স্যাটানিক ভার্সেস ও শয়তানের ওপরে ঈমান আনার গল্প-থ্রি

অর্থাৎ তাদের কথানুযায়ী, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল করেন নবুওয়াত প্রাপ্তির ৫ম বছরে, আর সূরা হজ নাযিল হয় নবুওয়াত প্রাপ্তির ১৩ তম বছরে। দুই সূরার মধ্যে সময় ব্যবধান ৮ বছর।

অর্থাৎ তাদের দাবি অনুযায়ী, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল করেছেন আজ, আর আল্লাহ তা সংশোধন করেছেন ৮ বছর পরে…!

সাজিদ জোরে বলতে লাগল, আচ্ছা বলুন তো, নেহাত পাগল ছাড়া এই গল্প কোনো মানুষ বিশ্বাস করবে? ভুল করেছে আজ আর তা সংশোধন হলো আরও ৮ বছর পরে। তাদের দাবি মানতে গেলে বলতে হয়, এই আট বছরের মধ্যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা নাজমে লাত, উযযা, মানাতের মতো দেবীর প্রশংসা করেছেন আবার একইসাথে কালেমায় বলেছেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই।

একদিকে দেবীদের কাছে সাহায্য চাওয়ার বৈধতা, আবার অন্যদিকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে তাদের বাতিল করে দেওয়া—এতসব কাহিনি করার পরেও কীভাবে তিনি সেখানে ‘আল আমীন’ হিশেবে থাকতে পারেন? হাউ পসিবল?’

আমরা কেউ-ই কোনো কথা বললাম না। চুপ করে মনোযোগ দিয়ে সাজিদের কথাগুলো শুনে যাচ্ছি। সে আবারও বলতে আরম্ভ করল, “ঠিক আছে। তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম যে, সূরা হজের সেই সংশোধনী আয়াত আল্লাহ তাআলা আট বছর পরে নয়, ওই রাতেই নাযিল করেছিলেন এবং ওই রাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ভুল শুধরে নিয়েছিলেন। ভুল শোধরানোর পরে ওই রাতেই ঘোষণা করলেন যে—লাত, উযযা, মানাতের কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না।

খেয়াল করুন, তিনি দিনে বলেছেন এরকম :

‘তারা হলেন খুবই উঁচু পর্যায়ের (ক্ষমতাবান দেবী)

‘এবং তাদের কাছে সাহায্যও চাওয়া যায়…।

আবার রাতে নিজের ওই কথাকে পাল্টে নিয়ে বলছেন, ‘লাত, উযযা, মানাতরা বাতিল। তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না।

অবস্থা যদি সত্যিই এরকম হতো, তাহলে মক্কার কাফির, পৌত্তলিকদের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি একজন ঠগ, প্রতারক ও বেঈমান বলে গণ্য হবার কথা ছিল না? অথচ, ইতিহাসের কোথাও কি তার বিন্দু-পরিমাণ প্রমাণ পাওয়া যায়? যায় না। যাদের সাথে তিনি মুহূর্তেই এতবড় বেঈমানি করলেন, তাদের কারও কাছেই তিনি ঠগ’ ‘প্রতারক’ ‘মিথুক’ সাব্যস্ত হলেন না। ব্যাপারটি খুব আশ্চর্যের নয় কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অপমান-অপদস্ত করার এতবড় সুযোগটি কীভাবে তার শত্রুপক্ষ মিস করে বসল? তা ছাড়া, ইতিহাস থেকে জানা যায়, মদীনায় হিজরতের আগের রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার ঘরে রেখে যান, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গচ্ছিত আমানত যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। ভাবুন তো, যিনি একদিনে দু-রকম কথা বলতে পারেন, তাকে কিন্তু তখনো মক্কার কুরাইশরা বিশ্বাস করছে, ভরসা করে আমানত গচ্ছিত রাখছে। কীভাবে? তিনি যদি সত্যিই এমন কাজ করে থাকেন, এরপরও মক্কার লোকজনের তার ওপরে এত অগাধ বিশ্বাস স্থাপনের কারণ কী ছিল? আদৌ কি সেদিন ‘Satanic Verses জাতীয় কিছু নাযিল হয়েছিল রাসূলের ওপর? উত্তর হলো-না।

সাজিদ ঘামতে শুরু করেছে; কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। এতজনের সামনে এভাবে সে আগে কোনোদিন কথা বলেনি। এজন্যেই হয়তো একটু অসুবিধে হচ্ছে তার। সে আবার শুরু করল-“দ্বিতীয় প্রমাণ হলো, তর্কের খাতিরে যদিও ধরে নিই যে, Satanic Verses সত্য, তাহলে চলুন, সূরা নাজমের আয়াতের সাথে ওই তথাকথিত শয়তানের আয়াতগুলো মিলিয়ে আমরা আরেকবার দেখে নিই :

[১৯] ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উযযা সম্পর্কে?

[২০] এবং আরেক (দেবী) মানাত সম্পর্কে?

[২১] ‘তারা হলেন খুবই উঁচু পর্যায়ের (ক্ষমতাবান দেবী)

[২২] এবং তাদের কাছে সাহায্যও চাওয়া যায়,

[২৩] এগুলো তো কেবল (এই যে লাত, উযযা, মানাত এসব) কতকগুলো নাম, যে নাম তোমরা আর তোমাদের পিতৃপুরুষেরা রেখেছ, এর পক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। তারা তো শুধু অনুমান আর প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে,

যদিও তাদের কাছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে পথ নির্দেশ এসেছে।

খেয়াল করুন, ২১ এবং ২২ নম্বর আয়াতের পরে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছ থেকে কোনোরকম সংশোধনী আসার আগেই ঠিক ২৩ নম্বর আয়াতে এসে বলা হচ্ছে, এগুলো (লাত, উযযা, মানাত ইত্যাদি) তো কেবল কতগুলো নাম মাত্র, যা তোমরা (মুশরিকরা) এবং তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছ। এদের (ক্ষমতার) পক্ষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি।

বড়ই আশ্চর্যের, তাই না? একটু আগে বলা হলো, তারা হলেন খুবই উঁচু পর্যায়ের দেবী। তাদের কাছে সাহায্যও চাওয়া যায়। আবার, তার ঠিক পরেই বলা হচ্ছে, ‘এগুলো তো কেবল কিছু নাম মাত্র, যা তোমাদের মস্তিষ্কপ্রসূত।’ what a double stand! এরকম ডিগবাজি দেওয়ার পরেও যারা একত্ববাদে বিশ্বাস রেখে নতুন ইসলামে এসেছে, তারা কি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ছেড়ে তৎক্ষণাৎ চলে যেত না?

আর কুরাইশরা এত পাণ্ডিত্যের অধিকারী হয়েও এটি বুঝতে পারল না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে মাইন্ড গেইম খেলছে?’ সাজিদ থামল। পঙ্কজ দা জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে, বলা হয় যে, আবিসিনিয়ায় হিজরত করা একটি দল এই ঘটনার কথা শুনে অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মুশরিকদের দেব-দেবীদের স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনা শুনে ফেরত চলে এলো, তাদের ব্যাপারে কী বলবে?

সাজিদ বলল, “হ্যাঁ, তারা ফেরত এসেছিল ঠিকই; কিন্তু তারা ফেরত এসেছে এই ঘটনা শুনে নয়, অন্য ঘটনা শুনে। নবুওয়াতের ৫ম বছরে তৎকালীন আরবের অন্যতম বীর উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হামজা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে, মক্কার পরিস্থিতিকে কিছুটা নিরাপদ ভেবে, তারা ফেরত এসেছিল। তথাকথিত ‘Satanic Verses’ নাযিলের কথা শুনে নয়। প্রত্যেক সহীহ রেওয়ায়েতেই এটার বর্ণনা পাওয়া যায়।

আমাদের কারও মুখে কোনো কথা নেই। সাজিদ পিকলু দার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পিকলু দা?’

‘আচ্ছা, তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? ‘না।

‘ঠিক তো?’

‘হ্যাঁ। ‘বিশ্বাস করো যে, ঈশ্বর বলে কেউ নেই? ‘তুম, বিশ্বাস করি যে—ঈশ্বর বলে আদৌ কেউ নেই। ‘আচ্ছা, তুমি কি বিশ্বাস করা শয়তান বলে কেউ আছে, যাকে দেখা যায় না, ধরা। যায় না, বোঝা যায় না? ‘আরে না! আমি অমন ফাও জিনিসে বিশ্বাস-টিশ্বাস করি না। “ঠিক বলছ তো?’

‘হ্যাঁ।

এবার সাজিদ হো-হো করে কিছুক্ষণ হাসল। এরপরে বলল, তাহলে কী করে তুমি সালমান রুশদির ‘Satanic Verses বিশ্বাস করছ যেখানে তুমি ‘শয়তান’ বলে কিছুতে বিশ্বাসই করো না? সালমান রুশদীকে বিশ্বাস করতে হলে তোমাকে আগে শয়তানের ওপরে ঈমান আনতে হবে। তারপরেই না ‘Satanic Verses (শয়তানের আয়াত) বিশ্বাস করা যাবে। হা-হা-হা-।

এতক্ষণের নীরবতা ভেঙে সবাই এবার হাসিতে ফেটে পড়ল। অট্টহাসিতে ভরে উঠল আমাদের আড্ডাস্থল। মাগরিবের আযান হচ্ছে। পিকলু দা, পঙ্কজ দা আর সৌরভ উঠে চলে যাবার পথ ধরল। আমরা মসজিদের পথ ধরলাম।

দূরে পাখিরা আপনালয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমি আর সাজিদ পাশাপাশি হাঁটছি। ভাবছি, ইশ! আজকের আড্ডাটি আরেকটু দীর্ঘ হলেও পারত…।

সমাপ্ত

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন