ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

২০. ইসলামী শরী‘আতে অপরাধের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে ফকীহগণ বলেন,

إنها محظورات شرعية زجر الله عنها بحد أو تعزير

‘‘অপরাধ হলো, শরী‘আতের সে সব নিষিদ্ধ বিষয় যেগুলোর সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা হদ বা তা‘যীর দ্বারা সতর্ক করেছেন।’’[1]

শরী‘আতের নিষিদ্ধ বিষয়াদি বলতে সে সব কাজ বুঝায় যা করতে বা ছাড়তে শরী‘আত নিষেধ করেছে। এক কথায়, করণীয় কাজ না করা অথবা নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হওয়ার নামই অপরাধ। সুতরাং এর দ্বারা বুঝা যায় যে, কর্ম সম্পাদন কিংবা বর্জন এ দ্বিবিধ বিষয়ই অপরাধ। কেননা ইসলামী শরী‘আত একে নিষিদ্ধ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। অনুরূপ শাস্তির উৎসও শরী‘আত। শরী‘আত বিশেষ বিশেষ অপরাধের জন্য বিশেষ বিশেষ শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়ে বলে দিয়েছে যে, এই অপরাধের এই শাস্তি। ইসলামী শরী‘আতে এ শাস্তি দু প্রকার:

প্রথম প্রকার: নির্ধারিত শাস্তিসমূহ, যা প্রথম থেকেই শরী‘আত নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।  সেগুলো হচ্ছে হদ, কিসাস ও দিয়াত।

দ্বিতীয় প্রকার: ঐসব শাস্তি যার প্রকার বা স্বরূপ শরী‘আত বর্ণনা করেছে; কিন্তু তার পরিমাণ ধার্য করার দায়িত্ব বিচারকের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বিচারক অপরাধের সাথে শাস্তির প্রকারগুলোর মধ্য থেকে যেটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটি নির্বাচন করবেন এবং শাস্তির মাত্রাও নির্ধারণ করবেন। এই শ্রেণির শাস্তিকে বলা হয় তা‘যীর (তিরস্কারমূলক শাস্তি)। শরী‘আত তা‘যীরের প্রকার বর্ণনা করে দিয়েছে। যেমন, বেত্রাঘাত, জেল, ভৎর্সনা ইত্যাদি। বিচারক এগুলোর মধ্য থেকে একটিকে নির্বাচন করে মাত্রা বা পরিমাণ ঠিক করে দিবেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি যদি কোনো অপরাধের শাস্তিস্বরূপ বেত্রাঘাত নির্বাচন করেন, তা হলে সে বেত্রাঘাত দশটি হবে না-কি বেশি হবে, তার পরিমাণও বলে দিবেন। তবে শাস্তির ধরণ ও পরিমাণ নির্ধারণ বিচারকের ইখতিয়ার তার খেয়াল-খুশীমত হবে না; বরং তা হবে বিধিবদ্ধ নিয়মের সাথে সঙ্গতি রেখে। বিচারকের কর্তব্য সেসব নিয়ম রক্ষা করা। সামনে এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তা‘যীর শাস্তির ধরণ ও পরিমাণ নির্ধারণ করার দায়িত্ব বিচারক বা নির্বাহী প্রধানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলেও ইসলামী শরী‘আতই এর উৎস মূল। শাস্তি আইনের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এমন কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না, যা ইসলামী উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণে নির্ধারিত হয় নি। সুতরাং শাস্তির আইন বিধিবদ্ধ থাকাই ইসলামী শরী‘আতে শাস্তির প্রথম বৈশিষ্ট্য।

২১. ইসলামে শাস্তির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য শাস্তির স্বাতন্ত্র্য। এর অর্থ, শাস্তির মূলে বা অপরাধের সাথে জড়িত নয় -এমন ব্যক্তির ওপর শাস্তি প্রয়োগ না হওয়া। এ বিষয়ের  মূলনীতি আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয়:

﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ﴾ [فاطر: ١٨]

“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৮]

﴿مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا فَلِنَفۡسِهِۦۖ وَمَنۡ أَسَآءَ فَعَلَيۡهَا﴾ [الجاثية: ١٥]

“যে সৎকাজ করে সে নিজের কল্যাণেই তা করে। আর যে মন্দ কাজ করে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে।” [সূরা আল-জাছিয়া, আয়াত: ১৫]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا يؤخذ الرجل بجريرة أبيه ولا بجريرة أخيه».

“কোনো লোককে তার পিতার পাপে বা ভাইয়ের পাপে অভিযুক্ত করা যাবে না।”

বস্তুত: শাস্তির স্বাতন্ত্র্যসত্তার দাবী হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং স্বজনের পাপে স্বজনকে এবং বন্ধুর পাপে বন্ধুকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী ও যুলুমের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামের প্রথম যুগের মুশরিকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর অকথ্য নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছে। সে কারণে তাদের অপরাধে তাদের স্বজনদেরকে মুসলিমরা অভিযুক্ত করে নি। ভুলবশতঃ হত্যায় অপরাধীর স্বজনদের ওপর দিয়াত (রক্তমূল্য) আরোপ করায় এ স্বাতন্ত্র্য লোপ পায় না বা ক্ষুণ্ণ হয় না। কেননা, স্বজনদের ওপর দিয়াত আরোপে অপরাধীর শাস্তি প্রত্যাহার হয়ে স্বজনদের ওপর চলে যায় না কিংবা তাদেরকে দিয়াতের শাস্তিতে শরীকও গণ্য করা হয় না। বস্তুত স্বজনদের ওপর দিয়াত আদায়ের হুকুম দেওয়া হয়েছে অপরাধীর প্রতি সহানুভুতি ও সহযোগিতা প্রকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে। কারণ, স্বজনদের পক্ষ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার অপরাধীর রয়েছে। তাই বলে বলা যাবে না যে, সাহায্য-সহানুভুতি দেখানো স্বজনদের ওপর ওয়াজিব নয়। কেননা ওয়াজিব বলা হলে তা আর সহানুভুতির পর্যায়ে থাকে না; বরং এটা হয়ে যাবে অপরাধীর থেকে শাস্তি প্রত্যাহার করে নিরপরাধীর ওপর আরোপ করার শামিল। এ দ্বারা শাস্তির স্বাতন্ত্র্য ভুলুণ্ঠিত হয়; কিন্তু এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা শরী‘আত কখনও এমন ব্যক্তির ওপর সহমর্মিতা দেখান ওয়াজিব করে দেয়, যে আদৌ পাপ করে নি। যেমন দরিদ্র অভাবী প্রতিবেশীকে সাহায্য করা ধনীর ওপর ওয়াজিব করা হয়েছে। এখানে সাহায্যের ভিত্তি হচ্ছে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন। শরী‘আত একে দরিদ্র প্রতিবেশীর পক্ষে ধনীর ওপর ওয়াজিব করে দিয়েছে। এমন কি সে যদি তা স্বেচ্ছায় দিতে অস্বীকার করে তা হলে আদালত তাকে বাধ্য করবে। তারপরে আরও বলা যায় যে, স্বজনদের ওপর দিয়াত ওয়াজিব হওয়া পুরষ্কার অনুপাতে দণ্ড (الغرم بالغنم) নীতির বাস্তবায়ণ। স্বজনদের সকল সদস্য উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ লাভ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ মিরাছ হলো পুরষ্কার। ওয়ারিছসূত্রে প্রাপ্ত এ পুরষ্কার তারা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিবে। তেমনিভাবেই তারা ঋণের ভারও নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিবে। সেই ঋণ হলো দিয়ত। কিছু সংখ্যক ফকীহ স্বজনদের ওপর দিয়াত ধার্যের ভিন্ন এক ব্যাখ্যা দেন। তার সার সংক্ষেপ হলো, স্বজন বা নিকট জ্ঞাতিদের অন্যতম দায়িত্ব হলো তাদের অন্তর্ভুক্ত সকল সদস্যের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা। যাতে তারা নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে বল্গাহীনভাবে না বেড়ায় এবং কোনো প্রকার অপরাধে লিপ্ত না হয়। যদি তাদের মধ্যে কেউ ভুলক্রমে হত্যা করার ঘটনা ঘটায় তা হলে বুঝা যাবে তার স্বজনরা এই অপরাধীর বেলায় দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে। ফলে নিয়ন্ত্রণহীন, উদাসীন ও অদূরদর্শী হয়ে সে ভুল হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে, যা একটি বড় ধরনের অপরাধ। সুতরাং আবশ্যকীয় দায়িত্ব পলনে ত্রুটি করায় এই অপরাধীর সাথে স্বজনদের ওপরও দিয়াত ওয়াজিব হবে। উপরোক্ত ব্যাখ্যাদ্বয়ের যে কোনোটি গ্রহণ করা হোক না কেন স্বজনদের ওপর দিয়াত ওয়াজিব হওয়ায় শাস্তির স্বতন্ত্র্য-বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট হয় না।

২২. ইসলামে শাস্তির তৃতীয় বৈশিষ্ট্য শাস্তির সর্বজনীনতা। অপরাধী যেই হোক ইসলামের শাস্তি বিধান তার ওপর কার্যকর হবে। কেউ এর থেকে রেহাই পাবে না। এখানে শাসক-শাসিত, শরীফ-ইতর, উচ্চ শ্রেণি-নিম্ন শ্রেণি, ধনী-গরিব, নরী-পুরুষ ও সবল-দুর্বলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করতে শরী‘আত কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে যে, দণ্ডবিধি সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকরি না করা গোটা জাতি ধ্বংসের কারণ। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إنما هلك الذين من قبلكم أنهم كانوا إذا سرق فيهم الشريف تركوه ، وإذا سرق فيهم الضعيف أقاموا عليه الحد وأيم الله لو أن فاطمة ابنة محمد سرقت لقطعت يدها».

“তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হয়েছে; কারণ তাদের মধ্যে অভিজাত শ্রেণির কেউ চুরি করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো। পক্ষান্তরে কোনো দুর্বল লোক চুরি করলে তাকে দণ্ডিত করা হত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করে তাহলে আমি তার হাত কেটে দিব।”

বস্তুত ইসলামে শাস্তি প্রয়োগের এ সমতা নীতিই সমাজের সেসব প্রভাবশালী লোকদেরকে দমিয়ে দিতে সক্ষম যারা তাদের শক্তির জোরে অপরাধ কর্মে আকৃষ্ট হয়। তাদের মনে যদি এই ধারণা থাকে এবং আশা পোষণ করে যে, সামাজিক প্রভাবের কারণে তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হবে তা হলে তো তারা শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে  যাবে। কিন্তু যদি তারা এ শাস্তিকে পূর্ণ সমতার সাথে কঠোরভাবে প্রয়োগ থেকে দেখে তা হলে তারা দমে যাবে। তাদের বাতিল ধান্দা আর সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। তারা যত বড় ক্ষমতাধর হোক না কেন শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। কেননা রাষ্ট্রের শক্তি তাদের শক্তি থেকে অনেক বড়। ফলে সমাজের দুর্বল শ্রেণির লোক স্বস্তি লাভ করবে এবং তাদের জান, মাল ও সম্মান প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপদ মনে করবে। এ অবস্থায় সে যে কোনো প্রভাবশালী লোকের চেয়ে অধিক শক্তিশালী। কারণ রাষ্ট্র তার পক্ষে আছে। আইনের দৃষ্টিতে শাস্তির সমতা রক্ষা করা যখন ওয়াজিব তখন তা সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। সুপারিশ বা অন্য কোনো পন্থায় অপরাধীর শাস্তি প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে ইসলাম নিষেধ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَّن يَشۡفَعۡ شَفَٰعَةً حَسَنَةٗ يَكُن لَّهُۥ نَصِيبٞ مِّنۡهَاۖ وَمَن يَشۡفَعۡ شَفَٰعَةٗ سَيِّئَةٗ يَكُن لَّهُۥ كِفۡلٞ مِّنۡهَاۗ﴾ [النساء: ٨٥]

“কেউ কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে এবং কেউ কোনো মন্দ কাজের সুপারিশ করলে তাতে তার অংশ থাকবে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮৫]

যে ব্যক্তি অপরাধীর শাস্তি রহিত করার সুপারিশ করবে তার সুপারিশ নিঃসন্দেহে একটি মন্দ সুপারিশ বলে বিবেচিত হবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من حالت شفاعته دون حد من حدود الله فقد ضاد الله في أمره».

“যে ব্যক্তির সুপারিশ আল্লাহর বিধান কার্যকর করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে, সে মূলত: আল্লাহর হুকুমের বিরোধিতা করে।”

শর‘ঈ শাস্তি মওকুফ করার জন্য সুপারিশ করা যেমন অবৈধ, তেমন অপরাধির কৃত অপরাধ ও শরী‘আতের বিরোধিতার কারণে প্রাপ্ত শাস্তি বাতিল করা কিংবা ক্ষমা করে দিতে অপরাধীর নিকট থেকে অর্থ গ্রহণ করা কর্তৃপক্ষের জন্য অবৈধ। চাই সে অর্থ বায়তুল মালে (রাজকোষে) জমা হোক বা অন্য কেউ ভোগ করুক। এ অর্থ ঘৃণিত অপবিত্র এবং ঘুষ।

২৩. এতক্ষণ শাস্তি সম্মন্ধে যা কিছু আলোচনা হলো তা শরী‘আতের স্থীরকৃত সিদ্ধান্ত। তবে দু’টি বিষয়ে ইমামদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। প্রথমতঃ রাষ্ট্র প্রধান কর্তৃক নিজের বিরুদ্ধে হদ জারি বিষয়ে এবং দ্বিতীয়তঃ ইসলামের দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্থান বিবেচনা বিষয়ে। প্রথম ক্ষেত্র অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রধান কর্তৃক নিজের বিরুদ্ধে হদ জারি বিষয়ে মতভেদ এ কারণে নয় যে, শরী‘আতের শাস্তি বিধানে অসমতা আছে। এর কারণ অন্য কিছু। বিষয়টির বিস্তারিত বর্ণনা এই, হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ রাষ্ট্র প্রধান কর্তৃক নিজের বিরুদ্ধে হদ জারি করা ওয়াজিব মনে করেন না। কিন্তু জমহুর ফকীহগণের মত ভিন্ন। তারা মনে করেন, ইসলামের হদ জারি করা -নিজের বিরুদ্ধে হলেও -রাষ্ট্র প্রধানের ওপর বর্তায়। হানাফীগণের যুক্তি হলো, রাষ্ট্র প্রধান কর্তৃক নিজের ওপর হদ বাস্তবায়ন বা কার্যকর করা সম্ভব নয়। কেননা রাষ্ট্রের মধ্যে অন্য নাগরিকদের ওপর যেহেতু হদ জারি করেন তিনিই। তাই নিজের ওপর হদ জারি করতে তিনি অপারগ। কেননা হদ জারি করা হয় লাঞ্ছনাসহ শিক্ষামূলক শাস্তি হিসেবে। এই জিনিস কেউ নিজের ওপর প্রয়োগ করতে পারে না। যখন শাস্তি বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে গেল, তখন শাস্তির হুকুম দেওয়ার অপরিহার্যতা আর থাকল না। তবে রাষ্ট্র প্রধান ব্যতীত আর যত আমলা ও প্রশাসক আছেন, তাদের ওপর হদ জারির ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই, যদি তারা হদের উপযুক্ত অপরাধ করেন। আর জমহুরদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, হদ জারির ক্ষেত্রে নাগরিক ও রাষ্ট্র প্রধান সবাই সমান। কোনো ভেদাভেদ নেই। এ দৃষ্টিভঙ্গি অতি উত্তম। এ রকম হওয়াই বাঞ্ছনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নীতি ছিল, যদি কিসাসের উপযোগী কোনো কাজ তাঁর থেকে প্রকাশ পেত তাহলে তার থেকে কিসাস (অনুরূপ বদলা) নেওয়ার আহ্বান জানাতেন। হদ যেহেতু আল্লাহর হক তাই একে কার্যকরী করার প্রতি মনোযোগী হওয়া অধিক প্রয়োজন। কারণ সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অশান্তির মূলোচ্ছেদ এর মধ্যেই নিহিত। জমহুরদের দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে যুক্তি হচ্ছে, শরী‘আতে শাস্তির নির্দেশ একটি ‘আম বা সাধারণ নির্দেশ। শাসক-শাসিত সবাই এ নির্দেশের আওতাভুক্ত। অন্য দিকে অন্যায় অপরাধ করা সকলের জন্য হারাম নিষিদ্ধ। যার মধ্যে রাষ্ট্র প্রধানও অন্তর্ভুক্ত। কাজেই অন্যরা অপরাধ করলে যে শাস্তি পাবে, রাষ্ট্র প্রধান অপরাধ করলেও একই শাস্তি পাবে। বাকী থাকে শাস্তি বাস্তবায়ন করার বিষয়। এ ব্যাপারে জমহুর ফকীহগণ বলেন, রাষ্ট্র প্রধানের ওপর শাস্তি জারি করবে তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত কোনো প্রতিনিধি। কেননা এটা করা হবে তার কল্যাণে ও জনগণের কল্যাণে।[2]

২৪. মতভেদের দ্বিতীয় বিষয় শাস্তি কার্যকর করার স্থান নির্ণয় নিয়ে। ইসলামে শাস্তির সার্বজনীনতা স্থানকাল নির্বিশেষে সর্বত্র প্রযোজ্য । তবে এই সার্বজনীনতার বাস্তব প্রয়োগ ইসলামী রাষ্ট্রেই (দারুল ইসলাম) সীমাবদ্ধ। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে অবস্থানকারী সকলের ওপর এ নির্দেশ কার্যকর হবে। ইসলামী শরী‘আত মূলত: একটি বিশ্ব ব্যবস্থা। তাই এর শাস্তি বিধান মূলগতভাবে সকল মানুষের জন্য প্রণীত। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপর ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব না থাকায় কেবল ইসলামী রাষ্ট্রেই এর প্রয়োগ সীমিত। অন্য দেশে নয়। ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-র নিম্নোক্ত বক্তব্যে এ কথাই ব্যক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শরী‘আতের মূল দাবী হচ্ছে তার বিধান সকল মানুষের জন্য সর্বব্যাপী। কিন্তু অমুসলিম রাষ্ট্রে (দারুল হারব) কর্তৃত্ব না থাকায় তথায় জারি করা সম্ভব নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে সম্ভব বিধায় এখানে জারি করা অপরিহার্য।’[3] এ নিয়মের ভিত্তিতে ইসলামী রষ্ট্রে সংঘটিত সকল অপরাধে শর‘ঈ শাস্তি প্রয়োগ হবে। অপরাধ কে করল তার জাতপাত বা ধর্মের দিকে তাকাবার কোনোই প্রয়োজন নেই। মুসলিম, জিম্মি, আশ্রয় গ্রহণকারী সবার ওপর এ শাস্তি কার্যকর হবে। রাষ্ট্র ক্ষমতার ব্যাপকতার এটাই সাধারণ নিয়ম। তদুপরি মুসলিম ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামী বিধান নিজের ওপর বাধ্য করে নেয়। জিম্মি চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় এ বিধানকে মেনে নেয়। অনুরূপ আশ্রয়প্রার্থী ইসলামী রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করায় যতদিন থাকবে ততদিন এ বিধান শিরোধার্য করে নেয়। অথবা সে যদি এ আইন না মেনে আশ্রয় গ্রহণ করে তবুও তার ওপর এ আইন স্বাভাবিকভাবে কার্যকর হবে, যেহেতু রাষ্ট্রের সর্বব্যাপী ক্ষমতা দেশের সকল জনগোষ্ঠীর ওপর সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত।

উপরে আমরা যা কিছু বর্ণনা করলাম তা এ বিষয়ের সাধারণ নিয়ম। তবে শাখা মাসয়ালায় ফকীহগণের মধ্যে জিম্মিদের ব্যাপারে অল্প এবং আশ্রয় প্রার্থীদের ব্যাপারে প্রচুর মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানিফা ও তদীয় শিষ্য ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে আশ্রয় গ্রহণকারীদের ওপর হদ প্রয়োগ করা যাবে না যা কেবল আল্লাহর হক; বরং তাদেরকে তা‘যীর বা লঘু দণ্ড দেওয়া যাবে। জমহুরগণ এ মতের বিরোধিতা করে বলেন, তাদের ওপর হদ জারি করতে হবে। অনুরূপভাবে জমহুর ফকীহগণ জিম্মি ও আশ্রয় গ্রহণকারীগণকে মদ্য পানের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার কথা বলেন। কেননা অমুসলিমরা তাদের ধর্মমতে মদ্যপানকে হারাম জানে না। আহলে জাহেরগণ এ মাসয়ালায় জমহুরদের বিপক্ষে বলেন। তাদের মতে মদখোর শাস্তি পাবে। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক।


[1] আল-মাওয়ারদী, প্রাগুক্ত, পৃ-২১১।

[2] এ মাসয়ালার বিস্তারিত বর্ণনা ও উভয় পক্ষের দলীল এর জন্য দেখুন, আহকামুয যিম্মিয়্যিয়িন ওয়াল মুসতামিনিন ফি দারিল ইসলাম।

[3] বাদাইয়ুস সানা‘ঈ, ২য় খণ্ড, পৃ-৩১১।