মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

শরতের রাতের আকাশ। তারায় তারায় ভরে উঠেছে আকাশের বুক। চাঁদ ঝুলন্ত একটি আলোকপিণ্ডের মতো দেখাচ্ছে। আলোর গহ্বর বললেও খুব-একটা ভুল হবে না। ঠিকরে পড়ছে জোছনা। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য শরতের এরকম কোনোএক রাতের দৃশ্য দেখেই সম্ভবত লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতার দুটো লাইন

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়; পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানোরুটি।

উঠোনজুড়ে জোছনা নেমেছে। শিমুলের গা বেয়ে লকলকিয়ে উঠে যাওয়া সন্ধ্যামালতির চারা, গোয়ালঘরটার কোণে বুড়োর মতো ঝিমুতে থাকা ডালিম ফলের গাছ আর পুব দিকে বুক ফুলিয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্বথের চেহারা এই আলো-আঁধারীতেও বেশ বোঝা যাচ্ছে। আমরা আবার এসেছি সাজিদদের গ্রামে। বরিশাল জেলার রসুলপুর গ্রাম। গত বছরও ঠিক এই সময়টায় আমরা রসুলপুরে এসেছিলাম।

উঠোনে বিছানোমাদুরে গোল হয়ে বসে আছি। রাহাত, জোবায়ের, সঞ্জু, সাজিদ আর আমি। এরা মূলত সাজিদের বন্ধু। আমার সাথে গতবারই প্রথম পরিচয়। রাহাত শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে। জোবায়ের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রিতে পড়ত; কিন্তু উদ্যোক্তা হবার ঝোঁক ওঠায় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে এখন গরুর খামার নিয়ে ব্যস্ত। সঞ্জু আবার এতদূর আগাতে পারেনি। উচ্চ মাধ্যমিকের পরে টাকা-পয়সার অভাবে পড়াশোনার ইতি টেনে দিয়েছে। সাজিদ এসেছে শুনে

বেচারা চৌদ্দ মাইলের রাস্তা সাইকেলে পাড়ি দিয়ে চলে এসেছে। আমাদের মাঝখানে আছে সরিষার তেল দিয়ে মাখানোমুড়ি। খাঁটি সরিষার তেলের গন্ধে আমার নাকে ইতোমধ্যেই জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে। ঢাকার দূষিত আবহাওয়া আর ভেজাল খাদ্যদ্রব্য খেতে খেতে খাঁটি জিনিসে রি-অ্যাকশান দেখা দিচ্ছে কি না কে জানে! মুড়ি চিবোতে চিবোতে রাহাত আমায় বলল, ‘তুমি মশাই ভালোই ম্যাজিক পারো।

বললাম, ‘মানে ‘মানে হলো, সাজিদের মতো গোঁড়া নাস্তিক আমি আমার জীবনে একটিও দেখিনি। তাকে কত রকমে বুঝাতাম সৃষ্টিকর্তা, ইসলাম, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে। কোনোকিছুতেই কাজ হয়নি। সে জেদ ধরে পাল্টা প্রশ্ন করত। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করতাম অবশ্য; কিন্তু সে গোঁ ধরে থাকত। তখন এত বিরক্ত লাগত যে, একটি সময় ওকে বোঝানোই ছেড়ে দিই। এরকম অসাধ্য তুমি ভাই সাধন করে ফেলেছ। রিয়েলি, ইউ ডিড অ্যা গ্রেট জব।

রাহাতের কথাগুলোতে বেশ বাড়াবাড়ি আছে। আমি আসলে সাজিদকে আস্তিক হবার মতো আহামরি কিছু বোঝাইনি কখনো। তবে একটি ব্যাপার ঠিক, সাজিদ কোনোকিছু জানতে চাইলে তখন সে খুব বেশি প্রশ্ন করে। প্রশ্ন করা অবশ্য খারাপ কিছু নয়। আমাদের ডিপার্টমেন্টের সজল স্যার প্রায়ই বলেন, “যে-ছাত্র প্রশ্ন করে, ধরে নিতে হবে পড়াশোনায় সে বেশি ফাঁকিবাজ।এই মুহূর্তে আমার জায়গায় সাজিদ হলে রাহাতের এই বক্তব্যের বিপরীতে কুরআনের আয়াত টেনে বলত, হেদায়াত জিনিসটি কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার হাতে। কেউ ইচ্ছে করলেই কাউকে হেদায়েত দিতে পারে না। মানুষ কেবল চেষ্টা করতে পারে।

আমাদের কথার মাঝখানে জোবায়ের বলে উঠল, “তো, আজকে আমরা কোন বিষয়ে গল্প করব?

রাহাত বলল, ‘ভ্রমণ কাহিনি বিষয়ক গল্প হতে পারে। সাজিদ তো দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বেড়ায়। ওর কাছে কাশ্মীর, নেপালের পোখারা ভ্রমণের কাহিনি শুনতে পারি আমরা।

সাজিদের সব ভ্রমণের কাহিনিই আমার আদ্যোপান্ত শোনা আছে। তাই আমি মতামত দিলাম সাহিত্যালাপের পক্ষে। সঞ্জু কোনোমতামত দেয়নি। যেন শুনে যাওয়াতেই তার আনন্দ। জোবায়ের বলল, “আচ্ছা, ইলুমিনাতি নিয়ে আলাপ করলে কেমন হয় রে? ড্যান ব্রাউনের থ্রিলার পড়ার পর থেকে আমি তো ইলুমিনাতি নিয়ে খুবই আগ্রহী হয়ে পড়েছি। সারাক্ষণ রহস্য নিয়ে ভাবতে মন চায়।

সাজিদ বলল, “তো, নিজেকে তুই কি রবার্ট ল্যাঙডন ভাবতে শুরু করেছিস নাকি?

সাজিদের কথা শুনে আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। হাসল জোবায়েরও। ইলুমিনাতি নিয়ে আমারও বেশ আগ্রহ আছে অনেক আগ থেকেই। এই সিক্রেট সোসাইটির ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত শুনতে শুনতে আগ্রহের পারদ উঁচু থেকে আরও উঁচুতে উঠেছে বলা যায়। আমি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা সাজিদ, ইলুমিনাতি বলতে সত্যিই কি কিছু আছে পৃথিবীতে?

সাজিদ উত্তর দেওয়ার আগে জোবায়ের বলে উঠল, “থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। তবে থাকার সম্ভাবনাই বেশি…।

‘কীভাবে?’, আমি জানতে চাইলাম।

‘থাকার সম্ভাবনা বেশি এ কারণেই, কারণ, ‘গডলেস’ একটি পৃথিবী নির্মাণের চিন্তা অনেক পুরোনো। সেই চিন্তার বাস্তবতা এখন আমরা সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। আজকের উন্নত বিশ্ব থেকে বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিয়া, সবখানেই বস্তুবাদের রাজত্ব। আমি বললাম, তুমি কি বস্তুবাদকেই ইলুমিনাতি বলতে চাচ্ছ? ‘ঠিক তা নয়। তবে বস্তুবাদের ধ্যান-ধারণার সাথে ইলুমিনাতির চিন্তাভাবনার মধ্যে ব্যাপক মিল পাওয়া যায়। এবার মুখ খুলল সঞ্জু। বলল, ‘দাঁড়া। ইলুমিনাতি জিনিসটাই-বা কী সেটাই তো বুঝলাম না। এরকম নাম তো কখনোশুনিনি আমি।’

জোবায়ের বলল, “ইলুমিনাতি হলো একটি গোপন ভ্রাতৃসংঘের নাম। ইলুমিনাতি শব্দটির অর্থ এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়ন। এই গোপন সংঘে তারাই যোগ দিত, যারা হাইলি কোয়ালিফাইড; যেমন-বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, ব্যবসায়ী ইত্যাদি।

সঞ্জু বলল, ‘তা বুঝলাম। তবে এটিকে গোপন ভ্রাতৃসংঘ বলছিস কেন? ‘এটি গোপন এ জন্যেই; কারণ, এটি তৈরিই হয়েছিল তৎকালীন খ্রিষ্টধর্মের বিরুদ্ধে।

‘কারণ কী?

‘কারণ, খ্রিষ্টধর্মের অনেক নিয়মকানুন তখনকার অনেকে মেনে নিতে পারেনি। খ্রিষ্টানদের কবল থেকে মুক্তি পেতে সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী লোকদের সমন্বয়ে এই ইলুমিনাতি গড়ে ওঠে বলে ধারণা করা হয়। তবে, ক্রিশ্চিয়ানিটির ব্যাপক প্রভাব এবং শক্তিমত্তার কারণে তারা কখনোই সামনে আসতে পারেনি।

‘ও আচ্ছা’, সঞ্জু বলল।

‘ক্রিশ্চিয়ানিটির বিরুদ্ধে তৈরি হলেও এই ইলুমিনাতি একপর্যায়ে এমন-সব মানুষের হাতে গিয়ে পড়ে, যারা আগাগোড়া নাস্তিক। তারা চায় পৃথিবীতে একটি নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ কায়েম করতে। তাদের মুঠোয় থাকবে পৃথিবী। এই লক্ষ্যে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদদের দলে ভেড়ায় এবং অনেকের মতে বর্তমান বিশ্ব পরিচালনা করে এই ইলুমিনাতিরাই।

সঞ্জুর মাথা যেন গুলিয়ে গেল। সে বলল, “কী সব ছাইপাঁশ বলছিস। একবার বলছিস তারা গোপনে আছে। আবার বলছিস তারা পৃথিবী পরিচালনা করছে। আগামাথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

আমি হো হো করে আরেকবার হেসে উঠলাম। জোবায়ের বলল, “ইলুমিনাতির একটি নীতি হচ্ছে তারা নিজেদের কখনোই প্রকাশ করবে না। অর্থাৎ তারা কখনোই প্রকাশ্যে প্রচার করবে না যে তারা ইলুমিনাতি। এই নিয়ম ইলুমিনাতির ভেতরে খুব কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। ইলুমিনাতির কোনোসদস্যই কখনোমুখ ফুটে বলবে না, সে ইলুমিনাতির সদস্য। মরে গেলেও না।

“সাংঘাতিক ব্যাপার, বলল সঞ্জু। তাহলে তাদের অস্তিত্ব বোঝা যাবে কীভাবে?

‘তাদের নির্দিষ্ট কিছু সাইন আছে।

“কী সেগুলো?’, সঞ্জুর উৎসুক প্রশ্ন।

আমাদের ইলুমিনাতি সম্পর্কিত আলাপে বাগড়া দিল এতক্ষণ ধরে চুপ করে থাকা রাহাত। বলল, “কী সব ফালতু ব্যাপারে আলাপ করছিস বল তো। এসব ইলুমিনাতি টিলুমিনাতি বলতে কিছু নেই। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আমার একদম ভালো লাগে না শুনতে। বাদ দে।

রাহাতের আপত্তির মুখে এতক্ষণ ধরে অনর্গল বলতে থাকা আমাদের ইলুমিনাতি বিশেষজ্ঞ রবার্ট ল্যাঙডন ওরফে জোবায়ের মুহূর্তেই হাওয়া ছেড়ে দেওয়া ফানুসের মতো টুস করে চুপসে গেল। তার চুপসে যাওয়ার নীরবতা ভেঙে সাজিদ বলল, ‘আমরা তাহলে অন্য কিছু নিয়ে আলাপ করতে পারি।

‘আবারও কি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব?’

‘না’, বলল সাজিদ।

‘তাহলে?’, রাহাতের প্রশ্ন।

‘সূরা ফাতিহার ব্যাপারে।

সূরা ফাতিহার ব্যাপারে সাজিদ কী আলোচনা করবে সেটাই ভেবে পেল না জোবায়ের। সাত আয়াতের এই সূরা সকলে মুখস্থ বলতে পারে। অর্থও মোটামুটি সবাই জানে। এরপরও এখানে আলোচনার কী থাকতে পারে?

আমি নীরবতা পালন করছি। সাজিদ যখন সেধে কোনোকিছু নিয়ে আলাপ করতে চায়, তার মানে সেখানে নিশ্চয়ই ভিন্নরকম কিছু আছে। গত দু-বছরে তার সাথে ওঠা-বসা করতে করতে এই আত্মবিশ্বাস আমার ভালোভাবেই জন্মেছে।

রাহাত বলল, এরকম আলোচনায় আমার আপত্তি নেই। শুরু করে দে।

সঞ্জু এবারও চুপ। সে সম্ভবত সবকিছুতেই আগ্রহী থাকে। এবার সাজিদ হালকা নড়েচড়ে বসল। কথা বলার আগে তার এরকম হাবভাব আমার কাছে পরিচিত। একটু পরেই গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তৃতা শুরু করবে। এখানে কফির বন্দোবস্ত করা গেলে তার জন্যে আরও সুবিধে হতো; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রসুলপুরের এই গ্রামে কফির কোনোব্যবস্থা নেই।

আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে সাজিদ কোনোপ্রকার গলা খাঁকারি দেওয়া ছাড়াই বলা শুরু করল, ‘কয়েকদিন আগে আমি সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করছিলাম।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন