মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

ডেভিডের খুব মন খারাপ। গতকাল সাজিদের কথাগুলো শোনার পর থেকেই সে কেমন যেন নির্জীব হয়ে আছে। সকাল থেকে বাংলায় সে একটি কথাও বলেনি। টুকটাক যা বলেছে তার সবটাই টান টান ইংরেজিতে।

পঁচিশে ডিসেম্বর হিশেবে আজ সরকারি ছুটির দিন। আমার একবার মনে হয়েছিল ডেভিড রাতের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাল্টাবে এবং সকালেই তার বন্ধু অ্যালেনদের সাথে ক্রিসমাস পাটিতে জয়েন করবে; কিন্তু সকাল থেকেই তার মধ্যে তেমন কোনোলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। সাদা চামড়ার এই ছেলেটিকে এরকম বিষন্ন চেহারায় দেখতে আমার একদমই ভালো লাগছে না। সাজিদ মনোযোগ দিয়ে কী যেন লিখছে। মন খারাপ নিয়ে ডেভিড ম্যাগাজিন পড়ছে, আর আমি হাত-পা গুটিয়ে বেডের ওপর বসে আছি। পুরো ঘরটি জুড়েই প্রচ্ছন্ন নীরবতা।

নীরবতা ভেঙে আমি বললাম, “ডেভিড, তুমি কি অ্যালেনদের বাসায় সত্যিই যাচ্ছ না?

আমার কথা শুনে সে ম্যাগাজিন থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। যেন আমার এই প্রশ্নটি তার কাছে খুব অপ্রত্যাশিত। চশমার ফ্রেম ঠিক করতে করতে সে বলল, ‘নো।

আমার কথা শুনে সাজিদ লেখা থামিয়ে দিল। সম্ভবত আমাদের আলোচনায় সেও অংশগ্রহণ করবে। আমি বললাম, তুমি যে যাচ্ছ না, সেটি অ্যালেনকে জানিয়েছ?

ডেভিড আবারও বলল, ‘নো৷

‘অ্যালেন চিন্তা করবে না তোমার জন্যে? ‘হোয়াই?’, ডেভিভ প্রশ্ন করল।

আমি অবাক হয়ে বললাম, “বলো কী! তুমি কিন্তু অ্যালেনের ইনভাইটেশান পেয়েই বাংলাদেশে এসেছ। বাংলাদেশে পা রাখার পরে অ্যালেনের সাথে তোমার কি একবারও যোগাযোগ হয়েছে?

ডেভিড পুনরায় বলল, “নো৷ এবার কথা বলে উঠল সাজিদ। সে বলল, “ডেভিড, এটি কিন্তু ঠিক হয়নি মোটেও। অ্যালেন তো তোমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে। কোনো খোঁজ না পেয়ে সে ভাবতে পারে, হয়তো তোমার কোনো বিপদ হয়েছে।”

সাজিদের কথা শুনে ডেভিড ও মাই গড’ বলে চিৎকার করে উঠল। এরপর বলল, ‘ইউ আর রাইট, সাজিদ। বলতে বলতেই সে তার ব্যাগ খুলে একটি ডায়েরি বের করল এবং দ্রুতই ডায়েরি থেকে অ্যালেনের নাম্বার খুঁজে বের করল। সেখান থেকে ফোন নম্বর নিয়ে অ্যালেনকে ফোন করল। সবকিছু সে খুব দ্রুততার সাথেই করল। বিদেশিরা যে কাজকর্মে খুব চটপটে হয়ে থাকে সেটি ডেভিডকে দেখে হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া গেল।

নাহ, ডেভিডের কল যায়নি। আমি বললাম, তোমার ফোনে তো নেটওয়ার্কই নেই, মাই ফ্রেন্ড। কল কীভাবে যাবে? ডেভিড ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আই সী…।’ আমি আমার ফোনটি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, তুমি চাইলে আমার মোবাইল থেকে কল করতে পারো।

সে ‘থ্যাংক ইউ’ বলে আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে অ্যালেনকে ফোন করল। অ্যালেনের সাথে কথা বলা শেষ করে ডেভিড বলল, ‘আই হ্যাভ টু গো দেয়ার।

আমি বললাম, কোথায়?

‘অ্যালেনদের বাসায়।

‘ক্রিসমাস ডে সেলিব্রেইট করার জন্যে?

‘নোননা।

‘তাহলে?

ডেভিড এবার খুব স্পষ্ট বাংলায় বলল, ক্রিসমাস ডের দিন যদি জিসাস ক্রাইস্ট জন্মগ্রহণ না-ই করে, সেটি তো অ্যালেনেরও জানা উচিত, তাই না? অ্যালেন তো আমার বন্ধু। আমি আমার বন্ধুকে এই সত্যটি জানাব না?’ আমি বললাম, কিন্তু ডেভিড, তুমি যদি এটি করতে চাও তো…। আমাকে আবার থামিয়ে দিল সাজিদ। সে বলল, অবশ্যই অ্যালেনেরও জানা উচিত এইটা। এরপর সে ডেভিডের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি অবশ্যই যাবে, মাই ফ্রেন্ড।

এবার হাসল ডেভিড। সাজিদের উৎসাহ পেয়ে তাকে যারপরনাই খুশি বলে মনে হলো; কিন্তু ডেভিড যদি অ্যালেনদের কাছে গিয়ে আজকের দিনে এসব কথাবার্তা বলে, তা যে কতটা হিতে বিপরীত হতে পারে তা কি সাজিদ বুঝতে পারছে না?

ডেভিডের অনুরোধে আমাদের দুজনকেই তার সাথে যেতে হচ্ছে। অ্যালেনদের বাসা শ্যামলীতে। অ্যালেনের সাথে ফোনে কথা বলার সময় ডেভিড একেবারে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে যে, সে ক্রিসমাস ডেতে অ্যাটেন্ড করছে না। তার কথা শুনে অ্যালেন ভারি অবাক হলো। ডেভিড ক্রিসমাস পার্টিতে কেন অ্যাটেন্ড করবে

সে ব্যাপারে বারবার জানতে চাচ্ছিল অ্যালেন। ডেভিড শুধু একটি বাক্যই বলেছে। তাকে, ‘আগে দেখা হোক তারপর বলব।’

আমাদের দেখা হলো শ্যামলী স্কয়ারে। বিশাল এই স্কয়ারের পাঁচ তলার একটি রেস্টুরেন্টে আমরা চারজন এসে বসলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অ্যালেনের কাছে। অনেক আগেই নাকি ডেভিড আমাদের গল্প করে রেখেছে। সাজিদের পরিচয় পাওয়ার পরে অ্যালেন বলল, ‘ওহ! সো ইউ আর মি. আইনস্টাইন।

অ্যালেনের মুখে এই নাম শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। সে বলল, আপনাদের গল্প ডেভিড আমার কাছে সবসময়ই করত। ইচ্ছে ছিল ঢাবি ক্যাম্পাসে গিয়ে একদিন আপনাদের সাথে দেখা করে আসব; কিন্তু হয়ে উঠল না আর। আজকে তো দেখা হয়েই গেল, বলতে বলতে হেসে ফেলল অ্যালেন।

খেতে খেতে ডেভিড বলতে লাগল, “তোমাদের বাংলা ভাষা যে কী দুর্বোধ্য! এই ভাষা রপ্ত করতে আমার মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। একবার কী হয়েছে শোনো। একদম প্রথম দিকের কথা। তখন আমি নতুন নতুন বাংলা শিখছি মাত্র। এক বাঙালি লোকের সাথে পরিচয় হলো ক্যান্টিনে। তার কাছে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম চেয়ারকে বাংলা ভাষায় কী বলে? সে বলল, “চেয়ার’। আমি বললাম, ‘আরে না না। চেয়ার তো ইংরেজি। এটিকে বাংলা ভাষায় কী বলে থাকে? সে আবার বলল ‘চেয়ার বলে। আমার মাথা গেল গরম হয়ে। বললাম, “আরে চেয়ার ততা ইংরেজি শব্দ। এটার বাংলা আছে না? আমি সেই বাংলাটি জানতে চাইছি।

আমি চটে গেছি দেখে লোকটি তার ব্রেড হাতে নিয়ে আমার টেবিল থেকেই উঠে চলে গেল। এর অনেক পরে আমি জানতে পারলাম—চেয়ারের বাংলা করলে হয় ‘কেদারা। বাঙালিরা এই কঠিন শব্দে না বলে চেয়ারকে সোজাসুজি ‘চেয়ার’-ই বলে। এটি জানার পরে সেদিনের ওই লোকটার জন্যে আমার খানিকটা মায়া হলো। বেচারা সেদিন সঠিক উত্তর দিয়েও কি ঝাড়িটাই-না খেলো আমার। হা-হা-হা।

ডেভিডের কথা শুনে আমরাও হেসে উঠলাম। খেতে খেতে আমাদের আরও বেশ কিছু বিষয়ে গল্প হলো। অ্যালেনের আগ্রহের বিষয় রাজনীতি। সে ট্রাম্প-হিলারির নির্বাচন নিয়ে বেশ বড় রকমের লেকচার ফেঁদে বসল। অ্যালেন আমাকে আর সাজিদকে ‘আপনি করে বলছে দেখে ডেভিড বলে উঠল, ‘হেই, তুমি ওদের আপনি বলে সম্বোধন করছ কেন? বাংলা ভাষার আরেকটি সমস্যা হলো এই জিনিস। সম্বোধনের কতগুলো স্তর। তুই-তুমি-আপনি। আমাদের ইংরেজিতে বাবা এত ঝামেলা নেই। ছোট-বড় সবাইকে আমরা “You’ দিয়েই সেরে ফেলি।

অ্যালেন বলল, ‘তা তুমি ঠিক বলেছ অবশ্য। বাংলা ভাষা হলো সর্বনামের আখড়া। হাহাহা।

অ্যালেন বলল, ‘তা ডেভিড, তুমি ক্রিসমাস পার্টিতে জয়েন করবে না কেন? কী সমস্যা?

‘বিরাট সমস্যা’, বলল ডেভিড। তুমি জানলে খুব অবাক হবে যে, আমাদের জিসাস ক্রাইস্ট কিন্তু ডিসেম্বরের পঁচিশ তারিখে জন্মগ্রহণ করেননি। আমরা একটি ভুল-দিনে জিসাস ক্রাইস্টের জন্মদিন পালন করি। আই সোয়ার।

ডেভিডের কথার আগামাথা কোনোকিছু অ্যালেন বুঝতে পারল না। সে কপাল কুঁচকে বলল, “কী বললে তুমি?

ডেভিড খুব সিরিয়াস চেহারায় বলল, “আমাদের জিসাস ক্রাইস্ট পঁচিশে ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেননি। আমরা, মানে খ্রিষ্টানরা একেবারে একটি ভুল-দিনে জিসাস ক্রাইস্টের জন্মদিন পালন করি।

‘আর ইউ কিডিং?’, অ্যালেনের চেহারা থেকে রুক্ষ ভাবটি যায়নি। কুঁচকানোকপাল আর গুটানোচোখে যেন তার রাজ্যের বিস্ময়।

‘ননা, মাই ফ্রেন্ড। ট্রাস্ট মি। আই অ্যাম নট লায়িং টু ইউ। আই সোয়ার।

আমার সবচেয়ে মজা লাগছে ডেভিডের হাবভাব দেখে। সে এমনভাবে অ্যালেনকে বোঝাচ্ছে যেন অ্যালেন ক্রিসমাস ডে পালন না করলে তারই লাভ। সিরিয়াসনেসের সবটুকু তার চেহারায় বিরাজ করছে।

অ্যালেন বলল, তুমি এই কথা কোথায় শুনলে?’

‘আমাকে সাজিদ বলেছে। সে কিন্তু মিথ্যে বলেনি অ্যালেন। সে একেবারে এভিডেন্স সহকারে আমাকে প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে—জিসাস ক্রাইস্ট পঁচিশে ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেননি। আমরা ভুলদিনে ক্রিসমাস ডে পালন করি।

‘তাই?’

‘হ্যাঁ।

এবার অ্যালেন সাজিদের দিকে মুখ ফেরাল। তার চেহারায় একটু আগের উজ্জ্বলতাটুকু নেই। সেখানে স্থান করে নিয়েছে একগাদা অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতা। সে হয়তো এতক্ষণে ধরে নিয়েছে যে, আমরাই ডেভিডের মাথা গুলিয়ে খেয়েছি। অ্যালেন সাজিদকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তুমিই বলেছ ডেভিডকে এই কথা?

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন