শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দিল্লাহ্ ইব্‌ন বায রাহেমাহুল্লাহ্

অনুবাদ :মুহাম্মাদ ফযলুর রহমান

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

অনুবাদকের কথা

“ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদ” সৌদি আরবের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও ইসলামী গবেষক শাইখ আব্দুল আযীয ইব্‌ন বায লিখিত نقد القومية العربية على ضوء الإسلام والواقع বইটির ভাষান্তর। বইটিতে লেখক পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারের যৌক্তিকতা খণ্ডন করেছেন।
বিশ্বে জাতীয়তাবাদ একটি বিতর্কিত বিষয়। জাতীয়তাবাদের ভিত্তি কী হওয়া উচিত তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু ইসলামের নীতি অনুযায়ী বংশ, বর্ণ, ভাষা কিংবা অঞ্চল— কোনোটাই জাতীয়তার ভিত্তি নয়। তবু, বিশ্বের বহু মুসলিম নিজেদের অজ্ঞতাবশত কিংবা অন্যদের চক্রান্তে আজ এই প্রশ্নে বিভ্রান্তির শিকার। এই বিভ্রান্তির কারণ কোথাও কোথাও তারা নিজেদের মধ্যে আত্মঘাতি কলহ ও মারাত্মক হানাহানিতে লিপ্ত।
আরব জাতীয়তাবাদ গোটা আরব জাহানে একটি ব্যাপক প্রচার। আরবদের ঐক্যবদ্ধ করার কথিত লক্ষ্যে এ প্রচার একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। লেখক এই আন্দোলনকে কুরআন-সুন্নাহ্ তথা ইসলামের মহান নীতির কষ্টি-পাথরে যাচাই করে এর ভ্রান্তি প্রমাণ করেছেন এবং সমগ্র আরবদেরকে এর মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন। আরব জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে একজন আরব লেখকের এই বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি বইটির প্রতি আমার আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে। তাছাড়া এ দেশেও জাতীয়তাবাদ নিয়ে নানা রকম বিতর্ক চলে আসছে। সে ক্ষেত্রে এই বইয়ের যুক্তিগুলো লোকদের অনেকটা পথ নির্দেশ দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। এ জন্যই বইটি বাংলায় অনুবাদ করলাম। পাঠকদের সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার পাদটিকায় সূরার নাম ও আয়াত নম্বরসহ পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতিসমূহের সূত্র উল্লেখ করেছি এবং প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়ের জন্য উপ-শিরোনাম ব্যবহার করে তদনুযায়ী একটি সূচি সন্নিবেশ করেছি।
জনাব মাওলানা আব্দুল মতীন সালাফী আমাকে মূল বইটি সরবরাহ করে বাংলায় অনুবাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। অনুবাদটি আগা-গোড়া পড়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দিয়েছেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় মামা স্বনামধন্য জনাব মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম। তিনি কষ্ট স্বীকার করে বইটির মূল্যবান ভূমিকাও লিখে দিয়েছেন। এ জন্য আমি তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ।
ভাষা কিংবা মুদ্রণ সংক্রান্ত ভুল-ত্রুটি ব্যাপারে পাঠকদের যে-কোনো সৎ পরামর্শ বইটির পুনর্মূদ্রণে সাদরে গৃহীত হবে।
মুহাম্মাদ ফযলুর রহমান

ভূমিকা

বর্তমান পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ওপর যে কয়টি ভ্রান্ত ধারণা বা মতাদর্শ দ্বারা কঠিন আঘাত হেনেছে ও তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে, জাতীয়তাবাদ (Nationalism) হচ্ছে তন্মধ্যে প্রধান। এই ভ্রান্ত মতবাদটি এককভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতার অবদান। পাশ্চাত্য সভ্যতার উদয়লগ্নে তার অগ্রগতি লাভের জন্য ইসলামের বিশ্বলৌকিক তাওহীদী আদর্শভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে ঘায়েল করা বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে করা হয়। প্রথম দিক দিয়ে তা আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক তথা দেশ মাতৃকাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সবক পড়িয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করে এবং বিশ্ব ইসলামী ঐক্যের সর্বশেষ নিদর্শন ওসমানীয় খিলাফতকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়ে এক-একটি অঞ্চলকে গ্রাস করে নেয়। পরে তার সহিত ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সংমিশ্রিত করে প্রত্যেকটি মুসলিম দেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা পায়। কেননা পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ও দুরভিসন্ধির পথে ইসলামের বিশ্বজনীন জাতীয়তাবাদ যেমন প্রচন্ড বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, পাশ্চাত্য চিন্তা বিশ্বাস ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভৃতি বাতিল চিন্তাধারার পথে অনুরূপ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রত্যেক মুসলিম দেশের অভ্যন্তরীণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

বস্তুত পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ- তা আঞ্চলিক ভৌগোলিক বা দেশমাতৃকাভিত্তিক জাতীয়তা হোক কিংবা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা সবই ইসলামী আদর্শের সুস্পষ্ট পরিপন্থি। পাশ্চাত্যের এই জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভংগী যেমন মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে প্রবল অনৈক্য সৃষ্টি করে তাদের পরস্পরে মারাত্মক শত্রুতা ও যুদ্ধ বিগ্রহের সৃষ্টি করে দিয়েছে, তেমনি প্রত্যেকটি মুসলিম দেশের অভ্যন্তরে ইসলামী আদর্শ পরিপন্থী জনগণের মধ্যেও চরম শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এর ফলে পাশ্চাত্যের ইসলাম-দুশমন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির যতনা ফায়দা হয়েছে, তার তুলনায় অনেক বেশী ক্ষতি সাধিত হয়েছে ইসলামী আদর্শের ও মুসলিম জনগণের। কিন্তু মুসলিম জনগণ এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় সচেতন হয়ে উঠতে পারেনি। এই ভৌগোলিক-আঞ্চলিক ও দেশমাতৃকাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ একই অঞ্চলে অবস্থিত একই ভাষাভাষি ও একই ধর্মবিশ্বাসী দেশগুলিকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ও পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও ভিন্নতার ভাবধারা জাগিয়ে দিয়েই তাদের বক্ষে বিষমিশ্রিত ছুরি বিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে ইসরাঈল রাষ্ট্র কায়েমের মাধ্যমে। সমগ্র আরব জাহান বর্তমানে এই বিষে জর্জরিত। ফলে কয়েক কোটি মুসলিম মাত্র কয়েক লক্ষ অধ্যুষিত ইসরাঈলের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত। তাকে উৎখাত করার জন্য তারা আজ পর্যন্ত কোন ঐক্যবদ্ধ সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। আর এটাই ছিল ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির উদ্যোক্তা বিশ্বের চারটি বৃহৎ রাষ্ট্রের ঐকান্তিক কাম্য। উক্ত জাতীয়তাবাদ যে আরব মুসলিম দেশগুলোর সমূহ মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছে, তাতে কোনই সন্দেই নেই। অথচ আরব জাহানে আরব জাতীয়তাবাদের ব্যাপক প্রচার হয়েছে এবং তা করে ইসলামের বিশ্ব মুসলিম জাতীয়তাকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষুন্ন করা হেয়ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আরব জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মতাদর্শ যেমন, তেমনি ইসলামেরও সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদ’ আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তা-বিশ্বাস ও কার্যক্রমের সমালোচনায় এক সার্থক প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে।

‘ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদ’ আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তা-বিশ্বাস ও কার্যক্রমের সমালোচনায় এক সার্থক প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। বইখানির মূল লেখক বর্তমান সৌদী আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় মনীষী শায়খ আবদুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায। তিনি একই সাথে কুরআন, হাদীস, ইসলামের ইতিহাস এবং বাসতবতার দৃষ্টিকোণে ও অকাট্য যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টির সম্যক ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, স্থান-দেশ-বর্ণ- বংশ-ভাষা-শ্রেণী প্রভৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যেমন অন্তঃসারশূন্য, মানবতার পক্ষে চরম মারাত্মক, তেমনি ইসলামেরও পরিপন্থী। আমি দৃঢ় নিশ্চিত যে, তাঁর এই বিশ্লেষণ খুবই যথার্থ ও বিজ্ঞানসম্মত। এ বই প্রত্যক্ষভাবে আরব জাতীয়তাবাদের উপর আঘাত হানলেও পরোক্ষভাবে সকল পাশ্চাত্য চিন্তাপ্রসূত জাতীয়তাবাদকে চূর্ণ করে ইসলামের বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের আদর্শভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পক্ষে এক দুর্জয় ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছে।

বইখানি সরাসরি আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছে আমার স্নেহাস্পদ মাওলানা ফজলুর রহমান এম, এ। বাংলাভাষায় এটাই তার প্রথম অবদান হলেও গ্রন্থটি সাহিত্যিক মানে উত্তীর্ণ হয়েছে। আমি ভবিষ্যতে এক্ষেত্রে তার উন্নতি ও অগ্রগতি আন্তরিকভাবে কামনা করছি।

আমি বইখানি আদ্যোপান্ত পড়িয়ে শুনেছি। কোন কোন স্থানে কিছুটা সংশোধন করে দেয়া হয়েছে।

বইখানি সুধী পাঠক মহলে বিশেষ সমাদৃত হবে বলে আশা পোষণ করছি এবং মনে করছি, এ বই পাঠে জাতীয়তাবাদ পর্যায়ে আমাদেরও অনেক ভুল ধারণার অপনোদন হবে।

মুহাম্মাদ আবদুর রহীম

ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদ

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরুদ ও সালাম তাঁর রসূলের প্রতি।

আরব মুসলিমদের মর্যাদা

ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞানের অধিকারী কোন মুসলিমই আরব মুসলিমদের মর্যাদায় সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। গৌরবময় দিনগুলোতে তাঁরাই ইসলামের বার্তা বহন করে নিষ্ঠার সাথে সকল জাতির নিকট পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁরা ইসলামের প্রসার ও প্রতিরক্ষার সংগ্রামের নিদারুণ কষ্ট সহ্য করেছিলেন। ফলে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয়েছিল। তা ছাড়া প্রারম্ভিক যুগে ইসলাম প্রচারকদের কাছে বিশ্ব দেখেছিল উৎকৃষ্টতম প্রশাসন ও শ্রেষ্ঠতম ন্যায়বিচারক শাসক। আরব মুসলিমরা ইসলামের মাঝে দেখতে পেয়েছিলেন তাঁদের ইহ-পরকালের ইপ্সিত সব কল্যাণ। সেখানে তাঁরা এমন এক সুন্দর জীবনের সন্ধান পেয়েছিলেন যা তাদেরকে মান-মর্যাদার গ্যারান্টি তথা মানুষের দাসত্ব, স্বৈরাচারীর অত্যাচার ও জালিম শাসকদের শোষণ থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে। প্রারম্ভিক যুগের আরব মুসলিমরা ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সাথে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁরা সেই মহান ইবাদাতের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন যা আল্লাহার সাথে তাঁদের সম্পর্ক নিবিড় করেছিল এবং তাদের অন্তর থেকে শির্‌ক, ঈর্ষা ও অহংকার উপড়ে ফেলে সেখানে আল্লাহর প্রতি খাঁটি ভালোবাসা, পূর্ণ আনুগত্য ও তাঁর সাথে নিভৃত আলাপনের সুখ জাগ্রত করেছিল। সে ইবাদাত তাঁদেরকে প্রতিপালকের সাথে যথার্থভাবে পরিচিত করেছিল এবং সবোর্পরি ভুলে গেলে কিংবা ভুলে যাবার উপক্রম হলে তাদেরকে আল্লাহ্‌ ও তাঁর অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। ইসলামের এই প্রথম সন্তানেরা রাসূলের সাথেও নিজেদের সম্পর্কের স্বরূপ জানতে পেরেছিলেন। ইসলাম তাদেরকে রক্ষকের সাথে রক্ষিতের, ব্যক্তির সাথে তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও মুসলিম ভাইদের এবং মুসলিমদের সাথে কাফিরদের সম্পর্কের বিধান সুস্পষ্টভাবে শিক্ষা দিয়েছিল। তাঁরা সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের যথার্থ অনুগামীদের অনিন্দ্যসুন্দর চরিত্র ও মহৎ গুণাবলীর মাধ্যমে এ সবকিছুর প্রামাণ্য ব্যাখ্যা লাভ করেছিলেন। মানুষ তাই ইসলামকে ভালবেসেছিল, শ্রদ্ধা করেছিল এবং দলে দলে তাতে প্রবেশ করেছিল। ইসলামে তারা সকল প্রকার কল্যাণ, শান্তি, মুক্তি ও উন্নতির সন্ধান লাভ করেছিল।

ইসলামের শ্রেষ্ঠ বিধানসমূহ ও সুন্দর নীতিমালা মানুষের হৃদয়কে সংস্কার করে সেখানে পারস্পরিক হৃদ্যতার জন্ম দেয় এবং আল্লাহ্‌কে ভালবেসে তাঁর দ্বীনের জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। এই বিধান তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করে পরস্পরকে সত্য ও সহিষ্ণুতার জন্য উপদেশ দিতে শেখায়। ইসলামের এই সুন্দর বিধানসমুহ সুদীর্ঘ আলোচনার বিষয়। এখানে যে বিষয়টির প্রতি সংক্ষেপে ইংগিত দিতে চাই তা হল, প্রারম্ভিক যুগে আরব মুসলিমগণ ইসলামের জন্য কঠোর প্ররিশ্রম ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। যার ফলে আল্লাহ্‌ তাদেরকে পৃথিবীর সর্বত্র ইসলামের মশাল ব’য়ে নেবার সুযোগ ও সৌভাগ্য দান করেছিলেন। বিশ্বে তখন ইসলাম সম্পর্কে গভীর আগ্রহ ও এই ধর্মে দ্রুত দীক্ষিত হবার ব্যাপক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল। তার কারণ, ইসলামের নীতিমালা ছিল ন্যায়ভিত্তিক এবং শিক্ষা ছিল উদার। তাছাড়া ইসলামে আল্লাহ ও মানুষের ওপর তাঁর অধিকারের যথার্থ পরিচয় মিলত। অধিকন্তু, ইসলামের বাহক ও প্রচারকগণ নিজেরা কথায়, কাজে ও চরিত্রে তার নীতিমালার প্রতি ছিলেন একান্ত অনুগত। যে কারণে তাঁরা পরিণত হয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ জাতিতে, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। আল্লাহ বলেন:

﴿كُنتُمۡ خَيۡرَ أُمَّةٍ أُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَتَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَتُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِۗ ﴾ [سورة آل عمران :110]

“তোমরা সর্বোত্তম জনসমষ্টি, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা ন্যায়ের নির্দেশ দাও, অন্যায় থেকে বিরত রাখ এবং আল্লাহ্‌তে বিশ্বাস রাখ।” [1]

কুরআনের এই আয়াতকে তাঁরা নিজেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছিলেন। প্রারম্ভিক যুগের মুসলিমদের সম্পর্কে জানা থাকলে কোন মুসলিমই উল্লিখিত বক্তব্যে সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। কেননা, এ হচ্ছে একটি বাস্তব তথ্য যা সকল মুসলিমেরই জানা। তাই বলে কোন মুসলিম অনারব মুসলিমদের অবদান সম্পর্কেও সন্দেহ পোষণ পারে না। তার কারণ, এই দ্বীনের প্রসারকার্যে আরব মুসলিম ভাইদের পাশাপাশি তাঁরাও পুরস্কারযোগ্য প্রয়াস চালিয়েছিলেন এবং দ্বীনের মর্যাদা সমুন্নত করে বিশ্ববাসীর নিকট তা পৌঁছে দেবার জন্য তাঁরাও জিহাদ করেছিলেন। আল্লাহ্‌ এদের সকলকে এই মহান প্রচেষ্টার জন্য পুরস্কৃত করুন এবং আমাদেরকে তাঁদের প্রকৃত উত্তরসুরী হবার সুযোগ দিন। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক আরব মুসলিম আজ সেই মহান ধর্ম ইসলামের প্রচার থেকে বিরত। অথচ ইসলামেরই কল্যাণে আল্লাহ্‌ তাদের পূর্বপুরুষদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি তাঁদেরকে ইসলামের বাণী বহন করার গৌরবে ভূষিত করেছিলেন। তাঁরা বিশ্ব জয় করেছিলেন ও পরাভূত রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের রাজকোষ দখল কেরে আল্লাহ্‌র রাহে ব্যয় করেছিলেন। তাঁরা তখন পরম নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্ববোধে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাঁদের কাছে আরব-অনারব, সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র কিংবা পূর্ব-পশ্চিমের কোন প্রভেদ ছিল না। তারা ছিলেন একে অপরের ভাই, যারা পরস্পরকে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য ভালো বাসতেন এবং সততা ও তাকওয়ার জন্য সহযোগিতা করতেন। আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ করতেন এবং দ্বীনের আদর্শে সর্বদা অবিচল থাকতেন। তাঁদের সখ্যতা-বৈরিতা কিংবা পছন্দ-অপছন্দ সবই ছিল ইসলামের স্বার্থে। এ জন্যই আল্লাহ্‌ তাঁদেরকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং জিহাদের সকল ময়দানে তাঁদের সাফল্য নিশ্চিত রেখেছেলেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ওয়াদা করেছিলেন এভাবে:

﴿ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٤٧ ﴾ [سورة الروم: 47]

“মুমিনদেরকে সাহায্য করা আমাদের একটি দায়িত্ব।” [2]

 আল্লাহ্‌ আরো বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن تَنصُرُواْ ٱللَّهَ يَنصُرۡكُمۡ وَيُثَبِّتۡ أَقۡدَامَكُمۡ ٧ ﴾ [سورة محمد : 7]

“হে ঈমানদারগণ ! তোমরা যদি আল্লাহ্‌কে সাহায্য কর, তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপ মজবুত করে দিবেন।” [3]

এই বিরাট গৌরব ও আরব-অনারব নির্বিশেষে সকল মুমিন বান্দার জন্য আল্লাহ্‌র এই সক্রিয় সাহায্যের পরও আমারা দেখতে পাচ্ছি আমাদের সন্তানদের একটি দল বিভ্রান্ত হয়ে ইসলাম ছাড়া ভিন্ন আদর্শ প্রচার করছে। যেন ইসলামের মহিমা কিংবা এর কল্যাণে নিজেদের পূর্বপুরুষদের অর্জিত সম্মান, মর্যাদা ও গৌরব সম্পর্কে তারা অনবহিত। তারা যেন খাঁটি মুসলিম হিসেবে পূর্বপুরুষদের সুদৃঢ় সংহতি সম্পর্কেও অজ্ঞ, যার কারণে এক মাসের দূরত্বে থেকেও শত্রু তাদের ভয়ে আতঙ্কিত হত। মুসলিমরা ইসলামের কল্যাণে যে গৌরব, সম্মান ও কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন এরা তা ভুলে গেছে, কিংবা ভুলে যাবার ভান করছে। আর তাই এরা সাম্রাজ্যবাদী শত্রুর কবল থেকে দেশের মুক্তির জন্য এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষা ও হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে লোকদের আরব জাতীয়তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবার ডাক দিচ্ছে।

আরব জাতীয়তার উপাদান

আরব জাতীয়তার উপাদান সম্পর্কে এর প্রচারকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলছে, এর উপাদান দেশ, বংশ ও আরবী ভাষা; কেউ বলছে, শুধু ভাষা; আবার কেউ বলছে, ভাষা তবে এর সংগে আছে সুখ-দুঃখ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার সংমিশ্রণ। কেউ কেউ অন্য কথাও বলেছে। তবে এর নায়ক ও প্রবক্তাদের কেউই ধর্মকে এর উপাদানের মধ্যে গণ্য করে না। অনেকে পরিস্কারই বলেছে যে, জাতীয়তায় ধর্মের কোন স্থান নেই। কেউ আবার একথাও বলেছে যে, জাতীয়তাবাদ ইসলামসহ সকল ধর্মকেই শ্রদ্ধা করে।

আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারকদের বক্তব্য অনুযায়ী এর লক্ষ্য হল শত্রুর বিরুদ্ধে ও নিজেদের যৌথ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সন্দেহ নেই, এ এক সুন্দর ও মহৎ লক্ষ্য। তবে এই লক্ষ্য কেবলমাত্র ইসলামের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে, আরব জাতীয়তার মাধ্যমে নয়। ইসলামই মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্য পারস্পরিক ঐক্যের ডাক দেয়। এই ঐক্যের উৎস আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান এবং এর শক্তি পার্থিব জীবনের কল্যাণ এবং পরকালে শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এই ঐক্যের তুলনায় মানব প্রবর্তিত জাহেলী ও শরীয়াত-বিরোধী আরব জাতীয়তার ভিত্তিতে আহূত ঐক্য নিতান্তই তুচ্ছ এবং অসার। আসলে আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারকারীরা মুখে শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যের কথা বললেও তাদের জাতীয়তাবাদ প্রচারের মূলে অন্যান্য উদ্দেশ্য কাজ করছে। সে সব উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা, সমাজ থেকে ইসলামের বিধানসমূহ দূর করে তার পরিবর্তে বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণে প্রস্তুত মনগড়া আইন-কানুন প্রবর্তন করা এবং স্বাধীনতার নামে শ্রেণীকলহ ও ধ্বংসাত্মক মতবাদ প্রচার করা। সন্দেহ নেই, যে প্রচারের লক্ষ্য এই, সাম্রাজ্যবাদ তা দেখে আনন্দে নৃত্য করবে এবং তাকে জিইয়ে রাখতে ও তার মানোন্নয়নের জন্য সব রকম সাহায্য সহযোগিতার যোগান দেবে। উদ্দেশ্য, আরবদেরকে তাদের দ্বীন সম্পর্কে ধোঁকায় ফেলা এবং জাতীয়তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এর পক্ষে প্রচার চালাতে তথা দ্বীনের পথ থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করা। অবশ্য সাম্রাজ্যবাদের বাহ্যিক আচরণে এটা চিহ্নিত করা বেশ কঠিন।

জাতীয়তাবাদ প্রচারকদের মধ্যে যারা বলতে চায় যে, ধর্ম জাতীয়তার একটা উপাদান, তারা আসলে জাতীয়তাবাদীদেরই বিপরীত কথা বলছে। কারণ, যে-সব ভিত্তির ওপর তাদের জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত, ধর্ম তার বিপরীত। ধর্ম তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্যেরও বিরোধী। তাছাড়া বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সকল আরবদেরকে জাতীয়তার পতাকাতলে একতাবদ্ধ করার তাদের যে লক্ষ্য, তাও ধর্মের পরিপন্থী। অতএব যারা ধর্মকে জাতীয়তার উপাদান বলতে চায় তারা পরস্পরবিরোধী কথা বলে। একবার তারা ইতিবাচক কথা বলছে, আর একবার নেতিবাচক। এর একমাত্র কারণ, ধর্মকে জাতীয়তার উপাদান বলা তাদের অন্তরের কথা নয়। এটা তারা বলছে, হয় ইসলামের অনুসারীদের সাথে সৌজন্য রক্ষার খাতিরে কিংবা জাতীয়তার স্বরূপ ও লক্ষ্য সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে। তেমনি যারা বলে যে, জাতীয়তা ইসলামের সহায়তা কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের কথাও সম্পূর্ণ অবান্তর। আসল কথা, জাতীয়তাবাদ ইসলামের নিজ মাটিতে তারই সাথে লড়াই করছে এবং ছদ্মবেশে চালু হবার আশায় কিংবা না জেনে শুধুমাত্র অনুকরণবশত: নিজের গায়ে ইসলামী বৈশিষ্ট্যের কিছু প্রলেপ লাগিয়ে রেখেছে।

জাতীয়তাবাদ যদি ইসালামের পৃষ্ঠপোষকতা ও তার পবিত্রস্থানসমূহ রক্ষার জন্যই হত তবে জাতীয়তাবাদীরা সরাসরি ইসলামেরই প্রচার ও প্রতিরক্ষার চেষ্টা করত এবং আসমান থেকে অবতীর্ণ তার শাসনতন্ত্রকে গ্রহণ করে অবিলম্বে তার বিধনমালার ছাঁচে নিজেদের গঠন করতে আরম্ভ করত। তারা ইসলামের নির্দেশসমূহ পুরোপুরি পালন করত ও তার পরিপন্থী সকল কার্যকলাপ পরিহার করে চলত। কেননা, আসল উদ্দেশ্য ও বৃহত্তর লক্ষ্য তো ইসলাম। ইসলামইতো সেই পথ যাকে ধরে থাকলে যে কেউ নিরাপদ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে এবং জান্নাত ও সম্মান লাভে সক্ষম হয়। আর কেউ ঐ পথ থেকে সরে গেলে তার পরিণাম হয় হতাশা আর অনুশোচনা। অতএব, জাতীয়তাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্য ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা গৌরববৃদ্ধি নয়, বরং ইসলামের বিরোধিতাই এর আসল উদ্দেশ্য। তার প্রমাণ, ইসলাম-প্রচারকগণ যখন মানুষকে ইসলামের ডাক দেয় এবং ইসলামের পথে বিরাজমান জাতীয়তার এই বাধা সম্পর্কে সাবধান করে, তখন জাতীয়তাবাদীরা দারুণ ক্ষেপে যায় এবং জাতীয়তার স্বার্থে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

জাতীয়তাবাদীরা ইসলামের গৌরববৃদ্ধি কিংবা আরবদের ইসলামভিত্তিক ঐক্য চাইলে জাতীয়তাবাদ প্রচারের পরিবর্তে আরবদের তারা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে তার বিধানসমূহ কার্যকর করার পরামর্শ দিত এবং ইসলামকে সমর্থন করার জন্য লোকদের আহবান জানাতে উৎসাহিত করত। কেননা সর্বপ্রথম তাদের পূর্বপুরুষ আরবরাই ইসলামের সমর্থন করেছিলেন, তাকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছিলেন ও নিজেদের বিরোধ মীমাংসার জন্য বিনা দ্বিধায় তারই ফায়সালা মেনে নিয়েছিলেন। ইসলামই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের সম্মান, মর্যাদা ও একমাত্র গৌরব। আল্লাহ বলেন:

﴿ لَقَدۡ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكُمۡ كِتَٰبٗا فِيهِ ذِكۡرُكُمۡۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ١٠﴾ [سورة الأنبياء: 10]

“তোমাদের নিকট আমরা এমন এক গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমদের মর্যাদার কথা রয়েছে, তোমরা কি বুঝতে পারছ না?” [4]

তিনি আরো বলেন:

﴿ فَٱسۡتَمۡسِكۡ بِٱلَّذِيٓ أُوحِيَ إِلَيۡكَۖ إِنَّكَ عَلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٤٣ وَإِنَّهُۥ لَذِكۡرٞ لَّكَ وَلِقَوۡمِكَۖ وَسَوۡفَ تُسۡ‍َٔلُونَ ٤٤﴾ [سورة الزخرف: 43-44]

“তোমার কাছে যে কিতাব অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে তা শক্ত করে ধরে থাক, নিশ্চয়ই তুমি সঠিক পথে রয়েছে। এটা তোমার ও তোমার লোকদের জন্য এক মর্যাদার বিষয়। আর তোমাদেরকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।” [5]

আসলে সুন্দর সুন্দর কথা, রঙ বেরঙের কল্পনা ও নানা ধরনের প্রতারণার সাহায্যে ইসলামের সাথে শত্রুতা করার জন্য ও ইসলামের নিজ মাটিতেই তার কবর রচনার অশুভ উদ্দেশ্যে পাশ্চাত্যের খ্রীষ্টানরা সর্বপ্রথম এই আরব জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করে। পরে ইসলামের শত্রু অনেক আরব তা গ্রহণ করে এবং তাদের অনুকরণকারী মূর্খ ও সরল লোকেরা প্রতারিত হয়। এতে বিধর্মীরা সর্বত্র পুলক বোধ করে। অথচ ইসলামের নীতি অনুযায়ী আরব কিংবা অন্য যে-কোন জাতীয়তাবাদ প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মহাপাপ। এই প্রচার মূলত ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রতারণা। এর প্রথম কারণ:

আরব জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে

আরব জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। এটা অনারব মুসলিমকে তার ভাই আরব মুসলিম থেকে পৃথক করে, আবার আরবদের পরস্পরের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করে; কারণ আরবদের সবাই এই মতবাদ সমর্থন করে না। তাদের একদল এটা সমর্থন করলেও আর একদল তা করে না। আর যে মতবাদ মুসলিমদের বিভক্ত করে ভিন্ন ভিন্ন দলে পরিণত করে, তা অবশ্যই ভ্রান্ত এবং ইসলামের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপন্থী। কারণ, ইসলাম ডাক দেয় ঐক্য ও সংহতির প্রতি এবং সত্য, ন্যায় ও তাকওয়ার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি।

পবিত্র কুরআনের ভাষায়:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٢ وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ وَٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ إِذۡ كُنتُمۡ أَعۡدَآءٗ فَأَلَّفَ بَيۡنَ قُلُوبِكُمۡ فَأَصۡبَحۡتُم بِنِعۡمَتِهِۦٓ إِخۡوَٰنٗا وَكُنتُمۡ عَلَىٰ شَفَا حُفۡرَةٖ مِّنَ ٱلنَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنۡهَاۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمۡ ءَايَٰتِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ ١٠٣ ﴾ [سورة آل عمران: 102-103]

“হে ঈমান গ্রহণকারীগণ ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় কর এবং পূর্ণাঙ্গ মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। সবাই একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তহাতে ধরে থাকো, বিচ্ছিন্ন হয়োনা। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর। কেননা, তোমরা ছিলে একে অপরের শত্রু। তারপর আল্লাহ তোমাদের বিরোধ দূর করে দিলেন। আল্লাহর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের প্রান্তদেশে অবস্থান করছিলে। আল্লাহই সেখান থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলী বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা ঠিক পথে চলতে পার।”[1]

﴿هُوَ ٱلَّذِيٓ أَيَّدَكَ بِنَصۡرِهِۦ وَبِٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٦٢ وَأَلَّفَ بَيۡنَ قُلُوبِهِمۡۚ لَوۡ أَنفَقۡتَ مَا فِي ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعٗا مَّآ أَلَّفۡتَ بَيۡنَ قُلُوبِهِمۡ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ أَلَّفَ بَيۡنَهُمۡۚ إِنَّهُۥ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٦٣﴾ [سورة الأنفال: 62-63]

“তিনিই তোমাকে তাঁর প্রত্যক্ষ সাহায্য ও মুমিনদের সহায়তায় শক্তিশালী করেছেন। তিনি মুমিনদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্বও স্থাপন করে দিয়েছেন। তুমি পৃথিবীর গোটা সম্পদ ব্যয় করেও তাদের মধ্যে এই বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারতে না। অথচ আল্লাহ তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন। তিনি সর্বজয়ী, মহাকুশলী।”[2]

﴿۞مُنِيبِينَ إِلَيۡهِ وَٱتَّقُوهُ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٣١ مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَكَانُواْ شِيَعٗاۖ كُلُّ حِزۡبِۢ بِمَا لَدَيۡهِمۡ فَرِحُونَ ٣٢ ﴾ [سورة الروم: 31]

“তাঁর দিকে একান্তভাবে মনোযোগী হয়ে। আর তাঁকে ভয় কর ও নামায কায়েম কর। আর মুশরিকদের দলভুক্ত হয়োনা, যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড খণ্ড করে দলে দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দুলই নিজের নিকট যা আছে তাই নিয়ে খুশী রয়েছে।”[3]

ইসলাম এমনিভাবে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করেছে এবং ঐক্য-সংহতি রক্ষার জন্য আমরণ সত্যের রজ্জুকে আকড়ে ধরার ডাক দিয়েছে। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। এর আরও প্রমাণ, এই মতবাদ অর্থাৎ আরব জাতীয়তাবাদ আমাদের পশ্চিমা শত্রুদের নিকট থেকে আমদানী হয়েছে। এর আড়ালে ওদের আসল উদ্দেশ্য “বিভক্ত কর ও শাসন কর” এই অশুভ কৌশলে মুসলিমদেরকে কত ক্ষতইনা করেছে, যা ভাবতে গেলে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয় এবং চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।

আরব জাতীয়তাবাদের আসল প্রবর্তক কারা?

আরব জাতীয়তাবাদের ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেকেই বলেছেন যে, খ্রীষ্টীয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পশ্চিমারা সিরিয়ার খ্রীষ্টান মিশনারী দলগুলোর মাধ্যমে সর্বপ্রথম আরব জাতীয়তাবাদ প্রচার শুরু করে। তখন এই প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল তুর্কীদেরকে আরবদের থেকে পৃথক করে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির সূচনা করা। ক্রমে এই প্রচার সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ষাট বছর পর ১৯৯০ খ্রীষ্টাব্দে প্যারিসে এর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে এই প্রচার দ্রুত বেড়ে যায় এবং ক্রমে একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। মৃত্যুদন্ড দিয়ে তুর্কীরা এই আন্দোলন নির্মূল করার চেষ্টা করে। জামাল পাশা সিরিয়ায় এসব মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছিল। তাহলে আমরা কি মনে করতে পারি যে, আমাদের শত্রুরা আরব জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন ও এর জন্য সম্মেলন অনুষ্ঠান করে, আর মিশন পাঠিয়ে আমাদের স্বার্থে কাজ করছে? অসম্ভব। তারা আমাদের কল্যাণ কিংবা স্বার্থ কোনটাই চায় না। তাদের উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হল, আমাদের ধ্বংস করা, আমাদের ঐক্য টুকরা টুকরা করা ও আমাদের দ্বীনের যেটুকু আছে তাও নিশ্চিহ্ন করা। এই প্রচার মূলত: পাশ্চাত্যের একটি সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র যা মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে দ্বীন থেকে তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখার লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের তরুণ সমাজ ও লেখকদের অনেকেরই -আল্লাহ ওদের হেদায়েত করুন- এই বাস্তবটি জানা নেই। তাই তারা মনে করে, ইসলামের তুলনায় আরব জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হলে ও এই মতবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলে আরবদের উপকার এবং তাদের শত্রুর ক্ষতি বেশী হবে। নি:সন্দেহে এ এক ভুল ধারণা ও বাস্তবতা বিরোধী বিশ্বাস। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে নিজ স্বার্থের বিরুদ্ধে যে কোন জোটই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। কিন্তু ইসলামভিত্তিক জোট ও ঐক্যে তার শংকা তুলনামূলকভাবে বেশী। এজন্যই সে আরব জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে সন্তুষ্ট এবং আরবদেরকে এই আন্দোলনে উৎসাহিত করার কাজে নিবেদিত। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উদ্দেশ্য, আরবদেরকে ইসলাম থেকে দূরে রাখা ও আল্লাহর সাথে তাদের বন্ধন ছিন্ন করা। কারণ, তারা যদি ইসলামকে হারায় তাহলে আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্য হতে বঞ্চিত হবে; যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি তিনি পূর্বোল্লিখিত দুটি আয়াত ও এই আয়াতটিতে দিয়েছেন:

﴿وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٤٠ ٱلَّذِينَ إِن مَّكَّنَّٰهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ أَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُواْ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَنَهَوۡاْ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۗ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلۡأُمُورِ ٤١ وَإِن يُكَذِّبُوكَ فَقَدۡ كَذَّبَتۡ قَبۡلَهُمۡ قَوۡمُ نُوحٖ وَعَادٞ وَثَمُودُ ٤٢﴾ [سورة الحج: 40-41]

“আল্লাহ্‌কে যারা সাহায্য করবে, আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালী, সর্বজয়ী। তারা এমন রোক, যাদেরকে আমরা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয়, সৎকাজের নির্দেশ দান করে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহই সকল কাজের পরিণামের মালিক।” [4]

জ্ঞানীরা সবাই জানে যে, দুটো ক্ষতির মধ্যে যদি যে-কোন একটি অপরিহার্য হয় তবে বৃহত্তর ক্ষতি এড়ানোর জন্য দুটোর মধ্যে ক্ষুদ্রতর ক্ষতিটি গ্রহণ করাই উত্তম। এ এক শাশ্বত নিয়ম। সাম্রজ্যবাদী শক্তি এ নিয়মটি জানে এবং এ ক্ষেত্রে তারা এই নিয়মই অনুসরণ করেছে। অতএব আমাদেরকে সব রকমের ক্ষতি ও বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শয়তান, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দোসরদের প্রতারণা সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

উপরোক্ত আলোচনায় বোঝা গেল যে, আরব জাতীয়তাবাদ ইসলামের প্রতি একটি বৈরী আচরণ ও ইসলামের নিজ ভূখন্ডে তারই সাথে এক লড়াই। আরবরা এই প্রচারে সাড়া দিলে নিজেরাই নিজেদের মারাত্মক সর্বনাশ ডেকে আনবে। এই প্রচার তাদের মর্যাদা, সম্মান, শক্তি ও কর্তৃত্বের প্রকৃত উৎস ইসলাম থেকেই তাদেরকে দূরে সরিয়ে নেবে। কোন বুদ্ধিমান আরব তাই এহেন একটি প্রচারে কিছুতেই সাড়া দিতে পারে না। প্রখ্যাত ইসলামী লেখক আবুল হাসান নদভী তার (اسمعوها مني صراحة أيها العرب) (হে আরব! তোমরা তা আমার নিকট স্পষ্ট শুনে নাও) নামক পুস্তিকার ২৭ ও ২৮ পৃষ্ঠায় চমৎকার বলেছেন:

“অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জার বিষয় যে, বর্তমানে আরব বিশ্বে কতিপয় লোক আদর্শ ও লক্ষ্যবিহীন আরবজাতীয়তাবাদ প্রচার করছে। এর উদ্দেশ্য শ্রেষ্ঠ নবীর উপস্থাপিত ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ব্যক্তি ও খন্ডিত মানবগোষ্ঠিকে সমন্বয়কারী আদর্শ এবং ইসলামের সুদৃঢ় আত্মিক বন্ধন হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া বৈ আর কিছুই নয়। বলা বাহুল্য, এটা একটা জাতীয় অপরাধ এবং এ অপরাধ এ জাতির ইতিহাসে লেখা সবগুলো জাতীয় অপরাধকে হার মানায়। এ এক ধ্বংসাত্মক আন্দোলন এবং এটা ইতিহাসের সকল ধ্বংসাত্মক আন্দোলন থেকে অধিক ক্ষতিকর। এই আন্দোলন জাতীয় বিনাশ ও সামাজিক আত্মহননের এক অশুভ চূড়ান্ত পদক্ষেপ।”

হযরত হাসানের রাদিয়াল্লাহু আনহু বংশধর আরব-বিশারদ এই মনীষী বিশ্ব পরিস্থিতি নিরীক্ষা ও বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অশুভ পরিণতি পর্যালোচনা করার পর এই উক্তি করেছেন। অতএব আরব জাতীয়তাবাদের এই ক্ষতিকর আন্দোলন আরব ও মুসলিমদের আজ কত বড় বিপদের সম্মুখীন করছে তা উপলব্ধি করার সময় এসেছে। আল্লাহ সকলকে এর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন এবং আরব ও অন্য সকল মুসলিমকে তাদের পুর্বপুরুষদের সঠিক পথে ফিরে যাবার তাওফীক দান করুন।

আজকাল ইসলামের সুহৃদ ও ইসলাম প্রচারে উদ্যমী লোকদের সংখ্যা নিতান্তই কম। পক্ষান্তরে ইসলামবিরোধী ও তার বিধান ও শিক্ষাসমূহ অমান্যকারীদের সংখ্যা অনেক বেশী। এমতাবস্থায় ইসলামের সন্তানদের একান্ত কর্তব্য জাতীয়তাবাদ ও তার প্রচারকদের সহযোগিতার পরিবর্তে ইসলাম প্রচারের কাজে সহযোগিত করা, মানুষের নিকট ইসলামের মহিমা তুলে ধরার চেষ্টা করা এবং ইসলামের গুণাবলী ও তার সুন্দর নীতিমালার প্রচার তথা শির্‌ক, বিদ্‌‘আত, কুসংস্কার ও গোঁড়ামিমুক্ত তার মহান শিক্ষাসমূহের প্রসারে নিজেদের প্রচেষ্টা নিয়োজিত করা। তাহলেই তারা পূর্বপুরুষদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারবে ও ইসলামের জন্য উদ্যম ও তাকে সংরক্ষণ করার শক্তি ফিরে পাবে এবং অকাট্য যুক্তির সাহায্যে ইসলাম বিরোধীদের সফলভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। তাই সামর্থনুযায়ী ইসলামের প্রত্যেক সন্তানের জন্য এ এক অপরিহার্য কর্তব্য। আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন সবাইকে এই কর্তব্য পালনের শক্তি দান করেন। তিনি আমাদের অন্তর ও আমল সংশোধন করে দেন এবং ইসলামকে শক্তিশালী করে ও সকল শত্রুর বিরুদ্ধে অচিরেই তাকে বিজয়ী করে মুসলিমদের চোখ শীতল করেন।

আরব জাতীয়তাবাদ জাহেলিয়াতের অন্যতম উপাদান

 ইসলামের নীতি অনুযায়ী আরব জাতীয়তাবাদ নিষিদ্ধহবার দ্বিতীয় কারণ এই যে, ইসলামের দৃষ্টিতে জাহেলিয়াতের প্রতি আহবান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অসংখ্য উদ্বৃতির মাধ্যমে এ ব্যাপারে ইসলামে কঠোর সাবধানবাণী ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এসব উদ্ধৃতিতে শুধুমাত্র ইসলাম যে কয়টি বহাল রেখেছে তাছাড়া জাহেলী যুগের যাবতীয় রীতিনীতি ও কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর আরব জাতীয়তাবাদ প্রচার যে জাহেলিয়াতেরই একটি অংশ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, তার ডাক ইসলামের জন্য নয় কিংবা তার সহযোগিতা সত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার বিপরীত। জাহেলিয়াতের আহ্বান তখনকার লোকদের ভাগ্যে বহু দুঃখ-দুর্দশা ও সর্বনাশা যুদ্ধ টেনে এনেছিল, যাতে তাদের জানমাল, মানসম্মান সবই নষ্ট হয়েছিল এবং পরিণামে তাদের ঐক্য ভেংগে গিয়ে অন্তরে শত্রুতা ও ঘৃণার জন্ম হয়েছিল, আর গোত্রে গোত্রে দেখা দিয়েছিল মারাত্মক বিভেদ। শাইখুল ইসলাম ইব্‌ন তাইমিয়া (র) বলেছেন, “ইসলাম ও কুরআনের আহ্বান বহির্ভূত সবকিছুই- যেমন বংশ, দেশ, জাতি, মাযহাব, তরীকা ইত্যাদি-জাহেলিয়াতেরই এক একটি নিদর্শন। একবার এক আনছার ও এক মুহাজিরের মধ্যে বিবাদ লেগে গেলে উভয়ে “হে আনসারগণ ও হে মুহাজিরগণ” সম্বোধনে যার যার সম্প্রদায়কে সাহায্যের জন্য ডাক দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন:

«أَبِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّة وَأَنا بَين أظْهركُم»

“জাহেলিয়াতের দিকে আহ্বান জানানো হচ্ছে! অথচ আমি তোমাদের মাঝেই রয়েছি।’ এই ঘটনায় তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।”

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

﴿ وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ وَأَقِمۡنَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتِينَ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣ ﴾ [الأحزاب: ٣٣]

 “তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান কর এবং প্রথম জাহেলিয়াতের ন্যায় নিজেদের রূপ সৌন্দর্য প্রদর্শন করোনা। নামায কায়েম কর ও যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অনুগত থাক।” [5]

তিনি আরো বলেন:

﴿ إِذۡ جَعَلَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فِي قُلُوبِهِمُ ٱلۡحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ﴾ [الفتح: ٢٦]

“কাফেররা যখন তাদের অন্তরে জাহেলীয়াতের উত্তেজনা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করল।”

আবূ দাঊদে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«ليس منا من دعا إلى عصبية، وليس منا من قاتل على عصبية، وليس منا من مات على عصبية»

“যে ব্যক্তি পক্ষপাত ও পরবিদ্বেষ গ্রহণের আহ্বান জানায়, সে আমাদের লোক নয়, যে পক্ষপাত ও পরবিদ্বেষের জন্য লড়াই করে, সে আমাদের লোক নয় এবং সে পক্ষপাত ও পরবিদ্বেষ পোষণকারী অবস্থায় মারা যায়, সেও আমাদের লোক নয়।”

সহীহ মুসলিমে উদ্ধৃত বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إن الله أوحى إلي أن تواضعوا حتى لا يبغي أحد على أحد ولا يفخر أحد على أحد»

“আল্লাহ আমার নিকট অহী পাঠিয়ে তোমাদেরকে বিনয়ী হবার নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে কেউ কারও ওপর অত্যাচার কিংবা অহংকার না করে।”

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, জাতীয়তাবাদ প্রচারকারীরা পক্ষপাত ও পরবিদ্বেষ প্রচার করে। তারা পক্ষপাত ও পরবিদ্বেষের জন্য মাথা গরম করে ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, জাতীয়তাবাদ মানুষকে অত্যাচার ও অহংকারের পথে নিয়ে যায়। কেননা এই জাতীয়তাবাদ কোন আসমানী দ্বীন নয় যে, তার অনুসারীদেরকে অত্যাচার ও অহংকার থেকে বিরত রাখতে পারে। বরং এটা এমন একটা জাহেলী মতবাদ যা কেবল তাকে নিয়েই গর্ব করতে এবং অন্যায়ভাবে হলেও তারই পক্ষাবলম্বন করার জন্য অনুসারীদের প্ররোচিত করে। বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তাহলেই সত্য পরিষ্কার হয়ে ওঠবে।

এ সর্ম্পকিত উদ্ধৃতিসমূহের মধ্যে তিরমিযী ও অন্যান্যদের বর্ণিত একটি হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 «إن الله قد أذهب عنكم عصبية الجاهلية وفخرها بالآباء، إنما هو مؤمن تقي أو فاجر شقي، الناس بنو آدم وآدم خلق من تراب، ولا فضل لعربي على عجمي إلا بالتقوى»

“আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের পক্ষপাত ও পরবিদ্বেষ এবং পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব করার প্রথা অপসৃত করেছেন। মানুষ হয় আল্লাহ্‌ভীরু মুমিন, অন্যথায় দুষ্কর্মা পাপী। সকল মানুষ আদমের বংশধর আর আদম মাটির তৈরী। একমাত্র তাকওয়ার মাপকাঠি ছাড়া অন্য কোন উপায়ে একজন আরব একজন অনারব থেকে কিছুতেই শ্রেষ্ঠ নয়।”

হাদীসটির সাথে কুরআনের এ আয়াতটিরও অর্থগত মিল রয়েছে:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ ١٣ ﴾ [الحجرات: ١٣]

“হে মানুষ ! আমরা তোমাদেরকে একজোড়া নারী-পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য বিভিন্ন জাতি গোত্রে পরিণত করেছি। আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান সে-ই যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহ্‌ভীরু।”[6]

এই পবিত্র আয়াতটিতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, তিনি মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন কেবলমাত্র পারস্পরিক পরিচিতির সুবিধার জন্য, গর্ব কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা করার জন্য নয়। তাছাড়া তিনি সবার মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহভীরুকেই তাঁর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাবান বলে ঘোষণা করেছেন। উপরোক্ত হাদীসের মর্মার্থও ঠিক তাই। হাদীসটিতে এই দিক-নির্দেশও রয়েছে যে, জাহেলী যুগের প্রথা অহঙ্কার ও বংশ-মর্যাদা নিয়ে গর্বের প্রতিযোগিতা করা। কিন্তু ইসলাম তার বিপরীত। ইসলাম মানুষকে বিনয়, তাকওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পারস্পরিক হৃদ্যতার ডাক দেয় এবং সকল জাতির মানুষ নিয়ে গঠিত প্রকৃত মুসলিমদেরকে এমনভাবে এক দেহ ও এক অট্রালিকার ন্যায় সংঘবদ্ধ হতে শেখায়, যাতে একজনের শক্তিতে আরেকজন শক্তি পায় এবং একজনের ব্যথায় আরেকজন ব্যথিত হয়। সহীহ হাদীসে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا- وشبك بين أصابعه -»

“মুমিনের জন্য মুমিন অট্রালিকার ন্যায়, যার একাংশ অন্যাংশকে শক্ত করে।”

এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতের আঙ্গুলসমূহ একত্রে বিজড়িত করে বলেন:

«مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم كمثل الجسد الواحد إذا اشتكى منه عضو تداعى له سائر الجسد بالحمى والسهر»

“পারস্পরিক হৃদ্যতা, সহানুভুতি ও দয়ার দিক থেকে মুমিনগণ যেন একটি দেহ, যার কোন একটি অঙ্গে কষ্ট অনুভব হলে গোটা দেহে জ্বর ও নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়।”

জাতীয়তাবাদীদের কাছে জিজ্ঞাসা করি, তাদের জাতীয়তা কি আরব- অনারব নির্বিশেষে সকল মুসলিমদের জন্য সহমর্মিতা, সহানুভুতি ও ব্যথায় ব্যথিত হবার এরূপ মহান নীতি প্রচার করে? অবশ্যই করে না। বরং জাতীয়তার নীতি হল, যারা এই মতবাদ গ্রহণ করে তাদের প্রতি বন্ধুত্ব, আর যারা একে মেনে নিতে পারে না তাদের সাথে শত্রুতা। অতএব মুক্তিকামী প্রত্যেক মুসলিমকে জাগ্রত হতে হবে এবং পক্ষপাত ও গোঁড়ামিমুক্ত হয়ে ন্যায্য-নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বাস্তবকে অবলোকন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে মুক্তির পথে পরিচালিত করুন।

সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে: একবার আনসার ও মুহাজির সম্প্রদায়ের দুই বালকের মধ্যে বিরোধ লেগে যায়। মুহাজির বালক ‘হে মুজাজিরগণ’ এবং আনসার বালক ‘হে আনসারগণ’ বলে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রার্থনা করে। কথাটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কানে গেলে তিনি বলেন, “জাহেলিয়াতের দিকে আহবান জানানো হচ্ছে ! অথচ আমি তোমাদের মাঝে এখনও বেঁচে আছি।” মুহাজির ও আনসার আল্লাহর নিকট দু’টো প্রিয় নাম। উভয়ের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেছেন:

﴿وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٠٠ ﴾ [التوبة: ١٠٠]

“মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম পর্যায়ের, আর যারা তাদের প্রকৃত অনুসারী, আল্লাহ্‌ তাদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট।” [7]

 তা সত্বেও মুহাজির হয়ে মুহাজিরদের কিংবা আনসার হয়ে আনসারদের সাহায্য প্রার্থনা করায় যদি জাহেলিয়াতের দিকে আহবান জানানো হয়ে থাকে, তাহলে যারা জাতীয়তাবাদী আখ্যায়িত হয়ে জাতীয়তার নামে সাহায্য প্রার্থনা করছে এবং জাতীয়তার জন্য উত্তেজিত হয়ে উঠেছে’ তাদের অবস্থাটা কি? এদের ক্ষেত্রে ‘জাহেলিয়াতের দিকে ডাক দিয়েছে’ কথাটি অধিকতর প্রযোজ্য নয় কি? আশা করি, বিষয়টি এখন অত্যন্ত পরিস্কার।

হারিস আশ্‌‘আরী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إن الله أمر يحيى بن زكريا بخمس أن يعمل بهن ويأمر بني إسرائيل أن يعملوا بهن فذكرها»

“আল্লাহ ইয়াহ্‌ইয়া ইব্‌ন যাকারিয়া আলাহিস সালামকে তাঁর নিজের করার জন্য ও বনী ইসরাঈলকে করতে বলার জন্য পাঁচটি কাজের নির্দেশ দিয়েছিলেন।”

কাজগুলো উল্লেখ করার পর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«وأنا آمركم بخمس الله أمرني بهن: السمع والطاعة والجهاد والهجرة والجماعة، فإنه من فارق الجماعة قيد شبر فقد خلع ربقة الإسلام من عنقه إلا أن يراجع ومن دعا بدعوى الجاهلية فهو من جُثَى جهنم»

“আর আমিও তোমাদেরকে পাঁচটি কাজ করতে বলছি, আল্লাহ আমাকে সেগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। কাজগুলো হল: শ্রবণ ও আনুগত্য, জিহাদ, হিজরত ও জামায়াত তথা সংঘবদ্ধভাবে থাকা (পৃথক না হওয়া)। যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধ জীবন থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে সে তার গলা থেকে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলবে, যতক্ষণ না আবার ফিরে আসে। আর যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের মতার্দশ গ্রহণের আহবান জানাবে সে জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত হবে।”

 একজন প্রশ্ন করলেন: হে আল্লাহর রাসূল ! যদি সে নামায-রোজা করে তবুও? তিনি বললেন:

«وإن صلى وصام وزعم أنه مسلم، فادعوا بدعوى الله الذي سماكم المسلمين المؤمنين عباد الله»

“যদিও সে নামায-রোযা করে এবং মনে করে যে, সে মুসলিম। অতএব তোমরা আল্লাহর দেয়া সম্বোধনে ডাকবে, যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মুমিন, আল্লাহর বান্দা নাম দিয়েছেন।”

এ সম্পর্কিত সব হাদীসের মধ্যে এই সহীহ হাদীসটি সর্বাধিক সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জাতীয়তাবাদ প্রচার একটি ভ্রান্ত ও জাহেলী প্রচার, এবং এর প্রচারকরা নামায-রোযা করলেও এবং নিজেদেরকে মুসলিম মনে করলেও জাহান্নামের ইন্ধন হবার যোগ্য। এ এক ভয়ানক হুমকি ও জোরালো সতর্কবাণী, যা প্রত্যেক মুসলিমকে জাহেলী মতবাদসমূহ থেকে সাবধান করে দেয়। এসব মতবাদকে তাদের প্রচারকরা মোহিনী পত্র-পত্রিকা, জাঁকালো বক্তৃতামালা এবং ভিত্তিহীন ও অবস্তব কল্পনাবিলাসে সাজিয়ে রাখলেও আসলে এগুলো মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর প্রতারণা। আল্লাহ আমাদেরকে এসব প্রতারণা ও তাদের নিকৃষ্ট পরিণতির হাত থেকে রক্ষা করুন।

বিভ্রান্তকর প্রচারণা ও তার জবাব

 এখানে একটি সংশয় নিরসন করা প্রয়োজন; তা হল, জাতীয়তাবাদীরা বলে বেড়ায় যে, আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারের বিরোধিতা আরবদের হেয় করা ও তাদের মর্যাদা অস্বীকার করার নামান্তর। আসলে এটা একটা মিথ্যা দাবি ও অন্যায় ধারণা। কারণ, আমরা আগেই বলেছি যে, আরবদের মর্যাদা ও ইসলামের প্রারম্ভকালীন তাদের মহান কার্যাবলীর স্বীকৃতির ব্যাপারে ইতিহাস-জানা কোন মুসলিমের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। اقتضاء الصراط المستقيم (সঠিক পথের দাবি) গ্রন্থে আবুল আব্বাস ইব্‌ন তাইমিয়াসহ একাধিক পন্ডিত উল্লেখ করেছেন যে, আহলে সুন্নাতের মতে অনারবদের তুলনায় আরব জাতির লোকেরা অধিকতর মর্যাদার অধিকারী। ইব্‌ন তাইমিয়া কয়েকটি হাদীসও উদ্ধৃত করেছেন যেগুলো আরবদের অধিকতর মর্যাদার ইংগিতবহ। কিন্তু আরবদের মর্যাদা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, তাদেরকে একটি স্তম্ভ বানিয়ে তার চারপাশে সবাইকে জড়ো হতে হবে এবং তারই ভিত্তিতে মানুষের বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতা নির্ণীত হবে। বস্তুত: এই অধিকার একমাত্র ইসলামের, যার কল্যাণে আল্লাহ্‌ তাদের সম্মান ও মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। অতএব এ দু’টো জিনিসের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আসলে অন্যদের চেয়ে আরবদের এই বাড়তি মর্যাদা কিংবা তাদেরকে বিশুদ্ধ ভাষার অধিকারী করে ও তাদেরই ভাষায় কুরআন নাযিল করে এমনকি তাদেরই ভাষাভাষী থেকে বিশ্বজনীন রাসূল পাঠিয়ে আরবদের প্রতি আল্লাহ্ যে অনুগ্রহ করেছেন, এর কোনটাই পরকালে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনে তাদের কিছুমাত্র সহায়ক কিংবা তাদের মুক্তির গ্যারান্টি হবে না, যদি তাদের মধ্যে ঈমান এবং তাকওয়া না থাকে। তাছাড়া এই বাড়তি মর্যাদা ও বিশেষ অনুগ্রহ দ্বীনের দিক থেকে অন্যদের তুলনায় তাদের অধিক মর্যাদার কারণ হতে পারে না। পূর্বোল্লিখিত আয়াত ও হাদীস অনুযায়ী সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী ব্যক্তি সকল মানুষের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী। বরং অন্যদের তুলনায় আরবদের এই বাড়তি মর্যাদার জন্য তাদের উচিত অন্যদের তুলনায় আল্লাহর বেশী শোকর করা ও যে দ্বীনের কারণে আল্লাহ তাদের ঊর্ধ্বে উঠিয়েছেন তার সাহায্যের জন্য নিজেদের প্রয়াস বৃদ্ধি করা। জাতীয়তাবাদ কিংবা অন্য কোন বিষাক্ত আদর্শ বা অশুভ প্রচারে কর্ণপাত না করে তাদের উচিত ঐ দ্বীনের জন্যই বন্ধুত্ব করা এবং ঐ দ্বীনের জন্যই শত্রুতা করা। কেবলমাত্র বংশই যদি তাদের এতটুকু কল্যাণ করতে পারত, তাহলে আবুলাহাব প্রমুখ জাহান্নামী হত না। ঈমান ছাড়া বংশ যদি আদৌ কোন কাজে আসত, তাহলে সহীহ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন না:

«يا معشر قريش! اشتروا أنفسكم من الله، لا أغني عنكم من الله شيئا»

 “হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা ! তোমরা আল্লাহর সাথে নিজেদের লেনদেনের সম্পর্ক ঠিক করে নাও। আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষায় আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারি না।”

অতএব ‘আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারের বিরোধিতা করলে আরবদের হেয় করা হয় কিংবা তাদের মর্যাদা অস্বীকার করা হয়। এটা একটা অমূলক কথা। পবিত্র শরীয়াতে কিংবা গোঁড়ামিমুক্ত সুস্থ যুক্তিতে এর কোনই ভিত্তি নেই।

 জাতীয়তাবাদীদের কেউ কেউ এই কথা বলে আরও একটি সংশয় সৃষ্টি করছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إذا ذل العرب ذل الإسلام»

 আরবরা লাঞ্ছিত হলে ইসলাম লাঞ্ছিত হবে।” কেউ আবার হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করেছে,

«إذا عز العرب عز الإسلام»

“আরবরা সম্মানিত হলে ইসলাম সম্মানিত হবে।”

তারা বলে: এতে বোঝা যায় যে, আরব জাতীয়তাবাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার করলে ইসলামেরই পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার করা হয়। এর জবাব হল: কথাগুলো শ্রবণ-বিভ্রাট, সত্যের অপলাপ এবং সত্য মিথ্যা যাই হোক হাদীসটির ভুল ব্যাখ্যাপ্রসূত। কেননা বাস্তব ঘটনা এই উক্তির বিপরীত। বদর ও খন্দকের যুদ্ধে আরবরা লাঞ্ছিত হয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই লাঞ্ছনায় ইসলামের সম্মান ও আত্মপ্রকাশ সূচিত হয়েছিল। পক্ষান্তরে, উহুদের যুদ্ধে আরবরা জয়ী হলেও তাদের সে বিজয়ে মুসলিমদের লাঞ্ছনা ও ক্ষতি হয়েছিল। অবশ্য করুণাময় আল্লাহ্‌ তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি সদয় হয়ে তাদের শেষ পরিণতি শুভই করেছিলেন। তাহলে কী করে বলা সম্ভব যে, আল্লাহ্‌কে অবিশ্বাসকারী ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আরবদের বিজয় ইসলামেরই বিজয়? বস্তুত: এই উক্তি যে করেছে সে সত্যের বিপরীত কথা বলছে। সত্যকে মিথ্যার আবরণে লুকিয়ে সে চায় দুর্বল দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের ধোঁকা দিতে।

এরপর ফিরে আসিছি উদ্ধৃত হাদীসটির সত্যতা প্রসংগে। আমি পরিষ্কার বলতে চাই যে, এই হাদীসটির সনদ দুর্বল এবং এটি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীস নয়। হাফেয আবুল হাসান হাইসামী তাঁর ‘মাজমা আয-যাওয়াঈদ’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, “আরবরা লাঞ্ছিত হলে ইসলাম লাঞ্ছিত হবে” হাদীসটি আবু ইয়া’লা বর্ণনা করেছেন, যার সনদে (সূত্র-তালিকায়) ইব্‌ন আল-খাত্তাব আল-বাসরী রয়েছেন, যাকে আল-আয্‌দী প্রমুখ দুর্বল বলেছেন এবং ইব্‌ন হিব্বান নির্ভরযোগ্য বলেছেন।

হাফেয আয-যাহাবী তার ‘মীযান’ নামক গ্রন্থে উল্লিখিত মুহাম্মাদের জীবন বৃত্তান্তে লিখেছেন: “আবু হাতেম বলেন যে, আমি তাকে চিনি না। আল-আযদী বলেছেন, তার বর্ণিত হাদীস সুপরিচিত বলে স্বীকৃত নয়।”

আমি বলি, হাদীসটির সনদে আলী যায়দ ইব্‌ন জাদ‘আনও আছেন যিনি অধিকাংশ হাদীস বিশারদের মতে দুর্বল। তাই প্রমাণস্বরূপ তাঁর হাদীস গ্রহনযোগ্য নয়। আর এই হাদীসে তাঁর থেকেও দুর্বলতর বর্ণনাকারী অর্থাৎ উল্লিখিত মুহাম্মাদ ইব্‌ন আল-খাত্তাব থাকতে কিভাবে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে? ইব্‌ন হিব্বান যে তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন তা মেনে নেয়া যায় না। তার কারণ, তিনি অসতর্ক বলে পরিচিত। তাছাড়া অন্যরাও তাঁর বিপরীত বলেছেন।

 আর হাদীসটি যদি সত্যও হয় তাহলে তার অর্থ হবে, “সেই আরবরা লাঞ্ছিত হলে ইসলাম লাঞ্ছিত হবে যারা ইসলামের পতাকা বহান করছে ও ইসলাম প্রচার করছে, সেই আরবরা লাঞ্ছিত হলে নয় যারা ইসলামের শত্রু ও ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু প্রচার করছে।” তাছাড়া হাদীসে এমন কিছু কখনো বর্ণিত হতে পারে না যা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসসমূহের পরিপন্থী। কেননা, আল্লাহর কালাম কিংবা রাসূলের বাণী স্ববিরোধী নয়। আর সুন্নাহ (হাদীস) কুরআনের বিরোধিতা করে না বরং সমর্থন করে ও তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়।

পবিত্র কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী কল্যাণ ও সাফল্যের জন্য আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তার দ্বীনের পৃষ্টপোষকতা অপরিহার্য শর্ত। হাদীসে এর পরিপন্থী কোন কথা থাকতে পারে না। অতএব, মুমিনদের অত্যন্ত সজাগ থাকতে হবে এবং বিভ্রান্তকর সংশয়, মিথ্যা হাদীস ও ভ্রান্ত মতবাদ সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। বিপদ কিন্তু অনেক বড় এবং আল্লাহ্‌ যাকে রক্ষা করবেন সে-ই রক্ষা পাবে। তাই সকলের উচিত তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা ও তাঁরই ওপর ভরসা রাখা। তাছাড়া আল্লাহর দ্বীনকে বোঝার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা ও দ্বীনের আদর্শে সর্বদা অটল থাকা সকলের কর্তব্য। এছাড়া সাফল্যের অন্য কোন বিকল্প পথ নেই।

জাতীয়তাবাদ প্রচারকদের সম্পর্কে মহানকবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী

এই প্রসঙ্গে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: লোকেরা রসূলুল্লাহর কাছে কল্যাণ সম্পর্কে জানতে চাইছিল আর আমি জানতে চাইছিলাম অকল্যাণ সম্পর্কে। আমার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে অকল্যাণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরাতো জাহেলিয়াত ও অকল্যাণের মাঝে ছিলাম। আল্লাহ্‌ আমাদের এই কল্যাণ এনে দিয়েছেন। এই কল্যাণের পর আর কি কোন অকল্যাণ আসতে পারে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ,” আমি বললাম: ঐ অকল্যাণের পর কি আবার কোন কল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, “হ্যা”, তবে তাতে একটা বিপত্তি থাকবে।” আমি বললাম: সে বিপত্তি কি রকম? তিনি বললেন, “একদল লোক আমার আদর্শ ছাড়া অন্য আদর্শ অনুসরণ করবে এবং আমার পথ ছাড়া অন্য পথে পরিচালিত হবে।” আমি বললাম: ঐ কল্যাণের পর আর কোন অকল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, “হ্যা”, জাহান্নামের দ্বারে দ্বারে কতিপয় আহ্বানকারী থাকবে। যে তাদের ডাকে সাড়া দেবে তাকেই তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।” আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আমি যদি ওদের যুগ পাই, তখন আমার প্রতি আপনার নির্দেশ কি? তিনি বললেন, “তুমি মুসলিম জামায়াত ও তাদের নেতার সঙ্গে থেকো।” আমি বললাম: তাদের যদি সে রকম কোন জামায়াত কিংবা নেতা না থাকে? তিনি বললেন, “তাহলে সেসব দলের প্রত্যেকটি থেকে দূরে থেকো, যদিও তোমাকে ঐ অবস্থায় আমরণ কোন গাছের শিকড় কামড়ে থাকতে হয়।” বুখারী ও মুসলিম হাদীসগ্রন্থে উল্লেখিত এই মহান হাদীসটি অগ্রিম বলে দিয়েছে যে, আজকের এই প্রচারকরা, যারা বিভিন্ন প্রকার অন্যায়-অসত্য, যেমন আরব জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, নিষ্ঠুর পুঁজিবাদ, যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা, লাগামহীন স্বাধীনতা ও নানারকম বিশৃংঙ্খলা প্রচার করছে, সবাই জাহান্নামের দ্বারে দ্বারে আহ্বানকারী। তারা নিজেরা তা জানুক কিংবা না জানুক। তাদের অন্যায় প্রচারে যে সাড়া দেবে তাকেই তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। সন্দেহ নেই, এই মহান হাদীসটি নবুওয়াতের অন্যতম নিদর্শন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সত্য রাসূল হবার অন্যতম প্রমাণ। কেননা, সংঘটিত হবার পূর্বে তিনি ঘটনার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এবং তিনি যেমন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন ঠিক তেমনটিই ঘটেছে। আল্লাহর নিকট আমরা নিজেদের ও সকল মুসলিমদের জন্য বিভ্রান্তিময় মোহাচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি কামনা করছি। তাঁর নিকট আমাদের আরও প্রার্থনা, তিনি যেন মুসলিমদের নেতৃবৃন্দকে সেই যোগ্যতা দান করেন যাত তারা তাঁর দ্বীনকে রক্ষা করতে পারে ও দ্বীন-বিরোধী কার্যকলাপ রুখতে সক্ষম হয়।

আরব জাতীয়তাবাদ কাফিরদের বন্ধুত্বে উৎসাহ যোগায়

আরব জাতীয়তাবাদ আন্দোলন নিষিদ্ধ হবার তৃতীয় কারণ এই যে, এই মতবাদ অমুসলিমদের বংশধর কাফির ও ধর্মবিরোধী আরবদের বন্ধু ভাবতে, এদের সাথে মেলামেশা করতে এবং মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে জাতীয়তাবাদীদের সকল শত্রুর বিরুদ্ধে এদের সাহায্য নিতে উৎসাহিত করে। এতে একদিকে যেমন বিরাট ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে তেনি অন্যদিকে এটা কুরআন-সুন্নাহর সেইসব উদ্ধৃতিরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যাতে আরব-অনারব নির্বেশেষে কাফিরদের শত্রু জ্ঞান করার নির্দেশ এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন ও মেলামেশার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সম্পর্কিত অনেক উদ্ধৃতির মধ্যে একটি আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

﴿۞يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلۡيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوۡلِيَآءَۘ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمۡ فَإِنَّهُۥ مِنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥١ فَتَرَى ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ يُسَٰرِعُونَ فِيهِمۡ يَقُولُونَ نَخۡشَىٰٓ أَن تُصِيبَنَا دَآئِرَةٞۚ فَعَسَى ٱللَّهُ أَن يَأۡتِيَ بِٱلۡفَتۡحِ أَوۡ أَمۡرٖ مِّنۡ عِندِهِۦ فَيُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَآ أَسَرُّواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ نَٰدِمِينَ ٥٢﴾ [المائ‍دة: ٥١، ٥٢]

“হে ঈমানদারগণ ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করোনা, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের কেউ তাদের সাথে বন্ধুত্ব করলে সে তাদেরই দলভুক্ত হবে। আল্লাহ জালিম কওমকে হেদায়েত করেন না। তুমি দেখছ, যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা ওদের মাঝে ধাবিত হয় আর বলে: আমাদের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।”[1]

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কথা কত খাঁটি, তাঁর বক্তব্য কত স্পষ্ট ! এই জাতীয়তাবাদীরা আরব জাতীয়তার চারপাশে মুসলিম ও কাফির সবাইকে সংঘবদ্ধ হবার ডাক দিয়ে বলে: আমাদের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের ভয়, সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশকে গ্রাস করতে পারে। আমাদের ভয়, শত্রুর হাতে আমাদের সম্পদ লুট হতে পারে। আর তাই তারা ইয়াহূদী, খ্রীস্টান, পারসিক, পৌত্তলিক, ধর্মত্যাগী প্রত্যেকটি আরবকে আরব জাতীয়তাবাদের মাপকাঠিতে বন্ধু জ্ঞান করে আর বলে: এই জাতীয়তাবাদের নীতি ধর্মের বিভিন্নতা সত্ত্বেও আরবে আরবে কোন পার্থক্য করে না। তাহলে এটা কুরআনের সাথে সংঘাত ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমামূহের পরিষ্কার লঙ্ঘন নয় কি? এতে কি দ্বীনের জন্যই বন্ধুত্ব-বৈরিতা ও প্রেম-ঘৃণার নির্দেশ লঙ্ঘিত হয় না? কী এক ভয়ানক ভ্রান্তি আর জঘন্য নীতি এই আরব জাতীয়তাবাদ ! কুরআন যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, মুমিনদের সাথে বন্ধুত্বের আর কাফিরদের সাথে শত্রুতার আহবান জানায়। কিন্তু আরব জাতীয়তাবাদ এটা অস্বীকার করে এবং এই নীতির বিরোধিতা করে।

﴿قُلۡ ءَأَنتُمۡ أَعۡلَمُ أَمِ ٱللَّهُۗ﴾ [البقرة: ١٤٠]

“হে নবী ! তুমি জিজ্ঞেস কর: তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ ?”[2]

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمۡ أَوۡلِيَآءَ﴾

﴿وَمَن يَفۡعَلۡهُ مِنكُمۡ فَقَدۡ ضَلَّ سَوَآءَ ٱلسَّبِيلِ ١ ﴾ [الممتحنة: ١]

“হে ঈমানদারগণ ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।”

 …“তোমাদের মধ্যে যে তা করবে সে সঠিক পথ হারিয়ে ফেলবে[3]।”

জাতীয়তার নীতি অনুযায়ী মুসলিম, কাফির সবাই বন্ধু। অথচ আল্লাহ বলেন:

﴿۞شَرَعَ لَكُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِۦ نُوحٗا وَٱلَّذِيٓ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ وَمَا وَصَّيۡنَا بِهِۦٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰٓۖ أَنۡ أَقِيمُواْ ٱلدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُواْ فِيهِۚ كَبُرَ عَلَى ٱلۡمُشۡرِكِينَ مَا تَدۡعُوهُمۡ إِلَيۡهِۚ ٱللَّهُ يَجۡتَبِيٓ إِلَيۡهِ مَن يَشَآءُ وَيَهۡدِيٓ إِلَيۡهِ مَن يُنِيبُ ٣﴾ [الشورى: 13]

“তোমাদের জন্য তিনি দ্বীনের সেই বিধানই দিয়েছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন, যা এখন তোমার কাছে অহির মাধ্যমে পাঠিয়েছি এবং যার নির্দেশ আমরা ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম। তা এই যে, তোমরা দ্বীন কায়েম কর এবং দ্বীনের ব্যপারে ভিন্ন ভিন্ন হয়োনা।” [4]

আল্লাহ আরও বলেন:

﴿قَدۡ كَانَتۡ لَكُمۡ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ فِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذۡ قَالُواْ لِقَوۡمِهِمۡ إِنَّا بُرَءَٰٓؤُاْ مِنكُمۡ وَمِمَّا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ كَفَرۡنَا بِكُمۡ وَبَدَا بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةُ وَٱلۡبَغۡضَآءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ وَحۡدَهُۥٓ إِلَّا قَوۡلَ إِبۡرَٰهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسۡتَغۡفِرَنَّ لَكَ وَمَآ أَمۡلِكُ لَكَ مِنَ ٱللَّهِ مِن شَيۡءٖۖ رَّبَّنَا عَلَيۡكَ تَوَكَّلۡنَا وَإِلَيۡكَ أَنَبۡنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ ٤ ﴾ [الممتحنة: ٤]

ইব্রাহীম ও তাঁর সংগীদের মাঝে তোমাদের জন্য এক সুন্দর আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের কওমকে বলে দিয়েছিল: তোমাদের সাথে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদাত করছ তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের নীতি ও আদর্শের সাথে বিরোধ ঘোষণা করলাম এবং আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সূচিত হল, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” [5]

অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে:

﴿لَّا تَجِدُ قَوۡمٗا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ يُوَآدُّونَ مَنۡ حَآدَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَوۡ كَانُوٓاْ ءَابَآءَهُمۡ أَوۡ أَبۡنَآءَهُمۡ أَوۡ إِخۡوَٰنَهُمۡ أَوۡ عَشِيرَتَهُمۡۚ ﴾ [المجادلة: ٢٢]

 “আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী লোকদেরকে তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দুশমনদের ভালবাসতে দেখবেনা, তারা তাদের বাপ-দাদা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বন্ধু কিংবা স্বগোত্রীয় হলেও।” [6]

 পক্ষান্তরে জাতীয়তার নীতি কিংবা বলা যায় জাতীয়তাবাদ প্রচারকদের নীতি বলে: ধর্মকে জাতীয়তা থেকে দূরে সরাও, ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখ এবং নিজেদের জাতীয়তার চারপাশে সংঘবদ্ধ হও। তা হলেই তোমাদের স্বার্থ উদ্ধার হবে এবং গৌরব ফিরে পাবে। ইসলাম যেন তাদের একটি বাধা ও তাদের গৌরব অর্জনের পথে একটি অন্তরায়। আসলে এটা মূর্খতা, বিভ্রান্তি ও ধোঁকাবাজি এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বড় রকমের এক মিথ্যা অপবাদ।

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব ও কাফিরদের সাথে বৈরিতা বজায় রাখার নির্দেশ উচ্চারিত হয়েছে। অধিকন্তু কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। যেহেতু কুরআনের অনুসারীদের এসব আয়াত অজানা নয়, তাই সেগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। কোন বুদ্ধিমান লোক কিছু্তেই মানতে পারেনা যে, আবু জাহ্‌ল, আবু লাহাব, উক্‌বা ইব্‌ন আবি মু‘ঈত, নাদার ইব্‌ন হারিস এবং রাসূলুল্লাহর সময় ও তাঁর পরবর্তী যুগের অন্যান্য বড় বড় কাফিররা আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী আরবদের ভাই কিংবা বন্ধু হতে পারে। এটা জঘন্যতম ভ্রান্তি ও চরম মূর্খতা। তবু জাতীয়তার নীতি অনুযায়ী এটাই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যদিও তার কোন কোন প্রচারক অজ্ঞতাবশত: কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একথা অস্বীকার করে।

মুসলিমদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ, তারা যেন ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ ও জোটবদ্ধ হয় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে একটি একক দেহ ও এক সুদৃঢ় অট্রালিকায় পরিণত হয়। এ জন্য তিনি তাদের সাহায্য, সম্মান ও শুভ পরিণামের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পূর্বে বর্ণিত অনেক আয়াতেও এর উল্লেখ রয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

﴿ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ كَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَهُمُ ٱلَّذِي ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنٗاۚ يَعۡبُدُونَنِي لَا يُشۡرِكُونَ بِي شَيۡ‍ٔٗاۚ وَمَن كَفَرَ بَعۡدَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٥٥ ﴾ [النور: ٥٥]

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনে সৎকাজ করে, তিনি তাদেরকে যমীনে উত্তরাধিকারী করবেন, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের করেছিলেন। আর তাদের জন্য সেই দ্বীনকে শক্তিশালী করে দিবেন যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পর আবার নিরাপত্তা দান করবেন। যখন তারা আমারই ইবাদাত করবে এবং আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না।” [7]

তিনি আরো বলেন:

﴿ وَلَقَدۡ سَبَقَتۡ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا ٱلۡمُرۡسَلِينَ ١٧١ ﴾ [الصافات: ١٧١]

 “আমার রাসূল বান্দাদের জন্য আমার কথা পূর্বেই নির্ধারিত হয়ে আছে। তাঁরা সাহায্যপ্রাপ্ত এবং আমার সৈন্যরা বিজয়ী।” [8]

 এভাবে আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিন সৈনিকদের সাহায্য ও বিজয়দান, পৃথিবীতে তাঁদের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাঁদের দ্বীনকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি সত্যই হয়। তিনি বলেন:

﴿ لَٰكِنِ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ رَبَّهُمۡ لَهُمۡ غُرَفٞ مِّن فَوۡقِهَا غُرَفٞ مَّبۡنِيَّةٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۖ وَعۡدَ ٱللَّهِ لَا يُخۡلِفُ ٱللَّهُ ٱلۡمِيعَادَ ٢٠ ﴾ [الزمر: ٢٠]

“ এটা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি বঙ্গ করেন না।” [9]

অবশ্য কখনও কখনও এই প্রতিশ্রুতি অনুপস্থিত দেখা যায়। তার কারণ মুসলিমদের ত্রুটি এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর দ্বীনের প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত আল্লাহর নির্দেশ পালনে তাদের ব্যর্থতা। সেটা আমাদের অপরাধ, ইসলামের অপরাধ নয়। বিপদ আমাদের পাপের ফলেই এসেছে।

আল্লাহ বলেছেন:

﴿ وَمَآ أَصَٰبَكُم مِّن مُّصِيبَةٖ فَبِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِيكُمۡ وَيَعۡفُواْ عَن كَثِيرٖ ٣٠ ﴾ [الشورا: ٣٠]

“তোমাদের যে বিপদ আসে তা তোমাদের কৃতকর্মের ফলে, আর অনেকগুলো তিনি নিজগুণে ক্ষমা করে দেন।” [1]

অতএব আরব-অনারব সকল নেতা ও সর্বসাধারণের উচিত আল্লাহর নিকট তওবা করে তাঁর দ্বীনকে শক্ত হাতে ধরা, আল্লাহর হক সম্পর্কে পরস্পরকে সদুপদেশ দেয়া, তাঁর শরী‘আতের বিধান মেনে নেয়া এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা। তাহলেই তারা বিজয় লাভ করবে এবং তাদের শত্রু পরাস্ত হবে। আর আমরা তা করতে পারলে সংখ্যা ও সাজ-সরঞ্জাম স্বল্প হলেও পৃথিবীতে আমাদের প্রতিষ্ঠা অর্জিত হবে। আর একটা কথা, শত্রু সম্পর্কে সতর্ক থাকা ও তার বিরুদ্ধে সম্ভব সকল শক্তি প্রস্তুত রাখা আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী কর্তব্য। একে কোনমতেই অবহেলা করা যায় না। আল্লাহ বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ خُذُواْ حِذۡرَكُمۡ فَٱنفِرُواْ ثُبَاتٍ أَوِ ٱنفِرُواْ جَمِيعٗا ٧١ ﴾ [النساء: ٧١]

“হে মুমিন ! তোমরা তোমাদের সাবধানতা অবলম্বন কর।”[2]

তিনি আরও বলেন:

﴿ وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةٖ ﴾ [الانفال: ٦٠]

“তাদের বিরুদ্ধে যত পার শক্তি প্রস্তুত রাখ।” [3]

মুসলিমদের জন্য কাফিরদের বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে ওদের সাহায্য গ্রহণ অবৈধ। কেননা ওরাও শত্রু এবং সুযোগ পেলে ওরাও বড় রকমের ক্ষতি করতে পারে। আল্লাহ কাফিরদের সাতে বন্ধুত্ব হারাম করেছেন এবং তাদের সাথে মেলামেশা করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, যারা ওদের বন্ধুজ্ঞান করবে তারা ওদেরই অন্তর্ভুক্ত এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, এরা সবাই জালিম। ইতোপূর্বে বর্ণিত স্পষ্ট আয়াতসমূহে এর উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া মুসলিম শরীফে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর পানে রওয়ানা হলেন। তিনি যখন ‘হার্‌রা আল-ওয়াবরা’তে ছিলেন তখন একটি লোক সেখানে রাসূলুল্লাহর সাথে মিলিত হয়। লোকটির সাহস ও বীরত্বের কথা সবাই বলাবলি করত। রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগীরা তাই লোকটিকে দেখে অত্যন্ত খুশী। কিন্তু সে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে মিলিত হয়ে যখন তাঁকে বলল, “আমি আপনার সহযাত্রী হয়ে আপনার কষ্টের অংশীদার হতে এসেছি”। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন : تؤمن بالله ورسوله؟ “তুমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান এনেছ? লোকটি ভলল, “না”। তিনি বললেন: فارجع فلن أستعين بمشرك “তাহলে তুমি ফিরে যেতে পার, আমি কোন মুশরিকের সাহায্য নেব না।” লোকটি চলে গেল। তারপর আমরা যখন ‘আশ-শাজারা’তে পৌঁছি, তখন লোকটি আবার এসে পূর্বের ন্যায় একই কথা বলল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাকে একই জবাব দিলেন। অর্থাৎ তিনি ‘না’ বলে দিলেন। তিনি বললেন فارجع فلن أستعين بمشرك “তুমি ফিরে যাও, আমি কোন মুশরিকের সাহায্য নেব না।’ লোকটি ফিরে গেল। কিন্তু ‘আল –বীরা’ নামক স্থানে সে আবার এল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এবারও প্রথমবারের মতই বললেন: تؤمن بالله ورسوله؟ “তুমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান এনেছ? লোকটি এবারে বলল, ‘হ্যাঁ’। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: فانطلق “তাহলে চল।” এই মহান হাদীস আমাদেরকে মুশরিকদের সাহায্য বর্জন এবং কেবলমাত্র মুমিনদের সাহায্য গ্রহণ করার পথনির্দেশ দেয়। এই হাদীসেই প্রমাণিত হয় যে, নিজেদের সৈন্যদলে বিধর্মীদের প্রবেশ করতে দেয়া মুসলিমদের উচিত নয়। এই বিধর্মীরা আরব হোক কিংবা অনারব। তার কারণ, কাফির মাত্রই মুসলিমদের শত্রু। তাকে বিশ্বাস করা যায় না। তাছাড়া আল্লাহর শত্রুদেরও জানতে দেয়া দরকার যে, মুসলিমরা তাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নয়। কেননা, মুসলিমদের সম্পর্ক আল্লাহর সাথে, এবং তারা সে সম্পর্ক রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ। আর বিজয়? সেতো আল্লাহরই হাতে, আর কারো হাতে নয়। সংখ্যা ও সরঞ্জাম স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহই মুসলিমদের সে বিজয়ের ওয়াদা করেছেন। ইতোপূর্বে বর্ণিত কুরআনের আয়াতসমূহে এই ওয়াদার উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া ইসলামের প্রথম যুগে মুসলিমদের সে বিজয় অর্জিত হয়েছিল। কাফিরদের সাহায্যগ্রহণ ও তাদের সাথে বন্ধূত্ব ও মেলামেশার বিপক্ষে আল্লাহ বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ بِطَانَةٗ مِّن دُونِكُمۡ لَا يَأۡلُونَكُمۡ خَبَالٗا وَدُّواْ مَا عَنِتُّمۡ قَدۡ بَدَتِ ٱلۡبَغۡضَآءُ مِنۡ أَفۡوَٰهِهِمۡ وَمَا تُخۡفِي صُدُورُهُمۡ أَكۡبَرُۚ قَدۡ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ ١١٨ ﴾ [ال عمران: ١١٨]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অন্যদের সাথে গোপন সম্পর্ক স্থাপন করো না। তারা তোমদের মনে অশান্তি সৃষ্টির কাজে কখনও ক্ষান্ত হয় না। তোমাদের যাতে কষ্ট হয় তারা তাই চেয়েছে। তাদের মুখ থেকেই শত্রুতা প্রকাশ পেয়েছে। আর অন্তরে যা লুকানো আছে সেতো আরও ভয়াবহ। আমরা তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী প্রকাশ করলাম। তোমরা যদি বুঝতে ……।[4]

অতএব দেখা যাচ্ছে পবিত্র কুরআন ও মহানবীর সুন্নত কাফিরদের বন্ধুত্ব, সাহায্যগ্রহণ ও তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক স্থাপনের কঠোর বিরোধী। বান্দার কল্যাণ আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন এবং তাদের নিজেদের চেয়েও বান্দার প্রতি তিনি অধিক সদয়। অতএব আরব বা অনারব কাফিরদের বন্ধুত্ব ও সাহায্য গ্রহণের মধ্যে যদি বড় কোন কল্যাণ থাকতই তাহলে আল্লাহ তার অনুমতি অবশ্যই দিতেন। কিন্তু তিনি এর বিরাট অকল্যাণ ও অশুভ পরিণামসমূহ জানেন বলেই তা নিষিদ্ধ করেছেন এবং যারা একাজ করে, তাদের নিন্দা করেছেন। তিনি অন্যান্য আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিরদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও মুসলিমদের সৈন্যবাহিনীতে তাদের যোগদান মুসলিমদের ক্ষতি করে এবং এতে তাদের উদ্বেগ বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু ফল হয় না। তিনি বলেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن تُطِيعُواْ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ يَرُدُّوكُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَٰبِكُمۡ فَتَنقَلِبُواْ خَٰسِرِينَ ١٤٩ بَلِ ٱللَّهُ مَوۡلَىٰكُمۡۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلنَّٰصِرِينَ ١٥٠ ﴾ [آل عمران: ١٤٩، ١٥٠]

“হে ঈমানদারগণ ! তোমরা যদি কাফিরদের কথা অনুযায়ী চল, তাহলে তারা তোমাদের পশ্চাতে ঠেলে দেবে এবং তোমরা এতে ক্ষতিগ্রস্তই হবে। বরং আল্লাহই তোমাদের বন্ধু, আর তিনি শ্রেষ্ঠতম পৃষ্ঠপোষক।” [5]

তিনি আরো বলেন:

﴿ لَوۡ خَرَجُواْ فِيكُم مَّا زَادُوكُمۡ إِلَّا خَبَالٗا وَلَأَوۡضَعُواْ خِلَٰلَكُمۡ يَبۡغُونَكُمُ ٱلۡفِتۡنَةَ وَفِيكُمۡ سَمَّٰعُونَ لَهُمۡۗ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِٱلظَّٰلِمِينَ ٤٧ ﴾ [التوبة: ٤٧]

“তারা যদি তোমাদের সাথে যোগ দেয় তাহলে তোমাদের উদ্বেগ বাড়ানো ছাড়া আর কিছু করবে না। তারা তোমাদের মাঝে গোলযোগ সৃষ্টির জন্য তৎপর থাকবে। তোমাদের মধ্যে তাদের গুপ্তচর আছে। আল্লাহ জালিমদের ভালই জানেন।” [6]

কাফিরদের সাথে ঘনিস্ঠতা বজায় রাখা ও তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া যে কত ক্ষতিকর এবং এর পরিণাম যে কত মারাত্মক, তা বোঝানোর জন্য এসব আয়াত যথেষ্ট। সেই পরিণাম থেকে আল্লাহ মুসলিমদের রক্ষা করুন।

আল্লাহ বলেন:

﴿ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ سَيَرۡحَمُهُمُ ٱللَّهُۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٧١ ﴾ [التوبة: ٧١]

“মুমিন নারী-পুরুষ একে অপরের বন্ধু”। [7]

﴿ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍۚ إِلَّا تَفۡعَلُوهُ تَكُن فِتۡنَةٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَفَسَادٞ كَبِيرٞ ٧٣ ﴾ [الانفال: ٧٣]

“আর যারা কাফির তারা একে অপরের বন্ধু। তোমরা যদি তা না মান তাহলে পৃথিবীতে অশান্তি ও বিরাট গোলযোগ সৃষ্টি হবে।” [8]

মহান আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, মুমিন মুমিনের বন্ধু আর কাফির কাফিরের বন্ধু। অতএব মুসলিমরা যদি তা না মানে, আর কাফিররা মুসলিমদের সাথে মেলামেশা করে একে অপরের বন্ধুতে পরিণত হয়, তাহলে সেই অশান্তি ও বিরাট গোলযোগ হবেই। শত্রুদের সাথে মুসলিমদের সংমিশ্রণ ও পারস্পরিক বন্ধুত্বের ফলে তাদের অন্তরে সংশয় ও অন্যায়পন্থীদের প্রতি এক ধরণের টান সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের কাছে সত্য অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। অশান্তি ও গোলযোগ সৃষ্টির মূল কারণ এখানেই। আজকের বাস্তব ঘটনাও ঠিক তাই। ইসলামের দাবিদার অধিকাংশ লোক আজ কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলেছে, তাদের সাথে মেলামেশা করছে। সে কারণে সবকিছু তাদের কাছে বিজড়িত হয়ে পড়েছে। তারা না পারছে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে, না সুপথ-কুপথ তারতম্য করতে এবং না পারছে নির্ণয় করতে কারা আল্লাহর বন্ধু, আর কারা শয়তানের সুহৃদ। তাই গোলযোগ সৃষ্টি ছাড়াও এমনসব ক্ষতি সাধিত হয়েছে যার হিসাব আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

জাতীয়তাবাদের কোন এক প্রচারকের মতে খ্রীস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা ও তাদের সাহায্য নেয়া বৈধ। তার যুক্তি এই আয়াত:

﴿ ۞لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ ٱلنَّاسِ عَدَٰوَةٗ لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱلۡيَهُودَ وَٱلَّذِينَ أَشۡرَكُواْۖ وَلَتَجِدَنَّ أَقۡرَبَهُم مَّوَدَّةٗ لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّا نَصَٰرَىٰۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّ مِنۡهُمۡ قِسِّيسِينَ وَرُهۡبَانٗا وَأَنَّهُمۡ لَا يَسۡتَكۡبِرُونَ ٨٢ ﴾ [المائ‍دة: ٨٢]

 “তুমি দেখবে, সব মানুষের মধ্যে ইয়াহূদী ও মুশরিকরা মুমিনদের সব চেয়ে বড় শত্রু, আর যারা বলে যে, আমরা খ্রীষ্টান, বন্ধু হিসেবে তারা মুমিনদের অধিকতর নিকটবর্তী।”[9]

 উক্ত প্রচারকের দাবি, যেহেতু এই আয়াতে অন্যদের তুলনায় খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে মুমিনদের অধিক নিকটবর্তী বলা হয়েছে, তাই আয়াতটি খ্রীস্টানদের সাথে বন্ধুত্বের বৈধতা প্রমাণ করে। আসলে এটা পরিষ্কার ভুল এবং কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা, যা স্পষ্ট আয়াতসমূহের পরিপন্থী। এই ব্যাখ্যা সেইসব হাদীসেরও পরিপন্থী, যাতে আহলে কিতাব (ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টান) ও অন্যান্য কাফিরদের বন্ধুত্ব থেকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে এবং তাদের সহায়তা বর্জন করতে বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«من قال في القرآن برأيه فليتبوأ مقعده من النار»

“কুরআন সম্পর্কে যে নিজের মনগড়া কথা কলবে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান ঠিক করে নেয়।”

কুরআনের এক আয়াত দিয়ে অন্য আয়াতের ব্যাখ্যা করতে হবে। কোন আয়াতের এমন কোন ব্যাখ্যা দেয়া যাবে না যা অন্যান্য আয়াতের পরিপন্থী। আর আল্লাহর মর্জি এই আয়াতটিতে খ্রীষ্টান ও অন্যান্য কাফিরদের বন্ধুত্ব নিষিদ্ধকারী আয়াতসমূহের পরিপন্থী কিছু নেই। উক্ত প্রচারক যা বলেছে তা তার ভুল বোঝার জন্য এবং আয়াতটির তাৎপর্য উপলব্ধিতে অক্ষমতার কারণে। তাছাড়া আয়াতটির ব্যাখ্যাকালে পন্ডিত, বিশ্বস্ত ও নেতৃস্থানীয় তাফসীরকারদের উক্তির সাহায্য নিতেও সে ব্যর্থ হয়েছে। তাফসীরকারকদের মতে আয়াতটির অর্থ-যা তার শব্দাবলী থেকেও পরিষ্কার বোঝা যায় এই যে, খ্রীস্টানরা ইয়াহূদী ও মুশরিকদের তুলনায় মুমিনদের বন্ধুত্বের অনেকটা কাছাকাছি। এর অর্থ এই নয় যে, তারা মুমিনদের ভালোবাসে কিংবা মুমিনরা তাদের ভালবাসে। যদি ধরেও নেয়া যায় যে, খ্রীস্টানরা মুমিনদের ভালোবেসেছে কিংবা তারা তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছে তা হলেও মুমিনরা তাদের ভালোবাসতে পারে না কিংবা তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারে না। কেননা, আল্লাহ তাদেরকে এটা নিষেধ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কিত আয়াত আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:

 ﴿ ۞يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلۡيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوۡلِيَآءَۘ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمۡ فَإِنَّهُۥ مِنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥١ ﴾ [المائ‍دة: ٥١]

“হে মুমিন ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করোনা।” [10]

﴿ لَّا تَجِدُ قَوۡمٗا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ يُوَآدُّونَ مَنۡ حَآدَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ ﴾ [المجادلة: ٢٢]

“আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী লোকদের তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের ভালোবাসতে দেখবে না।” [11]

আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, খ্রীষ্টানরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শক্রতা করেছে। তারা আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করেছে। তাহলে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসীরা কী করে তাদের ভালোবাসতে পারে কিংবা তাদের সাথে মেলামেশা করতে পারে? নাউযুবিল্লাহ। আল্লাহ আমাদেরকে লাঞ্ছনা, প্রবৃত্তিপরায়ণতা ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করুন।

আর এক প্রচারক দাবি করেছে যে, যে-সব কাফির আমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি কিংবা আমাদেরকে বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি, আল্লাহ তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখার সুযোগ দিয়েছেন। তার যুক্তি কুরআনের আয়াত:

﴿ لَّا يَنۡهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمۡ يُقَٰتِلُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ وَلَمۡ يُخۡرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمۡ أَن تَبَرُّوهُمۡ وَتُقۡسِطُوٓاْ إِلَيۡهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ ٨ ﴾ [الممتحنة: ٨]

“যারা তোমাদের সাথে দ্বীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে বাড়িঘর থেকে বের কের দেয়নি, তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।” [12]

 এ যুক্তিও আগেরটার মতই ভ্রান্ত। এটাও কুরআন সম্পর্কে মনগড়া উক্তি ও আয়াতটির ভুল ব্যাখ্যাদান। স্পষ্ট আয়াতসমূহে আল্লাহ কাফিরদের বন্ধুত্ব হারাম করে দিয়েছেন এবং তাদের সাথে মেলামেশা নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি তাদের শ্রেণীভেদের কোন তারতম্য করেন নি। কারা আমাদের সাথে যুদ্ধ করল আর কারা করল না, তিনি সে পার্থক্যও করেন নি। তাহলে আল্লাহ যা বলেন নি মুসলিম কী করে নিজের থেকে সেই ব্যাখ্যা দিতে পারে, যা কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থন করে না? সুবহানাল্লাহ, আল্লাহ কত সহিষ্ণু ! জ্ঞানীদের মতে উক্ত আয়াতটির মর্মার্থ: শন্তি-চুক্তি কিংবা মুসলিমদের বিশেষ নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের অধীন কাফিরদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও তাদেরকে দান-দক্ষিণা করার অনুমতি দান। সহীহ হাদীসে এই ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ: রাসূলুল্লাহর সাথে মক্কাবাসীদের সম্পাদিত শান্তি-চুক্তির মেয়াদের মধ্যে আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা আসমার মুশরিক মা পার্থিব কিছু সুযোগ-সুবিধার জন্য মদীনায় আসমার নিকট এসেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমাকে তাঁর মায়ের প্রতি সৌহার্দ্য দেখানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। একবার আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে একটি রেশমের জামা দান করেছিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেটি মক্কায় তাঁর মুশরিক ভাইকে উপহার পাঠিয়ে দেন। এই ধরনের অনুগ্রহ অনেক সময় ইসলাম গ্রহণ, ইসলামের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও অন্য ধর্মের তুলনায় ইসলামকে অগ্রাধিকারদানের কারণ হতে পারে। তাছাড়া এতে আত্মীয়তার সংযোগরক্ষা ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য হয়। এতে মুসলিমদের উপকার বৈ ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই। আর এটা যে আদৌ কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব নয় একটু চিন্তা করলেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়।

 জাতীয়তাবাদীরা যুক্তি দেখায়, “মুসলিম-কাফির পার্থক্য না করে আরব জাতীয়তার ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হলে আরবরা একটি শক্তিশালী ইউনিটে পরিণত হবে। ফলে শত্রু তাদেরকে ভয় করবে ও তাদের অধিকারসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। আর মুসলিমরা অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং শত্রুর লালসার শিকারে পরিণত হবে।” ওরা আরও বলে, “আরবরা যদি ইসলামের আশ্রয় নিয়ে তার পতাকাতলে সমবেত হয় তাহলে ইসলামের শত্রুরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে এবং তাদের আশু ধ্বংস কামনা করবে। কেননা শত্রুর তখন আশঙ্কা, অতীত গৌরব ফিরে পাবার জন্য আরবরা ইসলামী লড়াইকে উস্কানি দিতে পারে। পরিণামে আমাদের ক্ষতি হবে, শত্রুর সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকার ও স্বার্থ আদায় বিলম্বিত হবে, আমাদের ওপর ওদের ক্রোধ আরো বেড়ে যাবে।” এই যুক্তির জবাব: যদি মুসলিমরা ইসলামকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হয়, আল্লাহর রজ্জুকে শক্তহাতে ধরে, তার শরী‘আতের বিধান মেনে চলে এবং শত্রু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদেরকে প্রকাশ্যে শত্রু ঘোষণা করে, তবে আল্লাহই তাদের সাহায্য করবেন ও শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবেন। তিনি কাফির শত্রুর মনে এমন ভীতি সঞ্চার করবেন যাতে তারা ভয়ে মুসলিমদের অধিকারসমূহ পুরোপুরি ফিরিয়ে দেয়। তাঁদের ঈমানদার পূর্বপুরুষদের ক্ষেত্রে ঠিক যেমনটি ঘটেছিল। তাঁদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক ইয়াহূদী ও খ্রীস্টান ছিল। কিন্তু তাঁরা সেই বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব করেন নি কিংবা তাদের সাহায্য চান নি। তাঁরা বন্ধুত্ব করেছিলেন এক আল্লাহ্‌র সাথে, সাহায্য চেয়েছিলেন একমাত্র তাঁরই। যে কারণে শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহ্‌ তাঁদের সাহায্য করেছিলেন, তিনি তাঁদেরকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছিলেন। কুরআন ও সুন্নাহ এর সাক্ষী এবং ইসলামের ইতিহাসও তাই বলে। আর মুসলিম ও কাফির সবাই একথা জানে। মুশরিকদের মোকাবিলার জন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। মদীনায় তখন ইয়াহূদীরা আছে। কিন্তু তিনি তাদের সাহায্য চাইলেন না। অথচ সংখ্যায় মুসলিমরা তখনও কম এবং সাহায্যকারীর প্রয়োজন তাঁদের অনেক। আল্লাহর নবী ও মুসলিমরা কখনও ইয়াহূদীদের সাহায্য চাননি। না বদরে না উহুদে। যদিও সেসব দিনে বিশেষ করে উহুদের যুদ্ধে সাহায্যকারীর প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল। এতে পরিষ্কার প্রমাণ হয় যে, শত্রুদের সাহায্য নেয়া, তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করা কিংবা নিজেদের সেনাবাহিনীতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা মুসলিমদের জন্য জায়েয নয়। কেননা, শত্রুকে বিশ্বাস নেই। তাদের সাথে সংমিশ্রণের ফলে মুসলিমদের বড় রকম সর্বনাশ হতে পারে, তাদের নৈতিকতার পরিবর্তন এবং নিজেদের মধ্যে সন্দেহ, ঘৃণা ও শত্রুতা সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহর নবী ও ঈমানদার পূর্বপুরুষদের অনুসৃত সেই রীতি যাদের সন্তুষ্ট করতে পারছে না, আল্লাহ্‌ যেন কোনদিন তাদের সন্তুষ্ট না করেন। যেহেতু ইসলামকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হলে আল্লাহ মুসলিমদের ওপর সন্তুষ্ট হন এবং তাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য সুনিশ্চিত হয়, তাই তাদের বিরুদ্ধে অমুসলিমদের বিদ্বেষ। তাদের এই বিদ্বেষ কোন দিনও শেষ হবে না। তারা চায়, মুসলিমরা নিজেদের দ্বীন ছেড়ে দিয়ে বিধর্মীদের দলভুক্ত হয়ে যাক। মুসলিমদের একথা ভালভাবে উপলব্ধি করা উচিত। তারা যদি অমুসলিমদের ইচ্ছানুযায়ী নিজেদের দ্বীন ছেড়েই দেয় তাহলে তারা অবশ্যই ভ্রষ্ট হবে এবং কাফির হয়ে ইহ-পরকালের শাস্তি ও চরম দুর্দশার শিকার হবে।

আল্লাহ বলেন:

﴿ وَلَن تَرۡضَىٰ عَنكَ ٱلۡيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمۡۗ قُلۡ إِنَّ هُدَى ٱللَّهِ هُوَ ٱلۡهُدَىٰۗ وَلَئِنِ ٱتَّبَعۡتَ أَهۡوَآءَهُم بَعۡدَ ٱلَّذِي جَآءَكَ مِنَ ٱلۡعِلۡمِ مَا لَكَ مِنَ ٱللَّهِ مِن وَلِيّٖ وَلَا نَصِيرٍ ١٢٠ ﴾ [البقرة: ١٢٠]

“যতক্ষণ না তুমি ওদের ধর্ম অনুসরণ করবে, ইয়াহূদী ও খ্রীষ্টানরা তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবেনা। তুমি বল, আল্লাহর পথই একামাত্র পথ। আর তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে তার পরে তুমি যদি ওদের ইচ্ছানুযায়ী চল, তাহলে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য তুমি কোন বন্ধু বা সাহায্যকারী পাবে না।” [1]

﴿ وَلَا يَزَالُونَ يُقَٰتِلُونَكُمۡ حَتَّىٰ يَرُدُّوكُمۡ عَن دِينِكُمۡ إِنِ ٱسۡتَطَٰعُواْۚ وَمَن يَرۡتَدِدۡ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَيَمُتۡ وَهُوَ كَافِرٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٢١٧ ﴾ [البقرة: ٢١٧]

“তারা তোমাদের সাথে লড়তেই থাকবে; যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করে। অবশ্য তারা যদি তা করতে সক্ষম হয়। আর তোমাদের মধ্যে যারা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে কাফির অবস্থায় মারা যাবে, তাদের ইহ-পরকালের সকল কাজ নষ্ট হয়ে গেল। তারা জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” [2]

﴿ ثُمَّ جَعَلۡنَٰكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡرِ فَٱتَّبِعۡهَا وَلَا تَتَّبِعۡ أَهۡوَآءَ ٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَ ١٨ إِنَّهُمۡ لَن يُغۡنُواْ عَنكَ مِنَ ٱللَّهِ شَيۡ‍ٔٗاۚ وَإِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۖ وَٱللَّهُ وَلِيُّ ٱلۡمُتَّقِينَ ١٩ ﴾ [الجاثية: ١٨، ١٩]

“অতঃপর তিনি তোমাকে দ্বীনের একটি বিধান দান করলেন। তুমি তা অনুসরণ কর, আর যারা জানে না তাদের ইচ্ছানুসারে চলো না। তারা আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষায় তোমার এতটুকু উপকার করবে না। জালিমরা একে অপরের বন্ধু, আর মোত্তাকীদের বন্ধু আল্লাহ।”[3]

এসব সুস্পষ্ট আয়াতে আল্লাহ পরিস্কার বলে দিয়েছেন যে, কাফিররা আামাদের শরী‘আত ছেড়ে ওদের পথ অনুসরণ না করা পর্যন্ত আমাদের ওপর কখনও সন্তুষ্ট হবেনা। ওরা আমাদেরকে আমাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত না করা পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই থামাবে না। এসব আয়াতের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমরা যদি ওদের কথা ও মর্জি রক্ষা করে চলি এবং সে অবস্থায় আমাদের মৃত্যু হয় তা হলে চিরকাল আমাদের জাহান্নামে থাকতে হবে। আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, যেসব কাজে তিনি অসন্তুষ্ট এবং যেসব কাজে তাঁর শাস্তির কারণ নিহিত, তিনি যেন আমাদের সেসব কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন।

কুরআনী আইনের বিরোধিতা

আরব জাতীয়তাবাদ প্রচার নিষিদ্ধ হবার চতুর্থ কারণ এই যে, এই প্রচারের ফলে কুরআনের আইন প্রত্যাখ্যান করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কারণ, অমুসলিম জাতীয়তাবাদীরা স্বভাবতই কুরআনের আইন মানতে রাজি হবে না। যে কারণে জাতীয়তাবাদের নেতারা কুরআন বিরোধী এমন কতিপয় বানানো আইন প্রবর্তন করতে বাধ্য হবে যা জাতীয়তাবাদী সমাজের সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে। ঐ নেতাদের অনেকে কথাটি প্রকাশ্যেই বলেছে। নি:সন্দেহে এটা পরিষ্কার কুফ্‌র ও দ্বীনকে পরিত্যাগ করার নামান্তর। আল্লাহ বলেছেন:

﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء: ٦٥]

“তোমার প্রতিপালকের শপথ, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিরোধ মীমাংসার জন্য সম্পূর্ণ কুন্ঠাহীন চিত্তে তোমাকে বিচারক মেনে পুরোপুরিভাবে তোমার রায় মেনে না নেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার বলে বিবেচিত হবেনা।”[4]

﴿ أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ ٥٠ ﴾ [المائ‍دة: ٥٠]

“তারা কি তাহলে জাহেলিয়াতের আইন চায়? বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ট আইনদাতা কে আছে? ”[5]

 ﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [المائ‍دة: ٤٤]

“যারা আল্লাহর দেয়া আইন অনুযায়ী শাসন করেনা, তারা কাফির।”[6]

﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [المائ‍دة: ٤٥]

“যারা আল্লাহর দেয়া আইন অনুযায়ী শাসন করেনা, তারা জালিম।” [7]

﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧ ﴾ [المائ‍دة: ٤٧] “যারা আল্লাহর দেয়া আইন অনুযায়ী শাসন করেনা, তারা ফাসিক।”[8]

যে রাষ্ট্র আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা চালায় না এবং আল্লাহর আইন মানে না, সে রাষ্ট্র জাহেলী রাষ্ট্র, এসব স্পষ্ট আয়াত অনুযায়ী সে রাষ্ট্র কাফির, জালিম ও ফাসিক রাষ্ট্র। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রশ্নে সেদেশের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা ইসলামের অনুসারীদের জন্য অপরিহার্য। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে তাঁর বিধান অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা না চালানো পর্যন্ত ঐ দেশের সাথে বন্ধুত্ব করা মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আল্লাহ বলেন:

﴿ قَدۡ كَانَتۡ لَكُمۡ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ فِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذۡ قَالُواْ لِقَوۡمِهِمۡ إِنَّا بُرَءَٰٓؤُاْ مِنكُمۡ وَمِمَّا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ كَفَرۡنَا بِكُمۡ وَبَدَا بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةُ وَٱلۡبَغۡضَآءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ وَحۡدَهُۥٓ ﴾ [الممتحنة: ٤]

“ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মাঝে তোমাদের জন্য এক সুন্দর আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের কওমকে বলে দিয়েছিল: তোমাদের সাথে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত করছ তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের নীতি ও আদর্শের সাথে বিরোধ ঘোষণা করলাম এবং আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সূচিত হল, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।”[9]

অতএব জাতীয়তাবাদের নেতা ও প্রচারকদের উচিত আত্মসচেতন হওয়া এবং তাদের এই প্রচারের অশুভ ও মারাত্মক পরিণতির কথা চিন্তা করা। তাদের উচিত জাতীয়তা কিংবা স্বদেশিকতা প্রচারের পরিবর্তে সর্বশক্তি নিয়োগ করে ইসলাম প্রচার করা ও লোকদের মাঝে ইসলামের সৌন্দর্যসমূহ ছড়িয়ে দেয়া এবং ইসলামের বিধানসমুহ শক্তহাতে ধরে তার শাসনব্যবস্থার প্রতি লোকদের আকৃষ্ট করে তোলা। তাদের জানা উচিত যে, দ্বীনের পথে ফিরে না এলে কিংবা নিজেদের বিরোধ মীমাংসায় দ্বীনের সিদ্ধান্ত না মানলে আল্লাহ তাদের ওপর প্রতিশোধ নেবেন, তাদের ঐক্য বিচ্ছিন্ন করে দেবেন এবং তাঁর নিয়ামত থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করবেন। অতঃপর তাদের জায়গায় আর একদল লোক পাঠাবেন যারা তাঁর দ্বীনকে শক্তহাতে ধরবে ও দ্বীনের বিরোধী শক্তির সাথে লড়াই করবে। আল্লাহ যেমন বলেছেন:

﴿ وَإِن تَتَوَلَّوۡاْ يَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَيۡرَكُمۡ ثُمَّ لَا يَكُونُوٓاْ أَمۡثَٰلَكُم ٣٨ ﴾ [محمد: ٣٨]

“আর তোমরা যদি বিপথে যাও তাহলে তিনি তোমাদের জায়গায় অন্য একদল লোক পাঠাবেন। তারা তোমাদের মত হবে না।”[10]

﴿ فَلَمَّا نَسُواْ مَا ذُكِّرُواْ بِهِۦ فَتَحۡنَا عَلَيۡهِمۡ أَبۡوَٰبَ كُلِّ شَيۡءٍ حَتَّىٰٓ إِذَا فَرِحُواْ بِمَآ أُوتُوٓاْ أَخَذۡنَٰهُم بَغۡتَةٗ فَإِذَا هُم مُّبۡلِسُونَ ٤٤ فَقُطِعَ دَابِرُ ٱلۡقَوۡمِ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْۚ وَٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٤٥ ﴾ [الانعام: ٤٤، ٤٥]

“তাদের যা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলেই গেল তখন আমরা তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে অনেককিছু পেয়ে তারা যখন বেশ খুশী, তখন আমরা হঠাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। অমনি তারা দিশেহারা হয়ে পড়ল। এভাবে জালিম লোকদের শিকড় কেটে ফেলে হল। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক।”[11]

সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إن الله ليملي للظالم حتى إذا أخذه لم يفلته»

“জালিমকে আল্লাহ্‌ কিছুটা ঢিল দেন। তারপর যখন ধরেন, তখন আর ছাড়েন না।”

এই কথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত পাঠ করেন:

﴿ وَكَذَٰلِكَ أَخۡذُ رَبِّكَ إِذَآ أَخَذَ ٱلۡقُرَىٰ وَهِيَ ظَٰلِمَةٌۚ إِنَّ أَخۡذَهُۥٓ أَلِيمٞ شَدِيدٌ ١٠٢ ﴾ [هود: ١٠٢]

 আর আল্লাহর ধরা এমনই হয়ে থাকে, যখন তিনি জালিম জনবসতিগুলোকে ধরেন। তাঁর ধরা বড় যন্ত্রনাদায়ক, বড় কঠোর।”[12]

অতএব জাতীয়তাবাদীদের উচিত আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর নিকট তাওবা করা এবং আল্লাহর নিয়ামতের জন্য তাঁর শোকর আদায় করা। সাথে সাথে তাদের উচিত আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদনুযায়ী নিজেরা চলা ও অন্যদের চলতে বলা এবং এর বিপরীত পথ থেকে লোকদের সাবধান করে দেয়া। বস্তুত: এ পথেই রয়েছে সামাজিক কল্যাণ এবং মানসিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি। এ পথেই ইহ-পরকালের সম্মান ও সুখ রয়েছে, রয়েছে আল্লাহর আযাব থেকে নিষ্কৃতির গ্যারান্টি। এর বিপরীত যেসব প্রচার, তার পরিণতি জাহান্নাম, মানসিক অশান্তি আর সামাজিক অস্থিরতা। তাতে শত্রুর প্রতিপত্তি বেড়ে যায় এবং সুখ ও ইহকাল-পরকালের নিরাপত্তা হারাতে হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:

﴿ فَإِمَّا يَأۡتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدٗى فَمَنِ ٱتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشۡقَىٰ ١٢٣ وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِكۡرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحۡشُرُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ أَعۡمَىٰ ١٢٤ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِيٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرٗا ١٢٥ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ ١٢٦ وَكَذَٰلِكَ نَجۡزِي مَنۡ أَسۡرَفَ وَلَمۡ يُؤۡمِنۢ بِ‍َٔايَٰتِ رَبِّهِۦۚ وَلَعَذَابُ ٱلۡأٓخِرَةِ أَشَدُّ وَأَبۡقَىٰٓ ١٢٧﴾ [سورة طه: 123-127]

“তোমাদের কাছে আমার হেদায়েত আসবে। যে আমার হেদায়েত অনুযায়ী চলবে সে বিভ্রান্ত কিংবা অসুখী হবে না। আর যে আমার বিধান সম্পর্কে অমনোযোগী থাকবে, তার জন্য রয়েছে এক কষ্টসাধ্য জীবন। আর আমরা তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠাব। সে বলবে, হে প্রভু! আমিতো দৃষ্টিমান ছিলাম, আমাকে অন্ধ করে উঠিয়েছ কেন? তিনি বলবেন, তোমার কাছে আমাদের নিদর্শনসমূহ এসেছিল, তুমি তা ভূলে গিয়েছিলে। ঠিক তেমনি তোমাকেও আজ ভুলে যাওয়া হচ্ছে। যে সীমা লংঘন করে এবং তার প্রভূর নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করে না, আমরা তার এরকমই প্রতিদান দিয়ে থাকি। পরকালের আযাব অত্যন্ত কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী।” [13]

 এসব আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন যে, যে তার পথ অনুসরণ করবে, সে বিভ্রান্ত কিংবা অসুখী হবে না বরং তার ভাগ্যে সুপথ ও ইহকালের সুখ রয়েছে। আর যে তাঁর বিধান সম্পর্কে অমনোযোগী হবে তার জন্য রয়েছে পৃথিবীতে এক কষ্টসাধ্য জীবন, আর পরকালে অন্ধত্ব ও শাস্তি। পৃথিবীতে জীবনের কষ্ট বলতে, মনের আঁধার ও অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও সংশয়, পার্থিব সম্পদ অন্বেষণ ও সংরক্ষণে নানান কষ্টক্লেশ, তার ঘাটতি ও হারানোর আশঙ্কা এবং এ ছাড়া নানারকম তাৎক্ষণিক শাস্তি যা ইসলামের শত্রুরা পৃথিবীতে ভোগ করছে। আল্লাহ বলেছেন:

﴿ فَلَا تُعۡجِبۡكَ أَمۡوَٰلُهُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُهُمۡۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَتَزۡهَقَ أَنفُسُهُمۡ وَهُمۡ كَٰفِرُونَ ٥٥﴾ [سورة التوبة: 55]

“তাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি যেন তোমাকে মুগ্ধ না করে। আল্লাহর ইচ্ছা, ঐসব দিয়ে পার্থিব জীবনে তাদের শাস্তি দিবেন, আর কাফির অবস্থায় তাদের প্রাণ চলে যাবে।”[14]

﴿ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ ٱلۡأَدۡنَىٰ دُونَ ٱلۡعَذَابِ ٱلۡأَكۡبَرِ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٢١﴾ [سورة السجدة: 21]

“বৃহত্তর শাস্তির পূর্বে আমরা তাদের ক্ষুদ্রতর শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।” [15]

এ প্রসঙ্গে বহু আয়াত রয়েছে। আল্লাহর কাছে আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের অন্তর সংশোধন করে দেন, আমাদের পাপগুলো চিনিয়ে দেন, পাপ থেকে তওবা করার সুযোগ দিয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং আমাদেরকে ও আমাদের সকল ভাইদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম। আসুন আমরা প্রখ্যাত মিসরীয় লেখক মুহাম্মাদ আল-গাযালীর জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত চমৎকার কিছু কথা উদ্ধৃত করে আলোচনা এখানেই শেষ করি। তিনি তাঁর مع الله (আল্লাহর সাথে) নামক গ্রন্থের ২৫৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন:

মুহাম্মাদ আল-গাযালীর মন্তব্য

“এই লোকগুলো কারা? এরা না আরব না অনারব, আবার না রাশিয়ান না আমেরিকান। আসলে এরা নির্লজ্জ গলাবাজ অদ্ভুত স্বভাবের এক বিকৃত মনুষ্যরূপ। এদের কারণে এদেশের আজ মহাবিপদ। এদেশে সাম্রাজ্যবাদের অপকীর্তি এবং দেশবাসীর চিন্তা ও চেতনায় তার বীজ রেখে যাবার পরই এই বিপদের উদ্ভব হয়েছে। হাদীস অনুযায়ী এরা আমাদের বংশোদ্ভূত, আমাদেরই ভাষায় কথা বলে। তবে এরা আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির দুশমন, আমাদের সংগ্রাম ও জাগরণের পথে অন্তরায়। আমাদের দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের এরা সহায়ক। এরা দ্বীন ও তার অনুসারীদের বেঁচে থাকার অধিকার স্বীকার করে না। এই লোকগুলো হঠাৎ করে গজিয়েছে। ব্যাঙের ঘ্যানর-ঘ্যানর ডাক যেমন রাতের প্রহরগুলো ভরে দেয়, তেমনি এদের বিরক্তিকর চিৎকার ধ্বনি চারদিক ভরে ফেলেছে। এদের গোপন অভিলাষ ফাঁস হওয়া উচিত। জনগণ যাতে ধোঁকা না খায় বা মিথ্যায় প্রতারিত না হয় সেজন্য তাদের নিকট এদের আসল পরিচয় পরিষ্কার হওয়া উচিৎ। এই লোকগুলো আরবত্বের লেবেল এঁটে মুজাহিদদের কাতারে ঢুকে পড়েছে এবং আরব জাতীয়তাবাদের সুসংবাদদাতা ও তাঁর ঝান্ডা বহনকারী বলে নিজেরা দাবি করছে। একই সময়ে তারা আরব ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে আরও মারাত্মক কিছু করার চেষ্টা করছে এবং ঈমান ও তার মিশনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। লোকগুলোর কুৎসিত চেহারা উম্মোচন করে জনসমক্ষে তাদের সব কার্যকলাপ প্রকাশ করে দেয়া উচিত। তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্দেশ মোতাবেক কুরআন ও তার মহান ধারক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইব্‌ন আবদুল্লাহর মিশন ধ্বংস করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের সে কাজের তিক্ত পরিণাম প্রত্যক্ষ করার জন্য দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আমরা ওদের লেখা পড়েছি, কথা শুনেছি। ওদের উদ্দেশ্য বুঝতে আমাদের ধীশক্তির প্রয়োজন হয় নি। ওরা ধর্মত্যাগী, ওরা প্রকাশ্য কুফর ব্যক্তকারী। ওরা খোলাখুলি বলে: ইসলাম একটি আরব রেনেসাঁমাত্র, যার কল্যাণে মধ্যযুগে এই মহান জাতি বিস্ফোরিত হয়েছিল। এবং সেই প্রচন্ড বিস্ফোরণে সে এক প্রতিভাবান ব্যক্তির নেতৃত্বে গোটা বিশ্বকে দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি হলেন সেই বড় নেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থাৎ এই মহান দ্বীন মাটি থেকেই গজিয়েছে, আসমান থেকে আসেনি। এই দ্বীন এক উচ্চাভিলাষী বিজয়ী জাতির সূচনামাত্র। ওরা স্বীকার করতে চায় না যে, ইসলাম একটি একান্ত আদর্শ, যা জাহেলিয়াতের কলঙ্কময় অবস্থা থেকে উদ্ধার করে আরবদেরকে একটি উদার ও সরল-সত্য ধর্মব্যবস্থায় উন্নীত করেছিল এবং তারপর ক্রমেই ইসলামের আলোকরশ্মি পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল নির্বাচন করে এবং তাঁকে সত্য ও সৎপথে দান করে আরবদের এই মর্যাদায় ধন্য করেছেন।

আল্লাহ বলেছেন:

﴿ مَا كُنتَ تَدۡرِي مَا ٱلۡكِتَٰبُ وَلَا ٱلۡإِيمَٰنُ ﴾ [سورة الشورى: 52]

“তুমি জানতেনা কিতাব কি আর ঈমান কি।”[16]

﴿ وَأَنزَلَ ٱللَّهُ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمۡ تَكُن تَعۡلَمُۚ﴾ [سورة النساء: 113]

“আল্লাহ তোমার কাছে কিতাব নাযিল করলেন, তোমাকে হিকমত দান করলেন এবং তুমি যা জানতে না তোমাকে তা-ও শেখালেন।”[17]

যে আরবদের মাঝে তাঁকে রাসূল করে পাঠানো হল তাদের প্রসংগে আল্লাহ বলেন:

﴿ لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤﴾ [سورة آل عمران: 164]

“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কেননা তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের জন্য একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শোনান এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা পরিষ্কার বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিল।”[18]

‘ইসলাম একটি আরব বিস্ফোরণ’ কথাটি মিথ্যা ও মারাত্মক এক বিভ্রান্তি। এ উক্তি শুধু ইসলামকেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না, বরং এ এক ভয়াবহ অপপ্রচার, যার উদ্দেশ্য সকল ধর্মকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং সারা পৃথিবীতে কুফ্‌র ও পাপাচার ছড়িয়ে দেয়া। তবে চমৎকার ব্যাপার এই যে, এই লোকগুলো কঠোরভাবে ইসলামের বিরোধিতা ও সর্বশক্তি নিয়োগ করে ইসলামের অনুসারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও অন্যান্য ধর্মের সাথে এরা আপোস করে চলে। যেন ইসলামই একমাত্র শত্রু যার মুলোৎপাটন করার জন্য তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে। তাও নয়, বরং ইসলামই যেন একমাত্র দুরারোহ গিরিপথ যাকে মাটি ফেলে সমতল করার জন্য তাদের হাতে কোদাল দেয়া হয়েছে। তাইতো। ইসলাম ছাড়া এদেশে সাম্রাজ্যবাদের আর কোন শত্রু আছে কি? কঠোর প্রতিরোধের উৎস ও সাহসী সংগ্রামের প্রাণ তো একমাত্র ইসলামই, যে তার আক্রমণকারীদের আশাহত করেছে এবং তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে। অতএব ইসলামকে হত্যা করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার চারপাশে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করবেইতো। এই দ্বীনের অস্তিত্ব বিনাশ করার উদ্দেশ্যে এই শক্তি ইতিপূর্বে বিভিন্ন পন্থায় নানারকম সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু সংঘর্ষে ইসলামের সামনে সেগুলোর পতন ঘটলে সাম্রাজ্যবাদ তার অনুসারীদের আরব জাতীয়তার পতাকাতলে আশ্রয় দিয়ে তাদেরকে নানাপ্রকার ছলচাতুরী শিখিয়ে দেয়। যাতে তারা নিরীহ আরবদের এই ময়দানে ঠেলে দিয়ে ভিন্ন উপায়ে ইসলামের ক্ষতি করতে পারে। এদেরকে আরব জাতীয়তার অনুসারী না বলে বরং হিব্রু জাতীয়তার অনুসারী নামে আখ্যায়িত করা উচিত। এরা কি আসলে সাম্রাজ্যবাদ ও ইস্রাইলের স্বার্থে কাজ করছে না ? ইসলামের সাথে আরবত্বের চৌদ্দটি শতাব্দ একত্রে কেটেছে। আমাদের ঈমানপন্থীদের ভাষায় চৌদ্দশ বছর ধরে আল্লাহ আরবদেরকে ইসলামের এই পবিত্র আমানত বহন করার এবং লোকদের নিকট তা পৌঁছে দেবার সৌভাগ্য দান করেছেন। সুদূর অতীতের পানে একটিবার তাকালে আমরা অনায়াসে দেখতে পাই যে, ইসলামের পূর্বে যুগের পর যুগ আরবদের উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পর এরই কল্যাণে ইতিহাসে তাদের স্থান হল। ইসলামেরই পতাকাতলে তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। আল্লাহ সত্যই বলেছেন:

﴿ وَإِنَّهُۥ لَذِكۡرٞ لَّكَ وَلِقَوۡمِكَۖ وَسَوۡفَ تُسۡ‍َٔلُونَ ٤٤﴾ [سورة الزخرف: 44]

“তোমার ও তোমার জাতির জন্য তা একটি মর্যাদার বিষয়। আর তোমাদেরকে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।”[19]

কিন্তু তারপর আরবরা ভুল করল। তারা মনে করে বসল, এই বিশ্বজনীন ধর্ম তাদেরকে বিশেষ কিছু মর্যাদা দেয় এবং অন্যান্য লোকদের তুলনায় তাদেরকে উন্নততর জাতিতে পরিণত করে। এই ভুল থেকে তার অপরিহার্য প্রতিক্রিয়ার জন্ম হল। অন্যান্য জাতিও তাদের নিজ-নিজ জাতিগত মর্যাদা রক্ষায় দাঁড়িয়ে গেল। এসব ভুল-পাল্টা-ভুলের কারণ, জাহেলিয়াতের প্রতি মানুষের একটি স্বভাবজাত টান রয়েছে এবং মানবিক পূর্ণতা অর্জনের সাধনা তাদের কাছে কষ্টকর মনে হয়। কোন নির্বোধ ব্যক্তি যখন ধর্মপারায়ণ হয়ে নিজের কাজ দিয়ে সম্মান ও মর্যাদা অর্জনকে কষ্টসাধ্য মনে করে, তখন সে কোন পরিবার, দেশ কিংবা কোন জাতির সাথে কোন প্রকার সূত্র আবিষ্কার করতে আরম্ভ করে, যদ্বারা সে বিনা চেষ্টায় ওপরে ওঠতে পারে। এগুলো সবই মূলত: গোঁড়ামী আর হীনমন্যতা। ধর্মে এর কোন স্থান নেই। রব্বুল আলামীনের নিকটও এর কোন মূল্য নেই। তবে আগেকার আরবরা গর্বের প্রতিযোগিতা কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে গিয়ে ইসলামের ওপর ভর করত। ইসলামের নাম নেয়া ছাড়া তাদের বলার মত কিছুই ছিলনা। কেননা ভান্ডার তাদের খালি, ইতিহাস তাদের শূণ্য। কিন্তু এ যুগের মিথ্যুকরা নতুন কথা নিয়ে এল, যা কোনদিন কেউ শোনেনি। তাদের দৃষ্টিতে আরবত্ব ঈমান থেকে স্বতন্ত্র হতে হবে। আল্লাহ তাদের অমঙ্গল করুন, তারা দাবি করেছে যে, ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেই আরবত্ব ওপরে ওঠে, এগিয়ে চলে। এই চক্রের একজন লেখকতো এতখানি বলে ফেলেছে যে, “ইসলাম আরবত্বের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে; ইসলাম যতদূর ছড়িয়েছে তার চেয়ে বেশী ছড়িয়েছে আরবী ভাষা; ইসলাম যেহেতু বিশ্বধর্ম তাই সে আরব জাতীয়তার জন্য ক্ষতিকারক।” ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব উক্তি পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় সমানভাবে সহায়তা যোগায়। উক্তিকারী বস্তুত: সেই আগ্রাসনকারীদের অশুভ লক্ষ্যের পৃষ্ঠপোষক, যাদের সৈন্যরা ইতোমধ্যেই কোন কোন আরব ভূমিতে শিবির গেড়ে আরবদের অমর্যাদা করেছে কিংবা কোন কোন সীমান্তে তাদের চরম সর্বনাশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

 এই দলের আরেকজন লেখক আমাদেরকে অতীত ভুলে গিয়ে কেবলমাত্র ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকতে পীড়াপীড়ি করছে। কারণ, তার মতে অতীত শুধু মৃতের ধ্বংসাবশেষ জড়ো করে। এই ছোকরা ভুলে গেছে যে, ইয়াহূদীরা তাদের ইতিহাসের প্রেরণায় মধ্যপ্রাচ্যের বুকের মধ্যে নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। সব মানুষই তাদের সংগ্রামে নিজেদের ইতিহাসকে সঙ্গে রাখতে পারে। কিন্তু আমরা মুসলিমরা? আমাদের জন্য কি এই ইতিহাসের কোন অধ্যায় স্মরণ করা কিংবা তার শিক্ষা গ্রহণ করা হারাম? এহেন জাতীয়তা আসলেই হিব্রু জাতীয়তা, আরব জাতীয়তা নয়। এটা সেই জাতীয়তা যা ধর্মবিরোধী ও ইসলাম বিদ্বেষীরা প্রচার করছে। সবাই জানে যে, আমরা মুসলিমরা আরবত্বের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং তার সম্মান ও সমস্যাবলীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদীদের মাঝে কোন কল্যাণ নেই। এরা বিরাট অকল্যাণ ও গুরুতর অনিষ্টের উৎস।” মুহাম্মাদ আল-গাযালী তাঁর উল্লিখিত গ্রন্থের ৩৪৭ পৃষ্ঠায় বলেন:

“সম্ভব সকল উপায়ে সাম্রাজ্যবাদ চেষ্টা করছে মুসলিমদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করতে ও তাদের দেশের জাগ্রত মুক্তি আন্দোলনগুলোকে দ্বীনের সাথে সম্পর্কহীন রাখতে, যাতে প্রতিটি আন্দোলন থেকে একটি মৃত সন্তান জন্মলাভ করে, অথবা আন্দোলনটি এক বন্ধ্যা নারীর মত বেঁচে থাকে। পূর্ববর্তী প্রতিটি আন্দোলনের একটি খুঁটি ছিল, যার ওপর আন্দোলনটি ভর করে দাঁড়াতে এবং একটি আত্মিক শক্তি ছিল যার সাহায্যে সে নড়াচড়া করত। আর যেহেতু ঐ স্থানে দ্বীন ক্রিয়াশীল ছিল, তাই মানুষের হৃদয়কে সে বিবেক ও নৈতিকতাভিত্তিক চরিত্রে ভরপুর করেছিল। জীবনকে সে শাশ্বত ঐতিহ্য ও সুন্দর বৈশিষ্ট্যে রঙীন করেছিল এভং ভিন্ন ভিন্ন দলকে যৌথ উপলব্ধির ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ করে একই গন্তব্যে পরিচালিত করেছিল। কিন্তু আজ দ্বীন আর সেই অবস্থায় নেই। সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য যেহেতু সব দেশ থেকে দ্বীনকে বিতাড়িত করে পর্যায়ক্রমে দ্বীনের সাথে পরিচয়বিহীন নতুন যুগের সৃষ্টি করা, তাই মুসলিমদের দ্বীনের বিরুদ্ধেও তার এই ষড়যন্ত্র ও বৈরী তৎপরতা। ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ প্রসংগ ও বড় বড় কাজের ক্ষেত্রে ইসলামের কথা স্বরণ করাও যেন পাপ। কেউ কেউ তার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করলেও ইসলামকে প্রকাশ্যে ব্যক্ত করতে ভয় পায়। ইসলাম যেন এক ফেরারী আসামী। কোন অপরাধ করার পর বিচারে তার বিরুদ্ধে শান্তির রায় হওয়ায় সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সে জনসমক্ষে বের হতে পারছে না। কখনও ছদ্মবেশে ছদ্মনামে বের হবার সামান্য সুযোগ পেয়ে এখানে ওখানে একটু নড়াচড়া করলেও যখন তার কথা জানাজানি হচ্ছে বলে অনুভব করে তখন আবার লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। ইসলামের এই লাঞ্ছনা কিসের জন্য? এ প্রশ্নের জবাব আছে সাম্রাজ্যবাদের কাছে। সাম্রাজ্যবাদের অভিপ্রায়, নিজের দেশে ইসলামের কোন খুঁটির জোর না থাকুক। শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা, আইনকানুন তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সে ইসলামকে গলাটিপে হত্যা করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদ একটিমাত্র সমাজে আশ্বস্ত বোধ করে। তা সেই সমাজ যার প্রাণ মরে গেছে ও চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে, যে সমাজ থেকে মর্যাদাবোধ বিলুপ্ত হয়েছে এবং যেখানে লোভপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ও স্বার্থপরতার বিষাক্ত সাপ ফণা তুলেছে। কেবলমাত্র এই রকম সমাজেই সাম্রাজ্যবাদ বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য আশ্বস্ত বোধ করে। তাই যখন ইসলাম এসে সব আবর্জনা মুছে ফেলতে চাইল, অমনি তাকে তৎক্ষণাৎ নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে বলা হল। যেন ইসলাম একটি নাম যা মুখে নেয়া যাবে না এবং একটি বাস্তব যার বেঁচে থাকার অধিকার নেই।

সাম্রাজ্যবাদ এই বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এরপর এল আরববাদ। আমরা এই মতবাদে পুলকিত হলাম এবং এর মাধ্যমে সুফল লাভের আশা করলাম। শুধু আরবত্বেরও কিছু কিছু রূপকথা আছে যা সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু বিদেশী দখলের ছত্রছায়ায় পরিচালিত শিক্ষ-ব্যাবস্থা এমন কিছু লোক সৃষ্টি করেছিল যারা প্রবৃত্তির তাড়নায় চালিত হত এবং যাদের অন্তরে আত্মবিশ্বাস বলতে কিছুই ছিল না। এহেন লোকদের কাছে যখন আরববাদ এল তখন তারা জানতেই পারলনা যে, সচ্চরিত্রতা, আত্মমর্যাদাবোধ, পবিত্রস্থান সংরক্ষণ ইত্যাদি গুণাবলী আরবত্বেরই বৈশিষ্ট্য। প্রাক-ইসলামী যুগে প্রচলিত আরবদের প্রবাদসমূহ প্রমাণ করে, নারীর প্রতি আরবদের শ্রদ্ধাবোধ কত প্রগাঢ় ছিল। যেমন একটি প্রবাদবাক্য : كل ذات صدر خالة “ব্লাউজ পরিহিতা সকলেই খালা।” অর্থাৎ নারীদের পোশাক পরা সবাইকে আরবরা খালা গণ্য করত। তাই তারা তাদের দিকে শ্রদ্ধা ছাড়া অন্য দৃষ্টিতে তাকাত না। কারণ, খালা মায়ের মতই শ্রদ্ধাভাজন। কবি আনতারা বলেছেন: ‘আমার প্রতিবেশিনী কখনও আমার সামনে পড়ে গেলে আমি আমার দৃষ্টি নীচু করে রাখি, যতক্ষণ না প্রতিবেশিনী তার ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়।’

তাহলে আজকের অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত লোকদের পথ কি আসলে আরবদের পথ? কিংবা রূপের পসরা সাজিয়ে লোকদের আকর্ষণকারী যুবতীর হাত ধরে রাস্তায় চলা লোকগুলো কি সত্যিকার অর্থে আরব? আগেকার আরবরা ছিলেন সময়ের প্রতিকূলতা ও তীব্র অভাব অনটন সত্ত্বেও আশ্চর্য রকম উদার, স্বার্থত্যাগের উজ্জ্বল প্রতীক এবং কঠোর সত্যাশ্রয়ী। উর্‌ওয়া ইব্‌ন আল-ওয়ারদ কি বলেছেন শুনুন:

‘আমি সেই লোক যার বাসন অনেককে তৃপ্ত করে। আর তুমি সেই লোক যার বাসন তৃপ্ত করে একজনকে।’

‘তুমি নিজে বেশ মোটা-তাজা বলে এবং আমার মুখে সত্যের ক্লান্তি দেখে আমার সাথে ঠাট্টা করছ? সত্যতো চিরদিন কষ্টেরই হয়।’

‘আমি আমার দেহকে অনেক দেহের মাঝে বন্টন করে দেই এবং খাঁটি ঠান্ডা পানি চুমুক দিয়ে পান করি।’

 নিজের খাবার অন্যকে দিয়ে কয়েক ফোটা ঠান্ডা পানি পান করতে করতে চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, আগন্তুক মেহমানদের কোন রকম অযত্ন হোক তা চায়না এবং নিজের এই ত্যাগকে অনেক দেহের মাঝে নিজের দেহ বন্টন করে দেয়া মনে করে এমন কোন মহৎ লোকের চেহারা দেখেছেন কখনো? এরকম একটি চেহারা চোখের সামনে কল্পনা করুন। তারপর নিজের কাছে প্রশ্ন করুন: এইযে ক্রমবর্ধমান ধনসম্পদের অধিকারী লোকে পরিপূর্ণ শহরগুলো দেখেছেন, এগুলো কি আরব শহর? এত ধনসম্পদ সত্ত্বেও আপনি অনাথকে কতটুকু দিচ্ছেন? কিংবা বঞ্চিতকে কতটুকু খাওয়াচ্ছেন? পরিবেশকে বিকৃত করে সাম্রাজ্যবাদ যেখানে পশুত্বের ছাপ লাগিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে আমাদের হারিয়ে যাওয়া আরব বৈশিষ্ট্যাবলী খুঁজে বের করা এখন সাধ্যের অতীত। আশ্চর্যের ব্যাপার, বেতার প্রচারক পর্যন্ত বিশুদ্ধ ভাষার পরিবর্তে ইতরের ভাষা ব্যবহার করে বসে। কারণ, সে চায় এই ইতরের ভাষা টিকিয়ে রাখতে এবং বিশুদ্ধ আরবী ভাষাকে বদলে ফেলতে। অথচ বিশুদ্ধ ভাষাতেই বিশ্বের সকল কেন্দ্র থেকে শ্রোতাদের জন্য তাদের আঞ্চলিক ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হয়ে থাকে। আর যদি কোন কেন্দ্র অশুদ্ধ ভাষায় তার শ্রোতাদের সম্বোধন করও, তাতে কি আমরা ইতরের ভাষায় অনষ্ঠান প্রচার করলে আমাদের আরবত্বের প্রতি কোন প্রদ্ধাবোধ প্রকাশ হয়?

আসলে একমাত্র ইসলাম আরবদের ভাষা, আচরণ ও চরিত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এবং ধর্মকে বদলে দেবার অর্থ ভাষা, আচরণ ও চরিত্রের দিক থেকে আরবত্বের মৃত্যু ঘোষণা। অতএব প্রচারকদের উচিত ইসলামের নাম প্রকাশ করার জন্য ততখানি আত্মত্যাগ করা যতখানি আত্মত্যাগ একে গোপন রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদ করে থাকে। তাদের উচিত এই নাম সম্পর্কে শত্রুরা যে দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি করে রেখেছে তা অপসারণ করা, যাতে তা সকলের কানে ও অন্তরে ভাল লাগে। এই নামকে প্রকাশ করলেই যথেষ্ট হবে না। কেননা যে আকৃতির মাঝে সারবস্তু নেই তার কোন মূল্য নেই। প্রচারকদের তাই কর্তব্য সাধারণ মানুষকে ইসলামের শিক্ষানুযায়ী সংঘবদ্ধ করা এবং নিজেদেরকে তার প্রাণশক্তিতে প্রাণময় করে তোলা।

দ্বীনের প্রাণশক্তিতে মানুষ আল্লাহকে ভয় করে ও তার সৃষ্টির প্রতি সদয় হয়, কর্তব্যকে কর্তব্য মনে করে ও অন্যায়কে বর্জন করে চলে এবং সত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করার সৎসাহস লাভ করে ও আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি হিসেবে সকল ব্যাপারে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করে। অতএব আমাদের উচিত দ্বীনের এই প্রাণ শক্তিকে সযত্নে লালন করা এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে এই শক্তি উজ্জীবিত করে তোলা। ইসলাম একটি মহাপ্রাণ, যার যোগসূত্র আল্লাহর সাথে। যেখানেই থাকুক সে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য তৎপর থাকে ও তাঁকে ভয় করে। ইসলামের এই প্রাণ নিজে নিজে সৃষ্টি হয় না, কিংবা যে সংশয় ও অজ্ঞতার জোয়ার ইসলামকে গ্রাস করে আছে তার মধ্য থেকে এই প্রাণ আপনা আপনি সৃষ্টি হওয়া সম্ভবও নয়। এই প্রাণ শক্তির জন্য ইসলামকে কতগুলো নিয়মতান্ত্রিক আত্মার খোরাক দিতে হয়। শিক্ষা-কার্যক্রম, মসজিদের উপদেশাবলী ও মর্যাদাবোধ সৃষ্টির সহায়ক সুনির্দিষ্ট গুণাবলীর রঙে গোটা পরিবেশকে রঙিয়ে তোলার মাধ্যমে তাকে এই খোরাক সরবরাহ করা যায়। দ্বীনী প্রাণশক্তি সৃষ্টি করা আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশী প্রয়োজন প্রথমত: আমাদের নতুন বংশধরদের মধ্যে, যাদের তা একেবারেই নেই, তারপর সেইসব লোকদের মধ্যে যারা সব মূল্যবোধকে হালকা ও তামাশার বস্তু মনে করে। আমি অবাক হই, কেমন করে আমরা অতি উ‍চুঁ মূল্যে ক্রয় করে একটি যন্ত্রের সামনে এমন একজন শ্রমিককে বসিয়ে দেই যার মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই। যন্ত্রটি তার সামনেই দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় কিংবা যদি ভালও থাকে, তার উৎপাদন কমে যায়। আমরা যদি এই শ্রমিকের অন্তরে ধার্মিকতা সৃষ্টির জন্য সামান্য কিছু ব্যয় করতাম, তাহলে আমাদের অনেক লাভ হত। ক্রয় করা যন্ত্রটির সংরক্ষণ ব্যয় হিসেবেও কি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই সামান্য ব্যয়টুকু করবেন না? আমাদের প্রতি আল্লাহ্‌ ও দেশের পক্ষ থেকে এটা একটা দায়িত্ব যে, এই মহান আত্মিক দিকটির কথা বিবেচনা করে আমরা আমাদের ছোটদের ও বড়দের গড়ে তুলি। যেদিন তারা কোন কাজ শুরু করার জন্য একে অপরকে ঈমানের নামে ডাক দেবে, সে কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে। দ্বীনী প্রাণশক্তির প্রকৃত যোগসূত্র আসমানের সাথে, আবার তার শাঁস রয়েছে যমীনে। প্রফেসর আহ্‌মাদ আয-যাইন এই প্রাণশক্তির বর্ণনায় কত সত্য কথাই না বলেছেন:

‘তা মাটির পৃথিবীতে আকাশের ধ্বনি এবং করুণাময় ও সর্বজ্ঞ প্রভূর পক্ষ থেকে আসা এক শক্তি।’

‘একটি রশ্মি, যার উজ্জ্বল দীপ্তিতে ভন্ডামি, মিথ্যা ও প্রতারণা বিলীন হয়ে যায়।’

‘তা এক রহস্য যা বুঝতে বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি অক্ষম হয়ে পড়ে।’

‘জ্ঞানের চুড়ান্ত লক্ষ্য ও উৎকৃষ্ট এক আত্মা, যার আকৃতি অদৃশ্য হলেও প্রভাব সুস্পষ্ট।’

‘প্রত্যেকে তারই শক্তিতে বাঁচে এবং তাকে সংরক্ষণ করে রাখে। তার বিচরণ প্রত্যেক হৃদয়ের অনুভূতিতে।

‘প্রবৃত্তি যেখানে পাপ ও অন্যায়ের দিকে দ্রুত ধাবিত হয় সেখানেও তার বিচরণ।’

 ‘অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্কবাণী সত্ত্বেও প্রবৃত্তিগুলো অত্যন্ত অবাধ্য এবং মানুষ তাদের নিয়ন্ত্রণে অক্ষম।

‘দ্বীনী প্রাণশক্তি তাদের সতর্ককারী হয়ে ডাক দিয়েছে। তারা তখন এই সতর্ককারীর ডাকে সাড়া দিয়েছে।’

‘তা ফেরেশতাদের তেজ যা মাটির সন্তানকে আলোর জগতে তুলে আনে।’

‘যুগে যুগে একের পর এক কত নবী এসেছেন, কিন্তু যুগের বিবর্তন সত্ত্বেও তা আপন বৈশিষ্ট্যে বহাল রয়েছে।’

‘নবীগণ যা যা পিছনে রেখে এসেছেন, সে তা যুগযুগ ধরে সংরক্ষণ করে রেখেছে। মানুষের মনে সে সত্যের তাগিদ যুগিয়ে আসছে।’

‘উৎকৃষ্ট বিধানমালার বহু পবিত্র গ্রন্থ সে বহন করছে।’

‘তুমি তার জোরালো নিন্দা বা তিরস্কার করলেও সে অন্যায়কে ক্ষমা করে না।’

 আমরা এখানে এই কবিতা উদ্ধৃত করছি এর সাহিত্যিক মূল্যের জন্য। নতুবা রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই কথাটি চিন্তা করলে আর কোন কথারই অবকাশ থাকে না:

«ألا إن في الجسد مضغة إذا صلحت صلح الجسد كله وإذا فسدت فسد الجسد كله ألا وهي القلب»

“ওহে, শরীরে এক টুকরা মাংস আছে, তা যদি ভালো থাকে, গোটা শরীরটাই ভাল থাকে। আর তা নষ্ট হয়ে গেলে গোটা শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখ, তা অন্তর।”

 আল-গাযালীর ‘আল্লাহ্‌র সাথে’ গ্রন্থের যতটুকু উদ্ধৃত করার ছিল তা এখানেই শেষ হল। অংশটুকুর বিরাট কার্যকারিতার কথা ভেবে আমি তা এখানে উদ্ধৃত করলাম। আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিমদের অন্তর ঠিক করে তাকওয়ায় পরিপূর্ণ করে দেন। দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করার ও সঠিক পথে অটল থাকার শক্তি দিয়ে তিনি যেন আমাদের, আমাদের সব তরুণদের ও আমাদের অন্যান্য ভাইদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। কেননা, দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সম্মান লাভের এটাই পথ। আল্লাহ বলেছেন:

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ قَالُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُ ثُمَّ ٱسۡتَقَٰمُواْ فَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ١٣ أُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلۡجَنَّةِ خَٰلِدِينَ فِيهَا جَزَآءَۢ بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٤﴾ [سورة الأحقاف: 13-14]

“যারা বলে যে. আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, এবং তারপর অটল থাকে, তাদের কোন ভয় কিংবা দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তারা নিজেদের কাজের পুরস্কারস্বরূপ চিরদিনের জন্য জান্নাতের অধিবাসী হবে।”[1]

তিনি আরও বলেন:

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ قَالُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُ ثُمَّ ٱسۡتَقَٰمُواْ تَتَنَزَّلُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ أَلَّا تَخَافُواْ وَلَا تَحۡزَنُواْ وَأَبۡشِرُواْ بِٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي كُنتُمۡ تُوعَدُونَ ٣٠ نَحۡنُ أَوۡلِيَآؤُكُمۡ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِۖ وَلَكُمۡ فِيهَا مَا تَشۡتَهِيٓ أَنفُسُكُمۡ وَلَكُمۡ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ ٣١ نُزُلٗا مِّنۡ غَفُورٖ رَّحِيمٖ ٣٢﴾ [سورة حم السجدة: 30-32]

“যারা বলে যে, আমাদের প্রতিপালাক আল্লাহ্ এবং তারপর অটল থাকে তাদের নিকট ফেরেস্তা অবতরণ করে বলে: তোমরা ভয় পেয়োনা বা দুশ্চিন্তগ্রস্থ হয়োনা এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছিল তার সুসংবাদ গ্রহণ কর। পার্থিব জীবনে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। তোমাদের মন যা চাইবে জান্নাতে তোমাদের জন্য তাই রয়েছে। তোমারা যা দাবি করবে সেখানে তোমরা তাই পাবে। ক্ষমাশীল, করুণাময় আল্লাহ্‌র আতিথ্য হিসেবে।”[2]

 রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:

«من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين»

“আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন।”

আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার পরিজন ও সহচরবৃন্দ এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসারী হবে, তাদের সকলকে মহিমান্বিত করুন।

প্রশ্নোত্তরে আরব জাতীয়তাবাদ

হিজরী ১৩৮০ সনের মুহাররাম মাসে আল-বিলাদ পত্রিকার প্রতিনিধি আমাকে কিছু প্রশ্ন করেছিল যার মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন ছিল জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত। প্রশ্নগুলো আমার জবাবসহ ঐ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আমি সেই প্রশ্নকটি ও তার জবাব এখানে উল্লেখ করছি:

প্রথম প্রশ্ন: কিছু কিছু বিদেশী এজেন্ট প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, আরব জাতীয়তাবাদ আরবদের প্রথম পারস্পরিক বন্ধন। এ সম্পর্কে আপনার মত কি?

উত্তর: আরব জাতীয়তাবাদ আরবদের প্রথম পারস্পরিক বন্ধন’ এই প্রচার নিঃসন্দেহে একটি মিথ্যা প্রচার। এর স্বপক্ষে যুক্তি কিংবা শরী‘আতের কোন ভিত্তি নেই। এটা একটা জাহেলী ও দ্বীনবিরোধী প্রচার। যারা এই প্রচার চালাচ্ছে তাদের লক্ষ্য ইসলামের বিরোধিতা করা এবং তার বিধানমালা ও শিক্ষাসমূহ এড়িয়ে যাওয়া। অবশ্য কিছু কিছু লোক অন্যদের অনকরণে কিংবা ভাল মনে করে এই প্রচার করে থাকে। কিন্তু এরা তার আসল উদ্দেশ্য জানলে অবশ্যই তার বিরোধিতা করত এবং নিজেদেরকে ঐ প্রচার থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। ইসলামের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আরবদের ইতিহাস সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞানের অধিকারী সকলেই জানে যে ইসলাম ব্যতীত আরবদের অন্য কোন মূল্য কিংবা ভয় করার মত অন্য কোন কারণ ছিল না। এই ইসলামের জোরেই তারা দেশ জয় করেছিল, মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করেছিল। ইসলামেরই কল্যাণে তারা মাথা উঁচু এক মহান জাতীতে পরিণত হয়েছিল এবং সবাই তাদেরকে ভয় করত ও তাদের অধিকারকে শ্রদ্ধা করত। এরপর তাদের মাঝে পরিবর্তন ঘটল। কারণ আল্লাহই তো বলেছেন:

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنفُسِهِمۡۗ ﴾ [سورة الرعد: 11]

“আল্লাহ নিশ্চয়ই কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।”[3]

এ প্রসংগে আমি দীর্ঘ আলোচনা করব না। কেননা, পত্রিকায় তা ছাপানোর অবকাশ নেই। তাছাড়া দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন আছে বলেও আমি মনে করি না। কারণ, বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। আরবদের অবস্থা ও ইসলাম সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞানের অধিকারী কেউই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করবে না।

আল্লাহ তাঁর নবীকে কত সুন্দর কথা বলেছেন:

﴿ فَٱسۡتَمۡسِكۡ بِٱلَّذِيٓ أُوحِيَ إِلَيۡكَۖ إِنَّكَ عَلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٤٣ وَإِنَّهُۥ لَذِكۡرٞ لَّكَ وَلِقَوۡمِكَۖ وَسَوۡفَ تُسۡ‍َٔلُونَ ٤٤﴾ [سورة الزخرف: 43-44]

“তোমার কাছে যে কিতাব অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে তা শক্ত করে ধরে থাক, নিশ্চয়ই তুমি সঠিক পথে রয়েছ। এটা তোমার ও তোমার জাতির জন্য একটা মর্যাদার বিষয়। আর তোমাদেরকে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।”[4]

তিনি আরও বলেছেন:

﴿ لَقَدۡ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكُمۡ كِتَٰبٗا فِيهِ ذِكۡرُكُمۡۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ١٠﴾ [ سورة الأنبياء: 10]

“তোমাদের নিকট আমরা এমন এক গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমাদের মর্যাদার কথা রয়েছে। তোমরা কি বুঝতে পারছনা? ” [5]

আর আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারের লক্ষ্য যদি এই হয় যে, আরবরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের স্বার্থে সবাই কাজ করবে এবং দেশ থেকে শত্রুকে বিতাড়িত করবে, তাহলে এ মহৎ লক্ষ্যে উপনীত হবার পথতো এটা নয়। এর একমাত্র পথ হল, যে দ্বীনের কারণে তাদের সম্মান বেড়েছিল, পৃথিবীতে তারা পরিচিত হয়েছিল ও ময়দানে আত্মপ্রকাশ করেছিল এবং অন্যান্য জাতির ওপর কর্তৃত্ব করেছিল, সেই দ্বীনের দিকে ফিরে আসা ও তার উদার শিক্ষা ও সঠিক বিধানসমূহ শক্ত হাতে ধরা এবং সেই দ্বীনের স্বার্থে বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতা করা। তাহলেই পারস্পরিক ঐক্য, সকলের স্বার্থ ও শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জিত হবে। এই পথে দুনিয়া আখেরাতে শুভ পরিণামের গ্যারান্টিও আছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن تَنصُرُواْ ٱللَّهَ يَنصُرۡكُمۡ وَيُثَبِّتۡ أَقۡدَامَكُمۡ ٧﴾ [سورة محمد:7]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করলে তিনিও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন ও তোমাদের পদক্ষেপসমূহ সুদৃঢ় করে দিবেন।” [6]

﴿ وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٤٠ ٱلَّذِينَ إِن مَّكَّنَّٰهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ أَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُواْ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَنَهَوۡاْ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۗ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلۡأُمُورِ ٤١﴾ [سورة الحج: 40-41]

“আল্লাহ্‌কে যারা সাহায্য করবে আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন। নিশ্চই আল্লাহ শক্তিশালী, পরক্রান্ত। তারা এমন লোক, যাদেরকে আমরা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করলে তারা নামায কায়েম ও যাকাত আদায় করে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে আল্লাহই সকল কাজের পরিণামের মালিক।” [7]

﴿ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ كَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَهُمُ ٱلَّذِي ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنٗاۚ يَعۡبُدُونَنِي لَا يُشۡرِكُونَ بِي شَيۡ‍ٔٗاۚ ﴾ [سورة النور: 55]

“আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার হয়ে সংকাজ করে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী করবেন, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদের করেছিলেন। আর তাদের জন্য সেই দ্বীনকে শক্তিশালী করে দিবেন, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতিজনক অবস্থার পর আবার নিরাপত্তা দান করবেন। তখন তারা আমারই ইবাদাত করবে এবং আমরা সাথে কোন কিছু শরীক করবেনা।”[8]

 এ প্রসংগে আরও অনেক আয়াত রয়েছে যা সকলেই জানেন। মালিক ইব্‌ন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বড় সুন্দর কথা বলেছেন:

” لن يصلح آخر هذه الأمة إلا ما أصلح أولها “

“যা দ্বারা এ জাতির প্রথম পর্যায়ের লোকদের সংশোধন সাধিত হয়েছে, এ জাতির শেষাংশের সংশোধন কেবলমাত্র তদ্বারাই সম্ভব হবে।”

 এই মনীষীর ছোট্ট এই কথাটি অত্যন্ত সত্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে, আমাদের শাসকদেরকে ও সকল মুসলিমকে সংশোধন করে দাও।

 দ্বিতীয় প্রশ্ন: আজকাল ইসলামের সাথে জাতীয়তার তুলনা এবং এ দুইয়ের মাঝে সমন্বয় বিধান করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোন কোন সৌদী পত্র পত্রিকায়ও এই প্রবণতা দেখা যায়। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

উত্তর: ইসলাম ও আরব জাতীয়তার মধ্যে কিংবা সমন্বয় বিধান প্রচেষ্টা একটি বড় অন্যায় কাজ ও চরম বোকামী। আবু জাহল, উত্‌বা ইবন রাবী‘আ, শাইবা ইব্‌ন রাবী‘আ প্রমুখ ইসলামের শত্রুরা বেঁচে থাকলে এরাই আরব জাতীয়তার নেতা ও প্রধান প্রচারক হত। পক্ষান্তরে সব যুগ ও সব দেশের উপযোগী দ্বীন ইসলামের প্রচারক ও পৃষ্ঠপোষক হলেন মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর সিদ্ধীক রাদিয়াল্লাহু আনহু, ওমর ইব্‌ন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু, ওসমান ইব্‌ন আফ্‌ফান রাদিয়াল্লাহু আনহু, আলী ইব্‌ন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু ও ইসলামের নেতা ও সংরক্ষক অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী মহৎ ব্যক্তিবর্গ। এমতাবস্থায় আরব জাতীয়তা ও ইসলামের মধ্যে তুলনা কিংবা সমন্বয় বিধানের চেষ্টা কোন বুদ্ধিমান লোকের পক্ষে সম্ভব কি? একমাত্র বিকৃত মস্তিষ্ক কিংবা অন্ধ অনুকরণকারী অথবা ইসলাম ও তার নবীর জীবন শত্রুই তা করতে পারে। এই তুলনা গোবরের সাথে মুক্তার এবং রাসূলের সাথে শয়তানের তুলনার মতই অসামঞ্জস্যকর। বিচক্ষণ লোকেরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন যে, জাতীয়তা ও ইসলামের মধ্যে এই তুলনা ও সমন্ববিধান প্রচেষ্টা ইসলামের জন্য কত বিপদজ্জনক। আল্লাহ ! তুমি আমাদেরকে ও আমাদের জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত কর।

তৃতীয় প্রশ্ন : কিছু কিছু নিবেদিত প্রচারক দ্বীন সম্পর্কিত কতিপয় সাধারণ খুঁটিনাটি বিষয় যেমন মাথা কামানোর নিয়ম, পোশাকের আকৃতি ইত্যাদিকে তাদের প্রচারের বিষয়বস্তু করে থাকেন। অথচ আকীদা সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় রয়েছে, যেগুলোর প্রতি এই নিবেদিত প্রচারকদের মনোযোগ দেয়া উচিৎ। এ ব্যাপারে আপনি কি মনে করেন?

উত্তর: বস্তুত: পথ-প্রর্দশকগণ সমাজের চিকিৎসক। চিকিৎসকের কাজ প্রথমে রোগসমূহ নির্ণয় করা, তারপর বড় থেকে শুরু করে একে একে সেগুলোর চিকিৎসা করা। বিশ্বের সেরা চিকিৎসক বনী আদমের নেতা মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রীতিও তাই। আল্লাহ যখন তাঁকে নবী করে পাঠালেন তখন সর্বপ্রথম তিনি সমাজের বড় ব্যাধি শির্কের চিকিৎসা শুরু করেন। অর্থাৎ আল্লাহর সাথে শির্ক করতে লোকদের নিষেধ করেন। নবুওয়াত লাভ থেকে শুরু করে একাধারে দশ বছর তিনি মানুষকে শির্ক থেকে সাবধান করত: আল্লাহর একত্ব প্রচার করলেন। তারপর দিলেন নামাযের নির্দেশ এবং তারপর অন্যান্য বিধানসমূহ। এমনিভাবে তাঁর পরবর্তী প্রচারকদেরও দায়িত্ব তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বড় থেকে শুরু করে একে একে অগ্রসর হওয়া। তবে মুসলিম সমাজ হলে প্রচারকদের জন্য এই পদ্ধতি অপরিহার্য নয়। সেক্ষেত্রে একজন প্রচারকের বড়-ছোট সব ব্যাপারে প্রচারের অনুমতি আছে। বরং যার যতটুকু করার সামর্থ, তার জন্য ততটুকুই ওয়াজিব। কেননা, তখন উদ্দেশ্য মুসলিম সমাজের সংশোধন, শির্ক ও তার উপলক্ষণ থেকে এই সমাজের বিশ্বাসাকে মুক্ত রাখার চেষ্টা এবং সমাজের ক্ষতি করতে পারে কিংবা তার ঈমানকে দুর্বল করতে পারে এমন কাজকর্ম থেকে সমাজের চরিত্রকে মুক্ত রাখা। সুতরাং বড় বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলতে না পারলে কোন কোন সময়ে ছোটটি দিয়ে শুরু করতে কোন আপত্তি নেই। তেমনি ছোটটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বড়টিতে হাত দিতেও কোন বাধা নেই, যদি প্রচারক তা সঙ্গত মনে করেন কিংবা দুটো একসাথে করতে গেলে দুটোতেই ব্যর্থ হবার আশঙ্কা বোধ করেন। সংস্কারক ও বড় বড় চিকিৎসকগণও তাই করে থাকেন। তারা সংস্কার ও চিকিৎসার সকল পথকে গুরুত্ব দেন এবং যে পথে দ্রুত সন্তোষজনক ফল পাওয়ার আশা, সে পথে অগ্রসর হন। তারা যদি একসঙ্গে একাধিক উপকার করতে কিংবা ক্ষতি রোধ করতে না পারেন তাহলে গুরুত্ব হিসেবে সবচেবয়ে বড় উপকারটি করেন কিংবা বড় ক্ষতিটি রোধ করেন। শরী‘আতের বিধান এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোলাফায়ে রাশেদীন ও ইমামদের জীবনচরিত চিন্তা করলে আমার একথার সত্যতা প্রমাণিত হেব এবং লোকদের হেদায়েত করার ও রোগ-ব্যাধি হতে তাদেরকে উদ্ধার করে আনার সঠিক পদ্ধতি জানা যাবে। সৎ নিয়তে যে সত্যকে জানতে চেষ্টা করে, আল্লাহর নিকট দ্বীন প্রচারের জন্য উৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর পথ কামনা করে এবং জটিল ব্যপারে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ নেয়, সে সফল ও সৎপথপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তাই বলেছেন:

﴿ وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٦٩﴾ [سورة العنكبوت: 69]

“যারা আমাদের পথে সংগ্রাম করে আমরা তাদেরকে আমাদের পথ দেখিয়ে দেই। আর আল্লাহ নিষ্ঠাবান লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।’ [9]

চতুর্থ প্রশ্ন: আল-বিলাদ পত্রিকা তার বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকদের নিকট আপনার কিছু মূল্যবান উপদেশ পৌঁছে দিতে চায়। আপনি তাদের জন্য কী উপদেশ দিবেন:

উত্তর: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ যে তাকওয়ার নির্দেশ দান করেছেন সবাই তা পালন করুক, পাঠকদের জন্য আমার উপদেশ এটাই। আল্লাহ বলেছেন:

﴿وَلِلَّهِ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ وَلَقَدۡ وَصَّيۡنَا ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ مِن قَبۡلِكُمۡ وَإِيَّاكُمۡ أَنِ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ﴾ [سورة النساء: 131]

আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহর। তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদেরকে আমরা নির্দেশ দিয়েছিলাম এবং তোমাদেরকেও দিয়েছি যে, আল্লাহকে ভয় কর।” [10]

এই তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় একটি ব্যাপকার্থক শব্দ। যার প্রকৃত অর্থ হল: মানুষ জ্ঞান, বিশ্বাস, আন্তরিকতা, ভালবাসা, আগ্রহ ও ভয়ের সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনেও আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তিকে ভয় করবে। আর এটা করতে পারলে সে দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ ও সুফল লাভ করতে সক্ষম হবে। পাঠকদের জন্য আমার আর একটা উপদেশ আছে। অবশ্য এটাও তাকওয়ারই অংশ। তাহল, তারা যেন কোন বিষয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে বিষয়টি ভালভাবে পরীক্ষা করেন, সবদিক থেকে তা পূংখানুপুংখরূপে বিশ্লেষণ করে দেখেন এবং শরী‘আত অর্থাৎ কুরআন ও সহীহ হাদীসের মানদন্ডে তার তাৎপর্য যাচাই করে নেন। এই মানদন্ডের অনুকূল হলে তা যেন গ্রহণ করেন আর বিপরীত তা বর্জন করেন। বিষয়সমূহকে বিশ্লেষণ ও শরী‘আতের মানদন্ডে যাচাইকালে অবশ্যই ভাবাবেগ অথবা ঢিলেমী এবং গোঁড়ামী অথবা স্বেচ্ছানুবর্তিতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। এইসব ত্রুটি হতে মুক্ত থেকে তারা যদি আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার সাথে বিষয়সমুহ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তাহলে অবশ্যই তারা সত্যের সন্ধান পাবেন এবং শুভ পরিণাম লাভে সমর্থ হবেন। ভাবাবেগ ও তাড়াহুড়ার কারণে কত দুর্যোগ ও বিপদ এসেছে। যুগ যুগ পরেও তার জের ও ফলাফল শেষ হয়নি। আল্লাহ আমাদেরকে সেসব থেকে রক্ষা করুণ। পাঠকদের জন্য আমার আরও একটি উপদেশ আছে, সেটিও তাকওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা যেন মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকেন। অর্থাৎ সত্য ও সহিষ্ণুতার জন্য একে অপরকে উপদেশ দিতে, সততা ও তাকওয়ার জন্য পরস্পর সহযোগিতা করতে, বুদ্ধি ও সদুপদেশ দ্বারা সৎকাজের নির্দেশ ও অন্যায় কাজে বাধা দিতে এবং সাধ্যমত অন্যায়ের প্রতিরোধ করে যেতে বলেন। হাদীসে আছে:

«من رأى منكم منكرا فليغيره بيده فإن لم يستطع فبلسانه فإن لم يستطع فبقلبه وذلك أضعف الإيمان»

“তোমাদের কেউ কোন অন্যায় দেখলে যেন হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে) তা প্রতিরোধ করে। হাত দিয়ে না পারলে মুখ দিয়ে আর মুখ দিয়েও না পারলে অন্তর: অন্তর দিয়ে। আর এটা হচ্ছে দুর্বলতম ঈমান।”

 আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন সকলকে সত্যে অটল থাকার তাওফীক দেন এবং সবরকম বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেন।

সমাপ্ত


[1] . আল-আহকাফ, ১৩-১৪।

[2] . হা-মীম-সিজদা, ৩০-৩২

[3] . আর-রাদ,১১

[4] .আয্‌-যুখরূফ, ৪৩-৪৪

[5] . আল-আম্বিয়া, ১০

[6] . মুহাম্মাদ, ৭

[7] . আল-হজ্জ, ৪০-৪১

[8] . আন-নূর, ৫৫

[9] . আল- আনকাবুত, ৬৯

[10] . আন-নিসা, ১৩১


[1] . আল-বাকারা, ১২০

[2] . আল – বাকারা, ২১৭

[3] . আল- জাসিয়া, ১৮

[4] . আন-নিসা , ৬৫

[5] . আল-মায়েদাহ, ৫০

[6] আল-মায়েদাহ: ৪৪।

[7] . আল-মায়েদাহ , ৪৫

[8] . আল-মায়েদাহ ৪৭

[9] . আল-মুম্‌তাহানা , ৪

[10] .মুহাম্মদ , ৩৮

[11] . আল-আন্‌ আম, ৪৪-৪৫

[12] .হূদ, ১০২

[13] . তাহা, ১২৩-১২৭

[14] . আত-তাওবা, ৫৫

[15] . আস-সিজদা, ২১

[16] . আশ-শূরা, ৫২

[17] . আন-নিসা, ১১৩

[18] . আল ইমরান, ১৬৪

[19] . আয-যুখরুফ ৪৪


[1] . আশ-শূরা, ৩০

[2] . আন-নিসা, ৭১

[3] . আল-আন্‌ফাল, ৬০

[4] . আল-ইমরান, ১১৮

[5] . আল-ইমরান, ১৪৯-১৫০

[6] . আত-তওবা, ৪৭

[7] . আত-তাওবা ৭১

[8] . আল-আনফাল , ৭৩

[9] , আল-মায়েদাহ, ৮২

[10] . আল-মায়েদাহ, ৫১

[11] . আল-মুজাদালা, ২২

[12] . আল-মুমতাহানা, ৮


[1] .আল-মায়েদাহহ,৫১-৫২

[2] সূরা আল-বাকারাহ: ১৪০।

[3] সূরা আল-মুমতাহানাহ: ১।

[4] . আশ-শূরা , ১৩

[5] . আল-মুমতাহানা, ৪

[6] . আল-মুজাদালা, ২২

[7] . আন-নূর, ৫৫

[8] . আস-সাফ্‌ফাত, ১৭১-১৭৩

[9] . আয-যুমার, ২০


[1] সূরা আলে ইমরান: ১০২-১০৩

[2] . সূরা আনফাল, ৬২

[3] . আর রূম, ৩১

[4] . আল- হজ্জ , ৪০-৪১

[5] আল-আহযাব, ৩৩

[6] . আল-হুজুরাত , ১৩

[7] . আত-তাওবা, ১০০


[1] .আল ইমরান, ১১০

[2] .আর-রূম, ৪৭

[3] .মুহাম্মদ, ৭

[4] .আল-আম্বিয়া , ১০

[5] . আয-যুখ্‌রুফ, ৪৩-৪৪