মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২। লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

সকালবেলায় ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় একটি চক্কর না দিলে আমার চলে না। পুরো পার্কটি একবার ঘুরে আসা চাই। যদিও পার্ক এলাকাটিতে যুবকদের তুলনায় বয়স্কদের আনাগোনাই বেশি।

এখানে এসে এই বয়স্ক লোকগুলোর চেহারা দেখতে আমার খুবই ভালো লাগে। আমি এদের দেখি। এই যে লোকগুলো, এরা আজ থেকে বিশ বছর আগে কেমন ছিল? টগবগে তরুণ। তাদের গায়ে তখন যৌবনের উন্মত্ততা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হয়তো এদের গর্জন আর হুংকারে প্রতিনিয়ত প্রকম্পিত হতো। শার্টের কলার খোলা রেখেই এরা ঢুকত আর বের হতো। এরা চাইলেই ক্লাস হতো নয়ত হতো না।

এরা মিছিল করত, মিটিং করত। এদের কেউ হয়তো-বা ছিল পাক্কা রাজনীতিবিদ। মোদ্দাকথা, এদের শিরদাঁড়া তখন তালগাছের মতো খাড়া ছিল। বুক ফুলিয়ে হাঁটত এরা ক্যাম্পাসজুড়ে।

কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! ঠিক বিশ বছর পরে এসে এদের তালগাছের মতো খাড়া-শিরদাঁড়া নুয়েপড়া কলাগাছের মতো ঝুঁকে গেছে। যে তারুণ্য নিয়ে অহংকারে মাটিতে তাদের পা পড়ত না, আজ তা অতীত। যে শরীর নিয়ে তাদের অহংকারের অন্ত ছিল না, তা আজ নেতিয়ে পড়েছে। যাদের পায়ের শব্দে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা গমগম করত, আজকে তারা দু-মিনিট হাঁটতেই হাঁপিয়ে উঠছে! এই দৃশ্যগুলো থেকে মানুষের অনেককিছু শেখার আছে। বোঝার আছে।

বেলা বাড়তেই ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকাটি সরগরম হয়ে ওঠে। চারদিকে বাড়তে থাকে মানুষের কোলাহল। বাদাম-বিক্রেতা, আইসক্রিম-বিক্রেতারা তাদের মালপত্র নিয়ে হাজির হয়। পাশেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রছাত্রীদের আগমনে পুরো এলাকাটি আরও মুখরিত হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলা সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় যে জায়গাটিকে, সেই বাংলাবাজার এলাকা তো ভিক্টোরিয়ার ঠিক পাশেই। কত কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার, রাজনীতিবিদ, কলা-কুশলী রোজ এই পথ মাড়িয়ে যায়, তার ইয়ত্তা নেই। তবু ভিক্টোরিয়া তার মতোই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

আজ আমার সাথে সাজিদও আছে। তার হাতে একটি বই। ড্যান ব্রাউনের লেখা অ্যাঞ্জেলস এন্ড ডেমনসা

বিখ্যাত ডিটেক্টিভ ক্যারেক্টার ‘রবার্ট ল্যাঙডন’-এর স্রষ্টা ড্যান ব্রাউনের নাম শশানেনি—এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়াই এখন দুষ্কর বলতে গেলে। পার্কের পশ্চিম দিকটায় এসে সাজিদ বসে পড়ল। বই পড়বে। মঈনুল নামে আমার এক বন্ধু আছে। ভালো কবিতা লিখত একসময়ে। একবার একটি কবিতা লিখে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। সেই কবিতার সবটা আমার মনে নেই, তবে দু-লাইন মনে করতে পারি অবশ্য। লাইন-দুটো ছিল এরকম—

‘একদিন লাশেরা চিৎকার করে উঠবে চিহ্নিত হবে খুনীদের চেহারা …’

এই কবিতা লিখে মঈনুল তখন রাতারাতি ক্যাম্পাসে ‘কবি’ বনে যায়। এরপর থেকে দৈনিক পত্রিকাগুলো নিয়ম করে ওর কবিতা ছাপাতে শুরু করে। পত্রিকায় কবিতা ছাপা হওয়াতে আমাদের মঈনুল তখন ‘ক্যাম্পাসের কবি’র বদলে দেশের কবি’ খেতাবে উন্নীত হয়ে যায়।

মঈনুলের একটি কবিতা পত্রিকায় ছাপা হতো, আর আমরা সবাই মিলে মিন্টু দার দোকানে গিয়ে ফুচকা খেয়ে ওর পকেট সাবাড় করতাম। বেচারা কবিতা লিখে টুকটাক যা কিছু কামাই করে, দেখা যেত তার সবটাই আমাদের পেটে ঢুকে পড়ত।মঈনুলের সাথে খুব একটা যোগাযোগ হয় না আজকাল। দুনিয়ার ঘূর্ণাবর্তে আমরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। নিয়মের এই বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়লে সম্পর্কগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারাটা অনেক কঠিন হয়ে ওঠে। বন্ধু প্রতীমের কাছে জানতে পারলাম, মঈনুল এখন নাকি কবিতাচর্চা ছেড়ে নাস্তিকতাচর্চায় বিভোর হয়েছে। শুনে কিছুটা মর্মাহত হলাম। নটরডেমে আমরা একসাথে পড়েছি। ভালো

ধার্মিক ছিল সে। নিয়মিত নামাজ-কালাম পড়ত। ওর বাবা ছিলেন মৌলবী। ছোটবেলায় পরিবারে ধর্মীয় শিক্ষা যে পায়নি, তাও বলা যাচ্ছে না।

ভিক্টোরিয়া পার্কে সেদিন সকালবেলা চতুর্থ চক্করটা দিতে যাব ঠিক তখন দেখলাম, উত্তর-পূর্ব দিক থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে মঈনুল আসছে। দেখতে অনেক নাদুস-নুদুস হয়েছে অবশ্য। ভুড়িও বেড়েছে অনেকটা। হালকা পাতলা ধরনের একটি বাদামী টি-শার্ট গায়ে থাকায় তার ভুড়িটা সামনের দিকে আরও হেলে এসেছে।

কাছাকাছি আসতেই মঈনুল আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “কীরে ভ্যাবলা! কেমন আছিস?

মঈনুল কলেজ-লাইফ থেকেই আমাকে ‘ভ্যাবলা’ বলে ডাকে। আমার চেহারা নাকি দেখতে ভ্যাবলা টাইপের, তাই। নিজেকে ‘ভ্যাবলা ভাবতেই আমার গা ঘিনঘিন করত; কিন্তু মঈনুলকে কিছু বলতেও পারতাম না। কারণ, মঈনুল ছিল আমাদের ক্লাসে অঙ্কের বস। এমন কোনো অঙ্ক ছিল না, যা সে পারত না। দু-দুবার সে গণিত অলিম্পিয়াডে প্রথম হয়েছিল।

‘ভালো আছি, তুই কেমন আছিস? ‘ভালো। অনেকদিন পরে। থাকিস কোথায়? ‘কাছাকাছিই। তুই? ‘আমিও এদিকে থাকছি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কবিতা লিখিস আজকাল?

মঈনুল কিছু না বলে হাঁপাচ্ছে। আমি আবার বললাম, “শুনলাম, তুই নাকি বিগড়ে গিয়েছিস?’

মঈনুল আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল। আমি কী বলতে চাচ্ছি সেটা মনে হয় সে বুঝতে পেরেছে। চোখমুখ শক্ত করে বলল, ‘সত্য জানতে চাওয়া মানে কি বিগড়ে যাওয়া?

আমি বুঝতে পারলাম মঈনুল খুব সিরিয়াস মুডে আছে। এই মুহূর্তে তাকে পাল্টা উত্তর দিয়ে কাবু করে ফেলার ইচ্ছে আমার নেই। হাঁটতে হাঁটতে আমরা তখন পার্কের পশ্চিম দিকটায় চলে এসেছি। সাজিদ তখনো বই পড়ছে। আমি এসে সাজিদের সাথে মঈনুলের পরিচয় করিয়ে দিলাম। সাজিদের একটি গুণ এই, সে অপরিচিত কারও সাথে মুহূর্তেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

প্রাথমিক পরিচয়-পর্ব সেরে আমি আর মঈনুল সাজিদের পাশে বসে পড়লাম। দুজনেই হাঁপাচ্ছি। মঈনুল মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। সাজিদ তার ব্যাগে থাকা পানির বোতলটি মঈনুলের দিকে বাড়িয়ে দেয়। মঈনুল হাত বাড়িয়ে বোতলটি নিয়েই ঢকঢক করে বোতলের অর্ধেক পানি পেটের ভেতরে চালান করে দেয়। এরপর সে বোতলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নে, পানি খা।

পানি পান করে শার্টের হাতায় মুখ মুছে নিয়ে বললাম, “তা তোর বিগড়ে যাওয়ার রহস্যটা কীরে, মোটকু?

মঈনুল দাঁতমুখ খিচে আমার দিকে তাকাল। তাকে তখন আলিফ লায়লার কান খাড়া করা পিশাচের মতো দেখাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘সরি! সরি! আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম, তোর এই পরিবর্তনের কারণ কী?

আমার কথা বেশ গায়ে লাগল তার। ভারী মুখ নিয়েই বলল, পড়াশোনা কর, জানতে পারবি…’

‘তুই পড়াশোনা করেই এরকম বিগড়ে গিয়েছিস? মাই গুডনেস।

আমাদের এই ঝগড়া বেশিদূর আগাতে দিল না সাজিদ। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী নিয়ে তর্ক করছিস তোরা?

মঈনুলের দিক থেকে কঠিন দৃষ্টি ফিরিয়ে আমি সাজিদের দিকে তাকালাম। বললাম, ‘মঈনুল নাকি নাস্তিক হয়ে পড়েছে। আমাদের ধর্ম নিয়ে সে নাকি এত বেশি পড়াশোনা করে ফেলেছে যে, সে আস্ত একটা অশ্বডিম্ব হয়ে বসে আছে।

আমার কথায় বেশ রাগ ঝরছে দেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। সাজিদ। বলল, ‘একজন লোক তো চাইলে অনেক বেশি পড়াশোনা করতে পারে। সেটি ধর্ম নিয়ে হোক বা অন্যকিছু।

‘তাই বলে নাস্তিক হয়ে যেতে হবে? আমার প্রশ্ন।

‘সেটি তো তোর মর্জিমাফিক হবে না। কে আস্তিক থাকবে আর কে নাস্তিক থাকবে ব্যাপারটি তো আমি আর তুই ঠিক করব না, তাই না?

এমনিতেই প্রচণ্ড রেগে আছি। তার ওপর সাজিদের এমন দরদমার্কা কথা শুনে আমার তো একেবারে গা জ্বলে যাওয়ার মতো অবস্থা।

আমাকে দুচার-কথা শুনিয়ে এবার সে মঈনুলের দিকে ফিরে খুব শান্ত গলায় বলল, ‘মঈনুল ভাই, আরিফের কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না। সে আসলে অল্পতেই রেগে যায়। অস্থির সৃভাবের; কিন্তু বন্ধু হিশেবে সে যথেষ্টই ভালো মনের মানুষ।

সাজিদের কথা শুনে আমার রাগের মাত্রা যেন আরও বেড়ে গেল। গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালা হচ্ছে! খেয়াল করলাম মঈনুলের মুখ থেকে রাগের আভাটুকু সরে গেছে। সাজিদের কথাগুলো সে হয়তো পছন্দ করেছে। তাই বলল, ‘না, কী মনে করব? ও আর আমি তো কলেজ-লাইফ থেকেই এরকম খুনসুটি করতাম। এগুলো আমাদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার।

সাজিদ হেসে বলল, ‘বাহ। তাহলে তো আর কোনো ঝামেলাই নেই। তা, কোন ডিপার্টমেন্টে আছেন?’

মঈনুল বলল, ‘ম্যাথমেটিক্স। ‘খুব ভালো। আপনার কথা আরিফের কাছে আগে কখনোই শুনিনি। আজকে পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগল।

মঈনুল ইতস্তত করে বলল, আমরা তো একই বয়সের বলা চলে। আমাদের মধ্যে ‘আপনি’ সম্বাধনটা না থাকলেই ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে।

মঈনুলের কথায় সায় দিয়ে সাজিদ বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে বলার পরে সাজিদ পুনরায় প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, যদি কিছু মনে না করো আমি কি তোমাকে

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন