মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

ভ্যাকেশনের সময়টাতে আমরা সাধারণত ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। ঘোরাঘুরির প্রতি আমার আগ্রহ বা কৌতূহল—কোনোটাই কোনোকালে ছিল না। ক্লাস, ল্যাব, এক্সাম এসবের ভিড়ে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতাম কবে একদিন ছুটি পাব আর পুরোদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেবো। করতামও তাই। ছুটির দিন মানেই আরামসে ঘুম; কিন্তু এই অভ্যাসের যবনিকাপতন ঘটে সাজিদের হাতে। যখন থেকে তার সাথে পরিচয়, ঠিক তখন থেকেই তার মধ্যে দুটি নেশা প্রবলভাবে দেখে আসছি। একটি হচ্ছে বই পড়া আর অন্যটা ঘোরাঘুরি।

‘ট্রাভেলিং বিষয়ক বাংলা এবং ইংরেজিতে যতগুলো বই আছে মোটামুটি সবগুলো তার পড়া। সে শিডিউল করে রেখেছে, ফাইনাল সেমিস্টারের পরে আমাকে নিয়ে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম যাবে। আমস্টারডামের কোথায় কোথায় ঘুরব তারও একটি শর্ট লিস্ট রেডি করে রেখেছে সে।

সেই শিডিউলে আছে Anne Frank House, যে গৃহটির ওপর নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত মুভি The Diary of a Young Girl’, পৃথিবীর একমাত্র ভাসন্ত ফুলের মার্কেট Bloemenmarkt, Tuschinski Theater, Dam Square-সহ আরও বিভিন্ন বিখ্যাত জায়গা। সাজিদের ভাষ্যমতে, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই পৃথিবীকে এত সুন্দর করে সাজিয়েছেন—যাতে মানুষ তার অবসরে এইসব সৌন্দর্য অবলোকন করে নৈসর্গিক আনন্দ লাভ করতে পারে। অন্যথায় একটি ছোট্ট ফুলের পাঁপড়ির মধ্যে এরকম অঢেল লাবণ্য আর কারুকাজ দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না।

আমাদের কাছে সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ মাপকাঠি হচ্ছে জান্নাত। সাজিদ বলে, সৌন্দর্যের এই পরম মাত্রা বুঝাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা খুবই কমন কিছু জিনিস উপমা হিশেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন—ঝরনা, বাগান ইত্যাদি, যা আমাদের হাতের নাগালের মধ্যেই। আমরা হরহামেশাই চাইলে দুনিয়ায় এসব দেখতে পারি। এসব উপমা দেওয়ার কারণ হতে পারে এই—আল্লাহ চাইছেন আমরা এসব দেখে, এসবের সৌন্দর্য দেখে বিমুগ্ধ হই এবং ভাবি—“আহ! এগুলোই এত মনোহর! জান্নাতের নহর আর বাগান না জানি কত সুন্দর! আল্লাহ চান মানুষ ভ্রমণ করুক। দেখুক। বুঝুক। অনুধাবন করুক।

এই সব আলাপ সামনে এলে সাজিদ ‘ট্রাভেলিং’ ইস্যুতে বিখ্যাত মনীষীদের উক্তি কপচাননার সাথে সাথে ভ্রমণ বিষয়ক কুরআনের আয়াতগুলোও শুনিয়ে দেয়। আমরা যারা ভ্রমণকে নেহায়েত সময় আর অর্থ নষ্ট ভেবে ছুটির দিনে রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে অঘোর ঘুমে মজে থাকি, তাদের তখন চেহারা মলিন করে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

ফিরছিলাম রাজশাহী থেকে। গিয়েছিলাম দাওয়াতে। সাজিদের ফুফাত ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান। একসাথে দুটি কাজ সেরে ফেলা হলো। দাওয়াত-খাওয়া আর মহাস্থানগড় ভ্রমণ করা। সাহিত্যের ভাষায় যাকে ‘রথ দেখা আর কলা বেচা বলে।

সে যাহোক, রাতের ট্রেন। তিন দিনের সফর শেষে বাসায় যাচ্ছি। আমি খুব ক্লান্ত। মনে হচ্ছে বিছানায় শোয়া মাত্রই ঘুম চলে আসবে। সাজিদের দিকে তাকালাম। সে বসে আছে আমার পাশেই। তার চেহারায় ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। মনে হচ্ছে। এক্ষুনি কেউ যদি তাকে ৫০০ মিটার দৌড়ে আসতে বলে তবুও সে হাসিমুখেই রাজি হয়ে যাবে।

আমাদের ঠিক উল্টোদিকের সামনের সিটে, সাজিদের মুখ বরাবর মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। চুল আর দাড়িতে মেহেদীর কলপ করেছেন বলে বয়স তেমন বোঝা যাচ্ছে না। খুবই শৌখিন মানুষ হয়তো। শৌখিন মানুষগুলোই চুল-দাড়িতে মেহেদীর কলপ করে থাকে সাধারণত। আমার দাদা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের সরকারি চাকুরিজীবী। দাদাও প্রতিমাসে তার চুল আর দাড়িতে মেহেদীর কলপ লাগাতেন। আমাদের বাড়ির উঠোনে ইয়া বড় একটি মেহেদী গাছ ছিল। দাদির দাবি, এই গাছের দুই-তৃতীয়াংশ পাতা দাদাই ব্যবহার করতেন। মৃত্যুর মাস দেড়েক আগেও দাদা চুল-দাড়িতে মেহেদীর কলপ লাগিয়েছিলেন বলে দাদির কাছে। শুনেছিলাম। সে যাহোক, আমাদের সামনে যে ভদ্রলোক বসে আছেন, তার হাতে একটি ইংরেজি পত্রিকার ম্যাগাজিন। নাম-Lifestyle,

দাড়িতে মেহেদী লাগিয়ে সেগুলোকে কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো টকটকে লাল করে ফেলার পদ্ধতিটি হয়তো এই ম্যাগজিন থেকেই শেখা। এই মুহূর্তে আমার খুব ঘুম দরকার; কিন্তু ট্রেন চলার শব্দ আর ঝাঁকুনির কবলে পড়ে চোখ থেকে ঘুম পালিয়ে গেছে ততক্ষণে।

সাজিদ একমনে বই পড়ছে। বইটির নাম ‘There is a God: How World’s most notorious Atheists changed his mind. একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ ফিলোসফারের লেখা বই, যিনি একসময় কট্টর নাস্তিক ছিলেন। পরে নাস্তিকতা থেকে ফিরে এসে তিনি এই বই লিখে ব্যাপক হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। সাজিদের পাশে বসে আমি কেবল হাই তুলছি আর ঝিমুচ্ছি।

একটুপরে আমাদের সামনের ভদ্রলোক কথা বলে উঠলেন। তিনি একটি চিপসের প্যাকেট খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন—‘Please Take.

ভদ্রলোকের আবদার দেখে আমার হাই আর ঝিমুনি দুইটাই উবে গেল। মুহূর্তেই আমি স্বাভাবিক চেহারা বানিয়ে বললাম—“No, Thanks. ভদ্রলোক একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, ‘ভয় পাচ্ছ নাকি?

আমি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ভদ্রলোক ভাবছেন হয়তো তাকে কোনো হাইজ্যাকার-টাইজ্যাকার ভেবে আমি তার কাছ থেকে চিপস নিতে চাচ্ছি না। আমার হয়ে জবাব দিল সাজিদ। বলল, “আঙ্কেল, ওর আসলে ফাস্টফুডে এলার্জি আছে।”

“ওহ আচ্ছা। তাই বলো’ ভদ্রলোক বললেন। এরপর সাজিদের দিকে প্যাকেটখানা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি নাও।

সাজিদ নিল। দুটুকরো পটেটো চিপস মুখে পুরে দিয়ে সে ভদ্রলোককে বলল, Thank You.’

‘তোমার নাম?’ ভদ্রলোকের প্রশ্ন।

‘সাজিদ

‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?

‘রাজশাহীতে বেড়াতে এসেছিলাম। ঢাকা ফিরছি।”

এতটুকু আলাপের পরে সাজিদ আবার বই পড়ায় মন দিল। ততক্ষণে ভদ্রলোক পটেটো চিপসের প্যাকেটটি খালি করে সেটি জানালা দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। একটুপরে তিনি সাজিদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খুবই পারসোনাল একটি প্রশ্ন করতে পারি?

সাজিদ সাতপাঁচ না ভেবে বলল, “কোনো সমস্যা নেই। ‘তোমার হাতে থাকা বইটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। কিছু মনে না করলে আমি কি বইটি একটু দেখতে পারি?

সাজিদ হাসি মুখে ‘অবশ্যই’ বলতে বলতে ভদ্রলোকের দিকে বইটি এগিয়ে দিল। তিনি বইটি হাতে পেয়ে বেশ কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখলেন। এরপর বইটি আবার সাজিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ। বেশ ভালো বই বলে মনে হলো।

সাজিদ কিছু না বলে বইটি খুলে আগের জায়গা থেকে পড়তে শুরু করল। ভদ্রলোক একটু পরে আবার বললেন, ‘সরি, ইফ আই মাইট হ্যাভ বদারড ইউ। আমার মনে হচ্ছে তুমি কম্পারেটিভ রিলিজিওনের ছাত্র। আসলে তোমার হাতে থাকা বইটি দেখেই অনুমান করছি।’

সাজিদ বলল, ‘জি না। কম্পারেটিভ রিলিজিওন আমার অ্যাকাডেমিক সাবজেক্ট নয়। তবে বিষয়টি আমার খুব ফেভারিট। এজন্যেই সুযোগ পেলে আমি এটা নিয়ে পড়াশোনা করি।

সাজিদের উত্তর শুনে ভদ্রলোক বললেন, ‘দ্যাট’স গ্রেট। এরপর সাজিদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘নাইস টু মিট ইউ।

সাজিদ মুখে কোনোকিছু না বলে হাত মিলাল। করমর্দন-পর্ব শেষ হতেই তিনি আবার বললেন, কিছু মনে না করলে আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতাম।

সাজিদ তার হাতে থাকা বইটি বন্ধ করে বলল, ‘জি, অবশ্যই।

মুচকি হাসলেন ভদ্রলোক। সম্ভবত আড্ডা দেওয়ার মানুষ পেয়ে তিনি যারপরনাই খুশি এই মুহূর্তে।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন