কাবার ঐতিহাসিক সত্যতা-পাট ওয়ান

আমি খেয়াল করলাম অ্যালেন এবার ‘আপনি’ সম্বোধন ছেড়ে ‘তুমি’তে চলে এসেছে। সচেতনভাবে এসেছে না অবচেতনভাবে এসেছে তা বোঝা যাচ্ছে না।

সাজিদ বলল, “হ্যাঁ।

‘তোমার কাছে কী ধরনের এভিডেন্স আছে?

সাজিদ ধীরে ধীরে অ্যালেনকে সব কাহিনি খুলে বলল, যা সে গতকাল ডেভিডকে বুঝিয়েছিল। তবে একটি ব্যাপার বুঝেছি, অ্যালেন বাইবেল সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান রাখে। কয়েকটি জায়গায় সাজিদকে প্রশ্ন করে আটকাতেও চেয়েছে; কিন্তু সাজিদ দুর্দান্তভাবে সেগুলো রিফিউট করেছে। একটি পর্যায়ে গিয়ে অ্যালেন তো স্বীকার করেই বসল যে, জিসাস ক্রাইস্টের জন্ম কোনদিন সেটি বাইবেল নিশ্চিত করে না এবং সে এও বলল যে—আর্লি খ্রিষ্টানদের থেকে এই দিনটি জিসাস ক্লাইস্টের জন্মদিন হিশেবে উদ্যাপনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তার কথা শুনে ডেভিড বলল, ‘তাহলে, আমরা এই দিন পালন করি কেন অ্যালেন?

অ্যালেন বলল, ধর্মের কিছু কিছু বিচ্যুয়াল এভাবেই তৈরি হয়ে যায়। হতে পারে এই দিনেই জিসাস ক্রাইস্টের জন্মদিন উদ্যাপন উপলক্ষ্যে এমন কোনো ব্যাখ্যা আছে, যা আমরা কেউই জানি না। যারা জানে তারা হয়তো গত হয়েছে। তবে আমাদের উচিত প্রশ্ন না করে সেগুলো পালন করে যাওয়া।

তার কথা শুনে অবাক হলো ডেভিড। অবাক হলাম আমিও। সে ক্রিসমাস ডের জন্য এমন এক ব্যাখ্যার কথা বলছে যা বাইবেলে নেই, আর্লি ক্রিশ্চিয়ানরা পালন করেনি। সে এটিকে একটি রিচ্যুয়াল বানিয়ে সার্টিফায়েড করে দিতে চাইছে। অদ্ভুত!

অ্যালেন আবার বলল, “এরকম রিচুয়ালগুলো যে কেবল ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যেই আছে তা নয়। মোটামুটি সব ধর্মেই এসব পাওয়া যায়। এমনকি, ইসলামধর্মেও।

আমি আর সাজিদ সাথে আছি বলেই হয়তো অ্যালেন ইসলামধর্মের নামটি বেশ জোর দিয়েই বলল। ইসলামধর্মেও এরকম রিচ্যুয়াল আছে শুনে আরেকবার অবাক হলো ডেভিড। সে বেশ বিস্ময়ের সাথেই আমার আর সাজিদের চেহারার দিকে তাকাল। এই কথা শুনে আমাদের রিঅ্যাকশান কী হতে পারে সম্ভবত সেটি দেখাই তার উদ্দেশ্য।

আমি অ্যালেনকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “ইসলামধর্মেও এরকম রিচ্যুয়াল আছে বলতে?

অ্যালেন আমার দিকে তাকাল। বলল, ‘শিওর।

‘যেমন?

‘এই যেমন ধরো তোমাদের কাবা ঘর। তোমাদের কুরআন বলে এটি নাকি আব্রাহাম আই মিন নবী ইবরাহীম তার পুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন। দেখো, এটি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে জিসাস ক্লাইস্টের জন্মের আগেও পৃথিবীতে কাবা ঘরের অস্তিত্ব থাকবে, রাইট? এমনকি, জিসাস ক্রাইস্টের জন্মের সময়েও এটার অস্তিত্ব থাকা স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু নবী মুহাম্মদের জন্মের আগে তুমি এমন কোনোনন-মুসলিম সোর্স পাবে না যেখান থেকে প্রমাণ করা যায় যে, কাবা ঘরের অস্তিত্ব সেই আদিকাল থেকেই আছে। তাহলে কাবা ঘর আসলেই সেই আদিকাল থেকে ছিল কি ছিল না, সেটি নিয়ে একটি সংশয় কিন্তু আছে। তবুও মুসলিমরা সেটার দিকে মুখ করে ইবাদত করে। কাবায় হজ করে ইত্যাদি। এই যে, এভাবেই তো রিচ্যুয়াল তৈরি হয়।

সাজিদ বলল, “তো, তুমি বলতে চাচ্ছ যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের আগে, নন-মসুসলিম কোনো সোর্স থেকে কাবার অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না?

অ্যালেন বলল, “হ্যাঁ। দ্যাটস ইট।

কফি চলে এলো। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ডেভিড বলল, ‘হাউ স্ট্রেইঞ্জ। সাজিদ বলল, ‘অ্যালেন, আমার মনে হয় তুমি কোথাও একটি ভুল করছ। ‘না’, বলল অ্যালেন। আমি এ ব্যাপারে একেবারে সুনিশ্চিত।

‘তুমি কার কাছে শুনেছ এ ব্যাপারে?

অ্যালেন একটু ইতস্তত বোধ করল। এরপর বলল, “আমাদের এক ফাদারের কাছে।

আমার আর বুঝতে বাকি রইল না এই ফাদার আসলে কে। নিশ্চিত ক্রিশ্চিয়ান মিশনারি।

সাজিদ বলল, “ইটস ওকে। বাট, হতে পারে তোমার ফাদারের জানার মধ্যে কোথাও একটি গ্যাপ আছে।

অ্যালেন বলল, ‘আই ডোন্ট নন। বাট, তুমি কী বলতে চাচ্ছ, কাবার অস্তিত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোনো সত্যতা আছে? নন-ইসলামিক সোর্স থেকে?

‘অবশ্যই’, বলল সাজিদ। খুব সুন্দরভাবেই আছে।

সাজিদের কথা শুনে ডেভিডের চোখে-মুখে আবারও বিস্ময়ের রেশ দেখা গেল। এবারের বাংলাদেশ সফরে সে এত বেশিই বিস্মিত হচ্ছে যা সে তার পুরো জীবনেও হয়নি। সে বলল, “ওয়াও! সাজিদ, ক্যান ইউ এক্সপ্লেইন ইট, প্লিজ?

সাজিদ কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘শিওর।

এরপর সে অ্যালেনের দিকে ফিরল। বলল, ‘অ্যালেন, তোমার কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়েছে, বাইবেল, ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়ে তোমার বেশ জানাশোনা আছে। তুমি কি ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ Edward Gibbson-এর নাম শুনেছ কখনো?

অ্যালেন একটু মনে করার চেষ্টা করল। এরপর বলল, “ঠিক মনে করতে পারছি । হয়তো আমি তাকে চিনি না।

‘ফাইন’, বলল সাজিদ। আমি বলছি। Edward Gibbson হচ্ছেন পৃথিবীর হাতেগোনা সেরা কয়েকজন ইতিহাসবিদদের একজন। তার একটি বই এতই বিখ্যাত যে, ওই বইটির নামেই তাকে চেনা হয়ে থাকে।

ডেভিড বলে উঠল, “গ্রেট! কী নাম বইটির?’

“The History of the Decline and the Fall of the Roman Empire.?

ডেভিড আবার বলল, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে বইটি আগাগোড়া ইতিহাসের বই। হা-হা-হা।”

সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, এই বইতে তিনি বিভিন্ন ধর্ম, সেগুলোর উৎপত্তি থেকে শুরু করে সেগুলোর বিস্তৃতি ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন।

পৃথিবীতে ক্রিশ্চিয়ানিটির আগমনেরও আগে কাবার অস্তিত্ব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। মূলত তিনি এই রেফারেন্স টেনেছেন যিশু খ্রিষ্টেরও এক শতাব্দী আগের একজন ইতিহাসবিদ থেকে। তার নাম ছিল Diodorus siculus. গ্রিক এই ইতিহাসবিদ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আবিস্কৃত অঞ্চল নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম হলো Bibliotheca Historica. এডওয়ার্ড গিবসন তার সেই বই থেকেই কোট করেছিলেন।

‘কী আছে গিবসনের বইতে?

‘গিবসন লিখেছে, ‘blind mythology of barbarians – of the local deities, of the stars, the air, and the earth, of their sex or titles, their attributes or subordination. Each tribe, each family, each independent warrier, created and changed the rites and the object of this fantastic worship; but the nation, in every age, has bowed to the religion as well as to the language of Mecca. The genuine antiquity of Caaba ascends beyond the Christian era : in describing the coast of the Red sea the Greek historian Diodorus has remarked, between the Thamudites and the Sabeans, a famous temple, whose superior sanctity was revered by all the Arabians; the linen of silken veil, which is annually renewed by the Turkish emperor, was first offered by the Homerites, who reigned seven hundred years before the time of Mohammad[1]

অর্থাৎ ক্রিশ্চিয়ানিটির আগেই যে কাবার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, সেটি গিবসন অকপটে স্বীকার করেছে। এই দাবি গিবসনের নিজের নয়। তিনি কোট করেছেন গ্রিক হিস্টোরিয়ান ডিয়োডোরাসকে, যিনি আবার যিশু খ্রিষ্টের জন্মের আগেই মারা গেছেন। ডিয়োডোরাস তার বইতে গ্রিক ভাষায় যা লিখেছেন সেটার ইংরেজি ট্রান্সলেশান করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, And a temple has been set-up there, which is very holy and exceedingly revered by all Arabians.’

[1]The history of decline & the fall of the Roman Empire, Volume- 5, Page : 223-224


আগের অংশ টুকু পড়তে
[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন