কাবার ঐতিহাসিক সত্যতা-পাট টু

খেয়াল করো, গ্রিক হিস্টোরিয়ান বলছে যে, তখন সেখানে এমন একটি টেম্পল তথা প্রার্থনাস্থল তৈরি করা হয়েছিল, যা ছিল অতি পবিত্র এবং সেটি ছিল সকল আরবের কাছে পরম শ্রদ্ধার।

তো, এই যে টেম্পল তথা প্রার্থনাস্থল যা ছিল সকল আরবদের কাছে অতিশয় পবিত্রতা আর শ্রদ্ধার প্রতীক, এটি কি কাবাকেই নির্দেশ করে না, যা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন?

অ্যালেন বলল, ‘তা যে কাবা হবে, তা কীভাবে নিশ্চিত? অন্য কোনো ধর্মের কোনো গির্জা বা প্রার্থনাস্থলও তো হতে পারে, তাই না?

‘গুড কোয়েশ্চান’, বলল সাজিদ। কিন্তু, এখানে যে-সময়টার কথা বলা হচ্ছে তা যিশুর জন্মেরও অনেক আগের ঘটনা। ইতিহাস এবং বাইবেল থেকেও আমরা জানতে পারি—ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ইসমাঈলকে আরব দেশে রেখে যান। সে সময় আরব তথা মক্কায় তেমন কোনো লোকালয় ছিল না। এমনকি, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী হাজেরা আলাইহাস সালাম শিশু ইসমাঈলের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এ-পাহাড় থেকে ও-পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ির ঘটনাগুলোও তো সুপ্রসিদ্ধ, তাই না?

‘হুম।

‘এরকম একটি সময়ে ওই এলাকায় কি অনেক গুলো ধর্ম থাকা সম্ভব? নাকি, কেবল ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে-ধর্ম প্রচার করেছেন সেটি থাকা সম্ভব?

‘ইবরাহীমের ধর্ম থাকাই অধিক যুক্তিযুক্ত, তবে…।’, অ্যালেন একটি আপত্তি তুলতে যাচ্ছিল।

তাকে থামিয়ে দিয়ে সাজিদ বলল, “বেশ। ধরে নিলাম যে ওই সময়ে অনেকগুলো ধর্ম ছিল। তাহলে, গ্রিক হিস্টোরিয়ান ডিয়োডোরাস যে-টেম্পল তথা প্রার্থনাস্থলের কথা বলেছেন, তা একই সাথে ওই সময়ের সকল আরবদের কাছে পবিত্র এবং শ্রদ্ধার জায়গা হয় কীভাবে? যদি একেকজনের ধর্ম আলাদা আলাদা হয়, তাহলে তো ওই প্রার্থনাস্থল একই সাথে সবার কাছে সম্মানের এবং শ্রদ্ধার স্থান হিশেবে পরিচিতি পেতে পারে না। যদি তা-ই হয়, ডিয়োডোরাস কীভাবে লিখলেন যে,

‘And a temple has been set-up there, which is very holy and exceedingly revered by all Arabians?’

অ্যালেন চুপ মেরে গেল। সাজিদ আবার বলতে লাগল, ‘ডিয়োডোরাসের এই বক্তব্য থেকে এটাই পরিষ্কার যে, ওই সময়ে কেবল একটিই ধর্ম প্রচলিত ছিল এবং আরব দেশে অন্য কোনোধর্মের এমন কোনো প্রার্থনাস্থলের নিদর্শন পাওয়া যায়, যা একই সাথে খুবই প্রসিদ্ধ এবং শ্রদ্ধার বস্তু ছিল, কেবল কাবা ছাড়া। সেই ঐতিহাসিককাল থেকে আজ পর্যন্ত কাবা পুরো বিশ্বের সকল মুসলমানের কাছেই সমানভাবে সম্মানের, শ্রদ্ধার এবং ভালোবাসার জায়গা।

ডেভিড বলল, ‘ইটস অ্যা গুড পয়েন্ট, মাই ফ্রেন্ড।

‘তাহলে ডিয়োডোরাসের এই বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারলাম—যিশুর জন্মেরও অনেক আগেই কাবার অস্তিত্ব ছিল। এবার আসা যাক পরের পয়েন্টে। অ্যালেন, তুমি কি টলেমিকে চেনো?’

কথা বলে উঠল ডেভিড। বলল, বিজ্ঞানী টলেমির কথা বলছ তো?’

‘হুম।

-সাইন্সের ছাত্র হয়ে টলেমিকে চিনবে না এরকম আবার হতে পারে নাকি? হা-হা-হা।

‘বেশ’, বলল সাজিদ। টলেমি ছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী। তিনি নিজের কাজের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন সুপ্রাচীন অঞ্চলের একটি ম্যাপ তৈরি করেছিলেন। যিশুর জন্মেরও অনেক আগে পৃথিবীর কোথায় কোথায় প্রসিদ্ধ অঞ্চল বা লোকালয় আছে সেসব জড়ো করাই ছিল মূলত তার উদ্দেশ্য।

এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন মক্কা’-কে Macoraba বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং এই Macoraba-কে তিনি ধর্মীয় উপসনালয় এবং আরবের প্রাণকেন্দ্র হিশেবে উল্লেখ করেছিলেন। এই ব্যাপারটি অস্ট্রিয়ান ইতিহাসবিদ Gustave E. Von Grunebaum CPU PCS forza, ‘Mecca is mentioned by Ptolemy, and the name he gives it allows us to identify it as a south

Arabian foundation created around a sanctuary.?[1]

এতটুকু বলে সাজিদ থামল। ডেভিড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আরিফ, তোমার কি ব্যাপারটি ইন্টারেস্টিং লাগছে?

আমি বললাম, “হ্যাঁ। আমি তো খুব এনজয় করছি ডেভিড। তুমি?

‘আমিও খুব এনজয় করছি।”

‘খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে কাবার অস্তিত্ব যে ছিল এবং সেটি যে উপাসনালয় হিশেবে আরব পেনিনসুলাতে খুবই পরিচিত ছিল সেটাও আমরা টলেমির এসব রেফারেন্স থেকে বুঝতে পারি। তাহলে, এই কথা অস্বীকারের আর কোনো উপায় থাকে না যে, কাবার অস্তিত্ব কেবল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকেই নয়; বরং আমরা দেখলাম যে—কাবার ইতিহাস যিশু খ্রিষ্টের ইতিহাসের চাইতেও পুরোনো। যিশুর জন্মেরও বহু আগেও কাবার অস্তিত্ব পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল।

ডেভিড বলল, “কোয়াইট কনভিন্সিং, মাই ফ্রেন্ড।

চুপ করে আছে অ্যালেন। সাজিদ আবার বলা শুরু করল, “আচ্ছা অ্যালেন, বাইবেল কি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগের না পরের?’

‘ডেফিনেটলি আগের’, বলল অ্যালেন।

‘আচ্ছা। তাহলে নন-ইসলামিক সোর্স হিশেবে আমরা বাইবেলের রেফারেন্সও দেখতে পারি এক্ষেত্রে, কী বলে?

ডেভিড চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে বলল, “কী বললা! বাইবেলে এসব আছে নাকি? ডেভিডের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে সাজিদ বলতে লাগল, বাইবেলের Psalms এর চুরাশি নম্বর শ্লোকে বেশ ইন্টারেস্টিং কথা আছে। ওই শ্লোকটিতে মূলত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন স্ত্রী হাজেরা এবং পুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে হিজরত করছিল, সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। শ্লোকটিতে বলা হচ্ছে :

[1] How lovely is your dwelling place, O LORD Almighty!

[2] My soul yearns, even faints, for the courts of the LORD; my heart and my flesh cry out for the living God.

[3] Even the sparrow has found a home, and the swallow a nest for herself, where she may have her young– a place near your altar, O LORD Almighty, my King and my God.

[4] Blessed are those who dwell in your house; they are ever praising you.

[5] Blessed are those whose strength is in you, who have set their hearts on pilgrimage.

[6] As they pass through the Valley of Baca, they make it a place of springs; the autumn rains also cover it with pools.

এই শ্লোকটিতে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে শেষের লাইনটি। সেখানে তাদের, অর্থাৎ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এবং তার পরিবারের হিজরতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাইবেল বলছে, ‘As they pass through the valley of Baca’, তুমি কি বলতে পারো অ্যালেন, এই ‘Valley Of Baca’ বলতে বাইবেল কোন জায়গাটি বুঝিয়েছে?

অ্যালেন বলল, তুমি কি এটিকে মক্কা’ বলতে চাইছ?’

“হ্যাঁ”, বলল সাজিদ। কারণ, কুরআনের একটি আয়াতে ‘মাক্কা’ কে সরাসরি ‘বাক্কা’ নামে ডাকা হয়েছে।

ডেভিড অবাক হয়ে বলল, “রিয়েলি?’

‘হ্যাঁ। সূরা ইমরানের ছিয়ানব্বই নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, নিশ্চয় ইবাদতের জন্য সর্বপ্রথম যে-ঘর নির্মিত হয়েছিল তা ছিল বাক্কায়। এ থেকে আমরা জানতে পারি যে মক্কার আদি একটি নাম হলো বাক্কা এবং বাইবেলও কিন্তু এই নাম, অর্থাৎ মক্কার আদি নামই উল্লেখ করেছে। As they pass through the Baca, অর্থাৎ তারা যখন বাকা বা বাক্কার উপত্যকায় পৌঁছুল। মানে হলো, তারা যখন মক্কার উপত্যকায় পৌঁছুল।

অ্যালেন বলল, “ইউ নোঅ্যা ভেরি লিটল অ্যাবাউট বাইবেল, সাজিদ। তুমি বাইবেলের ‘Valley Of Baca’ এর অর্থ করেছ ‘মক্কার উপত্যকা। কিন্তু, বাইবেল-বিশারদরাও কি ঠিক এই অর্থ করেছে?

সাজিদ হাসল। মুখে হাসি রেখেই বলল, ‘ফাইন। এটি আমি তোমার কাছ থেকেই শুনতে চাই, অ্যালেন৷

‘কোনটা?’, অ্যালেনের প্রশ্ন।

‘বাইবেল-বিশারদরা Valley Of Baca এর কী অর্থ করেছে, সেটা।

অ্যালেন একটু কেশে নিল। এরপর বলল, তুমি যদি Jewish Encyclopedia দেখো তাহলে দেখবে যে, সেখানে “Baca’ এর অর্থ করা আছে এরকম : Valley Of Weeping। তা ছাড়া, অনেকে এই শব্দের আরও অর্থ করেছেন, যেমন : ‘valley Of Stream’, ‘Valley Of Deep Sorrow ইত্যাদি। সুতরাং, “Baca’ শব্দ থাকলেই যে তা তোমাদের কুরআনের ‘বাক্কা’ বা ‘মক্কা’ হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়।

অ্যালেনের চেহারায় বিজয়ীর একটি ভাব তৈরি হলো। সে সম্ভবত ধরেই নিয়েছে যে—সাজিদকে এবার সে আচ্ছামতো কাবু করে ফেলেছে। এই যুক্তি খণ্ডন করার ক্ষমতা আর সাজিদের নেই।

সাজিদ বলল, তুমি একদম ঠিক বলেছ অ্যালেন। বাইবেল-বিশারদরা এই শব্দটির অর্থ ঠিক এভাবেই করেছে যেমনটি তুমি বলেছ। শুধু Jewish Encyclopedia নয়, Anchor Bible Dictionary-তেও ‘Baca’ শব্দটির অর্থ তা-ই করা হয়েছে, যা তুমি একটু আগে বলেছ।

অ্যালেনের চেহারার উজ্জ্বলতা আরও বেড়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম না, সাজিদ কি নিজ থেকে হেরে যেতে চাচ্ছে নাকি অ্যালেনের কাছে? অ্যালেনের যুক্তি টিকে গেলে তো এতক্ষণ ধরে একটি একটি করে সাজিয়ে আসা সাজিদের সকল যুক্তি পুরোপুরিই ভেঙে পড়বে।

আবারও কথা বলে উঠল সাজিদ। সে বলল, ‘তবে অ্যালেন, আমি শব্দটির অর্থগুলোর একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

রিফারেন্স:

[1]Gustave E. Von Grunebaum, Classical Islam: A History 600-1258, Page : 19

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।