একজন অবিশ্বাসীর বিশ্বাস

মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

আমি রুমে  ঢুকেই দেখি সাজিদ কম্পিউটারের সামনে উবু হয়ে বসে আছে । খটাখট কি যেন টাইপ করছে হয়তো । আমি যোগ থেকে পানি ঢালতে লাগলাম । প্রচণ্ড রকম তৃষ্ণার্থ । তৃষ্ণায় বুক ফেটে জাবার জোগাড় । সাজিদ কম্পিউটার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি রে , কিছু হইল ? ’

আমি হতাশ গলায় বললাম, ‘নাহ ।’

-‘তার মানে তোকে এক বছর ড্রপ দিতেই হবে ? ’ সাজিদ জিজ্ঞেস করলো ।

আমি বললাম, ‘কি আর করা । আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন ।’

সাজিদ বলল, ‘তোদের এই এক দোষ, বুঝলি ? দেখসিস পুওর এটেন্ডেন্সের জন্য এক বছর ড্রপ খাওয়াচ্ছে, তার মধ্যে বলিস, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন । ভাই, এখানে কোন ভালটা তুই পাইলি, বলতো ?’

সাজিদ সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া দরকার । আমি আর সাজিদ রুমমেট । সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজিতে পড়ে । প্রথম জিবনে খুব ধার্মিক ছিল । নামাজ – কালাম করত । বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কিভাবে কিভাবে যেন এগনোষ্টিক হয়ে পড়ে । আস্তে আস্তে স্রষ্টার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এখন পুরোপুরি নাস্তিক হয়ে গেছে । ধর্মকে সে এখন সে আবর্জনা জ্ঞান করে । তার মতে পৃথিবীতে ধর্ম এনেছে মানুষ । আর ‘ঈশ্বর’ ধারনাটাই এরকম স্বার্থান্বেষী কোন মহলের মস্তিস্কপ্রসূত ।

সাজিদের সাথে এই মুহূর্তে তর্কে জড়াবার কোন ইচ্ছে আমার নেই । কিন্তু তাকে একদম ইগনোর করেও যাওয়া যায় না ।

আমি বললাম- ‘আমার সাথে তো এর থেকেও খারাপ কিছু হতে পারতো, ঠিক না ?’

-‘আরে, খারাপ হবার আর কিছু বাকি আছে কি ?’

— ‘হয়তো’

-‘যেমন ?’

-‘এরকমও তো হতে পারতো, ধর, আমি সারাবছর একদমই পড়াশোনা করলাম না । পরীক্ষায় ফেইল মারলাম । এখন ফেইল করলে আমার এক বছর ড্রপ যেত । হয়তো আমি ফেইল অপমানটা আমি নিতে পারতাম না । আত্মহত্যা করে বসতাম ।’

সাজিদ হা হা করে হাসা শুরু করলো । বলল, ‘কি বিদঘুটে বিশ্বাস নিয়ে চলিসরে ভাই’

এই বলে সে হাসা আবার হাসা শুরু করলো । বিদ্রূপাত্মক হাসি ।

রাতে সাজিদের সাথে আমার অ্যারো এক দফা তর্ক হল ।

সে বলল, ‘আচ্ছা তোরা যে স্রষ্টায় বিশ্বাস করিস, কিসের ভিত্তিতে ।’

আমি বললাম – ‘বিশ্বাস দু ধরনের । একটা হল, প্রমানের ভিত্তিতে বিশ্বাস । অনেকটা শর্তারোপে বিশ্বাস বলা যায় । অন্যটি হল, প্রমান ছাড়াই বিশ্বাস ।’

সাজিদ হাসল । সে বলল, ‘দ্বিতীয় ক্যাটাগরিকে সোজা বাংলায় অন্ধ বিশ্বাস বলে রে আবুল, বুঝলি ?’

আমি তার কথায় কান দিলাম না । বলে যেতে লাগলাম –

‘প্রমানের ভিত্তিতে যে বিশ্বাস, সেটা মূলত বিশ্বাসের মধ্যে পড়ে না । পড়লেও খুব ট্যাম্পরারি । এই বিশ্বাস এতই দুর্বল যে, হঠাত পালটায় ।’

সাজিদ এবার নড়েচড়ে বসলো । সে বলল, ‘কি রকম ?’

আমি বললাম, ‘এই যেমন ধর, সূর্য এবং পৃথিবীকে নিয়ে মানুসের একটা আদিম কৌতূহল আছে । আমরা আদিকাল থেকেই এদের নিয়ে জানতে চেয়েছি, ঠিক না ? ’

-‘হু ঠিক ।’

-‘আমাদের কৌতূহল মেটাতে বিজ্ঞান আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে, ঠিক ?’

-‘হ্যা’

-‘আমরা একটা ছিলাম । আমরা নির্ভুলভাবে জানতে চাইতাম যে, সূর্য আর পৃথিবীর রহস্যটা আসলে কি । সেই সুবাধে, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা নানান সময়ে নানান তত্ত্ব আমাদের সামনে এনেছেন । পৃথিবী আর সূর্য নিয়ে প্রথম ধারনা দিয়েছিলেন গ্রিক জোত্যির বিজ্ঞানী টলেমি । টলেমি কি বলেছিল সেটা তুই নিশ্চয়ই জানিস ?’

সাজিদ বলল, ‘হ্যা । সে বলেছিল সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে ।’

-‘একদম তাই । কিন্তু বিজ্ঞান কি আজো টলেমির থিউরিতে বসে আছে ? নেই । কিন্তু কি জানিস, এই টলেমির থিউরিটা বিজ্ঞান মহলে টিকে ছিল পুরো ২৫০ বছর । ভাবতে পারিস ? ২৫০ বছর পৃথিবীর মানুষ, যাদের মধ্যে আবার বড় বড় বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ছিল, তারাও বিশ্বাস করত যে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে । এই ২৫০ বছরে তাদের মধ্যে যারা যারা মারা গেছে, তারা এই বিশ্বাস নিয়েই মারা গেছে, তারা এই বিশ্বাস নিয়েই মারা গেছে যে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে ।’

সাজিদ সিগারেট ধরাল । ছিগারেটের ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘তাতে কি ? তখন তো আর টেলিস্কোপ ছিল না, তাই ভুল মতবাদ দিয়েছে আর কি । পরে নিকোলাস কোপারনিকাস এসে তার থিওরিকে ভুল প্রমান করলো না । ’

-‘হ্যাঁ । কিন্তু কোপারনিকাসও একটা মস্ত বড় ভুল করে গেছে । ’

সাজিদ প্রশ্ন করলো, – ‘কি রকম ?’

-‘অদ্ভুত ! এটা তো তোর জানার কথা । যদিও কোপারনিকাস টলেমির থিউরির বিপরীত থিউরি দিয়ে প্রমান করে দেখিয়েছিলেন যে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে নয়, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে । কিন্তু, তিনি এক জায়গায় ভুল করেন । এবং সেই ভুলটাও বিজ্ঞান দর্পে টিকে ছিল গোটা ৫০ বছর । ’

-‘কোন ভুল ?’

-‘উনি বলেছিলেন, পৃথিবীই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, কিন্তু সূর্য ঘোরে না । সূর্য স্থির । কিন্তু আজকের বিজ্ঞান বলে, – নাহ, সূর্য স্থির নয় । সূর্যও অবিরাম ঘূর্ণনরত অবস্থায় । ’

সাজিদ বলল, -‘সেটা ঠিক বলেছিস । কিন্তু বিজ্ঞানের এটাই নিয়ম যে, এটা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হবে । এখানে শেষ বাঁ ফাইনাল বলে কিছুই নেই ।’

-‘একদম তাই । বিজ্ঞানে শেষ ফাইনাল বলে কিছুই নেই । একটা বৈজ্ঞানিক থিউরি ২ সেকেন্ডও টেকে না, আবার আরেকটা ২০০ বছরও টিকে যায় । তাই, প্রমান বাঁ দলিল দিয়ে যা বিশ্বাস করা হয় তাকে আমরা বিশ্বাস বলি না । এটাকে আমরা বড়জোর চুক্তি বলতে পারি । চুক্তিটা এরকম, -‘তোমায় ততক্ষন বিশ্বাস করবো, যতক্ষণ তোমার চেয়ে অথেনটিক কিছু আমাদের সামনে না আসছে ।’

সাজিদ আবার নড়েচড়ে বসলো । সে কিছুটা একমত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে ।

আমি বললাম, ‘ধর্ম বাঁ সৃষ্টিকর্তা ধারণা/অস্তিত্ব হচ্ছে ঠিক বিপরীত । দ্যাখ, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মধ্যকার এই গূড় পার্থক্য আছে বলেই আমাদের ধর্মগ্রন্থের শুরুতেই বিশ্বাসের কথা বলা আছে । বলা আছে, ‘এটা তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে’ (সূরা বাকারাহ, ০২)

যদি বিজ্ঞানে শেষ বাঁ ফাইনাল কিছু থাকতো, তাহলে হয়তো ধর্মগ্রন্থের শুরুতে বিশ্বাসের বদলে বিজ্ঞানের কথাই বলা হতো । হয়তো বলা হতো, ‘এটা তাদের জন্যই যারা বিজ্ঞানমনস্ক’

কিন্তু যে বিজ্ঞান সদা পরিবর্তনশীল, যে বিজ্ঞানের নিজের উপর নিজেরি বিশ্বাস নেই, তাকে কিভাবে অন্যরা বিশ্বাস করবে ?

সাজিদ বলল, ‘কিন্তু, যাকে দেখি না, জার পক্ষে কোন প্রমান নাই, তাকে কি করে আমরা বিশ্বাস করতে পারি ?’

-‘সৃষ্টিকর্তার পক্ষে অনেক প্রমান আছে , কিন্তু বিজ্ঞান সেটা পুরোপুরি দিতে পারে না । এটা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, সৃষ্টিকর্তার নয় । বিজ্ঞান অনেক কিছুরই উত্তর দিতে পারে না । লিস্ট করতে গেলে অনেক লম্বা একটা লিস্ট করা যাবে । ’

সাজিদ রাগি রাগি গলায় বলল, ‘ফাজলামি করিস আমার সাথে ?’

আমি হাসতে লাগলাম, ‘আচ্ছা শোন বলছি, তোর প্রেমিকার নাম মিতু না ?’

-‘ এইখানে প্রেমিকার ব্যাপার আসছে কেন ?’

-‘আরে বল না আগে ।’

-‘হ্যাঁ ’

-‘কিছু মনে করিস না । কথার কথা বলছি । ধর আমি মিতুকে ধর্ষণ করলাম । রক্তাক্ত অবস্থায় মিতু তার ব্যাডে পরে আছে । অ্যারো ধর, তুই ব্যাপারটা কোনভাবে জেনে গেছিস । ’

-‘হু’

-‘এখন বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা কর দেখি, মিতুকে ধর্ষণ করায় কেন আমার শাস্তি হওয়া দরকার ?’

সাজিদ বলল- ‘ক্রিটিক্যাল কোয়েশ্চান । এটাকে বিজ্ঞান দিয়ে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো ? ’

-‘হা – হা –হা । আগেই বলেছি, এমন অনেক ব্যাপার আছে, যার উত্তর বিজ্ঞানে নেই । ’

-‘কিন্তু এর সাথে স্রষ্টায় বিশ্বাসের সম্পর্ক কি? ’

-‘সম্পর্ক আছে । স্রষ্টায় বিশ্বাসটাও এমন এক বিষয়, যেটা আমরা, মানে মানুষেরা, আমাদের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য প্রমাণাদি দিয়ে প্রমান করতে পারবে না । স্রষ্টা কোন টেলিস্কোপে ধরা পরেন না । উনাকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও খুজে বের করা যায় না । উনাকে জাস্ট বিশ্বাস করে নিতে হয় । ’

সাজিদ এবার ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেলে বেঁকে বসলো । সে বলল,- ‘ধুর ! কি সব বাল ছাল বুঝালি । যাকে দেখিনা তাকে বিশ্বাস করে নেব ?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, পৃথিবীতে অবিশ্বাসী বলে কেউই নেই । সবাই বিশ্বাসী । সবাই এমন কিছু না কিছুতেই বিশ্বাস করে, যা তারা আদৌ দেখে নি বাঁ দেখার কোন সুযোগও নেই । কিন্তু এটা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলে না । তারা নির্বিঘ্নে তাতে বিশ্বাস করে যায় । তুইও সেরকম ।’

সাজিদ বলল, ‘আমি ? পাগল হয়েছিস ? আমি না দেখে কোন কিছুতেই বিশ্বাস করি না, করবোও না ।’

-‘তুই করিস । এবং, এটা নিয়ে তোর মধ্যে কোন দিন কোন প্রশ্ন জাগেনি । এবং, আজকে এই আলোচনা না করলে হয়তো জাগতও না ।’

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল । বললাম ,‘জানতে চাস ? ’

-‘হু’

-‘আবার বলছি, কিছু মনে করিস না । যুক্তির খাতিরে বলছি ।’

-‘বল’

-‘আচ্ছা, তোর বাবা মার মিলনেই তো তোর জম্ম হয়েছে, সেটা তুই দেখেছিলি ? বাঁ এই মুহূর্তে কোন এভিডেন্স তোর কাছে ? হতে পারে তোর মা বাবা ছাড়া অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছে তোর জম্মের আগে । হতে পারে, তুই ওই ব্যক্তিরই জৈব ক্রিয়ার ফল । তুই এটা দেখিস নি । কিন্তু কোনদিনও কি তোর মাকে এটা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলি ? করিস নি । সেই ছেলেবেলা থেকে যাকে বাবা হিসেবে দেখে আসছিস, তাকেই বাবা ডাকছিস । যাকে ভাই হিসেবে জেনে আসছিস, তাকে ভাই । বোনকে বোন । তুই না দেখেই এসবে বিশ্বাস করিস না ? কোনদিন জানতে চেয়েছিস তুই এখন যাকে বাবা ডাকছিস, তুই আসলেই তার ঔরসজাত কিনা ? জানতে চাস নি । বিশ্বাস কয়রে গেছিস । এখনো করছিস । ভবিষ্যতেও করবি । স্রষ্টার অস্তিত্তেও বিশ্বাসটাও ঠিক এমনই রে । এটাকে প্রশ্ন করা যায় না । সন্দেহ করা যায় না । এটাকে হৃদয়ের গভীরে ধারন করতে হয় । এতার নামই বিশ্বাস । ’

সাজিদ উঠে বাইরে চলে গেল । ভাবলাম, সে আমার কথায় কষ্ট পেয়েছে হয়তো । পরের দিন ফজরের নামাজের জন্য আমি যখন অজু করতে যাবো, দেখলাম, আমার পাশে সাজিদ এসে দাঁড়িয়েছে । আমি তার মুখের দিকে তাকালাম । সে আমার চাহনির প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছে । সে বলল, ‘নামাজ পড়তে উঠেছি ।’

প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ – সম্প্রতি সময়ে সবচাইতে বেশী আলোচিত বইয়ের একটি। বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

রিলেটিভিটির গল্প

A letter to David –Jessus wasn’t myth & he exited

একটি ডিএনএ’র জবানবন্দী

চ্যালেঞ্জ রইল

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন