কুরআন কেন আরবী ভাষায় -পাট টু

সাজিদ কিছু একটি বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে রাহাত বলল, ‘দাঁড়া দাঁড়া। এটি তো ডাক্তারি ইস্যু। আমাকে কথা বলতে দে।

এরপর রাহাত আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আরিফ ভাই, সাজিদ কি এরকম সবসময়ই করে, নাকি শুধু কথা বলার সময়ই এমনটি করে?

‘সবসময় করে না। কথা বলার সময়েও করে না। তখনই করে, যখন ও বড় কোনোবক্তব্য দিতে যায়।

রাহাত বলল, ‘হুম। বুঝতে পেরেছি। ও যদি এই জিনিসটি নিয়মিত করত তাহলে ধরে নেওয়া যেত—তার শুচিবায়ু রোগ আছে। যেহেতু নিয়মিত করে না, তাই এটি কোনোরোগ নয়; বরং এটি অভ্যাসের রোগ।

‘অভ্যাসের রোগ?’, আমি প্রশ্ন করলাম।

‘সেটি আবার কীরকম?’, প্রশ্ন সঞ্জুর।

-রাহাত বলল, ‘ব্যাপারটি সাইকোলজির। বিশেষ বিশেষ সময়ে কোনোকিছু করতে করতে একটি সময় জিনিসটি ওই ব্যক্তির সাইকোলজিতে এমনভাবে সেট হয়ে যায় যে, সে পরবর্তী সময়ে মনের অজান্তেই ওই জিনিস করে চলে। যেমন ধরা যাক, দাঁত দিয়ে হাতের নখ কাটা। এই ব্যাপারটি বেশির ভাগ লোকই মনের অজান্তেই করে। কারণ, কোনোকিছু নিয়ে গভীর চিন্তার সময়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে একটি সময়ে গিয়ে ব্যাপারটি তার অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।

আমি বললাম, ‘বাহ রাহাত ভাই। তোমার কাছ থেকে তো দারুণ দারণ সব টার্মিনোলোজি শিখলাম। অভ্যাসের রোগ, অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাস…হা…হা…হা…।

এবার মুখে ভেংচি কেটে জোবায়ের বলল, ‘ফালতু কথাবার্তা। হাতুড়ি ডাক্তার হলে যা হয় আরকি।

জোবায়েরের কথা শুনে এবার আমি, সাজিদ আর সঞ্জু তিনজনই হেসে উঠলাম। বেচারা ইলুমিনাতির গল্প চালিয়ে যেতে না পারার শোধ কী সুন্দরভাবেই না তুলে নিল। রাহাত ওর দিকে খটমটে চেহারায় তাকিয়ে আছে। সাজিদ বলল, “বেশ ঝগড়া হয়েছে। এবার থামা যাক।

সাজিদের কথা শুনে সবাই আবার নড়েচড়ে বসল। রাহাত বলল, “তো বল, কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হওয়ার পেছনে আর কী কী কারণ থাকতে পারে?

সাজিদ আবারও বলতে শুরু করল, ‘ব্যাপারটি সহজে বোঝার জন্য আমাদের প্রথম যা বুঝতে হবে তা হলো, আরবী ভাষার অনন্যতা। যে-ভাষায় সৃষ্টিকর্তার বাণী প্রেরিত হবে, সেই ভাষা যদি যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা না-হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে সেই ভাষার বিলুপ্তির সাথে সাথে সৃষ্টিকর্তার বাণীও বিলুপ্ত হয়ে যাবে অথবা বিকৃত হয়ে যাবে।

‘ভাষা বিলুপ্ত বা বিকৃত হতে পারে?’, প্রশ্ন করল জোবায়ের।

‘অবশ্যই। হিব্রু ভাষার কথাই ধর। তাওরাতের মতো বিখ্যাত আসমানী কিতাব এই ভাষাতেই নাযিল হয়েছিল। অথচ কালের বিবর্তনে আজ হিব্রু ভাষা মৃত। মুসা আলাইহিস সালামের ওপরে তাওরাত নাযিল হয়েছিল আজ থেকে আরও তিন হাজার বছর আগে। অথচ ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিব্রু ভাষার প্রথম শব্দকোষ তথা ডিকশনারিই লিখিত হয় মাত্র সেদিন। দশম শতাব্দীতে। চিন্তা করে দেখ, আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে নাযিল হওয়া একটি কিতাবের ভাষা বোঝার ডিকশনারিই তৈরি হয়েছে মাত্র সেদিন। তাহলে মাঝখানের লম্বা টাইম-গ্যাপে যে-শব্দগুলো হারিয়ে গেছে, যে-শব্দগুলো কালের বিবর্তনে অর্থ বদলে ফেলেছে, সেগুলোর প্রকৃত অর্থ বের করার উপায় কী?

আমরা সবাই চুপ করে আছি। রাহাত বলল, ‘শব্দ অর্থ বদলাতে পারে?

‘অবশ্যই পারে। যেমন ধর ইংরেজি ভাষার কথা। ইংরেজিতে ‘Nice মানে কী বল।

জোবায়ের বলল, ‘সুন্দর।

সাজিদ বলল, কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে এই ‘Nice’ শব্দ দিয়ে কী অর্থ। করা হতো জানিস?’

‘কী?’, সঞ্জু জানতে চাইল।

‘এই ‘Nice’ শব্দটি লাতিন ‘Nescius’ শব্দ থেকে এসেছে। চতুর্দশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে এই ‘Nice’ শব্দের অর্থ করা হতো Ignorant’ বা মূর্খ বোঝাতে।

কালক্রমে Shyness, Resreve অর্থেও ব্যবহার করা হয় এই ‘Nice শব্দটি।

সঞ্জু অবাক হয়ে বলল, “বলিস কী!

‘তুম। এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে এসেই এই ‘Nice’ শব্দ আজকের ‘সুন্দর’ ‘সুশ্রী’ অর্থ লাভ করে। চিন্তা করে দেখ, ভাষা কীভাবে পাল্টে যেতে পারে। কুরআন যদি হিব্রু ভাষাতে নাযিল হতো, তাহলে কী অবস্থা হতো আর যদি ইংরেজিতে হতো তাহলে কী হতো ভেবে দেখ।

রাহাত বলল, ‘সত্যিই!

‘কিন্তু আরবী ভাষার ক্ষেত্রে কি এরকমটি হয়েছে সাজিদ?’, জানতে চাইল জোবায়ের।

‘না। আরবী ভাষার ক্ষেত্রে এরকমটি হয়নি মোটেও বলা চলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন একটি জাতির কাছে এবং এমন একটি ভাষায় কুরআন দেওয়া হয়েছে, যারা তৎকালীন সময়ে সাহিত্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। সে সময়ে পৃথিবীতে সাহিত্যের জীবন্ত ভাষাই ছিল আরবী। আরবরা কবিতা, সাহিত্যে এত বেশিই দক্ষ আর মুন্সিয়ানার অধিকারী ছিল যে, সমসাময়িক কোনোজাতিই সাহিত্যে এতটি অগ্রগতি লাভ করেনি। কুরআনকে সর্বোচ্চ এবং শ্রেষ্ঠ সাহিত্যমান দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপরে একটি মিরাকল হিশেবে পাঠিয়েছিলেন। এর প্রমাণ আমরা কুরআন থেকেই পাই। ‘যেমন?’, প্রশ্ন করল রাহাত।

“যেমন, মূসা আলাইহিস সালামের সময়ে জাদুবিদ্যা ছিল পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত ব্যাপার। চারদিকে তখন জাদুকরদের জয়জয়কার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মূসা আলাইহিস সালামকে সমসাময়িক বিষয় জাদুবিদ্যার মতোই মোজের জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। এটাই ছিল মূসা আলাইহিস সালামের জন্যে মিরাকল। ফেরাউনের সামনে তিনি যখন হাত থেকে লাঠি রাখলেন, তখন সেটি সাপ হয়ে গেল। তার সময়কার বাঘা বাঘা জাদুকরেরা এটি দেখে তো অবাক হয়ে গেল। বলে উঠল, এত এত জাদু দেখলাম, জাদু শিখলাম; কিন্তু এরকম জাদু তো কখনোদেখলাম না। ব্যস, তারা মূসা আলাইহিস সালামের রবের ওপরে ঈমান নিয়ে এলো। আবার ঈসা আলাইহিস সালামের সময়ে চিকিৎসাবিদ্যার ছিল জগৎজোড়া খ্যাতি। তাই আল্লাহ

সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামকে এমন বিদ্যা দিয়ে পাঠালেন, যা দেখে তখনকার ডাউস ডাউস চিকিৎসকরা অবাক হয়ে গেল। কী ছিল সেই বিদ্যা? সেটি হলো তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারতেন। এটি দেখে তো সবার চক্ষু ছানাবড়া। এটি কীভাবে সম্ভব? যে-যুগে যে-জিনিসের কদর সবচেয়ে বেশি, প্রচলন সবচেয়ে বেশি সেই যুগের রাসূলদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঠিক সেই জিনিসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান বা সেই জিনিস দিয়েই পাঠাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ ছিল সাহিত্যের যুগ। তখন সাহিত্যকে ধর্মের মতো পূজা করা হতো। চারদিকে যখন আরবী সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের জয়জয়কার, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন সাহিত্যমান-সমৃদ্ধ কুরআন দিয়ে পাঠালেন, যা এ যাবৎকালের সব সাহিত্যকর্মকে ছাপিয়ে একেবারে শীর্ষে আরোহণ করে বসল। সাহিত্যের জন্যে বিখ্যাত আরবরাই অবাক হতে বাধ্য হলো। কুরআনের শব্দচয়ন, সুর ও তাল-লহরি এতই চমৎকার যে, রাতের অন্ধকারে কাফিররা লুকিয়ে কুরআন শুনতে আসত।

সাজিদের কথা শুনে সঞ্জু সুবহানাল্লাহ বলে চিৎকার করে উঠল। বলল, সত্যিই চমৎকার!’

সাজিদ বলতে লাগল, ‘কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হওয়ার পেছনে আরেকটি অন্যতম কারণ হলো আরবী ভাষার সহজবোধ্য। আরবী ভাষার চমৎকারিত্ব, শব্দ এবং বাক্যগঠনই এমন যে, এই ভাষাটি সহজেই বোঝা যায়, মুখস্থ করে ফেলা যায়। সহজ ও সুন্দর আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যুগের পর যুগ ধরে এই কুরআনকে যেকোনোপ্রকার বিকৃতি ও বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছেন।

‘কীভাবে সেটি?’, সঞ্জু আবার জানতে চাইল।

‘এই যে, পৃথিবীজুড়ে যে-লক্ষ-লক্ষ কুরআনের হাফেজ, এদের মাধ্যমে। এরা কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আগাগোড়া মুখস্থ করে রাখে। যদি কোনোদুর্যোগে কুরআনসহ পৃথিবীর সকল বই নষ্ট হয়ে যায় বা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তবুও কুরআনকে হুবহু, ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড লিখে ফেলা সম্ভব। কারণ, পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ কুরআনের হাফেজ রয়েছে।

সঞ্জু আরেকবার ‘সুবহানাল্লাহ বলে উঠল।

সাজিদ এবার থামল কিছুক্ষণ। রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে। সাদা মেঘের ছুটোছুটি বেড়ে গেছে আকাশে। দূর থেকে কিছু শিয়ালের আওয়াজ ভেসে আসছে। কানে। হালকা শীত লাগছে গায়ে। দ্বিতীয়বারের মতো গলা খাঁকারি দিল সাজিদ। গলা খাঁকারি দিয়ে সে এবার আমার দিকে তাকাল। ভাবল আমি হয়তো এবারও অবজেকশান জানাব। আমাকে চুপচাপ দেখে সে আবার বলতে শুরু করল, আরবী ভাষার আরও অনেক চমৎকারিত্ব আছে, যা অন্য ভাষায় নেই।

‘যেমন?’, জানতে চাইল রাহাত।

‘যেমন ধরা যাক, বাংলায় যদি আমরা বলি ‘তারা যাচ্ছে, অথবা “They are going’, তখন আমরা বুঝতে পারি না যে—এই ‘তারা’ বা ‘They’ বলতে আসলে নারীকে বোঝানো হচ্ছে না পুরুষকে। কারণ, বাংলা বা ইংরেজিতে এই সর্বনামের জন্য কোনোআলাদা শব্দ নেই, যা দিয়ে এক শব্দেই বোঝানো যাবে যে, ‘তারা বলতে আসলে নারীদের বোঝানো হচ্ছে না পুরুষকে; কিন্তু আরবীতে এই সমস্যা নেই। যেমন আরবীতে “They’ শব্দটি যদি পুরুষের ক্ষেত্রে হয়, তখন শুধু “‘Hum” লিখলেই চলে। এই শব্দ থেকেই বুঝে ফেলা যায় যে, এখানে আসলে পুরুষদের বোঝানো হচ্ছে। আবার, ‘They দিয়ে যদি নারীদের বোঝানোলাগে, তখন শুধু ‘Hunna’ বললেই হয়ে যায়। এখানে সহজেই বোঝা যায়—“তারা’ বলতে নারীদের বোঝানো হচ্ছে।

জোবায়ের বলল, ‘অ্যামেইজিং ফিচারস!

সাজিদ বলল, ‘আরও চমৎকার জিনিস আছে। যেমন ধর ‘Camel’ বা ‘উট’ শব্দটি। নারী-উট বা পুরুষ-উট বোঝানোর জন্য ইংরেজিতে কিন্তু একক কোনোশব্দ নেই। যদি নারী-উট বোঝাতে হয় ইংরেজিতে কী বলতে হবে? বলতে হবে ‘Female Camels, পুরুষ-উট বোঝাতে গেলে বলতে হবে ‘Male Camels। কিন্তু আরবীতে পুরুষ-উট বোঝানোর জন্যে আলাদা শব্দ, নারী-উট বোঝানোর জন্যে আলাদা শব্দ রয়েছে। ইংরেজিতে Camel বলতে ইন জেনারেল সব ধরনের উটকেই বোঝানোহয়ে থাকে। আরবীতে ইন জেনারেল সব উটকে বোঝানোর জন্যেও শব্দ আছে। যেমন : Ibil এই শব্দ ইংরেজি ‘Camel’ শব্দের মতোই। এটার মধ্যে সব ক্যাটাগরির উটই অন্তর্ভুক্ত।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন