আরজ আলী মাতুব্বর

মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

পদ্মার বুক চলে আমাদের লঞ্চ চলছে ।

দুপাশ থেকে শুনতে পাচ্ছি পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ । সাধারণত, লঞ্চগুলোর মাথার উপর বিশাল সাইজের একটি ছাউনি থাকে । কিন্তু আমাদের লঞ্চের উপরিভাগ খালি । কোন ছাউনি নেই ।

আকাশটা একদম উদোম । তার ওপরে তারা-নক্ষত্র ভর্তি সুবিশাল আকাশ, নিচে আছে স্রোতস্বিনী পদ্মা ।

চাঁদের প্রতিফলিত আলোতে  নদীর পানি ঝিকমিক ঝিকমিক করছে । সে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য !

আমরা যাচ্ছি রসুলপুর গ্রামে । বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ।

সাজিদের অনুরোধ, এবারের কোরবানির ঈদটা তার সাথে তাদের বাড়িতে করতে হবে । তাই যাওয়া ।

তাছাড়া যখন শুনলাম, পদ্মা-মেঘনা সঙ্গমস্থলের উপর দিয়ে যাওয়া হবে, তখন আর লোভ সামলানো গেল না । আমি এর আগে কখনো এই দুই নদীকে স্বচক্ষে দেখিনি । তাই বিনা অজুহাতে তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম ।

লঞ্চে আমরা তিনজন মাত্র মানুষ । আমি, সাজিদ এবং একজন চালক । মধ্যবয়স্ক এই লোকটার নাম মহব্বত আলী । যারা নৌকা চালায় তাদের মাঝি বলা হয়, যারা জাহাজ চালায় তাদের বলে নাবিক । যারা লঞ্চ চালায় তাদের কি বলে ? আমি জানিনা । মহব্বত আলীর নামের এই লোক লঞ্চের এক মাথায় জড়সড় হয়ে বসে বসে ঝিমুচ্ছে । মাঝিদের মতো তার বৈঠা চালানোর চিন্তা নেই । তেলের ইঞ্জিন ।

আমি আর সাজিদ মঞ্চের একেবারে মাঝখানে বসে আছি । একটি চাদর পাতা হয়েছে । সাথে আছে পানির বোতল, চিনা বাদাম, ভাজা মুড়ি ।

মাথার উপরে আকাশ ।

হঠাৎ করে আমার তখন মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে গেল । আমি সাজিদ কে প্রশ্ন করলাম, -‘তুই কি মানিক দার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ পড়েছিস ?’

সাজিদ বলল, -‘হু’

আমিও কতবার পড়েছি এই উপন্যাস । সব চরিত্র গুলোর নাম আমার ঠিক মনে নেই । তবে উপন্যাসের নায়কের বউটা লেংড়া ছিল এবং নায়কের সাথে তার শালিকার প্রেম ছিল । এই ঘটনা গুলো আবছা আবছা মনে করতে পারি ।

সাজিদ আমাকে বলল, -‘হঠাৎ উপন্যাসে চলে গেলি কেন ?’

-‘না, এমনি ।’

এইটুকু বলে দুজনে খানিকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম । এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম,- ‘আচ্ছা ঐ উপন্যাসের কোন চরিত্রটি তোর কাছে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লেগেছে ?’

আমি ভাবলাম, সাজিদ হয় উপন্যাসের নায়ক কিংবা নায়কের শ্যালিকার কথাই বলবে ।  কিন্তু সাজিদ বলল, -‘ওই উপন্যাসে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার আছে কেবল একটাই । সেটি হল হোসেন মিয়া ।’

আমি খানিকটা অবাক হলাম । অবাক হলাম কারণ সাজিদ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও ভাবেনি । আগে পড়া একটি উপন্যাস থেকে সে এমন একটি ক্যারেক্টার নাম বলছে যেটি উপন্যাসটির কোন মূল চরিত্রের মধ্যেই পড়ে না । হোসেন মিয়া নামে এই উপন্যাসে কোন চরিত্র আছে, সেটি আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, -‘হোসেন মিয়া ? নায়কটা নয় কেন ?’

সাজিদ বলল, -‘কুবের মাঝির মতো কত কত শত মাঝি পদ্মা পারে অহরহ দেখা যায়, যাদের ঘরে মালার মতো একটি খোঁড়া পা ওয়ালা কিংবা অন্ধ স্ত্রী আছে, আছে তিন-চারটে করে পেটুক সন্তান, আছে কপিলার মত সুন্দরী শালীকা । তাদের মাঝেও পরকীয়া আছে, দৈহিক সম্পর্ক আছে । কিন্তু হোসেন মিয়া হোসেন মিয়ার মতো কোন চরিত্রে আছে এই পদ্মা পারে ? যে কিনা নিজের মত করে একটি দ্বীপ সাজিয়ে তুলে সেখানে মানুষকে বিনা পয়সায় থাকতে দেয় । আছে ?কি বাস্তবে, কি সাহিত্যে………’

আমি আরো একবার সাজিদের সাহিত্য জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হলাম । সে এমনভাবে চরিত্রগুলোর নাম বলে গেল যেন, সে এইমাত্র উপন্যাসটি পড়ে শেষ করেছে ।

আমরা রসুলপুরে পৌঁছাযই সাড়ে চারটেতে তখন কিছু কিছু জায়গার ফজরের আজান পড়েছে । যেখানে নেমেছি সেখান থেকে বেশ কিছু পথ হাঁটতে হবে ।

খানিকটা হেঁটে একটা মাটির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম । বুঝতে পারলাম এটা মসজিদ । ভেতরে একটি কুপিবাতি মিটমিট করে জ্বলছে ।

ব্যগপত্র রেখে দু’জন ওজু করে নিলাম । মসজিদে মানুষও আমরা তিনজন । আজব ! তিন সংখ্যাটা দেখি একদম পিছু ছাড়ছে না । লঞ্চেও ছিলাম আমরা তিনজন মসজিদে এসেও দেখি আমরা তিনজন ।

নামাজ শেষ হয়েছে একটু আগে । আমরা বসে আছি মসজিদের বারান্দায় । একটু আলো ফুটলে বেরিয়ে পড়বো । ইমাম সাহেব আমাদের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন । মাঝারি বয়স । দাড়িতে মেহেদি লাগিয়েছেন বলে দাড়িগুলো লালচে দেখাচ্ছে । উনি সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত করছেন । ‘ফাবি আইয়্যি আলা-য়্যি রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ অংশ টিতে এসে খুব সুন্দর করে টান দিচ্ছেন । পরান জুরানিয়া ।

আর রহমান তেলাওয়াত করে উনি কোরআন শরীফ বন্ধ করলেন । বন্ধ করে কোরআন শরীফের দুটি চুমু খেলেন । এরপর সেটাকে একবার কপালে আর একবার মুখে লাগিয়ে কি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে একটা কাঠের তাকে তুলে রাখলেন ।

আমরা লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি । লোকটা আমার দিকে ফিরে বললেন, -‘আমনেরা কি শহর হইতে আইছেন ?’

সাজিদ বলল, ‘জি ।’

-‘আমনেরা কি লেখাপড়া করেন ?’

সার্জিল আবার বলল, -‘জি ।’

-‘মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ । আমনেরা শহরের পইড়্যাও বিগড়াইয়া যান নাই । শুকুর আলহামদুলিল্লাহ ।’

লোকটার কথা আমি ঠিক বুঝিনি । সাজিদ বুঝেছে । সে জিজ্ঞেস করল, -‘চাচা, শহরে পড়াশোনা করলে বিগড়িয়ে যায়, আপনাকে কে বলল ?’

লোকটা হঠাৎ গম্ভীর মুখ করে বলল, -‘হেইয়া আবার কেডায় কইবে বাপ ! মোর ঘরেই তো জন্মাইছে একখান সাক্ষাৎ ইবলিশ ।’

-‘কি রকম ?’ সাজিদের প্রশ্ন ।

-‘মোর এক্কুয়াই পোলা । পড়ালেখা করতে পাডাইলাম ঢাকা শহরে । হেইনে যাইয়া কি যে পড়ালেহা করছে ! এহন কয়, আল্লা-বিল্লা কইয়া বোলে কিস্যু নাই । এই যে, এহন তো বাড়িতে আইছে । আইয়া কইতেছে কি বোঝঝেন, কয় বলে কোরবানি দিয়া মোরা পশু হত্যা করি । এইগুলা বোলে ধর্মের নাম ভাইঙ্গা খাওনেন ধান্দা হরি মোরা । কিরপ্যিকা যে এইডারে ঢাকায় পড়তে পাডাইলাম বাপ ! হালুডি হরাইলে আজ এই দিন দেহা লাগতে না । !’

লোকটা সব কথা আমি বুঝতে পারিনি । তবে এইটুকু বুঝেছি যে, লোকটার ছেলে ঢাকায় পড়ালেখা করতে এসে নাস্তিক হয়ে গেছে ।

সাজিদ বলল, -‘আপনার ছেলে এখন বাড়িতে আছে ?’

-‘হ’

সাজিদ আমার দিকে ফিরে বললো, -‘দেখছিস, মেঘনার এত বড় বুকেও কিন্তু নাস্তিকদের বসবাস আছে । হা হা হা ।

সিদ্ধান্ত হলো ছেলেটার সাথে দেখা করে যাব ।

সকাল ন’টায় ছেলেটার সাথে আমরা দেখা হল । বয়সে আমাদের চেয়ে ছোট হবে ।  জিজ্ঞেস করে জানলাম, ছেলেটা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয় নিয়ে পড়ছে । ফার্স্ট ইয়ারে । নাম মোঃ রফিক ।

সাজিদ রফিক নামের ছেলেটির কাছে জিজ্ঞেস করল, -‘কোরবানি নিয়ে তোমার প্রশ্ন কি ?’

ছেলেটা বলল, -‘এইটা একটা কুপ্রথা । এভাবে পশু হত্যা করে উৎসব করার কোন মানে হয় ?’

সাজিদ বলল, -‘তুমি কি বিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু জানো ?’

ছেলেটি চোখ বড় বড় করে বলল, -‘আপনি কি আমাকে বিজ্ঞান শিখেচ্ছেন নাকি ? ইন্টারমিডিয়েট লেবেল পর্যন্ত আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম ।’

-‘তা বেশ । খাদ্য শৃংখল সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানো ?’

-‘জানি । জানবো না কেন ?’

-‘খাদ্য শৃংখল হলো, প্রকৃতিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যকার একটি খাদ্য জাল । যেসব উদ্ভিদ সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে নেয় তাদের বলা হয় উৎপাদক । এই উৎপাদককে বা উদ্ভিদকে যারা খায়, তারা হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর খাদক…..’

ছেলেটা বলল, -‘মশাই, এসব আমি জানি । আপনার আসল কথা বলুন ।’

ছেলেটার কথার মধ্যে কোন রকম আঞ্চলিকতার টান নেই । তাই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না ।

পাশ থেকে ছেলেটার বাবা বলে উঠলেন, -‘এ, হেরা বয়সে কোলাং তোর চাইয়া বড় অইবে । মান ইজ্জত দিয়া কথা কইতে পারো না ?’

ছেলেটা তার বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো । সে দৃষ্টিতে পড়াশোনা জানা ছেলেদের মূর্খ বাবার প্রতি অবজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট ।

সাজিদ বলল, -‘ বেশ ! তোমাদের গরু আছে ?’

-‘আছে’

-‘কয়টা ?’

ছেলেটার বাবা বললেন, -‘হ বাপ । মোগো গরু আছে পাচ খান । দুইডা গাই, এক্কুয়া ষাঁড় গরু । লগে আবার বাছুরও আছে দুইডা।

-‘আচ্ছা রফিক, ধরো-তোমাদের যে দুটি গাভী আছে, তাদের এই দুটি করে বাচ্চা দিল । তাহলে তোমাদের মোট গরুর সংখ্যা হবে নয়টি । ধরো, তোমরা পশু হত্যায় বিশ্বাসী নও । তাই তোমরা গরুগুলো বিক্রিও করো না । কারণ, তোমরা জানো বিক্রি হলে গরুগুলো কোথাও না কোথাও কুরবানী হবেই । ধরো, এরপরের বছর গরু গুলো আরো দুটি করে বাচ্চা দিল । মোট গুরু তখন ১৩ টি । এর পরের বছর দেখা গেল, বাছুরগুলোর মধ্যে থেকে দুটি গাভী হয়ে উঠল, যারা বাচ্চা দিবে । এখন মোট গাভীর সংখ্যা চারটি । ধরো, চারটি গাভী এর পরের বছর আরো দুটি করে বাচ্চা দিবে । তাহলে সে বছর তোমাদের মোট গরুর সংখ্যা কত দাড়ালো ?’

ছেলেটির বাবা আঙুল হিসাব কষে বললেন, -‘হ, ১৯ টা অইবে ।’

সাজিদ বলল, -‘বলতো রফিক, ১৯ টা গরু রাখার মত জায়গা তোমাদের আছে কিনা ? ১৯ টা গরুকে খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য, পর্যাপ্ত ভুসি, খই, ঘাস আছে কি না তোমাদের ?’

-‘না’ -ছেলেটা বলল ।

-‘তাহলে আলটিমেটলি তোমাদের কিছু গরু বিক্রি করে দিতে হবে । এদের যারা কিনবে, তারা তো গরু কিনে গুদামে ভরবে না । তাই না ? তারা গরু গুলোকে জবাই করে মাংস বিক্রি করবে । গরুর মাংস আমিষের চাহিদা পূরণ করবে আর চামড়াগুলো শিল্পের জন্য কাজে লাগবে । তাই না ?’

-‘হুম’

-‘এটা হল প্রকৃতির ব্যালেন্স । তাহলে, প্রকৃতির ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য পশুগুলোকে জবাই করতেই হচ্ছে । সেটা এমনি হোক অথবা কোরবানে ।’

ছেলেটা বলল, -‘সেটা নিয়ে তো আপত্তি নেই । আপত্তি হচ্ছে, এটাকে ঘিরে উৎসব হবে কেন ?’

সাজিদ বলল, -‘বেশ ! উৎসব বলতে তুমি হয়তো মীন করছো, যেখানে নাচ গান হয়, ফুর্তি হয়, আড্ডা, ড্রিঙ্কস হয় । মিছিল হয়, শোভাযাত্রা হয়, তাই না ? কিন্তু দেখো, মুসলমানদের এই উৎসব সম্পূর্ণ ভিন্ন । এখানে নাচ গান নেই, আড্ডা মাস্তি নেই । ড্রিঙ্কস নেই, মিছিল শোভাযাত্রা নেই । আছে ত্যাগ আর তাকওয়ার পরীক্ষা । আছে, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানো প্রাণান্তকর চেষ্টা । শ্রেণি বৈষম্য দূর করে, সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া হয় । এরকম উৎসবে সম্ভবত কারো দ্বিমত থাকার কথা না । কার্ল মাক্সকে চেনো ?’

ছেলেটা এরপর কিছুক্ষন চুপ করেছিল । তারপর বলল, -‘আরজ আলী মাতুব্বরকে চিনেনে আপনি ?’

সাজিদ বলল, -‘হ্যাঁ, চিনি তো’

-‘কোরবানি নিয়ে উনার কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন আছে ।’

-‘কি প্রশ্ন বলো ।’

ছেলেটা প্রথম প্রশ্নটি বলল । সেটি ছিল –

‘আল্লাহ ইব্রাহিম এর কাছে তার সব চাইতে প্রিয় বস্তুর উৎসর্গের আদেশ দিয়েছিলেন । কিন্তু ইব্রাহিম এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তার ছেলে ইসমাইল না হয়ে, তার নিজ প্রান কেন হল না ?’

সাজিদ মুচকি হেসে বললো, -‘খুবই লজিক্যাল প্রশ্ন বটে ।’

-‘আমি যদি আরজ আলী মাতব্বরের সাক্ষাৎ পেতাম, তাহলে জিজ্ঞেস করতাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে, তাদের কাছে তাদের নিজের প্রানের চেয়ে দেশটা কেন বেশি প্রিয় হলো ? কেন দেশরক্ষার জন্য নিজেদের প্রাণটাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল ?

দুটো জিনিসই সেইম ব্যাপার । ইব্রাহীমের কাছে নিজের চেয়েও প্রিয় ছিল পুত্রের প্রাণ, আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নিজের প্রানের চেয়ে প্রিয় ছিল নিজের মাতৃভূমি ।

কিন্তু পরীক্ষার ধরন ছিল আলাদা । ইব্রাহিমকে বলা হলো, প্রিয় জিনিস কোরবানি করতে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের বলা হলো প্রিয় জিনিস রক্ষা করতে । কিন্তু, আমরা দেখতে পেলাম দুজনের কারো কাছেই প্রিয় বস্তু নিজের প্রান নয় । সুতরাং আরজ আলী মাতব্বরের মাতব্বরিটা এখানে ভুল প্রমাণিত হলো ।’

ছেলেটা কাচুমাচু করে দ্বিতীয় প্রশ্ন করল  ।

আরজ আলী মাতব্বর বলেছেন, -‘আল্লাহ পরীক্ষাটা করেছেন ইব্রাহিমকে । ইব্রাহিম এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেই পরীক্ষাটা কেন তার অনুসারীদের দিতে হবে ?’

সাজিদ বললো, -‘এইটা খুব ভালো প্রশ্ন । আমরা মুহাম্মদ সা. কে অনুসরন করি । তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে, -কই আমাদের উপর তো জিবরাঈল আঃ ওহী নিয়ে কখনো আসে নাই । তাহলে মোহাম্মদের উপর আসা ওহী আমরা কেন মানতে যাবো ? বলো প্রশ্নটা কি আমরা করতে পারি ?’

ছেলেটা চুপ করে আছে । সাজিদ বলল, -‘আরজ আলী মাতুব্বরের Leader & Leadership আদতে কোন জ্ঞানই ছিল না । তাই তিনি এরকম প্রশ্ন করে নিজেকে সক্রেটিস বানাতে চেয়েছিলেন ।

ছেলেটা তার তৃতীয় প্রশ্ন করল-

‘আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন, -নবী ইব্রাহিমকে তো কেবল ইসমাইলকে কুরবানী করা সংক্রান্ত পরীক্ষাই দিতে হয়নি, অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হবার মতো কঠিন পরীক্ষাও তাকে দিতে হয়েছিল । তাহলে মুসলমানরা ইব্রাহিমের স্মৃতি ধরে রাখতে পশু কোরবানি করলেও ইব্রাহিমের আর একটি পরীক্ষা মতে -মুসলমানরা নিজেদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে না কেন ?’

আরজ আলী মাতুব্বরের আগের প্রশ্নগুলো আমার কাছে শিশুসুলভ মনে হলেও, এই প্রশ্নটিকে অনেক ম্যাচিউর মনে হল । আসলেই তো । দুটোই ইব্রাহিম আঃ এর জন্য পরীক্ষা ছিল । তাহলে, একটি পরীক্ষা স্মৃতি ধরে রাখতে আমরা যদি পশু কুরবানী করি, তাহলে নিজেদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করি না কেন ?

পদ্মা থেকে সাঁ সাঁ শব্দে বাতাস আসতে শুরু করেছে ।

সাজিদ বলল, -‘রফিক, তার আগে তুমি আমার একটি প্রশ্ন উত্তর দাও । তুমি কি শেখ মুজিবকে ভালোবাসো ? তার আদর্শকে ?’

ছেলেটা বলল, -‘অবশ্যই । তিনি না হলে তো বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকত না । তিনি আমাদের জাতির পিতা ।’

-‘তুমি ঠিক বলেছ । শেখ মুজিব না হলে বাংলাদেশে হয়তো কোনদিনই স্বাধীন হত না  । সে যাহোক, শেখ মুজিবকে জীবনের দুটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ।

প্রথমে, একটা দেশকে স্বাধীন করার লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া ।

দ্বিতীয়ত, সপরিবারে খুন হওয়া । আমি কি ঠিক বললাম না রফিক ?’

-‘হু’

-‘এখন,  তুমি শেখ মুজিবের আদর্শ বুকে ধারণ কর । তুমি একাত্তরের চেতনায় নিজেকে বুলিয়ান ভাবো । তুমি ৭ ই মার্চের বিশাল মিছিলে যোগদান করো । ১৬ ই ডিসেম্বর সভা-সমাবেশে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে স্লোগান দাও । কিন্তু, ১৫ই আগস্টে রাস্তায় বেরিয়ে কোনদিন বলেছ, হে মেজর ডালিম এর বংশধর, হে খন্দকার মোশতাকের বংশধর, তোমরা কে কোথায় আছো, এসে আমাকেও মুজিবের মত সপরিবারে খুন করো । বলো কি ?’

আমি সাজিদের কথা শুনে হো হো হো করে হাসা শুরু করলাম । ছেলেতার২ মুখ তখন একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে । সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, -‘তুমি এটা বলো না । শেখ মুজিবের আদর্শ বুকে ধারণ করে এরকম কেউই এটা বলবে না । যদি কেউ এরকম বলে, তাহলে তাকে মানুষ বলবে, -কি ব্যাপার ? লোকটাকে কি ভাদ্র মাসের কুকুরে কামড়িয়েছে নাকি ?’

সাজিদের কথা শুনে রফিকের বাবাও হা হা হা করে হাসতে লাগলো । ছেলেকে পরাজিত হতে দেখে পৃথিবীর কোন বাবা এত খুশি হতে পারে, এই দৃশ্য না দেখলে বুঝতামই না ।

আমরা রসুলপুরের দিকে হাটা ধরলাম । পদ্মা পাড়ের জনবসতিগুলো দেখতে একেবারে ছবির মতো । নিজেকে তখন হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপের বাসিন্দা মনে হচ্ছিলো । আর সাজিদ ? তাকে আপাতত হোসেন মিয়া রূপেই ভাবতে পারেন ।

প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ – সম্প্রতি সময়ে সবচাইতে বেশী আলোচিত বইয়ের একটি। বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

রিলেটিভিটির গল্প

A letter to David –Jessus wasn’t myth & he exited

একটি ডিএনএ’র জবানবন্দী

চ্যালেঞ্জ রইল