Quran Translation to Bangla

মূল:বিশ্বনবী প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শ

সিরাজুল ইসলাম আলী আকবর

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ

যাকারিয়া আলী হাসান তৈয়ব

এ পর্যন্তকার আলোচনা থেকে এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলাম এক বিশ্বজনীন ও সর্বকালীন দীন। সকল প্রকার ভৌগলিক আঞ্চলিকতা ও সময়কালের সীমাবদ্ধতার সমস্ত বেড়াজালকে তা ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে।

গোত্র, বর্ণ, বংশ বা জাতি প্রভৃতি যাবতীয় সংকীর্ণতাকে ইসলাম পূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে এড়িয়ে গেছে। কোনোরূপ বস্তুগত বা কালগত পার্থক্যকেই ইসলাম স্বীকার করেনি কোনোদিন। তবে ইসলাম মানুষে মানুষে পার্থক্যের একটি মাত্র ভিত্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছে আর তা হচ্ছে তাকওয়া- আল্লাহকে ভয় করে চলার পবিত্র ভাবধারার দিক দিয়ে কে অগ্রসর আর কে পশ্চাদপদবর্তী। এই একটি মাত্র প্রশ্নে যে অগ্রসর তাকে ইসলাম অগ্রাধিকার দিয়েছে  আর যে তা নয়, তাকে অগ্রাধিকার দিতে ইসলাম রাজী নয়।

মানুষে মানুষে পার্থক্যের এই ভিত্তি পুরোপুরি গুণগত ব্যাপার। এ গুণটি কারোর পক্ষে অর্জনীয়, কারো পক্ষে নয়, এমন নয়; বরং নির্বিশেষে সকল মানুষই এই গুণ নিজের মধ্যে অর্জন করতে পারে এবং পারে এ গুণের বলে অধিক মর্যাদাবান হতে।

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ ١٣﴾ [الحجرات: ١٣] 

“হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন  নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি শুধু এ উদ্দেশ্যে যে, এর মাধ্যেমে তোমরা পারস্পরিক পরিচিতি লাভ করবে। তবে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানার্হ সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্য সর্বাধিক তাকওয়াধারী”। [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]

এ আয়াত দুনিয়ার সকল প্রকার বংশ গোত্র বা জাতিভিত্তিক হিংসাদ্বেষ, আত্মম্ভরিতাকে ভেঙ্গে ফেলেছে। বিশ্বমানবতার প্রতি এটাই ইসলামের অবদান। এর পূর্বে অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদই এর উদার মানবিকতার আদর্শ পেশ করতে বা গ্রহণ করতে পারেনি। ইসলামের পক্ষে তা পেশ করতে সম্ভব হয়েছে তার তওহীদী আকীদার কারণেই। এ আকীদা অনুযায়ী বিশ্ব স্রষ্টা যেমন এক আল্লাহ, তেমনি বিশ্বমানবতাও একই পিতা মাতা থেকে উৎসারিত, সর্বতোভাবে অভিন্ন, সকল মানুষ একই পিতা মাতার সন্তান, সকলের দেহে একই পিতা মাতার রক্ত। এ পর্যায়ে স্বয়ং রাসূলে করীমসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণাবলি অত্যন্ত উদাত্ত ও বলিষ্ঠ। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«قَدْ أَذْهَبَ اللَّهُ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، وَالنَّاسُ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ»  

“আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলীয়াতের যাবতীয় আত্মম্ভরিকতা এবং বংশগৌরব নিয়ে অহংকার দূর করে দিয়েছেন। তবে (মানুষের মধ্যে মর্যাদা নির্ণায়ক হলো) মুমিন মুত্তাকী এবং পাপাচারী দুর্ভাগা। তোমরা সকলেই আদম সন্তান এবং আদম মাটি থেকে সৃষ্ট”। (তিরমিযী, হাদীস নং ৩৯৫৬)

ইসলামের সার্বজনীনতা ও সর্বকালীন প্রমাণকারী উপরোদ্ধৃত অকাট্য দলীল-প্রমাণ সত্ত্বেও পাশ্চাতের ইসলামের দুশমন প্রাচ্যবিদ স্যার উইলিয়াম মূর বলতে দ্বিধা করেন নি, “ইসলামের বিশ্বজনীনতার ধারণা পরবর্তীকালে সৃষ্ট” এ পর্যায়ের বহুসংখ্যক আয়াত ও হাদীস বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন: এমনকি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ সম্পর্কে তা চিন্তা করেননি। তিনি চিন্তা করেছিলেন, এ কথা মেনে নিলেও তার চিন্তা ছিল প্রচ্ছন্ন। আসলে তার চিন্তার জগত ছিল শুধু আরব দেশ। তার উপস্থাপিত দীন কেবল আরবদের জন্য রচিত। আর মুহাম্মদ তার দাওয়াত নবুওয়ত লাভের সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কেবল আরবদের সম্মুখেই পেশ করেছেন, অন্য কারোর জন্য নয়”।

স্পষ্টত মনে হচ্ছে, উইলিয়াম মূর নিতান্ত অন্ধ বলেই ইসলামের বিশ্বজনীনতাকে দেখতে পান নি, তার সংকীর্ণতা ও দৃষ্টিভ্রম এর একমাত্র কারণ।

মনে হচ্ছে তিনি একজন ইতিহাসবিদ হয়েও তদানীন্তন আরবের বিশ্ববাণিজ্য পরিক্রমা সম্পর্কে কিছুমাত্র অবহিত ছিলেন না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের বাইরের দেশসমূহ সম্পর্কে জানতেন না, নবুওয়ত লাভ করার পর তিনি সমগ্র দৃষ্টি কেবল আরব দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন- এ ধরনের কথা ইতিহাসের দৃষ্টিতেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কে না জানে তিনি নবুয়ত লাভের পূর্বে আরব উপদ্বীপের বাইরে ব্যবসা উপলক্ষে যাতায়াত করেছেন? তা সত্ত্বেও কি এ কথা বলা যেতে পারে যে, তিনি আরব দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ সম্পর্কে জানতেন না? অথচ তার দীনি দাওয়াতের প্রথম পর্যায়েই তার প্রতি ঈমান এনেছিল হাবশার বেলাল, রোমের সুহাইব এবং পারস্যের সালমান। এসব দেশ তো আরবের বাইরে অবস্থিত। তাছাড়া কুরআনের বাণী তাঁকে ও তাঁর দাওয়াতকে বিশ্বজনীন ও সার্বজনীন বানিয়েছে- বানিয়েছে সর্বকালীন। কেননা আল-কুরআন দাবী করেছে:

﴿وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ ٨٩﴾ [النحل: ٨٩] 

“হে নবী! তোমার প্রতি যে কিতাব নাযিল করেছি, তা সব কিছুর ভাষ্যকার, মুসলিমদের জন্য হিদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ”। [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮৯]

এই মুসলিম দুনিয়ার যে কোনো মানুষই হতে পারে। হতে পারে ইসলাম কবুল করলেই। প্রথম পর্যায়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচারিত দীন সার্বজনীন ও সর্বজাতীয় তথা আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করেছিল। সেই পর্যায়ের ইতিহাসই তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে।