কুরআন কেন আরবী ভাষায় -পাট ওয়ান

সচরাচর যে-রকম করি, সে রকম। সেদিন হঠাৎ করে আমার মনে হলো, আমি মনে হয় সূরা ফাতিহার বিশেষ একটি দিক ধরতে পেরেছি।

“কীরকম?’, জোবায়ের জানতে চাইল।

সাজিদ বলল, ‘সূরা ফাতিহায় রয়েছে সাতটি আয়াত, তাই না? ‘হু’, বলল রাহাত।

‘এই সাতটি আয়াতকে দুই ভাগে ভাগ কর; কিন্তু মাঝের আয়াতকে কোনোভাগেই ফেলিস না। অর্থাৎ একদম মাঝের আয়াতটিকে আলাদা রেখে দুই ভাগ করলে কীরকম দাঁড়ায় হিশেব কর।

রাহাত বলল, তাহলে সাত আয়াতের মধ্যে মাঝের আয়াত হলো আয়াত নম্বর চার। চার নম্বর আয়াতকে আলাদা রেখে দুই ভাগ করলে এক, দুই এবং তিন নম্বর আয়াত পড়ে এক ভাগে, এরপর পাঁচ, ছয় এবং সাত নম্বর আয়াত পড়ে অন্য ভাগে।

সাজিদ বলল, গুড। সঞ্জু বলে উঠল, ‘আমি বুঝি নাই রে দোস্ত। আরেকটু সহজ করে বল।

‘আচ্ছা, সহজ করেই বলছি’, বলল সাজিদ।‘ধর, তোকে বললাম ১ থেকে ৭ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো দুই ভাগ করতে হবে, তবে মাঝের সংখ্যাটিকে কোনোভাগে না ফেলে আলাদা রাখতে হবে। তুই কীরকম ভাগ করবি?’ সঞ্জু মাথা চুলকাতে লাগল। কথা বলে উঠল রাহাত। বলল, “সঞ্জু, ১,২,৩,৪,৫,৬ এবং ৭ এর মধ্যে মাঝের সংখ্যা কোনটি হবে বল।

সঞ্জু এবারও বিভ্রান্ত। সাজিদ বলল, আমি আরও সহজ করি৷ ১-৭ এর মধ্যে ১,২,৩ এক ভাগে আর ৫,৬,৭ অন্য ভাগে। বাদ পড়ল কোন সংখ্যাটা?

‘চার’, বলল সঞ্জু।

‘রাইট। এই চার সংখ্যাটাই মাঝের সংখ্যা এখানে। দেখ, চার সংখ্যাটার আগেও তিনটি সংখ্যা ১,২,৩ এবং চার সংখ্যাটার পরেও তিনটি সংখ্যা ৫, ৬ এবং ৭। এবার বুঝতে পেরেছিস?’

সঞ্জু মাথা নেড়ে বলল, ‘ফকফকা পরিষ্কার।

সঞ্জুর কথা শুনে আমরা সকলে হেসে উঠলাম। সাজিদ আবার বলতে লাগল, ‘তাহলে সূরা ফাতিহাকেও যদি আমরা এরকম দুই ভাগ করি, তাহলে সূরাটার প্রথম তিন আয়াত চলে যাবে এক ভাগে, আর শেষের তিন আয়াত চলে যাবে অন্য ভাগে। মাঝে থাকবে আয়াত নম্বর চার। রাইট?’

“হুম।

‘এখানেই আসল রহস্যটা’, বলল সাজিদ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই মাঝের আয়াতে এমন কিছু বলেছেন, যেটি সূরা ফাতিহার প্রথম অংশ এবং পরের অংশ, দুই অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

‘ইন্টারেস্টিং’, বলল জোবায়ের।

সাজিদ বলল, ‘আয়াতের অর্থগুলোর দিকে খেয়াল করলেই বুঝতে পারবি। প্রথম তিনটি আয়াতে কী বলা হচ্ছে দেখে নিই। প্রথম আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি জগৎসমূহের অধিপতি। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। তৃতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘যিনি বিচারদিনের মালিক।

এই তিন আয়াত প্রথম ভাগে। চতুর্থ আয়াতে বলা হচ্ছে, আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। এটি কিন্তু মাঝের আয়াত। এটি কোনোভাগেই পড়বে না। এটিকে কেন্দ্রবিন্দু বলা যেতে পারে। এই আয়াত দিয়েই আমরা প্রথম ভাগ আর পরের ভাগকে যাচাই করব।

আমাদের মাঝে পিনপতন নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে সাজিদ আবার বলতে লাগল, ‘পরের ভাগের আয়াতগুলোতে কী বলা হচ্ছে দেখ। পঞ্চম আয়াতে বলা হচ্ছে, আমাদের সরলপথে পরিচালিত করুন।

ষষ্ঠ আয়াতে বলা হচ্ছে, ওইসব লোকদের পথে, যাদের আপনি নিয়ামত দান করেছেন।

সপ্তম আয়াতে বলা হচ্ছে, তাদের পথ নয়, যাদের ওপর আপনার অভিশাপ নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট।

এবার আমরা সিকোয়েন্সটি মিলাতে পারি। প্রথম ভাগের আয়াতগুলো এক জায়গায় নিয়ে আসা যাক। প্রথম অংশের আয়াতগুলো হলো—

‘যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি জগৎসমূহের অধিপতি। ‘যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। ‘যিনি বিচারদিনের মালিক।

মাঝখানে আছে আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আর, পরের অংশে আছে :

‘আমাদের সরলপথে পরিচালিত করুন।

‘ওই সব লোকদের পথে, যাদের আপনি নিয়ামত দান করেছেন।

‘তাদের পথ নয়, যাদের ওপর আপনার অভিশাপ নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট।

আমরা সকলে গভীর মনোেযোগের সাথে সাজিদের কথাগুলো শুনছি। সে বলতে লাগল, ‘মাঝখানের, অর্থাৎ চার নম্বর আয়াতে দুটো অংশ আছে। আমরা তোমারই ইবাদত করি’ এতটুকু একটি অংশ, এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি’ এতটুকু একটি অংশ। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই আয়াতের প্রথম অংশ সূরার প্রথম তিন আয়াতের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং পরের অংশ প্রতিনিধিত্ব করছে সূরার পরের তিন আয়াতের। এই আয়াতের প্রথম অংশ দিয়ে ওপরের তিন আয়াতকে যাচাই করা যাক :

‘আমরা তোমারই ইবাদত করি।

আমরা কার ইবাদত করি?

সকল প্রশংসা যার এবং যিনিই সৃষ্টিজগতের অধিপতি।’ [সূরা ফাতিহার ১ম আয়াত]।

আমরা কার ইবাদত করি?

‘যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু’ সূরা ফাতিহার ২য় আয়াত] আমরা কার ইবাদত করি? ‘যিনি বিচারদিনের মালিকা[সূরা ফাতিহার ৩য় আয়াত] ‘দারুণ তো’, বলে উঠল জোবায়ের।

এবার আসা যাক ওই আয়াতের পরের অংশে। যেখানে বলা হচ্ছে

‘তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।

আমরা কীসের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করি?

“যাতে আমরা সরল পথে চলতে পারি।”[সূরা ফাতিহার ৫ম আয়াত] আমরা কীসের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করি? যাতে আমরা নিয়ামতপ্রাপ্তদের দলে ভিড়তে পারি।’ [সূরা ফাতিহার ৬ষ্ঠ আয়াত] আমরা কীসের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করি? যাতে আমরা অভিশপ্ত এক পথভ্রষ্টদের দলের অন্তর্ভুনাই। [সূরা ফাতিহার ৭ম আয়াত]

চিন্তা কর, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ছোট্ট সুরাটার মধ্যেও কীরকম ভাষার মান, সাহিত্য মান দিয়ে দিয়েছেন। প্রথমে কিছু কথা, মাঝখানে একটি বাক্য, শেষে আরও কিছু কথা; কিন্তু মাঝখানের সেই বাক্যটিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন এবং এমনভাবে বলেছেন, যেটি প্রথম এবং শেষ—দুটো অংশের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যারা বলে কুরআন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বানিয়ে লিখেছেন, তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, এতটা সূক্ষ্মভাবে, এতটা সাহিত্যমান দিয়ে কোনোকিছু লেখা কোনোমানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আরও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই আয়াতগুলো একই সাথে নাযিল হওয়া। একটির পর একটি, বিরতিহীন। পৃথিবীর কোনোমানুষ যদি ইনসট্যান্ট কিছু রচনা করে, তার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় যে, কুরআনের মতো এরকম সিস্টেম্যাটিক পদ্ধতিতে কোনোকিছু লিখবে।

‘ওয়াও! দ্যাটস অ্যামেইজিং!’, চিৎকার করে বলে উঠল রাহাত। সহজে কোনোকিছু বুঝতে না পারা সঞ্জুও এবার ব্যাপারটি বুঝে গেছে। সেও বলে উঠল, ‘সত্যিই। দারুণ! এরকমভাবে কখনোভেবে দেখিনি। জোবায়ের বলল, ‘সিম্পলি গ্রেট! এটি নিশ্চিত মিরাকল।

আমি একটি ব্যাপার ভাবতে লাগলাম। সূরা ফাতিহা এর-আগে অনেকবার আমি পড়েছি; কিন্তু এত সহজ অথচ আশ্চর্যজনক এই ব্যাপারটি কখনোআমার মাথায় আসেনি কেন!

আমাদের ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে রাহাত বলল, ‘এটি কেবল আরবী ভাষাতেই সম্ভব। এ জন্যেই বোধকরি কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে, তাই নারে সাজিদ?’

সাজিদ বলল, ‘কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হওয়ার এটি একটি কারণ। তবে এর পেছনে আরও অনেক কারণ আছে।

যেমন?’, প্রশ্ন করল রাহাত।

এবার সামান্য গলা খাঁকারি দিল সাজিদ। এরপর যখনই সে তার পরবর্তী লেকচার শুরু করতে যাবে, অমনি আমি হাত তুলে বললাম, আমার একটি কোয়েশ্চান আছে।

এতক্ষণ ধরে সাজিদের দিকে চেয়ে থাকা বড় বড় চোখগুলো এবার সম্মিলিতভাবে আমার ওপরে এসে পড়ল। আমি কী প্রশ্ন করব সেটি শোনার জন্যে সবাই যেন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।

আমি বললাম, “সাজিদ, তোর ব্যাপারে আমার কমন একটি অবজার্ভেশন হলো এই, তুই যখনই কোনোলম্বা বক্তিতা শুরু করতে যাস, তখনই একবার গলা খাঁকারি দিয়ে এরপর শুরু করিস; কিন্তু আজকে আলাপের শুরুর দিকে তুই এরকম করিসনি। কেন করিসনি?’

আমার প্রশ্ন শুনে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে জোবায়ের। সে মুখ হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কমবোঝা লোক সঞ্জু সম্ভবত খুব মজা পেয়ে গেল। সে হো হো করে হেসে উঠল। হাসার সময় তার ফোকলা দাঁতগুলো দেখলে তাকে চকলেটে আসক্ত বাচ্চার মতো দেখায়।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন