ড. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস-সুহাইম

অনুবাদক : জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের  সম্পাদনা : প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ইতোপূর্বে যেমন এ কিতাবে আপনার নিকট এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর দীন। আর তা সত্য এবং এমন দীন যা নিয়ে সমস্ত নবী ও রাসূলগণ আগমন করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে, তিনি তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং যে তাঁর কুফুরী করে, তাকে কঠিন শাস্তি দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

আর যেহেতু আল্লাহ বিশ্বজগতের স্রষ্টা, অধিপতি ও কর্তৃত্বকারী, আর আপনি মানুষ হলেন তাঁর একটি সৃষ্টজীব। তাই তিনি আপনাকে সৃষ্টি করেন এবং বিশ্বজগতের সবকিছুকে আপনার অনুগত করেন, আপনার জন্য তাঁর বিধান রচনা করেন ও আপনাকে তাঁর আনুগত্য করার আদেশ দেন। সুতরাং আপনি যদি তাঁর ওপর বিশ্বাস আনেন এবং তিনি আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা পালন করেন, আর তিনি আপনাকে যা হতে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করেন, তাহলে আল্লাহ আপনার সাথে আখেরাত দিবসে যে স্থায়ী নি‘আমতের ওয়াদা করেছেন তা লাভ করবেন। দুনিয়াতে যেসব বিভিন্ন প্রকার নি‘আমত আপনাকে দান করেছেন তা অর্জন করবেন। আর জ্ঞানের দিক দিয়ে যার সৃষ্টি পরিপূর্ণ এবং যাদের অন্তর অধিক পবিত্র যেমন- নবী, রাসূল, নেককার, ও সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ফিরিশতামণ্ডলী, আপনি তাদের মত হলেন।

আর যদি আপনার প্রভুর কুফুরী করেন ও অবাধ্য হন, তাহলে তো আপনি আপনার দুনিয়া ও আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে আপনি তাঁর ঘৃণা ও ‘আযাবকে গ্রহণ করলেন। আর আপনি সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এবং যাদের জ্ঞান সবচেয়ে কম ও যাদের অন্তর সবচেয়ে নিম্নতর যেমন- শয়তান, অত্যাচারী, ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী ও তাগুত, তাদের মত হলেন। এগুলো সংক্ষিপ্তাকারে মাত্র। নিম্নে বিস্তারিতভাবে কুফুরীর কিছু পরিণাম উপস্থাপন করলাম যথা:

(১) ভয়ভীতি ও অশান্তি

যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং তাঁর রাসূলগণের আনুগত্য করে, তাদেরকে তিনি পার্থিব জীবনে ও আখেরাতে পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ ٨٢ ﴾ [الانعام: ٨٢]

“প্রকৃতপক্ষে তারাই শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী। যারা ঈমান আনয়ন করেছে এবং তাদের স্বীয় বিশ্বাসকে যুলুমের সাথে (শির্কের সাথে) সংমিশ্রন করেনি, আর তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮২]

আর আল্লাহ হলেন নিরাপত্তা দানকারী, তত্ত্বাবধায়ক এবং বিশ্বজগতে যা রয়েছে তার সবকিছুর অধিপতি। সুতরাং তিনি যদি কোনো বান্দাকে তাঁর ওপর ঈমান আনয়নের কারণে ভালোবাসেন, তাহলে তিনি তাকে নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও স্থিরতা প্রদান করেন। আর মানুষ যদি তাঁর সাথে কুফুরী করে, তাহলে তিনি তার নিরাপত্তা ও শান্তি ছিনিয়ে নেন। সুতরাং আপনি তাকে দেখবেন, সে আখেরাত দিবসে তার পরিণাম সম্পর্কে সর্বদা ভীত অবস্থায় আছে। আর সে তার নিজের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধি এবং দুনিয়াতে তার ভবিষ্যতের ব্যাপারেও ভীত। আর এই নিরাপত্তা-হীনতা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকার কারণেই গোটা বিশ্বে জান ও মালের ওপর বীমা তথা ইনস্যুরেন্সের মার্কেট গড়ে উঠেছে।

(২) সংকীর্ণ জীবন:

আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেন এবং পৃথিবীর সবকিছুকে তার অনুগত করে দেন। আর তিনি প্রত্যেকটি মাখলুককে তার অংশ তথা রিযিক ও বয়স বণ্টন করে দেন। তাই তো আপনি দেখতে পান, পাখি তার রিযিকের খোঁজে সকাল বেলা বাসা হতে বেরিয়ে যায় এবং রুযী আহরণ করে। এডালে ওডালে ছুটাছুটি করে এবং মিষ্টি সূরে গান গায়। আর মানুষও এক সৃষ্টজীব যাদের রিযিক ও বয়স বণ্টন করা হয়েছে। সুতরাং সে যদি তার প্রভুর ওপর ঈমান আনে এবং তাঁর শরী‘আতের ওপর অটল থাকে, তাহলে তিনি তাকে সুখ ও প্রশান্তি দান করবেন এবং তার যাবতীয় কাজকে সহজ করে দিবেন। যদিও তা জীবন গড়ার সামান্য কিছু হোক না কেন। পক্ষান্তরে সে যদি তার প্রভুর সাথে কুফুরী করে এবং তাঁর ইবাদাত করা হতে অহংকার প্রদর্শন করে, তাহলে তিনি তার জীবনকে কঠিন ও সংকীর্ণ করে দিবেন এবং তার ওপর চিন্তা ও বিষণ্ণতা একত্রে জড়িয়ে দিবেন। যদিও সে আরাম আয়েশের সকল উপকরণ এবং ভোগ সামগ্রীর বিভিন্ন প্রকার জিনিসের মালিক হয় না কেন। আপনি কি ঐ সমস্ত দেশে আত্মহত্যাকারীর আধিক্য লক্ষ্য করেননি, যারা তাদের জনগণের বিলাসিতার সমস্ত উপকরণের দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের পার্থিব জীবনের দ্বারা আনন্দ উপভোগ করার জন্য আপনি কি বিভিন্ন ধরনের অভিজাত আসবাবপত্র ও চিত্ত বিনোদনের ভ্রমণের ক্ষেত্রে অপচয় লক্ষ্য করেননি? আর এ ব্যাপারে অপচয়ের দিকে যে জিনিসটি ধাবিত করে তা হলো- ঈমান বা বিশ্বাসশূন্য অন্তর, সঙ্কীর্ণতা অনুভব এবং এসব সংকীর্ণতাকে পরিবর্তনকারী ও নতুন কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মনঃকষ্টকে দূর করার প্রচেষ্টা করা। আর আল্লাহ তা‘আলা তো সত্যই বলেছেন, তিনি বলেন,

﴿وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِكۡرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحۡشُرُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ أَعۡمَىٰ﴾ [طه: ١٢٤]

“যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১২৪]

(৩) যে কুফ করে, সে তার আত্মা এবং সৃষ্টি জগতের যা তার চতুঃপার্শ্বে তার সাথে সংঘাতের মধ্যে জীবনযাপন করে:

এর কারণ হচ্ছে, তার আত্মাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাওহীদ তথা একত্ববাদের ওপর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ﴾ [الروم: ٣٠]

“আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা ‌আর-রূম, আয়াত: ৩০] আর তার শরীর তার রবের জন্য আত্মসমর্পণ করে এবং তার নিয়মে চলে। কিন্তু কাফির তার সৃষ্টি তথা প্রকৃতির বিরোধিতা করে এবং সে তার স্বেচ্ছামুলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তার প্রভুর আদেশের বিপক্ষ হয়ে বেঁচে থাকে। ফলে তার শরীর আত্মসমর্পণকারী হলেও তার পছন্দ হয় বিপক্ষ।

সে তার চারপাশের সৃষ্টিজগতের সাথে সংঘাতের মধ্যে থাকে। কারণ এই বিশ্বজগতের সবচেয়ে বড় থেকে আরম্ভ করে সবচেয়ে ছোট কীট-পতঙ্গ পর্যন্ত সবকিছু ঐ নীতি নির্ধারণের ওপর চলে, যা তাদের রব তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ বলেন,

﴿ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ وَهِيَ دُخَانٞ فَقَالَ لَهَا وَلِلۡأَرۡضِ ٱئۡتِيَا طَوۡعًا أَوۡ كَرۡهٗا قَالَتَآ أَتَيۡنَا طَآئِعِينَ﴾ [فصلت: ١١]

“অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্র বিশেষ। তারপর তিনি ওটাকে ও পৃথিবীকে বললেন: তোমরা উভয়ে এসো (আমার বশ্যতা স্বীকার কর) ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল: আমরা অনুগত হয়ে আসলাম।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১১] বরং এই বিশ্বজগত ঐ ব্যক্তিকে পছন্দ করে যে আল্লাহর জন্য আত্মসমর্পণ করার ক্ষেত্রে তার সাথে মিলে যায় এবং যে তার বিরোধিতা করে তাকে সে অপছন্দ করে। আর কাফির তো হলো এই সৃষ্টি জগতের মাঝে অবাধ্য, যেহেতু সে নিজেকে প্রকাশ্যভাবে তা প্রভুর বিরোধী হিসাবে দাঁড় করিয়েছে। এজন্য ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল এবং সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্য; তাকে, তার কুফুরীকে এবং তার নাস্তিকতাকে ঘৃণা করা আবশ্যক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَالُواْ ٱتَّخَذَ ٱلرَّحۡمَٰنُ وَلَدٗا ٨٨ لَّقَدۡ جِئۡتُمۡ شَيۡ‍ًٔا إِدّٗا ٨٩ تَكَادُ ٱلسَّمَٰوَٰتُ يَتَفَطَّرۡنَ مِنۡهُ وَتَنشَقُّ ٱلۡأَرۡضُ وَتَخِرُّ ٱلۡجِبَالُ هَدًّا ٩٠ أَن دَعَوۡاْ لِلرَّحۡمَٰنِ وَلَدٗا ٩١ وَمَا يَنۢبَغِي لِلرَّحۡمَٰنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا ٩٢ إِن كُلُّ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ إِلَّآ ءَاتِي ٱلرَّحۡمَٰنِ عَبۡدٗا ٩٣﴾ [مريم: ٨٨،  ٩٣]

“আর তারা বলে: দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছ। এতে যে আকাশসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে এবং পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। যেহেতু তারা দয়াময় আল্লাহর ওপর সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর জন্য শোভনীয় নয়। আকাশসমূহে এবং পৃথিবীতে যারাই রয়েছে তারা সবাই আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে বান্দারূপে।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৮-৯৩]

মহান আল্লাহ ফির‘আউন এবং তার সৈন্যদল সম্পর্কে বলেন,

﴿فَمَا بَكَتۡ عَلَيۡهِمُ ٱلسَّمَآءُ وَٱلۡأَرۡضُ وَمَا كَانُواْ مُنظَرِينَ ٢٩﴾ [الدخان: ٢٩]

“আকাশ এবং পৃথিবী কেউই তাদের জন্য অশ্রুপাত করেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হয়নি।” [সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ২৯]

(৪) সে মূর্খ হয়ে বেঁচে থাকে:

যেহেতু কুফর বা অবিশ্বাস হলো; মূর্খতা, বরং তা সবচেয়ে বড় মূর্খতা। কারণ কাফির তার প্রভু সম্পর্কে অজ্ঞ। সে এই বিশ্বজগৎকে দেখে; এটাকে তার প্রভু চমৎকারভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং সে নিজেকে দেখে যা এক মহান কাজ ও গৌরবময় গঠন। তারপরও সে এ বিষয়ে অজ্ঞ যে, এই বিশ্বজগতকে কে সৃষ্টি করেছেন এবং কে তাকে গঠন করেছেন, এটা কি সবচেয়ে বড় মূর্খতা নয়?

(৫) কাফির তার নিজের প্রতি এবং যারা তার চারপাশে রয়েছে তাদের প্রতি যুলুমকারী হিসবে জীবনযাপন করে:

কারণ সে নিজেকে এমন কাজে নিয়োজিত করে, যে জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। সে তার প্রভুর ইবাদাত না করে বরং অন্যের ইবাদাত করে। আর যুলুম হচ্ছে কোন বস্তুকে তার অ-জায়গায় রাখা। আর ইবাদাতকে তার প্রকৃত হকদার ব্যতীত অন্যের দিকে ফিরানোর চেয়ে বেশি বড় যুলুম আর কী হতে পারে। লুকমান হাকীম পরিষ্কারভাবে শির্কের নিকৃষ্টতা বর্ণনা করে বলেন,

﴿يَٰبُنَيَّ لَا تُشۡرِكۡ بِٱللَّهِۖ إِنَّ ٱلشِّرۡكَ لَظُلۡمٌ عَظِيمٞ ١٣﴾ [لقمان: ١٣]

“হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয় শির্ক হচ্ছে মহা অন্যায়।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩]

সে তার চারপাশের মানুষ ও সৃষ্টিকুলের প্রতি যুলুম করে; কারণ সে প্রকৃত হকদারের হক সম্পর্কে অবহিত হয় না। ফলে কিয়ামত দিবসে মানুষ অথবা জীব-জন্তু যাদের প্রতিই সে যুলুম করেছে, তারা সবাই তার সামনে এসে দাঁড়াবে এবং তার রবের কাছে তার নিকট থেকে তাদের প্রতিশোধ নেয়ার আবেদন করবে।

(৬) দুনিয়াতে সে নিজেকে আল্লাহর ঘৃণা ও ক্রোধের সম্মুখীন করে:

সে দ্রুত শাস্তিস্বরূপ বালা-মুসিবত ও দুর্যোগ অবতীর্ণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿أَفَأَمِنَ ٱلَّذِينَ مَكَرُواْ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِ أَن يَخۡسِفَ ٱللَّهُ بِهِمُ ٱلۡأَرۡضَ أَوۡ يَأۡتِيَهُمُ ٱلۡعَذَابُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَشۡعُرُونَ ٤٥ أَوۡ يَأۡخُذَهُمۡ فِي تَقَلُّبِهِمۡ فَمَا هُم بِمُعۡجِزِينَ ٤٦ أَوۡ يَأۡخُذَهُمۡ عَلَىٰ تَخَوُّفٖ فَإِنَّ رَبَّكُمۡ لَرَءُوفٞ رَّحِيمٌ ٤٧﴾ [النحل: ٤٥،  ٤٧]

“যারা কুকর্মের ষড়যন্ত্র করে তারা কি এ বিষয়ে নিশ্চিত আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করবেন না অথবা এমন দিক হতে শাস্তি আসবে না যা তাদের ধারণাতীত অথবা চলাফেরা করা অবস্থায় তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন না? তার তো এটা ব্যর্থ করতে পারবে না অথবা তাদেরকে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ধৃত করবেন না? তোমাদের রব তো অবশ্যই অনুগ্রহশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৫-৪৭]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَلَا يَزَالُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ تُصِيبُهُم بِمَا صَنَعُواْ قَارِعَةٌ أَوۡ تَحُلُّ قَرِيبٗا مِّن دَارِهِمۡ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ وَعۡدُ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُخۡلِفُ ٱلۡمِيعَادَ ٣١﴾ [الرعد: ٣١]

