ইলমী গবেষণা ডীনশীপ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এ দু’ সাক্ষ্য ইসলামে প্রবেশ পথ ও তার মহান স্তম্ভ। কোনো ব্যক্তি মুসলিম হতে পারবে না যতক্ষণ না সে এ দু’ সাক্ষ্য মুখে উচ্চারণ করবে ও সাক্ষ্যদ্বয়ের দাবী অনুযায়ী আমল করবে।

আর এ সাক্ষ্য দানের মাধ্যমেই এক কাফির মুসলিম হয়ে যায়।

১- আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এ সাক্ষ্য দানের অর্থ: এর অর্থ জেনে তা মুখে উচ্চারণ করা, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে এর দাবী ও চাহিদা অনুযায়ী আমল করা।

বস্তুত এর অর্থ না জেনে এবং এর দাবী অনুযায়ী আমল না করে শুধু মুখে পাঠ করা সকলের ঐকমত্যে কোনো উপকারে আসে না। বরং তার বিরূদ্ধে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হবে।

আর ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ হলো: এক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা ছাড়া কোনো সত্য মা‘বুদ নেই।

এ কালেমার দু’টি রুকন (অঙ্গ) রয়েছে:

১- না-বাচক অঙ্গ; (অস্বীকৃতি জানানো আর ২- হ্যাঁ-বাচক অঙ্গ (স্বীকৃতি জানানো):

আল্লাহ ছাড়া সব কিছুর উপাসনা অস্বীকার করা এবং সে উপাসনা একমাত্র অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা, যার কোনো অংশীদার নেই। তাগুতকে অস্বীকার করাও এ কালেমার অন্তর্ভুক্ত।

তাগুত-হলো, আল্লাহ ছাড়া মানুষ, পাথর, বৃক্ষ ও প্রবৃত্তি ইত্যাদি যা কিছুর পূজা-উপাসনা করা হয় আর সে উপাস্য তাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।

মূলতঃ তাগুতকে ঘৃণা করা ও তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করাও এ কালেমার অর্থের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, যে ব্যক্তি এ কালেমা মুখে উচ্চারণ করেছে অথচ আল্লাহ ছাড়া যে সকল বস্তুর ইবাদাত করা হয় তা অস্বীকার করে নি সে এ কালেমার দাবী পূরণ করে নি।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلرَّحۡمَٰنُ ٱلرَّحِيمُ ١٦٣ ﴾ [البقرة: ١٦٣]

“তোমাদের ইলাহ-উপাস্য হলেন এক ও অদ্বিতীয় আর সে মহান করুণাময় দয়ালু ব্যতীত সত্যিকার কোনো মা‘বুদ- উপাস্য নেই।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৩]

তিনি আরো বলেন,

﴿لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَيِّۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٥٦﴾ [البقرة: ٢٥٦]

“দীনে প্রবেশ করানোর ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নাই, সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগুতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে সে এমন এক মজবূত হাতল ধরবে যাহা কখনও ভাঙ্গবে না। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬]

আর ইলাহ-এর অর্থ: মা‘বুদ-উপাস্য। কেউ যদি এ বিশ্বাস করে যে ইলাহ অর্থ সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা বা নতুন কিছু আবিস্কারে ক্ষমতাশীল, আর সে যদি মনে করে যে এ বিশ্বাসই যথেষ্ট, যদিও সে সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট না করে- সে ব্যক্তির ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ দুনিয়াতে কোনো উপকারে আসবে না, আর আখিরাতে স্থায়ী শাস্তি হতে এ কালেমা তাকে মুক্তিও দিবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ ٣١﴾ [يونس : ٣١]

“বল, কে তোমাদেরকে আকাশ ও পৃথিবী হতে জীবনোপকরণ সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি কার কর্তৃত্বাধীন? কে জীবিতকে মৃত থেকে নির্গত করে এবং কে মৃতকে জীবিত থেকে নির্গত করে এবং কে সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩১]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ فَأَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٨٧﴾ [الزخرف: ٨٧]

“যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তবুও তারা কোথায় ফিরছে?” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৭]

২- কালেমায়ে তাওহীদ-এর শর্তসমূহ:
(১) ইতিবাচক ও নেতিবাচক অর্থ জানা, যা না জানার বিপরীত।

নেতিবাচক হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য ইবাদাত সাব্যস্ত না করা। আর ইতিবাচক হলো ইবাদাত এককভাবে তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা। তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তিনিই একমাত্র ইবাদাতের মালিক ও হক্বদার।

(২) এ কালেমার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, যা যাবতীয় সন্দেহ-সংশয়ের বিপরীত।

অর্থাৎ এ কালেমার দাবীর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে আন্ত-রিকভাবে নিশ্চিত হয়ে মুখে উচ্চারণ করা।

(৩) এ কালেমাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করা, যা প্রত্যাখ্যানের পরিপন্থী।

অর্থাৎ এ কালেমার সকল দাবী-চাহিদা ও তার বক্তব্য গ্রহণ করা। সংবাদসমূহের প্রতি বিশ্বাস রাখা, আদেশসমূহ পালন করা। নিষেধসমূহ থেকে বিরত থাকা। কুরআন ও হাদীসের দলীল পরিত্যাগ ও অপব্যাখ্যা না করা।

(৪) কালেমার প্রতি অনুগত হওয়া, যা ছেড়ে দেওয়ার পরিপন্থী। অর্থাৎ এ কালেমা যে সকল বিধানের নির্দেশ দিয়েছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে তার প্রতি অনুগত থাকা।

(৫) এ কালেমাকে সত্য জানা, যা মিথ্যারোপ করার বিরোধী। আর তা হলো বান্দা এ কালেমাকে সত্য জেনে অন্তর থেকে উচ্চারণ করবে। অর্থাৎ এ কালেমা পাঠকারীর অন্তর তার কথা মোতাবেক হবে এবং তার বাহ্যিক অবস্থা অভ্যন্তরীণ অবস্থা অনুযায়ী হবে।

অতঃপর যে ব্যক্তি এ কালেমা মুখে উচ্চারণ করেছে অথচ তার দাবীকে অস্বীকার করেছে নিশ্চয় তার মুখের এ উচ্চারণ তার কোনো কাজে আসবে না। যেমন, মুনাফিকদের অবস্থা ছিল। তারা এ কালেমা মুখে উচ্চারণ করতো কিন্তু অন্তরে অস্বীকার করতো।

(৬) পূর্ণ একনিষ্ঠতা থাকা, যা শির্কের পরিপন্থী। আর তা হলো বান্দা তার আমলকে নেক নিয়াতের দ্বারা শির্কের সকল প্রকারের গ্লানি থেকে মুক্ত রাখবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٰلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ ٥﴾ [البينة: ٥]

“তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে ইবাদাত করার”। [সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫]

(৭) এ কালেমার সাথে মুহাব্বাত-ভালোবাসা রাখা, যা বিদ্বেষের পরিপন্থী।

আর তা বাস্তবায়িত হবে, এ কালেমাকে, তার দাবীকে, তার নির্দেশিত বিধানকে এবং যারা এ কালেমার শর্ত মোতাবেক চলে তাদেরকে ভালোবাসার মাধ্যমে। আর উল্লিখিত কথাগুলোর বিপরীত কথার সাথে বিদ্বেষ রাখার মাধ্যমে।

এর নিদর্শন হলো, আল্লাহর প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দেওয়া, যদিও তা প্রবৃত্তি বিরোধী হয়। আর আল্লাহর যা অপছন্দ তা অপছন্দ করা, যদিও তার দিকে প্রবৃত্তি ধাবিত হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যাদের বন্ধুত্ব রয়েছে তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যাদের শত্রুতা রয়েছে তাদের সাথে শত্রুতা রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قَدۡ كَانَتۡ لَكُمۡ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ فِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذۡ قَالُواْ لِقَوۡمِهِمۡ إِنَّا بُرَءَٰٓؤُاْ مِنكُمۡ وَمِمَّا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ كَفَرۡنَا بِكُمۡ وَبَدَا بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةُ وَٱلۡبَغۡضَآءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ وَحۡدَهُۥٓ إِلَّا قَوۡلَ إِبۡرَٰهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسۡتَغۡفِرَنَّ لَكَ وَمَآ أَمۡلِكُ لَكَ مِنَ ٱللَّهِ مِن شَيۡءٖۖ رَّبَّنَا عَلَيۡكَ تَوَكَّلۡنَا وَإِلَيۡكَ أَنَبۡنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ ٤﴾ [الممتحنة : ٤]

“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদাত কর তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে শুরু হলো শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন”। [সূরা আল-মুমতাহানাহ, আয়াত: ৪]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادٗا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبّٗا لِّلَّهِۗ وَلَوۡ يَرَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُوٓاْ إِذۡ يَرَوۡنَ ٱلۡعَذَابَ أَنَّ ٱلۡقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعٗا وَأَنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعَذَابِ ١٦٥﴾ [البقرة: ١٦٥]

“তথাপি কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালোবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালোবাসে, কিন্তু যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা দৃঢ়তম”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৫]

আর যে ব্যক্তি ইখলাস ও ইয়াকীনের সাথে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা‘বুদ নেই’’ একথা বলবে এবং সকল পাপাচার, বিদ‘আত, ছোট শির্ক ও বড় শির্ক থেকে মুক্ত থাকবে, সে দুনিয়াতে পথভ্রষ্ট থেকে হিদায়াত পাবে। আর আখিরাতে শাস্তি থেকে নিরাপত্তা পাবে। তার ওপর জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে।

এ শর্তগুলো পূর্ণ করা বান্দার ওপর আবশ্যক। আর এ শর্তগুলো পূর্ণ করা অর্থ হলো যে, এ শর্তগুলো একজন বান্দার জীবনে সমাবেশ ঘটা এবং তা জানা অত্যাবশ্যক হওয়া। তবে তা মুখস্থ করা জরূরী নয়।

এ মহান কালেমা (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু) হলো তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ বা ইবাদতে একত্বতা গ্রহণ, যা তাওহীদের প্রকারসমূহের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাওহীদ, এ বিষয়েই নবীগণ ও তাদের সম্প্রদায়ের মাঝে মতানৈক্য সংঘটিত হয়েছিল। আর এরই বাস্তবায়নের জন্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছিল।

যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ فَمِنۡهُم مَّنۡ هَدَى ٱللَّهُ وَمِنۡهُم مَّنۡ حَقَّتۡ عَلَيۡهِ ٱلضَّلَٰلَةُۚ فَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَٱنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلۡمُكَذِّبِينَ ٣٦﴾ [النحل: ٣٦]

“আর অবশ্যই আমরা আল্লাহর ইবাদাত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্যই তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি”। [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [الانبياء: ٢٥]

“আমরা তোমার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তাঁর নিকটে এ অহী অবতীর্ণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য মা‘বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]

আর যখন শুধু তাওহীদ বলা হবে, তখন তা থেকে উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ।

তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ-এর সংজ্ঞা: আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টিজীবের ইবাদত ও উপাসনা পাওয়ার মালিক, তিনি এককভাবে ইবাদাতের মালিক, তাঁর কোনো শরীক নেই এ স্বীকৃতি দেওয়া।

তাওহীদুল উলূহিয়্যার নামসমূহ: এ তাওহীদকে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ বা ইলাহিয়্যাহ বলা হয়। কারণ, একনিষ্ঠভাবে তা নিছক তা‘আল্লুহ (تأله) ওপর প্রতিষ্ঠিত। একক আল্লাহর জন্য অধিক ভালোবাসাকে তা‘আল্লুহ বলা হয়।

নিম্নে বর্ণিত নামগুলো তাওহীদুল উলূহিয়্যার নাম:

(ক) তাওহীদুল ইবাদাহ বা উবূদিয়্যাহ: কারণ, তা এক আল্লাহর জন্য ইবাদাত নির্ধারিত হওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

(খ) তাওহীদুল ইরাদা: কারণ, তা আমলের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

(গ) তাওহীদুল কাছদ: কারণ, তা এক আল্লাহর জন্য ইবাদাতকে একনিষ্ঠ অত্যাবশ্যক করে এমন ঐকান্তিক ইচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

(ঘ) তাওহীদুত ত্বলাব: কারণ, তা আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে চাওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

(ঙ) তাওহীদুল আমল: কারণ, তা আল্লাহ তা‘আলার জন্য আমলকে একনিষ্ঠ করার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

‘তাওহীদুল উলুহিয়্যা’-এর হুকুম বা বিধান:

তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ সকল বান্দার ওপর ফরয।

বান্দারা কেবল এর দ্বারাই ইসলামে প্রবেশ করে।

আর এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও আমল করলেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর এ বিশ্বাস এবং এ মোতাবেক আমল করা সর্বপ্রথম ফরয।

আর এর দ্বারাই দাওয়াত ও শিক্ষা শুরু করা সর্বপ্রথম কর্তব্য। যারা এর বিপরীত ধারণা করে তারা এতে মতনৈক্য করেছে।

কুরআন ও হাদীসে এর ফরয হওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

আল্লাহ এরই বাস্তবায়নের জন্য সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِنَّمَآ أُمِرۡتُ أَنۡ أَعۡبُدَ ٱللَّهَ وَلَآ أُشۡرِكَ بِهِۦٓۚ إِلَيۡهِ أَدۡعُواْ وَإِلَيۡهِ مَ‍َٔابِ ٣٦﴾ [الرعد: ٣٦]

“বল, আমি তো আল্লাহর ইবাদাত করতে ও তাঁর কোনো শরীক না করতে আদিষ্ট হয়েছি। আমি তাঁরই প্রতি আহ্বান করি এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন”। [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ৩৬]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦﴾ [الذاريات: ٥٦]

“আমি সৃষ্টি করেছি জিন্ন এবং মানুষকে এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন,

«إنك تأتي قوماً من أهل الكتاب فليكن أول ما تدعوهم إليه شهادة أن لا إله إلا الله، فإن هم أطاعوك لذلك فأعلمهم أن الله افترض عليهم خمس صلوات في كل يوم وليلة؛ فإن هم أطاعوك لذلك فأعلمهم أن الله افترض عليهم صدقة تؤخذ من أغنيائهم فترد على فقرائهم» الحديث.

“হে মু‘আয, তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছো। সর্বপ্রথম তাদেরকে (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু-) আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বুদ নেই- এ দিকে আহ্বান কর। যদি তারা এ দাওয়াত গ্রহণ করে তোমার আনুগত্য করে, তখন তুমি তাদেরকে জানাও যে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। যদি তারা তা গ্রহণ করে, তখন তুমি তাদেরকে জানাও যে, আল্লাহ তোমাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং দরিদ্রদেরকে দেওয়া হবে”।[1] 

এ তাওহীদ যাবতীয় আমলসমূহের মধ্যে অধিকতর উত্তম আমল ও অধিক পাপ মোচনকারী। এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী ও মুসলিম সাহাবী ইতবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করেছেন,

«فإن الله حرم على النار من قال: لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله»

“নিশ্চয় আল্লাহ ঐ ব্যক্তির জন্য জাহান্নামকে হারাম করেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে”।

সমস্ত রাসূলগণের এ কালেমার ওপর ঐকমত্য পোষণ করেছেন: সমস্ত রাসূলগণ তাদের সম্প্রদায়কে কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর দিকে দাওয়াত দানে এবং তা থেকে বিমুখের ভয় প্রদর্শনের ব্যাপারে একমত ছিলেন। যেমন, কুরআন কারীমে অনেক আয়াতে এর বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [الانبياء: ٢٥]  

“আমরা তোমার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তাঁর নিকটে এ অহী অবতীর্ণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য মা‘বুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কালেমার দিকে দাওয়াত দানে নবীদের একমতের এক সুন্দর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

«الأنبياء إخوة لعلات، أمهاتهم شتى ودينهم واحد»

“নবীগণ একে অপরে বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন। তাঁদের মা ভিন্ন ছিল আর দীন এক ছিল”।

সকল নবীদের মূল দীন ছিল একই: তা হলো তাওহীদ, যদিও শরী‘আতের অন্যান্য বিধি-বিধান ভিন্ন ছিল। যেমন, কখনো ছেলে-মেয়ে মায়ের দিক থেকে ভিন্ন হয় আর তাদের পিতা হয় এক।

৩- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এ সাক্ষ্য দানের অর্থ:

(ক) “নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল” এ সাক্ষ্য দানের অর্থ হলো,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা আদেশ করেছেন তা পালন করা,

তিনি যে সব খবর দিয়েছেন তা সত্য বলে বিশ্বাস করা

তিনি যে সব বিষয় সম্পর্কে নিষেধ ও সতর্ক করেছেন সেগুলি থেকে বিরত থাকা

আর একমাত্র তিনি যে বিধান দান করেছেন সেটা অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদাত করা।

(খ) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এ সাক্ষ্য বাস্তবায়ন:

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এ সাক্ষ্য বাস্তবায়ন হবে ঈমান ও পূর্ণ ইয়াকীন দ্বারা।

নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল; যাকে সকল মানব ও জিন্ন জাতির নিকট প্রেরণ করেছেন।

তিনি শেষ নবী ও রাসূল।

নিশ্চয় তিনি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকারী বান্দা। তাঁর মাঝে উলুহিয়্যাতের কোনো বৈশিষ্ট নেই।

তাঁর অনুসরণ করা, তাঁর আদেশ নিষেধের সম্মান করা।

কথায়, কাজে ও বিশ্বাসে তাঁর সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا﴾ [الاعراف: ١٥٨]

“বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৮]

তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا ٢٨﴾ [سبا: ٢٨]

“আমরা তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি”। [সূরা সাবা, আয়াত: ২৮]

তিনি আরো বলেন,

﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ ٤٠﴾ [الاحزاب : ٤٠]

“মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নহে, বরং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪০]

তিনি আরো বলেন,

﴿قُلۡ سُبۡحَانَ رَبِّي هَلۡ كُنتُ إِلَّا بَشَرٗا رَّسُولٗا ٩٣﴾ [الاسراء: ٩٣]

“বল, আমার রব পবিত্র! আমি কেবল একজন মানুষ যাকে রাসূল বানানো হয়েছে”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৯৩]

উক্ত সাক্ষ্য নিম্নেবর্ণিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে:

প্রথমত: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের স্বীকৃতি দেওয়া ও অন্তরে তার বিশ্বাস রাখা।

দ্বিতীয়ত: কালেমার এ অংশের উচ্চারণ করা ও মুখের দ্বারা প্রকাশ্যভাবে এর স্বীকৃতি দেওয়া।

তৃতীয়ত: যে সত্য তিনি নিয়ে এসেছেন তা অনুসরণ করা এবং যে বাতিল বিষয়সমূহ থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَ‍َٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ ١٥٨﴾ [الاعراف: ١٥٨]

“সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর বার্তাবাহক উম্মী নবীর প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীতে ঈমান আনে এবং তোমরা তাঁর অনুসরণ কর যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হতে পার”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৮]

চতুর্থত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব খবর দিয়েছেন তা সত্য বলে বিশ্বাস করা।

পঞ্চমত: জান-মাল, ছেলে-মেয়ে, পিতা-মাতা ও সকল মানুষের ভালোবাসার চাইতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক ভালোবাসা। কারণ, তিনি আল্লাহর রাসূল আর তাঁকে ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত।

আর তাঁর প্রকৃত মুহাব্বাত হলো তাঁর আদেশসমূহের আনুগত্য করে তাঁর নিষেধসমূহ থেকে বিরত থেকে তাঁর অনুসরণ করা। তাঁকে সাহায্য করা, তার সাথে বন্ধুত্ব রাখা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ ٣١﴾ [ال عمران: ٣١]

“বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده والناس أجمعين»

“তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে ও সকল মানুষের চেয়ে অধিকতর প্রিয় না হবো”।[1]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُواْ ٱلنُّورَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٥٧﴾ [الاعراف: ١٥٧]

“সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে সেটার অনুসরণ করে তাঁরাই সফলকাম”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭]

ষষ্টত: তাঁর সুন্নাতের ওপর আমল করা। তাঁর কথাকে সকলের কথার ওপর প্রাধান্য দেওয়া, নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করা। তাঁর শরী‘আত মোতাবেক বিধান পরিচালনা করা এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥﴾ [النساء : ٦٥]

“কিন্ত না, তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার ওপর অর্পণ না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সন্ধন্ধে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে না নেয়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৫]

৪- সাক্ষ্যদ্বয়ের ফযলত:

কালেমায়ে তাওহীদ-এর অনেক ফযীলত রয়েছে, যা কুরআন হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, তার কিছু ফযীলত নিম্নে বর্ণিত হলো:

(ক) এটি ইসলামের প্রথম স্তম্ভ, দীনের মূল, মিল্লাতের ভিত্তি। এর দ্বারাই বান্দা সর্বপ্রথম ইসলামে প্রবেশ করে। এর বাস্তবায়নের জন্যই আসমান জমিনের সৃষ্টি।

(খ) এটি জান-মাল হিফাযতের কারণ। যে ব্যক্তি এটি উচ্চারণ করবে তার জান-মাল হিফাযতের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

(গ) সাধারণভাবে এটি সর্ব উত্তম আমল, অধিক পাপমোচনকারী, জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ। যদি আসমান ও জমিন এক পাল্লায় রাখা হয় আর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ অপর পাল্লায় রাখা হয় তবে ‘‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ এর পাল্লা ঝুঁকে যাবে বা ভারী প্রমাণিত হবে।

তাই ইমাম মুসলিম সাহাবী উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফু‘ হাদীস বর্ণনা করেছেন,

«من شهد أن لا إله إلا الله وأن محمداً عبده ورسوله حرّم الله عليه النّار»

“যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দিবেন।”

(ঘ) আর তাতে যিকির, দো‘আ ও প্রশংসা সন্নিবেশিত রয়েছে। ইবাদাতের মাধ্যমে কৃত দো‘আ ও চাওয়ার জন্য কৃত দো‘আ উভয়টিই এর অন্তর্ভুক্ত। আর এ যিকির অধিক মাত্রায় পাওয়া যায় এবং এটি অতি সহজে অর্জন করা যায়। এটি পবিত্র কালেমা, দৃঢ় হাতল, কালেমাতুল ইখলাস, এর বাস্তবায়নের জন্য আসমান জমিনের সৃষ্টি। এর জন্যই সৃষ্টি জীবের সৃষ্টি, রাসূলগণের প্রেরণ, কিতাবসমূহের অবতীর্ণ, এরই পরিপূর্ণতার জন্য ফরয ও সুন্নাত প্রবর্তন হয়েছে। আর এরই জন্য জিহাদের তরবারী কোষমুক্ত করা হয়েছে।

অতঃপর যে ব্যক্তি এটি পাঠ করবে ও এর প্রতি আমল করবে সত্য জেনে, ইখলাসের সাথে, গ্রহণ করে ও মুহাব্বাতের সাথে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার কর্ম যাই হউক না কেন।

 


[1] ইমাম বুখারী ও মুসলিম এ হাদীসটি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন।


[1] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।