মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

‘ঈশ্বর সংক্রান্ত’ শিরোনামের অধ্যায়ে আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব বেশ কিছু আপত্তি তুলে এনেছেন । ঈশ্বর তথা স্রষ্টা সংক্রান্ত  । এই অধ্যায়ে আমি চেষ্টা করব বিষয়টি ক্লিয়ার করতে ।

আরজ আলী সাহেব হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মে স্রষ্টার ধারণা দিতে গিয়ে ইসলামের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছেন,

“মুসলিম ধর্মযাজকদের নিকট শোনা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা আরশে কুরছির উপরে বসিয়া রেজওয়ান নামক ফেরেশতার সাহায্যে বেহেশত, মালেক নামক ফেরশতার সাহায্যে দোযখ, জিবরাঈলের সাহায্যে সংবাদ এবং মেকাইলকে দিয়ে খাদ্য বণ্টন ও আবহাওয়া পরিচালনা করেন । সর্বশক্তিমান বিশ্বজগতের কার্যপরিচালনার জন্য ফেরেশতার সাহায্যের আবশ্যক কি ?”

প্রথম বলে রাখি, কোন বিষয়ে কথা বলতে হলে সে বিষয়টি জ্ঞান অথেন্টিক থেকে নিতে হবে । ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞান এতই শোনা কথার উপর নির্ভরশীল যে, তার কথার জবাব দেয়ার অনেকটাই সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না । তিনি বলেছেন, ‘মুসলিম ধর্মযাজকদের থেকে শোনা যায়’ এ কথাটি আপত্তিজনক । তিনি সোর্স পড়ে না দেখে মন্তব্য করার মাধ্যমে নিজেকে মূর্খদের কাতারে ফেলবেন এটা আমরা ধারণাও করতে পারে নি । তারপর তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তালা আরশে কুরছির উপর বসিয়া’ তার এই কথাটিও একটি মিথ্যা ও জঘন্যতম জগাখিচুড়ী টাইপের কথা । আল্লাহ আরশে কুরছির উপর বসেছেন এটা মুসলিমরা বলে না, তাছাড়া আরশ ও কুরছি ভিন্ন দুইটি জিনিস । সে কুরশিতে আসমান জমিন কয়েকটি মুদ্রার মত ।

দ্বিতীয়তঃ ফেরেশতাদের নিজুক্ত করা নিয়ে আরজ আলী সাহেব অত্যন্ত শিশুসুলভ একটি দাবি উত্থাপন করেছেন এখানে । তার কথার সারমর্ম হচ্ছে, আল্লাহ যেহেতু সর্বশক্তিমান, তাই তিনি কেন ফেরেশতাদের সাহায্য নিবেন বিশ্ব পরিচালনায় ?

এখানে যে ভুল তিনি করেছেন তা হলো, ফেরেশতাদের তিনি আল্লাহর সাহায্যকারী ভেবে বসে আছেন । তিনি ধরেই নিয়েছেন যে আল্লাহ ফেরেশতাদের মুখাপেক্ষী । কুরানুল কারিমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে,

“তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন”

আরজ আলী সাহেব এখানে ‘অধীনস্ত’ আর ‘সাহায্যকারী’ এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছেন । ফেরেশতাদের দিয়ে তিনি এই কাজগুলো করার মানে এটা নয় যে তিনি ফেরেশতাদের সাহায্য নিচ্ছেন; বরং এটাই ফেরেশতাদের জন্য ইবাদত । তাদের এই কাজের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে ।

আমি চাইলেই আমার বাসার সকল কাজকর্ম আমি নিজেই করতে পারি । কিন্তু আমার ইচ্ছে হল যে, এসব আমি করবো না । অন্যকে দিয়ে করাবো । এরপর আমি যদি এমন অত্যাধুনিক একদল রোবট তৈরি করি যাদের কেউ আমার কাপড়-চোপড় ধুয়ে দেবে, কেউ কাপড় ইস্ত্রি করে দেবে, কেউ আমার রান্না-বান্না করে দিবে, কেউ আমার রিডিং রুম আর ব্যাড রুম গুছিয়ে দেবে, কেউ আমার ব্যবসায়ের হিসাবপত্র মিলিয়ে দেবে, কেউ বাগান পরিচর্যা করবে ইত্যাদি । আমি যদি আমার বাসার এই সকল কাজ আমারি তৈরি অত্যাধুনিক রোবটকে দিয়ে করাই তাহলে এর দ্বারা কি এটা প্রমান হয় যে আমি আসলে আমার বাসার কাজকর্ম করতে অক্ষম ? নাহ, এটা প্রমাণ হয় না; বরং এতে আমার সম্মান, ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় । আমারই তৈরি একদল সুপার রোবট দল যখন কেবল আমার নির্দেশনা মত সুশৃংখলভাবে কাজ করে যায় তখন আমার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, আর অসাধারণ সৃষ্টিশৈলী প্রকাশ পায় । আমি কিন্তু কোনভাবেই আমার তৈরি রোবটের অধীন বা মুখাপেক্ষী নই বরং তারাই আমার মুখাপেক্ষী ।

তারা আমার তৈরি প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করে যেতে বাধ্য । আমি ইচ্ছে করলেই তাদের প্রোগ্রাম চেঞ্জ করে দিতে পারি । আমি সেই ক্ষমতা রাখি । সুতরাং, ফেরেশতাদের দিয়ে বিশ্ব পরিচালনা করাটা আল্লাহর সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটা তার ক্ষমতাই একটা অংশ । আরজ আলী সাহেব এই জায়গায় ভুল ব্যাখ্যা করেছেন ।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“আল্লাহ তাআলা দেখেন, শোনেন, বলেন ইত্যাদি শুনিয়া সাধারণ মানুষের মনে স্বতই প্রশ্ন জাগে – তবে কি আল্লাহর চোখ, কান ও মুখ আছে ? কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, আছে । তবে তা মানুষের মতো নয়, কুদরতি । কিন্তু ‘কুদরতি’ বলতে কি বুজায, তাহা তাহারা ব্যাখ্যা করেন না । আবার যখন শোনা যায় যে, খোদা তা’লা অন্যায় দেখিলে ক্রুদ্ধ হন, পাপীদের ঘৃণা করেন, কোন কোন কাজে খুশি হন ও কোন কোন কাজে বেজার হন, তখন মানুষ ভাবে -খোদার কি মানুষের মত মন আছে ? আর খোদার মনোবৃত্তিগুলি কি মানুষেরই অনুরূপ ?”

আরজ আলী সাহেবের যুক্তি হচ্ছে রাগ করা, ক্রুদ্ধ হওয়া, খুশি-বেজার হওয়া মানবীয় গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত । আল্লাহও যেহেতু কারো অন্যায় দেখলে রাগ করেন, ক্ষুব্ধ হন, বেজার হন, ভালো কাজ দেখলে খুশি হন, তাহলে আল্লাহ কি মনুষ্যভাবাপন্ন কি না ? অর্থাৎ আল্লাহর মধ্যে মানুষের মতো গুণাবলী আছে কিনা ?

প্রথমত, আল্লাহ দেখেন, শোনেন । এগুলো আল্লাহর সিফাত বা গুন । মানুষও দেখে শুনে । এর মানে কোনভাবেই এটা বোঝায় না যে, আল্লাহর মধ্যে মানবীয় গুনাবলী আছে ।

আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞাত । অর্থাৎ, তিনি সব কিছুই জানেন । এখন তিনি যদি মানুষকে ‘জানা’ মানে কি এই জ্ঞানটা না দিতেন, অর্থাৎ, মানুষ যদি না-ই বুঝত যে ‘জানা’ বলতে আসলে কি বুঝায়, তাহলে তারা কিভাবে অনুধাবন করতে পারতো যে আল্লাহ সর্বজ্ঞাত ?

আল্লাহ সর্বশ্রোতা । অর্থাৎ, তিন সবকিছু জানেন, শোনেন । এমতাবস্তায়, মানুষকে যদি তিনি ‘শোনার’ ক্ষমতা না দিতেন, তাহলে মানুষ কিভাবে উপলদ্ধি করত যে, তিনি সর্বশ্রোতা ? আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা, অর্থাৎ, তিনি সবকিছু দেখেন । এখন তিনি যদি মানুষকে ‘দেখার’ এ ক্ষমতাই না দিতেন, তাহলে মানুষ কিভাবে বুঝতে পারত যে আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা ?

আল্লাহ এই দেখার, জানার, শোনার গুণাবলি দিয়েই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে মানুষ আল্লাহর ক্ষমতা বুঝতে পারে । কিন্তু এটা কোনভাবেই বোঝায় না যে, আল্লাহ মনুষ্যভাবাপন্ন । আল্লাহর দেখা, জানা, শোনার সাথে মানুষের দেখা, জান, আর শোনার কোন তুলনা হতে পারে না; বরং প্রতিটি সত্তা অনুসারেই তার গুনাগুন নির্ধারিত হয়ে থাকে । প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই গুনাগুন আলাদা হয়ে থাকে । একটা মাছিও শুনে আবার গরুও শুনে । তাই বলে এতদুভয়ের শোনা একরকম নয় । একটি ডিভাইসও শোনে ও দেখে একটি মশাও শোনে ও দেখে কিন্তু তাদের মধ্যে কতো পার্থক্য ! সুবাহানাল্লাহ, তাহলে স্রষ্টার গুনাগুন সৃষ্টির মতো কেন হতে হবে ?

আসলে আরজ আলী গংরা যদি স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন তখন গুনের প্রশ্নটির সমাধান পরে করা যাবে, আগে যেখানে তারা অস্তিত্বই মানছেন না, সেখানে অন্য কথা বলা তাদের বাতুলতা বৈ নয় । যদি অস্তিত্ব মেনে নেন তবে মানতে হবে যে অস্তিত্বশীল সত্তার কোন না কোন গুণ থাকবেই, সে গুনের প্রকৃত স্বরূপ আমাদের জানা থাকার প্রয়োজন নেই । তবে এতটুকু অবশ্য বিশ্বাস করতে হবে যে, স্রষ্টা গুনাগুন আলাদা যেমনি তার অস্তিত্ব আলাদা, সৃষ্টির কারো মত করে তার সত্তাকে কিংবা গুণকে ধারণা করা সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতা; কারন, তা না জেনে মন্তব্য করা ।

আর এ জন্যই কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

“তার সদৃশ্ কোন কিছুই নেই”

আল্লাহ মানুষকে ক্ষমতা দিয়েছেন বলে মানুষ দেখতে পারে, শুনতে পারে, বুঝতে পারে । এটাকে আল্লাহর ক্ষমতার সাথে গুলিয়ে আল্লাহকে মনুষ্যভাবাপন্ন করাটা নেহাত মূর্খতা । তিনি বলেছেন,

“ঈশ্বর যদি উনার সৃষ্ট পদার্থ হতে ভিন্ন হন, তাহা হইলে তাহার সর্বব্যাপীত্ব থাকিতে পারে না । এবং ঈশ্বরের সর্বব্যাপীত্ব অক্ষুন্ন থাকিলে কোন সৃষ্ট পদার্থ এমনকি পদার্থের অণু-পরমাণুও ঈশ্বরশূন্য হইতে পারে না ।”

উনার পয়েন্ট হল, আল্লাহ যদি সর্বব্যাপী, সবখানেই বিরাজ করেন, তাহলে তিনি কি নাপাক বস্তুর মধ্যেও বিরাজ করেন ? যদি তা-ই হয়, তাহলে তিনি আর পরম, মহা পবিত্র সত্তা কিভাবে হন ?

এখানে আরজ আলী সাহেব যে জিনিসটা বুঝতে ভুল করেছেন তা হলো আল্লাহ তা’আলার সর্বব্যাপীত্ব । উনি আল্লাহ সর্বব্যাপীত্ব বলতে ধরেই নিয়েছেন যে, আল্লাহ জগতের সকল বস্তুর মধ্যে বিরাজ করেছেন । পাক-নাপাক সকল বস্তুর মধ্যেই । মূলত আল্লাহ তা’আলা তার আরশের উপরে রয়েছেন । তিনি সকল বস্তুর মধ্যে বিরাজমান নন; বরং তার জ্ঞান ও দৃষ্টি সকল বস্তুকে ঘিরে আছে । এটাই হল আল্লাহ্‌র সর্বব্যাপীত্ব ।

প্রসিদ্ধ চার ইমামের মতও এটাই যে, আল্লাহ তার আরশের উপরে কিন্তু তার জ্ঞান দ্বারা তিনি সৃষ্টি জগতের সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন ।

যেমন, ইমাম আবু হানিফা বলেছেন,

‘যে বলবে, আল্লাহ আসমানে আছেন না জমিনে তা আমি জানি না, সে কাফের হয়ে যাবে; কেননা, আল্লাহ বলেন, রহমান আরশের উপরে আর তার আরশ সপ্ত আকাশের উপরে ।’

১. সূরা আশ-শুরা (৪২):১১

২. ইজতিমা’ঊল জুয়ুসিল ইসলামিয়াহ, পৃষ্ঠা ৯৯

ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

‘আল্লাহ আকাশের উপর এবং তার জ্ঞানের পরিধি সর্বব্যাপী বিস্তৃত । কোন স্থানই তার জ্ঞানের আওতা বহির্ভূত নয় ।’

ইমাম শাফি’ঈ (রহ.) বলেন,

‘সুন্নাহ সম্পর্কে আমারও আমি যে সকল হাদীসের বিদ্বানদের দেখেছি এবং তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছি যেমনঃ সুফিয়ান, মালেক ও অন্যান্যরা, তাদের মত হল এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, নিশ্চয় আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা’বূদ নেই এবং মোহাম্মদ সাঃ আল্লাহর রাসূল । আর আল্লাহ আকাশের উপরে তার আরশের উপর রয়েছেন । তিনি যেভাবে ইচ্ছা তার সৃষ্টির নিকটবর্তী হন এবং যেভাবে ইচ্ছা নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন ।’

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এর পুত্র আবদুল্লাহ বলেন,

‘আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহ সৃষ্টি থেকে আলাদা, সপ্তম আকাশের উপর তার আরশের উপর রয়েছেন । তার ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত । এর উত্তরে তিনি (ইমাম আহমদ) বলেন, হ্যাঁ, তিনি আরশের উপরেই আছেন কিন্তু তার জ্ঞানের বহির্ভূত কোনো কিছুই নেই ।’

ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ আরো বলেন,

‘যে বলবে যে আল্লাহ আসমানে আছেন না জমিনে আছেন তা আমি জানিনা সে কাফের হয়ে যাবে, অনুরূপভাবে যে বলবে যে তিনি আরো সে আছেন কিন্তু আরশ আকাশে না জমিনে অবস্থিত তা আমি জানি না, সেও কাফির হয়ে যাবে । কেননা, উপরে থাকার জন্যই আল্লাহকে ডাকা হয় । নিচে থাকার জন্য নয় । আর নিচে থাকাটা আল্লাহর রবুবিয়্যাত এবং উলুহিয়াতের গুণের কিছুই নয় ।’

বস্তুত, আল কুরআনের আয়াত থেকেই ইমামগণ এ আকীদা-বিশ্বাস গ্রহন করেছেন, যেমন আল্লাহ বলেন,

‘দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে উঠেছেন’

‘তিনিই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন । অতঃপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন ।’

‘তোমরা কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে যে যিনি আরশের উপরে আছেন তিনি ভূমিসহ তোমাদের ধসিয়ে দেবেন না?’

অনুরূপভাবে হাদিসে আছে,

মু’আওয়িয়া ইবনে আল হাকাম আস সুলামি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমার একজন দাসী ছিল । উহুদ ও জাওয়ানিয়্যাহ নামক স্থানে সে আমার ছাগল চরাত । একদিন দেখি, নেকড়ে আমার একটি ছাগলকে ধরে নিয়ে গেছে । আমি এক আদমসন্তান । তারা যেভাবে ক্ষুব্ধ হয়, আমিও সেভাবে ক্ষুব্ধ হই । ফলে আমি তাকে থাপ্পড় মেরে বসি । অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর নিকট আসলে আমি একে এক সাংঘাতিক (অন্যায়) কাজ বলে গণ্য করি । তাই আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি তাকে মুক্ত করে দেবো ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে আসো । আমি তাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে আসলাম । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ কোথায়?’ সে বলল, ‘আসমানে ।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কে?’ সে বলল, ‘আপনি আল্লাহর রাসূল ।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তাকে মুক্তি দিয়ে দাও । কারণ, সে একজন ঈমানদার নারী ।’

দেখা যাচ্ছে, দাসীটাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল আল্লাহ কোথায়, সে জবাব দিল, আসমান । রাসুল সাঃ তার এই জবাব সঠিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন । তাহলে কুরআন, হাদিস এবং মাযহাবের ইমামদের মতামত থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ আরশেই আছেন, কিন্তু তার জ্ঞান সর্বব্যাপী ।

কোরআনের এ আয়াত স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, আল্লাহর জ্ঞানই আমাদের পরিবেষ্টন করে আছে ।

“আর আল্লাহ (স্বীয়) জ্ঞানে সবকিছুকে ঘিরে রেখেছেন”

সুতরাং আরজ আলী সাহেব সকল বস্তুর মধ্যে আল্লাহর উপস্থিতি ধরে নিয়ে যে তর্ক তুলেছেন, তা আমরা পুরোপুরি বাতিল ও অসংলগ্ন জ্ঞান থেকে উত্থিত বলে সুস্পষ্টভাবে বলতে পারি ।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“সুপারিশ রক্ষার অর্থই হইল, আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা । অর্থাৎ, স্বয়ং যাহা করিতেন না, তাহাই করা । ঈশ্বর কি কোন ব্যক্তিবিশেষের অনুরোধ বা সুপারিশে আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিবেন না ?”

আরজ্জ আলী সাহেবের প্রশ্নটির দুটি দিক আছে । একটি হচ্ছে, কিছু কিছু মানুষের ধারণা যে আল্লাহ তাদেরকে পীর বা ওলিদের সুপারিশের অধিকার দিয়েছেন, তারা সুপারিশ করে মানুষের তাকদির পরিবর্তন সাধন করে দেবে । কিন্তু এটাও আরজ আলী সাহেবদের ইসলাম সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞান থেকে উত্থিত । কারণ, তিনি জানেন না যে সুপারিশের মালিক আল্লাহ তাআলা । তিনি দয়াপরবশ হয়ে তার বান্দাগণের মধ্যে যার উপর তার সন্তুষ্টি রয়েছে তাকে হাশরের দিন অনুমতি দিবেন সুপারিশ করার জন্য । তিনি তখন সুপারিশ করার সুযোগ লাভ করবেন । সত্যিকারের মুসলিম এটা বিশ্বাস করে যে, তথাকথিত কবরবাসী কারো জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখেন না, কোন পীর সাহেবও নয় । সুতরাং সুপারিশের মূল অধিকার আল্লাহরই হাতে । তিনি যাকে ইচ্ছা দান করলে সেটা থেকে তাঁর ক্ষমতাহীন হওয়া সাব্যস্ত হয় না । তাছাড়া সব সুপারিশের পরে তিনি নিজে এমন অনেকজনকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন যাদের জন্য কারও সুপারিশ হয়নি, কিন্তু তাদের ইমান ছিল ।

হয়তো আরজ আলী সাহেবদের কাছে সুপারিশকে আল্লাহর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মনে হচ্ছে, কিন্তু বস্তুত কাজটা এরকম নয় । যিনি মহান, তিনি সব সময় তার কাছে অপরের কাছ থেকে আশা করেন যে কেউ আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করুক আমি তাকে দেই । দুনিয়ার বুকেও সেটা স্পষ্ট । মহান আল্লাহতালা দাতা, ক্ষমাশীল, দয়াকারি তার এ নাম ও গুনের দাবী হচ্ছে তার কাছে সবাই প্রার্থনা করুক আর তিনি দেবেন । এর মাধ্যমেই তার মহত্ত ফুটে উঠবে । আরজ আলী সাহেবের মত লোকেরা তা কিভাবে বুঝবে ?

দ্বিতীয়ত, আরজ আলী সাহেবদের হয়তো মনে হতে পারে যে তাকদির নির্ধারিত থাকলে আবার সুপারিশ করলে সেটা পরিবর্তন কিভাবে হবে ? এ হিসেবে আরজ আলী সাহেবের এই প্রশ্নটা ‘তাকদির’ সম্পর্কিত । তাকদির সম্পর্কে কোন জ্ঞান না থাকলে যে কেউ এমন বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্ন করে বসতে পারে ।

তাকদির হলো পূর্ব নির্ধারিত । তাহলে প্রশ্ন, আল্লাহ কি নিজের ইচ্ছামত তাকদীর লিখে মানুষের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন ? যদি তা-ই হয়, তাহলে মানুষ পাপ করলে তার দায়ভার সে তো স্বয়ং আল্লাহর । মানুষ কেন শাস্তি পাবে ? ব্যাপারটা আসলে সেরকম নয় । এটা ঠিক যে তাকদির পূর্ব নির্ধারিত । কিন্তু এটা জানা অবশ্যক যে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন হলো ‘আলিমুল গায়েব’ অর্থাৎ, ‘পূর্বাপরের সকল বিষয়ে সম্যক জ্ঞানি ।’ তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা । মানুষকে তিনি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন । যেহেতু মানুষের ম্যাকানিজমের স্রষ্টা আল্লাহ তালা এবং তিনি জানেন ভবিষ্যতে ঠিক কি কি হবে, তাই তিনি এও জানেন যে, স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি প্রয়োগ করে একজন মানুষ কোন কোন কাজগুলো করতে পারেন । যেহেতু তিনি সে সম্পর্কে অবহিত, তাই তিনি তা লিখে রেখেছেন । তবে তিনি কি ব্যক্তিবিশেষের ফরিয়াদ রাখেন না ? রাখেন । এই রাখাটাও তার পূর্বতন তকদিরের নির্ধারণের সময় লিখে রেখেছেন । তিনি সেখানে লিখেছেন যে অমুক ব্যক্তি অমুক সমস্যায় পড়বে আর দোয়া করতে সমর্থ হবে, অথবা তার জন্য জীবিত সমক্ষরা দোয়া করবে, অথবা সে সদকা করতে পারবে । সুতরাং, সে দুয়া সাদকার কারণে তার বিপদ থেকে মুক্তি ঘটবে, কিন্তু বান্দা তো জানেনা তার তাকদিরে কি আছে, সে তো মনে করছে এ বিপদই হয়তো তাকে শেষ করে দেবে । কিন্তু আল্লাহ জানেন যে তার আরও সুযোগ রয়েছে; কারণ এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সে এমন কিছু কাজ করবে যা তার কাজে লাগবে । সুতরাং বান্দার দায়িত্ব হচ্ছে কাজ করে যাওয়া, তাকদীরে কি লেখা আছে তা খুজে বেড়ানো নয় । আবার কখনো কখনো বিনা সুপারিশেই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে উদ্ধার করেন । এসবই তার একান্ত দয়া । তার দয়াকে অন্য কেউ নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না, বা দয়া না করার জন্যও বলতে পারে না । তবে সেটা ভিন্ন যেটা তিনি বলে দিয়েছেন; যেমন তিনি বলে দিয়েছেন যে, নাস্তিক, মুশরিক, কাফির ও মুনাফিকদের তিনি দয়া করবেন না ।

ধরুন, আমি জানি আল্লাহ হলেন ধন ভান্ডারের আধার । এখন একজন গরীব লোক যদি আল্লাহতালার কাছে ফরিয়াদ করে তার দারিদ্রতা বিমোচনের জন্য এবং দোয়া কবুল হয়ে যদি ওই ব্যক্তির দারিদ্রতা দূর হয়, তাহলে কি এর অর্থ এটাই যে, আল্লাহর ইচ্ছার ব্যাঘাত ঘটেছে ? বরং আল্লাহর অপার ভান্ডার নিয়ে বসে আছেন । কেউ চাইল আর তিনি দান করলেন । এতে করে তার দয়াশীলতা প্রকাশ পায় ।

আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন,

“ অন্যান্য ক্ষেত্রে যাই হোক না কেন, বিচারক্ষেত্রে ‘ন্যায়’ ও ‘দয়ার’ একত্র সমাবেশ অসম্ভব । কেননা, দয়া করলে ন্যায়কে উপেক্ষা করিতে হইবে এবং ন্যায়কে বজায় রাখিতে হইলে দয়া-মায়া বিসরজন দিতে হইবে । বলা হয়, আল্লাহ ন্যায়বান এবং দয়ালু । ইহা কিরুপে সম্ভব ? তবে কি তিনি কোন কোন ক্ষেত্রে ন্যায়বান আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে দয়ালু ?”

আরজ আলী সাহেব এই প্রশ্নের একটা জায়গা অবশ্য ঠিক আছেন । তিনি বলেছেন, বিচারক্ষেত্রে ন্যায় ও দয়ার একত্র সমাবেশ অসম্ভব । আসলেও তা-ই । সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই ন্যায়বান হতে হবে । কিন্তু আরজ আলী দুটোকে পরস্পর বিপরীতমুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ।

বিচারক্ষেত্রে একজন বিচারক ন্যায়বান থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক । নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটাই তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা । একজন বিচারক  বিচারক্ষেত্রে যদি ন্যায়বান না-ই থাকেন, তাহলে কি ঘটবে ? একজন চোর চুরির শাস্তি পাবে না, ধর্ষক ধর্ষণের শাস্তি পাবে না, অন্যায়কারী খুব সহজেই পার পেয়ে যাবে । তখন কি হবে ? সমাজে ন্যায় বলে কিছুই থাকবে না । অন্যায় আর পাপে ডুবে যাবে সমাজ ।

ধরুন, আপনি একজন বিচারক । আপনার সামনে দুজন আসামি আনা হলো । এদের দুজন থেকে যে কোন একজন আসামী । এখন সাক্ষ্যপ্রমাণের পর, আসামি সাব্যস্ত হওয়ার পরেও আপনি কি আসামিটাকে ছেড়ে দেবেন ? যদি দেন, তাহলে একই সাথে আপনি বেশ কিছু অপরাধ করবেন । প্রথমত, আপনি আসামীকে ছেড়ে দিয়ে অন্যায় করেছেন । দ্বিতীয়তঃ নির্দোষ লোকটিকে আপনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে তার প্রতি নির্দয় হয়েছেন ।

কিন্তু যদি আপনি এখানে ন্যায় বিচার করতেন তো কী হতো ? আপনি যদি ন্যায়বিচার করতেন তাহলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা পেত এবং সাথে সাথে আপনি নির্দোষ লোকটির প্রতিও সদয় হতেন ।

দয়ালু হওয়ার মানে এই না যে, আপনাকে চোর-ডাকাত-ধর্ষকে ছেড়ে দিতে হবে; বরং দয়ালু হবার অর্থ এই যে, আপনি আপনার অবস্থানে ন্যায়বান থেকে দয়াপরশ হবেন ।

আল্লাহ তাআলা যদি বিচারের সময় তার সাথে কৃত অপরাধ, যা একান্তভাবে তার অধিকার, যেমন সাওম পালন না করা, হজ্জ না করা ইত্যাদি অপরাধ ক্ষমা করে দেন, আর নিজের পক্ষ থেকে অধিকারে ছাড় দেওয়া বা ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি সারা দুনিয়াতে সভ্যসমাজে প্রশংসিত বিবেচিত হয়ে এসেছে, তাহলে সেখান কার কি বলার আছে ? অন্যদিকে যদি বিচারের সময় অন্যের উপর কৃত অপরাধ যেমন চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি ব্যাপারে উভয়কে ডেকে বিচারের সময় রাজি ও সন্তুষ্ট করে দিতে পারেন তাহলে আপনি তৃতীয়পক্ষ এ ব্যাপারে কথা বলার কে ? বান্দার অধিকারের ব্যাপারে বিচারের মূল উদ্দেশ্যই তো বাদী-বিবাদী উভয়ের সন্তুষ্টি, তৃতীয় পক্ষের সন্তুষ্টি নয় । সুতরাং আরজ আলী সাহেব এখানে সমীকরণ দাঁড় করাতেই ভুল করেছেন । তিনি নৈতিকতার সাথে অনৈতিকতাকে গুলিয়ে জগাখিচুড়ি তৈরি করেছেন বলা যায় ।

আরেক স্থানে আরজ আলী সাহেব লিখেছেনঃ

“বলা হয় যে, আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন ঘটনা ঘটে না । এমনকি গাছের পাতাও নড়ে না । বিশেষত, তাহার অনিচ্ছায় যদি কোন ঘটনা ঘটতে পারে, তাহা হইলে তাহার ‘সর্বশক্তিমান’ নামের সার্থকতা কোথায় ? আর যদি আল্লাহর ইচ্ছায়ই সকল ঘটনা ঘটে তবে জিবের দোষ বা পাপ কি ?”

এই ব্যাপারটাও তাকদির সম্পর্কিত । আরজ আলী মাতব্বরের যে তাকদির সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না, এই প্রশ্নগুলো তারই বহিঃপ্রকাশ । আল্লাহ সর্বশক্তিমান মানে এই নয় যে, তথা মানুষের দোষ বা পাপ কেবল তার ইচ্ছাতেই ঘটে চলেছে । আগেই বলেছি, আল্লাহ মানুষকে একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ।

আবার, আল্লাহ হলেন ‘আলিমুল গায়েব’ বা ‘ভবিষ্যস্রষ্টা’ । তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা । মানুষের মেকনিজম তিনিই তৈরি করেছেন । তিনিই মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন । এখন, তিনি যেহেতু ভবিষ্যস্রষ্টা অর্থাৎ ভবিষ্যৎ দেখতে পান, তাই তিনি জানেন এই স্বাধীন শক্তি প্রয়োগ করে মানুষ কি কি কাজ করবে । তাই আল্লাহ সেই কাজগুলোকে তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন ভাগ্যলিপি হিসেবে । এটাই সাধারণ অর্থে তাকদির । এর মানে এই না যে, আল্লাহ লিখে রেখেছেন বলেই মানুষ সেই কাজগুলো করছে; বরং এর মানে এই যে, আল্লাহ আলিমুল গায়েব । তিনি জানেন ভবিষ্যতে কি হবে আর কে কি করবে । তিনি জানেন বলেই সেগুলো লিখে রেখেছেন, ব্যস ।

একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক । ধরা যাক, একটি স্কুলের একজন ম্যাথ টিচারের আন্ডারে ৫ জন ছাত্র আছে । ম্যাথ টিচার জানে এই ৫ জনের মধ্যে কার মেধা কতটুকু । ম্যাথে কার মেধা কতটুকু । ম্যাথে কার দক্ষতা কতটুকু সেসব ম্যাথ টিচার খুব ভালো করেই জানেন । এখন ধরুন, পরীক্ষার আগে সেই ম্যাথ টিচার একটি কুপনে ওই পাচ জনের নাম এবং আসন্ন পরীক্ষায় ম্যাথে ওই ৫ জনের কে কি রকম মার্কস পাবে তাও লিখে  রাখলেন । ধরুণ, সেটা এরকম-

রাকিব ৯০

রাব্বি ৯৫

সিয়াম ৮২

রাশেদ ৭০

এবং মুরাদ ৫৫

আবার ধরুন, পরিক্ষা শেষে দেখা গেল ম্যাথ টিচার ঠিক যে ফলাফল আগে লিখে রেখেছিলেন, প্রত্যেকে ঠিক সেই পরিমান মার্কসই পেয়েছে ।

তাহলে প্রশ্ন- ম্যাথ টিচার আগে থেকেই লিখে রেখেছে বলেই কি ওই পাঁচজন এই রকম রেজাল্ট করেছে ? উত্তর হল- ‘না’ ।

ম্যাথ টিচার আগে থেকেই তাদের মেধা সম্পর্কে জানতেন বলেই তিনি অনুমান করতে চেয়েছেন কে কিরকম রেজাল্ট করবে । তাই তিনি লিখে রেখেছেন । এতে করে এটা প্রমাণ হয় না যে, লিখে রেখেছেন বলেই ছাত্ররা এরকম রেজাল্ট করেছে । ঠিক সেভাবে, আল্লাহ আগে থেকে জানেন বলেই তিনি মানুষের ভাগ্য লিখে রেখেছেন । এতে করে এটা প্রমাণ হয় না যে, আল্লাহ লিখে রেখেছেন বলেই মানুষ দোষ বা পাপ গুলো করছে ।

কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, ম্যাথ টিচারের অনুমান তো ভুলও হতে পারে । জি, ম্যাথ টিচারের অনুমান ভুল হতেই পারে । কারণ, তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন না । তিনি ভবিষ্যৎ জানেন না । তিনি স্রেফ অনুমান করতে পারেন । এর জন্য তার জানায়, তার অনুমানের ভুল হতেই পারে । কিন্তু আল্লাহ তো এরকম নন । তিনি ভবিষ্যৎ জানেন । তাই তার জানায় কোন ভুল করতে পারে না । আরজ আলী সাহেব এখানে তাকদীর সম্পর্কে না জেনে, পড়াশোনা না করেই প্রশ্ন করে বসেছেন । এখানে একটি বিষয় জানানো জরুরী মনে করছি, তা হলো আল্লাহর ইচ্ছা দু’ধরনের-

১. কাউনিয়াহ বা প্রাকৃতিক

২. শারইয়্যাহ বা শরীয়তগত

. কাউনিয়াহঃ এই ধরনের ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাকৃত জিনিসটি সম্পন্ন হয় । তবে জিনিসটি আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হওয়ার ব্যাপারটি জরুরী নয় । আর এটা দ্বারাই আল্লাহর ‘মাশিয়াত’ বা ইচ্ছা বোঝানো হয় । যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

“আল্লাহ চাইলে তারা পরস্পরে লড়াই করতে পারত না । কিন্তু আল্লাহ যা চান তা-ই করেন”

“যদি আল্লাহই তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চান (তাহলে কোন নসিহতই কাজে আসবে না) । তিনিই হচ্ছেন তোমাদের রব ।”

. শারইয়্যাহঃ এ ধরনের ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছাকৃত জিনিসটি সম্পন্ন হওয়া অপরিহার্য নয় । তবে এক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত জিনিস বা বিষয়টি তাঁর পছন্দনীয় হতে হবে । যেমন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

“আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিতে চান”

আমরা আরও ঈমান আনি যে, আল্লাহ তা’য়ালার কাউনি এবং শার’য়ী উভয় ইচ্ছাই তার হিকমতের অধীন । আল্লাহ তাআলা স্বীয় কাউনি ইচ্ছা অনুযায়ী যা ফয়সালা করেন অথবা শার’য়ী ইচ্ছা অনুযায়ী বান্দা [মাখলুক] যে ইবাদত করে উভয় ক্ষেত্রেই তার হিকমত নিহত রয়েছে । এ ব্যাপারে আল্লাহর হিকমতের কিছু আমরা বুঝতে সক্ষম হই বা না হই অথবা আমাদের বিবেক বুদ্ধি এক্ষেত্রে অক্ষম হলেও কিছু যায় আসে না । [সর্বাবস্থাতেই তিনি সবচেয়ে বড় হাকিম]

“আল্লাহ কি সব চেয়ে বড় হাকিম নন ?”

“যারা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় প্রতয়ি তাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুমের অধিকারী আর কে হতে পারে?”

আমরা ঈমান আনি যে,

“আল্লাহতালা সবকিছুরই সৃষ্টিকর্তা । তুমি সবকিছুরই অভিভাবক । আসমান ও যমীনের ধন-ভান্ডারের চাবি তার কাছে সংরক্ষিত”

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এবং তার বান্দার পক্ষ থেকে যা কিছু সংঘটিত হবে, তা চাই কথা হোক, কাজ হোক অথবা অমান্য করাই হোক না কেন এর সবকিছুই উক্ত চারটি স্তরের অন্তর্ভুক্ত । এর সবই তার জানা এবং তার কাছে লেখা রয়েছে । এর সবকিছুই তার ইচ্ছাস্মৃতির অন্তর্ভুক্ত ।

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সোজা সরল পথে চলতে চায় (তার জন্য এই কিতাব উপদেশস্বরূপ) আর যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা না চান ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের চাওয়ায় কিছু হয় না ।”

“আল্লাহ চাইলে তারা এরকম কাজ তারা করতো না । কাজেই তাদের ছেড়ে দাও । নিজেদের মিথ্যা রচনায় তারা বিমগ্ন থাকুক ।”

“আল্লাহ চাইলে তারা কখনো লড়াই করতো না । কিন্তু আল্লাহ যা চান তা-ই করেন ।”

“আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা কর তাও সৃষ্টি করেছেন ।”

এরপরও আমরা ঈমান আনি, যে কোন কাজ সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে এখতিয়ার এবং কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন । বান্দার কাজ যে তার এখতিয়ার এবং ক্ষমতায় সংগঠিত হয়ে থাকে তার কিছু প্রমাণঃ

আল্লাহ তাআলার বাণী-

“তোমাদের ইচ্ছামাফিক তোমাদের ক্ষেত্র [স্ত্রীদের কাছে] গমন কর ।”

সূরা তাকওয়ীর (৮১):২৮-২৯

সূরা আনআম (০৬):১৩৭

সূরা বাকারা (০২):২৫৩

সুরা সাফফাত (৩৭):৯৬

সূরা বাকারা (০২):২২৩

“তারা যদি বের হওয়ার ইচ্ছা সত্যিই পোষণ করত, তাহলে তারা অবশ্যই সেজন্য কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করত”

উক্ত আয়াত দুটিতে বান্দার ইচ্ছা পোষণ করা এবং ইচ্ছা অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করার ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়েছে ।

২. যদি বান্দার কাজ করার কোনো এখতিয়ার আর ক্ষমতাই না থাকে তাহলে বিধি-নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে যে নির্দেশ ও উপদেশ বান্দাকে দেয়া হয়েছে তার অর্থ দাঁড়ায়, বান্দাকে এমন কাজের প্রতি নির্দেশ দেয়া, যা করার কোন ক্ষমতাই তার নেই । অথচ এমনটি হওয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর করুণা, হিকমত ও কৌশলের পরিপন্থী । সাথে সাথে আল্লাহর এ ঘোষণার সম্পূর্ণ বিপরীতঃ

“আল্লাহ কারো উপরই তার শক্তি সামর্থের অধিক বোঝা চাপিয়ে দেন না”

৩. মুহসীন ব্যক্তির ইহসানের প্রশংসা এবং খারাপ ব্যক্তির কাজের নিন্দা করা আর উভয়কেই তার কৃতকর্মের প্রাপ্য পুরস্কার বা শাস্তি প্রদানের বিষয়টিও এক্ষেত্রে একটি দলিল । যদি বান্দার কর্ম তার ইচ্ছা ও এখতিয়ার অনুযায়ী কোন কাজ সংগঠিত না-ই হতো তাহলে মুহসিন ব্যক্তির ইহসানের প্রশংসা করার কোনো অর্থই হয় না । আর অন্যায়কারীর অন্যায়ের জন্য শাস্তি প্রদান জুলুম ছাড়া আর কিছুই নয় । অথচ আল্লাহতালা কোন অর্থহীন কাজ করা এবং জুলুম করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ।

সূরা তাওবা (০৯) ৪৬

সূরা বাকারা (০২) ২৮৬

৪. আল্লাহ তাআলা রাসূলগনকে পাঠিয়েছেন

“সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে । যেন তাদের পাঠাবার পর আল্লাহ তাআলা বিরুদ্ধে লোকেদের কোন যুক্তি না থাকে । আল্লাহ তো সর্বাবস্থায় মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”

কাজ সংঘতিত হওার ক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগানোর কোন এখতিয়ারই না থাকে তাহলে রাসুল পাঠানোর মাধ্যমে আল্লাহর বিরুদ্ধে বান্দার হুজ্জত (যুক্তি) বাতিল বলে গণ্য হতো না ।

৫. কার্য সম্পাদনকারী প্রত্যেক ব্যক্তি কাজ করার সময় কোন রকম জবরদস্তির অনুভূতি ও ধারণা পোষণ করা ছাড়াই কাজ করে । সে দাড়ায়, বসে, প্রবেশ করে, বের হয়, সফর করে আবার মুকিম হয় সম্পূর্ণ তার নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী । সে এ কথা মনে করে না যে, কেউ তাকে এসব করার জন্য বাধ্য করছে কিংবা জবরদস্তি করছে । বরং নিজেই স্বতঃস্ফূর্ত কাজ আর জবরদস্তিমূলক কাজের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য বের করে । এমনিভাবে শরিয়াত ও এ দু-ধরনের কাজের মধ্যে পার্থক্য করে থাকে । ফলে জবরদস্তি শিকার হয়ে যদি বান্দা আল্লাহর হক এর ব্যাপারে কোন কাজ করে ফেলে তাহলে এর জন্য কোন শাস্তি হবে না ।

আমরা মনে করি পাপী ব্যক্তির জন্য তার পাপ কাজের পক্ষে তাকদির দ্বারা যুক্তি পেশ করার কোন সুযোগ নেই । কারন, পাপী তার নিজ এখতিয়ার ও শক্তির বলে পাপ কাজ করে অথচ সে জানে না যে পাপ কর্মটি তার তাকদীরে আল্লাহ তা’আলা লিখেছেন কিনা । যেকোন কাজ নিজ এখতিয়ার ও ক্ষমতাবলে সমাপ্ত করার পূর্ব পর্যন্ত কেউ জানতে পারে না যে সংশ্লিষ্ট কাজতি আল্লাহ তাআলা তার তাকদিরে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন কি না ।

“কেউ জানে না আগামীকাল সে কি কামাই করবে ।”

১. নিসা (০৪) ১৬৫

২. সূরা লোকমান (৩১) ৩৪

তাহলে কোন কাজ করা বা না করার অপারগতা অথবা অক্ষমতার যুক্তি [অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে করতাম না চাইলে করতাম না] দেখানো কিভাবে সঠিক হতে পারে ? তাই আল্লাহ তা’আলা এই ধরনের যুক্তি দেখানোর বিষয়টি বাতিল ঘোষণা করেছেন ।

“মুশরিক লোকেরা অচিরেই এ কথা বলবে, যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা শিরক করতাম না । আমাদের বাপ-দাদারাও শিরক করতো না । আর আমরা কোন জিনিসকে হারাম করতাম না । বস্তুত এ ধরনের কথা বলে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা সত্যে মিথ্যারোপ করেছিল । এদের বল তোমাদের কাছে এমন কোন জ্ঞান আছে কি, যা আমাদের সামনে পেশ করার মত ? তোমারা তো কেবল ধারণা আর অনুমানের উপরে চলো । আর ভিত্তিহীন ধারণার জন্ম দিয়ে চলেছে ।”

যে পাপী ব্যক্তি তাকবীরের দোহাই দেয়, তাকে আমরা বলতে চাই, আনুগত্য বা নেক কাজ করাকে আপনি আপনার তাকদীরের লিখন বলছেন না কেন । আল্লাহ তাআলা তো নেক কাজই আপনার তাকদীর লিখে রেখেছেন । আপনার দ্বারা কোন কাজ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে পাপ-পুণ্যের কাজের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই । কারণ তাকদিরের লিখন তো আপনার অজানা । অর্থাৎ পাপ করে আপনি যেভাবে তাকদিরের লিখন বলে চালিয়ে দিচ্ছেন, পুণ্য কোন কাজ করেও তাকদিরের লিখন বলে চালিয়ে দিতে পারবেন ।  এজন্যই সাহাবায়ে কিরামকে যখন নবী সাঃ জানিয়ে দিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই জান্নাত কিংবা জাহান্নামের স্ব স্ব স্থান লিপিবদ্ধ রয়েছে তখন তাঁরা বললেন, আমরা কি তাহলে তাকদিরের উপর ভরসা করে আমল বাদ দিয়ে দেবো ? তিনি উত্তরে বললেন, বরং তোমরা আমল করতে থাকো । যার জন্য যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সে কাজ সহজ ।

তাকদিরের দোহাই দিয়ে যে ব্যক্তি পাপ কাজ করে তাকে আমরা বলতে চাই, আপনি যদি মক্কা শরীফ সফর করতে চান, আর সেখানে যাওয়ার জন্য দুটি পথ থাকে, আর একজন সত্যবাদী সংবাদদাতা আপনাকে জানানো যে মক্কার একটি পথ খুবই বিপদজনক ও দুর্গম, আরেকটি পথ সোজা এবং নিরাপদ, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই দ্বিতীয় পথটি অবলম্বন করবেন । প্রথম পথটি অবলম্বন করা আপনার জন্য আদৌ সঠিক নয় । কিন্তু প্রথম পথটি অবলম্বন করে যদি আপনি একথা বলেন, আমার তাকবীরে এটাই লিখা ছিল তাহলে অবশ্যই লোকের আপনাকে পাগল বলে গণ্য করবে ।

আমরা আরো বলতে চাই, আপনার কাছে যদি এমন দুটি চাকরির প্রস্তাব পেশ করা হয় যার একটি হচ্ছে অধিক বেতনের অপরটি স্বল্প বেতনের তাহলে আপনি বেশি বেতনের চাকরিটাই গ্রহণ করবেন । তাহলে, আখিরাতের আমলের ক্ষেত্রে আপনি কিভাবে নিম্নমানের কাজ করাকে বেছে নেবেন ? তারপর বলবেন এটাই তাকদিরের লিখন ?

তাকে আরো বলতে চাই, আমরা দেখতে পাই আপনার যখন কোন শারীরিক রোগ দেখা দেয়, তখন চিকিৎসার জন্য আপনি সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ডাক্তারের দরোজায় ধরনা দেন । তারপর অপরেশনের যত ব্যাথা সহ্য করেন । ঔষধ খাওয়ার যাবতীয় ঝামেলাকে বরদাশ্ত করেন । তাহলে অসংখ্য গুনাহের দ্বারা আপনার অন্তরের যে রোগের উৎপত্তি হয়েছে তা থেকে মুক্তি লাভের জন্য কেন আপনি সেরকমটি করেন না ?

আমরা ঈমান আনি যে, বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অপরিসীম রহমত ও পূর্ণ হিকমতের কারণে কোন খারাপ কাজকেই আল্লাহর সাথে সম্পর্ক যুক্ত করা যায় না । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

“খারাপ তোমার দিকে বর্তাবে না ।”

আল্লাহর ফয়সালা নিজে কখনো খারাপ হতে পারে না । কেননা, ফয়সালাটির পেছনে কোনো না কোনো কল্যাণ ও হেকমত নিহিত আছে । অনিষ্ট বা ত্রুটি মূলত আল্লাহর ফয়সালা নয়; বরং ফয়সালাকৃত জিনিস বা বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত । এর প্রমাণ হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর বাণীঃ

“হে আল্লাহ তোমার ফয়সালাকৃত জিনিসের অনিষ্ট হতে আমাকে বাঁচাও”

এই বাক্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসানকে [রাদিয়াল্লাহু আনহু] দুয়ায়ে কুনুত এর অংশ হিসেবে শিখিয়েছেন।

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনিষ্ট কথাটি আল্লাহ তাআলার ফয়সালাকৃত জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন । তাই অনিষ্ট বা দোষ মূলত ফয়সালাকৃত বিষয়ের । তবে নিছক অনিষ্টই এর মূল কথা নয় । এক দিক থেকে খারাপ হলেও আবার অপর দিক থেকে এর কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত আছে ।

দুনিয়ার বিপর্যয়, যেমন- দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধি, অভাব-অনটন, ভয় ভীতি ও আতঙ্ক ইত্যাদি খারাপ বটে, কিন্তু অন্য দিক থেকে বিচার করলে এগুলোর মধ্যে কল্যান খুঁজে পাওয়া যাবে । আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন

“লোকেদের নিজেদের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে যেন তাদের নিজেদের কৃতকর্মের স্বাদ ভোগ করাতে পারেন । এর ফলে হয়তো তারা আল্লাহর পথে ফিরে আসবে”

চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারের রজম অর্থাৎ পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেয়া, চোর এবং ব্যভিচারীর নিজের জন্য অনিষ্টকর হতে পারে । কেননা, চোর তার হাত হারাচ্ছে আর ব্যভিচারী তার জীবন হারাচ্ছে । কিন্তু অন্য দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে এর মধ্যেও কল্যাণ নিহিত রয়েছে । আর তা হচ্ছে তাদের উপর পাপের কাফফারা হয়ে যাচ্ছে । এর ফলে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি একত্র করা হবে না । অন্য দৃষ্টি কোন থেকে আরো একটি কল্যাণকর দিক রয়েছে । তা হচ্ছে, এ বিধান প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের ধন-সম্পদ, মান-সম্মান এবং বংশ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে ।

‘ইমাম বিল কদার’ বা তাকদীরের প্রতি ঈমান স্থাপন করার কারণে মানুষের কর্মসমূহ উপর তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতার বিষয়টি সাংঘর্ষিক নয় । কেননা, শরীয়ত ও বাস্তব অবস্থা বান্দার নিজস্ব যে ইচ্ছাশক্তি রয়েছে তা সাব্যস্ত করে ।

১ । শরীয়াতের প্রমাণঃ

আল্লাহ তাআলা বান্দার ইচ্ছা প্রসঙ্গে বলেন,

“এই দিবস সত্য । সুতরাং যার ইচ্ছা সে তার রবের নিকট তার ঠিকানা তৈরি করুক”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

“তবে তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র (স্ত্রীদের) কাছে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর”

আল্লাহ তাআলা বান্দার সামর্থ্য সম্পর্ক আরো বলেন,

“অতএব তোমরা আল্লাহর যথাসাধ্য তাকওয়া অবলম্বন কর”

১. সূরা নাবা (৭৮)-৩৯

২. সূরা আল বাকারা (০২)-২২৩

৩. সূরা আত-তাগাবুন (৬৪)-১৬

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের দায়িত্ব দেন না, সে তা-ই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে”

২ । বাস্তবতার আলোকে এর প্রমাণঃ

প্রত্যেক মানুষ জানে যে, তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি ও সামর্থ্য রয়েছে এবং এর মাধ্যমে যে কোন কাজ করে বা তা থেকে বিরত থাকে । যেসব কাজ  তার ইচ্ছায় সংঘটিত হয় যেমন, চলাফেরা করা এবং যা তার অনিচ্ছায় হয়ে থাকে যেমন, হঠাৎ করে শরীর প্রকম্পিত হওয়া এ উভয় অবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা সে পার্থক্যও করতে পারে ।

তবে বান্দার ইচ্ছা ও সামর্থ্য আল্লাহর ইচ্ছা ও সামর্থ্যের অধীন ও অনুগত । আল্লাহ তাআলা বলেন,

“যে সরল পথে চলার ইচ্ছা করে (এ ঘোষণা) তার জন্য, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছার বাইরে তোমাদের কোন ইচ্ছা কার্যকর হতে পারে না”

যেহেতু সমগ্র বিশ্ব জগত আল্লাতালার রাজত্ব, তাই তার রাজত্বে তাঁর অজনা কিছু হতে পারে না ।

আমাদের উল্লেখিত বর্ণনানুযায়ী তাকদীরের উপর বিশ্বাস বান্দাকে তার উপর অর্পিত ওয়াজিব আদায় না করার অথবা তাকদিরের কথা বলে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কোন সুযোগ প্রদান করে না । সুতরাং, তাকদিরের উপর বিশ্বাস করে এই ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করা কয়েকটি কারণে বাতিল বলে বিবেচিত হবে । তন্মধ্যে কয়টি প্রমাণ নিম্নে বর্ণনা করা হলঃ

১. সূরা আল বাকারা (০২)-২৮৬

২. সূরা তাকওয়ীর (৮১)-২৮-২৯

এক

আল্লাহ তাআল বলেন,

“যারা শিরক করছে, তারা অচিরেই বলবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছে করতেন তবে আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষগণ শিরক করতাম না এবং না আমরা কোন বস্তুকে হারাম করতাম । এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছে, শেষ পর্যন্ত তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছে । আপনি বলুন, তোমাদের কাছে কি কোন প্রমাণ আছে, যা আমাদের দেখাতে পারো ? তোমরা শুধু আন্দাজের অনুসরণ কর এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বলো”

এতে বোঝা গেল, পাপ কাজ করার জন্য তাকদিরেকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যদি বৈধ হত, তবে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে শাস্তি দিতেন না ।

দুই

আল্লাহ বলেন,

“রাসূলগনকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসুলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে । আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় ।”

যদি তাকদির পথভ্রষ্ট লোকদের জন্য পাপ কাজ করার প্রমাণ হত তাহলে নবী-রসূলগণ প্রেরিত হওয়ার পর থেকে উঠিয়ে নেওয়া হতো না । কেননা, নবী এবং রাসূলগণের আগমণের পরেও অবাধ্যতা তাকদিরের কারণে সংঘটিত হচ্ছে ।

তিন

আলী ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে,

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোন লোক নেই যার ঠিকানা জান্নাতে বা জাহান্নামের লেখা হয়নি । উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা কি ভাগ্যের উপর তাওয়াক্কুল তথা ভরসা করে থাকবো না ? রাসূলুল্লাহ তদুত্তরে বললেন, না, আমল করতে থাকো, যাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে তা সহজ পাবে’

তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাঠ করলেন,

‘আর যে দান করে, আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যা উত্তম তা সত্য বলে মেনে চলে, আমরা তার জন্য শুগম করে দেবো সহজ পথ’

সহিহ মুসলিমের হাদিসে এভাবে এসেছে যে,

‘যে যার জন্য সৃষ্ট তা তার জন্য সহজ’

তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকদীরের উপর ভর করে থাকতে নিষেধ করেছেন ।

১. সহিহ বুখারী ও মুসলিম

২. সূরা আল-লাইল (৯২) ৫-৭

চার

আল্লাহ তাআলা বান্দাকে কতিপয় বিষয়ে আদেশ এবং কতিপয় বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন । তাকে তার ক্ষমতা ও সাধ্যের বাইরে কিছুই করতে বলেননি । আল্লাহ তাআলা বলেন,

“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের দায়িত্ব দেন না”

যদি বান্দা কোন কাজ করার ক্ষেত্রে বাধ্যই থাকতো, তাহলে তাকে তার সাধ্য ক্ষমতার বহির্ভূত এমন অনেক কাজের নির্দেশ দেওয়া হতো যা থেকে তার রেহাই পাওয়ার কোন উপায় থাকত না । আর সেটা বাতেল । তাই বান্দা ভুল, অজ্ঞতাবশত অথবা জোরপূর্বক অনিচ্ছাকৃত কোন অপরাধ করলে তাতে পাপ হয় না ।

পাচ

আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদির সম্পর্কে বান্দার কোন জ্ঞান নেই । তাগায়েবি জগতের এক গোপন রহস্য । তাকদিরের বিষয় সংঘটিত হওয়ার পরই কেবল বান্দা তা জানতে পারে । বান্দার ইচ্ছা তার কাজের পূর্বে হয়ে থাকে; তাই তার ইচ্ছা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদির জানার উপর ভিত্তি করে হয় না । এমতাবস্থায় তাকদীরের দোহাই দেওয়ার কোনো অর্থই হয় না । আর যে বিষয় বান্দার জানা নেই সে বিষয়ে তার জন্য প্রমাণ হতে পারে না ।

ছয়

আমরা লক্ষ্য করি, মানুষ পার্থিব বিষয়ে সদাসর্বদা যথাপোযুক্ত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হয়ে থাকে । কখনো ক্ষতিকর ও অলাভজনক কাজে পা বাড়ায় না এবং তখন তাকদিরের দোহাইও দেয় না । তাহলে ধর্মীয় উপকারী দিক দিয়ে ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়ে তাকদিরের দোহাই দেওয়া হয় কেন ? ব্যাপারটা কি উভয় ক্ষেত্রে এক নয় ?

প্রিয় পাঠক, আপনার সম্মুখে দুটি উদাহরণ পেশ করছি যা বিষয়টি স্পষ্ট করে দেবে, ইনশাআল্লাহ ।

প্রথম উদাহরণঃ

যদি কারো সামনে দুটি পথ থাকে । এক পথে তাকে এমন এক দেশে নিয়ে পৌঁছাবে, যেখানে শুধু নৈরাজ্য, খুন-খারাবি, লুটপাট, ভয়ভীতি ও দুর্ভিক্ষ বিরাজমান । দ্বিতীয় পথ তাকে এমন স্বপ্নের শহরে নিয়ে যাবে, যেখানে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, খুব স্বচ্ছন্দ ও জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিদ্যমান । এমতাবস্তায় সে কোন পথে চলবে ? নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে, সে দ্বিতীয় পথে চলবে । যে পথে শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা বলবত রয়েছে । কোন বুদ্ধিমান লোক প্রথম পথে পা দিয়ে ভাগ্যের দোহাই দেবে না । তাহলে মানুষ আখিরাতের ব্যাপারে জান্নাতের পথ ছেড়ে জাহান্নামের পথে চলে তাকদীরের দোহাই দেবে কেন ?

দ্বিতীয় উদাহরণঃ

রোগীকে ওষুধ সেবন করতে বললে তা তিক্ত হলেও সে সেবন করে । বিশেষ ধরনের কোন খাবার খেতে নিষেধ করা হলে, তা সে খায় না, যদিও তার মন তা খেতে চায় । এসব শুধু নিরাময় ও রোগ মুক্তির আশায় এবং সে তাকদিরের দোহাই দিয়ে ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকে না বা নিষিদ্ধ খাদ্য ভক্ষণ করে না ।

তাহলে মানুষ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশাবলী বর্জন এবং নিষেধাবলি অমান্য করে তাকদিরের দোহাই দেবে কেন ?

সাত

যে ব্যক্তি তার ওপর অর্পিত ওয়াজিব কাজসমুহ ত্যাগ করে অথবা পাপ কাজ করে তাকদিরের দোহাই দিয়ে থাকে অথচ তার ধন-সম্পদ বা মান-সম্মানে কেউ যদি আঘাত হেনে বলে, এটাই তোমার তাকদীরে লেখা ছিল, আমাকে দোষারোপ করো না, তখন সে তার যুক্তি গ্রহণ করবে না । তাহলে কেমন করে সে তার উপর আক্রমণের সময় তাকদিরের এর দোহাই স্বীকার করে না । তাহলে কেন সে আল্লাহর অধিকারে আঘাত হেনে তাকদিরের দোহাই দেবে ?

উল্লেখ্য, একদা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর দরবারে এক চোরকে হাজির করা হয় । তার হাত কর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলে সে বলে, হে আমীরুল মুমিনীন, থামুন, আল্লাহ তাকদিরে লিখে রেখেছেন বলে আমি চুরি করেছি । উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমরাও আল্লাহর তাকদীর লিখে রেখেছেন বলে হাত কর্তনের নির্দেশ দিয়েছি ।

তাকদীরের উপর ঈমানের বহুবিধ ফল রয়েছে । তন্মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হলঃ

১ । ঈমান বিল ক্বাদর দ্বারা উপায়-উপকরণ গ্রহণকালে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহ তাআলার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা সৃষ্টি হয় এবং সে তখন শুধু উপায়-উপকরণের উপর নির্ভরশীল হয় না । কেননা, প্রতিটি বস্তুই আল্লাহতালার তাকদিরের আওতাধীন ।

২ । ব্যক্তির কোন উদ্দেশ্য সাধিত হলে সে তখন নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে না । কারণ, যা অর্জিত হয়েছে তা সবই আল্লাহর নেয়ামত । যা তিনি কল্যাণ ও সাফল্যের উপকরণ দ্বারা নির্ধারণ করে রেখেছেন । আর ব্যক্তি নিজ কর্মের জন্য আত্মম্ভরি হলে এই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে ভুলে যায় ।

৩ । ঈমান বিল ক্বাদর দ্বারা বান্দার উপর আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী যা কার্যকর হয় তাতে তার অন্তরে প্রশান্তি ও নিশ্চয়তা পরিচিত হয় । ফলে সে কোন প্রিয় বস্তু হারালে বা কোনো প্রকার কষ্ট ও বিপদে আপতিত হলে বিচলিত হয় না । কারন, সে জানে, সবকিছুই সেই আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী ঘটেছে যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর মালিক । যা ঘটবার তা ঘটবেই ।

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের উপর যেসব বিপদ-আপদ আসে জগত সৃষ্টির পূর্বেই তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে । নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ । এটা এজন্য, যাতে তোমরা যা হারিয়ে ফেলো তজ্জন্য দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, সেজন্য উল্লসিত না হয়ে ওঠো । আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীকে পছন্দ করেন না ।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“মুমিনের ব্যাপারে আশ্চর্য হতে হয়, তার সব ব্যাপারেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে । একমাত্র মুমিনের ব্যাপারেই তা হয়ে থাকে । আনন্দের কিছু হলে সে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তখন তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে । আর যখন তার উপর কোন ক্ষতি বিষয় আপতিত হয় তখন সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন তার জন্য তাও কল্যাণকর হয়ে ওঠে”

তাকদির সম্পর্কে দুটি সম্প্রদায় পথ ভ্রষ্ট হয়েছেঃ

তন্মধ্যে একটি হলো জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়, এরা বলে, বান্দা তাকদিরের কারণে স্বীয় ক্রিয়া কর্মে বাধ্য, এতে তার নিজস্ব কোন ইচ্ছাশক্তি বা সামর্থ্য নেই ।

আর দ্বিতীয়টি হলো ক্কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়, এদের বক্তব্য হলো, বান্দা তার যাবতীয় কর্মকাণ্ডে স্বীয় ইচ্ছা ও শক্তির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পন্ন, তার কাজে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা বা কুদরতের কোনো প্রভাব নেই ।

শরিয়াত ও বাস্তবতার আলোকে প্রথম দল (জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়)-এর বক্তব্যের জবাবঃ

১. শরীয়তের আলোকে এর জবাবঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দার জন্য ইরাদা ও ইচ্ছাশক্তি সাব্যস্ত করেছেন এবং বান্দার প্রতি তার কার্যক্রমের সম্বন্ধ আরোপ করেছেন । আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“তোমাদের কারো কাম্য হয় দুনিয়া আবার কারো কাম্য হয় আখেরাত”

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

“বলো, সত্য তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত। অতএব যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা কুফরি করুক আমি জালেমদের জন্যে অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি । যার বেষ্টনী তাদের পরিবেষ্টিত করে রাখবে”

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

“যে সৎকর্ম করে, সে নিজের জন্যই করে । আর যে অসৎকর্ম করে, তা তারই উপর বর্তাবে । আপনার পালনকর্তা বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করেন না”

১. সূরা আল ইমরান (০৩) ১৫২

২. সূরা আল কাহাফ (১৮) ২৯

৩. সূরা ফুসসিলাত (৪১) ৪৬

২ । বাস্তবতার আলোকে এর জবাবঃ সকল মানুষেরই জানা আছে যে, তার কিছু কর্ম স্বীয় ইচ্ছাধীন, যা তার আপন ইচ্ছায় সম্পাদিত করে । যেমন, খাওয়া-দাওয়া, পান করা এবং ক্রয় বিক্রয় করা । আর কিছু কাজ অনিচ্ছাধীন । যেমন, অসুস্থতার কারণে শরীর কম্পন করা ও উঁচু স্থান থেকে নিচু দিকে পড়ে যাওয়া ।  প্রথম ধরনের কাজে মানুষ নিজেই কর্তা, নিজ ইচ্ছায় মানুষ তা গ্রহণ করেছে এতে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না । আর দ্বিতীয় প্রকার কাজকর্ম তার কোন নিজস্ব পছন্দ ছিল না এবং তার উপর যা পতিত হয়েছে তার কোনো ইচ্ছাও তার ছিল না ।

শরীয়ত ও যুক্তির আলোকে দ্বিতীয় দল ক্কাদারিয়্যাহদের বক্তব্যের জবাবঃ

শরিয়াতঃ আল্লাহ তা’আলা সকল বস্তুর স্রষ্টা, জগতের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় অস্তিত্ব লাভ করে । আল্লাহ তালা তার পবিত্র গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, বান্দাদের সব কর্মকাণ্ডও আল্লাহর ইচ্ছায় বাস্তবায়িত হয়ে থাকে । আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“আর, আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে খুবই স্পষ্ট প্রমাণাদি এসে যাবার পর তাদের পয়গম্বরদের পরবর্তীরা পরস্পর লড়াই-বিগ্রহে লিপ্ত হতো না । কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে গেল । অতঃপর তাদের কেউ তো ঈমান এনেছে আর কেউ হয়েছে কাফের । আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে তারা পরস্পর লড়াই করত না । কিন্তু আল্লাহ তা-ই করেন, যা তিনি ইচ্ছা করেন”

১. সূরা আল বাকারা (০২) ২৫৩

আল্লাহ আরও বলেন,

“আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতাম । কিন্তু, আমার এ উক্তি অবধারিত সত্য, আমি জিন ও মানব উভয় দ্বারা অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করবো”

যুক্তির মাধ্যমে জবাব এর জবাবঃ একথা নিশ্চিত যে, সমস্ত বিশ্বজগৎ আল্লাহর মালিকানাধীন এবং মানুষ এই বিশ্বজগতেরই একটি অংশ, তাই সেও আল্লাহর মালিকানাধীন । আর মালিকানাধীন কোন সত্ত্বারপক্ষে মালিকের অনুমতি ও ইচ্ছা ব্যতিরেকে তার রাজত্বে কোন কিছু করা সম্ভব নয় ।

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন