Quran Translation to Bangla

চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

মাইকেল সারভেটাস (Michael Servetus) ১৫১১-১৫৫৩ খৃস্টাব্দ

১৫১১ সালে স্পেনের ভিলাবুয়েভায় মাইকেল সারভেটাস জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন স্থানীয় একজন বিচারক। তিনি এমন এক সময়ে বাস করতেন যখন প্রতিষ্ঠিত গির্জায় অসন্তোষ বিরাজ করছিল এবং প্রত্যেকেই খৃষ্টান ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করছিল। ১৫১৭ সালে সারভেটাস যখন ৬ বছরের বালক, তখন মার্টিন লুথার রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এর ফল হলো এই যে, তিনি বহিষ্কৃত হলেন এবং নয়া সংস্কারকৃত প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের একজন নেতায় পরিণত হলেন। এ আন্দোলন, যা আজ সংস্কার সাধন (Reformation) নামে পরিচিতি, তা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। যারা মার্টিন লুথারের (Martin Luther) সাথে একমত ছিল না তারাও এ আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য হয়। এ সংঘাতের পাশাপাশি স্পেনে আরেকটি ঘটনা ঘটে। অতীতে স্পেনের মুসলিম ও খৃষ্টানদের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক থাকলেও প্রাচ্যে ক্রুসেডের কারণে খৃষ্টানদের ক্রোধের শিকারে পরিণত হয় স্পেনের মুসলিমরা। স্পেনীয় ধর্মবিচার সভা (Spanish Inquisition) নির্দেশ জারি করে যে যারা খৃষ্টান নয় তাদের রোমান ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হতে হবে। চার্চের রীতি-নীতি অনুসরণে শিথিলতার পরিণতি দাঁড়াল হয় মৃত্যু না হয় কঠোর শাস্তি।

আরো বড় হয়ে এবং অধিক জানার পর তরুণ সারভেটাস এত রক্তপাতে আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। দেশে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ও ইয়াহূদী ছিল। প্রকাশ্যে রোমন ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ এবং ত্রিত্ববাদের ফরমুলার প্রতি আনুগত্য প্রকাশই ছিল তরবারির আঘাত থেকে তাদের জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়। আরো গভীরভাবে বাইবেল অধ্যয়ন ও পরীক্ষার পর সবিস্ময়ে তিনি দেখতে পেলেন যে, বাইবেলের শিক্ষার অংশ হিসেবে কোথাও ত্রিত্ববাদ নেই। তিনি আরো আবিষ্কার করলেন যে, চার্চ যা শিক্ষা দিচ্ছে বাইবেল সব ক্ষেত্রে তা সমর্থন করে না। তার বয়স যখন ২০ বছর তখন সারভেটাস সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি যা খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বকে সে সত্য জানাবেন। তিনি পরে আরো আবিষ্কার করেন যে, খৃষ্টানরা যদি মেনে নেয় যে, ঈশ্বর মাত্র একজনই, তাহলে খৃষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে বিরোধের অবসান হবে এবং উভয় সম্প্রদায় একত্রে শান্তিতে বাস করতে পারবে। এই সংবেদনশীল অনভিজ্ঞ তরুণ তার অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে উপলব্ধি করলেন যে, খৃষ্টান-মুসলিম সংঘাতের অবসানের লক্ষ্য সহজেই অর্জিত হওয়া সম্ভব যদি সংস্কারে নেতাদের সাহায্য পাওয়া যায়। কারণ তারা ইতিমধ্যেই ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তার বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নয়া প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চগুলো একত্ববাদী হবে এবং তাদের সাহায্যে খৃষ্টান, ইয়াহূদী ও মুসলিমরা একত্রে শান্তিতে বাস করতে সক্ষম হবে। মানব পরিবারের “পিতা” এক ঈশ্বরের ভিত্তিতে একটি সহনশীল বিশ্ব একটি সম্ভাব্য বিষয় হয়ে উঠবে।

সংস্কার নেতাদের মন ও মানস তখনও যে সেই একই মিথ্যা অধিবিদ্যার ফাঁদে আটকা পড়ে আছে, তা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সারভেটাস খুব বেশি তরুন ছিলেন। তিনি দেখলেন যে, ঈশ্বরের একত্বে তার বিশ্বাসের ব্যাপারে লুথার ও ক্যালভিনের কোনোই সম্পর্ক নেই। সংস্কার আন্দোলন সুদূর প্রসারী হওয়ার ব্যাপারে তারা শঙ্কিত ছিলেন। ক্যাথলিক চার্চের বেশ কিছু অনুষ্ঠান বিলুপ্ত করা হয়, কিন্তু তারা যীশুর আসল শিক্ষার পুনরাবিষ্কারে ভীত ছিলেন। কারণ তা করলে তাদের জন্য আরো সমস্যা দেখা দিতে পারত এবং তাদের নিজস্ব ক্ষমতা ও খ্যাতি বিলুপ্ত হতে পারত। সম্ভবত তারা উপলব্ধি করতে পারেন নি যে, রোমান-ক্যাথলিকদের আচার-আচরণ যিশুখ্রিস্টের জীবনাচারণ থেকে কত দূরে সরে গিয়েছিল। তারা সংস্কারকৃত ধর্মকে সনাতন ক্যাথলিক ধর্মের কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তাদের বিবাদ ছিল রোমের ধর্মতত্ত্বের সাথে নয়, তার সংস্থাগুলোর সাথে এবং নির্দিষ্টভাবে কে চার্চকে শাসন করবে, সে ব্যাপারে। সারভেটাসের বিশ্বাস এ দু’টি সংস্থার প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছিল। আর সে কারণেই সংস্কারবাদীদের প্রতি তার আবেদন তাদের নিজস্ব অভিন্ন স্বার্থরক্ষার স্বার্থে ক্যাথলিক চার্চের সাথে তাদের যোগদানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর কিছুই তরুণ সারভেটাসের পূর্ণ গোচরে আসে নি।

সংস্কার নেতাদের ব্যাপারে তিনি খুবই আশাবাদী ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল যে, রোমান ক্যাথলিকবাদ যিশুখ্রিষ্টের ধর্ম নয়। তার অধ্যয়ন ত্রিত্ববাদে তার বিশ্বাস চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। এর ফল হয়েছিল এই যে, তিনি ঈশ্বর এক এবং যীশু তার একজন নবী, এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। পোপ কর্তৃক স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লসের অভিষেক উৎসবে যোগদান করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। ১৫২৭ খৃস্টাব্দে চার্লস রোম আক্রমণ ও অধিকার করেন। প্রথমে তিনি পোপকে বন্দী করেন। কিন্তু তারপরই তিনি পোপকে একজন মিত্র করে তোলার দ্রুত প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি যেমনটি চেয়েছিলেন, বন্দী অবস্থায় পোপের পক্ষে জনগণকে নিজের অনুকূলে প্রভাবিত করা সম্ভব ছিল না। সে কারণে তিনি পোপকে কিছুটা স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেন। তিনি পোপের দ্বারা অভিষিক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সত্য বলতে কি, এর প্রয়োজন ছিল না। এটা ছিল সামাজিক বিবাহ অনুষ্ঠানের পর আবার গির্জায় গিয়ে বিবাহ করার মত। রাজার পূর্বসূরিরা এ প্রথা কেউ পালন করেছেন, কেউ করেন নি। কিন্তু পঞ্চাশ চার্লসের মনে হলো যে, তিনি এখন যথেষ্ট সক্তিশালী এবং পোপ যথেষ্ট দুর্বল। সুতরাং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। কিন্তু তা রোমে অনুষ্ঠিত হলো না। সাধারণের বিশ্বাস ছিল পোপ যেখানে রোমও সেখানে। রাজা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন বোলোনা (Bologna)-তে। সারভেটাস সেই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করলেন। ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে তার মন ঘৃণায় ও বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে। এ ঘটনা বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন: “নিজের চোখে আমি দেখলাম রাজপুত্রদের কাঁধে পোপের জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা। ক্রুশ চিহ্নের মতো তার হাত দু’টি আড়াআড়ি স্থাপিত। উন্মুক্ত রাস্তায় রাস্তায় ভক্তবৃন্দ এমনভাবে নতজানু হয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছিল যে, যারা তার পায়ের জুতা চুম্বন করতে

সক্ষম হচ্ছে তারা অবশিষ্টদের চেয়ে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছে এবং ঘোষণা করছে যে, তাদের বহু মনস্কামই পূর্ণ রয়েছে এবং এবার বহু বছরের জন্য তাদের নারকীয় যন্ত্রণার উপশম ঘটবে। হায়, ইতরতম প্রাণী, বারাঙ্গণার চেয়েও নির্লজ্জ!”

এমতাবস্থায় সংস্কারের নেতারা সারভেটাসের আশাস্থল হয়ে উঠেন। সারভেটাস নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি যদি ত্রিত্ববাদের ভ্রান্তি সম্পর্কে তাদের বুঝাতে পারেন তাহলে তারা ঐ মতবাদে বিশ্বাস হারাবেন এবং তা ত্যাগ করবেন। এ ভুল ধারণার মাশুল তাকে দিতে হয় জীবন দিয়ে। তিনি স্পেন ত্যাগ করেন এবং তুলুজে (Toulouse) বসবাস করতে শুরু করেন। এখানেই তিনি চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং ১৫৩৪ খৃস্টাব্দে ডাক্তারী ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি একজন কর্মজীবী চিকিৎসকে পরিণত হন। কিন্তু এ সম্পূর্ণ সময় প্রকৃত খৃষ্টান ধর্ম প্রতিষ্ঠার দিকেই তার আগ্রহ নিবদ্ধ ছিল। কোনো স্থানে দীর্ঘদিন থাকা তার স্বাভাব্যে ছিল না। তিনি দূর- দূরান্ত ঘুরে সেসব মুক্তমনা লোকদের খুঁজে ফিরতেন যারা যীশু প্রচারিত প্রকৃত খৃষ্ট ধর্মের কথা শুনবে।

তিনি সংস্কারবাদীদের বিখ্যাত নেতা ওয়েকলোমপাডিয়াসের (Oeclompadius) সাথে সাক্ষাতের জন্য বাসল (Basle) গমন করেন। তার সাথে সারভেটাসের বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়। তাদের আলোচনা প্রধানত খৃষ্ট ধর্মের দু’টি রূপের ব্যাপারেই কেন্দ্রীভূত ছিল। বিশ্ব সৃষ্টির আগেই যিশুখ্রিস্টের অস্তিত্ব ছিল, সারভেটাস এ বিশ্বাস বা ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, ইয়াহূদী নবীরা সর্বদাই “ঈশ্বরের পুত্র” সম্পর্কে কথা বলার সময় ভবিষ্যৎকাল ব্যবহার করেছেন। যা হোক, তিনি দেখতে পেলেন যে, তার মত সুইজারল্যান্ডের প্রোটেস্টান্টদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ১৫৩০ খৃস্টাব্দে বাসল ত্যাগ করেন। এটা ছিল তার জন্য এক বিরাট আঘাত। করণ তার আশা ছিল ফ্রান্সের ক্যাথলিকরা তার কথা না শুনলেও প্রোটেস্টান্টরা যীশু ও তার শিক্ষা সম্পর্কে তার বক্তব্য সহানুভূতির সাথে শুনবে। তিনি ষ্ট্রাসবুর্গ (Strassbourg) গমন করলেন। দেখলেন, সেখানে জীবিকা অর্জনের কোনো পথ নেই। জার্মান ভাষা না জানার কারণে তিনি তার চিকিৎসাবিদ্যা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে তাঁকে লিয়ঁ (Lyons) চলে যেতে হয়। সারভেটাস স্পেন থেকে ফেরার পর সম্পূর্ণ সময়কাল ধরে ক্যালভিনের (Calvin) সাথে দীর্ঘ যোগাযোগ বজায় রাখেন। কিন্তু তার কাছ থেকে তিনি অনুকূল সাড়া পাননি। ক্যালভিন নিজে যীশু খৃষ্টের শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে মেনে চলার চেষ্টা করতে আগ্রহী ছিলেন না, বরং তিনি সংস্কার আন্দোলনের নেতা হিসেবে থাকতে আগ্রহী ছিলেন।

ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে জনসাধারণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা যখন ব্যর্থ হলো, তখন সারভেটাস “দি এররস অব ট্রিনিটি” (The Errors of Trinity) গ্রন্থ রচনা ও মুদ্রণ করে তার মত প্রকাশ করলেন। ১৫৩১ খৃস্টাব্দে এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এ বছরই “টু ডায়ালগস অন ট্রিনিটি” (Two Dialogues on Trinity) নামে তিনি আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এ দু’টি গ্রন্থ সারা ইউরোপে ঝড় তোলে। স্মরণকালের মধ্যে এরকম গ্রন্থ রচনার দুঃসাহস আর কেউ করে নি। ফল হলো এই যে, চার্চ হন্য হয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সারভেটাসকে খুঁজে বেড়াতে শুরু করল। সারভেটাস বাধ্য হয়ে তার নিজের নাম পরিবর্তন করলেন, তবে মত-কে নয়। ১৫৩২ খৃস্টাব্দ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছদ্মনামে বেঁচে ছিলেন। তখনও ক্যালভিনের প্রতি সারভেটাসের একটি শিশুসূলভ বিশ্বাস বজায় ছিল। অথচ ক্যালভিন সারভেটাসের গ্রন্থ পাঠের পর তার প্রতি গভীরভাবে বিতৃষ্ণা হয়ে উঠেন। তার কাছে সারভেটাস ছিলেন এক কল্পনাপ্রবণ তরুণ যুবক যে কিনা তার মতো লোককেও ধর্মতত্ত্ব শেখানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিল।

কিন্তু সারভেটাস তার কাছে চিঠিপত্র লেখা অব্যাহত রাখেন। সারভেটাস তার মত মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন এটা দেখার পর এ নেতার ক্রোধ আরো বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে প্রোটেস্টাণ্ট আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিল যে, এই তরুণ যুবকের মতের কথা যদি জনসাধারণের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায় তাহলে তাদের ধর্মীয় আন্দোলন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। তাদের আরো ভয় ছিল যে, ক্যাথলিক খৃষ্টান ধর্ম থেকে প্রটেস্টান্ট ধর্ম যদি খুব বেশি দূরে সরে যায় তাহলে চার্চের নির্যাতন আরো বৃদ্ধি পাবে। এভাবে সারভেটাস, প্রটেস্টান্টদের তার মতে দীক্ষিত করার বদলে অধিকতার উৎসাহের সাথেই তাদের ত্রিত্ববাদী ধর্মকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করলেন। সে জন্য মার্টিন লুথার ১৫৩৯ খৃস্টাব্দে প্রকাশ্যে তার নিন্দা করেন।

এ সময়টাতে সারভেটাস চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিস অব্যাহত রাখেন এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় চিকিৎসকে পরিণত হন। একজন পেশাদার চিকিৎসকের বিকাশ খুব কম, এ বাস্তবতা সত্ত্বেও সারভেটাস একটি বাইবেলের মুদ্রণ তদারকির জন্য সময় বের করে নিতেন। বাইবেলটি ১৫৪০ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। সরভেটাস এতে একটি ভূমিকা লেখেন। তাতে তিনি প্রশ্ন করেন যে, বাইবেলের একের অধিক অর্থ থাকতে পারে কি না। ক্যালভিন এর হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। কিন্তু সারভেটাস তার সাথে একমত হতে পারেন নি। আজ ক্যালভিনপন্থী চার্চ সে ব্যাখ্যার নীতি গ্রহণ করেছে যাকে ক্যালভিন ক্যাথলিক ধর্মের বিরুদ্ধে সারভেটাসের সবচেয়ে বড় অপরাধ বলে অভিযুক্ত করেছিলেন। সারভেটাস বলেছিলেন যে, তিনি খৃষ্টবাদের অ্যানটিওচেন (Antiochene) ধারাভুক্ত প্রথমদিকের নবীদের মতেরই অনুসরণ করছেন।

এখানে একটি বিষয় উল্লে­খযোগ্য যে, তিক্ত বিরোধিতা যখন তুঙ্গে তখন সারভেটাস তার পুরোনো বন্ধু পিটার পালমিয়ের (Peter Palmier)-এর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন ও শান্তি পেয়েছিলেন। পালমিয়ের তখন ছিলেন ভিয়েনার রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ। সারভেটাস সেখানে ১৩ বছর বাস করেন। এ সময় তিনি চিকিৎসার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছিলেন এবং অত্যন্ত খ্যাতিমান একজন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। ইউরোপে যারা প্রথম রক্ত সঞ্চালনের নীতি সম্পর্কে লেখেন, তিনি ছিলেন তাদেরই একজন। তিনি ভূগোল বিষয়েও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এসব সাহিত্যিক সাফল্য সত্ত্বেও তার মনোযোগের কেন্দ্র ছিল খৃষ্টান ধর্মের সমস্যা। তিনি ক্যালভিনের কাছে চিঠি লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন। এ আশায় যে, তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের মতে আনতে পারবেন। কিন্তু ক্যালভিন সারভেটাসের চিঠিতে ব্যক্ত বিশ্বাস বা ধারণা দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। সারভেটাসও ক্যালভিনের নীতিবাক্য মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। সে সময়কার প্রটেস্টান্ট খৃষ্টানদের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হিসেবে স্বীকৃত ক্যালভিন মনে করতেন যে, ধর্মীয় ব্যাপারে তার নির্দেশনাকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহসের জন্য সারভেটাসের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ যথাযথ ছিল। সারভেটাস ক্যালভিনকে অবিতর্কিত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ক্যালভিন সক্রোধে তার পত্রের জবাব দেন এবং সারভেটাস তীব্র ব্যঙ্গপূর্ণ ভাষায় তার প্রত্যুত্তর প্রেরণ করেন। এরপর সারভেটাস “দি রেস্টারেশন অব ক্রিশ্চিয়ানিটি” (The Restoration of Christianity) নামক আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং সে পাণ্ডুলিপির একটি অগ্রিম কপি ক্যালভিনের কাছে পাঠান। বইটি যখন প্রকাশিত হলো, দেখা গেল তাতে রয়েছে মোট ৭টি অধ্যায়। এর মধ্যে প্রথম ও শেষ অধ্যায়টি সম্পূর্ণরূপে খৃষ্টধর্ম নিয়ে লেখা। পঞ্চম অধ্যায়ে ছিল ৩০টি চিঠি যেগুলো সারভেটাস ও ক্যালভিনের মধ্যে বিনিময় হয়েছিল। এ থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, ক্যালভিন যত প্রতিভাধরই হন না কেন, তার মধ্যে খৃষ্ট ধর্মের নম্রতার অভাব রয়েছে। এ গ্রন্থের জন্য সারভেটাস পুনরায় ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট খৃষ্টান উভয়েরই নিন্দার সম্মুখীন হন। উভয় পক্ষ গ্রন্থটি ধ্বংসের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তা এমনভাবে করা হয় যে, আজ তার দু’টি মাত্র কপি ছাড়া আর কোনো কপির কথা জানা যায় না। এ গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ হয় ১৭৯১ খৃস্টাব্দে। কিন্তু এ মুদ্রণের সকল কপিও ধ্বংস করা হয়।

১৫৪৬ খৃস্টাব্দে সারভেটাসকে লেখা এক চিঠিতে ক্যালভিন তাকে হুমকি দেন যে, সারভেটাস যদি কখনো জেনেভায় আসেন তাহলে তাকে জীবন নিয়ে ফিরতে দেওয়া হবে না। সারভেটাস তাকে বিশ্বাস করতেন বলেন মনে হয় না। পরে সারভেটাস জেনেভা এসে এ বিশ্বাস নিয়ে ক্যালভিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান যে, তাদের মধ্যে হয়তো মতের মিল তখনও সম্ভব। কিন্তু ক্যালভিন রোমান ক্যাথলিকদের দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করান এবং ধর্মদ্রোহিতার দায়ে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।

সারভেটাস চিকিৎসক হিসেবে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন যে, তার কিছু প্রাক্তন রোগীর সাহায্যে তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তিনি নেপলস (Naples) যাবার সিদ্ধান্ত নেন। জেনেভার মধ্য দিয়ে নেপলস যেতে হত। তিনি ছদ্মবেশ নিলেন। মনে করলেন, এ ছদ্মবেশ অন্যের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেটা ছিল ভুল। শহরের মধ্য দিয়ে যাবার সময় তিনি ধরা পড়লেন এবং আরেকবার কারারুদ্ধ হলেন। এবার তিনি পালাতে পারেন নি। বিচার তাঁকে ধর্মদ্রোহী বলে সাব্যস্ত করা হয়। তার বিচারের রায়ের কিছু অংশ নিম্নরূপ:

সারভেটাস স্বীকার করেন যে, তার বইতে তিনি ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসীদের ত্রিত্ববাদী ও নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ত্রিত্ববাদকে তিন মাথাওয়ালা এক শয়তান সদৃশ দৈত্য বলে আখ্যায়িত করেছেন… তিনি শিশুদের খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করাকে শয়তান ও জাদুকরদের আবিষ্কার বলে আখ্যায়িত করেছেন…. তার মতে, এটা বহু আত্মাকে হত্যা ও ধ্বংস করে। সর্বোপরি তিনি একজন মন্ত্রীর কাছে লেখা পত্রে অন্য বহু প্রকার ধর্ম অবমাননার সাথে আমাদের ঐশ্বরিক ধর্মকে বিশ্বাসহীন এবং ঈশ্বরহীন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ঈশ্বরের স্থানে আমরা তিন মাথাওয়ালা নরকের কুকুরকে স্থাপন করেছি। সারভেটাসকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলে যে, পবিত্র ত্রিত্ববাদের মহামহিম ঈশ্বরের বিরোধিতা করায় তুমি লজ্জা বা ভীতিবোধ কর না এবং হেতে তুমি একগুঁয়েভাবে বিশ্বে তোমার দূর্গন্ধযুক্ত ধর্মদ্রোহিতার বিষ চাড়ানোর চেষ্টা করছ সেহেতু এসব এবং অন্যান্য কারণে ঈশ্বরের চার্চকে এ ধরনের সংক্রমণ থেকে পবিত্র রাখতে এবং নষ্ট সদস্য থেকে মুক্ত করতে… আমরা তোমাকে মাইকেল সারভেটাসকে বন্ধন করে এবং গির্জায় নিতে এবং সেখানে খুঁটির সাথে বেঁধে এবং তোমার বইয়ের সাথে তোমাকে পুড়িয়ে মারার চরম শাস্তি প্রদান করছি এবং তোমার মতো আর কেউ করতে চাইলে তার জন্যও উদাহরণ হয়ে থাকবে।

১৫৫৩ খৃস্টাব্দে ২৬ অক্টোবর সারভেটাসকে মাটিতে প্রোথিত একটি গাছের সাথে বাঁধা হয়। তার পা শুধুমাত্র মাটি স্পর্শ করছিল। গন্ধক মাখানো খড় ও পাতার তৈরি একটি মুকুট তার মাথায় পরিয়ে দেওয়া হলো। পাতাসহ কাঁচা ওক ও অন্যান্য জ্বালানি কাঠ এনে তার পায়ের চারপাশে জড়ো করা হলো। এরপর খুঁটির সাথে তার শরীর লোহার শিকল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হলো। দড়ি দিয়ে গলা ও ঘাড় পেঁচিয়ে বাঁধা হলো, এরপর কাঠে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। আগুন তাঁকে যন্ত্রণা দিল, কিন্তু মারাত্মকভাবে পোড়াতে পারল না। এ দৃশ্য দেখে কিছু দর্শক তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠল এবং তার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে আরো জ্বালানি যোগ করল। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মতে সারভেটাস মৃত্যুর পূর্বে দু’ঘণ্টা ধরে যন্ত্রণায় মোচড় খাচ্ছিলেন। “দি এররস অব ট্রিনিটি”র (The Errors of Trinity) একটি কপি কাঠে আগুন জ্বালানোর আগে তার কোমরে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে যে, কেউ একজন বইটি উদ্ধার করেছিল। সেই আধ- পোড়া বইটি এখনও আছে। সেলসাস (Celsus) বলেছেন যে, জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে সারভেটাসের অবিচলতা বহু লোককে তার বিশ্বাসের অনুসারী হতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। ক্যালভিন তার অভিযোগের মধ্য দিয়ে সে কথাই স্বীকার করে বলেছেন যে, বহু লোক রয়েছে যারা তাঁকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করে। সারভেটাসের এক অনুসারী কাসটিলো (Castillos) বলেন, “কোনো মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে কোনো মতকে প্রমাণ করা যায় না।” পরবর্তী বছরগুলোতে জেনেভার মানুষেরা সারভেটাসের একটি মূর্তি তৈরি ও স্থাপন করে তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। কিন্তু ক্যালভিনের মৃত্যুর পর তারা তার কোনো মূর্তি তৈরি বা স্থাপন করে নি। কারণ, তিনিই সারভেটাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার জন্য দায়ী ছিলেন।

       কবি কাউপার (Cowper) এ ঘটনা স্মরণে লিখেছিলেন:

       তারা ছিলেন অপরিচিত

       নির্যাতন তাদের টেনে আনল খ্যাতির শিখরে

       এবং স্বর্গ পর্যন্ত তাদের ধাওয়া করল।

       তাদের ছাই উড়ে গেল হাওয়ায়

       কেউ জানে না- কোথায় গন্তব্যে!

       তাদের নামে কোনো চারণ কবি

       রচনা করে না অমর ও পবিত্র সংগীত।

       আর ইতিহাস কত ক্ষুদ্র বিষয়েও মুখর

       অথচ এ ব্যাপারে আশ্চর্য নীরব।

সারভেটাসের মৃত্যু কোনোক্রমেই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। সে সময় সমগ্র ইউরোপেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছিল। মোটলির (Motley) “রাইজ অব দি ডাচ রিপাবলিক” (Rise of the Dutch Republic) গ্রন্থের নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিতে তারই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

১৫৬৮ খৃস্টাব্দে ১৫ ফেব্রুয়ারি যাজক সভা নেদারল্যান্ডের সকল অধিবাসীকে ধর্মদ্রোহী বলে দোষী সাব্যস্ত করে। এ ভীষণ প্রলয়কান্ড থেকে মুষ্টিমেয় বিশেষ কিছু ব্যক্তিমাত্র প্রাণে রক্ষা পান। ১০ দিন পরের তারিখে স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের এক ঘোষণায় যাজক সভার দণ্ডাদেশ নিশ্চিত করা হয় এবং তাৎক্ষণিক মৃত্যুদন্ডের মাধ্যমে তা কার্যকর করার ফরমান জারি করা হয়… বধ্যভূমিতে ৩টি সারিতে দাঁড় করিয়ে ৩০ লাখ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। নয়া ফরমানে মৃত্যুদণ্ড শিথিল করা হয় নি। প্রতিদিন এবং প্রতি ঘন্টায় উচ্চপদস্থ ও মহৎ ব্যক্তিদের ধরে এনে শূলে চড়ানো হচ্ছিল। আলভা দ্বিতীয় ফিলিপের কাছে লেখা একটি পত্রে পবিত্র সপ্তাহ বা হলি উইকের পর পরপরই যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তাদের সংখ্যা ৮০০ বলে অনুমান করেন।

যে গ্রন্থ সারভেটাসের বিরুদ্ধে সহিংসতার কারণ হয়ে উঠেছিল, সেই “দি এররস অব ট্রিনিটি”র কিছু অংশ নিম্নরূপ:

দার্শনিকগণ তৃতীয় একটি পৃথক সত্ত্বার আবিষ্কার করেছেন। এটি প্রকৃতই অন্য দু’টি থেকে আলাদা। একে তারা বলেন তৃতীয় ঈশ্বর বা পবিত্র আত্মা, এভাবে তারা এক কল্পিত ত্রিত্ববাদের কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, একের মধ্যে তিনের অস্তিত্ব। কিন্তু বাস্তবে তিন ঈশ্বর অথবা এক ত্রিসত্ত্বময় ঈশ্বরকে মিথ্যা বর্ণনার মাধ্যমে এবং একত্ববাদের নামে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।… তাদের জন্য এসব কথাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা, ৩টি অস্তিত্ব বর্তমান বলে মেনে নেওয়া খুবই সহজ। কিন্তু অন্য যারা এটা বিশ্বাস করে না, তাদের সাথে এক্ষেত্রে সেই বিশ্বাস না করা ব্যক্তিদের পার্থক্য ও দূরত্ব রয়েছে এবং তারা এগুলো একই পাত্রে মুখ আটকে রেখেছে। যেহেতু আমি ‘ব্যক্তিগণ’ শব্দটির অপব্যবহার করতে অনিচ্ছুক সে কারণে আমি তাদের প্রথম সত্ত্বা, দ্বিতীয় সত্ত্বা ও তৃতীয় সত্ত্বা নামে আখ্যায়িত করব, কারণ বাইবেলে আমি তাদের জন্য অন্য নাম খুঁজে পাই নি… তারা তাদের রীতি অনুযায়ী এদের ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে, তারা মুক্তকণ্ঠে এ সব অস্তিত্বের বহুত্বকে, সত্ত্বার বহুত্বকে, মূলের বহুত্বকে, মর্মের বহুত্বকে স্বীকার করে। ঈশ্বর শব্দটিকে কঠোরভাবে গ্রহণ করার অর্থ তাদের ঈশ্বরের সংখ্যা একাধিক।

সারভেটাস আরো লিখেছেন:

যদি তাই হয় তাহলে ৩জন ঈশ্বর রয়েছে একথা যারা বলে সেই ট্রিওটোরাইটসদের (Triotorites) কেন দায়ী করা হবে? তাদের এত ঈশ্বরের মর্মার্থও তো একই এবং যদিও কিছু ব্যক্তি ৩ জন ঈশ্বরকে এক করা হয়েছে কথাটি বোঝাতে চাইবেন না, যদিও তারা এ শব্দটি ব্যবহার করেন যে, তারা একত্রে গঠিত এবং একথা যে- এ ৩টি সত্ত্বা থেকেই ঈশ্বর গঠিত। এরপর এটা সুস্পষ্ট যে, তারা ট্রিওটোরাইটস এবং আমাদের তিনজন ঈশ্বর গঠিত। এরপর এটা সুস্পষ্ট যে, তারা টিওটোরাইটস এবং আমাদের তিনজন ঈশ্বর রয়েছেন। আমরা নাস্তিক হয়ে পড়েছি অর্থাৎ আমাদের কোনো ঈশ্বর নেই। যেই মাত্র আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে ভাবার চেষ্টা করি, আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায় তিনটি অলীক মূর্তি যাতে আমাদের ধারণায় কোনো ধরনের একত্ববাদ অবশিষ্ট না থাকে। ঈশ্বর ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তায় অক্ষম হলে, যখন আমাদের উপলব্ধিতে ত্রি-সত্ত্বার সার্বক্ষণিক সংশয় বিরক্ত করতে থাকবে, আমরা চিরকালের জন্য একটি ঘোরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হব এবং মনে করব যে, আমরা ঈশ্বরের চিন্তাই করছি। তারা যখন স্বর্গ লাভের জন্য এ ধরনের স্বপ্ন দেখে, মনে হয় তারা আরেক জগতে বাস করছে। স্বর্গের রাজ্য এসব নির্বোধ কথাবার্তার ব্যাপারে কিছুই জ্ঞাত নন এবং ধর্মগ্রন্থ যে পবিত্র আত্মার কথা বলে তার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা তাদের অজানা।

তিনি আরো বলেন,

ত্রিত্ববাদের এই বিষয়টি মুসলিমদের কাছে যে কতটা হাস্যকর তা শুধু ঈশ্বরই জানেন। ইয়াহূদীরাও আমাদের এই কল্পিত ধারণার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নি, তারা এই বোকামির জন্য আমাদের উপহাস করে। তারা বিশ্বাস করে না যে, তারা যে যীশুখ্রিষ্টের কথা শুনেছে ইনিই তিনি। শুধু মুসলিম বা ইয়াহূদীরাই নয়, এমনকি মাঠের পশুরাও আমাদের নিয়ে উপহাস করত, যদি তারা আমাদের এই উদ্ভট ধারণা বুঝতে পারত, কেননা ঈশ্বরের সকল সৃষ্টিই এক ঈশ্বরের অনুগ্রহ প্রার্থনা করে।… তাই এই জ্বলন্ত মহামারি যেন যোগ করা হয়েছে এবং অতি কৌশলে সম্প্রতি আসা নয়া ঈশ্বরের বিষয় আরোপ করা হয়েছে যে ধর্ম আমাদের পূর্বপুরুষরা পালন করেন নি। আমাদের ওপর দর্শনের এ মহামারী এনেছে গ্রীকরা, আর আমরা তাদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে দার্শনিক হয়ে পড়েছি। তারা ধর্মগ্রন্থের বানীর মর্মার্থ কখনোই বুঝতে পারে নি যা তারা এ প্রসঙ্গে উপস্থাপন করেছে। সারভেটাস যীশুর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য বলে যা বিশ্বাস করতেন তার ওপর জোর দিয়েছেন:

যীশুখৃষ্টকে আমি নবী বলে আখ্যায়িত করায় কিছু লোক তা নিয়ে কুৎসা রটনা করছে, কারণ তার যেসব গুণাবলি সেগুলো তারা বলে না, তাদের বিশ্বাস যে যারা এ কাজ করে তাদের সবাই ইয়াহূদী ও মুসলিম। ধর্মীয় গ্রন্থ ও প্রাচীন লেখকগণ তাকে নবী বললেও তাদের কিছু আসে যায় না।

মাইকেল সারভেটাস ছিলেন তার সময়কার প্রতিষ্ঠিত চার্চের সবচেয়ে স্পষ্টভাষী সমালোচক। এটাই প্রটেনটান্টদের সাহায্য নিয়ে ক্যাথলিকগণ কর্তৃক তাকে আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নবজাগরণ (Renaissance) ও সংস্কারের (Reformation) যা কিছু ভালো,তার মধ্যে তারই সমন্বয় ঘটেছিল এবং যে আদর্শ একজন মানুষকে গভীর বৈশিক জ্ঞানসহ ‘বিশ্বজনীন মানুষ’ করে তোলে, তিনি জীবনের সে পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্র, ভূগোল ও বাইবেলে আর পাণ্ডিত্য ছিল এবং ধর্মশাস্ত্রে তিনি ছিলেন দক্ষ। বহুমুখী শিক্ষা তাকে দিয়েছিল দৃষ্টির প্রসারতা। কিন্তু তার চেয়ে অল্পশিক্ষিত ব্যক্তিরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ক্যালভিনের সাথে বিরোধ ছিল সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিশ্চিতভাবেই এটা ছিল ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, কিন্তু কার্যত তার চেয়েও বেশি কিছু এটা ছিল কঠোর বদলে দেয়ার জন্য সূচিত সংস্কারের প্রত্যাখ্যান, অধঃপতিত চার্চের বিষয় নয়। এর মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে নিজের জীবন দিয়ে। সারভেটাস যদিও পরলোকগত, কিন্তু একত্ববাদী ধর্মে তার বিশ্বাসের মৃত্যু হয় নি। এখনও তিনি আধুনিক একত্ববাদের প্রতিষ্ঠাতা (The Fonder of modern unitarianism) হিসেবেই মর্যাদা মণ্ডিত।

সারভেটাসের বিশ্বাসে যারা বিশ্বাসী ছিলেন তাদের সবাই তার পরিণতি মেনে নিতে পারেন নি। তার সমসাময়িক অ্যাডাম নিউসার (Adam Neuser)- এর চিঠিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ চিঠিটি লেখা হয়েছিল কনস্টান্টিনোপলের মুসলিম শাসক সম্রাট দ্বিতীয় সেলিমের কাছে। এ চিঠিটি রাজকীয় প্রাচীন নিদর্শনের অংশ হিসেবে এখন হাইডেলবার্গের (Heidelburg) আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে:

“আমি, অ্যাডাম নিউসার, জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী একজন খৃষ্টান এবং হাইডেলবার্গের লোকদের কাছে ধর্ম প্রচারকারীর মর্যাদা লাভকারী, যে শহরে এ সময়কার সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত লোক দেখা যায়, আমি আপনার প্রিয় আল্লাহ ও আপনার নবীর (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) উসিলা দিয়ে একান্ত বিনয়ের সাথে মহামান্য সুলতানের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমাকে আপনার একজন অনুগতদের মধ্যে এবং আপনার সেই জনগণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার আবেদন জানাচ্ছি যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইচ্ছায়, আমি দেখি, আমি জানি ও আমি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি যে, আপনার ধর্ম পবিত্র, সুস্পষ্ট ও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আমার প্রতিমা পূজক খৃষ্টান সমাজ ত্যাগের ঘটনা বহু বিবেচনাশীল ব্যক্তিকেই আপনার বিশ্বাস ও ধর্ম গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করবে, বিশেষ করে তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শিক্ষিত ও সর্বাপেক্ষা বিবেচনাশীল বহু ব্যক্তি যেহেতু আমারই মত মনোভাব পোষণ করেন যা আমি মহামান্য সুলতানকে মৌখিকভাবে অবহিত করব। আমার সম্পর্কে বলতে গেলে আমি সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে আল কুরআনের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে: খৃষ্টানরা আমাদের প্রতি ইয়াহূদীদের চেয়ে বেশি সদিচ্ছা প্রদর্শন করে; এবং যখন তাদের প্রাদ্রী ও বিশপগণের মত তারা হঠকারী ও একগুঁয়ে নয়, তারা আল্লাহর নবীর নির্দেশগুলো বুঝতে পারে এবং সত্যকে স্বীকার করে, তারা অশ্রু সজল চোখে বলে, হে প্রভূ! আমরা অন্তর থেকে আশা করি যে, যেহেতু ভালো লোকরা যা বিশ্বাস করত এবং আমরাও তাই করি এবং তা আমাদের ধর্মবিশ্বাসীদের দলে স্থাপিত করবে: তাহলে আমরা কেন আল্লাহ ও তার সত্য প্রচারকারী নবীকে বিশ্বাস করব না?[1]

হে সম্রাট! আমি তাদেরই একজন যারা আনন্দের সাথে আল কুরআন পাঠ করে। আমি তাদেরই একজন যে আপনার জনগণের একজন হতে চাই এবং আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনার নবীর মতবাদ সন্দেহাতীতভাবে সত্য। আমি মহামান্য সুলতানের কাছে আমার কথা শোনার জন্য এবং পরম করুণাময় আল্লাহ এ সত্য আমার কাছে কীভাবে প্রকাশ করেছেন তা জানার জন্য করজোড়ে আবেদন জানাচ্ছি।

তবে মহামান্য সম্রাট, আমি প্রথমেই বলে নিচ্ছি যে, অপরাধ, হত্যা, দস্যুতা অথবা যৌন অপরাধের কারণে যেসব খৃষ্টান তাদের নিজেদের মধ্যে বসবাস করতে না পেরে আপনার আশ্রয় নিয়েছে, আমি সে কারণে আপনার আশ্রয় চাইছি না। আমি এক বছর পূর্বেই আপনার আশ্রয় গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই এবং কনস্টান্টিনোপলের পথে আমি প্রেসবার্গ (Presburg) পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলাম। কিন্তু হাঙ্গেরীয় ভাষা না বুঝার কারণে আমি আর অগ্রসর হতে পারি নি এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি দেশে ফিরে আসি। যদি আমি কোনো অপরাধের কারণে পালিয়ে যেতাম তাহলে আমি দেশে ফিরতাম না। তাছাড়া কোনো ব্যক্তি আপনার ধর্ম গ্রহণ করতে আমাকে বাধ্য করে নি। আর কেই বা তা করবে? কারণ আপনার লোকদের কাছে অপরিচিত এবং তাদের কাছ থেকে বহু দূরে রয়েছি। সুতরাং আমার বিনীত প্রার্থনা যে, মহামান্য সুলতান যেন অনুগ্রহ করে আমাকে তাদের একজন বলে না ভাবেন যারা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বন্দী হয়েছে এবং আপনার ধর্ম গ্রহণ করেছে অনিচ্ছায় যারা সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাবে এবং সত্য ধর্মের নিন্দা করবে। আমি মহামান্য সুলতানের কাছে আমার বিনীত আবেদন জানাচ্ছি যে, আমি যা বলতে যাচ্ছি তাতে যেন তিনি অনুগ্রহ করে মনোযোগ দেন এবং আপনার সাম্রাজ্যে আমার প্রত্যাবর্তনের সত্য ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন। বিখ্যাত হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম প্রচারকের পদে উন্নীত হওয়ার পর আমি নিজে নিজেই আমাদের খৃষ্টধর্মের বহু প্রকার মতবিরোধ ও বিভক্তি সম্পর্কে বিচার বিশে­ষণ শুরু করি। কারণ আমাদের মধ্যে যত মানুষ ছিল তত ছিল মত ও মনোভাব। আমি নবী যীশু খৃষ্টের সময় থেকে যত পণ্ডিত ও ব্যাখ্যাকার ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে যা লিখেছেন ও শিক্ষা দিয়েছেন, তার সংক্ষিপ্তসার তৈরির কাজে হাত দিই। আমি শুধু দু’টি স্থানেই নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলাম। এক. মূসার আলাইহিস সালাম নির্দেশ এবং গসপেল। এরপর আমি অত্যন্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঈশ্বরকে একান্তভাবে ডাকতে থাকি, প্রার্থনা করতে থাকি যাতে তিনি আমাকে সঠিক পথ দেখান যাতে আমি বিভ্রান্ত না হই। এরপর ঈশ্বর সন্তুষ্ট হয়ে আমার কাছে প্রকাশ করলেন ‘একজন মাত্র ঈশ্বরের দলীল’, সেই দলীলের ওপর ভিত্তি করে আমি একটি গ্রন্থ রচনা করি যাতে আমি প্রমাণ করি যে, খৃষ্টানরা যে মিথ্যা কথা বলে থাকে যীশুর মতাদর্শে সে কথা কোথাও বলা নেই যে, তিনি একজন ঈশ্বর; বরং ঈশ্বর একজনই যার কোনো পুত্র নেই। আমি এ গ্রন্থটি আপনাকে উৎসর্গ করছি এবং আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, খৃষ্টানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা যোগ্য ব্যক্তিও এটা খণ্ডন করতে সক্ষম নয়। সুতরাং আমার পক্ষে কি ঈশ্বরের সাথে আরেকজন ঈশ্বরকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব? মূসা আলাইহিস সালাম এটা নিষেধ করেছেন এবং যীশুও কখনো এ শিক্ষা দেন নি। আল্লাহর অনুগ্রহে দিন দিন আমি নিজেকে শক্তিশালী করে তুলেছি এবং বুঝেছি যে, খৃষ্টানরা যিশুখ্রিস্টের সকল সুবিধার অপব্যবহার করেছে যেমনটি করেছিল ইয়াহূদীরা পিতলের সর্পকে…. আমার সিদ্ধান্ত যে, খৃষ্টানদের মধ্যে পবিত্র কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না এবং তারা এখন সকলেই মিথ্যাচারী। তারা মূসা আলাইহিস সালামের কিতাব ও গসপেলের সব কিছুই মিথ্যা ব্যাখ্যা করে বিকৃতির শিকার হয়েছে যা আমি আমার নিজের হাতে লেখা একটি বইতে দেখিয়েছি এবং সেটা আমি আপনাকে উপহার প্রদান করব। আমি যখন বলি যে, খৃষ্টানরা মিথ্যাচার করেছে ও মূসা আলাইহিস সালামের নির্দেশ ও গসপেল বিকৃত করেছে আমি তা মনে প্রাণেই বলি। মূসা আলাইহিস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে সুবিধাজনক সাক্ষ্য দিয়েছে। কিন্তু কুরআন প্রধানত তাদের মিথ্যা ব্যাখ্যার মাধ্যমে মূসা আলাইহিস সালামের কিতাব ও ঈসা

আলাইহিস সালামের গসপেল বিকৃত করার বিষয়টি জোর দিয়ে বলেছে। কার্যত আল্লাহর বাণী যদি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হত তাহলে ইয়াহূদী, খৃষ্টান ও তুর্কিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। তাই কুরআন যা বলেছে তা সত্য। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্ম সকল মিথ্যা ব্যাখ্যাকে ধ্বংস করেছে এবং আমাদের আল্লাহ এর সঠিক অর্থ শিক্ষা দিয়েছে….

এরপর আল্লাহর অনুগ্রহে আমি বুঝতে পারি যে, আল্লাহ এক, ঈসা আলাইহিস সালামের প্রকৃত ধর্মমতের শিক্ষা আমরা লাভ করি নি। তাই খৃষ্টানদের সকল অনুষ্ঠানের সাথেই মূলের অত্যন্ত বেশি পার্থক্য রয়েছে। আমি ভাবতে শুরু করি যে, এ বিশ্বে আমার মতে লোক শুধু আমি একা। আমি আল কুরআন দেখি নি। আমাদের খৃষ্টানরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্ম সংশ্লি­ষ্ট কোনো কিছু যাতে কোথাও বিস্তার লাভ করতে না পারে সে জন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখে এবং দারিদ্র্যরা যাতে এসব সত্য জেনে তাতে বিশ্বাস স্থাপন না করে সে জন্য তারা সত্যকে গোপন করে আল-কুরআনের মতবাদ সম্পর্কে এমন কুৎসা রটনা করে যে, তারা আল-কুরআনের নাম শুনেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও অলৌকিকভাবে সেই মহা গ্রন্থটি আমার হাতে এসে পড়েছে এবং এ জন্য আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আল্লাহ জানেন, আমি তার কাছে মহামান্য সুলতান ও তার সার্বিক কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করি। আমি যে জ্ঞান লাভ করেছি তা সকলের কাছে ব্যক্ত করার সকল পন্থা অবলম্বন করতে মনস্থ করেছি এবং যদি তারা তা গ্রহণ না করে তাহলে আমি আমার পদ ত্যাগ করব এবং আপনার শ্মরণ নিব। আমি খৃষ্ট ধর্মের কিছু বিষয়ে চার্চ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যে বিরোধ চলছে তার সমালোচনা শুরু করেছি এবং তাতে প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছি। আমি বিষয়টাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছি যে, সাম্রাজ্যের সকল লোকই এখন তা জেনে গেছে এবং আমি কিছু জ্ঞানী ব্যক্তিকে আমার পাশে পেয়েছি। আমার নিয়োগ কর্তা যিনি একজন রাজপুত্র এবং ক্ষমতার দিক দিয়ে জার্মানিতে সম্রাটের পরেই তার স্থান) সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ানের হামলার ভয়ে আমাকে পদচ্যুত করেছেন…।

এ চিঠিটি সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ানের (Maximilliaহ) হাতে পড়ে। নিউসার তার দু’বন্ধু সিলভান (Sylvan) ও ম্যাথিয়াস ভিহি (Mathias Vehe)- সহ গ্রেফতার হন। তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ১৫৭০ সালের ১৫ জুলাই নিউসার কারাগার থেকে পালিয়ে যান ও আবার গ্রেফতার হন। তিনি দ্বিতীয় বার পলায়ন করেন ও আবারও গ্রেফতার হন। দু’বছর ধরে তাদের বিচার চলে। সিলভানের মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ পর্যায়ে নিউসার আবার পলায়ন করেন। এবার তিনি কনষ্টাণ্টিনোপলে পৌঁছতে সক্ষম হন ও ইসলাম গ্রহণ করেন।

ফ্রান্সিস ডেভিড (Francis David) ১৫১০-১৫৭৯ খৃ.

ফ্রান্সি ডেভিড ১৫১০ খৃস্টাব্দে ট্রানসিলভানিয়ার কালোজার (Kolozsar) এ জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী ছাত্র ফ্রান্সিস উটেনবার্গে অধ্যয়নের বৃত্তি লাভ করেন। সেখানে তাকে ৪ বছর ধরে ক্যাথলিক পাদ্রির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কালোজার- এ ফিরে আসার পর তিনি ক্যাথলিক স্কুলের রেকর্ডার নিযুক্ত হন। এরপর তিনি প্রোটেষ্টাণ্টবাদ গ্রহণ করে ক্যাথলিক স্কুল ত্যাগ করেন। ১৫৫৫ খৃস্টাব্দে একটি লুথারপন্থী স্কুলের রেকর্ডার হন। লুথার ও ক্যালভিনের মধ্যে সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ভাঙন দেখা দিলে ডেভিড ক্যালভিনের দলে যোগ দেন। সংস্কার তখনও ব্যাপক রূপ লাভ করে নি। এ পরিবেশে অনুসন্ধানী চিন্তাকে তখনও নিষিদ্ধ করা হয় নি। খৃষ্টানধর্মের সকল পর্যায়ে আলোচনা অনুমোদিত ছিল। সংস্কারপন্থী চার্চ তখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ গ্রহণ করে নি এবং সে কারণে মুক্ত চিন্তার অবকাশ ছিল। এ পরিবেশে প্রতিটি মানুষ শুধু ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করবে, এ মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল।

যে দু’টি মত বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল এবং যা ছিল যৌক্তিক ব্যাখ্যার বাইরে সে দু’টি হলো যীশুর ঈশ্বরত্ব ও ত্রিত্ববাদ। যুক্তি বহির্ভূত এ মত বিশ্বাসের ব্যাপারে ডেভিডের মন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না যে, এ ব্যাপারগুলো বুঝার চেষ্টা না করেই যারা এ রহস্যে বিশ্বাসী তারাই ভালো খৃষ্টান হিসেবে গণ্য হয় কি করে। তিনি কোনো বিশ্বাসকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে এ সিদ্ধান্ত পৌঁছেন যে, যীশু ঈশ্বর নন। তিনি এক ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন।

পোলান্ডে এ বিশ্বাসের প্রতি জোর সমর্থন ছিল। এ দলের নেতা ছিলেন দু’জন: রাজ দরবারের চিকিৎসক ব­ন্ড্রাটা (Blandrata) এবং সোকিয়ানাস (Socianus) নামক এক ব্যক্তি। ডেভিড যখন ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে তার একটি ধারণা সূত্রবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এ সময় ট্রানসিলভানিয়ার রাজা জন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্য ব­ন্ড্রাটাকে তলব করেন। ডেভিড সেখানে অবস্থানকালে ব­ন্ড্রাটার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ থেকে খৃষ্টান ধর্মের মূল ভিত্তিরূপে এক ঈশ্বরে তার বিশ্বাসের যথার্থতা প্রমাণিত হয়। ১৫৬৬ খৃস্টাব্দে ডেভিড এক ধর্মীয় স্বীকারোক্তি রচনা করেন। এতে বাইবেলে প্রকৃত কি বলা হয়েছে তারই আলোকে ত্রিত্ববাদের অবস্থান ব্যক্ত করা হয়। এতে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার পাণ্ডিতিক ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ব­ন্ড্রাটাও তার পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক পুস্তিকায় এসব মত বিশ্বাস ইতিবাচক নেতিবাচক উভয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে ৭টি প্রস্তাব পেশ করেন। একই বছরে ব­ন্ড্রাটার সুপারিশে রাজা জন ডেভিডকে রাজদরবারে ধর্ম প্রচারক নিয়োগ করেন। এভাবে ডেভিড তৎকালে ধর্মীয় সমস্যাদি ব্যাখ্যা করার জন্য রাজা কর্তৃক আহুত জাতীয় বিতর্কে একত্ববাদী দলের মুখপাত্রে পরিণত হন। তিনি ছিলেন একজন অতুলনীয় বাগ্মী। তার সম্পর্কে সমকালীন এক ব্যক্তি বলেন, মনে হত ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্ট ডেভিডের ঠোঁটস্থ।

রাজা জনের আমলে ১৫৬৬ ও ১৫৬৮ খৃস্টাব্দে জিউয়ালফিহেরভাট (Gyualafeharvat) এবং ১৫৬৯ খৃস্টাব্দে নাগিভারাদ (Nagyvarad) এ সবচেয়ে বড় বিতর্ক সভাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম বিতর্ক ছিল অমীমাংসিত। তবে রাজা ব­ন্ড্রাটা ও ডেভিডের যুক্তি- প্রমাণ প্রদর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সে কারণে ১৫৬৭ খৃষ্টাব্দে পরমত সহিষ্ণুতা সংক্রান্ত এক রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়। এতে ঘোষণা করা হয়:

“প্রতিটি স্থানে ধর্ম প্রচারকরা ধর্মপ্রচার করতে এবং তাদের উপলব্ধি অনুযায়ী গসপেলের ব্যাখ্যা করতে পারবেন এবং সমবেত ব্যক্তিরা যদি তা ভালো মনে করে তাহলে কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। এবং যাদের মতবাদ তাদের ভালো মনে হয় তারা সেই ধর্ম প্রচারককে রাখবে। কেউ ধর্ম প্রচারককে ঘৃণা করতে বা তার সাথে দুর্ব্যবহার করতে পারবে না… বিশেষ করে তার ধর্মমত প্রচারের জন্য, কারণ ধর্ম বিশ্বাস ঈশ্বরের উপহার।”

১৫৬৮ সালে ধর্ম সম্পর্কিত দ্বিতীয় বিতর্ক সভাটি ডাকা হয়েছিল এ মত বিশ্বাস প্রমাণের জন্য যে বাইবেলে ত্রিত্ববাদ ও যীশুর ঈশ্বরত্বের কথা বলা হয়েছে কিনা। অত্যন্ত শক্তিশালী ও পরাঙ্গুম বক্তা ডেভিডের যুক্তিতর্ক অসার প্রমাণ করতে বিরোধীরা ব্যর্থ হয়। বিতর্ক সভায় আসন্ন পরাজয় উপলব্ধি করে বিরোধীরা গালাগালি শুরু করে। এ ঘটনা রাজা জনকে ডেভিডের যুক্তি প্রমাণকেই খাঁটি বলে গণ্য করতে সাহায্য করে। দশ দিন ধরে বিতর্ক সভা চলে এবং তা একত্ববাদকে জনপ্রিয় ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ডেভিড হয়ে উঠেন এর অগ্রদূত।

এ সময় মাইকেল সারভেটাসের লেখা-লেখির প্রায় সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিছু অংশ গোপনে ট্রানসিলভানিয়াতে নিয়ে এসে তা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়। সেগুলো ব্যাপকভাবে পঠিত হতে থাকে এবং তা পূর্ব ইউরোপে একত্ববাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করায় অবদান রাখে।

১৫৬৯ খৃস্টাব্দে হাঙ্গেরীতে তৃতীয় বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হয়। জনৈক ঐতিহাসিকের ভাষায় এটা ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক বিতর্ক সভা যা একত্ববাদের চূড়ান্ত বিজয় সূচিত করে।১০ রাজা স্বয়ং এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং এতে রাজ্যের সকল উচ্চ পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। ডেভিডের যুক্তি ছিল এরকম: রোমে পোপের ত্রিত্ববাদে আসলে ৪ অথবা ৫ জন ঈশ্বরের বিশ্বাস করা হয়। একজন মূল ঈশ্বর, ৩ জন পৃথক ব্যক্তি যাদের প্রত্যেককে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে এবং আরো একজন ব্যক্তি যীশু যাকেও কিনা ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে। ফ্রান্সিস ডেভিডের মতে, ঈশ্বর শুধু একজন তিনি হচ্ছেন পিতা, যার থেকে এবং যার দ্বারা সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং যিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রজ্ঞার শব্দ ও মুখ নিঃসৃত নিশ্বাসের মাধ্যমে। এই ঈশ্বরের বাইরে আর কোনো ঈশ্বর নেই, তিনও নয়, চারও নয়, না ভাবার্থে না ব্যক্তিরূপে, কারণ কোনো ধর্মগ্রন্থে ত্রয়ী ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুই বলা হয় নি।

চার্চের কথিত ঈশ্বর পুত্র যিনি কিনা ঈশ্বরের সত্ত্বা থেকে সৃষ্টির শুরুতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তার কথা বাইবেলের কোথাও উল্লেখ নেই, কিংবা নেই ত্রিত্ববাদের দ্বিতীয় ঈশ্বরের কথা যিনি উদ্ভূত ঈশ্বর থেকে এবং রক্তমাংসের মানুষ। এটা একান্তই মানুষেরই আবিষ্কার ও কুসংস্কার। আর সে কারণে তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।

যীশু নিজেকে সৃষ্টি করেন নি, পিতা তাকে জন্ম দিয়েছেন। পিতা তাকে ঐশ্বরিক পন্থার মাধ্যমে জন্মদান করেছিলেন।

পিতা তাকে পবিত্র করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন।

যীশুর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক শুধু তাই যা ঈশ্বর তাকে প্রদান করেছেন। ঈশ্বর ঐশী সত্ত্বার সব কিছুর ঊর্ধ্বে বিরাজমান।

ঈশ্বরের কাছে সময়ের পার্থক্য বলে কিছু নেই- তার কাছে সমস্ত কিছুই বর্তমানকাল। কিন্তু ধর্মগ্রন্থে কোথাও এ শিক্ষা দেওয়া হয় নি যে, যীশু সৃষ্টির শুরুতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

এ বিতর্ক পাঁচ দিন ধরে চলেছিল। আর এটিও হয় সমাপ্তিমূলক। রাজা জন তার চূড়ান্ত ভাষণে ঘোষণা করে যে একত্ববাদীদের মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ লুথারপন্থী দলের নেতা মেলিয়াসকে (Melius) হুঁশিয়ার করে দেওয়া হলো যে, তিনি যেন পোপের নির্দেশে কাজ না করেন, বই-পত্র পুড়িয়ে না দেন এবং জনগণকে বলপ্রয়োগে ধর্মান্তরিত না করেন।

পরে ডেভিড ধর্মীয় বিতর্কের সার সংক্ষেপ বর্ণনা করেন এভাবে:

আমি ধর্মগ্রন্থ অনুসরণ করি, কিন্তু আমার বিরোধীরা তা থলের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। তারা ত্রিত্ববাদের কথা বলে আলোর বদলে অন্ধকার ডেকে আনেন। তাদের ধর্ম এতটা স্ববিরোধী যে, তারা নিজেরা পর্যন্ত একে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করতে পারেন নি। যা হোক, তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেখতে পাবেন যে, ঈশ্বর তার সত্য প্রকাশ করবেন।১১

এ ধর্মীয় বিতর্কের ফল হয় এই যে, কলোজার শহরের প্রায় সকল অধিবাসীই এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়ে উঠে। গ্রামাঞ্চলেও এ ধর্ম বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ধর্মে পরিণত হয়। একত্ববাদ কারীভাবে স্বীকৃত ৪টি ধর্মের একটিতে পরিণত হয়, অর্থাৎ তা আইনের নিরাপত্তা লাভ করে। ১৫৭১ সাল নাগাদ ট্রানসিলভানিয়ায় একত্বাদীদের প্রায় ৫শ’টি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ বছরই রাজা জন মারা যান। একত্ববাদের জনপ্রিয়তা যদিও বৃদ্ধি পাচ্ছিল কিন্তু নতুন রাজা স্টিফেন রাজা জনের সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ পরিত্যাগ করেন। রাজা জনের মত প্রকাশের স্বাধীনতার নীতিও তিনি বাতিল করেন। ফলে একত্ববাদের অনুসারীদের জীবনযাত্রা বিপদসংকুল হয়ে পড়ে। এ সময় ব­ন্ড্রাটা ও সোকিনায়াসের সাথে বিরোধ দেখা দেয়ায় ডেভিডের অবস্থাও সঙ্গিন হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন আপসহীন একত্ববাদী এবং এমনকি পরোক্ষভাবেও তিনি কাউকে ঈশ্বরের অংশীদার করতে রাজি ছিলেন না। সোকিয়ানাস যীশুর প্রতি শ্রদ্ধা ও উপাসনার মধ্যে একটি পার্থক্য রেখা টানেন। কেউ তার উপাসনা করতে পারবে না, কিন্তু শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। ডেভিড এটা মানতে পারেন নি। অথচ পোলিশ একত্ববাদীদের কাছেও বিষয়টি আপত্তিকর মনে হয় নি। কারণ, এ দুয়ের মাঝে পার্থক্য ছিল সামান্যই। সাধারণ মানুষের চিন্তায় ও দৈনন্দিন অভ্যাসে এই পার্থক্যের বিষয়টি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে এবং উপাসনার সময় অকপটে এটা বলা সম্ভব ছিল না যে, কেউ প্রার্থনা করছে না শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে।

রোমান ক্যাথলিকগণ নতুন রাজার সমর্থন লাভ করে। অন্যদিকে একত্ববাদী আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে বিভক্তি তাদের আরো শক্তি জোগায়। ১৫৭১ খৃস্টাব্দে টরডাতে এক সম্মেলনে অভিযোগ উত্থাপন করা হয় যে, কিছু যাজক নয়া ধর্মমত প্রবর্তনের জন্য দোষী। ১৫৭৩, ১৫৭৬, ১৫৭৮ খৃস্টাব্দে সম্মেলনেও এ অভিযোগ পুনরায় উত্থাপন করা হয়। এসব অভিযোগ ক্রমশ সুনির্দিষ্ট রূপ নিতে থাকে এবং চূড়ান্তভাবে ফ্রান্সিস ডেভিড তার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ১৫৭৮ সালে বন্ড্রাটার সাথে রাজার ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল। ১৫৭৮ সালে ব­ন্ড্রাটা খোলাখুলিভাবে ডেভিডের বিরোধিতা করেন এবং তিনি ডেভিডকে তার ধর্ম আর প্রচার না করার জন্য বলেন। কিন্তু ডেভিড প্রাণভয়ে ভীত হয়ে নিজের বিশ্বাস ত্যাগ করার মত মানুষ ছিলেন না। যে ব­ন্ড্রাটা সারাজীবন একত্ববাদী ধর্ম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন তিনিই শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লেন। বয়োবৃদ্ধ ব­ন্ড্রাটা অবসর চাইলেন। তিনি আর নিজের বা বন্ধুদের ওপর সমস্যা ডেকে আনতে চাইলেন না। তারা জানতেন, ডেভিড যা করছেন তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তারা উপলব্ধি করলেন যে, ডেভিড যদি তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন তাহলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।

কিন্তু ডেভিড তার মতে অবিচল রইলেন। তিনি যে শুধু প্রচার অব্যাহত রাখলেন তাই নয়, উপরন্তু সকল বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে তার বিশ্বাসের কথা লিখতে ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। ব­ন্ড্রাটা ডেভিডের মত পরিবর্তন করার প্রয়াসে সোকিয়ানাসকে ট্রানসিলভানিয়ায় আমন্ত্রণ করেন। সোকিয়ানাস আগমন করেন ও ডেভিডের আতিথ্য নেন। তার চেষ্টায় কোনো ফল হয় নি। তবে ডেভিড তার লেখালেখি সংক্ষিপ্ত করতে রাজি হন এবং সেগুলো পোলিশ একত্বাবাদী চার্চের কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ডেভিড তাই করেন এবং মোট চারটি বিষয় প্রণয়ন করেন:

ঈশ্বরের কঠোর নির্দেশ হলো যে কেউই স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, পিতা ঈশ্বর ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা করতে পারবে না।

সত্যের শিক্ষাদাতা যিশুখ্রিষ্ট শিক্ষা দিয়েছেন যে, স্বর্গীয় পিতা ব্যতীত আর কারো সাহায্য প্রার্থনা করা যাবে না।

প্রকৃত প্রার্থনার সংজ্ঞা হলো যা মনে প্রাণে পিতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়।

সাধারণ প্রার্থনার লক্ষ্যবস্তু পিতা, খৃষ্ট নন।

সোকিয়ানাস এ মতের বিরুদ্ধে লেখেন এবং ডেভিড তার মতের সমর্থনে পুনরায় লিখেন। এ আলোচনা ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে এবং ধীরে ধীরে তা তিক্ত ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে পৌঁছে। ফল হলো এই যে, ব­ন্ড্রাটা ও ডেভিড খোলাখুলিভাবে পরস্পরের শত্রু হয়ে ওঠেন। একা ক্যাথলিক রাজাকে প্রয়োজনীয় সমর্থন এনে দেয়। ডেভিডকে গৃহবন্দী করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার সাথে কারো দেখা সাক্ষাৎ ও নিষিদ্ধ করা হয়। এ নির্দেশ কার্যকর হওয়ার আগেই ডেভিড তা জানতে পারেন। তিনি তৎক্ষণাৎ যত বেশি সম্ভাব্য গ্রেফতার সম্পর্কে জনসাধারণকে জানিয়ে দেন।

তিনি ঘোষণা করেন, বিশ্ববাসী যাই করার চেষ্টা করুক না কেন, ঈশ্বর এক- এ কথা সারা বিশ্বের কাছেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।১২

গ্রেফতারের পর ডেভিডকে একটি ধর্মীয় সম্মেলনে হাযির করা হয়। ব­ন্ড্রাটা একই সাথে প্রধান কৌসুলী এবং প্রধান সাক্ষীর ভূমিকা পালন করেন। ডেভিডের জন্য এটা ছিল দুঃসহ ধকল এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে একটি চেয়ারে করে বহন করা হতো। তিনি তার হাত-পা নাড়তে পারতেন না। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং একটি উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত ক্যাসলের বন্দীশালায় রাখা হয়। সেখানে তিনি যে ৫ মাস জীবিত ছিলেন, সে সময় তিনি কী পরিমাণ দুরবস্থার শিকার হয়েছিলেন তা কেউ জানে না। ১৫৭৯ খৃস্টাব্দে নভেম্বরে তার মৃত্যু হয় এবং একটি অজ্ঞাত কবরে অপরাধীর মত তাকে কবরস্থ করা হয়।

ডেভিডের মৃত্যুর পর তার কারা কক্ষের দেয়ালে একটি কবিতা লিখিত আছে বলে দেখা যায়। এর অংশ বিশেষ নিম্নরূপ:

দু’টি দশক আমি নিষ্ঠার সাথে আমার দেশ

ও প্রিন্সের সেবা করেছি

আমার বিশ্বস্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

আমার কি অপরাধ যে, আমি পিতৃভূমির কাছে ঘৃণিত?

তা হলো শুধু এই: ঈশ্বর একজন, তিনজন নন

আমি এ উপাসনাই করেছি।

এ কবিতার শেষাংশ ছিল এরকম:

বজ্র নয়, ক্রুশ নয়, নয় পোপের তরবারি, নয় মৃত্যুর মুখব্যাদান

সত্যের অগ্রযাত্রা রোধ করে নেই এমন কোনো শক্তি

আমি যা অনুভব করেছি তাই লিখেছি

এক বিশ্বাস পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে আমি কথা বলেছি

আমার মৃত্যুর পর ঘটবে পতন অসত্য মতবাদের।১৩

ডেভিড পরলোকগমন করলেও তার আন্দোলন অব্যাহত থাকে। কার্যত বহু বছর ধরে ট্রানসিলভানিয়ার একত্ববাদীদের ফ্রান্সিস ডেভিডের ধর্মের অনুসারী বলে আখ্যায়িত করা হত। আজ তার মত ও বক্তব্য সহজ, সুস্পষ্ট ও বাইবেল ভিত্তিক বলে গৃহীত হচ্ছে। সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তির রায়ই এখন ফ্রান্সিস ডেভিডের পক্ষে যাচ্ছে।১৪  ডেভিডের মৃত্যুর ব্যাপারে বড় ভূমিকা পালনকারী ব­ন্ড্রাটা ক্যাথলিকদের ও রাজার কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি এত ধনী ছিলেন যে, তার উত্তরাধিকারী তার স্বাভাবিক মৃত্যুর অপেক্ষা না করে তাকে হত্যা করে। একত্ববাদীদের ওপর নির্যাতন যদিও অব্যাহত ছিল কিন্তু নিপীড়নকারীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে তা সহায়ক হয় নি। শিগগিরই ডেভিড একজন শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। তার দৃষ্টান্ত

একত্ববাদীদের মধ্যে এমন প্রেরণা যে সংগঠিত নিপীড়ন সত্ত্বেও তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে।

ট্রানসিলভানিয়ায় একত্ববাদীদের সংখ্যা উল্লেখ যোগ্যভাবে হ্রাস পায়। তবে তুর্কী শাসনাধীন হাঙ্গেরীর দক্ষিণে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। মুসলিম শাসকরা কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সকল ধর্মের লোকদের শান্তিতে বসবাসের অনুমতি দেন। তবে শর্ত ছিল যে, তারা মুসলিমদের ধর্মাচরণে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। এভাবে খৃষ্টানরা মুসলিম শাসনাধীন পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে যা আর কোনো খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী দেশে ছিল না। এমনকি খৃষ্টানদের তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী চলারও অনুমতি দেওয়া হয়। স্বাধীনতার এ সুযোগ গ্রহণ করে একজন ক্যালভিনপন্থী বিশপ ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে একজন একত্ববাদীর ফাঁসি দেন। অন্য একজন একত্ববাদী এ বিষয়টি বুদার তুর্কি গভর্নরকে অবহিত করেন। গভর্নর ক্যালভিনপন্থী বিশপকে তার সামনে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। বিচারের পর বিশপ ও তার দু’জন সহকারীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একত্ববাদী যাজক দণ্ডপ্রাপ্ত বিশপের পক্ষে হস্তক্ষেপ করেন এই বলে যে, তিনি এ হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চান না, তবে তিনি চান যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এর ফলে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড রহিত করে তার পরিবর্তে তাদের বিপুল অংকের জরিমানা করা হয়।

তুর্কি সরকারের অধীনে একত্ববাদীগণ প্রায় এক শতাব্দী যাবৎ শান্তিতে বসবাস করে। তুর্কি শাসনাধীন দেশে তাদের প্রায় ৬০ টি চার্চ ছিল। তুর্কি সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের স্বাধীনতাও খর্ব হয় এবং লোকজনকে আবার বলপূর্বক ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিতকরণ শুরু হয়। যারা ধর্মান্তর গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাত তারা সহিংস নিপীড়নের শিকার হত। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ জনসাধারণের ওপর প্রকাশ্যে নিপীড়ন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে একত্ববাদীদের সংখ্যা আবার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পূর্ব ইউরোপে একত্ববাদী আন্দোলন আজও অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে এবং একত্ববাদের অনুসারীদের হৃদয়ে এখনও ডেভিডের বিপুল প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

মুসলিমদের সাথে ফ্রান্সিস ডেভিডের কতটা যোগাযোগ ছিল, সে ব্যাপারে জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। নিঃসন্দেহে তার ধর্ম বিশ্বাস ইসলামের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল এবং কমপক্ষে একটি স্থানে তিনি তার বিশ্বাসের সমর্থনে খোলাখুলিভাবে কুরআনকে উদ্ধৃত করেছিলেন:

কুরআনে একথা কারণ ছাড়া বলা হয় নি যে, যারা যীশুর উপাসনা করত যীশু তাদের কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। তারা তাকে ঈশ্বর বলে মনে করত যা ছিল তার ধর্মমতের বিরোধী… সুতরাং তাদেরকে এ জন্য দায়ী করা যায় যে, আমাদের যীশুর উপাসনা করার শিক্ষা কে দিয়েছে যেখানে যীশু নিজে বলেছেন যে, ঈশ্বরের প্রার্থনা কর…. ঈশ্বর তিনজন নন শুধু একজন।১৫

(তু. ৫ : ১১৬-১১৭)

 ডেভিডের যত নিন্দা বা সমালোচনা করা হোক না কেন, তাকে কখনোই একজন মুসলিম বলা হয় নি। কারণ ক্যালভিনপন্থী ও ক্যাথলিক উভয়েরই আশঙ্কা ছিল যে, এটা তৎকালীন শক্তিশালী তুর্কি শাসকদের একত্ববাদীদের সাহায্যে ডেকে আনবে। একত্ববাদী আন্দোলন যা ইসলামের খুবই নিকটবর্তী ছিল, সম্পর্কে তুর্কি শাসকদের অসতর্কতার কারণ হয়তো এই ছিল যে, তাদের নিজেদের ধর্ম ইসলামের ক্ষেত্রেও অধঃপতনের সূচনা হয়েছিল। ডেভিডের একটি প্রধান সমালোচনা হলো যে, যদি তার মত গ্রহণ করা হত, তাহলে ইয়াহূদী ও খৃষ্টধর্মের মধ্যকার পার্থক্য দূর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং খৃষ্টধর্ম হয়তো ইয়াহূদী ধর্মের মধ্যে পুনরায় মিশে যেত। এমনকি ব­ন্ড্রাটাও ডেভিডকে বিদ্রূপ করত এই বলে যে, তিনি ইয়াহূদী ধর্মে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি কখনই ডেভিডের যুক্তি খণ্ডন করেন নি, কিন্তু ইয়াহূদীদের বিরুদ্ধে জনমতকে উসকে দিয়ে তিনি ডেভিডের মর্যাদা হানির চেষ্টা করেছেন। ব­ন্ড্রাটা বোধ হয় একথা ভুলে গিয়েছিলেন যে, প্রত্যেক নবীই তার পূর্ববর্তী নবীর শিক্ষা পুনর্ব্যক্ত ও কাজ সমর্থন ও সম্প্রসারণের জন্যই এসেছেন। কার্যত ফ্রান্সিত ডেভিডের গুরুত্ব এখানেই যে এক ঈশ্বরের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রেরিত পুরুষদের ধারাবাহিকতায় যীশুর আগে ও পরের কোনো নবীর ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করে যীশুর অবস্থান সমর্থন করেছেন। উপরন্তু তিনি জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সত্য বিশ্বাস, ঈশ্বরে বিশ্বাস এবং যীশুর আদর্শ ও শিক্ষার অনুসরণ ও জীবন-যাপনই ইহকাল ও পরকালের জন্য যথেষ্ট।১৬,

লেলিও ফ্রান্সেসকো মারিয়া সোজিনি

(Lelio Francesco Maria Sozini) ১৫২৫-১৫৬২ খৃ.

লেলিও সোজিনি ১৫২৫ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পরিণত বয়সে তিনি একজন আইনবিদ হন। এ পর্যায়ে আইন অধ্যয়ন তাকে হিব্রু ও বাইবেলের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে। তরুণ বয়সে তিনি বোলোগনা ত্যাগ করেন ও ডেনিসের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গমন করেন। সেখানে তখন কিছুটা ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল যা ইতালির আর কোনো অংশে ছিল না। সারভেটাসের রচনা সেখানে সমাদৃত হতো এবং অনেকেই তার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ওয়ালেস তার “এন্টি ট্রিনিটারিয়অন বায়োগ্রাফি” গ্রন্থে লিখেছেন যে, সারভেটাসের অনুসারীদের মধ্যে ভেনিসের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাও ছিলেন।১৭ কিন্তু সিনেট সারভেটাসের অনুসারীদের প্রকাশ্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষিতে তারা গোপনে মিলিত হতে শুরু করেন। খৃষ্টধর্মের সত্য রূপ জানা এবং যীশুর প্রকৃত শিক্ষাকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। “হিষ্টরি অব দি রিফরমেশন ইন পোলান্ড” গ্রন্থে লুবিনিয়েটস্কি (Lubinietski) লিখেছেন:

তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এক ঈশ্বর ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই। যীশু প্রকৃতই একজন রক্ত- মাংসের মানুষ ছিলেন। তিনি ঈশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতায় কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ত্রি-ঈশ্বর এবং যীশুর ঈশ্বরত্ব মতবাদের উদ্যোগতা হলো পৌত্তলিক দার্শনিকগণ।১৮

ওয়ালেস (Wallace) লিখেছেন, লেলিও এসব লোকের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের মতে মুগ্ধ হয়ে তারুণ্যের উৎসাহ নিয়ে ধর্মীয় সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত হন।১৯ ক্যামিলো (Camillo) নামক একজন ধর্মজ্ঞানী ব্যক্তি তাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেন। তার সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তখন পর্যন্ত তার মন প্রতিষ্ঠিত চার্চের কঠোর ধর্মমতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু এখন তিনি নতুন এক স্বাধীনতা অনুভব করলেন যা তিনি আগে লাভ করেন নি। তিনি জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পেলেন এবং সত্যের সন্ধানে নিজেকে আজীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। জানা যায় যে, আজ যা ভিনেসেনজার গুপ্ত (Secret Society of Vincenza) সমিতি নামে পরিচিত, সেদিন এ সমিতির সদস্যদের সংখ্যা ছিল ৪০ এরও বেশি। এক সময় এ গুপ্ত সমিতির অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে পড়লে সদস্যদের অনেককেই গ্রেফতার করা হয়। কারো কারো মৃত্যুদণ্ড হয়। অন্যদিকে ভাগ্যবান সদস্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন ও অন্যান্য দেশে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। লেলিও সোজিনি ছাড়া এ সমিতির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ওচিনাস, ডারিয়াস সোজিনি (লেলিওর জ্ঞাতিভ্রাতা), আলসিয়াটি ও বুকালিস। একটি জোর ধারণা চালু আছে যে, শেষোক্ত দু’জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ডাঃ হোয়াইট তার ব্রম্পটন বক্তৃতায় (Brompton Lectures) সোজিনির অনুসারীদের “আরবের নবীর অনুসারী” বলে আখ্যায়িত করেছেন।২০

একদিকে এ সমিতির অস্তিত্ব যখন গোপন ছিল, অন্যদিকে লেলিও সোজিনির দৃষ্টি এর বাইরের দু’ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এদের একজন সারভেটাস, অন্যজন ক্যালভিন। সারভেটাসের একত্ববাদে তার বিশ্বাসের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণার সাহস ছিল, অন্যদিকে ক্যালভিন নিজেকে ইউরোপের সংস্কারবাদী গোষ্ঠীর সমতুল্য একটি শক্তি হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতেন।

সোজিনি প্রথমে ক্যালভিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে মনস্থ করেন। কিন্তু তার সাথে সাক্ষাতের পর সোজিনি দেখতে পান যে, একজন রোমান যাজকের মতই ক্যালভিন এক অনুদার মানসিকতার ব্যক্তি। এতে তিনি খুবই হতাশ হন। তার এ মনোভাব অবিলম্বেই বিস্ফোরণোন্মুখ রূপ পরিগ্রহ করে যখন তিনি আবিষ্কার করেন যে, সারভেটাসকে গ্রেফতারের ব্যাপারে ক্যালভিন সাহায্য করেছিলেন। তখন থেকে সোজিনি সারভেটাসের মতবাদে আস্থা স্থাপন করেন। ক্যামিলোর অনুপ্রেরণায় তিনি প্রতিষ্ঠিত চার্চের গৃহীত মতবাদ সমূহের ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণা অব্যাহত রাখেন।

১৫৫৯ সালে তিনি জুরিখ গমন করেন। সেখানেই তার জীবনের শেষ তিন বছর গভীর অধ্যয়নের মধ্যে অতিবাহিত হয়। ১৫৬২ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

ফাউষ্টো পাওলো সোজিনি (Fausto Paolo Sozini) ১৫৩৯-১৬০৪ খৃস্টাব্দ লেলিও সোজিনির ভ্রাতুষ্পুত্র ফাউষ্টো পাওলো সোজিনি ১৫৩৯ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃব্য স্বল্পকালীন অথচ ফলপ্রসূ জীবনে যা অর্জন করেছিলেন, তার সবই ভ্রাতুষ্পুত্রকে দিয়ে যান। ২৩ বছর বয়সে

জনসাধারণের কাছে সোকিয়ানাস নামে পরিচিত ফাউষ্টো সোজিনি শুধু লেলিওরই নয়, ক্যামিলো ও সারভেটাসেরও উত্তরসূরীতে পরিণত হন। পিতৃব্যের কাছ থেকে মহামূল্য উপহার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন বিপুল সংখ্যক পাণ্ডুলিপি ও ব্যাখ্যামূলক নোট।

সোকিয়ানাস তার জন্মস্থান সিয়েনায় (Sienna) প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি লিয়ঁ ও জেনেভা গমন করেন। ১৫৬৫ খৃস্টাব্দে তিনি ইতালিতে ফিরে আসেন। তিনি ফ্লোরেন্স যান এবং ইসাবেলা দ্য মেডেসির (Issabella de Medeci) অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি মর্যাদা ও সম্মান লাভ করেন। ইসাবেলার মৃত্যুর পর তিনি ইতালি ত্যাগ করেন ও বাসিলেতে বাস করতে শুরু করেন। তরুণ পণ্ডিত সেখানে খুব শিগগিরই ধর্মতত্ত্বে আগ্রহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তিনি বেনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে গোপনে বিতরণ করেন, কারণ চার্চের অনুশাসনের সাথে প্রকাশ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল।

ফাউস্টো সোজিনির গ্রন্থটি পোলান্ডের রাজ দরবারে চিকিৎসক বন্ড্রাটার (Blandrata) হাতে পৌঁছে। এ পর্যায়ে চেপে বসা শাসরোধকর পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার সাহস, মন, ক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব­ন্ড্রাটার ছিল। শাসকদের ধর্ম সহিষ্ণুতা ধর্ম নিয়ে মুক্ত আলোচনায় আগ্রহী ও চার্চের স্থূল অনুশাসন মানতে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য পোলান্ডকে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করেছিল। ব­ন্ড্রাটা সোকিয়ানাসকে পোলান্ডে আসার আমন্ত্রণ জানান। সোকিয়ানাস আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করেন। তিনি পোলান্ডে মুক্ত ও আন্তরিক পরিবেশ দেখতে পান। তিনি চার্চের নিপীড়ন, ভয় মুক্ত পরিবেশে স্বনামে লেখার স্বাধীনতা লাভ করেন। পোলান্ডে এসে যদিও তিনি প্রাণে রক্ষা পান, কিন্তু ইতালিতে তার সহায়-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। সোকিয়ানাস একজন পোলিশ মহিলাকে বিয়ে করেন এবং স্বদেশের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

পোলান্ডের শাসকরা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করতেন না। তবে তারা তখনও অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন। তারা জানতেন না যে, একটি ইতিবাচক ধর্মমত প্রণয়নে কী পদক্ষেপ নিতে হবে। সোকিয়ানাসের উপস্থিতি এ অভাব পূরণ করে এবং শাসক ও জনগণও তাতে স্পষ্টতই সন্তুষ্ট হয়। পিতৃব্যের কাছ থেকে লব্ধ জ্ঞান ও নিজস্ব অধ্যয়নের সুফলের সমন্বয় ঘটেছিল সোকিয়ানাসের মেধা ও মননে এবং চার্চের ওপর তার লেখার শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল।

ক্রুদ্ধ চার্চ তাকে গ্রেফতার করে এবং তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সোকিয়ানাসের প্রতি জনসমর্থন এত বিপুল ছিল যে, আদালত তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তবুও তাদের বিচারের ফলাফলের বিরাট গুরুত্ব প্রদর্শন করতে তাকে ঠাণ্ডা পানিতে ডুবিয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। চার্চ ধর্মীয় বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্য জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার পাশাপাশি ঠাণ্ডা পানিতে ডুবিয়ে হত্যার এ বিধানকে জুডিকাম ডেই (Judicum dei) বা ঈশ্বরের বিচার নামে আখ্যায়িত করত যদিও তা কখনোই যিশুখ্রিষ্ট বা পলের শিক্ষার অংশ ছিল না। এ শাস্তিতে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে গভীর পানিতে নিক্ষেপ করা হতো। যদি সে ডুবে যেত তাহলে সে দোষী প্রমাণিত হতো। সোকিয়ানাস সাঁতার জানতেন না, একথা ভালোভাবে জানা সত্ত্বেও যাজকরা তাকে সাগরে নিক্ষেপ করে। যেভাবেই হোক তিনি প্রাণে বেঁচে যান এবং ১৬০৪ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

১৬০৫ খৃস্টাব্দে সোকিয়ানাসের সব রচনা একত্র করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। রোকোউ (Rokow) তে গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার কারণে সাধারণের কাছে একটি রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম (Racovian Cathechism) নামে পরিচিত হয়। পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত এ গ্রন্থটি ইউরোপের প্রায় সকল ভাষায় অনুদিত হয়। তার মতাদর্শ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং তার ধর্মীয় চিন্তাধারা সোকিয়ানবাদ (Socianism) নামে পরিচিতি লাভ করে। হারনাক তার “আউটলাইনস অব দি হিষ্টরি অব ডগমা” গ্রন্থে সোকিয়ানবাদকে খৃষ্টীয় ধর্মমতের চূড়ান্ত পর্যায়ে সর্বশেষ হিসেবে রোমান ক্যাথলিকবাদ ও প্রটেস্টাণ্টবাদের সম পর্যায়ে স্থাপন করেছেন। অবশ্য এটা সোকিয়ানাসের প্রাপ্য। কারণ তার জন্যই সে সময় একত্ববাদীরা আধুনিক খৃষ্টান ধর্মের মধ্যে এক পৃথক পরিচিতি লাভ করেছিল। হারনাক সোকিয়ানবাদের নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করেছেন:

এতে রয়েছে ধর্মের বাস্তবতা ও বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহ সহজ করে তোলার এবং চার্চ প্রবর্তিত ধর্মের বোঝা প্রত্যাখ্যানের সাহস।

এটা ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে এবং খৃষ্টধর্ম ও প্লা­টোনিজমের মধ্যে চুক্তির বন্ধন ভেঙে দিয়েছে।

এটা এ ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছে যে, ধর্মকে শক্তিশালী করতে হলে ধর্মীয় সত্যের বিবরণ সুস্পষ্ট ও উপলব্ধিযোগ্য হতে হবে।

এটা বাইবেলে যা নেই সেই প্রাচীন ধর্মমতের বন্ধন থেকে পবিত্র বাইবেলের অধ্যয়নকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। কেউ একজন বলেছেন যে, “সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা হলো যাজকদের রাজস্ব।” সোকিয়ানবাদ এ দু’টিকেই হ্রাস করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে।

সোকিয়ান ধর্মতত্ত্ব ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডেও তা বিস্তৃত হয়। নরউইচের বিশপ হলো (Bishop Hall) বিলাপ শুরু করেন যে, ত্রিত্ববাদ বিরোধী ও নয়া ধর্মানুসারীদের দ্বারা নারকীয় সোকিয়ান ধর্মমতের মাধ্যমে খৃষ্টানদের মন বিপথগামী হয়েছে। ফলে খৃষ্টধর্মের চূড়ান্ত ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।২১ ১৬৩৮ খৃস্টাব্দে সোকিয়ানদের ওপর নির্মম ও সংগঠিত নিপীড়ন শুরু হয়। রোকোউতে তাদের কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সোকিয়ানাসের অনুসারীরা সকল নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং একত্ববাদে বিশ্বাসী বহু লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ক্যাথেরিন ভোগালের (Catherine Vogal) কথা বলা যেতে পারে। পোলান্ডের এক অলংকার ব্যবসায়ীর স্ত্রী ক্যাথেরিনকে ৮০ বছর বয়সে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। তার অপরাধ ছিল এই যে, তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর একজন, তিনিই দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য বিশ্বের স্রষ্টা এবং মানবিক বুদ্ধি তাঁর নাগাল পায় না। এটা আসলে অকৃত্রিম ইসলামি বিষয়। ফুলার লিখেছেন যে সোকিয়ানাসের অনুসারীদের এভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বীভৎস ব্যাপারটি সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করে… এবং তারা ভালো চিন্তাগুলো এমনকি ধর্মবিরোধীদের মতও সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল যারা রক্ত আখরে খচিত করেছিল নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসকে।২২ ওয়ালেস বলেন, সেজন্যই প্রথম জেমস আগুনে পুড়িয়ে হত্যার বদলে তাদের বই পুড়িয়ে দেওয়ার অধিকতর কম ক্ষতিকর নীতি গ্রহণ করেন।২৩

১৬৫৮ খৃস্টাব্দে জনসাধারণকে রোমান ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ অথবা নির্বাসনে যাওয়ার যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়। ফলে একত্ববাদীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাদের ধর্ম বিশ্বাস থেকে তারা বিচ্যুত হয় নি এবং দীর্ঘদিন নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখে।

রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজমে বিধৃত লেখায় সোকিয়ানাস প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে গোঁড়া খৃষ্টধর্মের মর্ম মূলে আঘাত হেনেছিলেন। যীশু ক্রুশবিদ্ধ হন নি কিংবা পুনরুজ্জীবিতও হন নি, সুতরাং এ মতবাদ সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। সোকিয়ানাস যীশুর জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞাত না থাকলেও তিনি অন্যান্য ভিত্তিতে এ মতবাদের অসারতা প্রমাণে সক্ষম ছিলেন। সংক্ষেপে বললে, প্রায়শ্চিত্ত মতবাদের অনুসারীরা প্রচার করতে থাকে যে আদমের প্রথম ভুল কাজের জন্য মানুষ পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। যীশু তার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে এ পাপ এবং খৃষ্টধর্ম গ্রহণকারী তার অনুসারী সকলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। গোঁড়া খৃষ্টধর্ম অনুসারে চার্চ হলো একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পবিত্র সমাজ যা যিশুখ্রিষ্ট মানুষের কাজের জন্য তার প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুধুমাত্র এ সমাজের মধ্যে থেকে এবং তার সেবার মাধ্যমে পাপী মানুষ ঈশ্বর লাভের পথ খুঁজে পেতে পারে। এ কারণে চার্চ বিশ্বাসী ব্যক্তির চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। সোজিনি-এর সবকিছুই প্রত্যাখ্যান করেন তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, একজন মানুষ কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে। আত্মার মুক্তির জন্য খৃষ্টধর্ম নয়, সঠিক বিশ্বাস প্রয়োজন, অন্ধভাবে চার্চকে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে সোকিয়ানাস সমগ্র চার্চের কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্নের সৃষ্টি করেন। প্রধানত এই কারণেই ক্যাথলিক ও প্রোটেষ্টাণ্টরা কোসিয়ানাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পরস্পরের সাথে হাত মিলিয়েছিল। সোকিয়ানাস নিম্নোক্ত ভিত্তিতে প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ খণ্ডন করেন:

যিশুখ্রিষ্ট আদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন নি। গসপেলের বর্ণনা অনুযায়ী যীশু অল্প সময়ের জন্য যন্ত্রণাভোগ করেন। মানুষকে যে অনন্তকালীন যন্ত্রণাভোগ করতে হবে তার সাথে তুলনায় স্বল্প সময়ের খুব তীব্র যন্ত্রণা কিছুই নয়। যদি এ কথা বলা হয় যে, এ যন্ত্রণা ছিল অতি ভয়ানক কারণ যিনি তা ভোগ করেন তিনি ছিলেন অনিঃশেষ ব্যক্তির যন্ত্রণাও অনন্ত যন্ত্রণার কাছে কিছুই নয়।

যদি স্বীকার করে নেওয়াও হয় যে, যীশুখ্রিষ্ট প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন তাহলেও সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা অথবা তার ক্ষমার জন্য তার প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কথা বলা অসম্ভব, যেহেতু যে ব্যক্তি যীশুখৃষ্টের নামে দীক্ষিত হয়ে সৃষ্টিকর্তা তার পাপ ক্ষমা করার আগেই সে স্বংয়ক্রিয়ভাবে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এ মতবাদ অনুসরণ করার অর্থ সৃষ্টিকর্তার আইন তার বান্দাদের জন্য আর বাধ্য-বাধকতামূলক থাকে না। যেহেতু ইতোমধ্যে তার সকল পাপের পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি তার যা খুশি করার স্বাধীনতা পেয়ে যায়। যেহেতু যীশুখৃষ্টের প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণাঙ্গ ও অনন্ত, সুতরাং সকলেই তার আওতাভূক্ত। তাই চিরকালীন মুক্তি অবধারিত হয়ে যায়। অন্য কথায়, মানুষকে নতুন কোনো শর্ত দেওয়ার অধিকার ঈশ্বরের নেই। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, সে কারণে সকল ঋণ গ্রহীতাই এখন মুক্ত। ধরা যাক, একদল লোক একজন জাগতিক ঋণদাতার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে এবং কোনো একজন তা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করল। এর পর ঐ ঋণদাতার কি ওইসব ঋণ গ্রহীতার কাছে আর কোনো দাবি থাকবে যারা আর তার কাছে ঋণী নয়?

যীশু ঈশ্বর নন, একজন মানুষ, একথা ব্যক্ত করে সোকিয়ানাস পরোক্ষভাবে প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কোনো ব্যক্তিই সমগ্র মানবজাতির অসৎ বা ভুল কাজের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে পারে না। এ সত্যটি এই কাল্পনিক মতবাদ খণ্ডন করার জন্য যথেষ্ট।

সোকিয়ানাস জোর দিয়ে বলেছেন যে, যীশু একজন মরণশীল মানুষ ছিলেন। তিনি এক কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনের পবিত্রতার জন্য তিনি অন্য সকল মানুষ থেকে পৃথক ছিলেন। তিনি ঈশ্বর ছিলেন না, কিন্তু ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। তার অলৌকিক দৃষ্টি ও শক্তি ছিল। কিন্তু তিনি তার স্রষ্টা ছিলেন না। ঈশ্বর মানবজাতির কাছে এক মিশনে তাকে প্রেরণ করেছিলেন। বাইবেলের সংশ্লি­ষ্ট অনুচ্ছেদসমূহের উদ্ধৃতি ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সোকিয়ানাস এসব বিশ্বাসকে সমর্থন করেন। তার সূক্ষ্ম ও বলিষ্ঠ যুক্তি যীশুখৃষ্ট সম্পর্কে একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। তিনি বলেন, যীশু তার জীবনে সকল অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছেন। বিশ্ব সৃষ্টির আগে তার সৃষ্টি হয় নি। প্রার্থনার সময় যীশুর সাহায্য কামনা করা যেতে পারে যদি না ঈশ্বর হিসেবে তার উপাসনা করা হয়।

সোকিয়ানাস দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে ঈশ্বর সর্বোচ্চ প্রভূ। সর্বশক্তিমান তার একমাত্র গুণ নয়, তিনি সকল গুণের অধিকারী। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। সীমা- অসীমের পরিমাপ হতে পারে না। সুতরাং ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের সকল ধারণাই অপর্যাপ্ত এবং শুধু এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে ঈশ্বরের বিচার করা যায় না। ঈশ্বর স্বাধীন, স্ব-ইচ্ছা সম্পন্ন এবং মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত কোনো আইনের তিনি আওতাধীন নন। তার উদ্দেশ্য এবং তার ইচ্ছা মানুষের অগোচর। তিনি মানুষের এবং অন্য সকল বিষয়ের ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সম্পন্ন এবং সব কিছুই তার ইচ্ছাধীন। তিনি অন্তরের অন্তস্থলে লুকিয়ে রাখা গোপন কথাটিও জানেন। যিনি ইচ্ছামতো বিধি-বিধান তৈরি করেন এবং সৎকাজ ও অসৎ কাজের জন্য পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করেন। ব্যক্তি হিসেবে মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যত সে ক্ষমতাহীন।

সোকিয়ানাস বলেন, সকল কিছুর ওপর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সত্ত্বা একজনের বেশি হতে পারেন না। সুতরাং তিনজন সর্বশক্তিমানের কথা বলা অযৌক্তিক। ঈশ্বর একজনই, সংখ্যায়ও তিনি এক। ঈশ্বরের সংখ্যা কোনো ক্রমেই একাধিক নয়। প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সত্ত্বা রয়েছে। ঈশ্বর যদি সংখ্যায় তিনজনই হবেন তাহলে তিনটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা ও থাকার কথা। যদি এটাই বলা হয় যে, একটি মাত্র সত্ত্বাই বিরাজমান তাহলে এটাও সত্য যে, সংখ্যার দিক দিয়েও ঈশ্বর একজনই।

সোকিয়ানাস যে যুক্তি দিয়ে ত্রিত্ববাদের বিষয় খণ্ডন করেছেন তা হলো যীশুর একই সাথে দু’টি বৈশিষ্ট্য থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, একই ব্যক্তির মধ্যে দু’টি বিপরীত গুণ বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সত্ত্বার সমাবেশ ঘটতে পারে না। আর এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো মরণশীলতা ও অ-মরণশীলতা, আদি ও অনাদি, পরিবর্তন ও পরিবর্তনহীনতা। আবার দু’টি বৈশিষ্ট্য যার প্রতিটি একটি পৃথক ব্যক্তিসত্তা গঠনে সক্ষম, এক ব্যক্তির মধ্যে তাদের সমন্বয় করা যেতে পারে না। তাই একজনের পরিবর্তে প্রয়োজনের তাগিদেই এক্ষেত্রে দু’ব্যক্তির উদ্ভব ঘটে এবং পরিণতিতে দু’জনই যীশু খৃষ্টে পরিণত হন। একজন ঈশ্বর, অন্যজন মানুষ। চার্চ বলে যে, যীশুখ্রিস্টের ঐশ্বরিক ও মানবিক সত্ত্বা রয়েছে যেমনটি মানুষ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে গঠিত। সোকিয়ানাস জবাব দেন যে, উভয়ের মধ্যে তুলনা চলে না। কেননা একজন মানুষের ক্ষেত্রে দেহ ও আত্মা এমনভাবে সংযুক্ত যে, একজন মানুষ শুধু না আত্মা না শরীর। শুধু আত্মা বা শুধু দেহ দিয়ে কোনো মানুষ সৃষ্টি হয় না। পক্ষান্তরে ঐশীশক্তি নিজেই প্রয়োজনে একটি মানুষ সৃষ্টি করে। একইভাবে মানুষ নিজেও এক পৃথক ব্যক্তিকে সৃষ্টি করে।

সোকিয়ানাস বলেন, শুধু তাই নয়, এটা বাইবেলের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না যে, যীশুখৃষ্টের ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। প্রথমত, ঈশ্বর যীশুকে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত, বাইবেলের মতে তার সবই ঈশ্বরের দান। চতুর্থত, বাইবেলে সুষ্পষ্টভাবে আভাস দেওয়া হয়েছে যে, যীশু সকল অলৌকিক ঘটনার উৎস হিসেবে তার নিজের বা কোনো ঐশ্বরিক গুনের কথা উল্লেখ করেন নি, বরং ঈশ্বরকেই এসবের উৎস বলে ব্যক্ত করেছেন। যীশু নিজেও ঈশ্বরের ইচ্ছার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

রেলান্ড (Reland)- এর ‘হিষ্টারিকাল অ্যান্ড ক্রিটিকাল রিফ্লেকশনস আপন মোহামেডানিজম এন্ড সোকিয়ানিজম’ (Historical and Critical Reflections upon Mohammedanism and Socianism) গ্রন্থে রাকাভিয়ান ক্যাতেসিজম সম্পর্কিত বক্তব্যের কিছু অংশ নিচে দেওয়া হলো:

যিশুখ্রিস্টকে ঈশ্বর বলে বিশ্বাস করার কথা যারা বলেন তা শুধু সঠিক যুক্তির বিপরীতই নয়, এমনকি তা পবিত্র বাইবেলেও পরিপন্থী এবং যারা বিশ্বাস করে যে, শুধু পিতাই নন, তার পুত্র এবং পবিত্র আত্মাও একই ঈশ্বরের মধ্যে ত্রয়ী সত্ত্বা, তারাও মারাত্মক ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে… ঈশ্বরের সত্ত্বা অত্যন্ত সহজ এবং সম্পূর্ণ একক। সুতরাং তারা যদি তিন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হয়ে থাকেন তাহলে আরেকজন ঈশ্বরের কথা বলা একেবারেই পরস্পর বিরোধী এবং পিতা তার নিজস্ব সত্ত্বায় একটি সন্তানের জন্মদান করেছেন বলে আমাদের প্রতিপক্ষের দুর্বল ক্ষুদ্র যুক্তি উদ্ভট ও অপ্রাসঙ্গিক… নিসিয়ার কাউন্সিলের সময় পর্যন্ত সকল সময় এবং কিছু সময় পরও সমসাময়িকদের লেখায় পিতা ঈশ্বরকেই প্রকৃত ঈশ্বর বলে স্বীকার করা হত বলে দেখা যায়। যারা বিপরীত মতের অধিকারী ছিলেন, যেমন সাবেলিয়ান (Sabellian) এবং তার সমমনাদের প্রচলিত ধর্মমত বিরোধী বলে গণ্য করা হতো… যিশুখ্রিস্ট বিরোধী চেতনা খৃষ্টীয় চার্চের মধ্যে সবচাইতে বেশি মারাত্মক ভুলের প্রচলন করেছে এই মতবাদে যে ঈশ্বরের অত্যন্ত সহজ সত্ত্বায় রয়েছে তিন জন স্বতন্ত্র ব্যক্তি যাদের প্রত্যেকেই এক একজন ঈশ্বর এবং পিতাই শুধু একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর নন, পুত এবং পবিত্র আত্মাও অবশ্যই একই রকম ঈশ্বর। সত্যের এর চেয়ে অধিক অবাস্তব, অধিক অসম্ভব এবং অপলাপ আর হতে পারে না… খৃষ্টানরাও বিশ্বাস করে যে, যীশুখৃষ্ট আমদের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্যই মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আমাদের পাপের স্খালন করেছেন। কিন্তু এই মত মিথ্যা, ভ্রান্তিপূর্ণ ও ক্ষতিকারক।২৪

সোকিয়ানাস বলেছেন যে, ত্রিত্ববাদ গ্রহণের অন্যতম একটি কারণ হলো পৌত্তলিক দর্শন। টোল্যান্ডের “দি নাজারেনিস” (Nazarenes) গ্রন্থে সে আভাস দেওয়া হয়েছে:

সোকিয়ানাসের মতানুসারী এবং অন্যান্য একত্বাবাদীরা অত্যন্ত আস্থার সাথে বলেন যে, যারা ইয়াহূদী সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল না তারাই খৃষ্টধর্মে তাদের সাবেক একাধিক ঈশ্বরবাদ ও মৃত মানুষকে ঈশ্বরত্ব আরোপের মতবাদ প্রচলন করেছে: এগুলোতে খৃষ্টধর্মের নাম বহাল রয়েছে কিন্তু বিষয়ের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং সকল মত ও প্রথার সাথে সংগতি রেখে নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে এরা তা কাজে লাগাচ্ছে।২৫ এটা সুস্পষ্ট যে, সোকিয়ানাসের রচনা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছিল। তিনি জনসাধারণের কাছে যীশু কে ছিলেন এবং কী জন্য তিনি এসেছিলেন সে ব্যাপারে সঠিক চিত্রই শুধু তুলে ধরেননি, উপরন্তু মানুষের ওপর চার্চ যে বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করত, তার অধিকাংশই ধ্বংস করেছিলেন। সোকিয়ানাসের শ্রেষ্ঠত্ব এখানে যে তিনি এমন এক ধর্মমতের ধারক ছিলেন যা ছিল যৌক্তিক এবং বাইবেলভিত্তিক। তার বিরোধীদের পক্ষে তার মতামত বাতিল করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা বলা যায়। ১৬৮০ খৃস্টাব্দে রেভারেন্ড জর্জ অ্যাশওয়েল (Ashwell) যখন দেখলেন যে, সোকিয়ানাসের গ্রন্থগুলো তার ছাত্রদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তখন তিনি নিজে সোকিয়ান ধর্মের ওপর একটি গ্রন্থ রচনার সিদ্ধান্ত নেন। সোকিয়ানাস সম্পর্কে তার মূল্যায়ন অত্যন্ত

কৌতুহলোদ্দীপক যেহেতু তিনি এ মূল্যায়ন করেছেন একজন শত্রু হিসেবে:

এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক এক অত্যন্ত মহৎ ব্যক্তি যার মধ্যে সকল গুণের সমাবেশ ঘটেছিল এবং তিনি মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। যাদের সাথে তিনি কথা বলতেন তাদের সকলকেই তিনি মুগ্ধ করতেন। তিনি সকলের মনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ছাপ রেখেছিলেন। তিনি তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। তার যুক্তি বিন্যাস ছিল অত্যন্ত জোরালো, তিনি ছিলেন বিরাট বাগ্মী। তার সদ্গুণ সকলের কাছেই ছিল অসাধারণ। তার মহৎ চরিত্র ও জীবন ছিল উদাহরণযোগ্য এবং সে কারণেই তিনি মানুষের শ্রদ্ধা লাভ করেছেন।

এসব কথা বলার পর অ্যাশওয়েল বলেছেন যে, কোসিয়ানাস ছিলেন “শয়তানের বড় ফাঁস বা ফাঁদ।”২৬

তবে আজকের দিনে বহু খৃষ্টানই সোকিয়ানাস সম্পর্কে রেভারেন্ড অ্যাশওয়েলের স্ববিরোধী মন্তব্যের সাথে একমত নন। কার্যত সোকিয়ানাসের প্রতি সহানুভূতি ব্যাপকভাবে বাড়ছে। যে নির্মমভাবে এই মতবাদ দমন করা হয়েছিল তাতে অনেকের সহানুভূতিরই উদ্রেক করে। উপরন্তু ত্রিত্ববাদের প্রতি সুনির্দিষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বহু চিন্তাশীল খৃষ্টান সোকিয়ানাসের বিশ্বাসকে সমর্থন এবং যীশুখৃষ্টকে ঈশ্বর ঘোষণার ধর্মমতকে প্রত্যাখ্যান করছেন।

জন বিডল (John Biddle) ১৬১৫-১৬৬২ খৃ.

ইংল্যান্ডে একত্ববাদের জনক জন বিডল ১৬১৫ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি বিদ্যাবুদ্ধিতে তার শিক্ষকদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন এবং নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণতি হয়েছিলেন বলে বর্ণিত আছে।২২ তিনি ১৬৩৪ খৃস্টাব্দে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৬৩৮ খৃস্টাব্দে তিনি বি.এস. এবং ১৬৪১ খৃস্টাব্দে এম.এস. ডিগ্রি লাভ করেন। অক্সফোর্ড ত্যাগের পর তিনি গ্লুচেষ্টারে সেণ্ট মেরি দ্যা ক্রিপস ফ্রি স্কুলে শিক্ষক নিযুক্ত হন। এখানে তিনি তার ধর্ম বিশ্বাস পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেন এবং এ পর্যায়ে ত্রিত্ববাদী ধর্মমতের বৈধতার ব্যাপারে তার মনে সন্দেহ জাগতে শুরু করে। সে সময় সোকিয়ানাসের মত ও রচনা ইংল্যান্ডে পৌঁছতে শুরু করেছিল। তিনিও ইউরোপীয় একত্ববাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হন। রাজা জেমসকে উৎসর্গ করা রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম এর ল্যাটিন ভাষায় অনুদিত একটি গ্রন্থ ইংল্যান্ডে প্রেরণ করা হয়। ১৬১৪ খৃস্টাব্দে জল্লাদ প্রকাশ্যে তা পুড়িয়ে দেয়। যদিও গ্রন্থটি পুড়িয়ে ফেলা হয় কিন্তু তার বিষয়বস্তু জনমনে আগ্রহের সৃষ্টি করে। এ ঘটনার নিন্দা জানানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ক্রমওয়েলের অধীনে কাউন্সিল অব ষ্টেট কর্তৃক জন ওয়েনকে সোকিয়ানাসের ধর্মমত খণ্ডনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, ভেবো না যে, এসব জিনিসের সাথে তোমাদের সম্পর্ক অতি সামান্য। শয়তান এখন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন ইংল্যান্ডের একটি নগর, শহর বা গ্রামও নেই যেখানে এ বিষয়ে কিছু না কিছু অংশ ছড়িয়ে পড়ে নি।২৮

চার্চের গৃহীত ধর্মমত সমুন্নত রাখার এ চেষ্টা বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। ইউলিয়াম লিলিংওয়ার্থ (১৬০২-১৬৪৪খৃ.) মানুষের নির্যাতন, পুড়িয়ে মারা, অভিশাপ প্রদান ও ক্ষতি করার মত অপকর্মগুলোকে ঈশ্বর কর্তৃক মানুষের জন্য নির্ধারিত নয় বলে নিন্দা করেন। ২৯ জেরেমি টেলর ও মিলটন উভয়েই বলেন যে, ধর্ম বিশ্বাসের অনুসরণ ধর্মদ্রোহিতা নয়। কেউ যদি অসৎ উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত হয় তাহলে সেটাই ক্ষতিকর।৩০ এ বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ত্রিত্ববাদের অনুসারীরা আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৬৪০ খৃস্টাব্দে জুন মাসে ক্যান্টারবেরি ও ইয়র্কের সম্মেলনে সোকিয়ানাসের গ্রন্থসমূহের আমদানি, মুদ্রণ ও বিতরণ নিষিদ্ধ দেওয়া হয় এবং হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয় যে, এ ধর্মমতে কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে গির্জা হতে বহিষ্কার করা হবে। একদল লেখক ও বুদ্ধিজীবী এ সিদ্ধান্তের নিন্দা করলেও ফলপ্রসূ হয় নি।

পুনর্মূল্যায়ন ও নতুন পরীক্ষার এ পরিবেশে বিশেষ করে ত্রিত্ববাদসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিডলের নিজের মতেও পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি তার উপলব্ধ বিশ্বাস সম্পর্কে খোলাখুলি কথাবার্তা বলতে থাকেন। এর ফল হিসেবে ম্যাজিষ্ট্রেটগণ ১৬৪৪ খৃস্টাব্দে তাকে লিখিতভাবে ধর্মীয় স্বীকারোক্তির নির্দেশ প্রদান করেন। খুব সহজ ভাষায় তিনি সেটা করেন। আমি বিশ্বাস করি ঈশ্বর নামে একজনই সর্বশক্তিমান সত্ত্বা রয়েছেন। সুতরাং ঈশ্বর একজনই।৩১

বিডল এ সময় একটি প্রচারপত্রও প্রকাশ করেন। এর শিরোনাম ছিল, “পবিত্র আত্মার ঈশ্বরত্ব খণ্ডন করে ১২ টি যুক্তি” (Twelve Arguments Refuting the Deity of the Holy Spirit) “খৃষ্টান পাঠক সমাজকে সম্বোধন করে এটি প্রকাশ করা হয়। ১৬৪৫ খৃস্টাব্দে এ গ্রন্থটি আটক এবং বিডলকে কারাগারে অন্তরিন করা হয়। তাকে পার্লামেন্টের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য তলব করা হয়, কিন্তু তিনি পবিত্র আত্মাকে ঈশ্বর হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ১৬৪৭ খৃস্টাব্দে তিনি আবার প্রচারপত্র পুনর্মুদ্রণ করেন। এ বছরই ৬ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট প্রচারপত্রগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য জল্লা­দকে নির্দেশ দেয় এবং তা পালিত হয়। ১৬৪৮ সালের ২ মে এক কঠোর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে বলা হয় যে, কেউ যদি ত্রিত্ববাদে, অথবা যীশু অথবা পবিত্র আত্মাকে অস্বীকার করে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।

যে গ্রন্থের কারণে এই কঠোর শাস্তির বিধান জারি করা হয়, সেই “টুয়েলভ আর্গুমেন্টস” এর সারাংশ নিম্নরূপ:

যে ঈশ্বর থেকে পৃথক সে ঈশ্বর নয়

পবিত্র আত্মা ঈশ্বর থেকে পৃথক

অতএব, পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নয়।

বিডল নিম্নোক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে এ যুক্তির ব্যাখ্যা প্রদান করেন:

প্রধান সূত্রটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, যদি আমরা বলি পবিত্র আত্মাই ঈশ্বর এবং তারপর যদি তাকে ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র, সমগ্র বাইবেল তা দ্বারা সমর্থিত। পবিত্র আত্মা ব্যক্তি হিসেবে ঈশ্বর থেকে ভিন্ন কিন্তু সত্ত্বা হিসেবে নয়, এরূপ যুক্তিই যুক্তি বিরুদ্ধ।

প্রথমত, কোনো মানুষের পক্ষে ঈশ্বর সত্ত্বা থেকে ব্যক্তিকে পৃথক করা এবং তার মনে দু’টি বা তিনটি সত্ত্বাকে ঠাঁই দেওয়া অসম্ভব। এর ফল হিসেবে সে দু’জন ঈশ্বর রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিকে যদি ঈশ্বরের সত্ত্বা থেকে পৃথক করা হয় তখন ব্যক্তি এক ধরনের স্বাধীন বস্তু হয়ে উঠবে এবং তা হয় সীমাবদ্ধ নয় অ-সীমাবদ্ধ হবে। যদি সীমাবদ্ধ হয় তাহলে ঈশ্বরও একজন সীমাবদ্ধ সত্ত্বা যেহেতু চার্চ অনুসারে ঈশ্বরের মধ্যকার সবকিছুই স্বয়ং ঈশ্বর। সুতরাং এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হবে অবাস্তব। যদি অ-সীমাবদ্ধ হয় তাহলে ঈশ্বরের মধ্যেও দু’জন অ-সীমাবদ্ধ ব্যক্তি থাকবেন অর্থাৎ দু’জন ঈশ্বর যা আগের যুক্তির চেয়ে আরো অবাস্তব।

তৃতীয়ত, ঈশ্বর সম্পর্কে নৈর্ব্যক্তিক কিছু বলা হাস্যকর যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তি কর্তৃক একথা স্বীকৃত যে, ঈশ্বর একজন ব্যক্তির নাম যিনি সর্বশক্তিমান শাসনকারী… একজন ব্যক্তি ছাড়া কেউ অন্যদের ওপর শাসন বিস্তার করতে পারে না। সুতরাং তাকে ব্যক্তির বদলে অন্য কিছু হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ তিনি যা নন তাকে সে হিসেবে গণ্য করা।

যিনি ইসরাইলদের পবিত্র আত্মা দিয়েছিলেন তিনি যিহোভা

সুতরাং পবিত্র আত্মা যিহোভা বা ঈশ্বর নন।

যিনি নিজের কথা বলেন না তিনি ঈশ্বর নন।

পবিত্র আত্মা নিজের কথা বলেন না।

সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

যিনি শিক্ষা লাভ করেন তিনি ঈশ্বর নন

যিনি কি বলবেন তা অন্যের

কাছ থেকে শোনেন সেটাই হলো শিক্ষা

যীশুখৃষ্ট তাই বলতেন যা তাকে বলা হত।

সুতরাং যীশু ঈশ্বর নন।

এখানে বিডল জনের গসপেল (৮: ২৬) উদ্ধৃত করেছেন যেখানে যীশু বলেছেন: “আমি তার (ঈশ্বর) কাছ থেকে যা শুনেছি সে সব কথাই বলি।”

জনের গসপেল-এ (১৬: ১৪) যীশু বলেন,

ঈশ্বর তিনি যিনি সকলকে সব কিছু দিয়েছেন।

যিনি অন্যের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ

করেন তিনি ঈশ্বর নন।

যিনি অন্য কর্তৃক প্রেরিত তিনি ঈশ্বর নন।

পবিত্র আত্মা ঈশ্বর প্রেরিত।

সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

যিনি সবকিছু দিতে পারেন না তিনি ঈশ্বর নন।

যিনি ঈশ্বরের দান, তিনি সর্বদাতা নন

তিনি নিজেই ঈশ্বরের প্রদত্ত দান

কিছু দান করা দাতার শক্তি ও নিজস্ব ইচ্ছাধীন

সুতরাং এটা কল্পনা করাই অবাস্তব

যে ঈশ্বর কারো শক্তি ও ইচ্ছাধীন।

এখানে বিডল প্রেরিতদের কার্যাবলী ১৭: ২৫ উদ্ধৃত করেছেন: ঈশ্বর সকলকে দিয়েছেন প্রাণ, শ্বাস- প্রশ্বাস এবং সবকিছু।

যিনি স্থান পরিবর্তন করেন তিনি ঈশ্বর নন

পবিত্র আত্মা স্থান পরিবর্তন করেন

সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

বিডল এই যুক্তির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে: “যদি ঈশ্বর স্থান পরিবর্তন করেন তাহলে যেখানে তিনি আগে ছিলেন সেখানে তিনি থাকবেন না এবং যেখানে তিনি আগে ছিলেন না সেখানে যাত্রা শুরু করবেন। এটা তার সর্বত্র বিরাজমান থাকা ও ঈশ্বরত্বের বিরোধী। সুতরাং যীশুর কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি ঈশ্বর নন বরং ঈশ্বরের নামে একজন স্বর্গীয় দূত।

যিনি সিদ্ধান্তের জন্য যীশুর কাছে প্রার্থনা

করেন তিনি ঈশ্বর নন

পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

রোমীয় ১০: ১৪ এ বলা হয়েছে:

“যার কথা তারা শোনেনি তাকে তারা কীভাবে বিশ্বাস করবে? মানুষ

যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে নি, তবুও ছিল তারা অনুসারী।”

যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপিত হয় নি তিনি ঈশ্বর নন।

মানুষ পবিত্র আত্মার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে নি

তবুও তারা তার অনুসারী

সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

যিনি অন্যের মারফত ঈশ্বরের কথা জানতে পারেন. যেমন যীশু, তিনি যা বলবেন তা ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র।

যিনি ঈশ্বরের কাছ থেকে নির্দেশ গ্রহণ করেন

ও বলেন তা ঈশ্বরের শিক্ষা

পবিত্র আত্মা সেটাই করেন

অতএব পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

ঈশ্বর থেকে যিনি স্বতন্ত্র ইচ্ছা রাখেন তিনি ঈশ্বর নন

পবিত্র আত্মা ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র ইচ্ছা রাখেন

সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

এখানে বিডল রোমীয় ৮: ২৬-২৭ উদ্ধৃতি করেছেন যাতে বলা হয়েছে: “অনুরূপভাবে পবিত্র আত্মা আমাদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন, কারণ আমরা তা জানতাম না। পবিত্র আত্মা আমাদের জন্য কাতরভাবে প্রার্থনা করেছেন… ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী সাধু- সন্তদের জন্যও তিনি সুপারিশ করেছেন।”

বিডল নিউ টেস্টামেন্টের একটি শ্লো­কও আলোচনা করেছেন যা প্রতিষ্ঠিত চার্চ ত্রিত্ববাদের ব্যাপারে তাদের সমর্থনে উদ্ধৃত করে থাকে। তা হলো জনের গসপেলে (৫ : ৭) বলা হয়েছে: “৩টি বিষয় রয়েছে যা ঐশী। সেগুলো হলো পিতা ঈশ্বর, বাণী ও পবিত্র আত্মা। আর এই তিনে মিলে এক।” বিডল বলেন, এ শ্লো­ক সাধারণ জ্ঞানে পরস্পর বিরোধী। উপরন্তু তা ধর্মগ্রন্থগুলোর অন্যান্য শ্লোকেরও বিরোধী। তাছাড়া এটা তাদের ঐকমত্যকেই তুলে ধরে, কখনোই সত্ত্বার নয়। তদুপরি, এমনকি প্রাচীন গ্রীক গসপেলেও এ শ্লোকটি দেখা যায় না যেমন তা নেই সিরীয় অনুবাদে এবং অতি প্রাচীন ল্যাটিন সংস্করণে। তাই মনে হয় যে, এ শ্লে­াকটি সংযোজন করা হয়েছে এবং সে কারণে প্রাচীন ও আধুনিক কালের ব্যাখ্যাকার গণ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ৩২

১৬৪৮ সালের আইন সত্ত্বেও বিডল এরা দু’টি গ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং এ কারণে হয়তো তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হত যদি না পার্লামেন্টের কয়েকজন নিরপেক্ষ সদস্য তাকে সাহায্য করতেন। একটি পুস্তিকার নাম ছিল “এ কনফেশন অব ফেইথ টাচিং দি হলি ট্রিনিটি অ্যাকর্ডিং টু দি স্ক্রিপচার” (A confession of Faith Touching the Holy Trinity According to the Scirpture)। ৬টি প্রবন্ধ নিয়ে এ গ্রন্থটি প্রণীত হয়েছিল। প্রতিটি প্রবন্ধই রচিত হয়েছিল বাইবেলের উদ্ধৃতি ও তার যুক্তি-তর্ক দিয়ে। ভূমিকায় তিনি ত্রিত্ববাদী ধর্মমতের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির কথা বলিষ্ঠতার সাথে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন যে, ত্রিত্ববাদীদের ব্যবহৃত যুক্তিসমূহ খৃষ্টানদের চেয়ে জাদুকরদের জন্য বেশি উপযুক্ত। ৩৩ বিডল এর এই “কনফেশন অব হেইথ” গ্রন্থের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো:

আমি বিশ্বাস করি যে, একজন সর্বোচ্চ ঈশ্বর রয়েছেন যিনি স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা এবং সকল বস্তুর মূল উৎস এবং তিনিই আমদের চূড়ান্ত বিশ্বাস ও প্রার্থনার লক্ষ্য। আমি যীশুতে বিশ্বাস করি এ পর্যন্ত যে, তিনি আমাদের ভাই হতে পারেন এবং আমাদের দুর্বলতার প্রতি তার রয়েছে সহানুভূতি যে কারণে আমাদের সাহায্যের জন্য তিনি অধিক প্রস্তুত। তিনি একজন মানুষ মাত্র। তিনি স্রষ্টার অধীন। তিনি অন্য একজন ঈশ্বর নন। ঈশ্বর দু’জন নয়।

পবিত্র আত্মা একজন স্বর্গীয় দূত যিনি তার মহত্ত্ব ও ঈশ্বরের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ঈশ্বরের বাণী বহনের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।৩৪

এ সময় বিডল অন্য যে গ্রন্থটি প্রকাশ করেন সেটির নাম ‘দি টেস্টিমনিজ অব ইরানিয়াস, জাস্টিন মার্টিয়ার কনসার্নিং ওয়ান গড অ্যান্ড দি পারসনস অবদি হলি ট্রিনিটি (Testimonies of Iraneus, Justin Martyr Etc. Conerning one God and the Persons of the Holy Trinity)।

কারাগারে দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর একজন ম্যাজিস্ট্রেট বিডলের জামিন মঞ্জুর করেন এবং তিনি কারামুক্ত হন। নিরাপত্তার কারণে উক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের নাম গোপন রাখা হয়। কিন্তু বিডল বেশিদিন মুক্ত জীবন কাটাতে পারেন নি। তাকে আবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর পরপরই ম্যাজিস্ট্রেট পরলোকগমন করেন। তিনি বিডলের জন্য সামান্য সম্পদ রেখে যান। কারা জীবনের ব্যায় মেটাতে খুব শিগগিরই তা নিঃশেষ হয়ে যায়। কিছুকালের বিডলের আহার সকাল ও সন্ধ্যায় সামান্য পরিমাণ দুধে মাত্র এসে ঠেকে। তবে এ সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় বাইবেলের গ্রীক অনুবাদের একটি নতুন সংস্করণের প্রুফ দেখে দেওয়ার জন্য লন্ডনের একজন প্রকাশক তাকে প্রুফরিডার নিযুক্ত করায় বিডলের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে। ১৬৫২ খৃস্টাব্দে ক্ষমা প্রদর্শন আইন পাস হলে বিডল মুক্তি লাভ করেন। এ বছরই আমষ্টার্ডামে রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম এর একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অবিলম্বেই তা ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

বিডল ১৬৫৪ খৃস্টাব্দে আমষ্টার্ডামে একত্ববাদ বিষয়ে পুনরায় একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ইংল্যান্ডে এ গ্রন্থটিও ব্যাপকভাবে পঠিত হয়। স্বাধীন জীবনের এ সময়কালটিতে বিডল প্রতি রবিবার তাদের নিজস্ব রীতিতে ঈশ্বরের উপাসনার জন্য অন্যান্য একত্ববাদীর সাথে মিলিত হতেন। এতে যারা যোগদান করতেন তারা আদি পাপের ধারণা ও প্রায়শ্চিত্ত মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। ১৬৫৪ খৃস্টাব্দে ১৩ ডিসেম্বর বিডলকে পুনরায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাকে কলম, কালি ও কাগজ প্রদান নিষিদ্ধ করা হয় এবং কোনো দর্শনার্থীকেও তার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দেওয়া হয় নি। তার সব গ্রন্থ জ্বালিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি আপিল করেন এবং ১৬৫৫ খৃস্টাব্দে ২৮ মে মুক্তি পান।

অল্পদিনের মধ্যেই বিডল পুনরায় কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। একটি প্রকাশ্য বিতর্ক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। বক্তা বিতর্কের শুরুতেই জিজ্ঞাসা করেন যে, যীশুকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর বলে অবিশ্বাস করেন এমন কোনো ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত আছেন কিনা। বিডল সাথে সাথে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন: আমি অবিশ্বাস করি। তিনি তার বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দিতে শুরু করেন। তার প্রতিপক্ষ সেসব যুক্তি খণ্ডন করতে পারলেন না। তখন বিতর্ক বন্ধ এবং অন্য দিন তা পুনরায় অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিডলকে কর্তৃপক্ষের কাছে নেওয়া হয়। বিতর্কের নির্ধারিত দিনের একদিন আগে আবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। সম্ভবত সে সময় এমন কোনো আইন সেখানে বলবৎ ছিল না যার বলে তাকে শাস্তি দেওয়া যেত। তার বন্ধুরা একথা জানতেন বলে সরাসরি ক্রমওয়েলের কাছে আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা একটি আবেদন পত্র প্রস্তুত করে ক্রমওয়েলের কাছে প্রেরণ করেন। কিন্তু তার কাছে পৌঁছানোর আগে সে আবেদন পত্রটি এমনভাবে পরিবর্তিত ও বিকৃত করা হয় যে আবেদনকারীরা সেটাকে জাল বলে প্রকাশ্যে দায়িত্ব অস্বীকার করেন।

ক্রমওয়েল এই জটিল অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পন্থা হিসেবে ১৬৫৫ খৃস্টাব্দে ৫ অক্টোবর বিডলকে সিসিলিতে নির্বাসিত করেন। তাকে বাকি জীবন সেন্ট মেরি ক্যাসলের কারাগারে থাকতে হবে এবং বার্ষিক ১০০ ক্রাউন ভাতা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। সেখানে কারাবন্দি থাকা কালে বিডল একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ:

               গুপ্ত সভার বৈঠক বসল, বিচারক নির্ধারিত হলো,

               মানুষ আরোহণ করল ঈশ্বরের সিংহাসনে

               এবং তারা একটি বিষয়ের বিচার করল

               যা শুধু একা তারই (ঈশ্বরের) শোভা পায়;

               একজন ভাইয়ের বিশ্বাসকে তারা বলল অপরাধ

               এবং তারা ধ্বংস করল চিন্তার মহৎ স্বাধীনতা।৩৬

বিডল যত বেশি অত্যাচারিত হলেন, চার্চ সমর্থিত ধর্মের ভ্রান্তিসমূহের ব্যাপারে তার মনোভাব তত বেশি দৃঢ় হলো। টমান ফারমিন অতীতেও বিডলকে সাহায্য করেছিলেন। তিনি বিডলকে সাহায্য করা অব্যাহত রেখে তাকে অর্থ সাহায্য দিতে থাকেন। এর ফলে কারাগারে তার জীবনযাত্রা যতটা সম্ভব আরামদায়ক হয়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে বিডলের প্রতি সহানুভূতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কারাগারে যতই দিন অতিবাহিত হতে থাকল তার জনপ্রিয়তা তত বেশি বাড়তে থাকল। সরকার ডা. জন ওয়েনকে বিডলের শিক্ষার প্রভাবের বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি এক জরিপ পরিচালনা করেন। এতে দেখা যায় যে, বিপুল সংখ্যক ইংরেজই একত্ববাদী। এরপর তিনি ১৬৫৫ খৃস্টাব্দে বিডলের ধর্মমতের জবাব প্রকাশ করেন। ক্রমওয়েলের পদক্ষেপ এক দিক দিয়ে বিডলকে সাহায্য করে। সরকার প্রদত্ত ভাতায় বিডল ছিলেন তার শত্রুদের নাগালের বাইরে। গভীর চিন্তা ও প্রার্থনার মধ্যে তার দিন অতিবাহিত হতো। ১৬৫৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সেন্ট মেরির দুর্গে (Castle of St. Mary) বন্দী জীবন কাটান। এ বছর তার মুক্তির ব্যাপারে চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি মুক্তি লাভ করেন।

কারাগার থেকে বাইরে আসার পর পরই বিডল জনসভা করতে শুরু করেন। এসব সভায় তিনি ঈশ্বরের একত্ব সম্পর্কে এবং ত্রিত্ববাদের অসারতা বিষয়ে বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি- ব্যাখ্যা দিতেন। এসব জনসভা এক পর্যায়ে প্রার্থনা সভায় পরিণত হয়। ইংল্যান্ডে আগে কখনো এমনটি দেখা যায় নি।

১৬৬২ খৃস্টাব্দে এক সভা চলার মাঝপথে বিডল ও তার কয়েকজন সঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের সবাইকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। তখন এমন কোনো আইন ছিল না যাতে তাদের শাস্তি দেওয়া যায়। তাই সাধারণ আইনেই তাদের বিচার করা হয়। বিডলকে একশত পাউন্ড জরিমানা করে উক্ত অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কারাগারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার সহযোগী বন্ধুদের প্রত্যেককে ২০ পাউন্ড করে জরিমানা করা হয়। কারাগারে বিডলের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং তাকে বন্দী রাখা হয় এক নির্জন প্রকোষ্ঠে। কারাগারের দূষিত বাতাস এবং নিঃসঙ্গতা মিলে তাকে রোগগ্রস্ত করে তোলে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। ১৬৬২ খৃস্টাব্দে ২২ সেপ্টেম্বর তাকে সমাহিত করা হয়।

যে বছর বিডলের মৃত্যু হয়, সে বছরই কার্যকর হয় সমরূপ বিধান আইন (Act of Uniformity)। এর অর্থ হলো বিডল যে প্রকাশ্য উপাসনা সভার পদ্ধতি প্রচলন করেছিলেন তা বন্ধ করে দেওয়া। এ আইনে ২,২৫৭ জন যাজককে তাদের জীবিকা চ্যুত করা হয়। তাদের পরিণতি অজ্ঞাত। তবে এটা জানা যায় যে, ত্রিত্ববাদকে মেনে নিতে অস্বীকার করায় ইংল্যান্ডে এসময় ৮ হাজার মানুষ কারাগারের অন্তরালে প্রাণ হারায়। বিডলের এক স্মৃতি কথার এক লেখক নিরাপত্তার কারণে তার নাম অজ্ঞাত রাখেন যদিও তিনি তা লিখেছিলেন বিডলের মৃত্যুর বিশ বছর পর। যাহোক, এতকিছুর পরও একত্ববাদ একটি ধর্মমত হিসেবে টিকে থাকে এবং অনুসারীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। চার্চের ধর্মে মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্য বল প্রয়োগ করা হয়। পরিণতিতে তা সোকিয়ানাস ও বিডলের প্রচারিত মতের অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সে যুগের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদগণ যেমন মিলটন, স্যার আইজাক নিউটন ও লক এর মত ব্যক্তিরা এক ঈশ্বরে আস্থা ব্যক্ত করেন।

একত্ববাদ নির্মূলের জন্য কর্তৃপক্ষ যে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, সংশ্লি­ষ্ট আইন জারি থেকে তার মোটামুটি পরিচয় পাওয়া যায়। ১৬৬৪ খৃস্টাব্দে এক আইনে চার্চে যেতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী সকল লোককে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়। কেউ ফিরে এলে তার জন্য ছিল ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড। চার্চের অনুমতি ছাড়া পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির উপস্থিতি সম্পন্ন চার্চের অননুমোদিত কোনো ধর্মীয় সভায় যোগদান করলে তাকে জরিমানা করা হত। কেউ যদি এ অপরাধ দ্বিতীয়বার করত তাকে আমেরিকায় নির্বাসনে পাঠানো হত। কেউ ফিরে এলে বা পলায়ন করলে তার শাস্তি ছিল যাজক- সুবিধাহীন মৃত্যুদণ্ড। ১৬৭৩ খৃস্টাব্দে জারিকৃত টেস্ট অ্যাক্টে (Test Act) বলা হয়, ১৬৬৪ খৃস্টাব্দে আইনে উল্লি­খিত শাস্তি ছাড়াও যারা চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রচলিত ধর্মানুষ্ঠান পালন করবে না তারা আদালতে কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে না অথবা কোনো বিচার পাবে না। সে এরপর থেকে কোনো শিশুর অভিভাবক হতে পারবে না, কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে না, কোনো সম্পদের বা কোনো কর্মের বা কোনো দানকৃত সম্পদের অধিকারী হতে পারবে না। কেউ যদি এই আইনের অধীনে উল্লি­খিত কোনো কাজ করার চেষ্টা করে তাহলে তাকে ৫শ’ পাউন্ড জরিমানা করা হবে। ১৬৮৯ খৃস্টাব্দে সহিষ্ণুতা আইন (Toleration Act) জারি হয়। কিন্তু ত্রিত্ববাদ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদেরকে এই আইনের সুবিধা দেওয়া হয় নি। একত্ববাদীরা সহিষ্ণুতা আইনের অসহিষ্ণুতার নিন্দা করেন। পার্লামেন্ট একত্ববাদকে এক ঘৃণ্য ধর্মবিরুদ্ধতা (Obnoxious heresy) আখ্যায়িত করে এর জবাব দেয়। এ অপরাধের শাস্তি ছিল সকল নাগরিক অধিকার বিলোপসহ ৩ বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু এত কিছু করেও মানুষের মন থেকে বিডলের প্রচারিত ধর্মমত অপসারণ করা যায় নি যদিও এসব আইনের ফলে বহু লোকের প্রকাশ্য ধর্ম বিশ্বাস ব্যক্ত করা বাধাগ্রস্ত হয়। যাদের পক্ষে আইন অমান্য ও প্রকাশ্যে ত্রিত্ববাদের নিন্দা করা সম্ভব ছিল না তারা তাদের ধর্মমতের প্রতি বিরোধিতা শান্ত করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকার পন্থা গ্রহণ করে। কেউ কেউ এথানাসিয়ান ধর্মমতের যে অংশ তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য, সে অংশটুকু বাদ দেয়। কেউ কেউ তা ‘প্যারিস ক্লার্ক’ (Parish Clerk) কে (জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ প্রভৃতির তারিখ ও বিবরণ লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত গির্জার কেরানি) দিয়ে তা পাঠ করাত। জানা যায় যে, এক ব্যক্তি একটি জনপ্রিয় শিকার সংগীতের সুরে এটি গাওয়ার মাধ্যমে তার অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। অন্য এক যাজক আইন অনুমোদিত ত্রিত্ববাদ ধর্মমত পাঠের পূর্বে বলেন, ভাইসব! এটা সেন্ট এথানাসিয়াসের ধর্মমত, কিন্তু ঈশ্বর না করুক, এটা যেন অন্যান্য মানুষের ধর্মমত না হয়।৩৭ তবে সাধারণত: একত্ববাদীরা প্রকাশ্যে তাদের ধর্মমত ঘোষণা করার সাহস করতেন না।

বিডল ছিলেন একজন পরিশ্রমী পণ্ডিত এবং তার বক্তব্য ছিল তার গভীর অধ্যয়নের ফল। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, অকুতোভয়ে সত্যের বাণী প্রকাশ ও প্রচারের ভিতর দিয়ে তিনি মানুষের সেবা করতে পারবেন। যদি তার পরিণতি হয় নিন্দা ও নির্যাতন, তবে তাই হোক। তিনি দরিদ্র, কারাদণ্ড বা নির্বাসনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন জনসাধারণ দুর্ণীতিগ্রস্থ চার্চ ত্যাগ এবং যে কোনো ভ্রান্তিকে প্রত্যাখ্যান করুক। তার ছিল আত্মত্যাগের সাহস।

মিলটন (Milton) ১৬০৮-৭৪ খৃ.

মিলটন ছিলেন বিডলের সমসাময়িক। বিডলের মতের সাথে তার বহু মিল ছিল, কিন্তু তিনি বিডলের মত স্পষ্টভাষী ছিলেন না। করাগারে তিনি নিক্ষিপ্ত হতে চাননি। “ট্রিটিজঅব ট্রু রিলিজিয়ান” (Treatise of True Religion) নামক দু’খণ্ডের এক গ্রন্থে তিনি বলেন, আরিয়ান ও সোকিয়ানরা ত্রিত্ববাদের বিরোধী বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তারা বাইবেল এবং প্রেরিতদের ধর্মমত অনুযায়ী পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মায় বিশ্বাস করতে হবে। ত্রিত্ববাদে ব্যক্ত ত্রি-ঈশ্বর সহ-সত্তা, ত্রি-ব্যক্তিত্বকে তারা ধর্মযাজকদের আবিষ্কার হিসেবে গণ্য করে এবং বলে যে, ধর্মগ্রন্থে এসব নেই। তাদের এ বিশ্বাস সাধারণ প্রটেস্টাণ্ট মতের মতই স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জল। সঠিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তারা এ উচ্চমার্গের বিষয়টি প্রকাশ করে যা জানা অত্যাবশ্যক। তারা মনে করে, ত্রিত্ববাদীদের তত্ত্বজ্ঞান সম্বলিত বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে রহস্যময় সূক্ষ্ম কৌশল, কিন্তু বাইবেলে তা সহজ এক মত মাত্র।৩৮

অন্য একটি গ্রন্থে তিনি আরো স্পষ্টভাবে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন যে, পোপ, কাউন্সিল, বিশপ ও যাজকদের অতি জঘন্য দুষ্কর্মকারী ও স্বৈরাচারীদের সারিতে শ্রেণিকরণ করা উচিৎ। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন আইন, অনুষ্ঠান ও মতবাদ হলো স্বাধীনতার ওপর অবাঞ্ছিত আগ্রাসন।৩৯

এ প্রখ্যাত কবি প্রকাশ্যে দেশের শাসন কর্তৃপক্ষকে অগ্রাহ্য করেন নি, কিন্তু তিনি নিজেকে চার্চের গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বেশ কিছু শীর্ষ বুদ্ধিজীবীর মত তিনিও চার্চে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মিলটন সম্পর্কে ডা. জনসন বলেছেন: তিনি প্রোটেষ্টাণ্টদের কোনো শাখার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি কী ছিলেন তা জানার চাইতে তিনি কী ছিলেন না, আমরা সেটাই জানি। তিনি চার্চ অব রোমের কিংবা চার্চ অব ইংল্যান্ডের অনুসারী ছিলেন না। প্রকাশ্যে তাকে উপাসনা করতে দেখা যায় নি। তার দৈনন্দিন সময়সূচিতে প্রতিটি ঘণ্টা ভাগ করা ছিল। সেখানে উপাসনার জন্য কোনো সময় রাখা ছিল না। তার কাজ এবং তার ধ্যানই ছিল তার উপাসনা।৪০

এটা স্পষ্ট যে, ডা. জনসন (Dr. Johnson) মিলটনের লেখা একটি গ্রন্থ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। কারণ, মিলটনের মৃত্যুর প্রায় দেড়শ’ বছর পর ১৮২৩ খৃস্টাব্দে এ গ্রন্থটি আবিষ্কৃত হয়। হোয়াইট হলে ওল্ড স্টেট পেপার অফিসে (Old state paper office in whitehall) পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কৃত হয়। এতে নাম ছিল: “এ ট্রিটিজ রিলেটিং টু গড” (A Treatise relating to God)। তিনি যখন ক্রমওয়েলের সেক্রেটারি ছিলেন তখনই এ গ্রন্থটি লেখা হয়। নিঃসন্দেহে, মিলটন তার জীবদ্দশায় এ গ্রন্থটি প্রকাশ হোক তা চাননি।

এ গ্রন্থের প্রথম খএণ্ডর দ্বিতীয় অধ্যায়ে মিলটন ঈশ্বরের গুণাবলি এবং নির্দিষ্টভাবে একত্ববাদ প্রসঙ্গে লিখেছেন:

“ঈশ্বরকে অস্বীকার করে এমন লোকের সংখ্যা একেবারে কম নয়। এসব নির্বোধেরা অন্তর থেকে বিশ্বাস করে যে, কোনো ঈশ্বর নেই” স্তোস্ত্র ১৪ : ১, অথচ ঈশ্বর মানুষের অন্তরে তার নিজের এমন বহু প্রশ্নাতীত নিদর্শনের ছাপ এঁকে দিয়েছেন এবং প্রকৃতির সর্বত্র তার পরিচয় এমনভাবে ছড়ানো রয়েছে যে বোধসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিই সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে না। এতে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না যে, বিশ্বের সব কিছুই সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত এবং তাতে রয়েছে এক চূড়ান্ত ও কল্যাণকর উদ্দেশ্য যা সাক্ষ্য দেয় যে, এক সর্বোচ্চ সুযোগ্য শক্তি অবশ্যই পূর্ব থেকে বিরাজমান যার দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিই এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য নির্ধারিত। ঈশ্বরের বাণী বাদ দিয়ে শুধু প্রকৃতি বা বুদ্ধিকে পথ নির্দেশক করে ঈশ্বর সম্পর্কে সঠিক চিন্তা করা যায় না। আমাদের মন যতটা ধারণ করতে পারে অথবা আমদের প্রকৃতির পক্ষে যতটা বহন করা সম্ভব, ঈশ্বর তার সম্পর্কে ততটাই প্রকাশ করেছেন…. ঈশ্বর সম্পর্কে যতটুকু জ্ঞান মানুষের পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন, তিনি তা পর্যাপ্ত পরিমাণে নিজ করুণায় প্রকাশ করেছেন… ঈশ্বরের নাম ও গুণাবলি হয় তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশক, নয় তার ঐশী শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।

মিলটন এরপর ঈশ্বরের কতিপয় গুণের বিবরণ দিয়েছেন: সত্য, সত্ত্বা, বিশালত্ব ও অসীমত্ব, চির স্থায়িত্ব, অপরিবর্তনীয়তা, ন্যায়পরায়ণতা, অমরত্ব, সর্বত্র বিদ্যমানতা সর্বশক্তিমত্তা এবং চূড়ান্তরূপে একত্ব। তিনি বলেন, উল্লি­খিত সকল গুণের সারবস্তু হলো তার একত্ব। এরপর মিলটন বাইবেল থেকে নিম্নোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন:

যিহোভা, তিনিই ঈশ্বর, তিনি ছাড়া আর কেউ নেই (দ্বিতীয় বিবরণ ৪: ৩৫)

যিহোভা, তিনিই স্বর্গ মর্তের ঈশ্বর, অন্য আর কেউ নেই।

(দ্বিতীয় বিবরণ ৫: ৩৯)

আমি, শুধু আমি, আমিই ঈশ্বর এবং আমার সাথে আর কোনো ঈশ্বর নেই।                                 (দ্বিতীয় বিবরণ ৩২ : ৩৯)

পৃথিবীর সকল মানুষের জানা প্রয়োজন যে, যিহোভাই ঈশ্বর এবং আর কোনো ঈশ্বর নেই।                               (১ রাজাবলি ৮ : ৬০)

তিনি ঈশ্বর, তিনি এক, তিনি বিশ্বের সকল সাম্রাজ্যের ঈশ্বর।

(২ রাজাবলি ১৯ : ১৫)

আমি ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর আছে? না, ঈশ্বর একজনই।

(যিশাইয় ৪৪ : ৮)

আমি যিহোভা এবং আমি ছাড়া কোনো ঈশ্বর নেই।

                                                                (যিশাইয় ৪৫ : ৫)

আমি ছাড়া কোনো ঈশ্বর নেই …. আমি ছাড়া আর কেউ নেই।

(যিশাইয় ৪৫ : ২১)

আমি ঈশ্বর এবং আর কেউ নেই।        (যিশাইয় ৪৫: ২২)

উপরোক্ত উদ্ধৃতিসমূহ প্রসঙ্গে মিলটন বলেন, অর্থাৎ ঈশ্বর ছাড়া আর কোনো সত্ত্বা, ব্যক্তি বা কোনো অস্তিত্ব নেই।

আমি ঈশ্বর, আর কেউ নয়। আমিই ঈশ্বর এবং আমার মত আর কেউ নেই। (যিশাইয় ৪৬: ৯)

মিলটন বলেন, “সংখ্যাতাত্ত্বিক একত্বের অভিন্ন ধারণায় সংখ্যাগত দিক দিয়ে একজন ঈশ্বর এবং একজন আত্মা রয়েছেন বলে ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টির লক্ষ্যে এর চাইতে সহজ, সুনির্দিষ্ট, গ্রহণযোগ্য আর কী পন্থা হতে পারে? এখানে প্রথমত এবং চূড়ান্তভাবে এটাই ছিল যথার্থ ও যুক্তিসংগত যে, জনসাধারণের মধ্যে নিম্নহার ব্যক্তিটির মস্তকও ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে অবনত করার জন্য ধর্মীয় বাণী এরূপ সহজ পন্থায় প্রচার করা হয় যে, তার মধ্যে কোনো অনিশ্চয়তা বা অস্পষ্টতা নেই। অন্যথায় উপাসনাকারীরা ভ্রান্তিতে কিংবা সন্দেহের মধ্যে নিপতিত হতে পারত। ইসরাঈলিরা তাদের বিধান ও নবীদের মারফত সর্বদাই একথা উপলব্ধি করেছে যে, সংখ্যাগত দিক দিয়ে ঈশ্বর একজনই এবং তার সম পর্যায়ের বা তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের আর কোনো ঈশ্বর নেই। তখন পর্যন্ত ধর্মগুরুদের আবির্ভাব হয় নি যারা তাদের নিজস্ব জ্ঞানবুদ্ধি ও সম্পূর্ণ স্ববিরোধী যুক্তির মাধ্যমে একত্ববাদী মতবাদকে বিকৃত করেছে যদিও ভান করে যে, তারা তা বজায় রাখতে চাইছে। কিন্তু সর্বশক্তিমান ঈশ্বর সম্পর্কে যে কথাটা সর্বজন গৃহীত তা হলো এই যে স্ববিরোধী হতে পারে এমন কিছু তিনি করতে পারেন না। সুতরাং এখানে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, ঈশ্বরের একত্বের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় এবং যা একই সাথে তার একত্ব ও একাধিকত্ব সম্পর্কিত, ঈশ্বর সম্পর্কে এমন কিছু বলা যায় না। (মার্ক ১৩ : ২৯-৩২) “হে ইসরাইলিরা শোন! আমাদের যিনি প্রভূ তিনিই ঈশ্বর একজনই এবং তিনি ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই।”

এরপর মিলটন পবিত্র আত্মার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বাইবেলে কী তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বাইবেলে কি তার বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি, কীভাবে তা অস্তিত্বশীল কিংবা কখন তার উদ্ভব- তার কিছুই বলা হয় নি। তিনি বলেন,

ধর্মের মত একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়ে বিশ্বাসীদের সামনে ধর্ম প্রবক্তাদের উচিৎ তার প্রাথমিক গুরুত্ব ও সন্দেহাতীত নিশ্চয়তা অথবা ধর্মগ্রন্থের সুস্পষ্ট সাক্ষ্যের চাইতে ভিন্ন কিছু উপস্থাপন না করা এবং বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে মানবিক বিবেচনায় তার প্রমাণ সম্পর্কে কোনো প্রকার সন্দেহের কোনো অবকাশ না থাকে বা কোনো সংশয় বা বিতর্কের বিষয়বস্তু যেন না হয়।

এরপর মিল্টন বাইবেলের আলোকে তার বক্তব্যের উপসংহার টেনেছেন: পবিত্র আত্মা সর্বজ্ঞ নয় এবং তা সর্বত্র বিরাজমানও নয়। একথা বলা যায় না যে, যেহেতু পবিত্র আত্মা ঈশ্বরের বাণী ও নির্দেশ বহন করে আনেন সে করণে তিনি ঈশ্বরের অংশ। যদি তিনি ঈশ্বরই হতেন তাহলে কেন পবিত্র আত্মাকে সান্ত্বনা দানকারী (Comforter) বলা হয় যিনি যীশুর পরে আসবেন, যিনি নিজের সম্পর্কে কিছু বলেন না কিংবা তার নিজের নামে কিছু বলেন না এবং যার শক্তি অর্জিত (জন ১৬ : ৭- ১৪)? সুতরাং এটা সুস্পষ্ট যে, ‘সান্ত্বনা দানকারী’ আসলে যীশুর পরে আগমনকারী একজন নবী, এ অর্থে তাঁকে গ্রহণ না করে এক সীমাহীন বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যেই তাকে পবিত্র আত্মা এমনকি ঈশ্বর বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ১৪

আরিয়াসের সাথে মিলটনও একমত যে, যীশু চিরন্তন নন। তিনি বলেন, যীশুকে সৃষ্টি করা বা না করা তা সম্পূর্ণই ছিল ঈশ্বরের ব্যাপারে। তিনি বলেন, যীশু “সময়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই” জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যীশুর ঐশ্বরিক জন্ম সম্পর্কিত মতবাদের সমর্থনে বাইবেলের একটি পঙক্তিও তিনি খুঁজে পান নি। যীশুকে ব্যক্তি হিসেবে ভিন্ন এবং সত্ত্বা হিসেবে ঈশ্বরের একজন হিসেবে গণ্য করা অদ্ভুত ও যুক্তি বিরোধী। এ মতবাদ শুধু যুক্তি বিরোধীই নয়, বাইবেলের সাক্ষ্য প্রমাণেরও বিরোধী। মিলটন ইসরাইলি জনগণের সাথে একমত পোষণ করেছেন যে, ঈশ্বর একজন ও অদ্বিতীয়। আর তা এতটাই সুস্পষ্ট যে, এর জন্য আলাদা কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। যে এক ঈশ্বর একজন স্ব- অস্তিত্ববান ঈশ্বর এবং যে সত্ত্বা স্ব-অস্তিত্ববান নয় সে ঈশ্বর হতে পারে না। তিনি উপসংহারে বলেন,

“বাইবেলের সহজ অর্থকে পরিহার অথবা আড়াল করার জন্য কতিপয় ব্যক্তি কি কৌশলপূর্ণ ধূর্ততা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে তা দেখে বিস্মিত হতে হয়।”৪২

মিলটন বলেন যে, পবিত্র আত্মা ঈশ্বর ও যীশুর চেয়েও ন্যূন স্থানীয় যেহেতু তার দায়িত্ব হলো একজনের বার্তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি নিজে কিছুই করতে পারেন না। তিনি সকল বিষয়ে ঈশ্বরের বান্দা ও অনুগত। ঈশ্বর কর্তৃক তিনি প্রেরিত হন এবং তাকে তার নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে দেওয়া হয় নি।

মিলটন উপলব্ধি করেছিলেন যে, তিনি এ মত প্রকাশ্যে ব্যক্ত করতে পারবেন না। কারণ তাতে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারত এবং তার অবস্থাও বিডল ও সমগোত্রীয় অন্যদের মত দুর্দশাপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ১৬১১ খৃস্টাব্দে মিলটনের জীবদ্দশায় মি: লেগাট ও মি: ওয়াইটম্যান (Legatt and wightman) নামক দু’ব্যক্তিকে রাজার অনুমোদনক্রমে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। তাদের অপরাধ ছিল যে, তারা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মাকে নিয়ে প্রচারিত ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা বিশ্বাস করতেন যে, যীশু যেমন ঈশ্বরের প্রকৃত স্বাভাবিক সন্তান নন তেমনি ঈশ্বরের সত্ত্বা, চিরন্তনতা ও সর্বময় ক্ষমতার অনুরূপ কোনো গুণ তার ছিল না। যীশু ছিলেন নিছক একজন মানুষ, একই ব্যক্তি সত্ত্বায় ঈশ্বর ও মানুষের সমন্বিত কিছু তিনি ছিলেন না।

মিলটন কেন তার জীবদ্দশায় নীরব ছিলেন, এ থেকেতা বুঝা যায়।

জন লক (John Locke) ১৬৩২-১৭০৪ খৃ.

সামাজিক চুক্তি বিষয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনার জন্য সুপরিচিত জন লোকও একত্ববাদী ছিলেন। কিন্তু তিনিও তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে ভীত ছিলেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এক পর্যায়ে তিনি ইংল্যান্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৬৮৮ সালের বিপ্ল­বের পর দেশে ফিরে তিনি নিশ্চিত করেন যে, তিনি সরাসরি চার্চ শক্তির বিরোধিতা করবেন না। কারণ এর ফলে আরো নিপীড়ন- নির্যাতনের আশঙ্কা ছিল। যুক্তি সমর্থনে তার পান্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থও চার্চ পছন্দ করে নি। অন্য একটি গ্রন্থ তাকে বেনামীতে প্রকাশ করতে হয়। যা হোক, জানা যায় যে, তিনি যীশু খৃষ্টের গোড়ার দিকের শিষ্যদের শিক্ষা অধ্যয়ন করেন এবং ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করার কোনো যুক্তি খুঁজে পান নি। তিনি বিজ্ঞানী নিউটনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তার সাথে এসব ব্যাপার নিয়ে তিনি আলোচনা করতেন যেগুলোর ব্যাপারে তার মত ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। লোক ও নিউটনের বন্ধু লী ক্লেয়ার বলেছেন, একদিকে এত দক্ষতা নিয়ে অথবা অন্যদিকে এত ভুল প্রতিনিধিত্ব, বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতা নিয়ে আর কোনো বিতর্কিত বিষয় এমনভাবে আলোচিত হয় নি। কথিত আছে যে, লকই ১৬৮৯ খৃস্টাব্দে সহিষ্ণুতা আইনের (Act of Toleration) প্রণেতা ছিলেন।

স্যার আইজাক নিউটন (Sir Isac Newton) ১৬৪২-১৭২৭ খৃ.

সুবিখ্যাত ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপের (Alexander pope) কবিতায় নিউটনের বর্ণাঢ্য জীবন চিত্রিত হয়েছে এভাবে:

       প্রকৃতি ও প্রকৃতির বিধান ঢাকা পড়ে ছিল রাতে

       ঈশ্বর বললেন “নিউটন সৃষ্টি হও”

       এবং সব আলোকিত হলো।”৪৩

নিউটন ছিলেন তাদেরই একজন যারা তাদের বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে ব্যক্ত করা বিচক্ষণতার পরিচায়ক বলে মনে করতেন না। ১৬৯০ খৃস্টাব্দে জন ৫ : ৭ ও তীমথীয় ৩ : ১৬ প্রসঙ্গে নিউ টেস্টামেন্টের বক্তব্যের বিকৃতি বিষয়ে তার মন্তব্য সংবলিত একটি ক্ষুদ্র প্যাকেট তিনি জন লকের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, যেহেতু এটা ইংল্যান্ডে প্রকাশ করা বিপজ্জনক সে কারণে জন লক তার পুস্তিকাটি ফরাসী ভাষায় অনুবাদ ও ফ্রান্সে প্রকাশের কাজে সহায়তা করবেন। এ পাণ্ডুলিপির নাম ছিল: “এন হিস্টোরিকাল একাউন্টস অফ টু নোটেবল করাপশনস অব স্ক্রিপচার (An Historical Accounts of Two Notable Corruptiouns of scripture)। ১৬৯২ সালে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির রচনা হিসেবে এর ল্যাটিন অনুবাদ প্রকাশের চেষ্টা নেওয়া হয়। নিউটন ব্যাপারটা শুনতে পেয়ে এ প্রকাশনা বন্ধের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য লককে অনুরোধ করেন। কারণ, তার ধারণা ছিল যে, সময়টি এ পুস্তিকা প্রকাশের অনুকূল নয়।

নিউটন তার ‘হিষ্টোরিকাল একানউন্টস’ গ্রন্থে জন ৫: ৭ প্রসঙ্গে বলেছেন:

“ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে জেরোমের সময় এবং তার আগে ও পরে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত শক্তিশালী দীর্ঘকালীন ও স্থায়ী কোনো বিতর্কেই তিন ঈশ্বরের বিষয়টি কখনোই ছিল না। এটা এখন প্রত্যেকের মুখে এবং কাজের প্রধান ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত এবং নিশ্চিতভাবে তাদের জন্যই তা করা হয়েছে যেভাবে তাদের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।”

নিউটন আরো বলেন,

যারা যোগ্য, এ ব্যাপারে তাদের বোধোদয় হওয়া উচিৎ। আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। যদি এটা বলা হয় যে, আমার ধর্মগ্রন্থ কী তা নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত বিচারের কেউ নেই সেক্ষেত্রে যেসব স্থানে বিরোধ নেই সেখানে আমি এটা স্বীকার করি, কিন্তু যেখানে বিরোধ আছে সেখানে আমি সবচেয়ে ভালো বুঝি, তাই করি। মানব সমাজের উত্তপ্ত মেজাজ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশ ধর্মীয় ব্যাপারে চিরকালই রহস্যময়তার ভক্ত, আর এ কারণেই তারা যা কম বোঝে সেটাই বেশি পছন্দ করে। এ ধরনের লোকেরাই প্রেরিত দূত যোহনকে যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তার প্রতি আমার এমন শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে যাতে আমি বিশ্বাস করি তিনি যে উদ্দেশ্যে লিখেছেন যা থেকে ভালোটুকু গ্রহণ করা যায়।৪৪

নিউটনের মতে, এই অংশটি এরাসমাসের নিউ টেস্টামেন্টের তৃতীয় সংস্করণে প্রথম দেখা যায়। তিনি মনে করতেন যে, এই সংস্করণ প্রকাশের আগে এই মিথ্যা অংশটি নিউ টেস্টামেন্টে ছিল না। নিউটন বলেন, “তারা যখন এই সংস্করণে ত্রিত্ববাদ পেল তখন তারা নিজেরাই নিজেদের ধর্মগ্রন্থ থেকে থাকলে তা ছুঁড়ে ফেলল যেমন লোকজন পুরোনো আলমানাককে ছুঁড়ে ফেলে। এ ধরনের পরিবর্তনের ঘটনা কি কোনো বিবেচক ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে পারে?” তিনি বলেন, “ভাঙ্গা বাদ্যযন্ত্রে সুর তোলার মতই এটা ধর্মের জন্য উপকারী হওয়ার পরিবর্তে বিপজ্জনক।”

১ তীমথীয় ৩ : ১৬ প্রসঙ্গে নিউটন বলেন, উত্তপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী আরিয়ান বিতর্কের কোনো সময়েই এটা শোনা যায় নি…. যারা বলে  “ঈশ্বর রক্তমাংসের মানুষের মধ্যে প্রকাশিত” তারা তাদের উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য হাসিলের জন্যই তা বলে থাকে।৪৫

নিউটন ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রতীকী বা দ্বৈত ব্যাখ্যার বিরোধী ছিলেন। তিনি সব ধর্মগ্রন্থকে সমান শ্রদ্ধা করতেন না। হুইস্টন বলেন, তিনি অন্য দু’টি ধর্মগ্রন্থের ওপর একটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেন যেগুলো এথানাসিয়াস বিকৃত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আজ আর তার সে গ্রন্থের কোনো হদিস পাওয়া যায় না।

নিউটন সবশেষে বলেন,

দেবতা (Deity) শব্দটি অধীনস্থ প্রাণীকুলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশক এবং ঈশ্বর (God) শব্দটি স্বতস্ফূর্তভাবে প্রভূত্ব প্রকাশক। প্রত্যেক প্রভূই ঈশ্বর নয়। এক আধ্যাত্মিক সত্ত্বার মধ্যে প্রাধান্য বিস্তারের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটে। যদি এ প্রাধান্য সত্য হয় তাহলে সে সত্ত্বাই প্রকৃত ঈশ্বর। এটা যদি সন্দেহপূর্ণ হয় তবে তা হবে মিথ্যা ঈশ্বর, আর যদি তা সন্দেহাতীত হয় তবে তিনি হবেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর।৪৬

টমাস এমলিন (Thomas Emlyn) ১৬৬৩-১৭৪১ খৃ.

টমাস এমলিন ১৬৬৩ খৃস্টাব্দে ২৭ মে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৬৭৮ খৃস্টাব্দে তিনি কেমব্রিজ গমন করে সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর তিনি ডাবলিনে ফিরে আসেন। খুব শিগগির তিনি সেখানে একজন জনপ্রিয় ধর্মপ্রচারক হয়ে উঠেন। ১৬৮২ খৃস্টাব্দে এই যাজক প্রথম ধর্মোপদেশ প্রচার করেন এবং পরবর্তী ১০ বছর একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবে তার খ্যাতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। ১৭০২ খৃস্টাব্দে তার ধর্মপ্রচার সভার একজন সদস্য লক্ষ করেন যে, এমলিন ত্রিত্ববাদের সমর্থনে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু সুপরিচিত ব্যাখ্যা ও যুক্তি পরিহার করেছেন। এ ঘটনার ফলে ত্রিত্ববাদের ধারণার ব্যাপারে তিনি কী শিক্ষা দিচ্ছেন, সে বিষয়ে তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যখন তাকে সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই খোলাখুলি তার মত প্রকাশ করেন।

তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি একত্ববাদে বিশ্বাসী। তিনি ঘোষণা করেন যে, ঈশ্বর একক সর্বোচ্চ সত্ত্বা এবং যীশু তার সকল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব শুধু তার কাছ থেকেই লাভ করেছেন। তিনি আরো বলেন, ধর্ম সমাবেশের কেউ যদি তার মতকে আপত্তিকর বলে দেখেন, তবে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন যাতে তারা তাদের মতের সমর্থনকারী একজন ধর্মপ্রচারক যাজককে মনোনীত করতে পারেন। ধর্মীয় সমাবেশের অধিকাংশই এটা চাইছিল না, কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তিনি পদত্যাগ করেন। এতে অধিকাংশ লোকই দুঃখিত হয়। পরিস্থিতি যাতে শান্ত হয়ে আসে সে জন্য স্বল্পকালের জন্য তাকে ইংল্যান্ড গমন করতে বলা হয়। তিনি তাই করেন।

ইংল্যান্ডে ১০ সপ্তাহ অবস্থানের পর তিনি তার পরিবারের সদস্যদের ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবার জন্য ডাবলিন ফিরে আসেন। কিন্তু তার আগেই তাকে ১৭০৩ খৃস্টাব্দে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ধর্ম বিরোধিতার অভিযোগ আনা হয়। দেখা যায় যে, তিনি “An humble Inquiry into the Scripture account of Jesus Christ” নামক একত্বাবাদের সমর্থক একটি গ্রন্থ প্রকাশের জন্য দায়ী। এ ঘটনায় তার বিচারের জন্য যেসব সাক্ষ্যপ্রমাণ খোঁজা হচ্ছিল, তা মিলে গেল। পুরো পুস্তকটিই মূলত জন এর গসপেলের ১৪ : ২৮ শ্লে­াকের ওপর ভিত্তি করে রচিত যাতে যীশু বলেছেন “পিতা আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ।” এমলিন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে, যীশু ছিলেন মানুষ ও ঈশ্বরের মাঝে একজন মধ্যস্থতাকারী। এভাবে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পন্থায় যীশুকে ঈশ্বর থেকে পৃথক করেন। আর তা করার মাধ্যমে ত্রিত্ববাদের ধারণাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেন।

এমলিনের বিরোধীরা তাকে দোষী প্রতিপন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় তার বিচার কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে যায়। এ সময়টি তার কাটে কারাগারে। যখন চূড়ান্ত বিচার শুরু হলো, তখন “দীর্ঘ আলখেল্লা পরিহিত এক সৎ ব্যক্তি” তাকে অবহিত করেন যে, আত্মপক্ষ সমর্থনের অনুমতি তাকে দেওয়া হবে না, বরং কোনো “আইন বা খেলা ছাড়াই একটি নেকড়ের ন্যায় তাকে ধাওয়া করে শেষ করে ফেলার জন্যই এ চক্রান্ত করা হয়েছে।”৪৭ সুতরাং তিনি যে “যীশুখ্রিষ্ট সর্বোচ্চ ঈশ্বর নন” একথা ঘোষণা করে একটি অখ্যাত ও কলঙ্কজনক বাইবেল রচনা ও প্রকাশের জন্য অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।৪৮ তাকে এক বছরের কারাদণ্ড অথবা এক হাজার পাউন্ড জরিমানা প্রদান- এ দুয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হলো। জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তিনি কারাগারে থাকেন। এ দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করলে তাকে আদালতে টানা-হেঁছড়া করা হয় এবং জনসাধারণের সামনে তাকে একজন ধর্মদ্রোহী হিসেবে প্রদর্শন করা হয়। এই অবমাননাকর আচরণকেও অবশ্য কর্তৃপক্ষ সদয় আচরণ বলেই আখ্যায়িত করেছিল, কারণ তিনি যদি স্পেনে থাকতেন তাহলে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। যা হোক, সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে তার জরিমানা কমিয়ে ৭০ পাউন্ড করা হয়। জরিমানা পরিশোধের পর এ মলিন প্রথমে কারাগার এবং পরে আয়ারল্যান্ড ত্যাগ করেন। ধর্মদ্রোহীদের প্রতি এ আচরণ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে একজন বিশিষ্ট যাজক বলেন যে, একটি অন্ধকার কারাগারে জ্ঞানের আলো প্রজ্জ্বলনকারী বিভাগ ও জরিমানা দৃঢ় প্রত্যয় উৎপাদক।৪৯

এরপর এ মলিন সেসব বিশিষ্ট সাধুদের সাথে যোগদান করেন যারা ত্রিত্ববাদ প্রত্যাখ্যান এবং এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের বিশ্বাসী ছিলেন। পবিত্র কুরআনে এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ এবং তার মত অন্য কেউ নেই। আর এতে আল্লাহ হিসেবে আর কারো উল্যে­খ নেই। দুর্ভাগ্যক্রমে বাইবেলে এভাবে বলা হয় নি। তাই এমলিন তার পুস্তকে এ বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন: ঈশ্বর “কোন কোনো সময় সর্বোচ্চ, পবিত্র ও অবিনশ্বর সত্ত্বা হিসেবে পরিগণিত যিনি নিজে একক এবং তিনি অন্য কারো জাত নন, তার কর্তৃত্ব এবং অন্যান্য কোনো কিছুই অন্য কারো কাছ থেকে লব্ধ নয়। তাই, যখন আমরা ঈশ্বরের কথা বলি বা সাধারণভাবে আলোচনা করি এবং প্রার্থনা করি এবং প্রশংসা করি, তখন এ বিষয়গুলোতে মহত্তম অর্থে ঈশ্বরকে বুঝাই।”

এমলিন পরবর্তীতে দেখান যে, বাইবেলে যদিও “ঈশ্বর” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু তা প্রায়শই এমন সব ব্যক্তির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে যাদেরকে সর্বোচ্চ সত্ত্বার তুলনায় নিম্নতর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিল: “ দেবদূতদের (ফিরিশতাদের) ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল…. যারা ঈশ্বরের চাইতে কিছুটা নিম্ন মর্যাদা সম্পন্ন ছিলেন (গীতসংহিতা ৮ : ১, যোহন ১০: ৩৪-৩৫)। কোনো কোনো সময় একজন ব্যক্তিকেও ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন নবী মূসা আলাইহিস সালামকে হারুন আলাইহিস সালাম নবীর কাছে দুইবার ঈশ্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং পরবর্তীতে ফেরাউনের (Pharaoh) কাছেও। এমনকি শয়তানকেও এই পৃথিবীর ঈশ্বর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাজপুত্র ও প্রবল ক্ষমতাশালী শাসকদেরও ঈশ্বর বলে আখ্যায়িত করার কথা জানা যায় যারা অন্যায়ভাবে ও বলপূর্বক এবং ঈশ্বরের অনুমোদনক্রমে শাসক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। যিনি একক সত্ত্বাময় ঈশ্বর তিনি এ সবের ঊর্ধ্বে অবিনশ্বর। সুতরাং অন্য যাদের ঈশ্বর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে তাদের চাইতে ঈশ্বরকে আমরা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দেখতে পাই।”

এ বৈশিষ্ট্য আরো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমলিন ফিলোকে (Philo) উদ্ধৃত করেছেন। ফিলো সর্বোচ্চ সত্ত্বাকে “শুধুমাত্র মানুষের ঈশ্বরই নয়, ঈশ্বরের ঈশ্বর” বলে বর্ণনা করেছেন। ওল্ড টেস্টামেন্টে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার মহিমান্বিত উল্যে­খ কালে তাঁকে এই সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক গৌরবান্বিত আখ্যায় আখ্যায়িত করা হয়েছে।

যেহেতু বাইবেল ঈশ্বরের বর্ণনা ও ঈশ্বরের চাইতে নিম্নতম সত্ত্বারও বর্ণনাকালে “ঈশ্বর” (God) শব্দটি ব্যবহার করেছে সেহেতু এমলিন এ প্রশ্নের একটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন: পবিত্র গ্রন্থে দু’টি অর্থের কোনোটিতে খৃষ্টকে ঈশ্বর বলে অভিহিত করা হবে? তিনি বলেন ঈশ্বরদের ঈশ্বরের তুলনায় খৃষ্ট একজন অধস্তন সত্ত্বা (দেখুন ১ করিণথীয় ৮ : ৫)। তিনি নিজেকে নিম্নের প্রশ্ন করেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সিদ্ধান্তে পৌঁছেচেন: যীশু খৃষ্টের ঊর্ধ্বতন যদি কোনো ঈশ্বর থাকেন তার কর্তৃত্ব অধিকতর বেশি এবং তার চাইতে অধিকতর ক্ষমতাবান, নয় কি? এ প্রশ্নের উত্তর একভাবে অথবা অন্যভাবে যীশুর অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত প্রদান করবে। যদি ঈশ্বর তার ওপর হয়ে থাকেন তাহলে তিনি অর্থাৎ যীশু সর্বোচ্চ ঈশ্বর হতে পরেন না। এমিলিনের জবাব: হ্যাঁ, তাই এবং তিনি তার জবাবের সমর্থনে ৩টি যুক্তি পেশ করেন:

যীশু সুষ্পষ্টভাবে তিনি ছাড়া অন্য একজন ঈশ্বরের কথা বলেছেন।

তিনি তার ঈশ্বরকে তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন অথবা উচ্চতর বলে গ্রহণ করেছেন। তিনি পবিত্রতা অর্জনের কথা বলেছেন যেহেতু তিনি সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্য এবং অবিনশ্বর পবিত্রতার অধিকারী ছিলেন না যা শুধু সর্বোচ্চ সত্ত্বা ঈশ্বরেরই রয়েছে।

এমলিন উপলব্ধি করেন যে, সাধারণ মানুষ যাতে বুঝতে পারে সেরকম পন্থায় এই ৩টি যুক্তিকে বিশদ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। যারা সাধারণ লোকের কাছে বোধগম্য নয় এমনভাবে ধর্মগ্রন্থাদি সম্পর্কে লিখেছেন অথচ যারা তাদের রচনায় ব্যক্ত মতবাদ লোকে বিশ্বাস করবে বলে প্রত্যাশা করেছেন- তিনি সেই সব লোকদের পন্থা বর্জন করেন। এমলিন এই ৩টি যুক্তি ব্যাখ্যা করেন এভাবে:

প্রথমত: যীশু তার চেয়ে পৃথক অন্য একজন ঈশ্বরের কথা বলেছেন। বেশ কয়েকবার আমরা দেখি অন্য কারো সম্পর্কে তিনি বলছেন “আমার ঈশ্বর আমার ঈশ্বর” (মথি ২৭: ৪৬), “আমার ঈশ্বর আমার ঈশ্বর, কেন তুমি আমাকে পরিত্যাগ করেছে? (যোহন ২০ : ১৭)। নিঃসন্দেহে তিনি একথা বলতে চান নি যে, “আমার আমি আমার আমি, তুমি কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছে?” এই ঈশ্বর তার চেয়ে পৃথক, যেমনটি তিনি অন্যান্য স্থানে ঘোষণা করেছেন (যোহন ৮: ৪২), উলে­খ্য যে, সেখানে তিনি ঈশ্বরকে পিতা হিসেবে তার থেকে পৃথক করেন নি, কিন্তু ঈশ্বর হিসেবে এবং অতঃপর, সকল ন্যায় বিবেচনায়, তিনি স্বয়ং সেই একই ঈশ্বর হতে পারেন না, যা থেকে তিনি নিজেকে পৃথক করেছেন….

দ্বিতীয়ত: যীশু তিনি ছাড়া অন্য ঈশ্বরকে শুধু মেনেই নেন নি, তিনি একথাও স্বীকার করেছেন যে, সেই তিনি অর্থাৎ ঈশ্বর তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন ও উচ্চ, যেমনটি সোজাসুজি ব্যক্ত করেছেন তার শিষ্যগণ। বহু ঘটনায়ই তিনি উচ্চস্বরে পিতা ঈশ্বরের প্রতি তার আনুগত্য ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় কিছু করার জন্য আসেননি, তার সবকিছুই শুধু পিতার (ঈশ্বর) নাম ও ক্ষমতা বলে। নিজের নয়, ঈশ্বরের মহিমাই তার কাম্য ছিল; নিজের ইচ্ছায় পরিচালনা নয়, ঈশ্বরের শাসন তার কাম্য ছিল। এ ধরনের আনুগত্য ধারণ করেই তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। পুনরায় তিনি ঈশ্বরের ওপর তার নির্ভরতার কথা ঘোষণা করেন। এমনকি সে সকল বিষয়ও, যেগুলো একজন ঈশ্বর হিসেবে তার বলেই বলার চেষ্টা করা হয়েছে, যেমন অলৌকিক ক্ষমতার প্রয়োগ, মৃতকে জীবিত করা, ন্যায়বিচার বলবৎ করা ইত্যাদি। আর এসব বিষয়ে তিনি বলেছেন, “আমি নিজে কিছুই করতে পারি না।”

তৃতীয়ত: যীশু নিজে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন (যেমন অনর্জিত শক্তি, একচ্ছত্র ঈশ্বরত্ব, সীমাহীন জ্ঞান), একমাত্র ঈশ্বরগণের সর্বোচ্চ ঈশ্বরই যার অধিকারী এবং এটা সুনিশ্চিত যে, তিনি যদি এসব গুণের একটি বা কোনো একটির অধিকারী না হয়ে থাকেন, যা ঈশ্বরত্বের জন্য অত্যবশ্যকীয়, তাহলে তিনি সে অর্থে ঈশ্বর নন। এর কোনো একটি গুণ যদি তার মধ্যে আমরা না দেখি, তিনি অন্যগুলো চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। কেননা তার নিজের সবকয়টি ঐশ্বরিক গুণাবলি না থাকা আর নিজেকে অবিনশ্বর ঈশ্বর হিসেবে অস্বীকার করা একই ব্যাপার।

এরপর এমলিন তার সর্বশেষ যুক্তির প্রমাণ হিসেবে কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন:

ঈশ্বর এক মহান ও বিচিত্র গুণ হলো সর্বময় ও অনর্জিত সর্বময় শক্তিমত্তা। যিনি সকল কিছু অলৌকিকভাবে এবং নিজের ইচ্ছানুরূপ করতে পারেন না তিনি কখনোই সর্বোচ্চ সত্ত্বা হতে পারেন না। যদি তিনি অন্য কারো সাহায্য না নিয়ে কিছু করতে না পারেন, তাকে তুলনামূলকভাবে অপূর্ণাঙ্গ ত্রুটিযুক্ত সত্ত্বা বলে মনে হয় যেহেতু তিনি অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী এবং তার নিজের ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত শক্তির প্রতি তিনি নির্ভরশীল। এখন সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, যীশু (তার ক্ষমতা যাই থাক না কেন) বার বার স্বীকার করেছেন যে, তার নিজের অসীম শক্তি ছিল না: “আমি নিজে কিছুই করতে পারি না” (যোহন ৫ : ৩০)। তিনি মহা অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে বলেছেন, যেমন মৃতদের পুনরুজ্জীবন, সকলের প্রতি সমবিচার করা; তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, মানুষের জানা উচিৎ যে, এসব ক্ষেত্রে তার ইচ্ছা পূরণ করার মালিক ঈশ্বর। শুরুতে তিনি বলেন, “পুত্র কিছুই করতে পারে না, তার পিতা যা করেন সে তাই শুধু দেখে।” তাই, মাঝে এসেও তিনি একই কথা ব্যক্ত করেন। তিনি যেন তার মহান সত্য সম্পর্কে খুব বেশি অংহকারী না হয়ে ওঠেন সে জন্য তিনি উপসংহারে বলেন, “আমি নিজে থেকে কিছুই করতে পারি না” … নিশ্চিতভাবে এটি ঈশ্বরের কথা নয়, একজন মানুষের কথা। যিনি সর্বোচ্চ তিনি কারো কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করতে পারেন না। তিনি তাঁকে নিজের চেয়ে অধিক শক্তিশালী বা জ্ঞানী হিসেবে তৈরি করতে পারেন না, কেননা পরিপূর্ণ শ্রেষ্ঠত্বের সাথে আর কিছু যোগ হতে পারে না। যেহেতু ঈশ্বরের ক্ষমতা একটি অত্যাবশ্যক পূর্ণতা সেহেতু সেটি যদি উদ্ভূত হয় তাহলে সত্ত্বা বা অস্তিত্বের ক্ষেত্রেও তা ঘটবে যা কিনা সর্বোচ্চ সত্ত্বার বিরুদ্ধেই অবমাননাকর। তাঁকে উদ্ভূত সত্ত্বা সমূহের মধ্যে স্থাপন করা তাঁকে “অ-ঈশ্বর” করারই শামিল। সর্বোচ্চ ঈশ্বর প্রকৃতপক্ষে শুধুমাত্র তিনিই যিনি একক এবং সকল কিছুর মূল।

মার্ক তার গসপেলের ১৩ : ৩২ শ্লোকে যীশু সম্পর্কে যে বিবরণ দিয়েছেন, এমলিন তা পরীক্ষা করেছেন। বিচার দিবস সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “সেই দিন সম্পর্কে কোনো মানুষ, স্বর্গের দেবদূত (ফিরিশতা) পুত্র কেউই জানে না- শুধু পিতা ছাড়া।” এমলিন বলেন, যীশুর ঈশ্বরত্ব বিশ্বাস করে এমন যে কোনো লোকের কাছেই এ বক্তব্য ঈশ্বরের একই সঙ্গে দু’টি প্রকৃতি বা দু’টি ভিন্ন অবগতির অবস্থার ধারণা প্রদান করে। কার্যত এটি একই সাথে তাঁকে কিছু জিনিস জানা এবং কিছু জিনিস না জানার মত এক উদ্ভট অবস্থায় স্থাপন করে। যদি যীশু ঈশ্বর হয়ে থাকতেন এবং ঈশ্বরের তা জানা থাকত তাহলে যীশু এ ধরনের কথা বলতেন না, কারণ এই প্রকৃতির অধিকারী হওয়ার কারণে তারও উক্ত জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কথা।

টমাস এমলিন ভালোভাবেই সচেতন ছিলেন যে, বিপুল সংখ্যক খৃষ্টান তাকে ভুল বুঝতে পারে। তিনি তার বিশ্বাসের সমর্থনে খৃষ্টধর্মে তার সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি প্রদান করেছেন এই বলে যে, তিনি যীশুকে তার শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। তিনি তার অনুরাগী ভক্ত এবং পিতা, মাতা, বন্ধু-বান্ধব সকলের চেয়ে তাঁকে বেশি ভালোবাসেন। তিনি বলেন, “আমি জানি যে, যীশু শুধু সত্যকেই ভালোবাসতেন এবং যারা তার বাণী অনুসরণ করে তিনি তাদের কারো প্রতিই ক্রুদ্ধ হবেন না যারা বলে “পিতা আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ” (যোহন ১৪ : ২৮)। এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এমলিন বলেন, “ঈশ্বর যীশুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নন” এ কথা বলা বিপজ্জনক হবে।৫০

টমাস এমলিন ছিলেন একজন ঈশ্বর ভক্ত জ্ঞানী ব্যক্তি যিনি তার পাণ্ডিত্য, নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার জন্য বিশিষ্ট ছিলেন। তিনি নির্যাতনের মুখেও কখনো আপোশ করেন নি। তিনি ছিলেন ঐ সাধুমণ্ডলীর একজন যারা তাদের বিরোধীদের সাথে লড়াই করেছেন নির্ভীকভাবে। তারা কারাদণ্ড, নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও মাথা পেতে নিয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্র ও চার্চের অপশক্তির কাছে নতজানু হন নি। তারা মিলিতভাবে তাদের নির্মূল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সার্বিক সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। কার্যত প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনাই তাদের সেই পরমপ্রিয় বাণীকে অধিকতরভাবে জনপ্রিয় করেছে। সে বাণীটি ছিল:

ঈশ্বর তিনজন নন, একজন।

এমলিন সেই সত্য ঘোষণাকারী ভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যে ছিলেন প্রথম সারির অন্যতম যার ত্রিত্ববাদে অবিশ্বাসের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করার সাহস ছিল। যেসব যাজক তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন, যারা আরিয়াসের অনুসারী ছিলেন এবং আঠারো শতকের গোড়ার দিকে আরিয়াসের অনুসারী ও অন্যান্য একত্ববাদীদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। এমলিনের বিচারের দশ বছর পর যীশুর কথিত ঈশ্বরত্ব নিয়ে প্রশ্নের ফলশ্রুতিতে যে চাপা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, চার্চ অব ইংল্যান্ড তার তীব্রতা উপলব্ধি করেছিল। ১৭১২ খৃস্টাব্দে স্যামুয়েল ক্লাক (Samuel Clarke) এর “Scripture Doctrine of the Trinity” গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সে চাপা অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটে। এ গ্রন্থে “পিতা ঈশ্বর হলেন সর্বোচ্চ এবং খৃষ্ট ও পবিত্র আত্মা তার অধীনস্থ সৃষ্টি”- একথা প্রমাণের জন্য তিনি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে ১২৫১ টি অংশ উদ্ধৃত করেছেন। ক্লার্ক পরে এথানাসিয়াসের ধর্মমত ও অন্যান্য ত্রিত্ববাদী বৈশিষ্ট্য বর্জন করে সর্বসাধারণের উপযোগী প্রার্থনা গ্রন্থের একটি সম্পাদিত সংস্করণ প্রকাশ করেন।

টমাস এমলিন ১৭৪১ খৃস্টাব্দে জুলাই মাসে পরলোকগমন করেন।

থিওফিলাস লিন্ডসে (Theophilus Lindsey) ১৭২৩-১৮০৮ খৃ.

থিওফিলাস লিন্ডসে ১৭২৩ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডে প্রথম একত্ববাদীদের সমাবেশ অনুষ্ঠানের সংগঠক। ৬০ বছর পূর্বে স্যামুয়েল ক্লার্কের সংশোধনীর ভিত্তিতে সংশোধিত প্রার্থনা রীতি ব্যবহার করে এবং প্রচলিত প্রথানুযায়ী সাদা আঙরাখা বা উত্তরবাস ছাড়া আলখেল্লা পরিধান করে লিন্ডসে লন্ডনের এসেক্স স্ট্রিটের এক নিলাম কক্ষে প্রথম প্রার্থনা সভায় বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন ও জোসেফ প্রিস্টলি সহ বহু সংখ্যক মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। পরের দিন লিন্ডসে তার এক বন্ধুর কাছে লেখা পত্রে এ ঘটনার বিবরণ দেন:

আপনি শুনে খুশি হবেন যে, গতকাল সব কিছু খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। আমি যা ধারণা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বড় সমাবেশ হয়েছিল এবং বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এতে যোগদান করেন। তাদের আচরণ ছিল পরিশীলিত ও সার্বিকভাবে সুন্দর। তাদের অনেকেই প্রার্থনা সভাকে সামগ্রিকভাবে অত্যন্ত সন্তোষজনক বলে আখ্যায়িত করেন। কিছু গোলযোগের আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবে কোনো কিছু ঘটে নি। একমাত্র যে ত্রুটি দেখা গিয়েছিল তা হলো এই যে আয়োজন প্রয়োজনের তুলনায় ছোট মনে হচ্ছিল। অনুষ্ঠান থেকে অনুকূল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, সবাই গুরুত্ব দিয়েছে ও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমার এখন প্রত্যয় জন্মেছে যে, এ প্রচেষ্টা ঈশ্বরের আশীর্বাদে ব্যাপক কল্যাণে আসবে। আমাদের ও চার্চের প্রার্থনার মধ্যে বৈপরীত্য প্রত্যেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমাকে একথা বলার জন্য ক্ষমা করবেন যে, আমার লজ্জাবোধ করা উচিৎ ছিল যে, আমি একটি সাদা পোশাক পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলাম। উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউই এটা চায় নি বলে মনে হয়েছে। সেখানে যে কোনো অঘটন ঘটে নি, শুধু এ কারণেই আমি সন্তুষ্ট নই, আমি সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানের ব্যাপারেই সন্তুষ্ট যা আগে কখনো হইনি। একথা আমাকে আবারও বলতে হচ্ছে। ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও করুণার ফলে আমরা এটা ভালোভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা শুধু আশা পোষণ করি যে, আমাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে তার আশীর্বাদ ও করুণা অব্যাহত থাকবে…।৫১

এসেক্স ট্রিটের এই ধর্মীয় সমাবেশ অন্যান্য একত্বাবাদীদের বার্মিংহাম, ম্যাঞ্চেষ্টর ও ইংল্যান্ডের অন্যান্য শহরে ছোট গির্জা (Chape) প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করে। গির্জায় ধর্মপালনের স্বাধীনতা মতবাদগত স্বাধীনতার বিকাশ ঘটায়। এর ফলে ১৭৯০ খৃস্টাব্দে অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতাকালে লিন্ডসে সকলের কাছে সুস্পষ্ট ও সহজ করে তোলার জন্য নিম্নোক্ত “সত্য” গুলো ব্যক্ত করেন যার কাছে পবিত্র গ্রন্থসমূহে বিশ্বাসী সকল মানুষ আগে বা পরে অবশ্যই নতি স্বীকার করবে ও মেনে নেবে:

ঈশ্বর একজন। তিনি একক সত্ত্বা, যিনি ঈশ্বর তিনি একমাত্র স্রষ্টা ও সকল কিছুর সার্বভৌম প্রভূ; যীশু ইয়াহূদী জাতিভূক্ত একজন ব্যক্তি ছিলেন, তিনি ছিলেন ঈশ্বরের বান্দা, তার দ্বারা বিপুল মর্যাদা মণ্ডিত ও সম্মান প্রাপ্ত; আত্মা অথবা পবিত্র আত্মা কোনো ব্যক্তি নন অথবা বুদ্ধি জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী নন, তিনি শুধু এক বিশেষ শক্তি অথবা ঈশ্বরের উপহার, তিনি যীশুখৃষ্টের জীবনকালে তাকে সংবাদাদি প্রদান করতেন এবং তার পরবর্তী সময়ে তিনি ধর্ম প্রচারকগণ ও বহু আদি খৃষ্টানকে সাফল্য জনকভাবে গসপেলের প্রচার ও প্রসার শক্তি ও উৎসাহ জুগিয়েছেন (প্রেরিতদের কার্য ১ : ২)।

এবং এই ছিল ঈশ্বর এবং খৃষ্ট এবং পবিত্র আত্মা সংক্রান্ত মতবাদ যা ধর্মপ্রচারকগণ কর্তৃক শিক্ষা প্রদান এবং ইয়াহূদী ও পৌত্তলিকদের কাছে প্রচার করা হয়েছে।৫২

এই আধুনিক প্রত্যয় দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে ইংরেজ একত্ববাদ তার শ্রেষ্ঠতম যুগে প্রবেশ করে।

লিন্ডসে তার রচনায় যীশুখৃষ্ট যে ঈশ্বর নন, সেই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নিম্নোক্ত যুক্তি প্রদর্শন করেন:

যীশু কখনোই নিজেকে ঈশ্বর বলে ঘোষণা বা আখ্যায়িত করেন নি। এমনকি, তিনি এক ব্যক্তি যার দ্বারা সকল কিছু সৃষ্টি হয়েছে এরকম সামান্যতম কোনো আভাসও তিনি দেন নি।

ওল্ড টেস্টামেন্টের পবিত্র গ্রন্থগুলোর সবগুলোতেই শুধু এক ব্যক্তি, এক যিহোভা, এক ঈশ্বর, তাকে একা এবং সকল কিছুর স্রষ্টা বলে বলা হয়েছে। যোহন এর গসপেল এর ৫ : ৭ শে­ক প্রসঙ্গে উলে­খ্য যে, যোহনের মত একজন ধর্মনিষ্ঠ ইয়াহূদী হঠাৎ করে একজন অন্য স্রষ্টা, একজন নতুন ঈশ্বর হাযির করবেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি কখন এই অদ্ভুত মতবাদ উদ্ভাবন করলেন এবং কোনো ক্ষমতাবলে তা প্রচার করলেন, সেটা জানা যায় না। বিশেষ করে তিনি নিজেই যেখানে বিশ্বাস করতেন যে, মূসা আলাইহিস সালাম নবীর বিধান অনুযায়ী যিহোভা ছাড়া অন্য কোনো ঈশ্বরের বিশ্বাস স্থাপন বা উপাসনা করা মূর্তি পূজার মতোই একটি অপরাধ এবং ধর্মের প্রতি অবমাননা কর। তার গুরু প্রভূ যীশু যিহোভা ছাড়া অন্য কোনো ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন বা উপাসনা করা মূর্তি পূজার মতই একটি অপরাধ এবং ধর্মের প্রতি অবমাননা কর। তার গুরু প্রভূ যীশু যিহোভা ব্যতীত অন্য কোনো ঈশ্বরের উল্লেখ করেন নি, তিনি নিজের সম্পর্কেও কখনো এরকম কিছু বলেন নি; বরং তিনি বলেছেন যে, পিতা, যার দূত ছিলেন তিনি, তিনিই তাকে কি বলতে হবে এবং কি বলা উচিৎ তার নির্দেশনা প্রদান করেছেন (যোহন ১২ : ৪৯)।

গসপেল ইতিহাসের লেখকগন একজন ঐশী ব্যক্তি, পিতাকে, একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর বলেছেন (যোহন ১৭ : ৩)

মার্ক, মথি ও লূক কেউই তাদের স্ব- স্ব গসপেল লেখার সময় কারো সাথে আলোচনা করেন নি। তারা কখনোই যীশু ঈশ্বর ছিলেন বলে কোনো ইঙ্গিত দেন নি। তারা যদি তাকে ঈশ্বর এবং বিশ্বের স্রষ্টা হিসেবেই জানতেন, সেক্ষেত্রে এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা নিশ্চুপ থাকতেন -একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

যোহন যিনি তার গসপেলের শুরুতেই ঈশ্বরকে ঈশ্বর এবং যীশুকে রক্ত মাংসের মানুষ রূপী বাণী বলে উল্লেখ করেছেন, গসপেলের অবশিষ্ট অংশে তিনি যীশুকে ঈশ্বর বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না।

লূকের গসপেল পরীক্ষা নিরীক্ষা করলে দেখা যায়, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মা মেরীর গর্ভে জন্মগ্রহণের পূর্বে যীশুর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। (যেহেতুঃ

       ৩.২৩.৩৮ এ যীশুর বংশানুক্রমের ধারাবাহিক উল্লেখ আছে।

  ৪: ২৪ এবং ৮: ৩৩ এ যীশুকে ঈশ্বরের নবী বলে স্বীকার করা হয়েছে।

       ৭: ১৬ ও ২৪: ১৯ এ যীশুকে নবী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

৩: ১৩, ২৬ ও ৪: ২৭, ৩০ এ পিটার ও অন্য কয়েকজন ধর্মপ্রচারক যীশুকে ঈশ্বরের বান্দা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

১৭: ২৪, ৩০ এ লূক তাকে “মানুষের পুত্র” পৃথিবীর স্রষ্টা ঈশ্বরের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন।

যারা যীশুর উপাসনা করে লিন্ডসে তাদের প্রশ্ন করেছেন যে, যীশু যদি তাদের সামনে হাযির হন ও নিম্নোক্ত প্রশ্নসমূহ জিজ্ঞাসা করেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া কি হবে:

তোমরা আমার উপাসনা কর কেন? আমি কি তোমাদের কখনো এ ধরনের নির্দেশ দিয়েছি অথবা ধর্মীয় উপাসনার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আমি কি নিজের নাম তোমাদের কাছে প্রস্তাব করেছি?

আমি কি সর্বদা এবং একেবারে শেষ পর্যন্ত পিতা, আমার ও তোমাদের পিতা, আমার ও তোমাদের ঈশ্বরের উপাসনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করি নি? (যোহন ২০ : ১৭)

আমার শিষ্যরা তাদের প্রার্থনা শেখানোর জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিল (লূক ১১ : ১-২)। আমি কি তখন তাদেরকে আমার কাছে প্রার্থনার অথবা পিতা ছাড়া অন্য কারো প্রার্থনা করার শিক্ষা দিয়েছিলাম?

আমি কি কখনো নিজেকে ঈশ্বর বলে ঘোষণা করেছিলাম অথবা তোমাদের কি বলেছিলাম যে, আমিই বিশ্বের স্রষ্টা এবং আমার উপাসনা করতে হবে?

 সোলায়মান আলাইহিস সালাম উপাসনালয় (বায়তুল মুকাদ্দস) নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর বলেছিলেন, “ঈশ্বর কি সত্যই পৃথিবীতে বাস করবেন? স্বর্গের প্রতি দৃষ্টিপাত কর, স্বর্গের স্বর্গও তাঁকে ধারণ করতে পারে না; আমি যে ভবন নির্মাণ করেছি তা তার চেয়ে কত যে নুনতম (রাজাবলি ৩৮: ২৭)৫৩

এক ঈশ্বরে লিন্ডসের বিশ্বাসের বিষয়টি নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়:

সকল স্থানে চিরন্তন ঈশ্বরের উপাসনা হওয়া প্রয়োজন, কারণ তিনি সর্বত্র বিরাজিত… কোনো স্থানই অন্যটির চেয়ে অধিক পবিত্র নয়, কিন্তু প্রতিটি স্থানই উপাসনার জন্য পবিত্র। উপাসনাকারীরাই স্থান নির্ধারণ করে। কেউ যখন ভক্তিপূর্ণ বিনয়াবনত চিত্তে সেখানে ঈশ্বরের সন্ধান করে তখন ঈশ্বর সেখানে থাকেন। পাপমুক্ত মনই হচ্ছে ঈশ্বর প্রকৃত মন্দির।৫৪

যোসেফ প্রিস্টলি (Josheph Priestly) ১৭৩৩-১৮০৪) যোসেফ প্রিস্টলি ১৭৩৩ খৃস্টাব্দে লিডস এর ৬ মইল দক্ষিণ- পশ্চিমে ক্ষুদ্র ফিল্ডহেড গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন স্থানীয় একজন বস্ত্র উৎপাদক। প্রিস্টলি ছিলেন পিতার জ্যোষ্ঠপুত্র। তার ৬ বছর বয়সের সময় মা মারা যান। কঠোর ক্যালভিনীয় শিক্ষায় বাড়িতে তিনি বেড়ে ওঠেন। কিন্তু স্কুলে তিনি সেই সব ভিন্ন ধর্মীয় আদর্শের অনুসারী শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন যারা চার্চ অব ইংল্যান্ডের মতবাদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতেন। একজন যাজক হওয়ার লক্ষ্যে তিনি ল্যাটিন, গ্রীক ও হিব্রু ভাষা ভালোভাবে আয়ত্ত করেন। আদমের পাপ (Adam’s Sins) বিষয়ে তিনি পর্যাপ্ত অনুতাপ প্রদর্শন না করায় তাকে বন্ধু সভার (Elders of the Quakers) সদস্য ভুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। অর্থোডক্স চার্চের সকল মতবাদের অনুসারী নয়, এমন কাউকে গ্রহণ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তাকে একটি সুপরিচিত একাডেমিতে পাঠানো হয় যেখানে শিক্ষক ও ছাত্ররা অর্থোডক্স চার্চের মতবাদ ও ‘ধর্মবিরোধী মতবাদ’ তথা একত্ববাদে বিশ্বাসের মধ্যে বিভক্ত ছিল। এখানে প্রিস্টলি খৃষ্টান চার্চের মৌলিক মতবাদ সমূহের বিশেষ করে ত্রিত্ববাদের সত্যতার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন। তিনি যতই বাইবেল পাঠ করলেন ততই তার নিজের মতে আস্থাশীল হয়ে উঠলেন। আরিয়াস, সারভেটাস ও সোজিনির রচনা তার মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে। তাদের মত তিনিও সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ধর্মগ্রন্থগুলো ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কে জোরালো প্রমাণ দিতে পারে নি। এর ফল হলো এই যে, তিনি যখন শিক্ষা শেষ করে একাডেমি ত্যাগ

করলেন, দেখা গেল তখন তিনি একজন কট্টর আরিয়াস অনুসারীতে পরিণত হয়েছেন।

প্রিস্টলি বার্ষিক ৩০ পাউন্ড বেতনে একজন যাজকের সহকারী নিযুক্ত হন। যখন আবিষ্কৃত হলো যে, তিনি একজন আরিয়াস অনুসারী তখন তাকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ১৭৫৮ খৃস্টাব্দে তিনি চেশায়ারে নান্টউইচে (Nantwich) একজন যাজক হিসেবে নিয়োগ লাভ করতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি তিন বছর চাকুরি করে। তার আয় অতি সামান্য হওয়ায় প্রাইভেট টিউশনির মাধ্যমে তিনি আরো অর্থোপার্জন করতেন। খুব শিগগিরই একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আরিয়াসপন্থীরা ১৭৫৭ খৃস্টাব্দে ওয়ারিংটনে (Warrington) একটি একাডেমী প্রতিষ্ঠা করলে প্রিস্টলি নান্টউইচ ত্যাগ করেন এবং সেখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। অবসরকালীন সময়ে তিনি প্রায়ই লন্ডন গমন করতেন। এভাবেই এক সফরের সময় লন্ডনে বিজ্ঞানী বেনজামিন ফ্রাংকলিনের সাথে তার প্রথমবারের মত সাক্ষাৎ ঘটে। ১৬৬৭ সালে তিনি তার পুরোনো বাসস্থানের কাছাকাছি লিডস (Lids)-এর মিল হিল (Mill Hill)- এর যাজক হয়ে আসেন। সেখানে তিনি ৬ বছর ছিলেন। লিডস-এ প্রিস্টলি বেশ কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করেন। শিগগিরই একত্ববাদের একজন অসাধারণ ও জ্ঞানী মুখপাত্র হিসেবে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। অবসর সময়ে তিনি রসায়নবিদ্যা পাঠ করতে শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে তার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি রয়াল সোসাইটির স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৭৭৪ সালে তিনি অক্সিজেন আবিষ্কার করার ফলে অত্যন্ত বিখ্যাত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে আরো গবেষণায় তিনি নতুন কিছু গ্যাস আবিষ্কার করেন যা তার আগে আর কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেন নি। তবে পদার্থ বিজ্ঞানের চেয় ধর্মের ব্যাপারেই তিনি বেশি উৎসাহী ছিলেন। তাই তিনি এসব আবিষ্কারকে একজন ধর্মতত্ত্ববিদের অবসর মুহূর্তের ফসল হিসেবেই বিবেচনা করতেন। আত্মজীবনীতে প্রিস্টলি তার এসব যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাত্র একটি পৃষ্ঠা ব্যয় করেছেন। এক সময় তিনি লিখেছিলেন: “রসায়নের কয়েকটি শাখায় আমি কিছু আবিষ্কার করেছি। আমি এ ব্যাপারে কখনোই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দিই নি এবং সাধারণ প্রক্রিয়াসমূহের ব্যাপারেও আমি সামান্যই জানতাম।৫৫

পরবর্তীতে যোসেফ প্রিস্টলি আর্ল অব শেলবার্সের (Earl of Shellburne) লাইব্রেরিয়ান ও সাহিত্য সঙ্গী হন। এ কাজের জন্য তাকে আকর্ষণীয় বেতন এবং তার খুশি মত কাজ করার স্বাধীনতাসহ আজীবন ভাতা বরাদ্দ করা হয়। তিনি এ কাজে ৭ বছর নিয়োজিত ছিলেন। তার গ্রীষ্মের দিনগুলো কাটত আর্লের পল্ল­ী- প্রসাদে এবং শীতকাল কাটত লন্ডনে। প্যারিস, হল্যান্ড, বেলজিয়াম ও জার্মানী সফরের সময় তিনি আর্লের সঙ্গী ছিলেন। আর্ল বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের সাথে প্রিস্টলির বন্ধুত্বের কারণে বিব্রত বোধ করতে থাকেন। করণ এ সময় ফ্রান্সে যে বিপ্ল­ব চলছিল ফ্রাংকলিন তার সমর্থক ছিলেন। প্রিস্টলি আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রাংকলিনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন এবং এর অত্যল্পকাল পরই বসবাসের জন্য বার্মিংহাম চলে যান। এই শহরে তার বসবাস ১১ বছর স্থায়ী হয়। যদিও শেষদিকটি ছিল অত্যন্ত মর্মবিদারক ট্রাজেডি, তা সত্ত্বেও এটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুখকর অধ্যায়। যাজক হিসেবে তাকে সপ্তাহে মাত্র এক দিন অর্থাৎ রবিবারে দায়িত্ব পালন করতে হতো। সে কারণে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তিনি প্রাণভরে গবেষণাগারে কাজ করতে ও ইচ্ছেমত লিখতে পারতেন।

বার্মিংহামে থাকতে প্রিস্টলি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী গ্রন্থ History of the Corruptions of Christianity রচনা করেন। এ গ্রন্থটি চার্চকে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ করে তোলে। এ গ্রন্থে প্রিস্টলি শুধু ত্রিত্ববাদের বৈধতা প্রত্যাখ্যানই করেন নি, উপরন্তু তিনি যীশুর মানবীয়তাকেও সমর্থন করেন। তিনি বলেন, যীশু জন্ম সম্পর্কে যেসব বর্ণনা ও বিবরণ পাওয়া যায় তা পরস্পর অসংগতিপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যীশু ছিলেন একজন মানুষ। মানুষের মতই সকল উপাদানে তিনি গঠিত ছিলেন। আর দশজন মানুষের মত তিনিও অসুস্থতা, অজ্ঞতা, সংস্কার ও দুর্বলতার প্রবণতা সম্পন্ন ছিলেন। বিশ্বে নৈতিক বিধান চালুর জন্যই ঈশ্বর তাঁকে নির্বাচিত করেছিলেন। তার কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল অলৌকিক ক্ষমতা। যীশুকে মৃত্যু পরবর্তী পরলৌকিক জীবন সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান দান করে মানুষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল যে জীবনে মানুষকে তার ইহজীবনের সৎকাজের জন্য পুরস্কৃত করা হবে, নিছক খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য নয়। সরকার কিংবা চার্চ কেউই প্রিস্টলির এই মত পছন্দ করতে পারে নি।

প্রিস্টলি যীশুর মানবীয়তাকে শুধু সমর্থনই করেন নি, যীশুর অলৌকিক জন্মগ্রহণের (Immaculate Conception) বিষয়টিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে তিনি এক নয়া চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেন। এর ফলশ্রুতিতে একত্ববাদীদের অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে হাল-বিহীন এক জাহাজের মত। সার্বজনীন একত্ববাদ নামে পরিচিত যে আন্দোলনের সূচনা হয়, তাতে এক দিক নির্দেশনার একান্তই অভাব ছিল। তাই যীশুর অলৌকিক জন্মগ্রহণের ধারণা প্রত্যাখ্যান সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ও তিক্ত এক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে যা একত্বাদের সমর্থকদের মঙ্গলের চাইতে ক্ষতিসাধন করে বেশি। ফরাসি বিপ্ল­ব ও সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইংল্যান্ডেও অনুরূপ আরেকটি আন্দোলনের জন্ম ঘটে যা বহু ইংল্যান্ডবাসীকে ভীত করে তোলে। গোঁড়া চার্চ এই সুযোগে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, প্রিস্টলির শিক্ষা ইংল্যান্ডেও অনুরূপ ট্রাজেডির সৃষ্টি করবে। এর ফলে প্রিস্টলিকে অপমান করে ও তাকে হুমকি দিয়ে লেখা অসংখ্য চিঠি তার বাড়িতে আসতে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তার কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়।

১৭৯১ খৃস্টাব্দে ১৪ জুলাই একদল লোক বার্মিংহামের একটি হোটেলে বাস্তিল পতনের বার্ষিকী উদযাপন করছিল। এ সময় শহরের বিচারকদের নেতৃত্বে এক বিশাল জনতা হোটেলের বাইরে সমবেত হতে শুরু করে। প্রিস্টলি এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন ধারণা করে তারা হোটেলে হামলা চালায় ও জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে। প্রিস্টলি সেখানে ছিলেন না। জনতা তখন প্রিস্টলির বাড়িতে হামলা চালায়। প্রিস্টলির ভাষায় “তারা নিষ্ঠুরভাবে লুন্ঠনপূর্ব সমাপ্ত করে বাড়িটিতে আগুন জ্বালিয়ে দিল।”৫৬ তার গবেষণাগার, লাইব্রেরি এবং তার সকল পাণ্ডুলিপি ও দলিলপত্র পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এক বন্ধু আগে থেকে সতর্ক করে দেওয়ায় প্রিস্টলি কোনো রকমে প্রাণে রক্ষা পান। পরদিন সকল গুরুত্বপূর্ণ একত্ববাদে বিশ্বাসী মানুষের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর দু’দিন পর জনতা, যারা ঘোষিত একত্ববাদী নয়, কিন্তু একত্ববাদীদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে এমন সব লোকদের বাড়িগুলোও পুড়িয়ে দেয়। এ সময়টি বার্মিংহামের লোকজনের কাটে আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে। সকল দোকান-পাট বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষকে উন্মত্ত জনতার রোষ থেকে বাঁচার জন্য “চার্চ ও রাজা” চিৎকার করে উচ্চারণ করতে ও দরজায় লিখে রাখতে দেখা যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। তখন দাঙ্গাকারীরা অদৃশ্য হয়।

এ পর্যায়ে বার্মিংহামে অবস্থান করা প্রিস্টলির জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। তিনি ছদ্মবেশে লন্ডলের উদ্দেশ্যে বার্মিংহাম ত্যাগ করেন। বার্মিংহামের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন: “আইনবিহীন সহিংসতা থেকে পালানোর পরিবর্তে আমি পালিয়েছিলাম গণবিচার থেকে। চূড়ান্ত প্রতিহিংসার উন্মত্ত আবেগ নিয়ে সেখানে আমাকে খোঁজা হচ্ছিল।”৫৭ লন্ডলে এসে লোকের চিনে ফেলার ভয়ে তিনি রাস্তায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে সক্ষম ছিলেন না। ইতোমধ্যে তার আশ্রয়দাতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ফলে তাকে একটি ভাড়া বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। তার গৃহস্বামী শুধু বাড়ি হারানোর ভয়েই শঙ্কিত ছিলেন না, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি হারানোর ভয়েও ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

১৭৯৪ খৃস্টাব্দে বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনকে সাথে নিয়ে প্রিস্টলি আমেরিকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ফিলাডেলফিয়া পৌঁছে তারা শহরে ও আশপাশে প্রথম কয়েকটি একত্ববাদীদের চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে ইংল্যান্ডের পরিস্থিতি অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ১৮০২ খৃস্টাব্দে প্রিস্টলির পুরোনো সংগঠন একটি ক্ষুদ্র গির্জা স্থাপন করে। একত্ববাদীদের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা বিলাশামকে (Bilsham) উক্ত গির্জার উদ্বোধনী ধর্মোপদেশ প্রদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে প্রিস্টলি আমেরিকাতেই থেকে যান। ১৮০৪ খৃস্টাব্দে তিনি মারা যান।

ইংল্যান্ডে একত্ববাদীদের জন্য প্রিস্টলির বড় অবদান হলো ঈশ্বরের একত্বের সমর্থনে ব্যাপক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক যুক্তিসমূহ। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং প্রাচীন খৃষ্টান যাজক ও ধর্মপ্রচারকগণের রচনা থেকে এসব যুক্তি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলো তিনি তার সময়কালের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমস্যায় যুক্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করতেন। তিনি লিখেছিলেন, “অসার বিষয়কে শক্তি দিয়ে যুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে টিকিয়ে রাখা পায় না।”৫৮ তার সকল ধর্মীয় কর্মকান্ডের মধ্যে দুই খন্ডে লেখা History of the corruptions of Christianity গ্রন্থটি ছিল সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী। এ গ্রন্থে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত খৃষ্টান ধর্ম, যা প্রথমদিকের চার্চের ধর্ম বিশ্বাসের অঙ্গ ছিল, তা একত্ববাদী এবং এ বিশ্বাস থেকে সকল ধরনের বিচ্যুতি কার্যত ধর্মবিকৃতি ছাড়া কিছুই নয়। এ গ্রন্থটি ইংল্যান্ড ও আমেরিকার গোঁড়া খৃষ্টানদের ক্রুদ্ধ এবং উদার পন্থীদের আনন্দিত করেছিল। হল্যান্ডে গ্রন্থটি প্রকাশ্যে পোড়ানো হয়। এ গ্রন্থে প্রিস্টলি লিখেছেন:

খৃষ্টান ধর্মের পদ্ধতিটি বিবেচনা করে দেখলে যে, কেউ একে ধর্মের বিকৃতি ও অপব্যবহারের জন্য দায়ী বলে ভাবতে পারে। খৃষ্টান ধর্মের বাহ্যিক রূপে থেকে যা মনে হয় তা হলো এই যে, মানব জাতির শাশ্বত পিতা (ঈশ্বর) যিশুখ্রিস্টকে মানুষকে সৎকাজ করার আহ্বান জানাতে, অনুশোচনাকারীদের জন্য তার ক্ষমার আশ্বাস প্রদান করতে এবং সকল সৎকর্মকারীদের জন্য পরকালে অমর জীবন ও সুখময় দিন যাপনের সংবাদ পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব প্রদান করেন। এর মধ্যে এমন কিছু নেই যা নিয়ে দুর্বোধ্য জল্পনা-কল্পনা সৃষ্টি বা আপত্তিকর মনে হতে পারে। এ মতবাদ এতই সরল যে, জ্ঞানী-অজ্ঞানী সকলের কাছেই তা শ্রদ্ধার বিষয় বলে যে কারোরই মনে হবে। যে ব্যক্তি এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত নয়, সে এ ধর্মের প্রচারকালে এ ধর্ম ব্যবস্থার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর বিকৃতি ও অপব্যবহার সম্পর্কে কিছু খুঁজতে গেলে ব্যর্থ হবে। যীশু ও তার ধর্মপ্রচারকগণ পূর্ব থেকেই অবহিত হয়েছিলেন যে, এক সময় সত্য থেকে ব্যাপক বিচ্যুতি ঘটবে এবং তারা যা শিক্ষা প্রদান করেছেন তার সাথে চার্চের মতবাদের বিরাট ফারাক ঘটবে, এমনকি তা সত্য ধর্মের জন্য ধ্বংসকর হবে।

যা হোক, বাস্তবে ধর্মের বিকৃতির কারণসমূহ উত্তরোত্তর বহাল থাকে এবং তদনুযায়ী, ধর্মের স্বাভাবিক রীতি- নীতি আরো অনুসরণের বদলে অপব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এক্ষেত্রে যা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক তা হলো, সত্য ধর্মের স্বাভাবিক কারণে এসব অপব্যবহার ধীরে ধীরে সংশোধিত হচ্ছে এবং খৃষ্টানধর্ম তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও মহিমা ফিরে পাচ্ছে।

এ ধর্মীয় বিকৃতির কারণসমূহ প্রায় সর্বাংশেই অ-খৃষ্টান জগতের প্রচলিত মত থেকে উদ্ভূত, বিশেষ করে তাদের দর্শনের অংশ এগুলো। সে কারণেই এই অ-খৃষ্টানরা যখন খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করল তারা এর সাথে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কারগুলিও মিশিয়ে দিল। উপরন্তু ইয়াহূদী ও অ-খৃষ্টানরা উভয়েই অভিন্ন অনিষ্টকারী হিসেবে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন এমন এক ব্যক্তির অনুসারী হওয়ার ধারণায় এতবেশি মর্মপীড়ার শিকার হয়ে পড়েছিল যে, খৃষ্টানরা এ কলঙ্ক একেবারে মুছে ফেলতে যে কোনো মতবাদ পুরোপুরি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল।

বলা হয় যে, মানুষের মানসিক ক্ষমতা শরীর কিংবা মস্তিষ্ক থেকে পৃথক বিষয় এবং এই অদৃশ্য আত্মিক অংশ, অথবা আত্মা, দেহের সাথে সম্মিলনের পূর্বে বা পরে নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম, সকল দর্শনের মধ্যেই তা গভীর শিকড় বিস্তার করেছে, এই উদ্দেশ্যের জবাব খোঁজার ক্ষেত্রে চমৎকারভাবে তার ওপর নির্ভর করা হয়েছে। এ পন্থায় খৃষ্টানরা খৃষ্টের আত্মাকে তার জন্মের পূর্বেই তাদের পছন্দ মত একটি ঐশ্বরিক মর্যাদায় স্থাপিত করতে সক্ষম হয়। প্রাচ্য দর্শন থেকে উদ্ভূত মতবাদ গ্রহণকারী অধ্যাত্ম রহস্যবাদী খৃষ্টানগণ এ নীতি অবলম্বন করেছিল। পরবর্তীতে খৃষ্টান দার্শনিকগণ জ্ঞান অথবা ঈশ্বর পিতার সর্ব নিয়ন্ত্রক শক্তিকে ব্যক্তিসম্ভুত করে ঈশ্বর পিতার সমকক্ষ করার অন্য নীতি গ্রহণ করে…।

খৃষ্টানধর্মের সদর্থক প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। এর উদ্ভব ঘটে ধর্মীয় রীতি ও অনুষ্ঠানের বিশুদ্ধকরণ ও পবিত্রকরণের মতবাদ থেকে, যা ছিল অ-খৃষ্টানদের উপাসনার সর্বপ্রধান ভিত্তি এবং সেগুলো ছিল ইয়াহূদী ধর্মের অপব্যবহারের অনুরূপ। আমরা অ-খৃষ্টানদের মত ও আচার-কর্মের মধ্যে সন্ন্যাসীদের কৃচ্ছ্রতার সকল উপাদান দেখতে পাই যারা শরীরকে মাসকারাভূষিত হওয়ার ও বাসনা দমন করার মাধ্যমে আত্মাকে পবিত্র ও মহিমান্বিত করার চিন্তা করত। চার্চের কর্তৃত্বের এই অপব্যবহারকে সহজেই বেসামরিক সরকারের অপব্যবহারের মতই ব্যাখ্যা করা যেত। জাগতিক স্বার্থসম্পন্ন লোকেরা তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যে কোনো সুযোগকে কাজে লাগাতে সদাপ্রস্তুত ছিল এবং অন্ধকার যুগে এমন বহু ঘটনা সংঘটিত হয় যা তাদেরকে এ ধরনের বিচিত্র সুযোগ এনে দিয়েছিল।

সামগ্রিকভাবে আমি বলতে চাই যে, একজন মনোযোগী পাঠকের কাছে এটা সুস্পষ্ট হবে যে, খৃষ্টান ধর্মের ধর্ম বিশ্বাস ও প্রতিটি কর্মকান্ডে বিকৃতি রয়েছে, আর তা হলো পরিস্থিতিতে তার প্রচার ঘটেছিল, তারই ফল। এ সাথে একথাও বলতে হয় যে, এ বিচ্যুতি থেকে মুক্তিও বিভিন্ন পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিণতি।

পুরো বিষয়টিকে (খৃষ্টানদের ভ্রান্ত অবস্থান) সংক্ষিপ্ত করলে দাঁড়ায়:

সাধারণ সভা পুত্রকে পিতার মত একই বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছিল।

পবিত্র আত্মাকে ত্রিত্ববাদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

মানবিক আত্মার অধিকারী খৃষ্টকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রক শক্তির সাথে সংযুক্ত করেছিল।

খৃষ্টের ঐশ্বরিক ও মানবিক বৈশিষ্ট্যের কল্পিত মিলন ঘটিয়েছিল এবং

এই মিলনের পরিণতি হিসেবে দু’টি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে একই ব্যক্তি গঠিত হওয়ার কথা সমর্থন করেছিল।

এসব বৈশিষ্ট্য মনে রাখার জন্য যথেষ্ট ভালো স্মৃতিশক্তি প্রয়োজন। কারণ এগুলো শুধু কথার বেসাত, এর সাথে ভাবনা- চিন্তার কোনো সম্পর্ক নেই।৫৯

“The History of Jesus Christ” নামে প্রিস্টলি আরো একটি গ্রন্থে তিনি বলেছেন:

আমরা যখন কোনো বিষয়ে একটি বা বেশ কিছু বইয়ের মতবাদ খুঁজে দেখি এবং যখন বিভিন্ন মতের সমর্থনে বক্তব্যসমূহ দেখতে পাই, তখন আমাদের প্রধানত বিবেচনা করতে হবে যে, পুরো গ্রন্থটির মূল সুর ও মর্ম কি অথবা এ ব্যাপারে প্রথম সযত্ন অনুসন্ধান একজন নিরপেক্ষ পাঠকের ওপর কি ছাপ ফেলবে…। আমরা যদি সৃষ্টি সম্পর্কে মূসা আলাইহিস সালামের ধারণা আলোচনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, তিনি একজনের বেশি ঈশ্বরের উল্লেখ করেন নি যিনি স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি পৃথিবীতে গাছপালা ও জীব-জন্তু সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি

মানুষও সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে বহুবচনাত্মক সংখ্যা তখনি ব্যবহৃত হতে পারে যখন তার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপন করা হয়। “চল, আমরা মানুষ সৃষ্টি করি” (আদি পুস্তক ১ : ২৬); কিন্তু এটা যে শুধুমাত্র বাগশৈলী তার প্রমাণ মিলে কিছু পরেই একবচন সংখ্যা থেকে, ঈশ্বর মানুষকে তার নিজস্ব কল্পনায় সৃষ্টি করেছেন। (আদি পুস্তক ৫ : ২৭), সুতরাং স্রষ্টা কিন্তু একজনই। উপরন্তু বাইবেলের তোরণ নির্মাণ বিবরণেও আমরা পাঠ করি যে, “ঈশ্বর বললেন, চল আমরা নীচে নামি এবং সেখানে তাদের ভাষা তালগোল পাকিয়ে গেছে” (আদি পুস্তক ১১ : ৭); কিন্তু পরবর্তী বাক্যেই আমরা দেখতে পাই যে, প্রকৃতপক্ষে এ কাজটি যিনি করেছিলেন তিনি ছিলেন একক সত্ত্বা মাত্র।

ঈশ্বরের সঙ্গে আদম আলাইহিস সালাম নূহ আলাইহিস সালাম ও অন্যান্য নবীর কথোপকথনের ক্ষেত্রে কখনোই এক সত্ত্বা ছাড়া অন্য কিছুর উল্লেখ পাওয়া যায় না। তারা ঈশ্বরকে একজন হিসেবেই সম্বোধন করেছেন। কোনো কোনো সময় তাকে “যিহোভা” অন্যান্য সময় “ইবরাহিমের ঈশ্বর” ইত্যাদি নামেও তাকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু এখানে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না যে, প্রথমেই যাকে ঈশ্বর নামে সাধারণ সম্বোধন করা হয়েছে এবং পৃথিবী ও স্বর্গের স্রষ্টা বলে যাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তিনি একই সত্ত্বা।

ধর্মগ্রন্থগুলোতে স্বর্গীয় দূতদের (Angels) বিষয়ে বারংবার উল্লেখ রয়েছে যারা কখনো কখনো ঈশ্বরের নামে কথা বলেছেন, কিন্তু তারা সর্বদাই স্রষ্টা এবং ঈশ্বরের দাস হিসেবে উল্লি­খিত… কোনো অবস্থাতেই এসব স্বর্গীয় দূতকে “ঈশ্বর” বলা যেতে পারে না। তারা সর্বোচ্চ সত্ত্বার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে কিংবা তার সমমর্যাদা সম্পন্ন হতে পারেন না।

ঈশ্বরের একত্ব সম্পর্কিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টে বার বার গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রথম নির্দেশ হলো, “আমার পূর্বে আর কোনো ঈশ্বর ছিল না” (যাত্রা পুস্তক ২০ : ৩)। এ কথাটি আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “ হে ইসরাইলিরা, শোন, যিনি প্রভূ তিনিই ঈশ্বর, তিনি একজনই” (দ্বিতীয় বিবরণ ৫: ৪)। এ বিষয়ে পরবর্তী নবীদের ক্ষেত্রে কি ঘটেছিল তা পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ আমার নেই। দেখা যায়, ইয়াহূদী ধর্মে এটি ছিল বিরাট বিষয় এবং এর ফলে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্বপূর্ণ উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধান, নিজেদের মধ্যে একেশ্বরের জ্ঞান সংরক্ষণ অন্যান্য জাতির সাথে তাদের পার্থক্য সূচিত করেছিল, অন্যদিকে বাকি বিশ্ব ছিল মূর্তিপূজার অনুসারী। এ জাতির মাধ্যমে এবং অনুসৃত শৃঙ্খলার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এই মহান মতবাদ কার্যকরভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল এবং আজো তা অব্যাহত আছে।

ত্রিত্ববাদ যেমনটি বলে তেমনটি পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন একাধিক ঈশ্বর থেকে থাকলে তা নুনতম পক্ষে মৌলিক ইয়াহূদী ধর্ম- মতবাদের লঙ্ঘন হতো এবং তা নিশ্চিতরূপে ব্যাখ্যা দাবি করত, উপরন্তু এর বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হত। শাশ্বত পিতার যদি কোনো পুত্র এবং আরো একটি আত্মা থেকে থাকে (পবিত্র আত্মা) যারা প্রত্যেকে তার নিজের সমান ক্ষমতা ও মহিমা সম্পন্ন, যদিও এমন একটি অর্থ থাকা উচিৎ ছিল যে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত ঈশ্বর তবুও সঠিকভাবে বলতে গেলে মাত্র একজন মাত্র ঈশ্বর রয়েছেন। ন্যূনতম পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত হতে পারত যে, তিন জনের প্রত্যেকেই যদি প্রকৃত ঈশ্বর হতেন তারা সকলে মিলে তিন ঈশ্বর হতেন। তবে যেহেতু ওল্ড টেস্টামেন্টে এ ধরনের কিছু বলা হয় নি, কোনো আপত্তি উত্থাপন বা তার জবাবও দেওয়া হয় নি। সুতরাং প্রতীয়মান হয় যে, এ ধারণাটি তখন ছিল না। সেকালের কোনো বক্তব্য বা ঘটনা থেকেও এ ধরনের সমস্যার কথা জানা যায় না।

ইয়াহূদীরা যে জ্ঞান ও উপলব্ধি দিয়ে তাদের নিজেদের পবিত্র গ্রন্থ সমূহ অবধান করত, আমরা যদি তার দ্বারা পরিচালিত হই, তাহলে যা দেখতে পাব তা হলো, খৃষ্টীয় ত্রিত্ববাদের মতো কোনো মতবাদ সেসব গ্রন্থে নেই। প্রাচীন বা আধুনিককালের কোনো ইয়াহূদী তাদের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো মতবাদ কখনোই গ্রহণ করে নি। ইয়াহূদীরা সব সময়ই তাদের ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বর এক, একাধিক ঈশ্বরের উল্যে­খ না করা এবং সেই অদ্বিতীয় সত্ত্বাই পৃথিবীর স্রষ্টা প্রভৃতি শিক্ষা প্রদানের জন্যই ব্যবহার করেছে এবং তাদের এসব ধর্মগ্রন্থ যাজক ও নবীদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে ঈশ্বর, স্বর্গীয় দূত (ফিরিশতা) ছাড়া তাদের পাশাপাশি অন্য কোনো সত্ত্বার কথা বলে নি।

খৃষ্টানরা কল্পনা করে যে, ত্রি-ঈশ্বরের মধ্যে মসীহের (Messiah) স্থান হলো দ্বিতীয়। কিন্তু ইয়াহূদীরা কখনোই এ ধরনের কোনো বিষয় কল্পনা করে নি। অন্যদিকে আমরা যদি এ মহান ব্যক্তির নবিত্ব সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণীর বিষয়টি বিবেচনা করি, আমরা দেখতে পাব যে, তারা তাকে মানুষের বাইরে অতিরিক্ত কিছু হিসেবে প্রত্যাশা করে নি। এটা নিঃসন্দেহে সন্তোষজনক। মসীহকে “স্ত্রীলোকের সন্তান” শিরোনামের অধ্যায়ে আমাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে ঘোষণা করা হয়েছে বলে মনে হয়” (আদি পুস্তক ৩ : ১৩)। ঈশ্বর ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, পৃথিবীতে তার বংশধরগণের প্রতি ঈশ্বরের আশীর্বাদ থাকবে (আদি পুস্তক ১২: ৩)। এ বিষয়টি (মোটেও যদি মসীহের সাথে জড়িত হয়ে থাকে) আমাদেরকে যে ধারণা দেয় তা হলো এই যে, তার কোনো সন্তান বা বংশধর মানব সমাজের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ বয়ে আনার কারণ হবেন। এ প্রসঙ্গে মসীহ সম্পর্কে মূসা আলাইহিস সালামের কথিত বর্ণনার কথাও উল্যেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, আমি তাদের নবী হিসেবে সৃষ্টি করব তাদের মধ্য থেকে, তোমার মত এবং তার মুখে দেব আমার বাণী এবং আমি তাকে যা নির্দেশ প্রদান করব সে তা তাদের কাছে ব্যক্ত করবে: (দ্বিতীয় বিবরণ ১৮ : ১৮)। এখানে ত্রিত্ববাদ অনুযায়ী দ্বিতীয় ঈশ্বরের মত কিছু নেই বা পিতার সমকক্ষ কোনো ব্যক্তির কথা বলা হয় নি- এখানে বলা হয়েছে একজন নবীর কথা যিনি ঈশ্বরের নামে কথা বলবেন এবং তাই করবেন যা করার জন্য তিনি নির্দেশিত….।

নিউ টেস্টামেন্টেও আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে ওল্ড টেস্টামেন্টের মত একই মতবাদ লক্ষ্য করি। প্রথম এবং শ্রেষ্ঠতম ঐশ্বরিক নির্দেশ কী, ধর্মগুরুর এ অনুসন্ধানের জবাবে আমাদের পবিত্র আত্মা বলেন, “হে ইসরাঈলিগণ, ঈশ্বরে প্রথম নির্দেশ হলো আমাদের প্রভূ যিনি ঈশ্বর তিনি এক প্রভূ” ইত্যাদি এবং ধর্মগুরু তার জবাবে বলেন “হ্যাঁ প্রভূ! আপনি সত্য বলেছেন: কারণ ঈশ্বর একজনই আছেন এবং তিনি ছাড়া আর কোনো ঈশ্বর নেই” ইত্যাদি।

যীশু সর্বদাই তার ঈশ্বর ও পিতা হিসেবে এই এক ঈশ্বরের উপাসনাই করেছেন। তিনি বলতেন তার ধর্মমত ও শক্তি তিনি ঈশ্বরের কাছ থেকেই প্রাপ্ত এবং তিনি বারংবার তার নিজের কোনো শক্তি বা ক্ষমতা থাকার কথা অস্বীকার করেছেন (যোহন ৫ : ১৯), “তখন যীশু জবাব দিলেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয় আমি তোমাদের বলছি, পুত্র নিজে কিছুই করতে পারে না।” “আমি তোমাদের কাছে যা ব্যক্ত করেছি, তা আমার নিজের কথা নয়, সেগুলো হলো আমার পিতার যিনি আমার ভিতরে বাস করেন, তিনিই সবকিছু করেন” (গালাতী ১৪ : ১৯)। “আমার সহযোগীদের কাছে গমন কর এবং তাদের উদ্দেশ্যে বল, আমি আমার পিতার ও তোমাদের পিতার এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বরের অধীনস্থ” (গালাতীয় ২০ : ১৭)। কোনো ঈশ্বর এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করবেন, কোনোক্রমেই তা হতে পারে না।

শেষ দিকের ধর্মপ্রচারকগণ তাদের লেখা, কথা বার্তার একই বিশ্বাস ও ধারণা ব্যক্ত করেছেন। তারা পিতাকে একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর এবং খৃষ্টকে একজন মানুষ ও ঈশ্বরের বান্দা হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন যিনি তাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং তার প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে খৃষ্ট যেসকল শক্তির অধিকারী ছিলেন তা তিনি তাকে দিয়েছিলেন। (প্রেরিতদের কার্য ২ : ২২)। পিটার বলেছেন “ হে ইসরাইলিগণ, তোমরা শোন, নাজারেথের যীশু, তিনি তোমাদের মধ্যে ঈশ্বর কর্তৃক মনোনীত, তিনি অলৌকিক, আশ্চর্য ক্ষমতা ও নিদর্শনসমূহের অধিকারী যা ঈশ্বর তাকে দিয়েছেন, ইত্যাদি, ঈশ্বর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।” পলও বলেছেন, “ঈশ্বর একজনই বিরাজমান এবং ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে একজন মধ্যস্থ ছিলেন, সেই লোকটি হলেন যিশুখ্রিষ্ট” (তীমথীয় ২ : ৫)।

ইতিহাসের ধারায় দেখা যাবে যে, সেসব সাধারণ মানুষ, যাদের ব্যবহারের জন্য নিউ টেস্টামেন্ট রচিত হয়েছিল, তারা সেগুলোর মধ্যে খৃষ্টের কোনো প্রাক- অস্তিত্ব বা ঈশ্বরত্ব দেখে নি। অথচ এখনকার বহু লোকই দৃঢ় বিশ্বাসী যে, তারা সেগুলোর মধ্যে তা দেখেছে। তা যদি সত্যই হয়ে থাকে তাহলে ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টে যেমন সুনির্দিষ্ট এক ঈশ্বরের মতবাদ সুষ্পষ্টভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ত্রিত্ববাদ সেখানে সুষ্পষ্টভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় নি কেন? ন্যূনতমভাবে নিউ টেস্টামেন্টে তো তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যেত। কেন একত্ববাদকে এত শর্তহীনভাবে, ত্রিত্ববাদের প্রতি কোনো ছাড় ব্যতিরেকে, যাতে এ ব্যাপারে কোনো বিভ্রান্তি না ঘটতে পারে এত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে? যেমনটি আজকাল গোঁড়া শিক্ষা রীতি, ধর্মমত, উপদেশ সকল ক্ষেত্রেই ত্রিত্ববাদের বিভ্রান্তিকে লালন করা হচ্ছে। ধর্মতত্ত্ববিদ গণ খুবই মামুলি কথাবার্তার ওপর অনুমান করে অদ্ভুত এবং অ-ব্যাখ্যাযোগ্য ত্রিত্ব মতবাদ সৃষ্টি করছেন যা সুস্পষ্ট, বলিষ্ঠ এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে ধর্মগ্রন্থ সমর্থিত বলে কারো কাছেই প্রমাণ করা যায় না।

বাইবেলে এমন বহু অংশ রয়েছে যেগুলোতে সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবে একত্ববাদের মতবাদ ঘোষিত হয়েছে। ত্রিত্ববাদের সমর্থনে এরকম কোনো একটি মাত্র অংশ উদ্ধৃত করা যাবে না। তাহলে সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতিরেকে রহস্যময় সব বিষয়ে আমরা কেন বিশ্বাস করব? যারা বিশ্বাস করে যে, খৃষ্ট হয় ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অধীনে পৃথিবীর স্রষ্টা তাদের বিবেচনার জন্য আরেকটি বিষয় এখানে উত্থাপিত হতে পারে। এটি হলো: আমাদের প্রভূ (যীশু) নিজের সম্পর্কে যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে কথা বলেন এবং তার যে শক্তি দিয়ে তিনি অলৌকিক কর্মকান্ড সাধন করেন, তা তার ভাষার সাথে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হবে যদি তা থেকে অন্য কোনো ব্যক্তির চেয়ে তার নিজের কোনো শক্তি অধিক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

যদি খৃষ্ট পৃথিবীর স্রষ্টা হতেন তাহলে তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন না যে, তিনি নিজে কিছু করতে পারেন না, তিনি যা বলেন তা নিজের কথা নয় এবং তার মধ্যে যে পিতা আছে তিনিই সবকিছু করেন। কোনো সাধারণ লোক, অন্য সাধারণ লোকের মত কাজ করে যদি এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করত এবং বলত যে, সে কিছু বলে না বা করে না, তার মাধ্যমে ঈশ্বরই সবকিছু বলেন ও করেন এবং সে কোনো কিছুই বলতে বা করতে সক্ষম নয়- আমরা বলতে দ্বিধা করতাম না যে, সে হয় মিথ্যাবাদী অথবা ধর্ম অবমাননাকারী…।

যদি মনে করা হয় যে, খৃষ্ট যখন বলেছেন যে, তার পিতা তার চেয়েও শ্রেষ্ঠতর তখন তিনি তার মানব সত্ত্বার কথা ব্যক্ত করেছেন, অথচ একই সাথে তার ঐশ্বরিক সত্ত্বা সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের সমকক্ষ ছিল, তাহলে তা হবে ভাষার অপব্যবহার। মথি, মার্ক বা লূকের গসপেলে ঐশ্বরিকত্ব, এমনকি অতি দৈবিক সত্ত্বা বলে আখ্যায়িত করা যায়, এমন কিছু যীশুর প্রতি আরোপিত হয় নি। জনের গসপেলের ভূমিকায় এ ধরনের কিছু আভাস আছে বলে স্বীকার করে নিলেও একথা বিশেষভাবে উলে­খ্য যে, সেখানে এমন বহু অংশ আছে যাতে চূড়ান্তভাবে যীশুকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন এ খৃষ্টানরা উপলব্ধি করতে পারে না যে, যাদের জন্য গসপেলসমূহ রচিত হয়েছিল সেই ইয়াহূদী অথবা অ-ইয়াহুদীদের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে তথ্যের প্রয়োজন ছিল না যা এ উভয় শ্রেণির লোকদের ধারণার বাইরে ছিল বরং যা একই সময়ে ক্রুশের সমালোচনাকে কার্যকরভাবে আবৃত করেছিল, যা ছিল সে যুগের খৃষ্টানদের অব্যাহত দুর্দশার কারণ। খৃষ্টের ঈশ্বরত্ব অথবা তার পূর্ব অস্তিত্বের মতবাদ যদি সত্য হয় তাহলে তা যে অতি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ও আগ্রহোদ্দীপক বিষয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু এ খৃষ্টানরা সেগুলো সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট কোনো বিবরণ দিতে পারে না এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কেও কিছু বলে না, সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা যায় এগুলো তাদের অজ্ঞাত ছিল।

আরেকটি প্রশ্নও তাদেরকে অবশ্যই করা যেতে পারে। তা হলো, ধর্মপ্রচারকারীরা যখন যীশুকে ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অধীন পৃথিবীর স্রষ্টাকে এক অতি- দৈবিক শক্তি হিসেবে আবিষ্কার করলেন, তারপরও তারা কিভাবে তাদের প্রেরিতদের কার্যাবলী (Book of Acts) গ্রন্থে এবং পত্রাবলিতে সব সময়ই যীশুকে একজন মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন? উক্ত ধারণার পর এটা ছিল অমর্যাদাকর, অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক, মানুষের রূপে তার উপস্থিতি একেবারেই বেমানান।… আসুন, আমরা প্রেরিতদের ও যীশুর শিষ্যদের স্থানে নিজেদের স্থাপন করি। তারা নিশ্চিতভাবে যীশুকে তাদের মতই একজন মানুষ হিসেবে ভেবেছিলেন বলেই তার সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। এরপর, তিনি মানুষ নন, বরং প্রকৃত পক্ষে ঈশ্বর, অথবা পৃথিবীর স্রষ্টা বলে জানতে পারলে তাদের বিস্ময় তেমনটিই হত যেমনটি আমাদের হবে যদি আমরা আবিষ্কার করি যে, আমাদের চেনা-জানা কোনো একজন মানুষ বাস্তবে ঈশ্বর অথবা পৃথিবীর স্রষ্টা। এখানে আমাদের বিবেচনা করতে হবে যে, আমাদের কেমন অনুভূতি হত এবং আমরা এ ধরনের একজন ব্যক্তির সাথে কেমন ব্যবহার করতাম এবং তার সাথে কীভাবে কথা বলতাম। আমি আস্থাশীল যে কেউ যদি উপলব্ধি করতে পারে যে, এই লোকটি ঈশ্বর অথবা একজন স্বর্গীয় দূত, সে কখনোই ঐ ব্যক্তিকে আর মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করবে না। সে এরপর থেকে তার পদ ও মর্যাদার উপযোগী পন্থায় তার সাথে কথা বলবে।

ধারা যাক, আমাদের সাথে সংশ্লি­ষ্ট যে কোনো দু’ব্যক্তি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর স্বর্গীয় দূত মাইকেল ও গ্যাব্রিয়েল (ফেরেশতা মিকাইল ও জিবরীল) বলে প্রমাণিত হলেন। এরপরও কি আমরা তাদের মানুষ বলেই আখ্যায়িত করব? অবশ্যই না। আমরা তখন স্বাভাবিকভাবেই বন্ধুদের বলব, “ঐ দুই ব্যক্তি যাদের আমরা মানুষ বলে জানতাম, তারা মানুষ নন, ছদ্মবেশে স্বর্গীয় দূত।” এ কথাটি হবে স্বাভাবিক। যিশুখ্রিষ্ট যদি পৃথিবীতে আসার পূর্বে মানুষের চাইতে বেশি কিছু হতেন, বিশেষ করে তিনি যদি ঈশ্বর বা পৃথিবীর স্রষ্টা হয়ে থাকতেন, তিনি কখনোই পৃথিবীতে থাকাকালে একজন মানুষ হিসেবে কখনোই গণ্য হতেন না, কেননা তিনি তার শ্রেষ্ঠত্ব ও আসল বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে পারতেন না। তিনি যদি ছদ্মবেশেও থাকতেন তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি পূর্বে যা ছিলেন তাই থাকতেন এবং যারা তাকে প্রকৃতপক্ষে চিনত, তাদের কাছে সেভাবেই তিনি আখ্যায়িত হতেন।

যীশুখৃষ্টকে তখন কোনোক্রমেই ন্যায়নিষ্ঠ, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না, যদিও তার বাহ্যিক উপস্থিতি মানুষকে অভিভূক্ত করত এবং তারা তাকে এ নামে ডাকত না।

নিউ টেস্টামেন্টের বাগ-বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিলে প্রতিটি লোকের মনে যে, কথাটা নাড়া দিবে তা হলো ‘খৃষ্ট’ ও ‘ঈশ্বর’ নামক দু’টি আখ্যা যা পরস্পর বিরোধী হিসেবে আগাগোড়াই ব্যবহার হয়েছে ‘ঈশ্বর’ ও ‘মানুষ’ শব্দ দ্বয়ের মত। আমরা যদি শব্দের সাধারণ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করি, আমরা সন্তোষের সাথে দেখতে পাব যে, এমনটি কখনই ঘটত না যদি প্রথমটি পরেরটির গুণ নির্দেশক হতো, অর্থাৎ যদি খৃষ্ট ঈশ্বর হতেন।

আমরা বলি, “রাজপুত্র এবং রাজা”, কারণ রাজপুত্র রাজা নন। যদি তিনি রাজা হতেন, তাহলে আমদেরকে অন্য কোনো পার্থক্যসূচক শব্দ যেমন “বৃহৎ ও ক্ষুদ্র” ‘ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন’ ‘পিতা ও পুত্র’ ইত্যাদি ব্যবহার করতে হতে। যখন ধর্মপ্রচারক পল বলেন যে, করিনথের চার্চ খৃষ্টের এবং খৃষ্ট ঈশ্বরের একজন, (নিউ টেস্টামেন্টে বারংবার এরকম উল্লেখ আছে) তখন প্রতীয়মান হয় যে, অর্থপূর্ণভাবে খৃষ্টের ঈশ্বর হওয়া সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। অনুরূপভাবে ক্লিমেন্স রোমানাস কর্তৃক খৃষ্টকে “ঐশ্বরিক মহিমার রাজদণ্ড” হিসেবে আখ্যায়িত করা থেকে পর্যাপ্ত প্রমাণ মিলে যে, তার মতে রাজদণ্ড হলো এক জিনিস এবং ঈশ্বর অন্য জিনিস। আমার বক্তব্য এই যে, কথাটি যখন প্রথম বলা হয়েছিল তখন তার অর্থ এ রকমই ছিল।

বাইবেলগুলোর সামগ্রিক মর্ম এবং কতিপয় বিবেচনা থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় যে, সেগুলো ত্রিত্ববাদের অথবা খৃষ্টের ঈশ্বরত্ব অথবা প্রাক অস্তিত্বের পক্ষে মোটেই অনুকূল নয়। উপরন্তু আরেকটি বিবেচনার দিকে লক্ষ্য করা যায় যেদিকে কারোরই দৃষ্টি খুব একটা পড়ে নি যা এসকল মতবাদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং তা তাদের ধর্মগ্রন্থের মতবাদেরও বিরুদ্ধে। সেটি হলো যীশু মসীহ হলেও সে বিষয়টি ধর্মপ্রচারক ও ইয়াহূদীদের কাছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রকাশ করা হয়েছিল। আমদের প্রভূ দীর্ঘ সময় যাবৎ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছুই বলেন নি, বরং ইয়াহূদীদের মত তার শিষ্যদেরও তাঁকে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাদের ওপর ছেড়ে দেন। তিনি শুধু তার কাছে ব্যাপ্টিস্ট যোহন এর প্রেরিত দূতদেরকেই ব্যাপারটি জানিয়ে ছিলেন।

যীশু নিজেকে মসীহ বলে ঘোষণার পর যদি সর্বোচ্চ পুরোহিত তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে আতঙ্ক প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে তিনি যদি অন্য কোনো উচ্চতর রকম দাবি করতেন, তা শোনা বা সন্দেহ করার পর ঐ পুরোহিত কি করতেন? যদি তিনি সে রকম কিছু দাবি করতেন তবে নিশ্চয় তা প্রকাশ পেত। যখন সাধারণ মানুষ তার অলৌকিক কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করল, তারা বিস্মিত হয়েছিল এই ভেবে যে, ঈশ্বর একজন মানুষকে এ ধরনের ক্ষমতা দান করতে পারেন! জনগণ যখন তা দেখল তারা বিস্মিত ও চমৎকৃত হলো এবং ঈশ্বরের মহিমা ঘোষণা করল যিনি মানুষকে এ ধরনের ক্ষমতা দিয়েছেন (মথি ৯: ৮)। হেরোদ যে সময় তার কথা শুনলেন, কেউ কেউ ধারণা করল তিনি ইলিয়াস আলাইহিস সালাম কেউ কেউ বলল তিনি নবী এবং কেউ কেউ বলল তিনি পুনর্জীবন লাভকারী যোহন। কিন্তু কেউই তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অধীন পৃথিবীর স্রষ্টা হিসেবেভাবেনি। একটি লোকও একথা বলে না যে যীশু তার নিজের শক্তিতে এরকম অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন। প্রেরিতগণ যদি প্রকৃতপক্ষে যীশুর ঈশ্বরত্বের মতবাদই প্রচার করতেন এবং ধর্মান্তরিত ইয়াহূদীরা যদি সামগ্রিকভাবে তা গ্রহণ করত তাহলে অবিশ্বাসী ইয়াহূদীদের মধ্যে তা অবশ্যই সুবিদিত থাকত এবং সে সময় যারা পূর্বাপর একত্ববাদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিল তারা কি একাধিক ঈশ্বরের ধর্মমত প্রচারের জন্য খৃষ্টানদের কাছে আপত্তি উত্থাপন করত না? এখন পর্যন্ত প্রেরিতদের কার্যাবলী গ্রন্থ কিংবা নিউ টেস্টামেন্টের কোনোখানেই এ ধরনের কোনো কিছুর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় নি। দুই অথবা তিনজন ঈশ্বর সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব দান কতিপয় প্রাচীন খৃষ্টান পাদ্রীর রচনার উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল। তারপরও কেন আমরা প্রেরিতদের সময়ে এ ধরনের কিছু খুঁজে পাই না? এর জবাব একটাই- আর তা হলো এই যে, তখন এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় নি এবং খৃষ্টের ঈশ্বরত্বের মতবাদও উত্থাপিতই হয় নি। মন্দির ও আইনের বিরুদ্ধে কথা বলা ছাড়া স্টিফেনের বিরুদ্ধে আর কি অভিযোগ ছিল (প্রেরিতদের কার্য ৬ : ১৩)? আমরা যদি পলের সকল সফরেই তার সঙ্গী হই এবং ইয়াহূদীদের উপাসনালয়ে (Synagogue) ইয়াহূদীদের সাথে তার আলোচনাসমূহে যোগ দেই, তাদের অবিরাম ও প্রচণ্ড নির্যাতনের বিষয় লক্ষ করি, তাহলে দেখতে পাব যে, তিনি যীশুর নয়া ঈশ্বরত্বের প্রচার করেছেন বলে ইয়াহূদীরা কোনো সন্দেহ প্রকাশ করছে না। যদি যীশুর ঈশ্বরত্ব প্রচার করা হতো তাহলে ইয়াহূদীরা তাদের চিরাচরিত নিয়মে এক নয়া ঈশ্বরের প্রচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করত।

প্রেরিতগণ কখনোই যীশুর ঈশ্বরত্ব বা পূর্ব অস্তিত্বের মতো কোনো মতবাদের ব্যাপারে কি কখনো নির্দেশিত হয়েছিলেন? যদি তাই হত তাহলে তার সাথে তাদের সংযোগ স্থাপনের সময়কালটি আমাদের কাছে ধরা পড়ত যেহেতু সেটি ছিল তখনও সম্পূর্ণ নতুন ও অস্বাভাবিক এক মতবাদ। যদি এ বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে তারা দৃঢ়ভাবে সন্দেহমুক্ত না থাকতেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বিস্ময় প্রকাশ করতেন। তারা যদি অবিচল বিশ্বাসে তা অন্যদের শিক্ষা দিতেন তবে তারা তাদের তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করত না। কিছু বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে তাদের তর্ক-বিতর্ক করা কিংবা কতকগুলো বিষয়ে আপত্তির জবাব দিতে হতো। কিন্তু তাদের সমগ্র ইতিহাসে এবং তাদের বিশাল রচনার ভান্ডারে তাদের নিজেদের বিস্ময় বা সন্দেহ কিংবা অন্যদের সন্দেহ বা আপত্তির কোনো প্রমাণ মিলে না।

একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, উপাসনার যথাযথ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন পিতা ঈশ্বর, ত্রিত্ববাদে যাকে ঈশ্বরদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি বলা হয়। কার্যত ধর্মগ্রন্থগুলোতে এরকম কোনো অনুমোদিত বিধান পাওয়া যায় না যা আমাদের অন্য কোনো ঈশ্বর বা তদানুরূপ কাউকে সম্বোধন করতে বলে। এ বিষয়ে স্বপ্নে যীশুকে দেখার পর তার উদ্দেশ্যে ষ্টিফেনের কথিত সংক্ষিপ্ত ভাষনের উল্যেখ গুরুত্বহীন। যীশু সব সময়ই তার পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন, আর তা তিনি করতেন এত বিনীত ও আত্ম সমর্পিতভাবে যা একজন অতি নির্ভরশীল ব্যক্তির পক্ষেই শুধু করা সম্ভব। তিনি ঈশ্বরকে সর্বদাই তার পিতা বলে অথবা তার জীবনের প্রভূ বলে সম্বোধন করতেন এবং তিনি তার শিষ্যদেরও একই সত্ত্বার প্রার্থনা করার জন্য নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন, আমাদের তারই উপাসনা করা উচিৎ।

তদনুযায়ী শুধুমাত্র পিতার প্রার্থনা করা ছিল চার্চের সুদীর্ঘকালের নিয়ম ও ঐতিহ্য। লিটানিতে (Litany) যেমনটি রয়েছে, “প্রভু আমাদের করুণা কর”, “খৃষ্ট আমাদের করুণা কর”- এ ধরনের সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা তুলনামূলকভাবে অনেক পরে প্রবর্তন করা হয়। ক্লিমেন্টীয় প্রার্থনা যা সবচেয়ে প্রাচীন প্রার্থনা হিসেবে আজও বিদ্যমান এবং গীর্জা সংক্রান্ত সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত, এটি রচিত হয়েছিল চতুর্থ শতাব্দীতে এবং সেখানে এ ধরনের কোনো বিষয় নেই। অরিজেন প্রার্থনা বিষয়ক এক বিশাল গ্রন্থে অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে শুধু পিতাকে উপাসনার আহ্বান জানিয়েছেন, খৃষ্টকে নয়; এবং যেহেতু জনসাধারণের এ ধরনের প্রার্থনার ক্ষেত্রে নিন্দার বা দোষের কিছু আছে এমন কথা তিনি বলেননি, স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নিতে পারি যে, খৃষ্টের কাছে পূর্বোক্ত ধরনের কাতর অনুনয় বিনয় করা খৃষ্টানদের গণ প্রার্থনা সভার কাছে অজ্ঞাত ছিল।

এখানে প্রেরিতদের ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যাক। হেরোদ যখন জেমসকে হত্যা করলেন (যনি ছিলেন জনের ভাই) এবং পিটারকে বন্দী করলেন, আমরা পাঠ করি যে, চার্চে অবিরাম “ঈশ্বরের উদ্দেশ্য” প্রার্থনা করা হয়েছিল; খৃষ্টের উদ্দেশ্যে নয়, “তাঁর জন্য” (প্রেরিতদের কার্য ১২ : ৫)। পল ও সাইলাস যখন ফিলিপির কারাগারে বন্দী ছিলেন, আমরা পাঠ করি যে, তখন তারা “ঈশ্বরের গুণগান ও প্রশংসা করেছিলেন” (প্রেরিতদের কার্য ১৬: ২৫) যীশুর নয়; এবং যখন পলকে জেরুজালেম গমন করলে তার পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হলো, তখন তিনি বলেছিলেন “ঈশ্বর যা ইচ্ছা করেন তাই হবে (প্রেরিতদের কার্য ২১ : ১৪)। এ থেকে অবশ্যই মনে করা যায় যে, তারা পিতা ঈশ্বরকেই বুঝিয়েছেন, কারণ যীশু নিজেও এ ক্ষেত্রে একই ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। যেমন ঈশ্বরের উপাসনাকালে তিনি বলতেন: আমার ইচ্ছায় নয়, আপনার ইচ্ছাই পূরণ হোক…।

পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, ধর্মগ্রন্থসমূহে ত্রিত্ববাদের মত কোনো মতবাদ নেই। এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোনো যুক্তিবাদী ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের পক্ষে এ ত্রিত্ববাদ গ্রহণ বা ধারণ করা অসম্ভব। কেননা এর স্ববিরোধিতা এটাকে অর্থহীন করে দিয়েছে।

এথানাসিয়াসের ত্রি-ঈশ্বর বিষয়ক মতবাদে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, পিতা-পুত্র বা আত্মার কারোরই কোনো কিছুর অভাব নেই। কেননা তাদের মধ্যে প্রত্যেকে প্রকৃত ও যথাযথ ঈশ্বর, প্রত্যেকেই অবিনশ্বরতার দিক দিয়ে সমান এবং প্রত্যেকেই ঐশ্বরিকতায় পূর্ণাঙ্গ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা তিনজন তিন ঈশ্বর নন, শুধু এক ঈশ্বর। ফলে তারা প্রত্যেকে পূর্ণাঙ্গ ঈশ্বর হওয়া সত্ত্বেও এক এবং বহু উভয়ই। এটি নিঃসন্দেহে এক স্ববিরোধী বিষয়- যেমন একথা বলা যে, পিটার, জেমন ও জন এদের প্রত্যেকেরই এক একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে, তবে তারা সম্মিলিতভাবে তিন ব্যক্তি নয়- একজন মাত্র। “ঈশ্বর” অথবা “মানুষ” শব্দ দ্বয়ের সাথে সংশ্লি­ষ্ট ধারণা সমূহ এ দু’টি প্রস্তাবের প্রকৃতিতে কোনো পার্থক্য সূচিত করতে পারে না। নিসিয়ার কাউন্সিলের পর এই বিশেষ রীতিতেই ত্রিত্ববাদের মতবাদকে ব্যাখ্যা করার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। সে যুগের যাজক ও পাদ্রীগণ বিশেষভাবে তিন “ব্যক্তির” পূর্ণাঙ্গ সমকক্ষতা রক্ষার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। আর তা করতে গিয়ে তারা একত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। যা হোক, এ মতবাদ কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, সেটি কোনো ব্যাপার না হলেও এগুলোর একটিকে সর্বদাই অন্যটির জন্য বলি দিতে হয়। যেহেতু “ব্যক্তি” (Person) ও “সত্ত্বা” (being) শব্দের ব্যবহার নিয়ে মানুষ বিভ্রান্তির শিকার, সে কারণে তা সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। “সত্তা” আখ্যাটি প্রত্যেকটি বিষয়ের এবং তারপর ত্রি-ঈশ্বরের তিন ব্যক্তির প্রত্যেকের গুণবাচক আখ্যা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যদি বলা হয় খৃষ্টই ঈশ্বর। কিন্তু এখানে কোনো সত্ত্বা নেই, বৈশিষ্ট্য নেই যা দিয়ে তার গুণ প্রকাশ পায়। তাহলে এটাকে এক অর্থহীন বিষয় ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কিন্তু যখন বলা হয় যে, এসব ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই স্বয়ং ঈশ্বর, এর অর্থ অবশ্যই এই হবে যে, পিতা পৃথকভাবে একটি সত্ত্বা, পুত্র পৃথকভাবে একটি সত্ত্বা এবং তদানুরূপ পবিত্র আত্মারও স্বতন্ত্রভাবে একটি সত্ত্বা রয়েছে। এখানে তিনটি সত্ত্বার তিনজনই ব্যক্তি। সে ক্ষেত্রে এই তিনজন ঈশ্বর ছাড়া আর কি হতে পারেন যদি না অনুমান করা যায় যে, তিনজন সমন্বিত ব্যক্তি অথবা তিনজন পিতা, তিনজন পুত্র অথবা তিনজন পবিত্র আত্মা আছেন?

পিতার যদি জন্মদানের রহস্যময় বিচিত্র ক্ষমতা থাকে, তবে এখনও তা সক্রিয় নয় কেন? তিনি যদি অপরিবর্তনীয় নাই হবেন তাহলে শুরুতে যা ছিল এখন তা নেই কেন? তার পূর্ণাঙ্গতা কি একই আছে এবং তার পরিকল্পনা করার ক্ষমতাও কি একরই রকম রয়েছে? তাই যদি হয় তাহলে আরো সন্তান তিনি উৎপাদন করেন নি কেন? গোঁড়া যাজকরা যেমনটি জিজ্ঞাসা করে সে রকম তিনি কি সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়েছেন? অথবা তিনি তার জন্মদানের ক্ষমতা কাজে লাগাবেন কিনা সেই ইচ্ছা ও মর্জির ওপরই কি তা নির্ভরশীল? তিনি তার দ্বারা ভিন্নভাবে সৃষ্ট অন্য কোনো রূপ বা আকৃতি সম্পন্ন অন্য কোনো কিছুর মতই? এবং তিনি তারই মত একই উপাদানে গঠিত হবেন কি না?

এ প্রশ্নও অবশ্যই করতে হবে যে, ত্রি-ঈশ্বরের তৃতীয় ব্যক্তি কোনো পন্থায় উৎপন্ন হয়েছেন। তাকে প্রথম দু’ব্যক্তির স্ব স্ব পূর্ণাঙ্গতার অভিপ্রায় থেকে যৌথ ক্ষমতার মাধ্যমে হয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে একই কার্যক্রমে কেন চতুর্থ বা পরে আরো উৎপন্ন করা হলো না?

যা হোক, ত্রিত্ববাদের এই অদ্ভুত জন্মদানের কথা স্বীকার করে নিলে পুত্রের ব্যক্তিক অস্তিত্ব তার পিতার মেধা থেকেই উৎসারিত বলে অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, আর তা পুত্রের তুলনায় নিশ্চিতভাবে পিতার অগ্রাধিকার অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথাই তুলে ধরে। আর কোনো সত্ত্বাই যথাযথ ঈশ্বর হতে পারে না যদি তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন বা শ্রেষ্ঠ কেউ থাকে, সংক্ষেপে এই পরিকল্পনা কার্যকরভাবে যথাযথ সমকক্ষতার এবং পাশাপাশি ত্রিত্ববাদে তিন ব্যক্তির একত্বের মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে।

ত্রিত্ববাদের ব্যাপারে প্রধান আপত্তি এই যে, এটি হলো ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য উপাসনার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। এই একত্ববাদের সংস্কার করা অথবা অন্যরূপে তার অনুসরণ সন্দেহের বিষয় বলেই বিবেচিত বা গণ্য হবে। আর তা এ কারণে যে, এ মতবাদ বহু ঈশ্বর তথা পৌত্তলিক উপাসনার প্রবর্তন করে।৬০

ইংল্যান্ডের একত্ববাদী আন্দোলনের গভীর প্রভাব আমেরিকাতেও পড়েছিল। ক্যালভিনপন্থী একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে এর সূচনা হয়েছিল। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ধর্মীয় আশ্রমে পরিণত হয় এবং এ পর্যায়ে ধর্মমতের ওপর তত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত না। এভাবে ধীরে ধীরে ধর্মীয় পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়। চার্লস চনসী (Charles Chauncy, ১৭০৫-১৭৫৭ খৃ.) ছিলেন বোস্টনের অধিবাসী। তিনি এক ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপনের এক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। জেমস ফ্রিম্যানের (১৭৫৯-১৮৩৫ খৃ.) নেতৃত্বে কিংস চ্যাপালের ধর্মীয় সমাবেশ ত্রিত্ববাদ বিষয়ক তাদের অ্যাংগলিকান গির্জার সকল রীতি- নীতি বিলোপ করে। ১৭৮৫ খৃস্টাব্দে এ ঘটনা ঘটে। এভাবে আমেরিকায় প্রথম একত্ববাদী চার্চের অস্তিত্ব ঘোষিত হয়। প্রিস্টলির মতবাদ প্রকাশ্যে মুদ্রিত ও বিতরিত হতে থাকে। অধিকাংশ লোকই তা গ্রহণ করে। এর ফল হিসেবে বোস্টনে একজন ছাড়া সকল যাজক নেতৃবৃন্দ কর্তৃক একত্ববাদ গৃহীত হয়।

উইলিয়াম এলরি চ্যানিং (W. Ellery Channing, ১৭৮০-১৮৮২ খৃ.)

ইউলিয়াম এলারি চ্যানিং ১৭৮০ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ২৩ বছর বয়সে তিনি বোস্টনে আগমন করেন এবং যাজকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি একত্ববাদী চিন্তা দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। চ্যানিং কখনোই ত্রিত্ববাদ গ্রহণ করেন নি, তবে সে সময় তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা নিরাপদ ছিল না। তাকে অন্যান্য একত্ববাদী যাজকদের সাথে মিলে গোপনে ত্রিত্ববাদ বিরোধী মতবাদ প্রচারের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। চ্যানিং জবাবে বলেন যে, ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাদের মতামত তারা গোপন রাখেননি, তবে তারা সে মতবাদ এমনভাবে প্রচার করেছেন যেন আগে কারো তা জানা ছিল না। চ্যানিং আরো বলেন, তারা এ পন্থা গ্রহণ করেছেন এ কারণে যাতে খৃষ্টানরা পরস্পরের বিরুদ্ধে আরো বিভক্ত না হয়ে পড়ে। সে কারণে এ পর্যায়ে একত্ববাদী আন্দোলন প্রকাশ্য রূপ গ্রহণ করতে পারে নি।

১৮১৯ খৃস্টাব্দে চ্যানিং রেভারেন্ড জ্যারেড স্পার্কসের (Jared Sparks) দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে এক বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি তার অননুকরণীয় রীতিতে একত্ববাদী ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন যে, নিউটেস্টামেন্টের ভিত্তি হলো ওল্ড টেস্টামেন্ট। খৃষ্টানদের জন্য যে শিক্ষা প্রচার করা হয়েছে, তাই ইয়াহূদীদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছিল। এটি ছিল ঈশ্বরের সুদূর প্রসারী বিশাল পরিকল্পনার পূর্ণতা যা উপলব্ধি করার জন্য বিপুল প্রজ্ঞা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, একথা মনে রেখে তিনি এ বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন যে, পবিত্র গ্রন্থের এক অংশে ঈশ্বর যে শিক্ষা প্রদান করেন তা অন্য অংশের সাথে বিরোধিতাপূর্ণ হতে পারে না। ঈশ্বর তার গভীর বিবেচনার পর এমন সব ব্যাখ্যার প্রতি আমরা অবিশ্বাস ব্যক্ত করি, যা প্রতিষ্ঠিত সত্যের পরিপন্থী। চ্যানিং জোর দিয়ে বলেন, মানুষের উচিৎ তার যুক্তি ব্যবহার করা। তিনি বলেন, “ঈশ্বর আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়েছেন এবং এর জন্য আমাদের জবাবদিহী করতে হবে। আমরা যদি একে ব্যবহার না করে নিষ্ক্রিয় রাখি, যে ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে আনা হবে। আমরা বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বলেই আমাদের উদ্দেশ্যে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে। আমরা আলস্যে নিমজ্জিত হয়ে আশা করতে পারি যে, ঈশ্বর আমাদের এমন ব্যবস্থা দিয়েছেন যেখানে তুলনা করা, সীমাবদ্ধ করা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটা হবে আমাদের বর্তমান অস্তিত্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের চাইতে পৃথক কিছু। প্রত্যাদেশ যেভাবে আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে তাকে সেভাবেই গ্রহণ করা এবং যার ওপর তার বিশ্বাস ও ভিত্তি নির্ভর করে সেই মনের সাহায্যে তার ব্যাখ্যা করা প্রজ্ঞার কাজ।” তিনি আরো বলেন, “ঈশ্বর যদি অপরিসীম জ্ঞানী হন তাহলে তিনি তার সৃষ্টির জ্ঞান নিয়ে কৌতুক করতে পারেন না। একজন জ্ঞানী শিক্ষক তার ছাত্রগণ কর্তৃক তাকে গ্রহণের ক্ষমতার মধ্যেই তার সার্থকতা দেখতে পান, তাদের বোধের অগম্য কিছু শিক্ষা দিয়ে হতবিহবল করে কিংবা পরস্পর বিরোধী বিতর্কের মধ্যে তাদের অসহায়ভাবে নিক্ষেপ করে নয়। বুদ্ধির অগম্য বাগ শৈলীর দ্বারা আমাদের ক্ষমতার বহির্ভূত কিছু বোঝানোর চেষ্টা করা এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও কোনো সমাধান না করা প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়। একটি প্রত্যাদেশ একটি ঐশ্বরিক উপহার। তা আমাদের অজ্ঞানতাকে বৃদ্ধি এবং জটিলতাকে বহুমুখী করে না।”

এই নীতি অনুসরণ করে চ্যানিং বলেন, “প্রথমেই আমরা বিশ্বাস করি এক ঈশ্বরে অর্থাৎ ঈশ্বর একজনই এবং শুধুমাত্র এক। এই সত্যের প্রতি আমরা অশেষ গুরুত্ব প্রদান করি এবং কোনো ব্যক্তি যাতে ব্যর্থ দর্শনের মাধ্যমে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সে জন্য এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে আমরা দায়বদ্ধ। ঈশ্বর এক প্রচারিত সত্যটি আমাদের কাছে অত্যন্ত সরল বলে মনে হয়। এর

দ্বারা আমরা বুঝি যে, একজন মাত্র সত্ত্বাই রয়েছেন। এক সত্ত্বা, এক মন, এক ব্যক্তি, এক বুদ্ধিমান ঘটয়িতা এবং অদ্বিতীয় সেই একজনই যিনি অনুদ্ভূত, চিরন্তন, সম্পূর্ণ নিখুঁত এবং প্রভূত্বের অধিকারী। আমরা জানি যে এই মহা সত্যের যারা ভবিষ্যতের জন্য আমানতকারী ছিল এবং যারা সত্ত্বা ও ব্যক্তির মধ্যকার চুলচেরা পার্থক্য বুঝতে একেবারেই অক্ষম ছিল, সেই সরল ও অননুশীলিত লোকদের কাছে এই সব শব্দ অন্য কোনো অর্থ বহন করত না। এসব বিচারবুদ্ধি মূলত আরো পরবর্তী কালের আবিষ্কার। আমরা এ ধরনের কোনো আভাস পাই না যে ঈশ্বরের একত্ব অন্যান্য বুদ্ধিমান সত্ত্বার একত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক কোনো বিষয় ছিল।

আমরা ত্রিত্ববাদের বিরোধী এ কারণে যে, তা শাব্দিকভাবে ঈশ্বরের একত্বের কথা বললেও কার্যত তার বিপরীত। এই মতবাদ অনুযায়ী তিনজন অবিনশ্বর ও সমকক্ষ ব্যক্তি রয়েছেন যারা সর্বোচ্চ ঈশ্বরত্বের অধিকারী, তাদের বলা হয় পিতা-পুত্র ও পবিত্র আত্মা। ধর্মতাত্মিকগণ যেমনটি বর্ণনা করেছেন, এই সব ব্যক্তির প্রত্যেকেরই নিজস্ব চেতনাবোধ, ইচ্ছা (মন) ও উপলব্ধি রয়েছে তারা পরস্পরকে ভালোবাসেন, পরস্পর কথাবার্তা বলেন এবং একে অন্যের সহচর্যে উৎফুল্ল­ হন। তারা মানুষের প্রায়শ্চিত্তের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেন, প্রত্যেকেরই রয়েছে যথাযথ কর্মস্থল এবং প্রত্যেকেই যার যার নিজের কাজ করেন, একজন অন্যজনের কাজ করেন না। পুত্র মধ্যস্থতাকারী, তিনি পিতা নন। পিতা পুত্রকে প্রেরণ করেন, নিজে প্রেরিত হন না। তিনি পুত্রের মত দেহ সচেতন নন। সুতরাং এখানে আমরা তিন ধরনের বুদ্ধিমান ঘটয়িতাকে পাচ্ছি যারা ভিন্ন চেতনাবোধ সম্পন্ন, ভিন্ন ইচ্ছার অধিকারী ও ভিন্ন উপলব্ধি সম্পন্ন; তারা ভিন্ন কাজ করেন এবং তারা ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখেন। এসব বিষয় যদি তিনটি ‘মন’ বা ‘সত্তা’ গঠন না করে, তাহলে আমরা সত্যই জানি না যে, তিনটি মন বা সত্ত্বা কীভাবে গঠিত হয়। এটি হলো বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য, কর্মকান্ডের পার্থক্য, চেতনাবোধের পার্থক্য যা আমাদের বিভিন্ন বুদ্ধিসম্পন্ন সত্ত্বার ব্যাপারে বিশ্বাসী করে এবং যদি এসব লক্ষণ সত্য না হয় তাহলে সমগ্র জ্ঞানেরই পতন ঘটে, কারণ আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই যে, বিশ্বজগতের সকল ঘটয়িতা ও ব্যক্তি এক নন বা অভিন্ন মনের নন। আমরা যখন তিন ঈশ্বরের কথা কল্পনা করার চেষ্টা করি, আমরা আমাদের তিনজন ঘটয়িতার প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছাড়া বেশি কিছু ভাবতে পারি না যারা একই প্রকার বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য দ্বারা পরস্পর থেকে পৃথক যেগুলো ত্রিত্ববাদের ব্যক্তিদেরও পৃথক করে রাখে। যখন সাধারণ খৃষ্টানরা এ ব্যক্তিদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে, একে অপরকে ভালোবাসতে ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব পালন করার কথা শোনে, তখন তারা কীভাবে তাদের পৃথক সত্ত্বা, পৃথক মন সম্পন্ন নন বলে মনে করতে পারে?

আমরা আমাদের সহযোগী ভাইদের নিন্দা না করেও মনে-প্রাণে এই অযৌক্তিক ও ধর্মগ্রন্থ বহির্ভূত ত্রিত্ববাদের প্রতিবাদ করি। ধর্মপ্রচারক ও আদি খৃষ্টানদের মত “আমাদের কাছেও ঈশ্বর অদ্বিতীয়, এমনকি পিতাও।” যীশুর মত আমরাও পিতার উপাসনা করি, আর তা একমাত্র জীবন্ত ও প্রকৃত ঈশ্বর হিসেবেই। আমরা আশ্চর্য হই, যেকোনো লোক নিউ টেস্টামেন্ট পাঠ করতে পারে এবং এই বিশ্বাস পরিহার করতে পারে যে, পিতাই একমাত্র ঈশ্বর। আমরা শুনি যে, আমাদের পবিত্র আত্মা অব্যাহতভাবে এভাবে যীশুর সাথে পার্থক্যমণ্ডিত হয়েছেন যে, “ঈশ্বর তার পুত্রকে প্রেরণ করেছেন”, “ঈশ্বর যীশুকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন।” এখন এই আখ্যা যদি যীশুর জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য হয়ে থাকে এবং এ গ্রন্থের একটি প্রধান উদ্দেশ্য যদি তাকে ঈশ্বর হিসেবে প্রকাশ করা হয়ে থাকে, সর্বোচ্চ ঈশ্বর পিতার সমকক্ষ হিসেবে, তাহলে গোটা নিউ টেস্টামেন্ট ভর্তি বাগ শৈলী কতই না অদ্ভুত ও অব্যাখ্যেয় হয়ে পড়বে। আমরা আমাদের বিরোধীদের নিউ টেস্টামেন্ট থেকে এমন একটি অংশ উদ্ধৃত করার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি যেখানে ঈশ্বর বলতে তিন ব্যক্তি বুঝানো হয়েছে, যেখানে তা এক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং যেখানে সাধারণ সংশ্লি­ষ্ট পরিস্থিতিতে অর্থের ব্যতিক্রম ছাড়া এর অর্থ পিতা ব্যক্ত করা হয় নি। তিন ব্যক্তি সংবলিত ঈশ্বরের মতবাদ যে খৃষ্টানদের মৌলিক মতবাদ নয়, এ ব্যাপারে তাদের কাছে বলিষ্ঠ প্রমাণ আছে কি?

এই মতবাদ যদি ব্যাপক স্পষ্টতা, বিপুল সতর্কতা ও সম্ভাব্য সকল ধরনের নির্ভূলতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো। কিন্তু এরকম বক্তব্য কোথায়? ঈশ্বর সংক্রান্ত ধর্মগ্রন্থের বহু অংশ থেকে আমরা একটি মাত্র অংশ দেখতে চাই যাতে আমাদের বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর তিনটি সত্ত্বা অথবা তিনি তিন ব্যক্তি অথবা তিনি পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। এর বিপরীতে নিউ টেস্টামেন্টে আমরা যেখানে কমপক্ষে এ বৈশিষ্ট্যের বহুবার উল্লেখ আশা করি, সেখানে ঈশ্বরকে অদ্বিতীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে বলেই দেখতে পাই এবং সেক্ষেত্রে সাধারণভাবে ন্যুনতম কোনো আপত্তিও পরিলক্ষিত হয় না। ঈশ্বর সেখানে সর্বদাই বর্ণিত ও সম্বোধিত হয়েছেন একবচনে, অর্থাৎ সেই ভাষায় যা একক ব্যক্তির কথাই সার্বিকভাবে প্রকাশ করে এবং যার সাথে অন্য কোনো ধারণা যুক্তি হলে প্রকাশ্য ভৎর্সনা ডেকে আনে। সুতরাং আমাদের সকল ধর্মগ্রন্থ ত্রিত্ববাদ বর্ণনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত। তাই আমাদের বিরোধীরা তাদের ধর্মমত ও ঈশ্বর মহিমা কীর্তনের প্রার্থনায় বাইবেলের শব্দমালা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং এমন সব শব্দগুচ্ছ আবিষ্কার করে যা ধর্মগ্রন্থ কর্তৃক অনুমোদিত নয়। এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ ধরনের মতবাদ এত অদ্ভুত, এত বিভ্রান্তি সৃষ্টিকর, এত অপরিপক্ব এবং সতর্ক ব্যাখ্যা সাপেক্ষ যা অনির্ণীত ও অরক্ষিত অবস্থায়ই রেখে দিতে হয় এবং যে ব্যাপারে শুধু অনুমান করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এ ব্যাপারে কোনো অনুসন্ধান করতে হয় ধর্মগ্রন্থের দূরবর্তী ও বিচ্ছিন্ন অংশ দ্বারা, এটি এক সমস্যা, যা আমাদের মতে কোনো উদ্ভাবন পটুতা দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।

আমাদের আরেকটি সমস্যা আছে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, খৃষ্টান ধর্মের গোড়াপত্তন ও তার বিকাশ ঘটেছে তীক্ষ্ণদৃষ্টি সম্পন্ন শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায়। তারা এ মতবাদের কোনো আপত্তিকর অংশের প্রতিই উদাসীন থাকে নি এবং ত্রিত্ববাদের মত স্ববিরোধী একটি মতবাদ ব্যক্ত হলে তাকে সমালোচনার জন্য তারা অত্যন্ত আগ্রহভরে লুফে নিত। ইয়াহূদীরা যারা একত্ববাদের অনুসারী বলে গর্ববোধ করত, তারা এরকম একটি গোলযোগ সৃষ্টি করেছিল বলে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়, আমরা তা মেনে নিতে পারি না। এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এটা ঘটে যেখানে প্রকৃত খৃষ্টান ধর্মের অনুসারীদের রচনা এই খৃষ্টান ধর্ম ও ধর্ম থেকে উদ্ভূত বিতর্কিত বিষয় সংশ্লি­ষ্ট হলেও সেখানে ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে গসপেলের বিরুদ্ধে অভিযোগমূলক কোনো শব্দ নেই, এর সমর্থনে ও ব্যাখ্যায়ও একটি শব্দ ব্যয় করা হয় নি, নিন্দা ও ভুল থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যেও কোনো শব্দ উচ্চারিত হয় নি? এই যুক্তি স্পষ্ট ও শক্তিশালী। আমাদের বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, খৃষ্টান ধর্মে তিনজন ঐশ্বরিক ব্যক্তি রয়েছেন যা খৃষ্টান ধর্মের আদি প্রচারকগণ ঘোষণা করে গেছেন, তারা সকলেই সমকক্ষ, সকলেই অবিনশ্বর সত্ত্বা, তাদের মধ্যে একজন হলেন যীশু যিনি পরে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যান। খৃষ্টান ধর্মে ত্রিত্ববাদের এই বিচিত্র ব্যাপার-স্যাপার ঘটে থাকলে তার বিরুদ্ধে অব্যাহত আক্রমণ এত বিপুলভাবে আসত যে, সকলেই তার জবাব দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত এবং প্রেরিতগণকে সে আক্রমণ ঠেকাতে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। তবে বাস্তব সত্য এই যে, খৃষ্টান ধর্মের প্রতি যে আপত্তির কথাবার্তা শোনা যায়, তা প্রেরিতদের সময়কালীন নয়। তাদের পত্রাবলিতে ত্রিত্ববাদ থেকে সৃষ্ট বিতর্কের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না।

এ মতবাদ সম্পর্কে আমাদের আরো আপত্তি তার বাস্তব প্রভাব থেকে উৎসারিত। ঈশ্বরের সাথে সংযোগ থেকে মনকে পৃথক করা বা ভিন্ন পথে চালিত করাকে আমরা উপাসনায় একাগ্রতা অর্জনের প্রতিকূল বলে বিবেচনা করি। একত্ববাদী মতবাদের এক বিরাট মহিমা যে তা আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার, ভক্তির ও ভালোবাসার এক সত্ত্বার, এক চিরন্তন পিতার, সত্ত্বাসমূহের একক সত্ত্বা, এক আদি ও উৎস উপাস্য সত্ত্বার কথা বলে, যার কাছে আমরা সকল ভালো কাজের প্রতিদান চাইতে পারি, তিনি আমাদের সকল মুক্তি এবং অবলম্বন এবং যার সুন্দর ও অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য আমাদের চিন্তাকে পরিব্যাপ্ত করতে পারে। কোনো অবিভক্ত সত্ত্বার প্রতি নিবেদিত অকৃত্রিম উপাসনার মধ্যে বিশুদ্ধতা, অনন্যতা রয়েছে যা ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এখন ত্রিত্ববাদ আমাদের সামনে হাযির করে সর্বোচ্চ ভক্তিভাজন তিনটি পৃথক সত্ত্বা, তিনজন অবিনশ্বর ব্যক্তি, আমাদের অন্তরের ওপর সমান দাবি জানায়, তিনজন ঐশ্বরিক সত্ত্বা বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত এবং পৃথক পৃথক স্বীকৃতি ও উপাসনা দাবি করে। আমাদের প্রশ্ন, দুর্বল ও সীমাবদ্ধ মানুষের মন নিজেকে সেই রকম একাধিক শক্তির সাথে কি সম্পৃক্ত করতে পারে, যেমনটি করতে পারে এক অবিনশ্বর পিতা, এক ঈশ্বরের সাথে যিনি সকল করুণা ও মুক্তি লাভের একমাত্র প্রভূ? ধর্মীয় উপাসনাকে তিন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির দাবির দ্বারা বিভক্ত করা অবশ্যই উচিৎ নয়। কেননা সে ক্ষেত্রে একজন জ্ঞানসম্পন্ন দৃঢ় বিশ্বাসী খৃষ্টানের মনোযোগ বিঘ্নিত হবে এই আশঙ্কায় যে কোনো একজন ঈশ্বর বা অন্যজনের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা ও ভক্তির অনুপাত না ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।

আমরা আরো চিন্তা করি যে, ত্রিত্ববাদ উপাসনার ক্ষতি সাধন করে। আর তা পিতার সাথে অন্যান্য সত্ত্বাকেও উপাসনার লক্ষ্য স্থির করেই শুধু নয়, উপরন্তু পিতার সর্বোচ্চ স্নেহ যা শুধু তারই এখতিয়ার, তা তার কাছ থেকে নিয়ে পুত্রের কাছে স্থানান্তরের মাধ্যমেও। এটা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যিশুখ্রিস্ট যদি অবিনশ্বর সত্ত্বা হন তাহলে পিতার চেয়েও তিনি অধিক আকর্ষণীয় হবেন- ইতিহাস থেকে এটাই প্রত্যাশিত। মানব স্বভাবের গতি প্রকৃতি থেকে দেখা যায় যে, মানুষ এমন এক উপাস্য বস্তু চায় যা হবে তাদের মতই এবং মূর্তি পূজার গোপন রহস্যটি মানুষের এই প্রবণতার মধ্যেই নিহিত। আমাদের মত একই পোশাকে সজ্জিত, আমাদের চাওয়া ও দুঃখের অনুভূতি সম্পন্ন, দুর্বল প্রকৃতি নিয়ে যিনি কথা বলেন তিনিই আমাদের কাছে আকর্ষণীয়, স্বর্গের সেই ঈশ্বর থেকে যিনি শুদ্ধ আত্মা; অদৃশ্য এবং চিন্তাশীল ও পরিশুদ্ধ মন ছাড়া অন্যের কাছে অনধীগম্য। আমরা আরো ভাবি যে, প্রচলিত ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী যীশুর ওপর যে বিচিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা তাকে ঈশ্বরদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। পিতা ন্যায়বিচারের ধারক, অধিকারসমূহের রক্ষাকারী এবং ঐশ্বরিক বিধি-বিধানের প্রতিফলদাতা। অন্যদিকে পুত্র, যিনি ঐশ্বরিক ক্ষমার উজ্জ্বল্যদীপ্ত, তার অবস্থান ক্রুদ্ধ ঈশ্বর ও অপরাধী মানুষের মধ্যে, তিনি ঝড়ের মধ্যে তার বিনত মস্তক এগিয়ে দেন, ভালোবাসা পরিপূর্ণ বক্ষ প্রসারিত করেন ঈশ্বরের ন্যায়- বিচারের তলোয়ারের নিচে, তিনি বহন করেন আমাদের শাস্তির সমগ্র বোঝা এবং নিজের রক্ত দিয়ে ক্রয় করেন ঈশ্বরের প্রতিটি করুণা বিন্দু। খৃষ্টান ধর্ম তাদের জন্য প্রধানত প্রেরিত হয়েছিল, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের, যাদের কাছে পিতাকে সুন্দরতম সত্ত্বা হিসেবে প্রতিভাত করার কথা, তাদের মনের ওপর এই উপস্থাপনার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তার বর্ণনার আর প্রয়োজন আছে কি?

একত্ববাদ সম্পর্কে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনার পর আমি দ্বিতীয় যে বিষয়টির কথা বলব, তা হলো আমরা যীশু খৃষ্টের একত্বে বিশ্বাসী। আমরা বিশ্বাস করি যে, যীশু এক মন, এক আত্মা, প্রকৃতপক্ষে যেমনটি আমরা এবং তিনি সমানভাবে এক ঈশ্বর থেকে আলাদা। আমরা ত্রিত্ববাদকে অভিযুক্ত করব এ কারণে যে, তা ঈশ্বরের তিনটি সত্ত্বা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয় নি, যীশুরও দু’টি সত্ত্বা তৈরি করেছে এবং এভাবে তার ব্যাপারে আমাদের সাধারণ জ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থের স্বাভাবিক মর্মবাণীর পরিপন্থী এবং তা যীশুর সরল সত্যকে বিকৃত করার মিথ্যা দর্শনের ক্ষমতার এক উল্লে­খযোগ্য প্রমাণ।

এ মতবাদ অনুযায়ী যীশুখ্রিস্ট আমাদের পক্ষে যা বুঝা সম্ভব সেই এক মন, এক জ্ঞান সম্পন্ন বুদ্ধিমান মানুষ হওয়ার পরিবর্তে দু’টি আত্মার সমন্বয়ে গঠিত, দুই মনসম্পন্ন সত্ত্বা। এর একটি হলো ঐশ্বরিকতা, অন্যটি হলো সর্বজ্ঞতা। আমরা লক্ষ্য কির, যীশুকে দু’টি সত্ত্বা করার জন্যই এটি করা হয়েছে। তাকে এক ব্যক্তি, এক সত্বা আখ্যা দেওয়া এবং তদুপরি তাকে দুই মন সম্পন্ন বলে অনুমানের কারণ অপব্যবহার ও তালগোল পাকানোর মাধ্যমে বোধশক্তি সম্পন্ন সত্ত্বা সম্পর্কে আমাদের ধারণার ওপর সামগ্রিকভাবে একটি কালো পর্দা ছুঁড়ে দেওয়া। সাধারণ মতবাদ অনুসারে খৃষ্টের এই দু’টি মনের প্রত্যেকেরই নিজস্ব বোধ, নিজস্ব ইচ্ছা, নিজস্ব উপলব্ধি রয়েছে। কার্যত তাদের কোনো অভিন্ন বৈশিষ্ট্য নেই। ঐশ্বরিক মন মানুষের কোনো অভাব বা দুঃখ অনুভব করে না এবং মানুষের মধ্যে ঐশ্বরিক পূর্ণাঙ্গতা ও সুখ নেই। আপনি কি বিশ্ব পৃথিবীতে অধিক স্বাতন্ত্রমণ্ডিত দু’টি সত্ত্বার কথা ভাবতে পারেন? আমরা সব সময়ই ভেবে এসেছি যে, এক ব্যক্তি এক সচেতনতা বোধ দ্বারা গঠিত ও স্বতন্ত্র। এক এবং অভিন্ন ব্যক্তির দু’টি সচেতনতাবোধ, দু’টি ইচ্ছা, দু’টি আত্মা, এগুলো সম্পূর্ণরূপে পরস্পর থেকে আলাদা। এগুলো মানুষের বিশ্বাসের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টিকারী বোঝা ছাড়া আর কিছু নয়।

আমাদের বক্তব্য যে, এ ধরনের একটি অদ্ভুত, জটিল, মানুষের পূর্ব ধারণা থেকে বহু দূরবর্তী মতবাদ যদি প্রকৃতই প্রত্যাদেশের অংশ বা অত্যাবশ্যক অংশ হয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণভাবে শিক্ষা দিতে হবে। আমরা আমাদের ভাইদের এরকম কিছু সরল, সরাসরি অংশ দেখানোর আহ্বান জানাচ্ছি যেখানে যীশুকে দু’মনের অধিকারী হিসেবে পৃথকভাবে দেখানো হয়েছে, এক ব্যক্তি হিসেবে নয়। আমরা এমন কিছুই দেখি না। অন্য খৃষ্টানরা বলেন, এ মতবাদ ধর্মসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অত্যাবশ্যক, কারণ কিছু ধর্মগ্রন্থে যীশুকে মানুষ এবং কিছু ধর্মগ্রন্থে তাকে ঐশ্বরিক সত্ত্বা হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর এক্ষেত্রে একটি সমন্বয় সাধনের জন্যই আমাদের অবশ্যই দুই মনের অনুমান করতে হবে যাতে এই বৈশিষ্ট্যসমূহ তার সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। অন্য কথায়, কিছু নির্দিষ্ট অংশকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আমাদের অবশ্যই একটি কল্পিত বিষয় আবিষ্কার করা প্রয়োজন যা আরো জটিল এবং ব্যাপকভাবে অযৌক্তিক। আমাদের একটি সূত্রের মাধ্যমে এই গোলকধাঁধার জটিল আবর্ত থেকে পরিত্রাণ লাভের পথ খুঁজে বের করতে হয়।

যদি যীশুখ্রিস্ট নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতেন যে, তিনি দুই মন দ্বারা গঠিত এবং তা তার ধর্মের শীর্ষস্থানীয় বৈশিষ্ট্য, তাহলে তার মর্যাদা সংক্রান্ত তার বক্তব্য এই বৈশিষ্ট্যের রঙে রঞ্জিত থাকত। মানুষের বিশ্বজনীন ভাষা যে ধারণাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তা হলো, এক ব্যক্তি, একই ব্যক্তি, একই মন এবং একই আত্মা। যখন সাধারণ মানুষ যীশুর মুখ থেকে এ ভাষা উচ্চারিত হতে শুনেছে তারা অবশ্যই তা সাধারণ অর্থেই গ্রহণ করেছে এবং ভিন্ন অর্থে ব্যাখ্যার স্পষ্ট নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত একক আত্মার সাথেই তা সম্পর্কিত করেছে যার কথাই তিনি সর্বদা বলেছেন। কিন্তু আমরা এ নির্দেশনা কোথায় পাব? যেসব কথাবার্তায় ত্রিত্ববাদ গ্রন্থগুলো পরিপূর্ণ এবং যা যীশুর দ্বৈত বৈশিষ্ট্য থেকে অবশ্যম্ভাবীরূপে সৃষ্ট হয়েছে, নিউ টেস্টামেণ্টে তা আপনি কোথায় পাবেন? কোথায় এই ঐশ্বরিক শিক্ষক বলেছেন, “আমি এটা বলছি ঈশ্বর হিসেবে এবং এটা বলছি মানুষ হিসেবে, এটা শুধু আমার মানব মনের সত্য, এটা শুধু আমার ঐশ্বরিক মনের সত্য?” আমরা কি পত্রাবলিতে এই অদ্ভুত কথার কোনো সন্ধান পাই? কোথাও নয়। তখনকার দিনে এগুলোর প্রয়োজন ছিল না। পরবর্তীকালে ভ্রান্তি সৃষ্টির জন্যই এসব করা হয়েছে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি যে, খৃষ্ট এক মন, এক সত্ত্বা এবং আমি এর সাথে যোগ করছি যে, তিনি এক সত্ত্বা যা ঈশ্বর থেকে পৃথক।… আমরা আশা করি, যাদের সাথে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করবেন। যীশু তার শিক্ষা প্রচারকালে অব্যাহতভাবে ঈশ্বরের কথা বলেছেন। এ শব্দ সব সময় তার মুখে থাকত। আমাদের প্রশ্ন, এই শব্দ দ্বারা তিনি কি নিজেকে বুঝিয়েছেন? আমরা বলি, কখনোই না। বরং তিনি সোজাসুজিভাবে ঈশ্বর ও তার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন এবং তার প্রত্যক্ষ অনুসারীরাও তাই করেছেন। সুতরাং একথা কীভাবে মেনে নেওয়া যায় যে, ঈশ্বর হিসেবে যীশুর প্রকাশ খৃষ্টান ধর্মের প্রধান লক্ষ্য? আমাদের প্রতিপক্ষকে অবশ্যই তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে।

ধর্মগ্রন্থগুলোর যে অংশগুলোতে যীশুকে ঈশ্বর থেকে পৃথক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আমরা সেগুলো পরীক্ষা করলে দেখতে পাব যে, সেগুলোতে তাঁকে শুধু আলাদা সত্ত্বাই বলা হয় নি, উপরন্তু তার অধস্তন হওয়ার কথাও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সর্বদাই নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র, ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত, ঈশ্বর থেকে সকল শক্তি লাভকারী, ঈশ্বরের সাহায্যেই সকল অলৌকিক ঘটনা সংঘটন, ঈশ্বর তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন বলেই ন্যায় বিচার করতে পেরেছেন, যেহেতু ঈশ্বর তাঁকে নিযুক্ত ও বৈধতা প্রদান করেছেন সে কারণে তার প্রতি আমাদের বিশ্বাস দাবি করেছেন এবং তিনি নিজে কোনো কিছু করতে সক্ষম নন বলে জানিয়েছেন। নিউ টেস্টামেন্ট এসব কথায় পরিপূর্ণ। এখন আমাদের প্রশ্ন, এসব কথা দ্বারা কী বলতে ও বুঝাতে চাওয়া হয়েছে? যারা এসব কথা শুনেছে তারা কি এ ধারণা করবে যে, যীশুই ছিলেন সেই ঈশ্বর যে ঈশ্বরের চাইতে তিনি নিজেকে অধস্তন বলে বার বার ঘোষণা করেছেন; যিনি তাঁকে প্রেরণ করেছেন এবং যার কাছ থেকে তিনি শক্তি ও ক্ষমতা লাভের কথা স্বীকার করেছেন!

ত্রিত্ববাদীরা যীশুর প্রতি তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা লাভের চেষ্টা করেছে। তারা আমাদের বলে যে, এটা তাদের জন্য ঐশ্বরিক প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, কেননা এটা তাদের দেখিয়েছে যে, তাদের পাপের কারণে এক ঐশ্বরিক সত্ত্বা যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। এই ভ্রান্ত যুক্তি তারা এত আস্থার সাথে ব্যক্ত করে যা দেখে বিস্মিত হতে হয়, যখন তাদের প্রশ্ন করা হয় যে, তারা কি প্রকৃতই বিশ্বাস করে যে, একজন অবিনশ্বর ও অপরিবর্তনীয় ঈশ্বর ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে যন্ত্রণাভোগ ও মৃত্যুবরণ করেছেন? তখন তারা স্বীকার করে যে, এটা সত্য নয়। তবে খৃষ্টের মানবিক মনই শুধু মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করে টিকে ছিল। তাহলে আমরা একজন যন্ত্রণা ভোগীকারী ঐশ্বরিক সত্ত্বাকে পাচ্ছি কীভাবে? আমাদের মনে হয়, এই সব কথা সাধারণ মানুষের সরল মনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তা ঈশ্বরের ন্যায়- বিচারের প্রতি অত্যন্ত অবমাননা কর, যেহেতু এগুলো কূট তর্ক ও কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছু নয়…।৬১

এভাবে যদিও চ্যানিং বিশ্বাস করতেন যে, যীশু ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন ও পুনর্জীবন লাভ করেছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি প্রায়শ্চিত্ত মতবাদের অসারতা প্রদর্শনে সক্ষম ছিলেন। যেসব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো যে বাস্তবে সংঘটিত হয় নি, সে ব্যাপারে কিন্তু তিনি অবহিত ছিলেন না। চ্যানিং নিম্নোক্ত কারণে প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন:

বাইবেলে এমন কোনো অংশ নেই যেখানে আমাদের বলা হয়েছে মানুষের পুত্র ঈশ্বর এবং তার ঐশ্বরিক প্রায়শ্চিত্ত প্রয়োজন। এ মতবাদ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষ যদিও ঈশ্বর কর্তৃক নশ্বর, ভ্রান্তিশীল ও অপূর্ণাঙ্গ সত্ত্বা হিসেবে সৃষ্ট, সে স্রষ্টার কাছে একজন ঐশ্বরিক বিধান লংঘনকারী হিসেবেই গণ্য। চ্যানিং বলেন, একত্ববাদীরা বিশ্বাস করে যে, ঈশ্বর কোনো কঠোর শাস্তি ছাড়াই পাপ ক্ষমা করতে পারেন। যে মতবাদ ঈশ্বরকে একজন যন্ত্রণা ভোগকারী ও নিজের বিদ্রোহপ্রবণ সৃষ্টির কারণে প্রাণদানের কথা বলে তা অযৌক্তিক ও ধর্মগ্রন্থ পরিপন্থী। প্রায়শ্চিত্ত হয় ঈশ্বরের কাছে, ঈশ্বরের জন্য প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে না। যদি ঐশ্বরিক প্রায়শ্চিত্ত অপরিহার্য হয়, যা শুধু ঈশ্বরই করতে পারেন, সেক্ষেত্রে ঈশ্বরকে অবশ্যই একজন যন্ত্রণা ভোগকারী হতে হবে এবং আমাদের দুঃখ ও ব্যথা গ্রহণ করতে হবে। এটা এক অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য কল্পনা। এই সমস্যা পরিহার করতে আমাদের বলা হচ্ছে যে, খৃষ্ট একজন মানুষ হিসেবে যন্ত্রণা ভোগ করেন, ঈশ্বর হিসেবে নয়। কিন্তু মানুষ যদি স্বল্প ও সীমিত সময়ের জন্য যন্ত্রণাভোগ করে তাহলে চিরন্তন প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন কি? আমাদের যদি স্বর্গে চিরন্তন গুণ ও শক্তি সম্পন্ন ঈশ্বর থেকেই থাকেন, তাহলে আমাদের রক্ষার জন্য অন্য কোনো চিরন্তন ব্যক্তির আমাদের প্রয়োজন নেই। এই মতবাদ যখন বলে যে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঈশ্বর ছাড়া ঈশ্বর কোনো মানুষকে রক্ষা করতে পারেন না, তখন এ মতবাদ ঈশ্বরেরই অবমাননা করে। মানুষের মুক্তির জন্য ন্যায়- বিচারের প্রতি ঐশ্বরিক সন্তুষ্টি যদি অপরিহার্য হয়ে থাকে তবে বাইবেলের অন্তত একটি অংশে তার সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রকাশ থাকা উচিৎ ছিল। এ মতবাদ আদালতে উপস্থিত অপরাধীর দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য বিচারক কর্তৃক নিজেকে শাস্তি প্রদানের মতোই অবাস্তব ও অর্থহীন।

বাইবেল বলে, “খৃষ্টের বিচার আসনের সম্মুখে প্রত্যেককেই হাযির হতে হবে তার কৃতকর্মের ফললাভের জন্য, তা সে ভালোই করুক আর মন্দই করুক (২ করিনথীয় ৫ : ১০) এবং পুনরায় বাইবেল বলে: “আমাদের প্রত্যেককেই ঈশ্বরের কাছে নিজের বিবরণ দিতে হবে” (রোমীয় ১৪ : ১০)। যদি যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে বলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, তাহলে ধর্মীয় ও সৎকর্মশীল জীবন-যাপনের নির্দেশ দেওয়ার সকল ক্ষমতা ঈশ্বর হারিয়েছেন এবং অবাধ্যদের শাস্তি প্রদানেরও বিশেষ অধিকার তার নেই। ঈশ্বর যদি বিচার দিবসে কোনো পাপীকে শাস্তি প্রদান করেন তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, হয় ঈশ্বর তার ওয়াদা লংঘণকারী, নয় প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ অসত্য।

১৮১৯ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত কারো বাড়িতে অথবা বোস্টনের বার্কলে স্ট্রীট অবস্থিত মেডিক্যাল কলেজের হলে একত্ববাদীদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। ১৮২০ খৃস্টাব্দে একত্ববাদীদের উপাসনার জন্য একটি ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৮২১ খৃস্টাব্দে তা শেষ হয়। এর মধ্য দিয়ে তাদের মতবাদের আরো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ মিললেও তখন পর্যন্ত একত্ববাদীদের ধর্মদ্রোহী, অবিশ্বাসী অথবা নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করা হতো।৬২ যাহোক, এ বছর একত্ববাদীদের ধর্মমত প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতার নীতির অবসান ঘটে। চ্যানিং এতদিন গোঁড়া চার্চের সংকীর্ণ ও তিক্ত আক্রমণের শিকার হয়েছেন, কিন্তু কোনো প্রতি-আক্রমণ করতে পারেন নি। এখন তিনি অনুভব করলেন যে, পাল্টা আঘাত হানার সময় এসেছে। আর তা করতে হবে তার সর্বশক্তি দিয়ে, অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তার ধর্ম বিশ্বাসের সপক্ষে ও গোঁড়া কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলে।

A History of Unitarianism গ্রন্থে ই.এম. উইলবার (E. M. wilbar) চ্যানিং সম্পর্কে লিখেছেন, তার মূল বক্তব্য ছিল ধর্মগ্রন্থগুলো যখন যুক্তিসংগতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন তা একত্ববাদীদের মতবাদই শিক্ষা দেয়। এগুলোতে রয়েছে প্রধান মতবাদসমূহ যার ওপর একত্ববাদীদের গোঁড়াপন্থীদের থেকে পৃথক এবং সেগুলো তারা সমুন্নত রেখেছে একের পর এক পরীক্ষা অনুসন্ধানের জন্য… এগুলো ক্যালভিনবাদের মত অযৌক্তিক, অমানবিক ও হতাশাগ্রস্ত পরিকল্পনা পরিপূর্ণ মতবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ও দ্ব্যর্থহীন আহ্বান জানায়…. এবং মানুষের যুক্তি ও জ্ঞান বহির্ভূত সেকালের গোঁড়া খৃষ্টান ধর্মীয় মতবাদকে অভিযুক্ত করে।৬৩

১৮২৩ খৃস্টাব্দে ম্যাসাচুসেটসে এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমেরিকায় একত্ববাদী আন্দোলন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। এই সম্মেলনে যোগদানের জন্য যারা প্রচার চালাতে আগ্রহী ছিল, গোঁড়া চার্চ তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতা একত্ববাদী আন্দোলনকে প্রকাশ্য রূপ লাভে সাহায্য এবং এর বিভিন্ন সমস্যাকে অভিন্ন স্বার্থরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ করে।

১৮২৭ খৃস্টাব্দে চ্যানিং এর বিখ্যাত এক ধর্মীয় বক্তৃতার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় একটি চার্চের প্রতিষ্ঠা ঘটে। ই. এম. উইলবার লিখেছেন, এই সুফল লাভের কৃতিত্ব প্রধানত তারই প্রাপ্য এ কারণে যে, সুষ্পষ্টভাবে স্বীকার করা না হলেও ত্রিত্ব-বাদ আনুষ্ঠানিক প্রচার সত্ত্বেও গোঁড়া ধর্ম বিশ্বাসের কেন্দ্রীয় অবস্থান বিলুপ্ত হলো এবং তার গুরুত্ব আর আগের মত রইল না। উপরন্তু ক্যালভিনবাদের মতবাদ এক নতুন ব্যাখ্যা লাভ করল যা যাজকরা ইতিপূর্বে ভীতির সাথে প্রত্যাখ্যান করতেন।৬৪ সব ঘটনা প্রতিরোধ ছাড়া ঘটে নি। ১৮৩৩ খৃস্টাব্দে একত্ববাদীদেরকে ঠান্ডা মাথায় অবিশ্বাসী বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং তাদের এমন নিপীড়ন করা হয় যে, তার কাছে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও গোঁড়ামির পূর্বের সকল নজির ম্লান হয়ে যায়।৬৫ জানা যায় যে, ১৯২৪ খৃস্টাব্দের দিকে ৪০ জন একত্ববাদীর মধ্যে ৩০ জন বোস্টনে মিলিত হন এবং একটি অজ্ঞাতনামা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যদিও আগেকার দিনের একত্ববাদীদের মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বরণের আশঙ্কা তাদের ছিল না, তা সত্ত্বেও এক ঈশ্বরের সমর্থনকারী একজন খৃষ্টানের জন্য তখন পর্যন্ত পরিস্থিতি বিপজ্জনক ছিল।

চ্যানিং তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একত্ববাদে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তার কাছে যীশু শুধু একজন মানুষই ছিলেন না, ঈশ্বরের প্রেরিত একজন নবীও ছিলেন। মানুষের নৈতিক স্খলন, ঈশ্বরের রোষ এবং যীশুর প্রায়শ্চিত্তমূলক আত্মত্যাগের ক্যালভিনীয় মতবাদের বিপরীতে চ্যানিং এক মহত্তম ধারণার ঘোষণা দেন যার সংজ্ঞা তিনি দিয়েছেন এভাবে: “আত্মার শ্রেষ্ঠত্ব, ঈশ্বরের সাথে আত্মিক সাদৃশ্যের কারণে তার সম্মিলন, ঈশ্বরের সত্ত্বার ধারণ ক্ষমতা, তার স্ব-গঠন শক্তি, অনন্ত জীবনের দিকে তার যাত্রা এবং তার অমরত্ব।”৬৬

প্রিস্টলির যুক্তিবাদ এবং কল্পিত জগৎ থেকে এটি ছিল এক নতুন পরিবর্তন। শুধু আমেরিকাতেই নয়, ইংল্যান্ডেও একত্ববাদী আন্দোলনে তা নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছিল। প্রিস্টলি কার্যত ছিলেন একজন বৈজ্ঞানিক। তার যুক্তি ছিল জোরালো, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি ছিল জড়বাদী। চ্যানিং তাকে মহত্তম আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে উন্নীত করেন। তিনি যখন বলেছিলেন- “মানুষের যুক্তিবাদী স্বভাব ঈশ্বরের প্রদত্ত”- তার সেই কথা আটলান্টিকের উভয় পারের মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।৬৭ তিনি সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতার প্রতিটি দিকেরই বিরোধী ছিলেন। শ্রেণি বা সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ছিল তার কাছে অসহ্য এবং তার এই চেতনা আন্দোলনের নেতাদেরকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। এরই পরিণতি হিসেবে ১৮৬১ খৃস্টাব্দে ডিভিনিটি স্কুল অফ হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই সংগঠনের সংবিধানের এক অংশে বলা হয়েছে, “এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, খৃষ্টীয় সত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন অনুসন্ধানের প্রতিটি ক্ষেত্রকে উৎসাহিত করতে হবে এবং ছাত্র, শিক্ষক অথবা প্রশিক্ষকদের কোনোপ্রকার সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণযোগ্য হবে না।৬৮ ১৮২৫ খৃস্টাব্দে আমেরিকান সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর ইংল্যান্ডেও এ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। রালফ ওয়ালডো এমারসন (Ralph Waldo Emerson, ১৮০৩-১৮৮২ খৃ.) বোস্টনের যাজক সম্প্রদায় থেকে পদত্যাগ করেন এবং নতুন ও পুরোনো চিন্তার অনুসারীদের মধ্যে ভাঙন সম্পন্ন হয়। যীশুর ধর্মকে ঈশ্বর প্রেম ও মানব সেবার ধর্ম এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

খৃষ্টান ধর্মের মধ্যে একত্ববাদ আজও অব্যাহত রয়েছে। খৃষ্টান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অনেকেই এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী এবং তারা বাইবেলের মধ্যকার স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও সেই নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন-যাপনে আগ্রহী। যদিও যীশুর বাস্তব জীবন সম্পর্কে, যেমন তিনি কীভাবে মানুষের সাথে আচরণ করতেন এবং তাদের ধর্ম শিক্ষা দিতেন, তিনি কীভাবে সব কাজ করতেন ও জীবন-যাপন করতেন সেসব বিষয়ে তাদের সামান্যই জ্ঞান ছিল। যা হোক, প্রায়শ্চিত্ত, পাপ স্খলন ও ত্রিত্ববাদী মতবাদের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তি এবং তার সাথে যীশু (ঈসা আলাইহিস সালাম) যেভাবে জীবন কাটিয়েছেন, তদনুযায়ী চলার ব্যাপারে প্রকৃত দিক-নির্দেশনার অভাব থাকার কারণে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা খৃষ্টধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের কারণ হয়েছে। বস্তুত খৃষ্টধর্মের চার্চগুলো আজ সামান্যতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।


[1] তু. ১৩ : ৩৬ এবং ৫ : ৮২-৮৩।