“যারা কুফুরী করেছে তাদের কর্মফলের জন্যে তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে, অথবা বিপর্যয় তাদের আশে পাশে আপতিত হতেই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি আসবে, নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ৩১]

প্রশংসিত আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿أَوَ أَمِنَ أَهۡلُ ٱلۡقُرَىٰٓ أَن يَأۡتِيَهُم بَأۡسُنَا ضُحٗى وَهُمۡ يَلۡعَبُونَ﴾ [الاعراف: ٩٧]

“অথবা জনপদ বাসীরা কি এই ভয় করে না যে, আমাদের শাস্তি তাদের ওপর এমন সময় এসে পড়বে যখন তারা পূর্বাহ্ণে আমোদ-প্রমোদে রত থাকবে?” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৯৮]

এমন যারাই আল্লাহর যিকির বা স্মরণকে বিমুখ করে তাদের প্রত্যেকের এ অবস্থা। আল্লাহ তা‘আলা বিগত কাফির জাতির শাস্তির সংবাদ জানিয়ে বলেন,

﴿فَكُلًّا أَخَذۡنَا بِذَنۢبِهِۦۖ فَمِنۡهُم مَّنۡ أَرۡسَلۡنَا عَلَيۡهِ حَاصِبٗا وَمِنۡهُم مَّنۡ أَخَذَتۡهُ ٱلصَّيۡحَةُ وَمِنۡهُم مَّنۡ خَسَفۡنَا بِهِ ٱلۡأَرۡضَ وَمِنۡهُم مَّنۡ أَغۡرَقۡنَاۚ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيَظۡلِمَهُمۡ وَلَٰكِن كَانُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ يَظۡلِمُونَ ٤٠﴾ [العنكبوت: ٤٠]

“তাদের প্রত্যেককেই তার অপরাধের জন্যে শাস্তি দিয়েছিলাম, তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি শিলাবৃষ্টি, তাদের কাউকে আঘাত করেছিল বিকট শব্দ, কাউকে দাবিয়ে দিয়েছিলাম ভূ-গর্ভে এবং কাউকে করেছিলাম নিমজ্জিত। আর আল্লাহ তাদের কারো প্রতি যুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিল।” [সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৪০]

আর আপনি যেমন আপনার চারপাশে যাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি ও তাঁর আযাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মুসিবত লক্ষ্য করছেন।

(৭) তার জন্য ব্যর্থতা ও ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়:

সে তার যুলুমের কারণে, সবচেয়ে বড় ক্ষতিতে নিপতিত হয়, তা হারানোর মাধ্যমে যার দ্বারা তার হৃদয় ও আত্মা উপকৃত হতো। তা হলো- আল্লাহর পরিচয় লাভ এবং তাঁকে ডাকার মাধ্যমে তাঁর ঘনিষ্ঠতা অর্জন ও তাঁর প্রশান্তি লাভ।

সে দুনিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ সে দুনিয়াতে শোচনীয় ও দিশেহারা হয়ে জীবন-যাপন করে।

আর সে তার নিজের জানের ক্ষতি করে, অথচ এর জন্যই সে সম্পদ জমা করে। কারণ, তাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে নিজেকে সেই কাজে নিয়োজিত করে না এবং দুনিয়াতে সে এর দ্বারা সুখীও হয় না। কারণ সে হতভাগ্য হয়ে বেঁচে থাকে, হতভাগ্য হয়ে মারা যায় এবং কিয়ামত দিবসে তাকে হতভাগাদের সাথে পুনরুত্থিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنۡ خَفَّتۡ مَوَٰزِينُهُۥ فَأُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ خَسِرُوٓاْ أَنفُسَهُم﴾ [الاعراف: ٩]

“আর যাদের নেকীর পাল্লা হালকা হবে, তারা হবে ঐসব লোক যারা নিজেদের ধ্বংস ও ক্ষতি নিজেরাই করেছে।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৯]

সে তার পরিবারের ক্ষতি করে, কারণ সে আল্লাহর সাথে কুফুরী করা অবস্থায় তাদের সাথে বসবাস করে। সুতরাং তারাও দুঃখ ও কষ্টের ক্ষেত্রে তার সমান এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٱلَّذِينَ خَسِرُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ وَأَهۡلِيهِمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ﴾ [الزمر: ١٥]

“নিশ্চয় কিয়ামতের দিন ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা নিজেদের ও তাদের পরিবারবর্গের ক্ষতিসাধন করে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ১৫]

আর কিয়ামত দিবসে তাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে, আর তা কতইনা নিকৃষ্ট জায়গা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱحۡشُرُواْ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ وَأَزۡوَٰجَهُمۡ وَمَا كَانُواْ يَعۡبُدُونَ ٢٢ مِن دُونِ ٱللَّهِ فَٱهۡدُوهُمۡ إِلَىٰ صِرَٰطِ ٱلۡجَحِيمِ ٢٣﴾ [الصافات : ٢٢،  ٢٣]

“(ফিরিশতাদেরকে বলা হবে) একত্রিত কর যালিম ও তাদের সহচরদেরকে এবং তাদেরকে, যাদের তারা ইবাদাত করতো-আল্লাহর পরিবর্তে এবং তাদেরকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাও জাহান্নামের পথে।” [সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ২২, ২৩]

(৮) সে তার রবের প্রতি অবিশ্বাসী এবং তাঁর নি‘আমতের অস্বীকারকারী রূপে জীবনযাপন করে:

আল্লাহ তা‘আলা তাকে অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে হতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন এবং তার প্রতি সকল প্রকার নি‘আমত পূর্ণ করেন। অতএব সে কীভাবে অন্যের ইবাদাত করে, আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করে এবং তিনি ব্যতীত অন্যের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে …… কোন অস্বীকৃতি এর চেয়ে বেশি বড়? কোন অস্বীকৃতি এর চেয়ে বেশি নিকৃষ্ট?

(৯) সে প্রকৃত জীবন থেকে বঞ্চিত হয়:

কারণ পার্থিব জীবনের যোগ্য মানুষ তো সেই, যে তার রবের প্রতি ঈমান রাখে, তার উদ্দেশ্যকে জানতে পারে, তার গন্তব্য তার জন্য স্পষ্ট এবং সে তার পুনরুত্থানকে বিশ্বাস করে। অতএব, সে প্রত্যেক হকদারের হক সম্পর্কে অবহিত, কোনো হককেই সে অবজ্ঞা করে না এবং কোনো সৃষ্টজীবকে কষ্ট দেয় না। ফলে সে সুখীদের মত জীবনযাপন করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সুন্দর জীবন লাভ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ﴾ [النحل: ٩٧]

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমরা তাকে পবিত্র জীবন দান করব।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯৭]

আর আখেরাতে রয়েছে—

﴿وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةٗ فِي جَنَّٰتِ عَدۡنٖۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ﴾ [الصف: ١٢]

“স্থায়ী জান্নাতের (আদন নামক জান্নাতের) উত্তম বাসগৃহ। এটাই মহা সাফল্য।” [সূরা আস-সাফ, আয়াত: ১২]

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এই পার্থিব জীবনে চতুষ্পদ জানোয়ারের মতো জীবন-যাপন করে; অতএব সে তার রবকে চেনে না এবং সে জানে না যে তার উদ্দেশ্য কী এবং এও জানে না যে, তার গন্তব্য-স্থল কোথায়? বরং তার উদ্দেশ্য হলো; খাবে, পান করবে এবং ঘুমবে। তাহলে তার মাঝে এবং সমস্ত জীব-জানোয়ারের মাঝে কী পার্থক্য? বরং সে তাদের চাইতে বড় বেশি বিপথগামী। মহান আল্লাহ  বলেন,

﴿ وَلَقَدۡ ذَرَأۡنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلۡجِنِّ وَٱلۡإِنسِۖ لَهُمۡ قُلُوبٞ لَّا يَفۡقَهُونَ بِهَا وَلَهُمۡ أَعۡيُنٞ لَّا يُبۡصِرُونَ بِهَا وَلَهُمۡ ءَاذَانٞ لَّا يَسۡمَعُونَ بِهَآۚ أُوْلَٰٓئِكَ كَٱلۡأَنۡعَٰمِ بَلۡ هُمۡ أَضَلُّۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡغَٰفِلُونَ ١٧٩ ﴾ [الاعراف: ١٧٨]

“আর আমরা তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৭৯]

তিনি আরও বলেন,

﴿ أَمۡ تَحۡسَبُ أَنَّ أَكۡثَرَهُمۡ يَسۡمَعُونَ أَوۡ يَعۡقِلُونَۚ إِنۡ هُمۡ إِلَّا كَٱلۡأَنۡعَٰمِ بَلۡ هُمۡ أَضَلُّ سَبِيلًا ﴾ [الفرقان: ٤٤]

“আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে ও বুঝে? তারা তো পশুর মত বরং তারা আরও বেশি পথভ্রষ্ট।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৪৪]

(১০) চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে:

কারণ কাফির এক শাস্তি থেকে আরেক শাস্তিতে স্থানান্তর হয়। তাই সে দুনিয়া থেকে বের হওয়া থেকে আরম্ভ করে আখেরাত পর্যন্ত ওর বিভিন্ন প্রকার যন্ত্রণা ও বিপদ ভোগ করতে থাকে। এর প্রথম পর্যায়ে সে যে শাস্তির উপযুক্ত তা প্রদান করতে তার নিকট মালাকুল মাউত বা মৃত্যুর ফিরিশতা আগমন করার আগেই শাস্তির ফিরিশতা আগমন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذۡ يَتَوَفَّى ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ يَضۡرِبُونَ وُجُوهَهُمۡ وَأَدۡبَٰرَهُمۡ﴾ [الانفال: ٥٠]

“(হে রাসূল) আর আপনি যদি (ঐ অবস্থা) দেখতে পেতেন, যখন ফিরিশতাগণ কাফিরদের রূহ কবজ করার সময় তাদের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৫০]

তারপর যখন তার রূহ বের হয় এবং তার কবরে অবতরণ করে তখন সে এর চেয়ে বেশি কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হয়। আল্লাহ তা‘আলা ফির‘আউনের বংশধরের সংবাদ দিয়ে বলেন,

﴿ٱلنَّارُ يُعۡرَضُونَ عَلَيۡهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوۡمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدۡخِلُوٓاْ ءَالَ فِرۡعَوۡنَ أَشَدَّ ٱلۡعَذَابِ﴾ [غافر: ٤٦]

“সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হবে আগুনের সম্মুখে, আর যেদিন কিয়ামত ঘটবে সেদিন বলা হবে ফির‘আউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৪৬]

তারপর যখন কিয়ামত হবে, সকল সৃষ্টিকুলকে পুনরুত্থিত করা হবে, মানুষের আমলসমূহ তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে, তখন কাফিররা দেখবে; আল্লাহ তা‘আলা তাদের যাবতীয় আমলকে সেই কিতাবের মধ্যে লিখে রেখেছেন, যার সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَوُضِعَ ٱلۡكِتَٰبُ فَتَرَى ٱلۡمُجۡرِمِينَ مُشۡفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَٰوَيۡلَتَنَا مَالِ هَٰذَا ٱلۡكِتَٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةً إِلَّآ أَحۡصَىٰهَاۚ وَوَجَدُواْ مَا عَمِلُواْ حَاضِرٗاۗ وَلَا يَظۡلِمُ رَبُّكَ أَحَدٗا ٤٩﴾ [الكهف: ٤٩]

“আর উপস্থাপিত করা হবে ‘আমলনামা, তখন তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধিদেরকে দেখবেন আতংকগ্রস্ত এবং তারা বলবে, ‘হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা তো ছোট বড় কিছু বাদ না দিয়ে সব কিছুই হিসেব করে রেখেছে।’ আর তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে; আর আপনার রব তো কারো প্রতি যুলুম করেন না।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৪৯]

সেখানে কাফির কামনা করবে যে, সে যদি মাটি হয়ে যেতো:

﴿يَوۡمَ يَنظُرُ ٱلۡمَرۡءُ مَا قَدَّمَتۡ يَدَاهُ وَيَقُولُ ٱلۡكَافِرُ يَٰلَيۡتَنِي كُنتُ تُرَٰبَۢا﴾ [النبا: ٤٠]

“সেদিন মানুষ তার নিজ হাতের অর্জিত কৃতকর্মকে দেখবে আর কাফির বলতে থাকবে: হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!” [সূরা আন-নাবা, আয়াত: ৪০]

কিয়ামত দিবসের সেই অবস্থার তীব্র আতঙ্কের কারণে, মানুষ যদি পৃথিবীর সবকিছুর মালিক হতো, তাহলে অবশ্যই তারা সেই দিনের ‘আযাব থেকে বাঁচার জন্য তা মুক্তিপণ দিতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ أَنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُواْ مَا فِي ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعٗا وَمِثۡلَهُۥ مَعَهُۥ لَٱفۡتَدَوۡاْ بِهِۦ مِن سُوٓءِ ٱلۡعَذَابِ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ وَبَدَا لَهُم مِّنَ ٱللَّهِ مَا لَمۡ يَكُونُواْ يَحۡتَسِبُونَ ٤٧﴾ [الزمر: ٤٦]

“যারা যুলুম করেছে তাদের কাছে যদি সমস্ত পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরো সম্পদ থাকে, তবুও কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য মুক্তিপণ স্বরূপ সকল কিছু তারা দিয়ে দিতে প্রস্তুত হবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৭]

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

﴿ يُبَصَّرُونَهُمۡۚ يَوَدُّ ٱلۡمُجۡرِمُ لَوۡ يَفۡتَدِي مِنۡ عَذَابِ يَوۡمِئِذِۢ بِبَنِيهِ ١١ وَصَٰحِبَتِهِۦ وَأَخِيهِ ١٢ وَفَصِيلَتِهِ ٱلَّتِي تُ‍ٔۡوِيهِ ١٣ وَمَن فِي ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعٗا ثُمَّ يُنجِيهِ ١٤ ﴾ [المعارج: ١١،  ١٤]

“তাদেরকে করা হবে একে অপরের দৃষ্টিগোচর। অপরাধী সেই দিনের শাস্তির বদলে দিতে চাবে আপন সন্তানকে। তার স্ত্রী ও ভাইকে। তার আত্মীয়-স্বজনকে, যারা তাকে আশ্রয় দিতো এবং পৃথিবীর সকলকে, যাতে এই মুক্তিপণ তাকে মুক্তি দেয়।” [সূরা আল-মা‘আরিজ, আয়াত: ১১-১৪]

কারণ সেই জায়গা (নিবাস) তো হলো প্রতিদানের জায়গা, তা কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষার জায়গা নয়। সুতরাং মানুষ তার কর্মের প্রতিফল অবশ্যই পাবে; দুনিয়ায় যদি তার কর্ম ভালো হয়, তবে তার প্রতিদানও ভালো হবে। আর দুনিয়ায় যদি তার কর্ম মন্দ হয়, তবে তার প্রতিদানও হবে মন্দ। আর আখেরাতে আবাসস্থলে কাফির যে মন্দ জিনিস পাবে তা হলো- জাহান্নামের শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার শাস্তি প্রদান করবেন, যাতে করে তারা তাদের মন্দ কর্মের কঠিন শাস্তি ভোগ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ هَٰذِهِۦ جَهَنَّمُ ٱلَّتِي يُكَذِّبُ بِهَا ٱلۡمُجۡرِمُونَ ٤٣ يَطُوفُونَ بَيۡنَهَا وَبَيۡنَ حَمِيمٍ ءَانٖ ٤٤ ﴾ [الرحمن: ٤٣،  ٤٤]

“এটা সেই জাহান্নাম, যা অপরাধীরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে।” [সূরা আর-রহমান, আয়াত: ৪৩, ৪৪]

আর তিনি তাদের পানীয় এবং পোশাক পরিচ্ছদ সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন,

﴿فَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ قُطِّعَتۡ لَهُمۡ ثِيَابٞ مِّن نَّارٖ يُصَبُّ مِن فَوۡقِ رُءُوسِهِمُ ٱلۡحَمِيمُ ١٩ يُصۡهَرُ بِهِۦ مَا فِي بُطُونِهِمۡ وَٱلۡجُلُودُ ٢٠ وَلَهُم مَّقَٰمِعُ مِنۡ حَدِيدٖ ٢١ ﴾ [الحج : ١٩،  ٢١]

“সুতরাং যারা কুফরী করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক; তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি। যা দ্বারা, তাদের পেটে যা রয়েছে তা এবং তাদের চামড়া বিগলিত করা হবে। আর তাদের জন্য থাকবে লোহা হাতুড়িসমূহ।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ১৯-২১]

 

উপসংহার

হে মানুষ! আপনি তো অস্তিত্বহীন ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে অস্তিত্ব দান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَوَ لَا يَذۡكُرُ ٱلۡإِنسَٰنُ أَنَّا خَلَقۡنَٰهُ مِن قَبۡلُ وَلَمۡ يَكُ شَيۡ‍ٔٗا﴾ [مريم: ٦٧]

“মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমরা তাকে পূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না?” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৬৭]

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা এক ফোটা শুক্র-বিন্দু থেকে আপনাকে সৃষ্টি করেন, তারপর আপনাকে শ্রবণকারী ও দর্শনকারী করেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هَلۡ أَتَىٰ عَلَى ٱلۡإِنسَٰنِ حِينٞ مِّنَ ٱلدَّهۡرِ لَمۡ يَكُن شَيۡ‍ٔٗا مَّذۡكُورًا ١ إِنَّا خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ مِن نُّطۡفَةٍ أَمۡشَاجٖ نَّبۡتَلِيهِ فَجَعَلۡنَٰهُ سَمِيعَۢا بَصِيرًا ٢﴾ [الانسان: ١،  ٢]

“মানুষের ওপর অন্তহীন মহাকালের এমন এক সময় কি আসেনি, যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না? আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি সংমিশ্রিত শুক্র বিন্দু থেকে, তাকে পরীক্ষা করবো এজন্য আমি তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দিয়েছি।” [সূরা আদ-দাহর, আয়াত: ১-২]

ক্রমান্বয়ে দুর্বল থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, এরপর আবারও আপনার প্রত্যাবর্তন হয় দুর্বলতার দিকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿۞ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَكُم مِّن ضَعۡفٖ ثُمَّ جَعَلَ مِنۢ بَعۡدِ ضَعۡفٖ قُوَّةٗ ثُمَّ جَعَلَ مِنۢ بَعۡدِ قُوَّةٖ ضَعۡفٗا وَشَيۡبَةٗۚ يَخۡلُقُ مَا يَشَآءُۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيمُ ٱلۡقَدِيرُ ٥٤﴾ [الروم: ٥٤]

“আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দূর্বলরূপে। অতঃপর দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি, শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।” [সূরা আর-রূম, আযাত: ৫৪]

অতঃপর সর্ব শেষে হয় মৃত্যু, যার মধ্যে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। আর আপনি (জীবনের) সেই স্তরগুলোর এক দুর্বলতা হতে আরেক দুর্বলতায় স্থানান্তরিত হন, কিন্তু আপনি আপনার নিজের ক্ষতিকে দূর করার সামর্থ্য রাখেন না, আর আপনি এ ব্যাপারে আপনার প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নি‘আমত যেমন শক্তি, সামর্থ্য ও খাদ্য ইত্যাদির সাহায্য চাওয়া ব্যতীত আপনি আপনার নিজের কোনো উপকার করতে পারেন না। আর আপনি তো সৃষ্টি লগ্ন হতেই অভাবগ্রস্ত ও মুখাপেক্ষী। আপনার জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, আপনার হাতের নাগালে নয়, এমন কত জিনিসেরই না আপনার প্রয়োজন হয়, কিন্তু ওগুলি আপনি কখনও লাভ করেন আবার কখনও তা ছিনিয়ে নেন। এমন অনেক জিনিস রয়েছে যা আপনার উপকার করে, সেগুলো আপনি অর্জন করতে চান, ফলে কখনও এগুলো জয় করেন, আবার কখনও অকৃতকার্য হন। এমন অনেক জিনিস রয়েছে যা আপনার ক্ষতি করে, আপনার আশা আকাঙ্ক্ষাকে ব্যর্থ করে, আপনার প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে এবং আপনার ওপর বিপদ-আপদ ও কষ্ট নিয়ে আসে, আর আপনি তা বিদূরিত করতে চান, ফলে কখনও একে দূর করেন, আবার কখনও অপারগ হন। আপনি কি আল্লাহর প্রতি আপনার অভাব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অনুভব করেন না? আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ أَنتُمُ ٱلۡفُقَرَآءُ إِلَى ٱللَّهِۖ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلۡغَنِيُّ ٱلۡحَمِيدُ ١٥﴾ [فاطر: ١٥]

“হে লোক সকল! তোমরা তো আল্লাহর মুখাপেক্ষী; কিন্তু আল্লাহ, তিনি অভাব-মুক্ত, প্রশংসিত।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৫]

ক্ষুদ্র ভাইরাসে আপনি আক্রান্ত হন, যা খালি চোখে দেখা যায় না, ফলে তা আপনাকে কঠিন রোগে আক্রান্ত করে, কিন্তু আপনি তা দূর করতে সক্ষম হন না, আর তখন আপনি আপনার মত এক দুর্বল মানুষের নিকট গমন করেন এই আশা নিয়ে যে, সে আপনার চিকিৎসা করবে। সুতরাং কখনও ঔষধে কাজ করে (রোগ ভালো হয়), আবার কখনও ডাক্তার তা ভালো করতে অপারগ হয়। তখন রোগী ও ডাক্তার উভয়ই দিশেহারা হয়ে পড়ে।

হে আদম সন্তান, দেখুন আপনি কত দুর্বল! যদি একটি মাছি আপনার কোনো জিনিস ছিনিয়ে নেয় (যেমন শরীরের রক্ত), তাহলে আপনি তার থেকে তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন না। আর আল্লাহ তো সত্যই বলেছেন; তিনি বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٞ فَٱسۡتَمِعُواْ لَهُۥٓۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَن يَخۡلُقُواْ ذُبَابٗا وَلَوِ ٱجۡتَمَعُواْ لَهُۥۖ وَإِن يَسۡلُبۡهُمُ ٱلذُّبَابُ شَيۡ‍ٔٗا لَّا يَسۡتَنقِذُوهُ مِنۡهُۚ ضَعُفَ ٱلطَّالِبُ وَٱلۡمَطۡلُوبُ ٧٣﴾ [الحج : ٧٣]

“হে লোক সকল! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, অতএব তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এই উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্রিত হলেও এবং মাছি যদি কোনো কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের নিকট থেকে, এটাও তারা তার নিকট থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। পূজারী এবং দেবতা কতই না দুর্বল!” [সূরা আল-হজ্জ্ব, আয়াত: ৭৩]

সুতরাং সামান্য একটি মাছি যা আপনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় তা যদি আপনি উদ্ধার করতে সক্ষম না হন, তাহলে আপনি আপনার কোন জিনিসের ক্ষমতা রাখেন? আপনার তাকদীর ও জীবন তো আল্লাহর হাতে, আর আপনার অন্তর তাঁর হাতের দুই আঙ্গুলের মাঝে, তিনি তা যেভাবে ইচ্ছা ওলট-পালট করেন। আপনার জীবন ও মৃত্যু এবং আপনার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য তাঁরই হাতে। আপনার নড়াচড়া ও নীরবতা এবং আপনার সমস্ত কথাবার্তা তাঁর অনুমতি ও ইচ্ছাতেই হয়। সুতরাং তাঁর বিনা হুকুমে আপনি নড়েন না এবং তাঁর বিনা ইচ্ছাই কোনো কিছু করেন না। তিনি যদি আপনার ওপর আপনার নিজের দায়িত্ব অর্পণ করেন, তাহলে তো তিনি এক অক্ষম, দুর্বল, শিথিল, গুনাহ ও ভুলকারীর নিকট আপনার দায়িত্ব অর্পণ করলেন। আর যদি তিনি অন্যের নিকট আপনার দায়িত্ব অর্পণ করেন, তাহলে তো তিনি আপনার দায়িত্ব অর্পণ করলেন এমন এক ব্যক্তির নিকট, যে ব্যক্তি আপনার কোনো ক্ষতি, লাভ, মৃত্যু, জীবন এবং পুনরুত্থান করার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং তাঁর নিকট হতে আপনার এক পলক অমুখাপেক্ষী হওয়ার কোনোই উপায় নেই। বরং গোপনে ও প্রকাশ্যে জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আপনি তাঁর নিকট নিরুপায়। যিনি আপনার ওপর সমস্ত নি‘আমত পূর্ণ করেন। পক্ষান্তরে প্রত্যেক দিক দিয়ে তাঁর নিকট আপনার তীব্র প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও, পাপাচার ও কুফুরী করার মাধ্যমে আপনি তার কাছে নিজেকে ঘৃণিত করেন। আপনি তাঁকে ভুলে রয়েছেন, অথচ আপনাকে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে এবং তাঁর সামনে আপনাকে বিচারের জন্য দাঁড়াতে হবে।[1]

হে মানুষ ! আপনার গুনাহের বোঝা বহন করার অক্ষমতা ও দুর্বলতার দিকে লক্ষ্য রেখে তিনি,

﴿يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمۡۚ وَخُلِقَ ٱلۡإِنسَٰنُ ضَعِيفٗا﴾ [النساء : ٢٨]

“আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান, যেহেতু মানুষ দূর্বলরূপে সৃষ্ট হয়েছে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৮]

তাই তিনি রাসূল প্রেরণ করেন, কিতাব অবতীর্ণ করেন, বিধি-বিধান প্রবর্তন করেন, আপনার সামনে সঠিক পথ দাঁড় করান এবং যুক্তি, দলীল-প্রমাণাদি ও সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এমনকি তিনি আপনার জন্য প্রতিটি বিষয়ে এমন নিদর্শন স্থির করেন যা তাঁর একত্ববাদ, প্রভুত্ব ও উপাসনার প্রমাণ বহন করে। পক্ষান্তরে আপনি বাতিল দিয়ে হক বা মহা সত্যকে দূর করেন এবং আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেন ও বাতিলের সাহায্যে বিতর্কে লিপ্ত হন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَكَانَ ٱلۡإِنسَٰنُ أَكۡثَرَ شَيۡءٖ جَدَلٗا﴾ [الكهف: ٥٤]

“আর মানুষেরা অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্ক প্রিয়।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৫৪]

আর আপনাকে আল্লাহর ঐ সমস্ত নি‘আমতের কথা ভুলিয়ে দেন, যার মধ্যে আপনি আপনার শুরু এবং শেষ অতিবাহিত করেন! আপনি কি স্মরণ করেন না, আপনাকে এক ফোটা শুক্র-বিন্দু থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তারপর আপনার প্রত্যাবর্তন হবে কবরে, অতঃপর সেখান হতে আপনার পুনরুত্থানের পর ঠিকানা হবে জান্নাতে অথবা জাহান্নামে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَوَ لَمۡ يَرَ ٱلۡإِنسَٰنُ أَنَّا خَلَقۡنَٰهُ مِن نُّطۡفَةٖ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٞ مُّبِينٞ ٧٧ وَضَرَبَ لَنَا مَثَلٗا وَنَسِيَ خَلۡقَهُۥۖ قَالَ مَن يُحۡيِ ٱلۡعِظَٰمَ وَهِيَ رَمِيمٞ ٧٨ قُلۡ يُحۡيِيهَا ٱلَّذِيٓ أَنشَأَهَآ أَوَّلَ مَرَّةٖۖ وَهُوَ بِكُلِّ خَلۡقٍ عَلِيمٌ ٧٩﴾ [يس: ٧٧،  ٧٩]

“মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্র-বিন্দু হতে? অথচ হঠাৎ করেই সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী। আর সে আমার সম্বন্ধে উপমা পেশ করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে: হাড্ডিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে, যখন তা পচে গলে যাবে? (হে রাসূল) আপনি তাদেরকে বলুন: এতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তো তিনিই, যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৭৭-৭৯]

তিনি আরও বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡإِنسَٰنُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ ٱلۡكَرِيمِ ٦ ٱلَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّىٰكَ فَعَدَلَكَ ٧ فِيٓ أَيِّ صُورَةٖ مَّا شَآءَ رَكَّبَكَ ٨﴾ [الانفطار: ٦،  ٨]

“হে মানুষ! কিসে তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলেছে? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং তৎপর সুবিন্যস্ত করেছেন। যে আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে সংযোজিত করেছেন।” [সূরা আল-ইনফিতার, আয়াত: ৬-৮]

হে মানুষ! আপনি মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে ডাকবেন এই আনন্দ থেকে নিজেকে কেন বঞ্চিত করছেন? যাতে করে তিনি আপনাকে অভাব-মুক্ত করেন, আপনাকে আরোগ্য দান করেন, আপনার বিপদ-আপদ দূর করেন, আপনাকে ক্ষমা করেন, আপনার অনিষ্টকে অপসারণ করেন, আপনার প্রতি যুলুম করা হলে সাহায্য করেন, আপনি দিশেহারা এবং পথভ্রষ্ট হলে পথ দেখান, আপনি অজ্ঞ হলে শিক্ষা দেন, ভয় পেলে নিরাপত্তা দেন, আপনার দুর্বলতার সময় দয়া করেন, আপনার শত্রুদেরকে আপনার নিকট থেকে নিবৃত্ত করেন এবং আপনাকে রিযিক দেন।

হে মানুষ! আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে যে সব নি‘আমত দান করেছেন তার মধ্যে সত্য দীনের নি‘আমতের পর সব চাইতে বড় নি‘আমত হলো জ্ঞান বা বুদ্ধি। কারণ যা তার উপকার করে এবং যা ক্ষতি করে, সে এর মাধ্যমে পার্থক্য করে, আল্লাহর আদেশ ও নিষেধকে বুঝে এবং এর মাধ্যমেই সে জানতে পারে মানুষ সৃষ্টির মহান উদ্দেশ্যকে; আর তা হলো: একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত বন্দেগী করা, যার কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ পাক বলেন,

﴿وَمَا بِكُم مِّن نِّعۡمَةٖ فَمِنَ ٱللَّهِۖ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فَإِلَيۡهِ تَجۡ‍َٔرُونَ ٥٣ ثُمَّ إِذَا كَشَفَ ٱلضُّرَّ عَنكُمۡ إِذَا فَرِيقٞ مِّنكُم بِرَبِّهِمۡ يُشۡرِكُونَ ٥٤﴾ [النحل: ٥٣،  ٥٤]

“তোমরা যেসব নি‘আমত ভোগ কর, তা তো আল্লাহরই নিকট থেকে; আবার যখন দুঃখ-কষ্ট তোমাদেরকে স্পর্শ করে, তখন তোমরা তাঁকেই ব্যাকুলভাবে আহ্বান কর। এরপর যখন আবার আল্লাহ তোমাদের দুঃখ-কষ্টকে দূরীভূত করেন, তখন তোমাদের একদল তাদের রবের সাথে অংশীদার স্থির করে।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫৩-৫৪]

হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয় জ্ঞানবান ব্যক্তি মহত্তর কর্মসমূহ পছন্দ করে এবং নিকৃষ্ট ও নীচু কর্মসমূহকে ঘৃণা করে, আর প্রত্যেক সম্মানিত নবী ও সৎ ব্যক্তিদের অনুসরণ করা ভালোবাসে এবং সে তাদের নাগাল না পেলেও তার মন সব সময় তাদের সাথে মিলিত হতে চায়। আর সে পথ পাওয়ার রাস্তা তো হলো এটাই; মহান আল্লাহ তাঁর বাণীতে যে পথনির্দেশ করেছেন:

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ﴾ [ال عمران: ٣١]

“যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসা তবে আমার অনুসরণ কর , তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১]

সুতরাং সে যদি এই বাণী মান্য করে চলে, তবে আল্লাহ তাকে নবী, রাসূল, শহীদ ও সৎ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُوْلَٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَۚ وَحَسُنَ أُوْلَٰٓئِكَ رَفِيقٗا ٦٩﴾ [النساء : ٦٩]

“আর কেউ আল্লাহ্ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ- যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯]

হে মানুষ! আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আপনি একটি নির্জন স্থানে একাকী হন, অতঃপর চিন্তা করুন; আপনার নিকট সত্য কি এসেছে? আপনি তার দলীল দেখুন এবং তার যুক্তি ও প্রমাণাদি নিয়ে গবেষণা করুন। ফলে আপনি যদি দেখেন যে তা সত্য, তাহলে তার অনুসরণ করুন। কখনও পরিচিত অভ্যাস ও দেশ প্রথার নিকট বন্দী হবেন না। জেনে রাখবেন! নিশ্চয় আপনার জীবন আপনার নিকট, আপনার বন্ধু-বান্ধব, জমি-জমা এবং বাপ-দাদার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির চেয়েও অধিক সম্মানিত। আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদেরকে এর উপদেশ দেন এবং তিনি বলেন,

﴿قُلۡ إِنَّمَآ أَعِظُكُم بِوَٰحِدَةٍۖ أَن تَقُومُواْ لِلَّهِ مَثۡنَىٰ وَفُرَٰدَىٰ ثُمَّ تَتَفَكَّرُواْۚ مَا بِصَاحِبِكُم مِّن جِنَّةٍۚ إِنۡ هُوَ إِلَّا نَذِيرٞ لَّكُم بَيۡنَ يَدَيۡ عَذَابٖ شَدِيدٖ ٤٦﴾ [سبا: ٤٦]

“(হে রাসূল!) আপনি বলুন: আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি; তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দুই দুই জন অথবা এক এক জন করে দাঁড়াও, অতঃপর তোমরা চিন্তা করে দেখো, তোমাদের সাথী আদৌ পাগল নয়। সে তো আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ককারী মাত্র।” [সূরা সাবা, আয়াত:৪৬]

হে মানুষ! আপনি ইসলাম গ্রহণ করলে আপনার কোনো কিছুই হারানোর নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَاذَا عَلَيۡهِمۡ لَوۡ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقَهُمُ ٱللَّهُۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِهِمۡ عَلِيمًا ٣٩﴾ [النساء : ٣٩]

“আর এতে তাদের কী হতো, যদি তারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনয়ন করতো এবং আল্লাহ তাদেরকে যে রিযিক প্রদান করেছেন তা থেকে ব্যয় করতো? আর আল্লাহ তাদের বিষয়ে মহাজ্ঞানী।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত:৩৯]

ইমাম ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন: তারা যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং ভালো পথে চলে তবে তাদেরকে কোনো জিনিস ক্ষতি করবে? বরং তারা যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং আল্লাহ তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছেন তা হতে ঐ খাতে ব্যয় করে যা তিনি ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন; তাহলে আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাদের সঙ্গে কিয়ামত দিবসে সৎ আমলকারীদের সাথে যেমন আচরণ করবেন, তাদের সাথেও তেমনই আচরণ করবেন। আর তিনি তো তাদের সৎ ও বাতিল নিয়ত এবং তাদের মধ্যে কে আল্লাহর তাওফীক পাওয়ার হকদার সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত রয়েছেন। ফলে তিনি তাকে তাওফীক দান করেন এবং তার অন্তরকে হিদায়াতের দিকে চলতে ইলহাম (গোপন নির্দেশ প্রদান) করেন। আর তিনি তাকে এমন সৎ কাজের জন্য নিয়োজিত করেন যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। আর মহান আল্লাহর নৈকট্য থেকে কে ব্যর্থ ও বিতাড়নের হকদার তাও তিনি অবগত আছেন। আর যে ব্যক্তি তাঁর নিকট থেকে বিতাড়িত সে তো দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নিশ্চয় আপনার ইসলাম গ্রহণ করা, তা আপনার মাঝে এবং আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন এমন যে কোনো কাজ করার মাঝে, কখনও বাধা সৃষ্টি করে না। বরং আল্লাহ আপনাকে প্রত্যেক আমলের বিনিময়ে সাওয়াব দিবেন যা আপনি একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করেন। যদিও তা আপনার দুনিয়ার কাজে লাগে এবং আপনার সম্পদ, মর্যাদা ও গৌরব বৃদ্ধি করে। এমনকি আপনি যে সমস্ত মুবাহ বা বৈধ কোনো কিছু গ্রহণ করেন, সে ক্ষেত্রে যদি হারাম থেকে বাঁচার জন্য হালালের ওপর তৃপ্ত থাকার সাওয়াব কামনা করেন, তাহলেও এর মধ্যে আপনার জন্য সাওয়াব আছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، أَيَأتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ؟ قَالَ: «أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرٌ؟ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ»

“তোমাদের কারোও স্ত্রী সহবাসেও সদকার সাওয়াব রয়েছে। সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! এটা কীভাবে হয় যে, আমরা যৌনতৃপ্তি অর্জন করবো আর তাতে সাওয়াবও রয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমরা বল তো দেখি, যদি কেউ ব্যভিচার করে তাহলে তার কি গুনাহ হবে না? অতএব, সে যদি তা না করে হালালভাবে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তাহলে অবশ্যই সাওয়াব হবে।”[2]

হে মানুষেরা! নিশ্চয় রাসূলগণ সত্য সহকারে আগমন করেন এবং আল্লাহর উদ্দেশ্য প্রচার করেন। আর মানুষ তাঁর শরী‘আতকে জানার ব্যাপারে মুখাপেক্ষী, যাতে করে সে এই পার্থিব জীবনে বুদ্ধিমত্তার সাথে চলতে এবং আখেরাতে কামিয়াব হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَكُمُ ٱلرَّسُولُ بِٱلۡحَقِّ مِن رَّبِّكُمۡ فَ‍َٔامِنُواْ خَيۡرٗا لَّكُمۡۚ وَإِن تَكۡفُرُواْ فَإِنَّ لِلَّهِ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمٗا ١٧٠﴾ [النساء: ١٧٠]

“হে মানুষেরা! নিশ্চয় তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সত্যসহ রাসূল আগমন করেন। অতএব তোমরা ঈমান আনয়ন কর, তাহলে তোমাদের কল্যাণ হবে, আর যদি অবিশ্বাস কর তবে নভোমণ্ডলে ও ভূ-মন্ডলে যা কিছু আছে তা আল্লাহর জন্য। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭০]

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَكُمُ ٱلۡحَقُّ مِن رَّبِّكُمۡۖ فَمَنِ ٱهۡتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهۡتَدِي لِنَفۡسِهِۦۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيۡهَاۖ وَمَآ أَنَا۠ عَلَيۡكُم بِوَكِيلٖ ١٠٨﴾ [يونس : ١٠٨]

“(হে রাসূল!) আপনি বলে দিন: হে মানুষেরা! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য (দীন) এসেছে। অতএব যে ব্যক্তি সঠিক পথে আসবে, বস্তুত সে নিজের জন্যেই সঠিক পথে আসবে, আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট থাকবে, তার পথভ্রষ্টতা তারই ওপর বর্তাবে, আর আমাকে তোমাদের ওপর দায়বদ্ধ করা হয়নি।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৮]

হে মানুষ! আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তাতে আপনার নিজেরই লাভ। আর যদি আপনি কুফরি করেন তবে তাতে আপনার নিজেরই ক্ষতি। মহান আল্লাহ তো তাঁর বান্দা থেকে অমুখাপেক্ষী। সুতরাং অবাধ্যদের অবাধ্যতা তাঁর কোনো ক্ষতিই করতে পারে না। আর আনুগত্যকারীর আনুগত্যও তাঁর কোনো উপকার করতে পারে না। ফলে তাঁর অজান্তে কেউ পাপ কার্য করতে এবং তাঁর বিনা হুকুমে কেউ আনুগত্য করতে পারে না। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দেন যে তিনি বলেন:

«يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوا، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌّ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ، فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ جَائِعٌ، إِلَّا مَنْ أَطْعَمْتُهُ، فَاسْتَطْعِمُونِي أُطْعِمْكُمْ، يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ عَارٍ، إِلَّا مَنْ كَسَوْتُهُ، فَاسْتَكْسُونِي أَكْسُكُمْ، يَا عِبَادِي إِنَّكُمْ تُخْطِئُونَ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَأَنَا أَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا، فَاسْتَغْفِرُونِي أَغْفِرْ لَكُمْ، يَا عِبَادِي إِنَّكُمْ لَنْ تَبْلُغُوا ضَرِّي فَتَضُرُّونِي وَلَنْ تَبْلُغُوا نَفْعِي، فَتَنْفَعُونِي، يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَتْقَى قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ مِنْكُمْ، مَا زَادَ ذَلِكَ فِي مُلْكِي شَيْئًا، يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَفْجَرِ قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِنْ مُلْكِي شَيْئًا، يَا عِبَادِي لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِي صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِي فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ، مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِي إِلَّا كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ، يَا عِبَادِي إِنَّمَا هِيَ أَعْمَالُكُمْ أُحْصِيهَا لَكُمْ، ثُمَّ أُوَفِّيكُمْ إِيَّاهَا، فَمَنْ وَجَدَ خَيْرًا، فَلْيَحْمَدِ اللهَ وَمَنْ وَجَدَ غَيْرَ ذَلِكَ، فَلَا يَلُومَنَّ إِلَّا نَفْسَهُ»

“হে আমার বান্দাগণ! আমি যুলুমকে আমার জন্য হারাম করেছি; আর তা তোমাদের মধ্যেও হারাম করে দিলাম। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর যুলুম করো না। হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে হিদায়াত দান করি সে ছাড়া তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট। সুতরাং আমার কাছে হিদায়াত চাও, আমি তোমাদেরকে হিদায়াত দান করব। হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে খাদ্য দান করি, সে ছাড়া সবাই ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদেরকে খাদ্য দান করব। হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে কাপড় পরিয়েছি সে ব্যতীত, তোমরা সবাই বিবস্ত্র। সুতরাং তোমরা আমার কাছে বস্ত্র চাও, আমি তোমাদেরকে বস্ত্র দান করব। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা রাত-দিন গুনাহ করছ, আর আমি তোমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেই। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিব। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা কখনই আমার ক্ষতি করার সামর্থ্য রাখ না যে, আমার ক্ষতি করবে; আর তোমরা কখনই আমার ভালো করার সামর্থ্য রাখ না যে, আমার ভালো করবে। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্বের ও পরের সকল মানুষ ও জিন্ন যদি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মুত্তাকী ও পরহেজগার ব্যক্তির হৃদয় হয়ে যায়, তবে তা আমার রাজত্বে কিছুই বাড়াতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্বের ও পরের সকল মানুষ ও জিন্ন যদি তোমাদের মধ্যে একজন সবচেয়ে পাপী ব্যক্তির হৃদয় হয়ে যায়, তবে তা আমার রাজত্বে কিছুই কমাতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের পূর্বের ও পরের সকল মানুষ ও জিন্ন যদি একই ময়দানে দাঁড়িয়ে আমার কাছে চায় এবং আমি সকলের চাওয়া পূরণ করে দেই, তবে আমার কাছে যা আছে তাতে সমুদ্রে একটি সুই ডুবালে যতটা কম হয়ে যায় তা ব্যতীত আর কিছুই কম হতে পারে না। হে আমার বান্দাগণ! আমি তোমাদের আমলকে (কাজকে) তোমাদের জন্যে গণনা করে রাখি, আর আমি তার পুরোপুরি প্রতিফল দেব। সুতরাং যে ব্যক্তি উত্তম প্রতিফল পাবে তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করা উচিৎ, আর যে এর বিপরীত পাবে তার শুধু নিজেকেই ধিক্কার দেয়া উচিৎ।”[3]

والحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের রব। দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক সমস্ত নবী ও রাসূলগণের সর্বোত্তম ব্যক্তি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সকল সহচরবৃন্দের ওপর।

সমাপ্ত

[1] ইমাম ইবনুল কায়্যেম রাহিমাহুল্লাহ রচিত “আল-ফাওয়াইদ, পৃ. ৫৬ (কিছু পরিবর্তিত)।

[2] সহীহ মুসলিম, কিতাবুয যাকাত, হাদীস নং ১০০৬।

[3] সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি, অনুচ্ছেদ: তাহরীমুয যুলমি, হাদীস নং ২৫৭৭।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন