ইসলাম কি অমুসলিমদের অধিকার নিশ্চিত করে -ওয়ান

প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে তিনি বললেন, ‘আসলে, পারিবারিকভাবে আমি মুসলিম পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়েছে ইসলাম হলো একটি সাম্যের ধর্ম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার মনে নানা ধরনের প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। আমি অবশ্য ধর্ম কিংবা স্রষ্টা কোনোটিই অস্বীকার বা অবিশ্বাস করি না। ইসলাম নিয়েও আমার ঢের কোনো আপত্তি নেই। তবুও মাঝে মাঝে আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে। আমার খুব করে জানতে মন চায় ইসলাম অমুসলিমদের স্বাধীনতা রক্ষায়, অধিকার রক্ষার ব্যাপারে আদৌ তৎপর কি না? তুমি প্রশ্ন করতে পারো, আমার মধ্যে এই প্রশ্ন জাগল কেন? আসলে, ব্যক্তিগত জীবনে এবং চাকরির সুবাদে দেশে-বিদেশে প্রচুর অমুসলিমের সাথে আমি লেনদেন করেছি। তাদের অধিকাংশকেই আমি সৎ ও ভালো মানুষ হিশেবে পেয়েছি। এমতাবস্থায়, যদি ধরে নিই যে, দেশে শারয়ী আইন বাস্তবায়িত হচ্ছে, তাহলে তাদের সাথে ইসলামিক পারস্পেক্টিভ থেকে কীরকম আচরণ করা হবে? তাদের অধিকার কতটুকু নিশ্চিত করা হবে? তাদের ধর্মান্তকরণে জোর-জুলুম, জবরদস্তি করা হবে কি না?

ভদ্রলোক এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন কথাগুলো। কোথাও একটিবারের জন্যও থামেননি। প্রশ্ন করা শেষে তিনি উৎসুক চোখ নিয়ে সাজিদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন উত্তর পাবার আশায়। সাজিদ খানিকটা সময় নিয়ে কিছু চিন্তা করে বলল, “ভেরি গুড কোয়েশ্চান। এই ব্যাপারে সঠিক ধারণাটি আমাদের প্রত্যেকেরই জানা উচিত। এমন নয় যে, এটা আমাদের মষ্টিমেয় কয়েকজনের প্রশ্ন। ইসলামকে আক্রমণ করতে আসা অনেকে এই প্রশ্নটা করে থাকে। তারা বলে, শারয়ী আইন নাকি অমুসলিমদের অধিকার খর্ব করে, তাদের ধর্মান্তকরণে জোর জবরদস্তি করে ইত্যাদি।

আমার চোখেমুখে ঘুমের যে লেশটুকু অবশিষ্ট ছিল, এখন তাও লাপাত্তা। এদের দুজনের আলোচনা শোনার জন্য একটু নড়েচড়ে বসলাম। ট্রেনের জানালার ফাঁক গলে বাইরের বাতাস এসে ভেতরে ঢুকছে। তাতে হালকা শীত শীতও লাগছে। ভদ্রলোক সাজিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী যেন নাম তোমার?

সাজিদ সুন্দর করে তার নাম বলল। তারপর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আমাকেও জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম?

বললাম, আরিফ।

‘বেশ! শুরু করা যাক তাহলে?

দূর্বার গতিতে ছুটে চলছে ঢাকাগামী ট্রেন। শামসুর রাহমানের কবিতার মতো ঝকঝক শব্দ করে করে এটি পার করছে একটির পর একটি স্টেশন। আশপাশের গাছপালা, মানুষগুলোকে খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির মনে হচ্ছে।

সাজিদ বলল, “ব্যাপারটি ভালোমতো বোঝার জন্য প্রথমে আমাদের দেখতে হবে এই ইস্যুতে কুরআন কী বলছে। কুরআন বলছে, There shall be no compulsion in (acceptance of) the religion.’অর্থাৎ ধর্মের মধ্যে কোনোরকম জোরজবরদস্তি নেই।[১]।

কথাটি খুবই স্পষ্ট এবং পরিষ্কার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলে দিচ্ছেন যে, ধর্মে কোননারকম চাপাচাপি নেই। আপনি হিন্দু ধর্ম পালন করতে চান? খ্রিষ্টান অথবা ইহুদী ধর্ম? ফাইন। ইসলাম বলছে, আপনি সেটি অবশ্যই পারেন। ইসলাম এক্ষেত্রে আপনাকে বাঁধা দেবে না।

তিনি বললেন, তাহলে কেউ অন্য ধর্ম মানতে চাইলে তাকে তার ধর্ম ছেড়ে আমার ধর্মে আসার জন্য বলতে পারব না?’

সাজিদ বলল, অবশ্যই পারবেন। এটা তো জোরজবরদস্তি নয়। এটা আপনার বিশ্বাসের প্রচারণা। আর এই প্রচারণা কীভাবে করতে হবে সেটারও খুব সুন্দর উপায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, Invite (all) to the way of ur Lord with wisdom & beautiful preaching; And argue with them in ways that are best & most gracious.[২] অর্থাৎ ‘স্বীয় রবের পথে মানুষকে আহ্বান করুন জ্ঞান এবং হিকমার মাধ্যমে। আর তাদের সাথে কথা বলুন সুন্দরভাবে। দেখুন, এখানে খুবই স্পষ্ট করে বলে দেওয়া আছে মানুষদের দ্বীনের পথে ডাকার পদ্ধতি। ইসলাম বলছে, আপনি তাদের সাথে অহেতুক, অযৌক্তিক কথা বলতে পারবেন না। আপনি যদি দাবি করেন যে আপনার বিশ্বাস সত্য, আপনার ধর্ম সত্য, তাহলে উপযুপরি যুক্তি, প্রমাণ, দলীল দেখিয়ে তাদের সাথে তর্ক করতে বলা হয়েছে এবং তর্কের সময়ে আপনাকে তাদের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহারটাই করতে বলা হয়েছে।’

‘হুম; কিন্তু কুরআনের এক জায়গায় বলা হয়েছে মুশরিকদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই হত্যা করতে। এটা কেন?’

‘খুবই সহজ জিনিস। হ্যাঁ, কুরআন বলেছে মুশরিকদের যেখানেও পাও, হত্যা করো; কিন্তু, আপনাকে এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট জানতে হবে। এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে যখন মুসলিম বাহিনী এবং মুশরিক বাহিনী পরস্পর মুখখামুখি। এই আয়াতে যে-নির্দেশ এসেছে সেটি কেবল ওই প্রেক্ষাপটে। যেমন—৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কালজয়ী ভাষণে বলেছিলেন, “আমরা ওদের ভাতে মারব, পানিতে মারব। তার এই কথাগুলো তখন যুদ্ধশিবিরে অবস্থানরত সৈনিকদের উদ্দীপ্ত করেছিল; প্রেরণা জুগিয়েছিল; কিন্তু আজকে এই সময়ে কি আমরা বলি, ‘পাকিস্তানীদের আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব? বলি না। ঠিক একইভাবে, কুরআনের সেই আয়াত বিশেষ একটি সময়, প্রেক্ষাপট ও একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নাযিল হয়েছিল। এটা কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না যে, এই আয়াত দিয়ে ইসলাম সবসময় অমুসলিমদের হত্যার বিধান দিয়েছে বা এরকম কিছু।

সাজিদ থামল। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, “কুরআন কি এমন কারও সাথে রক্তারক্তিতে জড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিচ্ছে না, যারা আদতে সংখ্যালঘু এবং নিরপরাধ?

আমি সাজিদের মুখ থেকে কথা কেড়ে নেওয়ার মতো করে বললাম, ‘একদমই না। প্রথমত এই আয়াত যখন নাযিল হয়, তখন কাফির-মুশরিকরা সংখ্যালঘু ছিল না; বরং মুসলিমরা ছিল সংখ্যালঘু।

সাজিদ বলল, আপনার পয়েন্টটি দারুণ। কুরআন কি অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বলেছে? দেখুন, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলছেন, ‘Fight in the way of Allah (with) those who fight you.”[৩] অর্থাৎ আল্লাহ্‌ বলেছেন ‘তাদের সাথেই কেবল যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পৃথিবীর কোনো জাতি কি এই থিওরিতে বিশ্বাস করে যে, অন্য একটি জাতি এসে তাদের মেরে সাফ করে যাবে, আর তারা তাদের জামাই আদর দিয়ে বরণ করে নেবে?

ভদ্রলোক বললেন, না।

সাজিদ আবার বলল, এরপরেই কুরআন বলছে, ‘But do not transgress. অর্থাৎ কিন্তু সীমা অতিক্রম কোরো না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, তোমাদের সাথে যারা যুদ্ধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে। এটা কীরকম সীমা? মানে, যারা যুদ্ধ করতে চায় না বা করে না, যারা মুশরিক-কাফির; কিন্তু অত্যাচারী সম্প্রদায়ভুক্ত নয়, যারা নিরপরাধ, তাদের যেন জান এবং মালের কোনো ক্ষতি না হয়। এরকম বাড়াবাড়ি করলে কী হবে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা একই আয়াতে স্পষ্ট করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদের ভালোবাসেন না। এটাই হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে মুসলিমদের জন্য যুদ্ধের শর্ত এবং বাউন্ডারি। বলুন তো এরমধ্যে আপনি এমন কিছু কি দেখছেন যেটা আপনার দৃষ্টিতে খারাপ বা বাড়াবাড়ি?

লোকটা ‘না’ সূচক মাথা নাড়ল।

আমি বললাম, ‘ধর্মগ্রহণে ইসলাম কখনোই জোরজবরদস্তি করে না। কুরআন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে—“তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য।'[৪]

সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, ‘গেল কুরআনের কথা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী দেখলেই বোঝা যায়, তিনি অমুসলিমদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কতটা তৎপর ছিলেন।

ভদ্রলোক বললেন, “যেমন?

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাবধান! তোমাদের যে-ব্যক্তি কোনো নিরপরাধ অমুসলিম ব্যক্তির ওপর নির্যাতন চালাবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তাকে দুঃখ দেবে, অথবা তার অনুমতি ব্যতীত তার কাছ থেকে কোনোকিছু ছিনিয়ে নেবে, জেনে রাখো কিয়ামতের মাঠে আমি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো।[৫] এরচেয়ে উত্তম কিছু আর কী হতে পারে বলুন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম স্বয়ং সেই মুসলিমের সাথে যুদ্ধে নামার ঘোষণা দিচ্ছেন, যে একজন নিরপরাধ অমুসলিমকে কষ্ট দেয়, আঘাত করে, অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

রিফারেন্স

১ সূরা বাকারা, ০২ : ২৫৬
২ সূরা নাহল, ১৬ : ১২৫
৩ সূরা বাকারা, ০২ : ১৯০
৪ সূরা কাফিরুন, ১০৯ : ০৬
৫ সুনানু আবি দাউদ, ৩/ ১৭০

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন