চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

এ গ্রন্থের লেখক মুহাম্মাদ আতাউর রহীম আবেগ সহকারে উপলব্ধি করেন যে, খৃষ্টান দেশগুলোর জনসাধারণের যদি ইসলামি ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে কিছু জ্ঞানও থাকত, পাশাপাশি তারা যদি আল্লাহর নবী ঈসা আলাইহিস সালামকে প্রকৃতই বুঝার চেষ্টা করত, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা পরিহার করা যেত। মেধাবী, উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী আন্তর্জাতিক মনোভাবাপন্ন পণ্ডিত এ লেখক মানুষের সুখ ও কল্যাণ কামনার ক্ষেত্রে দেশ ও জাতীয়তার সীমা অতিক্রম করে গেছেন। তার বক্তব্য, আন্তঃসাংস্কৃতিক অজ্ঞতাই হচ্ছে আজকের দুর্দশা ও কষ্টের প্রধান একক কারণ।

সে কারণেই এ গ্রন্থটি রচিত, প্রধানত পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে। তবে এ গ্রন্থটি তাদের জন্যও যারা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম, তার মিশন ও তার অন্তর্ধানকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী ধারণার জটাজাল থেকে মুক্তি পেতে চান। মুহাম্মাদ আতাউর রহীম এই বিশৃঙ্খলাকে একজন খাঁটি ঐতিহাসিকের যুক্তি দিয়ে আক্রমণ করেছেন। তিনি দেখতে পেয়েছেন যে, প্রায় সকল বিভ্রান্তির কারণ হলো দু’টি মতবাদ যা সকল যুক্তিকেই উপেক্ষা করেছে। মতবাদ দু’টি হলো কথিত যীশুর ঈশ্বরত্ব এবং ত্রিত্ববাদ।

এই গ্রন্থ খৃষ্টান চার্চ যার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, সেই কল্পকাহিনীকে বিপুলভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখিয়েছে একেশ্বরবাদে বিশ্বাসের শিক্ষক হিসেবে যাকে ইয়াহূদী পুরোহিততন্ত্রের মধ্যকার অসংখ্য, খারাপ উপাদান ধ্বংসের জন্য আল্লাহ পাক নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন।

তবে আমি এই ভূমিকাকে এ গ্রন্থের সারমর্ম হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছি না। এ গ্রন্থটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ও স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। সত্য উপলব্ধির ব্যাপারে অ-মুসলিমদের সাহায্য করতে এবং অধিকাংশ খৃষ্টানের ইসলামের প্রতি কুসংস্কারজনিত ভীতি হ্রাস করার একান্ত ইচ্ছার অংশ হিসেবে লেখক এ গ্রন্থটি রচনা করেছেন।

আমরা যারা মুসলিম তারা জানি যে, এ ভয় কতটা অমূলক। আমরা আমাদের জ্ঞান থেকে জানি, মহান আল্লাহ কত ক্ষমাশীল, মানুষের প্রতি কত অনুগ্রহশীল, তিনি মানুষের স্পর্শাতীত সত্ত্বা:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [الشورا: ١١] 

“কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়, তিনি সর্ব শ্রোতা, তিনি সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ১১] আমরা নিশ্চিত জানি যে, আল্লাহ নবীগণকে প্রেরণ করেছেন, তারা আমাদের জন্যই প্রেরিত হয়েছেন, জগতে আমাদের একমাত্র মা‘বুদ হিসেবে আল্লাহর বাণী তারা প্রচার করেছেন এবং আমাদের অনুসরণের জন্য প্রদান করেছেন নির্দেশনা (আসমানি কিতাব)। মুসলিমগণ অপরিবর্তনীয় ও পূর্ণাঙ্গ পবিত্র কুরআনের অনুসারী, কিন্তু তারা সম্ভবত সময়ে সময়ে এ পূর্ণাঙ্গ অপরিবর্তনীয় মহা গ্রন্থটিকে অন্যদের জন্য

তুলতে সমর্থ হয় না। এই লেখক, সকল মানুষের জন্য তার গভীর দরদের কারণে (বিশেষ করে যারা তার চেয়েও সৌভাগ্যহীন) তাদের সাথে যোগাযোগের এই ব্যর্থতা সম্পর্কে সচেতন। তিনি ইসলামের বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ সম্পর্কেও বিশেষভাবে সচেতন যা কিনা ইস বোধগম্য লামের অভ্যন্তরেই বিকাশ লাভ করেছে। এগুলো যারা ইসলামকে বেড়ার ওপার থেকে ভীতির সাথে দেখেছে তাদের বিভ্রান্ত করতে, এমনকি বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যেও বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি ঘটাতে সক্ষম।

কেবল সুদৃঢ় সংকল্প, বিপুল সহানুভূতিই বিভিন্ন জাতির মধ্যে প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব ও সমঝোতা আনতে পারে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো অপরিচয়ের ভীতি। নৈতিক মূল্যবোধহীন পাশ্চাত্যের দিকে তাকিয়ে অনেক মুসলিমই মনে করেন যে, সেই আধ্যাত্মিক শূন্যতার মধ্যে ইসলামের প্রবেশ ঘটানো খুবই সহজ ব্যাপার হবে। কিন্তু এ ধরনের আশা পোষণ করা আসলে শূন্যে প্রাসাদ নির্মাণের মতোই। পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি ও শিল্প প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য জনগণের গণশিক্ষা। এ গণশিক্ষা এসব লোকদের সবাইকে সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, ধর্মকে তারা যেভাবে জানে, তা সত্যের সমর্থনহীন মতবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। পরিণতিতে, এটা তেমন আশ্চর্যজনক নয় যে, এই শিল্প সমৃদ্ধ সমাজের বৃদ্ধিজীবী এলিটরা খৃষ্টান চার্চের একচেটিয়া পুরোহিততন্ত্রের কাছ থেকে তাদের নয়া আবিষ্কৃত স্বাধীনতার মধ্যে এক অপরিসীম মুক্তির স্বাদ খুঁজে পেয়ে প্রথম তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। অথচ এই পুরোহিততন্ত্রই শত শত বছর ধরে শিক্ষা বিস্তারের কাজটি পালন করে এসেছে। যা হোক, এ ধরনের লোকদের কাছে ধর্ম, তা সে যে নামেই হোক, শুধু পুরোনো কুসংস্কারই নয়, উপরন্তু তা এক বাধা সৃষ্টিকারী শক্তি এবং অধিকতর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে এক প্রতিবন্ধক হিসেবে পরিদৃষ্ট হয়েছে। জন্মগতভাবে মুসলিম, যারা নিজেদের ও আল্লাহর মধ্যে সংঘৃষ্ট হতে অনভ্যস্ত, তারা এই মনোভাবকে উপলব্ধি করতে পারে নি বলেই মনে হয়। সত্য ভ্রষ্ট খৃষ্টানদের জন্য ধর্ম-বিশ্বাস হারানো হলো মানুষের তৈরি দর্শন থেকে বিচ্যুত হওয়া। যা কিনা অতীতে আইন- শৃঙ্খলা রক্ষার একটি পন্থা হিসেবেই কিছুটা যা কাজে লেগেছে।

ইসলাম পাশ্চাত্যের আধ্যাত্মিক শূন্যতা পূরণ করতে পারার আগে এসব সম্পূর্ণ বস্তুবাদী মানুষকে আল্লাহর প্রকৃত সত্ত্বার সম্পর্ক বুঝাতে হবে এবং আল্লাহ সম্পর্কে এই জ্ঞান যে তাদের প্রত্যাখ্যাত পুরোহিততন্ত্রকে পুনরায় গ্রহণ করার ওপর নির্ভর করে না তাও বুঝাতে হবে। তাদেরকে মুসলিমদের ব্যাপারে দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে এক নতুন ধারণা প্রদান করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলো যদি প্রায় রাতারাতি বিপুল সম্পদ অর্জন করতে না পারত তাহলে ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের অজ্ঞতা আরো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে বিদ্যমান থাকত। যেমন বলা যায়, রাশিয়াসহ সমগ্র ইউরোপ এবং আমেরিকা হঠাৎ করে শুধু তাদের কাছে অপরিচিত একটি ধর্ম বিশ্বাসেরই মুখোমুখি হয় নি, বরং এমন একটি ধর্ম বিশ্বাসের সম্মুখীন হয়েছে যার পিছনে রয়েছে একটি পণ্য, যেটাকে তারা স্বীকৃতি দেয়। সেটি হলো অর্থ, বিপুল পরিমাণ অর্থ। তার অর্থ শক্তি, যে শক্তি দিয়ে প্রায় সব কিছু জয় করা যায়।

এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, এই শক্তির ব্যাপারে প্রকৃতই ভয় রয়েছে। দীর্ঘকাল পূর্বে মুসলিম বিশ্বই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের একচেটিয়া অধিকারী ছিল। প্রাচ্যের বিকাশের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান, এটা দীর্ঘদিনের বিস্তৃত ইতিহাস। আরব দেশগুলো অতি সম্প্রতি প্রকৃত জাতীয়তাবোধ খুঁজে পেয়েছে। পাকিস্তান এই কয়েক দশক আগেও পশ্চিমা শিল্পশক্তির শোষণ-নিপীড়নের শিকার ছিল। তবুও বিশ্বব্যাপী ইসলাম (অনুসারী জনগোষ্ঠী পাশ্চাত্যের চন্দ্র পৃষ্ঠে পদচারণা, টেস্ট-টিউব শিশু তৈরির সক্ষমতা এবং মানুষের বর্তমান আয়ু সীমাকে দ্বিগুণ করার প্রায়) অর্জিত সাফল্য সত্ত্বেও সেই সমাজের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করার সম্ভাবনা প্রদর্শন করছে।

রোমার যাজকতন্ত্রের অধীনতা ও শাসন থেকে নিজেদের দেশকে মুক্ত করতে এবং বেসামরিক সরকার ও নাগরিক আইন প্রতিষ্ঠা করতে যারা কঠিন লড়াই করেছে, খৃষ্টান দেশগুলোতে জন্মগ্রহণকারী সে সব লোকেরা আজ তাদের স্বাধীনতা দ্রুত বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে। মুহাম্মাদ আতাউর রহীমের এই গ্রন্থের মত ইসলামি পণ্ডিত-গবেষকরা মানুষের প্রতি সযত্ন ভালোবাসা নিয়ে যতক্ষণ না পাশ্চাত্যের সাথে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের পরিবেশ সৃষ্টি করবে ততদিন শুধু ভীতির আবহাওয়া থেকে বিরোধেরই সৃষ্টি হতে থাকবে। মুসলিম দেশগুলো

বিশেষত যেসব দেশের বিপুল আর্থিক শক্তি রয়েছে, তাদের ওপরই আজ অর্পিত হয়েছে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদাহরণ সৃষ্টির গুরু দায়িত্ব। আশার কথা যে, পশ্চিমা দেশগুলো এবং মুসলিম দেশগুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর বিস্তৃতি ও সংখ্যা বৃদ্ধি ইসলামি গবেষণা ও অধ্যয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের জনগণের অমূলক ভীতি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হবে।

আমরা, মুসলিমরা আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করব। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা হাত-পা গুটিয়ে পিছনে পড়ে থাকব। আমাদের রয়েছে মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠতম দৃষ্টান্ত এবং আমাদের দিক-নির্দেশনা প্রদানকারী পবিত্র কুরআনের অপরিবর্তনীয় নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা। তবে এ নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে যা বলা হয়েছে তা হলো আমরা যদি ইহকালে শান্তি ও পরকালে আল্লাহর সর্বোত্তম অনুগ্রহ চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই সেভাবে কাজ করতে হবে যেমনটি মহান রাব্বুল আলামিন চান।

অ্যান্ড্রু ডগলস হ্যামিলটন

জমাদিউস সানি, ১৩৯৯ হিজরি

এপ্রিল, ১৯৭৯ খ্রী.

অনুবাদকের কথা

Jesus: Prophet of Islam ‘জেসাস: এ প্রফেট অব ইসলাম’ গ্রন্থটি আমি প্রথম দেখি ১৯৯৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরিতে। অন্য আর পাঁচটি বই উলটে দেখার মতোই দেখেছিলাম এ বইটি। এটি যে কখনো অনুবাদ করব ভাবি নি।

ঘটনাচক্রে এর বছর দেয়ক পর বইটি অনুবাদের কাজ শুরু করলাম। আর এ কাজে যিনি আমাকে উৎসাহিত করেছেন, তিনি হচ্ছে আমার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী পরম শ্রদ্ধাভাজন লেখক, অনুবাদক জনাব লুৎফুল হক। তিনি তখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ বিভাগের পরিচালক। নিয়মানুযায়ী বইটি অনুবাদের ব্যাপারে আমার আগ্রহ প্রকাশ করে অনুবাদ বিভাগকে চিঠি দিলাম। তারা অনুবাদের নমুনা জমা দিতে বললেন। দিলাম। তা তাদের পছন্দ হলো। তারপর পুরো বই অনুবাদ করে জমা দিলাম। সে ১৯৯৭ সালের কথা।

এখানে বলা দরকার, এ অনুবাদ বইয়ের সূত্রেই দেশের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক, গবেষক, টিভি ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আশরাফ আলী সাহেবের সাথে আমার পরিচয় ঘটার সৌভাগ্য হয়। তিনি ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ছিলেন। আমি তাকে চিনলেও তিনি আমাকে চিনতেন না। অনুবাদ বিভাগ আমার অনুদিত বইটি বিক্রয়ে জন্য তার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তখন আর মহাপরিচালক নন। কিন্তু বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তিনি অনুবাদকের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন। এটা জেনে একদিন ফোনে কথা বলে সময় ঠিক করে তার কলা বাগান লেক সার্কাসের বাড়িতে গেলাম। তার মত একজন পণ্ডিত লোক আমার মত সামান্য অনুবাদকের অনুবাদ পরীক্ষা করে দেখছেন এ কারণে বেশ শঙ্কিত ছিলাম। তবে সাক্ষাতের পর তার অসাধারণ সৌন্দর্যবোধ আর আন্তরিক ব্যবহারে সে শঙ্কা কেটে গেল। তিনি বইটি দেখে শেষ করেছিলেন। দু’একটি জায়গায় শব্দ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। আমি ব্যাখ্যা দিলাম। তিনি মেনে নিলেন। বললেন এটি বেশ কঠিন বই। তবে আপনার অনুবাদ যথেষ্ট ভালো হয়েছে। তার কথায় সত্যি ভালো লাগল আমার আত্মবিশ্বাস আরো দৃঢ় হলো। দেখলাম পাণ্ডুলিপিতে তিনি অনেক সংশোধন করেছেন। আমি বিভিন্ন নাম ও স্থানের ইংরেজি বানান উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম, তিনি কষ্ট করে সেগুলো লিখে দিয়েছেন। এর প্রয়োজন ছিল। তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল।

এরপর বইটি সম্পাদনা করতে দেওয়া হয় প্রফেসর আবদুল মান্নান সাহেবকে। তার সাথে আমার পরিচয় নেই। কিন্তু বইটির চূড়ান্ত প্রুফ দেখার সময় পাণ্ডলিপিতে দেখলাম তার সুদক্ষ সম্পাদনার পরিচয় ছড়িয়ে আছে। আমি উপলব্ধি করলাম যে, এই পণ্ডিত মানুষটির হাতে সম্পাদিত না হলে এ বইটিতে অনেক ত্রুটি থেকে যেত। তাকে আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।

এবার এ বইটি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলি। সত্যি কথা বলতে কি, নবী ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বিশ্বের কোথাও কোনো তথ্য নেই। আমরা তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না। অথচ বিশ্বের ধর্মীয় ইতিহাসে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ নবী। মহান আল্লাহ তাআলা মানব সমাজকে হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেন। তাদের মধ্যে মাত্র চারজনের কাছে আল্লাহ পাক আসমানি কিতাব নাজিল করেছিলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম তাদেরই একজন। কিন্তু মানব সমাজের দুর্ভাগ্য যে সমকালের এক শ্রেণির মানুষ তার সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি পূর্বক তার প্রচারিত ধর্ম শিক্ষাকে বিকৃত এবং তার ওপর ‘ঈশ্বরত্ব’ আরোপ করে, যার মূলে কিনা অসত্য আর বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নেই। এমনকি ঈসা আলাইহিস সালাম যে, ইসলামেরই এক নবী এ কথাটিও খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীরা স্বীকার করে নি, এখনও করে না।

পাকিস্তানের লেখক গবেষক মুহাম্মাদ আতাউর রহীম এ বিষয়টি গভীর অধ্যয়ন গবেষণার পর ‘জেসাস, এ প্রফেট অব ইসলাম’ শীর্ষক ইংরেজি গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি অসংখ্য গ্রন্থের সমর্থনে প্রমাণ করেছেন যে ‘ত্রিত্ববাদ’ যা প্রচারিত তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, আর যীশু অবশ্যই ঈশ্বর নন- তিনি একজন মানুষ ও আল্লাহর প্রেরিত কিতাবধারী নবী ঈসা আলাইহিস সালাম।

জানা মতে, খৃষ্টধর্মের তথাকথিত ত্রিত্ববাদকে অসার ও ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করে যুক্তি ও প্রমাণ সহযোগে এ রকম আর কোনো গ্রন্থ এ পর্যন্ত রচিত হয় নি। জনাব আতাউর-রহীমের গ্রন্থটি ১৯৮০ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের করাচিস্থ আয়েশা বাওয়ানী ওয়াকফ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়।

১৯৮৬ সাল পর্যন্ত গ্রন্থটির মোট ৩টি সংস্করণ প্রকাশের কথা জানা যায়।

এ মূল্যবান গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ করার তাওফীক আল্লাহ আমাকে দিয়েছিলেন। এ জন্য তার কাছে লাখো শুকরিয়া জানাই। আর্থিক অনটন, ব্যক্তিগত সমস্যা সময়ের একান্ত অভাবের কারণে রাতের পর রাত জেগে বহুবার ঢাকা-কুষ্টিয়া-ঢাকা যাওয়া-আসার পথে চলন্ত বাসে, ট্রেনে, ফেরীতে বসে যখন যেখানে পেরেছি, সেখানে সে অবস্থায় অমানুষিক পরিশ্রম করে এ বইয়ের অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেছিলাম। এমনও হয়েছে যে, একটি জটিল শব্দের অর্থ বুঝতে গোটা রাত পার হয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক স্থানে আটকে গিয়ে তিন সাংবাদিক সহকর্মী, শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ নুরুল হোসেন সাহেব, এস.এম. হাফিজুর রহমান ও একরামুল্লাহিল কাকির সাহায্য চেয়েছি। এ সকল মানুষেরা বিপুল ঔদার্যে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।

সুধী পাঠকের কাছে যদি সমাদৃত হয়, এ গ্রন্থ অনুবাদকের উদ্দেশ্য ও পরিশ্রম সফল হবে।

হোসেন মাহমুদ