মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ-২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

অনেকদিন পর শাহবাগে হঠাৎ নীলু দা’র সাথে দেখা। প্রথমে খেয়াল করিনি। পেছন থেকে এসে আমার মাথায় টোকা দিয়ে বললেন, কী খবর কবি সাহেব?

পেছন ফিরতেই দেখি হাতে একগাদা বই নিয়ে নীলু দা দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা লাগিয়েছেন বলে দেখতে একদম স্কুল মাস্টারের মতো লাগছে। খয়েরি রঙের টি-শার্ট গায়ে। আমি খুবই অপ্রস্তুত ছিলাম। বললাম, আরে দাদাভাই যে! কেমন আছ?

‘ভালো। তুই কেমন?

‘ভালো।

কুশলাদি বিনিময় করতে করতে আমরা একটি ফাঁকা স্থানে এসে দাঁড়ালাম। নীলু দা জিজ্ঞেস করল, “সাজিদ কোথায়?

এই মুহূর্তে সাজিদ কোথায় তা আমিও জানি না। একটু আগেও সে আমার সাথে ছিল। আমি মোবাইলে টাকা রিচার্জ করে এসে দেখি সে উধাও। কখন থেকে ফোন করেই যাচ্ছি! যদিও জানি, সে আমার ফোন ওঠাবে না, তবুও ব্যর্থ চেষ্টা করে যাওয়া আরকি! কতক্ষণই বা এরকম কাঠফাঁটা রোদে দাঁড়িয়ে থাকা যায়?

নীলু দা’র প্রশ্নের জবাবে বললাম, ‘আছে হয়তো এদিকে কোথাও।

বলতে-না-বলতেই সাজিদ আমাদের সামনে এসে উপস্থিত। যেরকম বাতাসের মতোই উবে গিয়েছিল, সেরকম বাতাসের মতোই এসে হাজির হয়েছে। মাঝে মাঝে তাকে আমার ভারি অদ্ভুত লাগে। এই মুহূর্তে মন চাচ্ছে তাকে কানের নিচে দুচারটা দিয়ে জিজ্ঞেস করি—ফোনটা ওঠালে কী অপরাধ হতো?

কোনোরকমে রাগ সংবরণ করে বললাম, “ফোন উঠাসনি কেন?

সে আমার কথা গ্রাহ্য করেছে বলে মনে হলো না। হাত বাড়িয়ে নীলু দার সাথে হ্যান্ডশেক-পর্ব সেরে নিল। আমার রাগ আরও বেড়ে গেল। পৃথিবীতে আমি সবকিছু সহ্য করতে পারি; কিন্তু কেউ আমাকে পাত্তা না দিলে, সামনাসামনি আমাকে ইগনোর করলে আমি সেটি একদমই মেনে নিতে পারি না। নীলু দা না-থাকলে হয়তো এই মুহূর্তে তার গায়ে এক ঘুসি লাগিয়ে দিতাম; কিন্তু সিনিয়র একজন সামনে আছেন বলে ধৈর্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “এতক্ষণ তুই ফোন উঠাসনি কেন?

পাশ দিয়ে একজন চা-বিক্রেতা যাচ্ছিল। সাজিদ তাকে থামিয়ে নীলু দার দিকে ফিরে বলল, ‘চা খাবে নীলু দা?’

‘খাওয়া যায় নীলু দার সম্মতি।

এরপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই খাবি?’

রাগে আমার গা ঘিনঘিন করছিল তখন। ব্যাটা! নীলু দার মতো লোকের সামনে অপমান করার পরেও জিজ্ঞেস করছে চা গিলব কিনা! আহাম্মক কোথাকার!

রাগ চেপে বললাম, “না, খাব না।

আমার ব্যাপারে আর বেশি আগ্রহ না দেখিয়ে সাজিদ আর নীলু দা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটি বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। তাদের পেছন পেছন আমিও গেলাম।

‘কোথায় ছিলে এতদিন?’ সাজিদ নীলু দার কাছে জানতে চাইল।

‘ছিলাম শহরেই।

‘আত্মগোপনে?

নীলু দা এমনিতেই সদাহাস্য মানুষ। যেকোনো কিছুতে হো হো করে হাসতে পারে। সাজিদের কথা শুনে হাসতে হাসতেই বলল, ‘তুই কি আমাকে চোর-ডাকাত টাইপ কিছু ভাবিস নাকি রে?’

‘না। তবে যেভাবে তুমি একেবারে সবকিছু থেকে ইস্তফা দিয়ে বেখবরে চলে গেলে, তাই ভাবলাম আত্মগোপনে আছ কি না।

দুজনের মধ্যে কথাপকথন চলছিল। মুখ গোমড়া করে আমি নীলু দার পাশে বসে আছি। একপর্যায়ে নীলু দা বলল, “তবে ভালোই হয়েছে তোর সাথে দেখা হয়ে। কিছুদিন ধরে মনে মনে আমি তোকেই খুঁজছিলাম।

সাজিদ বলল, তুমি খুজছিলে আমাকে অবাক করা ব্যাপার!

‘বিস্মিত হলি বলে মনে হলো’ বলল নীলু দা।

‘বিস্মিত হবারই তো কথা। তোমার মতো লিজেন্ডারি পারসন আমার খোঁজ করছে, এই খুশিতে তো আমার বাকবাকুম বাকবাকুম করতে মন চাইছে।

নীলু দা চোখ রাঙিয়ে বলল, “মজা করবি না একদম। আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলেছি। তোর কাছে একটি ব্যাপার জানার ছিল আমার।

এবার সাজিদ বেশ আগ্রহ দেখিয়ে জানতে চাইল, ‘ব্যাপার কী?

নীলু দা গা ঝেড়ে উঠে বলল, “তুই তো জানিস, আমি উইমেন রাইটস নিয়ে কাজ করি। নারীর অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়ে কাজ করাই আমার । প্যাশন বলতে পারিস।

সাজিদ বলল, ‘তা তো আমি জানিই। নতুন করে বলার কী দরকার?

‘দরকার আছে। যেখানেই আমরা নারীর অমর্যাদা আর অসম্মান দেখব, আমাদের উচিত সেখানেই প্রতিবাদ করা, রাইট?’

‘হুম।

‘সেই অসম্মানটা ধর্মের নামে হোক বা অধর্মের নামে, আমাদের প্রতিবাদ সব জায়গাতেই জারি থাকা উচিত। তাই নয় কি?

সাজিদ ‘হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।

‘তাহলে বল, একটি ধর্মগ্রন্থ যদি নারীদের শস্যক্ষেতের সাথে তুলনা করে এবং যদি বলে যে তাদের যেমন ইচ্ছে ব্যবহার করতে, তখন ব্যাপারটি কেমন দেখায়?

সাজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। বুঝতে পেরেছি লম্বা একটি লেকচার ঝাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। তবে এই মুহূর্তে তার লেকচার শোনার কোনোরকম ইচ্ছে আমার নেই। উঠে হাঁটতে পারলেই বাঁচি; কিন্তু সম্মানিত এক সিনিয়র বড় ভাই সাথে আছেন বলে এভাবে ওঠা-ও সম্ভব না। তাই ইচ্ছে না থাকলেও সাজিদের লেকচার গলাধঃকরণ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো উপায় নেই।

এবার সাজিদ বলতে শুরু করল, ‘বুঝতে পেরেছি। তুমি নিশ্চয়ই সূরা বাকারার ২২৩ নাম্বার আয়াতের কথা বলছ, তাই না?

নীলু দা না জানার ভান করে বলল, আমি আসলে জানি না কুরআনের কোথায় এটা বলা আছে। তবে আমি নিশ্চিত হয়েছি এরকম কিছু ব্যাপারে। এরকম কিছু যদি থেকে থাকে, তাহলে এই বক্তব্যের সাথে কি তুই একাত্মতা পোষণ করিস, সাজিদ?

সাজিদ আবারও কয়েক মুহূর্ত ভাবল। এরপর বলল, ‘আমি একাত্মতা পোষণ করি কি , সেটি জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত থেকে তুমি কী বুঝেছ সেটি।

নীলু দা বলল, নতুন করে আর কী বুঝব? ওখানে তো খুব স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে নারীরা হলো তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। তোমরা তাদের যেভাবে মন চায় ব্যবহার করো। নারীর জন্য এর চেয়ে অপমানজনক কথা আর কিছু কি থাকতে পারে, বল?

সাজিদ নীলু দার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘এভাবে উত্তেজিত হচ্ছ কেন দাদা ভাই? কুল! আমি তো তোমাকে ঠান্ডা মাথার লোক হিশেবেই জানি। তোমার কাছ থেকে এরকম তাড়াহুড়োকিন্তু একদম আশা করি না।

সাজিদের কথা শুনে নীলু দা একটু নরম হলো বলে মনে হচ্ছে। নীলু দা বলল, ‘কিন্তু সাজিদ, ব্যাপারটা খুবই সাংঘাতিক নয় কি? একটি ধর্মগ্রন্থে কীভাবে এরকম

কথা লেখা থাকতে পারে বল? আবার এই কথা কোটি কোটি মানুষ পড়ে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করে। কী অদ্ভুত!

‘তুমি যেভাবে ভাবছ ব্যাপারটি আসলে সেরকম নয়।

সাজিদের কথা শুনে বেশ অবাক হলো নীলু দা। বলল, ‘মানে কী? তুই বলতে। চাইছিস কুরআনে এমন কোনো কথা নেই? ‘থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে।”

‘তাহলে?

‘কুরআনের ওই কথাগুলোকে তোমরা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে থাক।

বিতর্ক জমে উঠছে। সাজিদের সাথে রাগ করে উঠে না গিয়ে ভালোই করেছি। আমার সাবেক তার্কিক বড় ভাইয়ের সাথে বর্তমান বন্ধুর তর্কটা উপভোগ্য হবে বলেই মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে নীলু দার জায়গায় মফিজুর রহমান স্যার হলে নিশ্চিত সাজিদকে ‘মহামতি আইনস্টাইন’ বলে ঠাট্টা করত; কিন্তু নীলু দা সেরকম নয়। খুবই ঠান্ডা মেজাজের লোক। বলল, “তুই বলতে চাচ্ছিস যে, কুরআনের এই কথার অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে?’

‘হ্যাঁ।

‘কী সেটি? জানতে চাইল নীলু দা।

সাজিদ দীর্ঘ বক্তব্য শুরুর আগে যা করে এবারও তাই করল। প্রথমে ঝেড়ে কেশে নিল। এরপর বলতে শুরু করল, ‘সবার আগে আমরা কুরআন থেকে ওই অংশটুকু দেখে নিই যা নিয়ে তুমি কথা উঠিয়েছ। এটি আছে সূরা বাকারার ২২৩ নাম্বার আয়াতে। কুরআনে বলা হয়েছে, “Your wives are a tilth for you, so go to your tilth when or how you will. অর্থাৎ তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্রস্বরূপ। সুতরাং, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো।

আয়াতটির অর্থ বলা শেষ হলে সাজিদ আবার বলতে লাগল, ‘আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে এই আয়াতটি দ্বারা কুরআন নারীদের অতি তুচ্ছ শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা তো করেছে, সাথে তাকে পুরুষের যৌন-চাহিদা মেটানোর জন্য নারীদের যেভাবে ইচ্ছা

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন