আহমাদ বলেছেন: যে এ ধারণা করে, আল্লাহ কথা বলেন না সে কাফির। তবে আমরা এ হাদীসসমূহ যেভাবে এসেছে সেভাবেই বর্ণনা করি।

লালাকায়ী হাম্বাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইমাম আহমাদকে আল্লাহর দিদার সম্পর্কে জিজ্ঞাস করেছেন, ফলে তিনি বললেন, হাদীসগুলো সহীহ। আমরা তার প্রতি ঈমান আনি ও তা স্বীকার করি। বস্তুত যেসব হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে, আমরা তার প্রতি ঈমান আনি ও স্বীকার করি।

ইবনুল জাওযী তাঁর ‘মানাকিব’ গ্রন্থে মুসাদ্দাদ (ইবন মুসারহাদ) এর জন্যে রচিত আহমাদ ইবন হাম্বলের কিতাবটি উল্লেখ করেছেন, তাতে রয়েছে: তোমরা আল্লাহকে সেসব গুণে গুনান্বিত করো, যা দ্বারা তিনি নিজেকে গুনান্বিত করেছেন এবং আল্লাহ থেকে তোমরা সেসব দোষ-ত্রুটি নাকচ করো, যা তিনি তার নিজের থেকে নাকোচ করেছেন।

আহমাদ রচিত ‘আর-রদ আলাল জাহমিয়া’ কিতাবে তার বাণী এভাবে এসেছে: জাহাম ইবন সাফওয়ান বলে, আল্লাহ স্বীয় কিতাবে নিজেকে যা দ্বারা গুনান্বিত করেছেন অথবা (আল্লাহর কোনো গুণ) তাঁর রাসূল থেকে বর্ণনা করেছে, সে কাফির ও সাদৃশ্যবাদীদের অর্ন্তভুক্ত।

ইবনু তাইমিয়্যাহ “আদ-দারউ” কিতাবে ইমাম আহমাদের কথা বর্ণনা করেন: আমরা ঈমান আনি যে, আল্লাহ যেভাবে ও যেমন চেয়েছেন সেভাবে আরশের ওপর রয়েছেন কোনো ধরণ বর্ণনাকারীর ধরণ ও সংজ্ঞা বর্ণনাকারীর সংজ্ঞা ছাড়াই। আল্লাহর সিফাতসমূহ তার থেকেই এবং তাঁর জন্যেই। তিনি তেমনই যেমনটি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন। তাকে চক্ষুসমূহ আয়ত্ব করতে পারে না।

ইবনু ইয়া‘লা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহকে আখিরাতে দেখা যাবে সে কাফির কুরআনকে মিথ্যা সাব্যস্তকারী।

ইবন আবি ইয়া‘লা আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে এক সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যারা বলেন, আল্লাহ যখন মূসার সাথে কথা বলেছেন, তখন তিনি আওয়াজের সাথে কথা বলেননি। তখন আমার পিতা বললেন, আল্লাহ আওয়াজের সাথে কথা বলেছেন। আর এ সব হাদীস যেভাবে এসেছে সেভাবেই আমরা বর্ণনা করি।

লালাকাঈ’ আব্দূস ইবন মালিক আল-আত্তার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবন হাম্বলকে বলতে শুনেছি: কুরআন আল্লাহর কালাম, তা মাখলুক নয়। মাখলুক নয় বলতে দুর্বল হবে না। কারণ, আল্লাহর কালাম আল্লাহর থেকেই। আর তার থেকে কোন বস্তুই মাখলুক নয়।

কাদর বিষয়ে তার বাণী

ইবনুল জাওযী তার ‘মানাকিব’ নামক গ্রন্থে মুসাদ্দাদের জন্যে লেখা আহমাদ ইবন হাম্বালের কিতাবটি উল্লেখ করেছেন, তাতে রয়েছে: তাকদীরের ভালো-মন্দ ও মিষ্ট-তিক্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে ঈমান আনবে।

আল-খাল্লাল আবু বকর আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আবু আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, (উত্তরে) তিনি বললেন: ভালো ও মন্দ সবকিছুই বান্দার ওপর নির্ধারিত। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো : আল্লাহই কি ভালো ও মন্দ সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহই তা নির্ধারণ করেছেন।

ইমাম আহমাদের আস-সুন্নাহ কিতাবে এসেছে, তিনি বলেছেন, তাকদীরের ভালো-মন্দ, কম-বেশি, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, মিষ্ট-তিক্ত, প্রিয়-অপ্রিয়, সুন্দর-অসুন্দর, শুরু-শেষ সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে। এগুলো আল্লাহর ফয়সালা। তিনি তাঁর বান্দাদের উপর ফয়সালা করেছেন এবং তাঁর নির্ধারণ, যা তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর নির্ধারণ করেছেন। তাদের কেউ আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধিতা করতে পারে না এবং তাঁর ফায়সালাকে অতিক্রম করতে পারে না।

খাল্লাল মুহাম্মাদ ইবন আবী হারুন থেকে তিনি আবী হারেস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি: আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা ইবাদাত ও গুনাহ নির্ধারণ করেছেন, ভালো ও মন্দ নির্ধারণ করেছেন। যাকে তিনি সৌভাগ্যবান লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি সৌভাগ্যবান আর যাকে তিনি দূর্ভাগ্যবান লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি দূর্ভাগ্যবান।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি তাকে আলী বিন জাহাম জিজ্ঞাসা করল, যে ব্যক্তি কাদার বা তাকদীর অস্বীকার করে সে কি কাফির হবে? তিনি বললেন, যদি আল্লাহ তা‘আলার ইলমকে অস্বীকার করে তাহলে সে কাফির হবে। সে যখন বলবে, আল্লাহ আলেম ছিলেন না। তারপর তিনি ইলম সৃষ্টি করেছেন অতঃপর জেনেছেন। যে এমন কথা বলবে, সে আল্লাহর ইলমকে অস্বীকার করার কারণে কাফির হবে।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে আরেকবার কাদারীর পিছনে সালাত আদায় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, সে যদি এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করে এবং তার দিকে আহবান করে তাহলে, তুমি তার পিছনে সালাত আদায় করবে না।

ঈমান বিষয়ে তার বাণী:

ইবন আবী ইয়া‘লা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ঈমানের চরিত্রসমূহ হতে উত্তম চরিত্র হলো আল্লাহর জন্য মুহাব্বত করা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা।

ইবনুল জাওযী আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ঈমান বাড়ে এবং কমে, যেমনটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।ঈমানের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ মু’মিন, তাদের মধ্যে যে চারিত্রের দিক দিয়ে সুন্দর।

ঈমানের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ মু’মিন, তাদের মধ্যে যে চারিত্রের দিক দিয়ে সুন্দর।

খাল্লাল সুলাইমান ইবন আশ‘আছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু আব্দুল্লাহ বলেছেন, সালাত, যাকাত, হজ্জ ও নেক আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর পাপসমূহ ঈমানকে হ্রাস করে।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম যিনি বলেন, ঈমান কথা ও আমলের নাম এবং কমে ও বাড়ে তবে সে ইস্তেসনা করে না (ইনশাআল্লাহ বলে না) সে কি মুরজী? তিনি বলেন, আশা করি সে মুরজিইয়্যাহ হবে না। আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, ইস্তেসনা না করার বিপক্ষে প্রমাণ হচ্ছে কবরবাসীদের জন্য রাসূলের বাণী:যদি আল্লাহ চায় অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে অচীরেই সম্পৃক্ত হবো।

যদি আল্লাহ চায় অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে অচীরেই সম্পৃক্ত হবো।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতা—রাহিমাহুল্লাহু—কে ইরজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি। তখন তিনি বললেন, আমরা বলবো, ঈমান হচ্ছে কথা ও আমল এবং তা কমে ও বাড়ে। আর যখন ব্যভিচার ও মদ পান করে তখন তার ঈমান কমে।

সাহাবীদের বিষয়ে তার মতামত:

ইমাম আহমাদের আস-সুন্নাহ কিতাবে নিম্নের লিখিত কথাগুলো এসেছে: সুন্নাত হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমস্ত সাহাবীর চারিত্রিক সৌন্দর্যগুলো তুলে ধরা। তাদের খারাপ দিকগুলো এবং তাদের মধ্যে সংঘটিত বিরোধের আলোচনা থেকে বিরত থাকা। যে ব্যক্তি রাসূলের সাহাবীগণকে বা তাদের কাউকে গালি দেয়, সে বিদ‘আতী, রাফেযী, দুষ্ট এবং অভদ্র। আল্লাহ তার কোন ফরয বা নফল আমল কবুল করবেন না। বরং সাহাবীগণকে ভালোবাসা সুন্নাত, তাদের জন্য দুআ করা সাওয়াবের কাজ, তাদের অনুসরণ করা নৈকট্য এবং তাদের কথা গ্রহণ করা ফযীলতের বিষয়।

তারপর তিনি বলেন, অতঃপর চার খলীফার পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ সর্বোত্তম মানুষ। কারো জন্য তাদের খারাপ দিকগুলো আলোচনা করা বৈধ নয় এবং তাদের কাউকে কোন দোষ-ত্রুটি দ্বারা আঘাত করা যাবে না। যে এ ধরনের কর্ম করে শাসকের ওপর ওয়াজিব হলো তাকে শাস্তি ও শিক্ষা দেওয়া। তাকে ক্ষমা করার কোন অধিকার শাসকের নাই।

ইবনুল জাওযী মুসাদ্দাদের নিকট ইমাম আহমাদের পত্রটি উল্লেখ করেছেন, তাতে রয়েছে: তুমি দশজন সাহাবীর বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা জান্নাতী। তারা হলেন, আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর, সা‘আদ, সা‘ঈদ, আব্দুর রহমান ইবন আওফ, আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।আর যার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, আমরাও তার জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দেব।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে ইমামগণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আবূ বকর, তারপর উমার তারপর উসমান তারপর আলী।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি যারা বলে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু খলীফা নয়। তিনি বলেন, এটি মন্দ ও নিম্নমানের কথা।

ইবনুল জূযূ আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আলীর খিলাফত মানে না সে তার পরিবারের গাধা থেকেও অধিক ভ্রষ্ট।

ইবনু আবী ইয়া‘লা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি আলী ইবন আবু তালেবকে চতুর্থ খলীফা স্বীকার করে না তার সাথে তোমরা কথা বলো না এবং তাকে বিবাহ করাবে না।

কালাম শাস্ত্র ও দীনের বিষয়ে ঝগড়া করা থেকে তার নিষেধ করা:

ইবন বাত্তাহ আবূ বকর আল মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি: যে কালাম আদান-প্রদান করে সে কামিয়াব হবে না। আর যে কালাম আদান প্রদান করে সে জাহমিয়াহ হওয়া ছাড়া থাকবে না।

ইবনে আব্দুল বার ‘জামে বায়ানুল ইলম’ নামক কিতাবে আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইলমুল কালামের অধিকারী কখনোই সফলকাম হবে না। যে ব্যক্তি ইলমুল কালামের মধ্যে দৃষ্টি দিবে তার অন্তরে অবশ্যই তুমি কোন না কোনো বক্রতা দেখতে পাবে।

হারাভী আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ ইবন আম্বল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার পিতা উবাইদুল্লাহ ইবন ইয়াহয়া ইবন খাকানের নিকট লিখেন, আমি আহলে কালাম নই। আল্লাহর কিতাব বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে যা আছে তা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কালাম করাকে ভালো মনে করি না। কারণ, এ ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কালাম করা প্রশংসনীয় নয়।

ইবনুল জাওযী মূসা ইবন আব্দুল্লাহ আত-তারসূসী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি আহমাদ বিন হাম্বালকে বলতে শুনেছি, তোমরা তর্কশাস্ত্রবিদদের সাথে উঠ-বস করো না। যদিও তারা সুন্নাতের পক্ষে প্রতিহত করে।

ইবন বাত্তাহ আবূল হারেস আস-সায়েগ‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: যে ব্যক্তি কালামকে মহব্বত করে তা তার অন্তর থেকে বের হবে না। আর তুমি কোন কালামীকে সফল হতে দেখবে না।

ইবন বত্তাহ উবাইদুল্লাহ ইবন হাম্বাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা বলেছেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি: তোমরা সুন্নাত ও হাদীসকে আঁকড়ে ধরো। তার দ্বারাই আল্লাহ তোমাদের উপকার করবেন। আর তোমরা ঘাটাঘাটি, ঝগড়া ও অন্যায় বিতর্ক করা থেকে বিরত থাক। কারণ, কালাম পছন্দকারী কেউ সফল হয় না। আর যে কেউ কালাম শাস্ত্র চর্চা করে তার পরিণতি বিদ‘আত ভিন্ন কিছু হয় না। কেননা কালাম কোনো কল্যাণের দিকে আহ্বান করে না। আমি ঘাটাঘাটি, ঝগড়া ও অন্যায় বিতর্ক করা পছন্দ করি না। আর তোমরা সুন্নাত, সাহাবীগণের কথা ও ফিকাহ গ্রহণ করো যার দ্বারা তোমরা উপকৃত হবে। আর তোমরা ঝগড়া, বাঁকা পথের অনুসারীদের কথা ও অন্যায় বিতর্ক বর্জন করো। আমরা পূর্ববর্তী লোকদেরকে পেয়েছি তারা এসব জানতেন না, তারা কালাম পন্থীদেরকে এড়িয়ে চলতেন। বস্তুত কালাম শাস্ত্রের পরিণতি কখনো ভালোর দিকে যায় না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের ও তোমাদেরকে ফিতনা থেকে সুরক্ষা দিন এবং আমাদের ও তোমাদেরকে সব ধরনের ধ্বংস থেকে নিরাপত্তা দিন।

আল ইবানাহ নামক কিতাবে ইবনু বাত্তাহ আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, তুমি যখন কোন লোককে ইলমুল কালামকে মুহাব্বাত করতে দেখবে তখন তুমি তার থেকে সতর্ক থাকবে।

এ হলো দীনের মৌলিক বিষয়ে তার মতামত এবং ইলমে কালাম বিষয়ে তার অবস্থান

পরিশিষ্ট:

উপরের আলোচনা দ্বারা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, আকীদার ক্ষেত্রে চার ইমামের বক্তব্য ছিল এক ও অভিন্ন। শুধু ঈমানের মাসআলা ছাড়া তাদের সকলের আকীদাহ এক। ইমানের মাসআলায় ইমাম আবূ হানীফা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এদত্ব সত্তেও বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ঈমান বিষয়ে তার মতামত থেকে ফিরে এসেছেন।

এই আকীদাহ মুসলিমগণকে এক কালিমার ওপর একত্র করা এবং দীনের ব্যাপারে তাদেরকে দলাদলি থেকে বাঁচানোর উপযুক্ত মাধ্যম। কারণ এসব আকীদাহ আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত থেকেই গৃহিত হয়েছে। খুব কম মানুষই এসব ইমামের আকীদাহ বুঝে এবং ভালোভাবে জানে ও ভালোভাবে শিখে। বরং এ কথা ছড়িয়ে গেছে যে, এসব ইমাম আকীদাহ সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোর জ্ঞান আল্লাহর নিকট সোপর্দ করতেন এবং তাঁরা কুরআন-সুন্নাহ শুধু পাঠ করা ব্যতীত আর কিছুই জানতেন না। যেন আল্লাহ অনর্থক অহী নাযিল করেছেন।

অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।সূরা সাদ : ২৯আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।আশ-শু‘আরা : ১৯২, ১৯৫আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,নিশ্চয় আমি একে আরবী কুরআনরূপে নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।ইউছুফ : ২

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।

সূরা সাদ : ২৯

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।

আশ-শু‘আরা : ১৯২, ১৯৫

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

নিশ্চয় আমি একে আরবী কুরআনরূপে নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।

ইউছুফ : ২

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন নাযিল করেছেন, যাতে তার আয়াতসমূহে চিন্তা করা হয় এবং তা দ্বারা উপদেশ গ্রহন করা যায়। তিনি সংবাদ দেন যে, তিনি কুরআনকে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন, যাতে মানুষ তার অর্থ জানে ও বুঝে। আল্লাহ যেহেতু তার আয়াতসমূহ চিন্তা করার জন্য স্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন, তাই যাদের প্রতি এটি নাযিল করা হয়েছে, সুস্পষ্ট আরবী ভাষার দাবি অনুযায়ী তাদের জন্য এর অর্থ জানা সহজ হওয়া আবশ্যক। কুরআন যদি এমন হতো যে, তার অর্থ জানা সম্ভব নয়, তাহলে তা নাযিল করা অনর্থক হতো। কারণ কোনো সম্প্রদায়ের নিকট এমন শব্দমালা নাযিল করে কোনো লাভ নেই, যা তাদের নিকট অর্থবিহীন শব্দের স্থলাভিষিক্ত; যার কোন অর্থ নেই।

এ ধরনের কথা বলা, সাহাবী, তাবে‘ঈ ও তাদের পরবর্তী ইমামগণের আকিদার ওপর অপবাদ এবং এমন কিছু তাদের দিকে ছুড়ে মারা যার থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত। তারা নবুওয়তী যুগের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে ওহীর নসসমূহের অর্থ জানেন ও বুঝেন। বরং এ বিষয়ে সব মানুষের চেয়ে তাঁঁরাই বেশী হকদার। তারা এমন কতক ইবাদাত দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করেন যা তারা কুরআন ও সুন্নাহের প্রমাণ থেকে বুঝেছেন এবং তারা তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সত্য ও বিধান বলে বিশ্বাস করেছেন। বস্তুত যে রাস্তা তাদেরকে তাদের মা‘বুদের নিকট পৌঁছে দেয় সে রাস্তাকে যখন তারা চিনেছেন তাহলে কীভাবে তারা তাদের মা‘বুদকে পরিপূর্ণ সিফাতের সাথে চিনবে না এবং নসসমূহের অর্থ জানবে না, যা আল্লাহ নিজেই তার বান্দাদের জানিয়েছেন?!

মোট কথা এ চার ইমামের আকীদা হলো বিশুদ্ধ আকীদা যা কুরআন ও সুন্নাহের পরিষ্কার ঝর্ণাধারা থেকে এসেছে, তার সাথে ব্যাখ্যা, অস্বীকার করা বা সাদৃশ্য বা তুলনার লেশও যুক্ত হয় না। সাদৃশবাদী ও মুয়াত্তীল আল্লাহর সিফাত থেকে তাই বুঝেছে যা মাখলুকের সাথে প্রযোজ্য হয়। আর এটি হচ্ছে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে যে ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন তার সম্পূর্ণ পরীপন্থী। কারণ, (বান্দারা স্বভাগতভাবে জানে) আল্লাহর মতো কোন কিছুই হয় না, না তার সত্বার মতো হয়, না তার সিফাতের মতো হয়, না তার কর্মসমূহে মতো হয়।

আল্লাহর নিকট আমার প্রার্থনা যে, তিনি এই পুস্তিকা দ্বারা মুসলিমগণের উপকার করেন এবং তাদেরকে এক আকীদাহ ও এক পথের ওপর একত্র করেন, যা কুরআন ও সুন্নাহের আকীদাহ এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ও তাঁর সুন্নাত। আল্লাহই ইচ্ছার পিছনে। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক।

আমাদের শেষ দাবি হলো, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।

আর আল্লাহ সালাত নাযিল করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদের ওপর।