ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

কিসাস শাস্তির মধ্যে অপরাধের মূলনীতি -সুবিচার, সমতা, নিবৃত রাখা ও সমাধান করার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তাই কিসাস প্রয়োগের দ্বারা শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্য এবং নাগরিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এ শাস্তির মধ্যে সমতা ও সুবিচারের দৃশ্য এতই স্পষ্ট যে, কারো কাছে তা গোপন থাকা অসম্ভব। কেননা অপরাধীর সাথে কেবল সে আচরণই করা হয় যে আচরণ সে করেছে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর। এ কারণে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি সাদৃশ্যতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায় এবং সমতার সাথে অনুরূপ আচরণ করা সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে কিসাস রহিত হয়ে যায়। যেসব লোক মানুষের প্রাণ সংহারের সংকল্প করে এ ব্যবস্থা তাদেরকে কিসাসের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত করে দমিয়ে রাখে। তা ছাড়া কিসাস যেহেতু নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের হক, সুতরাং কিসাসের হাত থেকে হত্যাকারীকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও তাকে ক্ষমা করতে পারবে না। অনুরূপ এ শাস্তি কার্যকর থাকলে অপরাধের বিভিন্ন পথও রুদ্ধ থাকে। কেননা নিহতের উত্তরাধিকারীগণ যেহেতু কিসাস নেওয়ার অধিকারী তাই তারা অন্যভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে না, নিরপরাধীকে হত্যা করবে না কিংবা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে নিজেরাই অপরাধীকে হত্যা করবে না।

অভিযোগ ও তার জবাব

৬১. এক শ্রেণির লোক ইসলামের দণ্ডবিধান -কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যা  (القصاص في النفس) সম্পর্কে অভিযোগ করেন। তাদের অভিযোগ দু’টি।

এক. কিসাস একটি নির্মম নিষ্ঠুর শাস্তি। কেননা সকল হত্যার ক্ষেত্রে এ শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। তাদের ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতি মোটেই লক্ষ্য রাখা হয় না।

দুই. এ বিধানে কিসাসকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের অধিকার বলা হয়েছে অথচ হত্যাকাণ্ডকে সমাজের প্রতি মারাত্মক হুমকি ও ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হয়। সুতরাং কিসাস সমাজের অধিকার, উত্তরাধিকারীদের নয়।

প্রথম অভিযোগের জবাব: কিসাস আদৌ নিষ্ঠুর বিধান নয়। কেননা অপরাধী একজনকে হত্যা করেছে। তার বদলা হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়।  সে অন্যের ওপর যা করেছে তার চেয়ে বেশি কিছু তার ওপর করা হয় না। আর অপরাধীর ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করার বিষয়ে আমরা বলছি যে, অপরাধীর ব্যক্তিত্ব যতটুকু বিবেচনা করা প্রয়োজন শরী‘আত ততটুকু করেছে। সে হিসেবে অপরাধী যদি বালেগ, বিবেকবান ও স্বাধীন হয় তখন সে কিসাসের যোগ্য হয়, যদি সে অন্যায়ভাবে ইচ্ছাপূর্বক কাউকে হত্যা করে। তার বালেগ হওয়া, বিবেকবান হওয়া ও স্বাধীন হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেই তার প্রতি বিবেচনা করার দাবী শেষ হয়ে যায়। এই সীমানা পেরিয়ে তার মর্যাদা, অনুরাগ ও আভিজাত্য বিবেচনায় আনা হলে আমরা খেয়াল-খুশির চোরাবালিতে নিক্ষিপ্ত হব, সামাজিক বিধান ও শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়বে, অপরাধী শাস্তি থেকে খালাস পেয়ে যাবে এবং অন্যরা এ অপরাধ করতে আশকারা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে মানব সমাজের জন্য বড় ধরণের ক্ষতি, যা থেকে রক্ষা পেতে শরী‘আতের কিসাস প্রয়োগ অপরিহার্য।

দ্বিতীয় অভিযোগের জবাব: কিসাসকে নিথেকের উত্তরাধিকারীদের অধিকার গণ্য করা এবং সমাজের অধিকার গণ্য না করা এ বিধানের দোষ নয়; বরং অন্যতম সৌন্দর্য। কেননা অপরাধের প্রত্যক্ষ শিকার হয় নিহত ব্যক্তি ও তার উত্তরাধিকারীগণ। স্বজন হারাবার দহন জ্বালা তাদেরকেই সহ্য করতে হয়। পক্ষান্তরে সমাজের যে ক্ষতি হয় তা হয় পরোক্ষভাবে। তাই ইসলামের দাবী হলো তাদের হৃদয় থেকে ক্রোধের আগুন নির্বাপিত করা এবং কিসাসের অধিকার প্রদান করা। এরপর যদি তারা চায় তাহলে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারে এবং সেটাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবী। তারপর তারা কিসাস গ্রহণ করুক বা ক্ষমা করে দিক উভয় অবস্থায় অপরাধ প্রবণতা থেমে যাবে, অগ্রসর হবে না। অপরাধ নির্মূল হবে, ছাড়া পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। কেননা পূর্বেই বলা হয়েছে যে, নিহতের উত্তরাধিকারীগণ অপরাধীকে ক্ষমা করে দিলেও আদালতের ইখতিয়ার আছে তাকে তা‘যীর দণ্ড প্রদান করা।

আরও একটি অভযোগ ও তার জবাব

৬২. অভিযোগ করা হয় যে, হত্যা ব্যতীত যখম ও অঙ্গ কর্তন করার অপরাধে কিসাস (القصاص فيما دون النفس) হিসেবে অপরাধীকে অনুরূপ যখম করা ও অঙ্গ কর্তন করার শাস্তি একটি নির্দয় ও কঠোর শাস্তি।  এ অভিযোগ পূববর্তী অভিযোগের মতোই প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা হত্যার কিসাস এবং যখম বা অঙ্গ কর্তনের উদ্দেশ্য একই। তা হলো অপরাধ দমন, সতর্ককরণ এবং ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা। যখম বা অঙ্গ কর্তনের ফলে কোনো কোনো সময় আহত ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটে থাকে। তাই হত্যার ক্ষেত্রে যেমন কিসাস ওয়াজিব তেমনি যখম ও অঙ্গ কর্তনের ক্ষেত্রেও কিসাস ওয়াজিব। জীবনের ওপর যুলুম করায় শিরচ্ছেদ যখন বৈধ তখন একটি অঙ্গ কর্তন করা তো আরো বেশি বৈধ।

কিসাস শাস্তির মধ্যে অপরাধের মূলনীতি -সুবিচার, সমতা, নিবৃত রাখা ও সমাধান করার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তাই কিসাস প্রয়োগের দ্বারা শাস্তি প্রদানের মূল উদ্দেশ্য এবং নাগরিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এ শাস্তির মধ্যে সমতা ও সুবিচারের দৃশ্য এতই স্পষ্ট যে, কারো কাছে তা গোপন থাকা অসম্ভব। কেননা অপরাধীর সাথে কেবল সে আচরণই করা হয় যে আচরণ সে করেছে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর। এ কারণে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি সাদৃশ্যতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায় এবং সমতার সাথে অনুরূপ আচরণ করা সম্ভব না হয় সেক্ষেত্রে কিসাস রহিত হয়ে যায়। যেসব লোক মানুষের প্রাণ সংহারের সংকল্প করে এ ব্যবস্থা তাদেরকে কিসাসের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত করে দমিয়ে রাখে। তা ছাড়া কিসাস যেহেতু নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের হক, সুতরাং কিসাসের হাত থেকে হত্যাকারীকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও তাকে ক্ষমা করতে পারবে না। অনুরূপ এ শাস্তি কার্যকর থাকলে অপরাধের বিভিন্ন পথও রুদ্ধ থাকে। কেননা নিহতের উত্তরাধিকারীগণ যেহেতু কিসাস নেওয়ার অধিকারী তাই তারা অন্যভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে না, নিরপরাধীকে হত্যা করবে না কিংবা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে নিজেরাই অপরাধীকে হত্যা করবে না।

অভিযোগ ও তার জবাব

৬১. এক শ্রেণির লোক ইসলামের দণ্ডবিধান -কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যা  (القصاص في النفس) সম্পর্কে অভিযোগ করেন। তাদের অভিযোগ দু’টি।

এক. কিসাস একটি নির্মম নিষ্ঠুর শাস্তি। কেননা সকল হত্যার ক্ষেত্রে এ শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। তাদের ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতি মোটেই লক্ষ্য রাখা হয় না।

দুই. এ বিধানে কিসাসকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের অধিকার বলা হয়েছে অথচ হত্যাকাণ্ডকে সমাজের প্রতি মারাত্মক হুমকি ও ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হয়। সুতরাং কিসাস সমাজের অধিকার, উত্তরাধিকারীদের নয়।

প্রথম অভিযোগের জবাব: কিসাস আদৌ নিষ্ঠুর বিধান নয়। কেননা অপরাধী একজনকে হত্যা করেছে। তার বদলা হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়।  সে অন্যের ওপর যা করেছে তার চেয়ে বেশি কিছু তার ওপর করা হয় না। আর অপরাধীর ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করার বিষয়ে আমরা বলছি যে, অপরাধীর ব্যক্তিত্ব যতটুকু বিবেচনা করা প্রয়োজন শরী‘আত ততটুকু করেছে। সে হিসেবে অপরাধী যদি বালেগ, বিবেকবান ও স্বাধীন হয় তখন সে কিসাসের যোগ্য হয়, যদি সে অন্যায়ভাবে ইচ্ছাপূর্বক কাউকে হত্যা করে। তার বালেগ হওয়া, বিবেকবান হওয়া ও স্বাধীন হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেই তার প্রতি বিবেচনা করার দাবী শেষ হয়ে যায়। এই সীমানা পেরিয়ে তার মর্যাদা, অনুরাগ ও আভিজাত্য বিবেচনায় আনা হলে আমরা খেয়াল-খুশির চোরাবালিতে নিক্ষিপ্ত হব, সামাজিক বিধান ও শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়বে, অপরাধী শাস্তি থেকে খালাস পেয়ে যাবে এবং অন্যরা এ অপরাধ করতে আশকারা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে মানব সমাজের জন্য বড় ধরণের ক্ষতি, যা থেকে রক্ষা পেতে শরী‘আতের কিসাস প্রয়োগ অপরিহার্য।

দ্বিতীয় অভিযোগের জবাব: কিসাসকে নিথেকের উত্তরাধিকারীদের অধিকার গণ্য করা এবং সমাজের অধিকার গণ্য না করা এ বিধানের দোষ নয়; বরং অন্যতম সৌন্দর্য। কেননা অপরাধের প্রত্যক্ষ শিকার হয় নিহত ব্যক্তি ও তার উত্তরাধিকারীগণ। স্বজন হারাবার দহন জ্বালা তাদেরকেই সহ্য করতে হয়। পক্ষান্তরে সমাজের যে ক্ষতি হয় তা হয় পরোক্ষভাবে। তাই ইসলামের দাবী হলো তাদের হৃদয় থেকে ক্রোধের আগুন নির্বাপিত করা এবং কিসাসের অধিকার প্রদান করা। এরপর যদি তারা চায় তাহলে অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারে এবং সেটাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবী। তারপর তারা কিসাস গ্রহণ করুক বা ক্ষমা করে দিক উভয় অবস্থায় অপরাধ প্রবণতা থেমে যাবে, অগ্রসর হবে না। অপরাধ নির্মূল হবে, ছাড়া পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। কেননা পূর্বেই বলা হয়েছে যে, নিহতের উত্তরাধিকারীগণ অপরাধীকে ক্ষমা করে দিলেও আদালতের ইখতিয়ার আছে তাকে তা‘যীর দণ্ড প্রদান করা।

আরও একটি অভযোগ ও তার জবাব

৬২. অভিযোগ করা হয় যে, হত্যা ব্যতীত যখম ও অঙ্গ কর্তন করার অপরাধে কিসাস (القصاص فيما دون النفس) হিসেবে অপরাধীকে অনুরূপ যখম করা ও অঙ্গ কর্তন করার শাস্তি একটি নির্দয় ও কঠোর শাস্তি।  এ অভিযোগ পূববর্তী অভিযোগের মতোই প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা হত্যার কিসাস এবং যখম বা অঙ্গ কর্তনের উদ্দেশ্য একই। তা হলো অপরাধ দমন, সতর্ককরণ এবং ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা। যখম বা অঙ্গ কর্তনের ফলে কোনো কোনো সময় আহত ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটে থাকে। তাই হত্যার ক্ষেত্রে যেমন কিসাস ওয়াজিব তেমনি যখম ও অঙ্গ কর্তনের ক্ষেত্রেও কিসাস ওয়াজিব। জীবনের ওপর যুলুম করায় শিরচ্ছেদ যখন বৈধ তখন একটি অঙ্গ কর্তন করা তো আরো বেশি বৈধ।

দিয়তের ওপর অভিযোগ ও তার জবাব

৬৩. শরী‘আতের অন্যতম বিধান দিয়ত সম্পর্কে কেউ কেউ অভিযোগ করেন। তারা বলেন, দিয়তের ভার বহন করতে হয় স্বজনদের, অথচ তারা অপরাধের সাথে জড়িত নয়। এটা শাস্তির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবির পরিপন্থী। অভিযোগের জবাব, স্বজনরা কেন দিয়তের ভার বহন করবে তার কারণ ইতোপূর্বে আমরা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি। ঐ বর্ণনার সারকথা হলো, স্বজনদের ওপর দিয়ত আরোপ শাস্তি হিসেবে হয় নি, হয়েছে সহযোগিতা ও সহমর্মীতা হিসাবে। কোনো কোনো অবস্থায় সহমর্মীতা দেখানো অপরিহার্য করে দেওয়ার পূর্ণ অধিকার শরী‘আতের আছে। যেমন, অভাবী আত্মীয়-স্বজনদের আর্থিক সাহায্য ও ভরণপোষণ দেওয়া শরী‘আত অপরিহার্য করে দিয়েছে। এছাড়া স্বজনদের ওপর দিয়ত আরোপের আরও কারণ হলো -অপরাধীকে দেখাশুনা করা, সুশিক্ষা দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব স্বজনদের। তারা দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছে। সে ত্রুটির জন্য তাদের ওপর দিয়ত আরোপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিশদভাবে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।