চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

খৃষ্টধর্ম প্রচারকদের (প্রেরিতদের, যীশু ও বার্নাবাসের অনুসারীরা এ নামে পরিচিত ছিলেন) মধ্য থেকে বেশ কিছু সংখ্যক পণ্ডিত ও সন্তের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাদের ধর্মভক্তি ও জ্ঞানের জন্য তারা এমনকি আজও বরিত ও সমাদৃত। তাদের ধর্মগ্রন্থ-গুলোর ভাষ্য ঐতিহাসিক এবং তাতে বর্তমান গোঁড়া ক্যাথলিক চার্চ এর প্রচলিত বাইবেলের মত মূল ভাষ্যে রূপক আকারে কোনো অর্থ লুকিয়ে রাখা হয় নি, বরং প্রেরিত নবীর ব্যক্ত বাণীর সরল অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। বাইবেলের কিছু অংশকে অন্যান্য অংশের চাইতে বেশি গুরুত্ব প্রদানের বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। তারা ঈশ্বরের একত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং ত্রিত্ববাদের সামান্যতম সমর্থন করে, এমন মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা ঐতিহাসিক যীশুর ওপরই জোর দিয়েছিলেন এবং তার সম্পর্কে কথা বলার সময় ‘পুত্র’ শব্দটি পরিহার করেছিলেন। যীশু যেভাবে জীবন যাপন করতেন এবং যেমন আচরণ করতেন তারা ঠিক তারই অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। তাদের অনেকেই উত্তর আফ্রিকায় বসবাস করতেন। যীশুর এসব অনুসারীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সম্পর্কে নীচে উল্লে­খ করা হলো:

ইরানিয়াস (Iranaeus) ১৩০-২০০ খৃ.)

ইরানিয়াসের জন্মকালে যীশুর প্রকৃত অনুসারী ধর্ম প্রচারকদের প্রচারিত খৃষ্টধর্ম উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন এবং দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত প্রসার লাভ করেছিল। লিয়ঁ (Lyons)-এর বিশপ পথিনাসের (Pothinus) পক্ষ থেকে রোমে পোপ এলুথেরামের কাছে প্রেরিত এক দরখাস্ত প্রসঙ্গে ইরানিয়াস সম্পর্কে প্রথম উল্লে­খ পাওয়া যায়। এ দরখাস্তে পলীয় চার্চের ধর্মমতের সাথে একমত নয় এমন খৃষ্টানদের ওপর নিপীড়ন বন্ধের জন্য পোপের কাছে আবেদন জানানো হয়। ইরানিয়াসই এ দরখাস্ত বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রোমে থাকা অবস্থায়ই শুনতে পান যে সকল ভিন্ন মতাবলম্বী খৃষ্টানসহ বিশপ পথিনাসকে হত্যা করা হয়েছে। রোম থেকে ফেরার পর তিনি লিয়ঁর বিশপ হিসেবে পথিনাসের স্থলাভিষিক্ত হন।

১৯০ খৃস্টাব্দে ইরানিয়াস নিজেই শুধুমাত্র ধর্মীয় ভিন্নমতের কারণে খৃষ্টানদের গণহত্যা বন্ধ করার জন্য পোপ ভিক্টরকে অনুরোধ জানিয়ে পত্র লেখেন। কিন্তু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং তিনি নিজেই ২০০ খৃস্টাব্দে নিহত হন। এভাবে খৃষ্টধর্মের জন্য ইরানিয়াসের জীবন উৎসর্গিত হয়।

ইরানিয়াস এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন এবং যীশুর মানবিকতার মতের সমর্থক ছিলেন। তিনি খৃষ্টধর্মে পৌত্তলিক ধর্ম পটোনীয় দর্শন প্রবিষ্ট করার জন্য পলকে দায়ী করে তার তীব্র সমালোচনা করেন। ইরানিয়াস তার লেখায় বার্নাবাসরে গসপেলের ব্যাপক উদ্ধৃতি দিতেন। তার লেখা পড়েই ফ্রা মারিনো উক্ত গসপেলের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তার পরিণতিতেই তিনি পোপের লাইব্রেরিতে বার্নাবাসের গসপেলের ইতালীয় পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন।

টারটালিয়ান (Tertullian) (১৬০-২২০খৃ.)

টারটালিয়ান আফ্রিকান চার্চের অনুসারী ছিলেন। তিনি ছিলেন কার্থেজের অধিবাসী। তিনি ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইয়াহূদী মেসিয়াহকে যীশু হিসাবে চিহ্নিত করেন। আনুশাসনিক অনুতাপ প্রকাশের পর গর্হিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় বলে পোপ ক্যালিসটাস যে বিধান জারি করেন, তিনি তার বিরোধিতা করেন। তিনি ঈশ্বরের একত্বের ওপর জোর দেন।

টারটালিয়ান লিখেছিলেন: “সাধারণ মানুষ যীশুকে একজন মানুষ হিসেবেইভাবে।” তিনিই প্রথম ল্যাটিন ভাষায় গীর্জা সম্পর্কিত রচনায় ত্রিত্ববাদের নতুন অদ্ভুত ধর্মমত আলোচনা করতে গিয়ে ‘ত্রিত্ববাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অনুপ্রাণিত ধর্মগ্রন্থগুলোতে এক সময় এ শব্দটি ব্যবহারই করা হয় নি।

অরিজেন (Origen) (১৮৫-২৪৫ খৃ.)

অরিজেন জন্মসূত্রে মিশরীয় ছিলেন। সম্ভবত তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা থিওনিডাস একটি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ক্লিমেন্টকে এর প্রধান নিয়োগ করেন। অরিজেন এখানেই শিক্ষা লাভ করেন। লিওনিডাস খৃষ্টধর্ম প্রচারকদের প্রচারিত ধর্মের অনুসারী ছিলেন। পলীয় চার্চ তার ধর্ম বিশ্বাস অনুমোদন করে নি। কারণ, তিনি পলের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও নতুন সংযোজন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ২০৮ খৃস্টাব্দে লিওনিডাসকে হত্যা করা হয়। অরিজেন এই মর্মন্তুদ ঘটনায় এতটা বিচলিত হন যে, তিনি খৃষ্টধর্মের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে তথা শহীদ হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মায়ের বাধার কারণে তা সম্ভব হয় নি।

নিজের জীবন বিপন্ন দেখে অরিজেনের শিক্ষক ক্লিমেন্ট আলেকজান্দ্রিয়া থেকে পলায়ন করেন। পিতা নিহত, শিক্ষক পলাতক। সেই শঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে অরিজেন নিজেও বিপদাপন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু পিতার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের নয়া প্রধান হিসেবে তিনি শীঘ্রই জ্ঞান ও অধ্যবসায়ের কারণে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। তার ঈশ্বরভক্তি ও অতিরিক্ত ধর্মপ্রীতি তার জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়। মথির ১৯ : ১২ শ্লোকে বলা হয়েছে:

কিছু নপুংসক মানুষ আছে যারা মাতৃ গর্ভ থেকে নপুংসক শিশুর মতই জন্ম নেয় এবং কিছু মানুষ আছে যাদের নপুংসক করা হয় এবং এমন কিছু মানুষ আছে যারা পরলৌকিক সুফল লাভের জন্য নিজেদেরকে নপুংসক করে নেয়। যে তা করতে সক্ষম, তাকে তা করতে দাও।

২৩০ খৃস্টাব্দে অরিজেন ফিলিস্তিনে পাদ্রী নিযুক্ত হন। কিন্তু বিশপ ডেমারিয়াস (Demerius) তাকে উৎখাত করেন এবং নির্বাসনে পাঠান। ২৩১ খৃস্টাব্দে তিনি কায়সারিয়ায় আশ্রয় লাভ করেন। পিতার দৃষ্টান্ত অনুসরণে তিনি কায়সারিয়ায় একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিদ্যালয়টিও অত্যন্ত খ্যাতি লাভ করে। চতুর্দশ শতাব্দীতে গ্রীক বাইবেল প্রথম ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন সাধু জেরোম (Jerome)। তিনি অরিজেনের প্রতি শুরুতে সমর্থন জানান। কিন্তু পরে তিনি ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং অরিজেনের শত্রুতে পরিণত হন। অরিজেন যাতে চার্চ কর্তৃক দন্ডিত হন, সে জন্য জেরোম চেষ্টা চালান। কিন্তু অরিজেনের জনপ্রিয়তার কারণে বিশপ জন (Bishop John) তা করার সাহস পান নি। প্রকৃতপক্ষে অরিজেন নিজেই দেশত্যাগী হন। যা হোক, শেষ পর্যন্ত ২৫০ খৃস্টাব্দে জেরোম সফল হন। আলেকজান্দ্রিয়ার কাউন্সিল অরিজেনকে দন্ডিত করে। তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। দীর্ঘকাল নির্যাতনের ফলে অবশেষে ২৫৪ খৃস্টাব্দে কারাগারেই অরিজেন মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার কারাদন্ডের কারণ ছিল তিনি ত্রিত্ববাদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং একত্ববাদ প্রচার করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ, যীশু তার সমকক্ষ ছিলেন না, বরং তার বান্দা ছিলেন।

অরিজেন প্রায় ৬শ’ গবেষণামূলক গ্রন্থ ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তাঁকে চার্চের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় (Appealing) চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যৌবনের প্রথম থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন অকুতোভয়। তিনি ছিলেন বিবেকজ্ঞান সম্পন্ন, ও সহিষ্ণু এবং একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সকল গুণাবলি তার ছিল। যারা তার কাছে শিক্ষা লাভ করেছিল তারা তাঁকে ভালোবাসত। তার পার্থক্য নিরূপণ ক্ষমতা ও সৃজনশীল শক্তি ও বিপুল জ্ঞান খৃষ্টান সমাজে ছিল তুলনাহীন।

ডায়োডোরাস (Diodorus)

ডায়োডোরাস ছিলেন টারসসের একজন বিশপ। যীশুর আসল শিক্ষার অনুসারী খৃষ্টানদের মধ্যে তাঁকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গণ্য করা হত।

ডায়োডোরাস মত পোষণ করতেন যে বিশ্ব পরিবর্তনশীল। কিন্তু এ পরিবর্তন স্বয়ং একটি শুরুর শর্ত হিসেবে কাজ করে যার পিছনে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ধারা। উপরন্তু জীবনের বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তনের এই বিশেষ প্রক্রিয়ায় যে প্রজ্ঞা পরিলক্ষিত হয় তা মূলের ঐক্য নির্দেশ করে এবং একজন স্রষ্টা ও দূরদর্শীর উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। এ ধরনের স্রষ্টা শুধু একজনই হতে পারেন।

ডায়োডোরাস মানবিক প্রাণ ও রক্ত- মাংসের শরীর সম্পন্ন যীশুকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ বলেই গণ্য করতেন।

লুসিয়ান (Lucian)

একজন জ্ঞানী হিসেবে লুসিয়ানের যতটা খ্যাতি ছিল ঠিক ততটাই খ্যাতি ছিল তার ঈশ্বর- ভীরুতার জন্য। তিনি হিব্রু ও গ্রীক ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। ২২০ খৃস্টাব্দ থেকে ২৯০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি চার্চ সম্প্রদায়ের বাইরে অবস্থান করেন। তার পবিত্রতা ও গভীর পান্ডিত্য বিপুল সংখ্যক লোককে আকৃষ্ট করে। তার বিদ্যালয়টি শিগগিরই পরবর্তী কালে ‘আরিয়ান’ নামে পরিচিত মতবাদের লালন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আরিয়াস ছিলেন তার একজন ছাত্র।

লুসিয়ান ধর্মগ্রন্থের ব্যাকরণিক ও আক্ষরিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ধর্মগ্রন্থের প্রতীকী ও রূপক অর্থ সন্ধানের প্রবণতার বিরোধিতা করেন। তিনি ধর্ম গ্রন্থের গবেষণামূলক ও সমালোচনামূলক পদ্ধতি সমর্থন করতেন। এই পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায় যে, এ সময় লোকে ক্রমশই অধিকতর মাত্রায় ধর্মগ্রন্থের ওপর আস্থাশীল হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে যীশুর শিক্ষার মৌখিক ভাষ্যের ওপর ক্রমশই তাদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছিল। তা ছাড়া যীশুর শিক্ষা সামগ্রিকভাবে যে কত দ্রুত বিলুপ্ত হয় এ থেকে তারও আভাস মেলে।

লুসিয়ান একজন বিরাট পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের গ্রীক অনুবাদটি সংশোধন করেছিলেন। গসপেলসমূহ গ্রীক ভাষায় অনুদিত হওয়ার পর সেগুলোতে যেসব পরিবর্তন ঘটানো হয় তিনি তার অনেকটাই নির্মূল করেন এবং ৪টি গসপেল প্রকাশ করেন। তার মতে সেগুলোই ছিল সত্য গসপেল। এখন পলীয় চার্চ কর্তৃক গৃহীত যে ৪টি গসপেল রয়েছে সেগুলো লুসিয়ানের গসপেলের অনুরূপ নয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যীশু ঈশ্বরের সমকক্ষ নন এবং তিনি ছিলেন ঈশ্বরের অধীনস্থ বান্দা। এ বিশ্বাসের কারণে তিনি পলীয় চার্চের শত্রুতে পরিণত হন। ব্যাপক নির্যাতনের পর ৩১২ খৃস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়।

আরিয়াস (Arius) (২৫০-৩৩৬ খৃ.)

আরিয়াসের জীবনের সাথে সম্রাট কনস্টানটাইনের জীবন এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত যে একজনকে না জেনে অন্যকে জানা সম্ভব নয়। রোমক চার্চের অনুসারী সম্রাট কনস্টানটাইন খৃষ্টান চার্চের সংস্পর্শে কিভাবে এলেন সে কাহিনি উল্লেখ করা যেতে পারে।

কনস্টানটাইন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ক্রিসপাসের (Crispus) প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তরুণ রাজকুমার সুন্দর ব্যবহার, চমৎকার আচরণ এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহসিকতার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। সম্রাট তার নিজের অবস্থান যাতে বিপন্ন না হয় সে জন্য ক্রিসপাসকে হত্যা করেন। ক্রিসপাসের মৃত্যুতে সমগ্র সাম্রাজ্যে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। জানা যায় যে, ক্রিপাসের সৎ মাতা নিজের পুত্রের সিংহাসনে আরোহণের পথ নিষ্কণ্টক করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। সে কারণে ক্রিসপাসকে হত্যা করা তার অভিপ্রায় ছিল। কনস্টানটাইন এ কারণে এ হত্যার জন্য তাঁকে দায়ী করেন এবং গরম পানি ভর্তি চৌবাচ্চার মধ্যে নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করেন। এভাবে তিনি এক হত্যা দ্বারা আরেকটি হত্যার দায় অপনোদন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর ফল তিনি যা ভেবেছিলেন তার বিপরীত হয়। নিহত রাণীর সমর্থকরা তার মৃত পুত্রের সমর্থকদের সাথে মিলিত হয় এবং প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠে। কনস্টানটাইন উপায়ন্তর না দেখে রোমের জুপিটারের মন্দিরের পুরোহিতদের শরণাপন্ন হন। কিন্তু তারা বলেন যে, এমন কোনো উৎসর্গ বা প্রার্থনা নেই যা তাকে এ দু’টি হত্যার দায় থেকে মুক্ত করতে পারে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, কনস্টানটাইন রোমে অবস্থানে স্বস্তি বোধ না করায় বাইজানটিয়াম চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বাইজানটিয়ামে পৌঁছে তিনি তার নামে শহরটির নামকরণ করেন। তখন থেকে শহরটির নাম হয় কনস্টান্টিনোপল (Constantinople)। এখানে তিনি পলীয় চার্চের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত সমর্থন লাভ করেন। তারা তাকে জানায় যে, তিনি যদি তাদের চার্চে প্রায়শ্চিত্ত করেন তবে তার পাপ মুক্তি ঘটবে। কনস্টানটাইন এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন। শুধু দু’টি হত্যার রক্তে কনস্টানটাইনের হাত যে রঞ্জিত ছিল তাই নয়, সাম্রাজ্য শাসনের বিভিন্ন সমস্যায়ও তিনি হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। এভাবে অপরাধ স্বীকারের মাধ্যমে বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি লাভ করে এবং দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেয়ে তিনি সাম্রাজ্যের দিকে মনোনিবেশ করলেন। তিনি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য চার্চকে ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখলেন এভাবে যে, তিনি যদি চার্চের আনুগত্য লাভ করেন তাহলে তিনিও চার্চকে পূর্ণ সমর্থন দেবেন। তার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত সমর্থন লাভ করে চার্চ রাতারাতি শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। কনস্টানটাইন এর পূর্ণব্যবহার করেন। ভূমধ্যসাগরের চারপাশের দেশগুলোতে অসংখ্য খৃষ্টান চার্চ ছিল। সম্রাট কনস্টানটাইন যে লড়াই করছিলেন সে লড়াইয়ে চার্চগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বিপুল সুবিধা লাভ করেন। বহু পুরোহিতই তার গোয়েন্দা বৃত্তির কাজে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিলেন। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে তার অধীনে একত্রিত করার প্রচেষ্টায় এ সাহায্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অংশত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য এবং অংশত জুপিটারের মন্দিরের যে রোমান পুরোহিতরা তাঁকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তাদের ক্ষমতা বিলুপ্ত করার জন্য তিনি রোমে একটি চার্চ প্রতিষ্ঠার জন্য খৃষ্টানদের উৎসাহিত করেন। যা হোক, কনস্টানটাইন নিজে খৃষ্টান হলেন না, কারণ তার বহু সহযোগীই জুপিটার এবং রোমের দেবতার মন্দিরের অন্যান্য দেবতাদের বিশ্বাস করতেন। তাদের মনে যাতে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না হয় সে জন্য তিনি বহুসংখ্যক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তিনি রোমান দেবতাদেরই উপাসনা করতেন। যখন পলীয় চার্চ ও যীশুর প্রকৃত অনুসারী খৃষ্টানদের চার্চের মধ্যে পুরোনো বিরোধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল তখনও সব কিছু ভালোভাবেই চলছিল বলে অনুমিত হয়।

এ সময় যীশু অনুসারী চার্চের নেতা ছিলেন একজন যাজক যিনি ইতিহাসে আরিয়াস নামে পরিচিত। তিনি জন্মগত সূত্রে ছিলেন লিবিয়ার অধিবাসী। যীশু অনুসারী চার্চকে তিনি এক নয়া শক্তি দান করেছিলেন। তিনি যীশুর শিক্ষার দ্ব্যর্থহীন অনুসারী ছিলেন এবং পলের প্রবর্তিত ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। আরিয়াসের কথা ছিল, যীশু যে ধর্ম প্রচার করছেন সেটাই অনুসরণ করতে হবে- অন্যকিছু নয়। এখন পর্যন্ত একেশ্বরবাদের সমর্থক হিসেবে তার নাম স্মরণ করা হয়ে থাকে। এ থেকে তার ভূমিকা ও আবেদনের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।

পলীয় চার্চ আরিয়াসের কাছ থেকে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিল। তার শত্রুদের মত তিনি কোনো কুচক্রী ব্যক্তি ছিলেন না। তাই সাধারণ মানুষের মত তারাও তাকে বিশ্বস্ত ও নির্দোষ যাজক হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। যে সময় মুখে মুখে ধর্মপ্রচারের প্রথা দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করেছিল (যে যীশুর শিক্ষাকে জীবন্ত রেখেছিল) এবং যখন লিখিত ধর্মগ্রন্থের প্রতিও বিশ্বাস হ্রাস পেতে শুরু করেছিল তখন আরিয়াস তার প্রাণশক্তি ও জ্ঞান দিয়ে উভয়েরই পুনরুজ্জীবন ও নবায়ন সাধন করেছিলেন। পলীয় চার্চ ও সম্রাট কনস্টানটাইনের মধ্যে গড়ে ওঠা আঁতাত থেকে তিনি দূরে সরে ছিলেন।

আরিয়াস পলীয় চার্চের কট্টর সমালোচক, ধর্মের জন্য জীবনোৎসর্গকারী, পান্ডিত্যের জন্য সুখ্যাত এন্টিওকের লুসিয়ানের (Lucian) শিষ্য ছিলেন। লুসিয়ান তার পূর্বসূরির মতই পলীয় চার্চের ধর্মমত অনুসরণ না করার কারণে নিহত হন। এই চার্চের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এমন ধর্ম বিশ্বাস লালন করার বিপজ্জনক পরিণতি সম্পর্কে আরিয়াস সচেতন ছিলেন। তার প্রথম জীবন রহস্যের আড়ালে আবৃত থাকলেও জানা যায় যে, ৩১৮ খৃস্টাব্দে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার বকালিস (Baucalis) চার্চের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। নগরীর চার্চগুলোর মধ্যে এটি ছিল সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চার্চ।

প্রাপ্ত অপর্যাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, আরিয়াস ছিলেন দীর্ঘ ও কৃশকায়। তিনি হয়তো সুদর্শন ছিলেন, কিন্তু অতিশয় কৃশকায় হওয়ার কারণে তার মুখমণ্ডল ছিল অত্যন্ত ফ্যাকাশে, অন্যদিকে দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার জন্য তার দৃষ্টি থাকত আনত। তার পোশাক ও ব্যবহার ছিল একজন নিষ্ঠাবান তাপসের। তিনি একটি খাটো হাতা দীর্ঘ কোট পরিধান করতেন। তার মাথার চুল ছিল জট পাকানো। সাধারণত তিনি নীরব থাকলেও কোনো কোনো উপলক্ষে প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে কথা বলতেন। তার কণ্ঠস্বরে একটি মাধুর্য ছিল। তার নিকট সান্নিধ্যে যারা আসত তারা তার আন্তরিকতা ও ব্যবহারে মুগ্ধ হত। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যাজক হিসাবে সকলের গভীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন:

তাঁর খ্যাতি শিগগিরই আলেকজান্দ্রিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। একজন নিষ্ঠাবান কর্মী এবং কঠোর তাপস জীবন তাঁকে এ খ্যাতি এনে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী ধর্ম- প্রচারক যিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে খোলাখুলি ধর্মের মহান নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন। তার ছিল অপূর্ব বাগ্মিতা ও চমৎকার ব্যক্তিত্ব। তিনি যে বিষয়ে আগ্রহ বোধ করতেন তা অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করতে সক্ষম ছিলেন। বিশ্বের অন্যান্য মহান ধর্মীয় নেতাদের মত তিনিও ছিলেন গোঁড়া ধর্মনিষ্ঠ এবং তিনি যে ধর্মমত প্রচার করতেন তা ছিল বলিষ্ঠ ও ফলপ্রসূ।

জানা যায় যে, আলেকজান্দ্রিয়ার বহু মহিলা তার অনুসারী হয়েছিল। এ খৃষ্টান মহিলাদের সংখ্যা ৭শত’র কম ছিল না।

এ সময় পর্যন্ত একজন খৃষ্টানকেও তার ধর্ম বিশ্বাসের জন্য পীড়ন করা হয় নি। বিভিন্ন খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে মত পার্থক্য ছিল, কখনো তা গভীর ও তিক্ত রূপ পরিগ্রহ করত, কিন্তু কোনো ব্যক্তির ধর্ম বিশ্বাস ছিল তার নিজস্ব ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও আন্তরিকতার বিষয়। পৃথিবী থেকে যীশুর অন্তর্ধানের পরের এ সময়কালে সাধ ও ‘ধর্ম শহীদ’রা তাদের ধর্ম বিশ্বাসের সাথে আপোষ করার চেয়ে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন। শাসক কর্তৃপক্ষ এ ধর্মবিশ্বাসীদের নির্মূল করার জন্য তলোয়ার উত্তোলন করলেও নিশ্চিতভাবে তাদের ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তনে বাধ্য করে নি। কনস্টানটাইন যখন পলীয় চার্চের সাথে প্রথম জোটবদ্ধ হলেন, তখন পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা দিল। তিনি রোমান দেবতাদের পূঁজারি ছিলেন এবং পৌত্তলিক রাষ্ট্রের ধর্মীয় প্রধান হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি পলীয় চার্চকে সমর্থন করতে শুরু করেন। পলীয় খৃষ্টধর্ম ও যীশুর মূল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে একটি বিভেদ সৃষ্টি করাই সম্ভবত তার উদ্দেশ্য ছিল। এ আনুকূল্য খৃষ্টানধর্মকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে এবং কার্যত তা রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম বিশ্বাসে পরিণত হয়। বহু লোকের জন্যই খৃষ্টান ধর্ম আকস্মিকভাবে যুগপৎ নীতি ও সুবিধা লাভের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে সামান্য সরকারী চাপ প্রয়োগ করতেই এ যাবৎ নিরপেক্ষ কিছু লোক পলীয় চার্চের অনুসারীতে পরিণত হয়। তবে বহু লোকই অন্তর থেকে নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে খৃষ্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে। খৃষ্টান ধর্ম এক গণ আন্দোলন হয়ে উঠে। যাহোক, এ ঘটনা পলীয় চার্চ ও যীশুর প্রকৃত অনুসারী খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনরায় বিভক্তি ঘটায়। যারা সুবিধা লাভের জন্য খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল তারা স্বভাবতই অনেক কম কঠোর পলীয় চার্চকে বেছে নিয়েছিল। অন্যদিকে যীশুর প্রকৃত ধর্মের অনুসারী চার্চ তাদেরই আমন্ত্রণ জানাত যার নিষ্ঠার সাথে এ ধর্মটি গ্রহণ ও পালনে সম্মত ছিল। কনস্টানটাইন, যিনি এ পর্যায়ে না খৃষ্টধর্মকে উপলব্ধি করতেন না তাতে বিশ্বাস করতেন, একটি ঐক্যবদ্ধ চার্চের রাজনৈতিক সুবিধা উপলব্ধি করেন যা তাকে মান্য করবে এবং যার কেন্দ্র হবে রোম, জেরুজালেম নয়। যীশুর ধর্মের প্রকৃত অনুসারী চার্চ যখন তার ইচ্ছা পালনে অস্বীকৃতি জানায় তখন তিনি বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের বশীভূত করার চেষ্টা করলেন। এ অকারণ চাপ কিন্তু প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারে নি। যীশুর প্রকৃত ধর্মের অনুসারী বেশ কিছু খৃষ্টান সম্প্রদায় তখন পর্যন্ত রোমের বিশপের প্রভূত্ব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা এ ঘটনাকে একজন বিদেশি শাসকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের এবং যীশুর শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি পদক্ষেপ হিসেবেই গণ্য করে।

প্রথম বিদ্রোহের ঘটনাটি গটে উত্তর আফ্রিকায় বারবার সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে আরিয়াস নন, ডোনাটাস (Donatus) নামক এক ব্যক্তি এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। বারবাররা সামগ্রিকভাবে কতিপয় মৌলিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাস। তারা যীশুকে একজন নবী হিসেবেই বিশ্বাস করত, ঈশ্বর হিসেবে কখনোই নয়। যেহেতু যীশু তার ধর্ম প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে রোমের কথা কখনোই উল্লেখ করেন নি, সেহেতু তাদের কাছে এ রকম কোনো ধারণা গ্রহণযোগ্য ছিল না। ৩১৩ খৃস্টাব্দে এসব লোক ডোনাটাসকে তাদের বিশপ হিসেবে নির্বাচন করে। প্রায় ৪০ বছর ধরে ডোনাটাস তাদের চার্চের নেতৃত্বে দেন যা রোমের বিশপের প্রতিপক্ষ হিসেবেই ক্রমশ প্রসার লাভ করে। জেরোমের মতে, ‘ডোনাটাসবাদ’ এক প্রজন্মের মধ্যে প্রায় সমগ্র উত্তর আফ্রিকার ধর্মে পরিণত হয়। কোনো শক্তি বা যুক্তি দিয়েই তার পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না।

রোমের বিশপ ডোনাটাসের স্থলে কার্থেজে আর একজন নিজের বিশপকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। তার নাম ছিল কেসিলিয়ান (Cacealian)। সম্রাট কনস্টানটাইনের মর্যাদার কারণে উভয় বিবদমান পক্ষই এ ব্যাপারে তার শরণাপন্ন হয়। মনে হয়, তারা ভেবেছিল যে কোনো এক রাজার সমর্থন লাভ করলে আর লড়াই করতে হবে না। সম্রাট কনস্টানটাইনের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের এ প্রয়াস খৃষ্টান ধর্মের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে। এই প্রথমবারের মত মতবিভেদ ও প্রচলিত ধর্মমতে অবিশ্বাস নিরপেক্ষ আইন দ্বারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া সম্ভব হলো। এই আইনে ধর্মের রক্ষাকবচ সেই পাবে যে নিজেকে কট্টর ধর্ম বিশ্বাসী বলে প্রমাণ করতে পারবে এবং তা পারার পর এ আইন তার বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে যে ধর্ম বিশ্বাসের নয়া মানদণ্ডের সাথে ভিন্নমত পোষণ করবে। কনস্টানটাইন কেসিলিয়ানের পক্ষ সমর্থন করলেন। কার্থেজের অধিবাসীরা রোমান উপ-কনসালের অফিসের সামনে জড়ো হলো এবং কেসিলিয়ানের নিন্দা করল। কনস্টানটাইন তাদের আচরণে বিরক্ত হলেন। তা সত্ত্বেও তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার জন্য রোমের বিশপের নেতৃত্বে একটি ট্রাইবুনাল গঠন করেন। ডোনাটাস সেখানে হাযির হন নি এবং তার পক্ষে যুক্তি-তর্ক পেশ করারও কেউ সেখানে ছিল না। তার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়। আফ্রিকায় যীশুর প্রকৃত শিক্ষার অনুসারী চার্চ রোমান বিশপের প্রদত্ত একতরফা রায় প্রত্যাখ্যান করে। এ ঘটনায় কনস্টানটাইনের বিরুদ্ধে এ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হলো যে, “ঈশ্বরের মন্ত্রীগণ ফালতু মামলাবাজদের মত নিজেদের মধ্যে বাক- বিতণ্ডায় লিপ্ত ছিলেন” হতাশ হওয়া সত্ত্বেও কনস্টানটাইন আরলেসে নতুন করে একটি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করলেন। উভয় পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো রকম সংঘর্ষ যাতে না ঘটে সে জন্য তাদের পৃথক পৃথক পথে আরলেসে আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ডোনাটাসের সমর্থকরা পুনরায় পরাজিত হন। এ ট্রাইবুনালের রায়ে বলা হয়: “বিশপগণ নিজেদের বিপজ্জনক লোকদের সাথেই দেখতে পেয়েছেন যাদের দেশের কর্তৃপক্ষ- বা ঐতিহ্যের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই। একমাত্র শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।” আগের রায়ের চেয়ে এ রায় কোনোভাবেই পৃথক ছিল না। ফলে উত্তর আফ্রিকার খৃষ্টানদের কাছে তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। বাস্তবে রোমান উপ-কনসাল ও রাজ-কর্মচারীদের প্রতি তাদের সামান্যই শ্রদ্ধা ছিল। কয়েক প্রজন্ম ধরে খৃষ্টানরা তাদের নিপীড়নের শিকার হয় এবং শয়তানের চেলা হিসেবে তাদের আখ্যায়িত করা হয়। আগে তারা নিপীড়িত হত খৃষ্টান হওয়ার কারণে। এখন তাদের ওপর নিপীড়ন নেমে আসে তারা প্রকৃত খৃষ্টান নয় বলে। উত্তর আফ্রিকার খৃষ্টানরা শুধুমাত্র রোমের পলীয় চার্চের বিশপের রায় বলবৎ করার জন্য রোমান সাম্রাজ্যের রাজকর্মচারীদের রাতারাতি ঈশ্বরের সেবক বনে যাওয়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারে নি। এ সময় পর্যন্ত ডোনাটাস তাদের বিশপ ছিলেন। এখন তিনি তাদের জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হলেন।

এই বিখ্যাত ব্যক্তি সম্পর্কে খুব অল্পই জানা যায়। তিনি যেসব গ্রন্থ লিখেছিলেন সেগুলো সহ বহু মূল্যবান গ্রন্থ সমৃদ্ধ তার লাইব্রেরিটি রোমান সৈন্যরা পুড়িয়ে দেয়। এ কাজটি তারা করেছিল রোমান খৃষ্টান চার্চের নামে যা তখন এক পৌত্তলিক রাজার সমর্থনে ক্রমশ গুরুত্ব লাভ ও শক্তি অর্জন করছিল। যা হোক, ডোনাটাসের অতীত জীবন, তার ব্যক্তিগত জীবন, তার বন্ধু- বান্ধব বা জীবনের ঘটনাবলী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। শুধু জানা যায় যে, তিনি একজন চমৎকার বাগ্মী এবং একজন বিরাট নেতা ছিলেন। তিনি যেসব স্থানে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর বহুকাল পরও সে সব স্থানে তাকে স্মরণ করা হত। তার অনুসারীরা তার ‘শ্বেত শুভ্র কেশ’ স্পর্শ করে শপথ গ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন সে সব ধর্মপ্রাণ যাজকদের অনুসরণীয় আদর্শ যারা নিশ্চিত ছিলেন যে সঠিক পথ অনুসরণ করলে ইহকাল ও পরকালেও তার সুফল লাভ করবেন। তার নিষ্ঠা ও সততা শত্রু-মিত্র সকলেরই শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। তিনি একজন ধর্মীয় সংস্কারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। “যিনি কার্থেজ-এ চার্চকে ভ্রান্তি থেকে মুক্ত করেছিলেন।” জনসাধারণ তাকে একজন অলৌকিক কর্মী এবং দানিয়েলের চেয়ে জ্ঞানী তাপস হিসেবে সম্মান করত। যীশুর প্রকৃত শিক্ষা বিলোপ ও পরিবর্তনের সকল অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি এক অটল পাহাড়ের মত দণ্ডায়মান ছিলেন। সম্রাট কনস্টানটাইন দুই চার্চের কাছে লেখা এক পত্রে তাদের মধ্যকার বিরোধ ভুলে যেতে এবং তার সমর্থিত চার্চের অধীনে উভয় পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। এ পত্রটি তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে এতে কনস্টানটাইন নিজেকে চার্চের সর্বময় কর্তা হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং এতে যীশু সম্পর্কে কোনো প্রকার উল্লেখ না থাকায়

বিষয়টি নজর কাড়ে। তবে কেউ এ পত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয় নি এবং আরলেস এর ট্রাইব্যুনালে যে সিদ্ধান্ত হয় তা বাস্তবায়নেরও কোনো অগ্রগতি দেখা যায় নি।

৩১৫ খৃস্টাব্দে সম্রাট রোমে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতালির উত্তরে ফ্রাংকরা যে হামলা শুরু করে তা দমনের জন্য মিলান গমন করা সম্রাটের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। এ সময় তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে আফ্রিকায় প্রেরণের জন্য একটি কমিশন গঠন করেন। কমিশন সেখানে পৌছলে তাকে বর্জন করা হয় এবং এমন সহিংস দাঙ্গা শুরু হয় যে কমিশনের সদস্যরা কোনো সাফল্য অর্জন ছাড়াই ইতালিতে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এই অপ্রীতিকর সংবাদ কনস্টানটাইনের কাছে পৌঁছে ৩১৬ খৃস্টাব্দে। তিনি স্বয়ং উত্তর আফ্রিকা গমন এবং সঠিক কীভাবে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের উপাসনা করতে হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ফরমান জারির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

লক্ষণীয় যে, কনস্টানটাইন এ ধরনের একটি রায় প্রদান তার কর্তৃত্বের এখতিয়ারভূক্ত বলে গণ্য করেছিলেন। আফ্রিকায় দুই চার্চের কাছে যে পত্র লিখেছিলেন তাতে তিনি বলেছিলেন:

“আমার পক্ষে আরো যা করা যেতে পারে তা হলো সকল ভ্রান্তি দূর করে এবং হঠকারী মতামত ধ্বংস করে দিয়ে সকল লোককে সত্য ধর্ম ও সরল জীবনের পথ অনুসরণ এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রাপ্য উপাসনা করার আহ্বান জানানো।”

এটা সুস্পষ্ট যে, যীশুর দৃষ্টান্ত ভুলে যাওয়া ও উপেক্ষা করার প্রবণতা শুরু হওয়ার পর থেকে ‘সত্য ধর্ম’ এক মতামতের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং কনস্টানটাইন নিজে যে মত সমর্থন করতেন তা ছাড়া অন্য কোনো মতামত ছিল না। এভাবে সম্রাট কনস্টানটাইন এমন একটি ধর্মের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন যা তিনি নিজে অনুসরণ করতেন না। কনস্টানটাইন নিজেকে চার্চের নেতাদের চেয়েও অধিক কর্তৃত্ববান মনে করতেন এবং মনে হয় নিজকে সাধারণ মরণশীল মানুষের চাইতে ঈশ্বরের নিজস্ব প্রতিনিধি হিসেবেই বিবেচনা করতেন। আরলেস (Arles)- এর ট্রাইব্যুনালে যেসব পলীয় বিশপ বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তারাও সম্ভবত কনস্টানটাইনের মতই ধারণা পোষণ করতেন। তারা দাবি করতেন যে, তাদের পরিকল্পনা “পবিত্র আত্মা ও তার দেবদূতের সামনেই লিপিবদ্ধ হয়েছিল।” কিন্তু তাদের রায় যখন উপেক্ষিত হলো তখন তারা সাহায্যের জন্য সম্রাটের শরণাপন্ন হলেন।

কনস্টানটাইন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও আফ্রিকা সফরে যান নি। ডোনাটাস পন্থীরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে সম্রাটকে ডোনাটাস ও কেসেয়িনের মধ্যকার বিরোধে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি তার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হত তবে সেটা হত তার মর্যাদার প্রতি এক বিরাট আঘাত। তাই তিনি ডোনাটাসের নিন্দা করে একটি ফরমান জারি করলেন। এতে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের যথোচিত পন্থায় প্রার্থনার সুযোগ সুবিধা বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। যখন তা উপেক্ষিত হলো তখন অত্যন্ত কঠোর এক আইন’ জারি করে আফ্রিকায় প্রেরিত হলো। এতে ডোনাটাসের অনুসারীদের সকল চার্চ বাজেয়াপ্ত এবং তাদের সকল নেতাকে নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কেসেলিয়ান প্রথমে ডোনাটাসপন্থী চার্চদের নেতাদের উৎকোচ দিয়ে হাত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। ডোনাটাসপন্থীরা রাজকীয় ফরমান অগ্রাহ্য ও উৎকোচ উপেক্ষা করে। তারা অর্থ উৎকোচের প্রস্তাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে ফাঁস করে দেয়। কেসেলিয়ান “কসাই এর চাইতেও নির্মম এবং একজন স্বৈরাচারীর চাইতেও নিষ্ঠুর” হিসেবে আখ্যায়িত হন।১০

ইতোমধ্যে ‘ক্যাথলিক’ বিশেষণ গ্রহণকারী রোমের চার্চ ডোনাটাসপন্থীদের কাছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। ঈশ্বরের উপাসনায় তাদের ধর্মমতকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যেই তারা এ নামটি গ্রহণ করে। যা হোক, তাদের আবেদনের কোনো সাড়া মিলে নি এবং ডোনাটাস কেসেলিয়ানের কাছে তার চার্চগুলো হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত রোমান সেনাবাহিনী মাঠে নামে। পাইকারীভাবে লোকজনকে হত্যা করা হয়। মৃতদেহেগুলো কূপের মধ্যে নিক্ষেপ এবং বিশপদের তাদের চার্চের অভ্যন্তরে হত্যা করে। কিন্তু ডোনাটাস বেঁচে যান এবং অনমনীয় থাকেন। এরপর তাদের আন্দোলন আগের চেয়েও জোরদার হয়। তারা শহীদদের চার্চ (Church of Martyrs) নামে নিজেদের চার্চের নামকরণ করেন। এ সকল ঘটনায় ডোনাটাসপন্থী ও ক্যাথলিক চার্চ পৌত্তলিক বিচারকগণ (Magistrates) ও তাদের সৈন্যদের সাথে একজোট হয়ে কাজ করছিল, সেহেতু তাদের বিভেদপন্থী এবং তাদের চার্চগুলোকে ‘ঘৃণ্য প্রতিমা উপাসনার স্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

কনস্টানটাইন, যিনি একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, বল প্রয়োগে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐক্য পুনরুদ্ধারে তার ব্যর্থতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। বিচক্ষণতা বীরত্বের অঙ্গ এ বিবেচনায় তিনি উত্তর আফ্রিকার জনসাধারণকে তাদের নিজেদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সব ঘটনা ও সেগুলোর ফলাফল পরবর্তীকালে তার কাউন্সিল অব নিসিয়া (Council of Nicea) আহবানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে।

এ সময় আরিয়াসের কণ্ঠস্বর কেবল শোনা যেতে শুরু করেছিল। তার কাহিনিতে ফিরে যাওয়ার আগে ইসলামের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ডোনাটাসপন্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করা প্রয়োজন। যেহেতু কনস্টানটাইন উত্তর আফ্রিকা থেকে তার মনোযোগ সরিয়ে এনে সাম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানের দিকে নিবদ্ধ করেছিলেন সে কারণে ডোনাটাসপন্থীদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা অনেক কমে এসেছিল। তাদের সংখ্যা পুনরায় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তারা এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সম্রাট যখন ৩৩০ খৃস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায় ক্যাথলিকদের জন্য একটি চার্চ নির্মাণ করেন তখন ডোনাটাসপন্থীরা তা দখল করে নেয়। সম্রাট এ ঘটনায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। কিন্তু আরেকটি চার্চ নির্মাণের জন্য ক্যাথলিকদের পর্যাপ্ত অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না। ডোনাটাসপন্থীদের আন্দোলন রোম পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। রোমে তাদেরও একজন বিশপ ছিলেন, তবে পদমর্যাদার দিক থেকে তাকে কার্থেজ (Carthage) ও নিকোমেডিয়ার (Nicomedia) বিশপের চেয়ে একধাপ নীচে বলে গণ্য করা হত।১১

ডোনাটাস কার্থেজে সার্বভৌম কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন। জনগণ অন্যান্য মরণশীল মানুষের চাইতে তাকে আরো উচ্চপর্যায়ের মানুষ বলে বিবেচনা করত। তাকে কখনোই বিশপ বলে ডাকা হতো না, বরং তিনি ‘কার্থেজের ডোনাটাস’ নামেই পরিচিত ছিলেন। আগাস্টাইন একবার অভিযোগ করেন যে, ডোনাটাসপন্থীরা যীশুর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার চাইতে ডোনাটাসের বিরুদ্ধে অপমানজনক কিছুর ক্ষেত্রে বেশি কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ঘটনাটি সত্য ছিল। কারণ তৎকালীন ক্যাথলিকরা ডোনাটাস সম্পর্কে কিছু বলার সময় কঠোর ও নিষ্ঠুর ভাষা ব্যবহার করত।

যখন কনস্টানটাইনের রাজত্বের অবসান ঘটে, তখন ডোনাটাসপন্থীরা চার্চের স্বাধীনতার জন্য তৎপরতা অব্যাহত রাখে। তারা ধর্মের ব্যাপারে সম্রাট অথবা রাজকর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের বিরোধী ছিল। তবে, তারা কিন্তু আর যাই হোক, সংকীর্ণ চিত্ত ছিল না। আগাষ্টাইন বলেছেন যে, তারা ক্যাথলিকদের ওপর নিপীড়ন চালাত না, এমনকি তারা যখন তাদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি হয়ে পড়ে, তখনও না। ক্যাথলিকগণ, যারা সব সময় নিজেদের সহিষ্ণু বলে দাবি করতে প্রস্তুত ছিল, তারা এটা বরদাশত করতে সম্মত ছিল না। যখন আরো একবার ভয়- ডরহীন ডোনাটাসপন্থীদের দমনের জন্য রাজকীয় সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করা হয়, তখন এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যা হোক, দমন-নিপীড়ন অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও ডোনাটাসপন্থীরা সম্রাটকে তাদের ধর্মমত বা ঈশ্বর- উপাসনার পন্থা পরিবর্তন করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তাদের অভিমত ছিল এই যে, “ক্যাথলিকগণের পুরোহিতরা অসৎ ব্যক্তি যারা ইহলোকের রাজন্য বর্গের সাথে কাজ করে। রাজ- অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে তারা যীশুর অবমাননা করেছে।১২

ডোনাটাসের মৃত্যুর পর উত্তর আফ্রিকার অধিবাসীরা তার আদর্শ অনুসরণ অব্যাহত রাখে। তারা ৩শত’ বছর ধরে তার প্রচারিত যীশুর শিক্ষা অনুসরণ করে। পরে ইসলামের আগমন ঘটলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে যা ছিল কার্যত তাদের অনুসৃত ধর্মেরই এক সম্প্রসারিত ও সমর্থনকারী ধর্ম।

ডোনাটাসের আন্দোলনের পাশাপাশি একই সময়ে অথচ সম্পূর্ণ স্বাধীন এক আন্দোলন দক্ষিণ মিসরে চলছিল। কনস্টানটাইন যখন ৩২৪ খৃস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার জট খোলার জন্য আরেকবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তখনি তার দৃষ্টি মিশরের ওপর পতিত হয়। মিশর তখন বিদ্রোহ গোলযোগ ও অরাজকতায় আকীর্ণ ছিল। ডায়োক্লোশিয়ানের (Diocletioan) নেতৃত্বে খৃষ্টানদের প্রতি নিপীড়ন যখন তুঙ্গে উঠেছিল, তখন অনেকেই তা পরিহারের জন্য তার সাথে সমঝোতা করেছিল। মেলেটিয়াস (Meletius) নামক একজন পুরোহিত এ সময় বলেন যে, যেসব পুরোহিত প্রকাশ্যে খৃষ্টধর্মের নিন্দা করেছে তাদের যাজকবৃত্তির কাজ পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া উচিৎ। তিনি আরো উপলব্ধি করেন যে, প্রায়শ্চিত্তের পর্যাপ্ত প্রমাণ না প্রদর্শন করা পর্যন্ত সকল বিশুদ্ধ প্রার্থনা সমাবেশে তাদের যোগদান বন্ধ করতে হবে। এ সময় আলেকজান্দ্রিয়ার প্রধান যাজক পিটার আরো নমনীয় পন্থার পরামর্শ দেন। তবে অধিকাংশ লোকই মেলেটিয়াসকে সমর্থন করে। আলেকজান্ডার যখন যাজকদের প্রধান হলেন, তিনি মেলেটিয়াসকে মাইনেস-এ (Mines) নির্বাসিত করেন।

মেলেটিয়াস ফিরে আসার পর বহু অনুসারী তার চারপাশে সমবেত হন। তিনি বিশপ, পুরোহিত ও উচ্চপদের যাঁজকদের নিয়োগ দান এবং বহু গির্জা নির্মাণ করেছিলেন। তার অনুসারীরা তাদের নিপীড়নকারীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করেছিল। মেলেটিয়াস তার চার্চকে “শহীদদের চার্চ” (Church of the Martyrs) নামে আখ্যায়িত করেন। আলোকজান্ডারের অনুসারীরা এর বিরোধী ছিল। কারণ, তারা নিজেদের ক্যাথলিক নামে আখ্যায়িত ও পলের প্রচারিত খৃষ্টধর্মের অনুসরণ করত। মেলেটিয়াসের মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার তার অনুসারীদের প্রার্থনা সমাবেশ নিষিদ্ধ করেন। এ আদেশের বিরোধিতা করে তারা সম্রাট কনস্টানটাইনের কাছে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। একমাত্র নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াসের (Eusebius) সাহায্য লাভ করে তারা সম্রাটের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করে। সম্রাটের দরবারে তাদের উপস্থিতির ঘটনা নিসিয়ার কাউন্সিল আহবানের অন্যতম কারণ ছিল। ইউসেবিয়াস আরিয়াসের বন্ধু ছিলেন। এই সাক্ষাতের মধ্যদিয়ে আরিয়ান ও মেলেটিয়ান আন্দোলনের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়।

এই দু’টি শহীদের চার্চের প্রেক্ষাপটে আরিয়াসের নেতৃত্বে আন্দোলন সংঘটিত হয়। আরিয়াসের সমর্থনে লেখা কোনো বিষয় এবং তার আন্দোলনের কোনো প্রকার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কার্যত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এখন আরিয়াস সম্পর্কে যেসব বইতে উল্লে­খ পাওয়া যায় তার প্রায় সবই তার শত্রুদের লেখা। সে কারণে তার জীবন ও কর্মের পূর্ণ বিবরণ প্রদান একেবারেই অসম্ভব। বিভিন্ন সূত্র থেকে তার সম্পর্কে যেসব চিত্র পাওয়া যায় তা জোড়া দিলে এই দাঁড়ায়: আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ পিটার তাঁকে একজন উচ্চ পদমর্যাদার যাজক হিসেবে নিয়োগ করেন, কিন্তু পরে তাকে তিনি বহিষ্কার করেন। পিটারের উত্তরসূরি পুনরায় তাঁকে পুরোহিত নিয়োগ করেন। আরিয়াস এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে, যখন আচিলাসের (Achillas) মৃত্যু গটে তখন তার স্থান দখলের সর্বপ্রকার সুযোগ জড়িত হওয়ার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। ফলে যাজকদের সর্বোচ্চ পদটিতে আলেকজান্ডার সহজেই অধিষ্ঠিত হন। আরিয়াসের প্রচারিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করা হয়েছিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এ মামলার বিচারক। পরিণতিতে তাঁকে আবার বহিষ্কার করা হয়। এ পর্যায় পর্যন্ত খৃষ্টানদের ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিরাট স্বাধীনতা ছিল। যারা নিজেদের খৃষ্টান বলে আখ্যায়িত করত তাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক লোক ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ কি সে ব্যাপারে

কেউই নিশ্চিত ছিল না। কিছু লোক অন্ধভাবে এর সমর্থন করত। অন্য দিকে ডোনাটাস ও মেলেটিয়াসের মত কিছু লোক তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর এ দুয়ের মধ্যে যারা অবস্থান করছিল, তারা নিজেরা যেভাবে ভালো মনে করত, ত্রিত্ববাদের সেভাবে ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা তাদের ছিল। দুই শতাব্দী ধরে আলোচনার পরও কেউই এ ধর্মমতকে সন্দেহমুক্তভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয় নি। আরিয়াস ত্রিত্ববাদের সংজ্ঞা প্রদানের জন্য চ্যালেঞ্জ জানালেন। আলেকজান্ডার তখন সম্পূর্ণ পশ্চাদপসরন করলেন। তিনি যতই এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন ততই তিনি বিভ্রান্তির শিকার হলেন। আরিয়াস যুক্তি দিয়ে এবং পবিত্র গ্রন্থের প্রামাণিকতার ওপর নির্ভর করে ত্রিত্ববাদকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করলেন।

এর পর আরিয়াস যীশু সম্পর্কে আলেকজান্ডারের দেওয়া ব্যাখ্যা খণ্ডন করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, যীশু যদি প্রকৃতই ‘ঈশ্বরের পুত্র’ হয়ে থাকেন তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, পুত্রের পূর্বে পিতার অস্তিত্ব ছিল। অতএব, এমন একটি সময় অবশ্যই ছিল যখন সন্তানের অস্তিত্ব ছিল না। সুতরাং এর অর্থ এটাই হয় যে, পুত্র ছিল কোনো সত্ত্বা বা প্রাণ দ্বারা গঠিত সৃষ্টি যা সব সময়ই অস্তিত্বশীল ছিল না। যেহেতু ঈশ্বর অনাদি ও চিরস্থায়ী সত্ত্বা, সে কারণে যীশু ঈশ্বরের মত একই সত্ত্বা হতে পারেন না।

আরিয়াস সব সময় যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে কথা বলতেন। যেহেতু আলেকজান্ডার যুক্তি প্রমাণ সহ পাল্টা জবাব দিতে ব্যর্থ হতেন সে কারণে তিনি চট করেই ক্রুদ্ধ হয়ে পড়তেন। তার সাথে তর্কের সময় আরিয়াস বলতেন: “আমার যুক্তির ত্রুটি কোথায় এবং আমার ন্যায়ানুমান কোথায় ভঙ্গ হয়েছে?” এর জবাব মিলত না। ফলে ৩২১ খৃস্টাব্দে নাগাদ আরিয়াস হয়ে উঠেছিলেন একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী পুরোহিত, বিপুল রকম আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের বিশ্বাসের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্ধহীন।

বিতর্কে এই ব্যক্তিগত বিপর্যয় ঘটার পর আলেকজান্ডার আরিয়াসের ধর্মমতের ব্যাপারে রায় ঘোষণার জন্য এক প্রাদেশিক সভা আহ্বান করেন। প্রায় ১শ’ মিশরীয় ও লিবীয় বিশপ এতে যোগদান করেন। আরিয়াস অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তার অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, এমন এক সময় ছিল যখন যীশু অস্তিত্বশীল ছিলেন না, অথচ ঈশ্বর তখনও বিরাজিত ছিলেন। যেহেতু যীশু ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট সে কারণে তার সত্ত্বা সীমাবদ্ধ, সুতরাং তিনি চিরন্তন হতে পারেন না। একমাত্র ঈশ্বরই চিরন্তন। যেহেতু যীশু সৃষ্ট প্রাণী, সে কারণে তিনিও অন্যান্য সকল যুক্তিবাদী প্রাণীর মতোই পরিবর্তনশীল। একমাত্র ঈশ্বরই অপরিবর্তনীয়। এভাবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যীশু ঈশ্বর ছিলেন না। অবিরাম যুক্তি সহকারে তার বক্তব্য পেশের পাশাপাশি তিনি বাইবেল থেকে অজস্র শ্লোক উদ্ধৃতি করতেন যেগুলোর কোথাও ত্রিত্ববাদের ব্যাপারে কোনো উল্লেখই ছিল না। তিনি বলেন, যদি যীশু বলে থাকেন ‘আমার পিতা আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’১৩ তাহলে ঈশ্বর ও যীশু সমকক্ষ এ কথায় বিশ্বাস করার অর্থ বাইবেলের সত্যকে অস্বীকার করা।

আরিয়াসের যুক্তি সমূহ অখণ্ডনীয় ছিল। কিন্তু আলেকজান্ডার তার অবস্থানের সুবাদে তাকে নির্বাসনে প্রেরণ করেন। তবে আরিয়াসের অনুসারীর সংখ্যা এত বিপুল ছিল যে, পলীয় চার্চ তাকে উপেক্ষা করতে পারে নি। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের অনেক বিশপই আলেকজান্ডারের জারি করা আদেশ মেনে নিতে পারেন নি। যে বিতর্ক ৩শ’ বছর ধরে টগবগ করে ফুটছিল তা এবার বিস্ফোরিত হলো। পূর্বাঞ্চলের এত বেশি সংখ্যক বিশপ আরিয়াসকে সমর্থন করেন যে, আলেকজান্ডার রীতি মত সমস্যার সম্মুখীন হন। এ সব বিশপের প্রধান মিত্র ছিলেন নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস। তিনি আরিয়াস ছিলেন বন্ধু ও লুসিয়ানের ছাত্র যিনি তার পবিত্রতা ও জ্ঞানের জন্য সার্বজনীন মর্যাদার পাত্র ছিলেন। সম্ভবত ৩১২ খৃস্টাব্দে লুসিয়ানের হত্যার ঘটনা তাদের বন্ধুত্বকে আরো শক্তিশালী ও অভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসে আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী করেছিল।

আলেকজান্ডার কর্তৃক নির্বাসিত হওয়ার পর আরিয়াস কনস্টান্টিনোপলে ইউসেবিয়াসের কাছে একটি পত্র লেখেন। সে পত্রটি আজও রয়েছে। আরিয়াস এ পত্রে আলোকজান্ডারের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ আনেন যিনি আরিয়াসকে একজন অধার্মিক নাস্তিক হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া থেকে বহিষ্কার করার চেষ্টা করেছিলেন। কারণ আরিয়াস ও তার বন্ধুরা বিশপের প্রচারিত ধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে রাজি হন নি। আরিয়াস পত্রে বলেন, “আমরা নির্যাতিত হচ্ছি এ কারণে যেহেতু আমরা বলি যে, যীশু উদ্ভূত হয়েছিলেন; কিন্তু ঈশ্বর উদ্ভূত হন নি, তিনি অনাদি।১৪ এ ঘটনার ফলে আরিয়াস ইউসেবিয়াসের কাছ থেকে আরো বেশি করে সমর্থন লাভ করেন। ইউসেবিয়াসের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আর শুধু জনসাধারণের ওপরই নয়, খোদ রাজ প্রসাদেও তার প্রভাব বিস্তৃত ছিল। তবে এই সমর্থন লাভ সত্ত্বেও আরিয়াস মনে হয় বিরোধিতার চাইতে একটি সমঝোতার প্রতিই সর্বদা আগ্রহী ছিলেন। সম্ভবত চার্চের অভ্যন্তরে একটি শৃঙ্খলা বজায় থাকুক, এটা তিনি বিশেষভাবে চাইতেন।

দুর্ভাগ্যক্রমে এ বিষয়ে ইতিহাসে খুব সামান্য উপাদানই পাওয়া যায়। আরিয়াসের কিছু পত্র এখনও টিকে আছে যা থেকে দেখা যায় যে, আরিয়াসের একমাত্র লক্ষ ছিল যীশুর শিক্ষাকে বিশুদ্ধ ও পরিবর্তন থেকে মুক্ত রাখা এবং খৃষ্টানদের মধ্যে বিচ্যুতি না ঘটানো। অন্যদিকে আলেকজান্ডারের লেখা পত্রসমূহ থেকে দেখা যায় যে, তিনি সর্ব সময়ই আরিয়াস ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু ভাষা ব্যবহার করেছেন। এক পত্রে তিনি লিখেছেন: তারা শয়তানের দ্বারা চালিত, শয়তান তাদের মধ্যে বাস করে এবং তাদের উত্তেজিত করে; তারা ভেলকি জানে এবং প্রতারক, চতুর, জাদুকরের মতো কথায় মোহাবিষ্ট করে, তাহারা হলো দস্যু, নিজেদের আস্তানায় তারা দিন রাত খৃষ্টকে অভিশাপ দেয়… তারা শহরের চরিত্রহীন তরুণী-রমণীদের মাধ্যমে লোকজনকে ধর্মান্তরিত করে।”১৫ এ ধরনের হিংস্র ও অপমানকর ভাষা ব্যবহার থেকে সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে, বিশপ আলেকজান্ডার তার নিজের ধর্মমতের দুর্বলতার ব্যাপারে অবশ্যই সচেতন ছিলেন।

ইউসেবিয়াস বিশপ আলেকজান্ডারের মনোভাবে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। তিনি পূর্বাঞ্চলীয় বিশপদের এক সভা আহ্বানপূর্বক তাদের কাছে সম্পূর্ণ বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সমাবেশের ফল ছিল একটি পত্র যা পূর্ব ও পশ্চিমের সকল বিশপের কাছে প্রেরণ করা হয়। পত্রে তাদেরকে আরিয়াসকে চার্চে ফিরিয়ে নিতে আলেকজান্ডারকে রাজি করাতে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু আলেকজান্ডার আরিয়াসের পূর্ণ আত্মসমর্পণ চাইলেন। আরিয়াস ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন ও তার অনুসারীদের নিয়ে প্রার্থনা সমাবেশ করতে থাকেন। আলেকজান্ডার তখন “তার ক্যাথলিক চার্চের সহযোগী কর্মীদের” কাছে দীর্ঘ এক পত্র লেখেন যাতে আরিয়াসের পুনরায় সমালোচনা করা হয়। আলেকজান্ডার এ পত্রে ইউসেবিয়াসের নাম উল্লেখ করে তাকে অভিযুক্ত করেন এ বলে যে, “তিনি মনে করেন যে, তার সম্মতির ওপরই চার্চের কল্যাণ নির্ভর করে।”১৬ তিনি আরো বলেন, ইউসেবিয়াস আরিয়াসকে সমর্থন করেন, আর তা শুধু তিনি যে আরিয়াসের মতবাদে বিশ্বাস করেন সে জন্যই নয়, এর পিছনে রয়েছে তার নিজস্ব উচ্চাকাঙ্খাজনিত স্বার্থ। এভাবে যাজকদের মধ্যকার বিরোধ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশপদের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধের রূপ গ্রহণ করে।

এ বিষয়টি নিয়ে বিশপদের পর্যায় থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভিন্ন প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে। নাইসিয়ার গ্রেগরী (Gregory of Nyssea) লিখেছেন:

“রাস্তা-ঘাট, বাজার, মুদ্রা ব্যবসায়ীদের দোকান, খাবার দোকানসহ কনস্টান্টিনোপলের সর্বত্রই তাদের নিয়ে আলোচনা চলছিল। একজন দোকানিকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে অমুক জিনিসের মূল্য কত, সে তার জবাব দেয় উদ্ভূত সত্ত্বা ও উদ্ভূত নয় এমন সত্ত্বা সম্পর্কে জানতে চেয়ে। রুটিওয়ালার কাছে রুটির দাম জানতে চাইলে সে বলে, ‘পুত্র তার পিতার বান্দা’; চাকরকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, গোসলখানা তৈরি করা হয়েছে কিনা, সে জবাব দেয়: ‘পুত্র কোনো কিছু থেকে উদ্ভূত হয় নি।’ ক্যাথলিকরা ঘোষণা করেছে, ‘জন্মলাভকারীই শ্রেষ্ঠ’ এবং আরিয়াসরা বলছে: তিনিই শ্রেষ্ঠ যিনি জন্মদান করেছেন।”১৭

লোকে রমণীদের কাছে জিজ্ঞাসা করত যে, কোনো পুত্র জন্মগ্রহণ করার আগে তার অস্তিত্ব থাকতে পারে কি? যাজক মহলের উচ্চ পর্যায়েও এ বিতর্ক ছিল সমানভাবে উত্তপ্ত ও তিক্ত। জানা যায় যে, “প্রতিটি শহরেই বিশপরা বিশপদের সাথে একগুঁয়ে বিরোধে লিপ্ত ছিল। জনসাধারণ ছিল জনসাধারণের বিপক্ষে… এবং তারা পরস্পরের সাথে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।১৮

সম্রাট কনস্টানটাইন বিষয়টি অবহিত ছিলেন। ঘটনাবলী ক্রমশই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। তিনি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হলেন এবং আলেকজান্ডার ও আরিয়াস উভয়ের উদ্দেশ্যে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। এতে তিনি বললেন যে, ধর্মীয় মতামতের ঐক্য তিনি একান্তভাবে কামনা করেন যেহেতু সাম্রাজ্যে শান্তির জন্য সেটাই হলো সর্বোত্তম গ্যারান্টি। উত্তর আফ্রিকার ঘটনাবলীতে গভীরভাবে হতাশ হয়ে তিনি “প্রাচ্যের হৃদয়ের” (Bosom of East) কাছ থেকে উত্তম কিছু আশা করলেন যেখানে “ঐশ্বরিক আলোর প্রভাতের” (Dawn of Divine light) উদয় ঘটেছিল। তিনি লিখেছেন:

“কিন্তু হায় গৌরবময় ও পবিত্র ঈশ্বর! শুধু আমার কান নয়, আমার হৃদয়ও ক্ষত- বিক্ষত, যখন আমি শুনতে পেলাম যে, আপনার মধ্যে যে বিরোধ ও দলাদলি বিদ্যমান তা এমন কি আফ্রিকার চাইতেও মারাত্মক; সুতরাং আপনারা, যাদের আমি অন্যদের বিরোধ নিরসনের দৃষ্টান্ত হিসেবে আশা করি, তাদের চেয়ে আরো খারাপ হওয়ার আগেই এর প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন এবং এখনো, এই আলোচনার মূল কারণ সম্পর্কে সতর্ক অনুসন্ধান করার পর আমি দেখতে পেয়েছি যে, তা একেবারেই তাৎপর্যহীন এবং এ ধরনের বিবাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ যুক্তিহীন। …. আমার অনুমান যে, বর্তমান বিতর্কের উৎপত্তি ঘটেছে এভাবে: যখন আপনি, আলেকজান্ডার, প্রতিটি যাজককে জিজ্ঞাসা করলেন যে, পবিত্র গ্রন্থের কতিপয় অংশ সম্পর্কে তিনি কীভাবেন অথবা তিনি একটি অর্থহীন বোকামিপূর্ণ প্রশ্নের একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে কী চিন্তা করেন এবং আপনি, আরিয়াস, যথাযথ বিবেচনা ছাড়াই আপনি এমন সব কথা বললেন যা কখনো প্রকাশই পায় নি অথবা পেলেও নীরবেই তার বিলুপ্তি ঘটেছে, আপনাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিল। যোগাযোগ ছিন্ন হলো এবং অধিকাংশ লোক দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, তারা আর অভিন্ন হিসেবে ঐক্যবদ্ধ রইল না।”

এর সম্রাট তাদের উভয়কেই অবান্তর প্রশ্ন ও হঠকারী জবাব বিস্মৃত হওয়ার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান:

বিষয়টি আদতে কখনোই উত্থিত হওয়ার যোগ্য ছিল না, কিন্তু অলস লোকদের করার মত বহু অপকর্ম থাকে এবং অলস মস্তিষ্কগুলো এ চিন্তাই করে। আপনাদের মধ্যে যে মতপার্থক্য বা বিরোধ তা পবিত্র গ্রন্থভিত্তিক কোনো যাজকের ধর্মমত নয় কিংবা তা নয়া প্রবর্তিত কোনো মতবাদের কারণে নয়। আপনারা উভয়েই একই প্রকার এবং অভিন্ন মত পোষণ করেন। সুতরাং আপনাদের মধ্যে পুনর্মিলন সহজেই সম্ভব।

সম্রাট এ পত্রে পৌত্তলিক দার্শনিকদের উদাহরণ দেন যারা একই প্রকার বিশদ সাধারণ নীতিমালা ধারণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য পোষণে সম্মত হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্রশ্ন করেন, নিছক তুচ্ছ ও মৌখিক মতপার্থক্যের কারণে খৃষ্টান ভাইদের একে অপরের সাথে শত্রুর মতো আচরণ করা কি ঠিক? তার মতে এ ধরনের আচরণ:

রুচিহীন, শিশুসূলভ ও বদমেজাজি ও দুর্ভাগা ঈশ্বরের যাজকগণ এবং বোধ সম্পন্ন ব্যক্তিগণ… এটা হলো শয়তানের ছলনা ও প্রলোভন। এ ব্যাপারে আসুন আমরা কিছু করি। আমরা সবাই যদি সকল বিষয়ে এক রকম ভাবতে নাও পারি, অন্তত বড় বিষয়গুলোতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি। পবিত্র ঐশ্বরিক সত্ত্বা প্রসঙ্গে আসুন সবাই একই বিশ্বাস এক উপলব্ধি পোষণ এবং ঈশ্বর প্রসঙ্গে এক ও অভিন্ন মত অবলম্বন করি।

পত্রে এ বলে উপসংহার টানা হয়:

যদি তা না হয়, তাহলে আমার সেই শান্তিপূর্ণ ও সমস্যামুক্ত রাতগুলো ফিরিয়ে দিন যাতে আমি আমার আনন্দ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের উৎফুল্ল­তা লাভ করতে পারি। তা যদি না হয় তাহলে আমি অবশ্যই যন্ত্রণা কাতর ও অশ্রুসিক্ত হব এবং মৃত্যু পর্যন্ত আমি কোনো শান্তি পাব না। যেখানে ঈশ্বর প্রেমীগণ, আমার সহকর্মী সেবকগণ এ ধরনের বেআইনি ও ক্ষতিকর বিতর্কে লিপ্ত সেখানে আমি কীভাবে মনে শান্তি পাব?১৯

এ পত্র শুধু খৃষ্টধর্ম সম্পর্কেই নয়, অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও সম্রাটের চরম অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে যেহেতু তিনি মনে করতেন যে, একজন মানুষ যেভাবে খুশি ঈশ্বরের উপাসনা করুক অথবা ঈশ্বর নির্দেশিত পন্থায়ই উপাসনা করুক তা একই ব্যাপার। কার্যত তার কাছে আলেকজান্ডার ও আরিয়াসের মধ্যকার বিরোধ ছিল নেহায়েতই মৌখিক বিবাদ অথবা এক তাৎপর্যহীন এবং অপ্রয়োজনীয় তুচ্ছ বিষয়। এ দু’জনের মধ্যকার বিরোধকে নিছক তুচ্ছ বলে আখ্যায়িত করা থেকে বোঝা যায় যে, কনস্টানটাইন জানতেন না তিনি কোন বিষয়ে কথা বলছেন। একদিকে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস অন্য দিকে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস এর মধ্যে তার দৃষ্টিতে মৌলিক কোনো বিরোধ ছিল না। পত্র থেকে দেখা যায়, কনস্টানটাইন বাস্তব সত্য নিয়ে নয়, তার মনের শান্তির ব্যাপারেই বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুতরাং তার পত্রে যে কোনো ফল হয় নি, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কর্দোবার হোসিয়াস এ পত্র আলেকজান্দ্রিয়ায় বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। অল্প কয়েকদিন অবস্থানের পর তিনি তার মিশনের ব্যর্থতা সম্পর্কে সম্রাটকে জ্ঞাত করার জন্য শূন্য হাতে ফিরে আসেন।

একদিকে যখন এসব ঘটনা ঘটে চলেছিল, অন্যদিকে কনস্টানটাইন তার ভগ্নীপতি লিসিনাসের (Licinus) সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে লড়াই করছিলেন। যুদ্ধে লিসিনাস নিহত হন। লিসিনাস ছিলেন আরিয়াসের সমর্থক। সুতরাং তার মৃত্যুর ফলে সম্রাটের দরবারে আরিয়াসের অবস্থান আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। যা হোক, কনস্টানটাইন উপলব্ধি করলেন যে, একটি যুদ্ধে জয়লাভ করলেও শান্তি হারানো সম্ভব। হোসিয়াসের (Hosius) মিশনের ব্যর্থতার পর প্রাচ্যের পরিস্থিতি গোলযোগপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। আরিয়াসের বাণী ও যুক্তির পরিণতি হলো আলেকজান্দ্রিয়ায় রক্তপাত। সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল বা প্রাচ্যের সর্বত্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ইতিপূর্বেই উত্তর আফ্রিকায় বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ ছিল। এ পর্যায়ে সম্রাট উপলব্ধি করেন যে, তার পলীয় চার্চের বন্ধুগণ তার কোনো সমস্যাই মিটিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী নয়। উত্তর আফ্রিকার বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেছিলেন তা হলো: প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ সমর্থন করা তার উচিৎ নয়। তাই তিনি আহ্বান করার সিদ্ধান্ত নেন। একজন পৌত্তলিক হিসেবে তার অবস্থান তাকে এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছিল। যেহেতু তিনি বিবাদমান কোনো সম্প্রদায়েরই অনুসারী নন, সে কারণে তিনি একজন নিরপেক্ষ বিচারক হতে পারবেন। তার ধারণা হলো, এর ফলে তখন পর্যন্ত বিশপরা যে সমস্যার সম্মুখীন ছিলেন, তা নিরসন হবে। কারণ, এ ধরনের একটি বিষয়ের নিষ্পত্তিকারী হিসেবে একজন খৃষ্টানের সভাপতিত্বের বিষয়টি মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কনস্টানটাইনের নেতৃত্বে বিশপদের এ সভাটি আজ কাউন্সিল অব নিসিয়া (Council of Nicea) হিসেবে পরিচিত।

সভার জন্য আমন্ত্রণ লিপি প্রেরণ করা হলো। কনস্টানটাইন রাজকীয় কোষাগার থেকে এর সকল ব্যয় ভার বহন করেন। দু’বিবদমান পক্ষে নেতৃবৃন্দ ছাড়া অন্য যাদের আমন্ত্রণ জানানো হলো তারা সার্বিকভাবে তেমন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন না। ডোনাটাসের প্রধান বিরোধী কেসেলিয়ানকে এ সভায় আমন্ত্রণ জানানো হলেও ডোনাটাসের চার্চের কাউকেই আমন্ত্রণ করা হয় নি। সভায় অংশগ্রহণকারী অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিশপগণ হলেন:

ায়সারিয়ার ইউসেবিয়াস (Eusebius of Caesaria)

ইউসেবিয়াস ছিলেন খৃষ্টীয় ধর্মীয় ইতিহাসের জনক। তার গ্রন্থ হলো বিভিন্ন বিবরণের প্রধান ভান্ডার যা খৃষ্টীয় ধর্মীয় ইতিহাসের চতুর্থ শতককে প্রথম শতকের সাথে সংযুক্ত করেছে। প্রভূত জ্ঞান ছাড়াও তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। প্রাচ্যের যাজকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি সম্রাটের মনের কথা বলতে পারতেন। তিনি সম্রাটের দোভাষী, নামমাত্র যাজক ও পাপের স্বীকারোক্তি শ্রবণকারী ছিলেন। তিনি মনে প্রাণে আরিয়াসের মতানুসারী ছিলেন এবং ফিলিস্তিনের অধিকাংশ বিশপের সমর্থন তিনি লাভ করেছিলেন।

িকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস (Eusebius of Nicomedia)

তিনি ছিলেন এক অভিজাত পরিবারের সন্তান। তিনি একই সময় লুসিয়ান ও আরিয়াসের অনুসারী ছিলেন। তার আধ্যাত্মিক খ্যাতি সর্বত্র স্বীকৃত ছিল। ঐ সময় একই নামে (ইউসেবিয়াস) দু’জন ঈশ্বরভক্ত ব্যক্তি ছিলেন। যার ফলে সমকালীন ঐতিহাসিকদের মধ্যে তাদের ব্যাপারে কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস আরিয়াসের অবিচল সমর্থন ছিলেন। আরিয়াসের অনুসারীরা তাকে “মহান” বলে আখ্যায়িত করেন। তার অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। তিনি প্রথমে বৈরুতের বিশপ ছিলেন, পরে নিকোমেডিয়ায় বদলি হন। নিকোমেডিয়া তখন প্রাচ্যের রাজধানী ছিল। সম্রাটের ভগ্নীপতি ও প্রতিদ্বন্দ্বী লিসিনাস তার একজন ভালো বন্ধু ছিলেন। ফলে সম্রাটের বোন কনষ্টানটিনার (Constantina) ওপর তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। লিসিনাস সম্রাটের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হন। এবং প্রাণ হারান। স্বামীর মৃত্যুর পর কনস্টানটিনা বসবাসের জন্য রাজ প্রসাদে চলে যান। এভাবে কনষ্টানটিনার মাধ্যমে ও রাজ পরিবারের সাথে তার দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়তার কারণে রাজদরবারে তার ভালো প্রভাব ছিল এবং তা কখনোই খর্ব হয় নি। শুধু তার প্রভাবেই সম্রাট কনস্টানটাইন আরিয়াসের চার্চে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী হয়েই মারা যান।

থানাসিয়াস (Athanasius):

বয়সে তরুণ এই ব্যক্তিটি ত্রিত্ববাদের এক কট্টর সমর্থক ছিলেন। বার্ধক্যে উপনীত ও আরিয়াস কর্তৃক বহুবার বিপর্যস্ত আলেকজান্ডার নিসিয়ার সভায় নিজে যাওয়ার পরিবর্তে প্রতিনিধি হিসেবে এথানাসিয়াসকে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

োসিয়াস (Hosius)

হোসিয়াস ছিলেন সম্রাটের প্রধান সভাসদ। তার গুরুত্ব ছিল এখানে যে তিনি পাশ্চাত্যে পলীয় চার্চের প্রতিনিধিত্ব করতেন যেখানে সম্রাটের প্রভাব ছিল দুর্বলতার। হোসিয়াস একজন ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। ইতিহাসে তিনি ‘মাননীয় প্রবীণ ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন যাকে এথানাসিয়াস ‘পবিত্র’ (Holy) বলে আখ্যায়িত করেন। উচ্চ চরিত্র বলের জন্য তিনি সকলের কাছে সুপরিচিত ছিলেন। সম্রাটের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল।

উপরোক্ত কয়েকজন ছাড়াও কাউন্সিলে এমন সব ব্যক্তি ছিলেন যারা ধর্মনিষ্ঠার জন্য খ্যাতিমান হলেও জ্ঞানের জন্য খ্যাতিমান ছিলেন না। তাদের হৃদয় পবিত্র থাকলেও মুখের ভাষা সবসময় পরিশীলিত ছিল না।

্পিরিডেম (Spiridem)

স্পিরিডেম ছিলেন একজন অমার্জিত ও সরলমনা যাজক। তিনি ছিলেন সেসব অশিক্ষিত বিশপদেরই একজন যারা ঐ সময় ছিলেন চার্চগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে তিনি কী ধরনের মানুষ ছিলেন তা বুঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। তিনি ছিলেন একজন মেষ পালক। নিপীড়ন-নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি তার বিশ্বাসে অটল ছিলেন। ধর্মের রাজনীতির ব্যাপারে তার জ্ঞান ছিল ভাষা। তার প্রতি বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা আরোপিত হওয়ার কারণে তিনি বিশপ নিযুক্ত হন। বিশপ হওয়ার পরও তার সাধারণ ও গেঁয়ো বেশ-ভূষার পরিবর্তন হয় নি। তিনি সব সময় পদব্রজে চলতেন। পলীয় চার্চের অন্যান্য ‘রাজপুত্রগণ’ তাকে পছন্দ করতেন না। তাদের উদ্বেগ ছিল যে, তিনি যথাসময়ে সভার অধিবেশনে যোগ দিতে নিসিয়া পৌঁছতে পারবেন কিনা। স্পিরিডেম যখন সম্রাটের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পত্র পেলেন, তিনি উপলব্ধি করলেন তিনি যদি যথাসময়ে পৌঁছতে চান তাহলে তাকে খচ্চরের পিঠে সাওয়ার হয়ে সফর করতে হবে। তিনি অন্যান্য বিশপদের মত দলবল না নিয়ে একজন মাত্র পরিচারক সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করলেন। তারা দু’টি খচ্চরে চড়ে সফর করছিলেন। একটি রং ছিল সাদা, অন্যটির রং ছিল সাদা ও কালোয় মিশানো। এক রাতে তারা একটি সরাইখানায় আশ্রয় নেন। এ সময় সেখানে অন্যান্য বিশপরাও পৌঁছেন যারা নিশ্চিন্তে ছিলেন না যে, স্পিরিডেম সভার আলোচনায় অংশ গ্রহণের জন্য আদৌ যোগ্য কিনা। পরদিন ভোরে স্পিরিডেম যখন নিদ্রায় বিভোর, তারা দু’টি খচ্চরকে হত্যাকরে সরাইখানা ত্যাগ করেন। স্পিরিডেম ঘুম থেকে জেগে খচ্চরগুলোকে আহার করিয়ে সেগুলোর পিঠে জিন চাপাতে পরিচারককে নির্দেশ দিলেন। সে খচ্চরগুলোকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে স্পিরিডেমকে সেই দুঃসংবাদ দিল। বিশপগণ খচ্চর দু’টির মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। তিনি পরিচারককে প্রতিটি খচ্চরের দেহের কাছে সে গুলোর কর্তিত মাথা এনে রাখতে বললেন। সে অন্ধকারের মধ্যে ভুল করে এক খচ্চরের মাথা অন্যটির কাছে নিয়ে রাখল। যেইমাত্র সে মাথাগুলো খচ্চরগুলোর দেহের কাছে রাখল, সাথে সাথে সেগুলো জীবন লাভ করে উঠে দাঁড়াল। তারা তাদের যাত্রা আবার শুরু করলেন। কিছু সময় পরই তারা সেই বিশপদের দলকে অতিক্রম করলেন যারা ভেবেছিল যে, তারা স্পিরিডেমকে যথেষ্ট পিছনে ফেলে আসতে সক্ষম হয়েছে এবং তিনি যথা সময়ে নিসিয়া পৌঁছতে পারবেন না। তাদের বিস্ময় চরমে পৌঁছাল যখন তারা দেখল যে, সাদা খচ্চরটির মাথা সাদা কালো রং অন্যদিকে সাদা কালো রঙের খচ্চরটির মাথা সাদা।২০

াটামন (Patamon) তিনি একজন সন্ন্যাসী ছিলেন

ওসিয়াস (Ocsius), তিনি শুধু তার আচারনিষ্ঠতার কারণে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

নিকোলাসের মাইজার (Myser of Nicholas), তার নামটি ইতিহাসে স্থান লাভ করেছে বিশেষত চার্চের ঐতিহাসিকগণের করণে, যেহেতু আরিয়াস যখন কথা বলছিলেন, তিনি তখন তার কানে ঘুসি মেরেছিলেন।

এভাবে দেখা যায়, নিসিয়ার (নিকিও) পরিষদ বেশির ভাগ সেসব বিশপদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল যারা একান্ত ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন, কিন্তু মূল বিষয়ে পর্যাপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান তাদের ছিল না। এ সকল লোককে হঠাৎ করে সেকালের গ্রীক দর্শনের চটপটে ও অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যাখ্যাতাদের মুখোমুখি করা হয়েছিল। তাদের প্রকাশ ভঙ্গি ছিল এমন যে কী বলা হচ্ছে তার তাৎপর্য বুঝে ওঠা এসব বিশপের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তারা তাদের জ্ঞানের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে অপরাগ হয়ে অথবা তাদের বিরোধীদের সাথে বিতর্কে অক্ষম হয়ে তাদের নিজেদের বিশ্বাসে স্থিত হয়ে চুপ করে থাকা অথবা সম্রাটের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না।

সভা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই সকল প্রতিনিধি নিসিয়া পোঁছেন। তারা ছোট ছোট দলে জড়ো হতেন এবং তাদের মধ্যে আসন্ন সভার বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক হত। এসব সমাবেশে, যা সাধারণত জিমনাসিয়াম বা খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠিত হত, গ্রীক দার্শনিকগণ তাদের যুক্তির বাণ ছুঁড়ে দিতেন এবং ব্যঙ্গ্য বিদ্রূপ করতেন তবে তা আগত প্রতিনিধিদের বিভ্রান্ত করত না।

অবশেষে নির্দিষ্ট দিনটি এল। প্রত্যেকেই সভায় উপস্থিত হলেন। সম্রাট সভা উদ্বোধন করবেন। প্রাসাদের একটি বিশাল কক্ষ সভার জন্য নির্ধারণ করা হয়। কক্ষের মাঝখানে টেবিলে সেকালের সকল জ্ঞাত গসপেলের কপি সমূহ রাখা হয়ে ছিল। সেগুলোর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩শ’। প্রত্যেকের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল চমৎকার সাজে সজ্জিত কাঠের তৈরি রাজসিংহাসনের দিকে। সিংহাসনটি স্থাপন করা হয়েছিল পরস্পরের দিকে মুখ করে সন্নিবিষ্ট দু’সারি আসনের মধ্যে, কক্ষের উঁচু হয়ে উঠে যাওয়া দিকের শেষ প্রান্তে। মাঝে মাঝে দূরাগত মিছিলের শব্দ রোল ছাড়া কক্ষের মধ্যে গভীর নীরবতা বিরাজ করছিল। মিছিলটি প্রাসাদের দিকেই অগ্রসর হচ্ছিল। এ সময় রাজদরবারের কর্মকর্তারা একে একে আসতে শুরু করলেন। শেষ মুহূর্তে কোনো ঘোষণা ছাড়াই সম্রাট এসে হাযির হলেন। সভায় আগত সমবেত প্রতিনিধিরা উঠে দাঁড়ালেন এবং প্রথমবারের মত তারা সম্রাট কনস্টানটাইনের প্রতি সবিস্ময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। তিনি ছিলেন সম্রাট কনস্টানটাইন, বিজয়ী, মহান, শ্রেষ্ঠ। তার দীর্ঘ দেহ, সুগঠিত শরীর, প্রশস্ত কাঁধ এবং সুদর্শন মুখায়বর তার উচ্চ মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল। তার অভিব্যক্তি দেখে তাকে অবিকল রোমান সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর মতো মনে হচ্ছিল। বিশপদের অনেকেই তার ঝলমলে জমকালো রাজ পোশাক দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন। তার দীর্ঘ চুলে ঢাকা মাথায় ছিল মনিমুক্তা খচিত রাজমুকুট। তার উজ্জ্বল লাল রঙ্গের আলখাল্লা ছিল মূল্যবান পাথর ও সোনার কারুকাজ খচিত। তার পায়ে ছিল টকটকে লাল রঙের জুতা যা সেকালে শুধুমাত্র সম্রাটরাই পায়ে দিতেন এবং এ কালে শুধুমাত্র পোপই তা পরেন।

সম্রাটের দু’পাশে আসীন ছিলেন হোসিয়াস ও ইউসেবিয়াস। ইউসেবিয়াস সম্রাটের উদ্দেশ্যে বক্তৃতার মাধ্যমে সভার কার্যক্রম শুরু করলেন। সম্রাট সংক্ষিপ্ত ভাষণের মধ্যে দিয়ে তার জবাব দিলেন। তার ভাষণ ল্যাটিন থেকে গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করা হয় যা অল্প লোকেই বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি সম্রাট নিজেও তা তেমন বুঝতে পারেন নি। কারণ, গ্রীক ভাষায় তার জ্ঞান ছিল অতি সামান্য। সভার কাজ যতই অগ্রসর হতে থাকল, বিতর্কের তোরণদ্বার তত উন্মুক্ত হতে শুরু করল। কনস্টানটাইন তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গ্রীক জ্ঞান নিয়ে একটা বিষয়েই তার সকল শক্তি নিয়োজিত করলেন। তা হলো, একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছা। তিনি প্রত্যেককে জানিয়ে দিলেন যে, বিভিন্ন দলের কাছ থেকে কয়েকদিন আগে তিনি যত অভিযোগ আবেদন পেয়েছিলেন তার সবই তিনি পুড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আশ্বস্ত করলেন যে, যেহেতু তিনি সেগুলোর কোনোটিই পড়েন নি, যেহেতু তার মন খোলা রয়েছে এবং তিনি পক্ষপাতদুষ্ট নন।

পলীয় চার্চের প্রতিনিধিগণ ঈশ্বরের ৩টি অংশ প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা বাইবেল থেকে মাত্র দু’জনের পক্ষে যুক্তি পেশ করতে সক্ষম হন। তা সত্ত্বেও ‘পবিত্র আত্মা’ কে ঈশ্বরের তৃতীয় অংশ তথা তৃতীয় ঈশ্বর হিসেবে ঘোষণা করা হয় যদিও এ কল্পিত বিষয়ের সমর্থনে কোনো যুক্তি প্রদর্শন করা হয় নি। অন্যদিকে লুসিয়ানের শিষ্যরা তাদের ভিত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন এবং তারা ত্রিত্ববাদীদের একটি অসম্ভব অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যেতে বাধ্য করেন।

ত্রিত্ববাদীরা একজন খৃষ্টানের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে চাইছিল আরিয়াস ও অন্যান্য একত্ববাদী সমর্থকদের বাদ দিয়ে সে সংজ্ঞা নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে ত্রিত্ববাদ যাকে তারা দু’পক্ষের মধ্যে প্রধান বিতর্কিত বিষয় বলে গুরুত্ব আরোপ করেছিল, প্রকৃতপক্ষে কোনো গসপেলেই তার উল্লেখ ছিল না। তাদের বক্তব্য ছিল যে, তারা যাকে ‘পুত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি ঈশ্বরের পুত্র। আরিয়াস পন্থীরা তার জবাবে বলে যে, তারা সকলেই ‘ঈশ্বরের পুত্র’, কারণ বাইবেলে লেখা আছে যে, “সকল কিছুই ঈশ্বর থেকে।”২১ এ যুক্তি ব্যবহার করা হলে সকল সৃষ্টিরই ঈশ্বরত্ব প্রমাণিত হয়। পলীয় বিশপগণ তখন যুক্তি উত্থাপন করেন যে, যীশু শুধু ‘ঈশ্বর হতে’ নন, ‘ঈশ্বরের সত্ত্বা থেকেও।’ এ যুক্তি সকল সনাতনপন্থী খৃষ্টানের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তারা বলেন, বাইবেলে এ ধরনের কোনো কথাই নেই। এভাবে যীশুকে ঈশ্বর প্রতিপন্ন করার চেষ্টা খৃষ্টানদের ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের মধ্যে আরো বিভক্তি সৃষ্টি করে। বেপরোয়া হয়ে ত্রিত্ববাদীরা তখন যুক্তি প্রদর্শন করে যে, বাইবেলে বলা হয়েছে “যীশু হলেন পিতা ও সত্য ঈশ্বরের চিরন্তন ভাবমূর্তি।”২২ আরিয়াস পন্থীরা তার জবাবে বলেন, বাইবেলে একথাও বলা হয়েছে “আমরা মানবগণ ঈশ্বরের ভাবমূর্তি ও গৌরব।”২৩ যা হোক, এ যুক্তি যদি গৃহীত হয় তাহলে প্রমাণিত হয় শুধু যীশুই নয়, সকল মানুষই ঐশ্বরিক বলে দাবি করতে পারে।

সভাকক্ষেই শুধু নয়, রাজপ্রাসাদের মধ্যেও আলোচনা চলতে থাকে। সম্রাটের মাতা হেলেনা পলীয় চার্চকে সমর্থন করেন। তিনি ছিলেন রাজনীতি বিশারদ, তার রক্তে ছিল শাসক গোষ্ঠীর ধারা প্রবাহ মান। অন্যদিকে সম্রাটের বোন কনষ্টানটিনা ছিলেন একত্ববাদে বিশ্বাসী। তিনি আরিয়াসকে সমর্থন করতেন। তার মতে আরিয়াস যীশুর শিক্ষার অনুসারী ছিলেন। তিনি রাজনীতি ঘৃণা করতেন এবং ঈশ্বরকে ভালো বাসতেন ও ভয় করতেন। বিতর্ক রাজ দরবারেও ছড়িয়ে পড়ে। সভায় যার শুরু হয়েছিল তা রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় এবং তাতে রাজপুরুষ ও প্রাসাদের পাচকগণও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুকৌশলে সম্রাট দু’পক্ষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন এবং সবাইকে আঁচ-অনুমানের মধ্যে রাখেন। একজন পৌত্তলিক হিসেবে তিনি খৃষ্টানদের কোনো সম্প্রদায়েরই পক্ষে ছিলেন না। এটি ছিল তার পক্ষে এক জোরালো যুক্তি।

বিতর্ক চলতে থাকা অবস্থায় উভয় পক্ষের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, এ সভায় কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তা সত্ত্বেও তারা সম্রাটের সমর্থনের প্রত্যাশা করলেন যেহেতু পলীয় চার্চের জন্য সেটা ছিল শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপার। অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকাবাসীদের জন্য সম্রাটের সমর্থন লাভের অর্থ ছিল তাদের নিপীড়নের অবসান। কনস্টানটাইনের আনুকূল্য লাভের জন্য উপস্থিত সকল বিশপ ধর্মের কিছু পরিবর্তন সাধনে সম্মত হন। রাজকুমারী কনষ্টানটিনা ইউসেবিয়াসকে পরামর্শ দিলেন যে, সম্রাট একটি ঐক্যবদ্ধ চার্চ চান। কারণ খৃষ্টান সম্প্রদায়ের বিভক্তি সাম্রাজ্যকে বিপদগ্রস্ত করবে। কিন্তু যদি কোনো ঐকমত্য না হয় তাহলে তিনি ধৈর্য্য হারাবেন এবং খৃষ্টানদের প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করবেন। যদি তিনি সে পন্থাই গ্রহণ করেন তাহলে খৃষ্টানদের পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হবে এবং খৃষ্টান ধর্মও অধিকতর বিপন্ন হবে। ইউসেবিয়াসের পরামর্শক্রমে আরিয়াস ও তার অনুসারীরা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করলেন, তবে সভা যেসব পরিবর্তন সাধনের সিদ্ধান্ত নিল তা থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখলেন। যেহেতু সে সময় সাম্রাজ্যের সর্বত্র রোমান সূর্যদেবতার উপাসনা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং সম্রাটকে পৃথিবীতে দেবতার রূপ হিসেবে গণ্য করা হত, এ প্রেক্ষিতে পলীয় চার্চ:

রোমান সূর্য- দিবস (Sun-day)- কে খৃষ্টানদের সাপ্তাহিক ধর্মীয় দিবস ঘোষণা করল;

সূর্য-দেবতার প্রচলিত জন্ম দিবস ২৫ ডিসেম্বরকে যীশুর জন্ম দিবস হিসেবে গ্রহণ করল;

সূর্য-দেবতার প্রতীক আলোর ক্রুশকে (Cross of light) খৃষ্টবাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করল;

এবং সূর্য-দেবতার জন্ম দিবসের সকল উৎসব অনুষ্ঠানকে নিজেদের উৎসব অনুষ্ঠান হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিল।

খৃষ্টান ধর্ম এবং তার সাম্রাজ্যের ধর্মের মধ্যকার বিপুল ব্যবধান অত্যন্ত উল্লেখ যোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার এ ঘটনা সম্রাট কনস্টানটাইনের জন্য নিশ্চয় অত্যন্ত সন্তোষজনক মনে হয়েছিল। চার্চ তার ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে। ফলে চার্চের প্রতি তার সমর্থন আগে দুর্বল থাকলেও এখন তা অত্যন্ত জোরালো হয়ে ওঠে।

চূড়ান্তভাবে ত্রিত্ববাদ খৃষ্টানধর্মের মৌলিক মতবাদ হিসেবে গৃহীত হয়। এ পর্যায়ে সম্ভবত এই মতবাদের কিছু অনুসারীর তখনও সরাসরি একত্ববাদের অভিজ্ঞতা ও তার প্রতি সমর্থন বিদ্যমান ছিল। তাদের জন্য ত্রিত্ববাদ সেই পন্থার চেয়ে কম কিছু ছিল না যে পন্থায় তারা যা প্রত্যক্ষ করেছিল তা বর্ণনার চেষ্টা করত। যেহেতু যীশু যে এক ঈশ্বরের শিক্ষা দিয়েছিলেন তা তখন বিলুপ্ত হয়েছিল, তাই তারা শেষ পন্থা হিসেবে প­টোনিক দর্শনের পরিভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেছিল যদিও তা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। কার্যত এ-ই ছিল তাদের সব যা তারা জানত। যা হোক, এ বিষয়টি সামান্য কিছু লোকের কাছেই স্পষ্ট ছিল। এপুলিয়াস (Apuleius) লিখেছেন, “আমি নীরবে এই মহিমান্বিত ও প্লাটোনিক মতবাদ উপেক্ষা করেছিলাম। কারণ, সামান্য কিছু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিই এটা বুঝেছিলেন, অন্যদিকে প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছেই তা অজ্ঞাত ছিল।”২৪ ­প্লাটো বলেন, “স্রষ্টাকে খোঁজা কঠিন, কিন্তু নিম্নশ্রেণির লোকদের কাছে তা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।”২৫ পিথাগোরাস বলেন, “কু-সংস্কারাচ্ছন্ন মতের মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের কথা বলা নিরাপদ নয়। তাদের কাছে সত্য বা মিথ্যা বলা সমান বিপজ্জনক।”২৬

যারা এক ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন তাদের কারো কারো কাছে যদিও এ পরিভাষার ব্যবহার যৌক্তিক বলেই গণ্য ছিল, কিন্তু কার্যত এ প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন কোনো পন্থা ছিল না যাতে ‘দেবতাগণ’ এর গ্রীক ধারণা যীশুর কাছে প্রত্যাদেশকৃত ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বকে সফলভাবে খর্ব করতে পারে। এ ধরনের কোনো ঘটনা শুধুমাত্র পল ও তার অনুসারীদের পক্ষেই কল্পনা করা সম্ভব ছিল। যারা গ্রীক দর্শনের আদর্শ হৃদয়ংগম করতে পারে নি তাদের মধ্যে শুধু বিভ্রান্তিরই সৃষ্টি হয়েছিল। আসলে ত্রিত্ববাদের সংস্পর্শে যারা এসেছিল, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অবস্থাই ছিল এ রকম। তারা যে বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছিল তা নানা জল্পনা কল্পনার সৃষ্টি করেছিল। সভা নিজে থেকেই তাদের সুস্পষ্টভাবে এ পথে ঠেলে দিয়েছিল। এ মতবাদ কীভাবে উদ্ভূত এবং কেন তা গৃহীত হলো, কি করে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হলো, তা বোধগম্য। এটাও পরিষ্কার যে, এ মতবাদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির প্রেক্ষিতে আরিয়াস কেন পথ নির্দেশনার জন্য গ্রীক দার্শনিকদের চিন্তাধারার আশ্রয় নেয়ার বদলে খৃষ্টান ধর্মের উৎসের কাছে ফিরে যাবার ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। কারণ, গ্রীক দর্শন নবী যীশুর ওপর প্রত্যাদেশ থেকে উদ্ভূত ছিল না।

নিসিয়ার সভায় এ সব পরিবর্তন সংঘটিত হওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল যীশুর শিক্ষা থেকে সরে আসা। সেটাও সম্ভব হয়েছিল। আজ যা নিসীয় ধর্মমত (Nicene Creed) নামে পরিচিত তা সম্রাট কনস্টানটাইনের সমর্থনে সভায় উপস্থিতদের দ্বারা প্রণীত ও সত্যায়িত। এতে ত্রিত্ববাদীদের মতই স্থান পেয়েছিল এবং আরিয়াসের শিক্ষার সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে নিম্নোক্ত দৈব অভিশাপ সংযুক্ত করা হয়েছিল।

যারা বলে, “এক সময় তিনি ছিলেন না এবং জন্মের পূর্বে তিনি অস্তিত্বশীল ছিলেন না এবং তিনি কোনো কিছু থেকে অস্তিত্বশীল হন নি” অথবা যারা বলে যে, ঈশ্বরের পুত্র ভিন্ন সত্ত্বা বা উপাদান অথবা তিনি সৃষ্ট হয়েছেন অথবা পরিবর্তনের উপযোগী- তাদের জন্য ক্যাথলিক চার্চের অভিশাপ।

যারা এ ধর্মমতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাদের কেউ কেউ এতে বিশ্বাসী ছিলেন, কেউ কেউ জানতেন না যে, কি সে তারা তাদের নাম স্বাক্ষর করেছেন এবং কিছু ব্যক্তি, যারা সভার প্রতিনিধিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন, তারা ত্রিত্ববাদের সাথে একমত হতে পারেন নি, কিন্তু তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্রাটকে খুশি করার জন্য এতে স্বাক্ষর করেন। তাদের একজন বলেন, “একটু কালির বিনিময়ে প্রাণ রক্ষা মোটেই খারাপ নয়।” এ বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রফেসর গোয়াটকিন (Gwatkin) দুঃখ করে বলেছেন যে, একজন ঐতিহাসিকের জন্য এটি কোনো আনন্দদায়ক দৃশ্য ছিল না। হয়তো ঘটনা এ রকমই ছিল বলে প্রফেসর গোয়াটকিন একজন ঐতিহাসিক হিসেবে তা লেখেননি, তিনি পালন করেছেন একজন আইনজীবীর ভূমিকা যিনি একটি দুর্বল মামলা পরিচালনার জন্য গ্রহণ করেছেন।

এরাই ছিল সে সব লোক যারা একজন পৌত্তলিক সম্রাটের অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে, একজন গোঁড়া খৃষ্টানের পরীক্ষা কী হবে? এর ফল ত্রিত্ববাদীদের জন্য যেমন তেমনি আরিয়াসপন্থীদের জন্যও অত্যন্ত বিস্ময়কর হয়েছিল। ঘটনা কোনো দিকে মোড় নেবে তা কারোরই জানা ছিল না। সার্বজনীন পরীক্ষা গ্রহণের ধারণাটি ছিল এক বিপ্ল­বিক পরিবর্তন। কেউই তা পছন্দ করে নি। তদুপরি আরিয়াসবাদের সরাসরি নিন্দা ছিল এক মারাত্মক পদক্ষেপ। এমনকি যারা ধর্মমতের সত্যায়নে সম্মতি জ্ঞাপন করেছিল তারাও সন্দেহের সাথেই তা করেছিল। পবিত্র গ্রন্থে ছিল না এবং যীশু বা তার শিষ্যদের দ্বারা ব্যক্ত বা উল্লে­খিত নয়, এমন একটি শব্দের সমর্থনে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে তোড়জোড় করে যে সভার আয়োজন করা হয়েছিল বাস্তবে তা কিছু অর্জন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

একজন মাত্র ব্যক্তি জানতেন যে, তিনি কী করছেন। তিনি হলেন সম্রাট কনস্টানটাইন। তিনি জানতেন যে দৃঢ় বিশ্বাস নয়, ভোটের ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো একটি ধর্মমতকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হবে না। কোনো ব্যক্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু তাকে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত নাও করতে পারে। তিনি জানতেন কীভাবে ও কেন বিশপগণ ধর্মমতের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন। তিনি বিশপদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করেছেন এমন ধারণা সৃষ্টি না করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প ছিলেন। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সভার সিদ্ধান্তের প্রতি ঈশ্বরের সমর্থন ও অনুমোদন প্রমাণের জন্য ঈশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতার আশ্রয় নেওয়া হবে। সভার শুরুতে এনে জড়ো করা যীশুর শিক্ষার লিখিত বিবরণ গসপেলের বিশাল স্তূপ তখনও সভাকক্ষের মধ্যখানে রাখা ছিল। একটি সূত্র মতে, সেখানে সে সময়ে ২৭০টি গসপেল রাখা ছিল। অন্য একটি সূত্র মতে বিভিন্ন ধরনের গসপেলের সংখ্যা ছিল ৪০০০ এর মতো। যদি সেগুলোর সংখ্যা একেবারেই কমিয়ে ধরা হয় তাহলেও কোনো শিক্ষিত খৃষ্টানের জন্য সে সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। গসপেলে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন সব ধারণা সম্বলিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গসপেলের সাথে সরাসরি বিরোধমূলক একটি ধর্মীয় মতবাদ প্রণয়ন ও প্রচলন কিছু লোককে যেমন বিভ্রান্ত করেছিল অন্যদিকে গসপেলসমূহের বিদ্যমানতা অন্যদের জন্য খুবই অসুবিধাজনক ছিল।

এ প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সকল গসপেল সভাকক্ষে একটি টেবিলের নীচে রাখা হবে। তার পর সকলেই কক্ষ ত্যাগ করে এবং তা তালাবদ্ধ করা হয়। এখন যে গসপেলটি সঠিক সেটা যাতে টেবিলের ওপর চলে আসে তার জন্য সারারাত ধরে প্রার্থনা করার জন্য বিশপদের নির্দেশ দেওয়া হয়। সকাল বেলা দেখা গেল, আলেকজান্ডারের প্রতিনিধি এথানাসিয়াসের কাছে গ্রহণযোগ্য গসপেলটি টেবিলের ওপর স্থাপিত রয়েছে। এ ঘটনায় টেবিলের নীচে থাকা অন্যান্য সকল গসপেল পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সেই রাতে সভাকক্ষের তালার চাবি কার কাছে ছিল সে ব্যাপারে কিছু জানা যায় না।

এরপর অননুমোদিত গসপেল কাছে রাখা গুরুতর অপরাধে পরিণত হয়। এর পরিণতিতে পরবর্তী বছরগুলোতে ১০ লাখেরও বেশি খৃষ্টান নিহত হয়। এথানাসিয়াস যে কীভাবে খৃষ্টানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, এ থেকেই তা বুঝা যায়।

নিসিয়ির সভা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বিশপগণ তাদের পুরোনো বিরোধকে জাগিয়ে তুললেন যা তারা সম্রাট কর্তৃক আহূত হয়ে পরিত্যাগ করেছিলেন। লড়াই শুরু হয়, পুরোনো বিরোধ চলতেই থাকে। তারা যে নিসিয়ার সভায় ধর্মমতে স্বাক্ষর করেছেন, সে কথা বিস্মিত হলেন। আরিয়াসের সমর্থকরা নিসিয়ার ধর্মমতকে প্রকৃত খৃষ্টান ধর্মের সমর্থক বলে বিবেচনা করেন না, সে কথা গোপন করলেন না। একমাত্র এথানাসিয়াসই (Athanasius) সম্ভবত এ নয়া ধর্মমতের প্রতি অনুগত ছিলেন। কিন্তু তার সমর্থকদের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ বিরাজ করছিল। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে তা ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।

নিসিয়ার সভার ৩০ বছর পরও সাধু হিলারি (Saint Hillary) নিসীয় ধর্মমত সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন। তিনি লিখেছেন:

আমরা যাদের বিরোধী তাদের আমরা অভিশাপ দিচ্ছি। আমাদের মধ্যে অন্য কারো মতবাদ হোক অথবা অন্য কারো মধ্যে আমাদের মতবাদ হোক, আমরা তার নিন্দা করছি। এভাবে আমরা একে অপরকে ছিন্নভিন্ন করছি, আমরা অন্যের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি। নয়া বাইবেলের গ্রীক থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ বিশেষ করে পটোনিক দর্শনের গ্রীক শব্দগুলোর ক্ষেত্রে, যা চার্চ কর্তৃক পবিত্র উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, খৃষ্টান ধর্মের রহস্যগুলোকে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। পবিত্র গ্রন্থে মৌখিক ভুলগুলো ল্যাটিন ধর্মতত্বে মারাত্মক রকম ভ্রান্তি বা জটিলতার সৃষ্টি করবে।২৮

থ্রেসের (Thrace) একজন বিশপ সাবিনাস (Sabinus) নিসিয়ায় সমবেত হওয়া সকল বিশপকে অজ্ঞ, স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন বলে আখ্যায়িত করেন। সেখানে যে ধর্ম বিশ্বাসের ঘোষণা দেওয়া হয় তাকে তিনি মূর্খ ব্যক্তিদের কাজ বলে উল্লে­খ করে বলেন যে, এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। ঐতিহাসিক সক্রিটাস (Socritus) উভয় পক্ষকে রাতের অন্ধকারে একে অন্যের কথা বুঝতে না পেরে লড়াইরত সেনা দলের সাথে তুলনা করেছেন। ড. স্ট্যানলি লিখেছেন যে, এথানাসিয়াস বৃদ্ধ বয়সে ধর্মের আধুনিকায়নে যে আগ্রহ দেখিয়েছেন তা তিনি যদি তরুণ বয়সে প্রদর্শন করতেন তাহলে হয়তো ক্যাথলিক চার্চ বিভক্ত হত না, বহু রক্ত ক্ষয়ও হয়তো বা এড়ানো যেত। এভাবে নিসিয়ার সভা খৃষ্টান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যকার বিরাট ব্যবধান কমিয়ে আনার পরিবর্তে তা আরো বাড়িয়ে তোলে। তাদের মধ্যে তিক্ততার অবসান তো ঘটলই না, বরং তা বৃদ্ধি পেল। চার্চের ক্রোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সকল যুক্তি ও কারণ বাদ দিয়ে তা শক্তি প্রয়োগের পথ গ্রহণ করে। এর পরিণতিতে আরিয়াসদের প্রথম বড় ধরনের রক্তপাত শুরু হয়। এ পন্থায় পথ (Goths) ও লমবার্ডরা (Lombards) ‘ধর্মান্তরিত’ হয়। ক্রুসেড যুদ্ধের ফল হিসাবে আশঙ্কাজনকভাবে প্রাণহানি ঘটতে থাকে। ইউরোপে ত্রিশ বছর ধরে চলতে থাকা যুদ্ধে এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, শুধু ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপনই যথেষ্ট নয়, চার্চকেও মান্য করতে হবে। এই সংস্কার চলাকালে পরিস্থিতি ছিল এমনই যে লুথারের (Luther) কর্মকাণ্ড মোটেই যীশুর প্রকৃত শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে নয়, বরং তা নিছক এক ক্ষমতার লড়াই বলেই প্রমাণিত হয়।

৩২৫ খৃস্টাব্দে অব্যবহিত পরই যেসব ঘটনা ঘটেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল বিশপ আলেকজান্ডারের পরলোকগমন। তিনি ৩২৮ খৃস্টাব্দে মারা যান। আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ নির্বাচন নিয়ে গোলযোগ দেখা দেয়। আরিয়াসপন্থী ও মেলেটিয়ান পন্থীরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু এথানাসিয়াস বিশপ পড়ে প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত, নির্বাচিত ও অভিষিক্ত হন। তার নির্বাচন ছিল বিতর্কিত। যারা তার নির্বাচিত হওয়ার বিরোধিতা করেছিল তারা তার বিরুদ্ধে নিপীড়ন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এমনকি ভোজবাজি প্রদর্শনেরও অভিযোগ আনে।

এদিকে সম্রাট কনস্টানটাইনের দরবারে তার ঈশ্বরপ্রেমী বোন কনষ্টানটিনা খৃষ্টানদের হত্যাকান্ডের বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি যে আরিয়াসকেই সত্য খৃষ্টান ধর্মের প্রতিনিধি মনে করেন সে কথা কখনোই গোপন করার চেষ্টা করেন নি। তিনি নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াসের প্রতি সম্রাটের আচরণেরও বিরোধিতা করেন। কনস্টানটাইন তাকে নির্বাসন দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন পর কনস্টানটিনা সফল হন এবং ইউসেবিয়াসকে দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। এথানিয়াসের জন্য এটি ছিল এক মারাত্মক আঘাত। সম্রাট ধীরে ধীরে আরিয়াসের প্রতি ঝুঁকে পড়তে শুরু করেন। যখন তিনি শুনলেন যে, আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ পদে এথানাসিয়াসের নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তখনি তিনি নয়া বিশপকে রাজধানীতে তলব করেন। কিন্তু এথানাসিয়াস ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তিনি রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে গেলেন না। ৩৩৫ খৃস্টাব্দে কনস্টানটাইনের রাজত্বের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে টায়ার (Tyre) নগরীতে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এথানাসিয়াস তাতে যোগ দিতে বাধ্য হন। তার বিরুদ্ধে রাজকীয় স্বৈরাচারের অভিযোগ আনা হয়। পরিস্থিতি তার এমনই প্রতিকূল ছিল যে, তিনি সভার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই সভাস্থল ত্যাগ করেন। তার নিন্দা করা হয়। বিশপগণ জেরুজালেমে সমবেত হন এবং তার নিন্দার বিষয়ে নিশ্চিত হন। আরিয়াসকে চার্চে ফিরিয়ে আনা হয় এবং তিনি ধর্মীয় প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠানের অনুমতি লাভ করেন।

আরিয়াস ও তার বন্ধু ইউজোয়াসকে সম্রাট কনস্টান্টিনোপলে আমন্ত্রণ জানান। আরিয়াস ও সম্রাটের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হলো। এরপর বিশপগণ পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে এথানাসিয়াসের নিন্দা করেন। বেপরোয়া এথানাসিয়াস সিংহের গুহার মধ্যেই তার সম্মুখীন হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি কনস্টান্টিনোপলে চলে আসেন। সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাকে অনুমতি দেওয়া হলো। এ সময় নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে, নিসিয়ার সভার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক কারণে আরিয়াসের বিপক্ষে গেছে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, ধর্মীয় বিতর্ক সম্রাট কোনোভাবেই বুঝতে পারবেন না। সুতরাং সে পথে না গিয়ে তিনি রাজধানীতে শস্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টির জন্য এথানাসিয়াসকে অভিযুক্ত করলেন। এই অভিনব অভিযোগে এথানাসিয়াস বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েন। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তিনি যে খেলায় দক্ষ সে খেলা দক্ষতার সাথে খেলতে পারার মতো অন্য লোকও আছে। অভিযোগ সহজেই প্রমাণিত হয় এবং এথানাসিয়াসকে গল (Gaul) প্রদেশের ট্রায়ারে (Trier) প্রেরণ করা হয়। আরিয়াস কনস্টান্টিনোপলের বিশপ নিযুক্ত হন। কিন্তু এর কিছুদিন পরই ৩৩৬ খৃস্টাব্দে বিষ প্রয়োগের ফলে তিনি মারা যান। চার্চ একে অলৌকিক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করলেও সম্রাট তা হত্যাকান্ড বলে সন্দেহ করলেন। তিনি এ মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেন। রহস্যজনক পন্থায় তদন্ত কাজ চলে। এথানাসিয়াস এ হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী বলে প্রমাণিত হয়। ফলে আরিয়াসকে হত্যার জন্য এথানাসিয়াসকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আরিয়াসের মৃত্যুর ঘটনায় সম্রাট প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন। উপরন্তু বোনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি খৃষ্টানধর্ম গ্রহণ করেন। নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস তাকে দীক্ষিত করেন। এর মাত্র এক বছর পর ৩৩৭ খৃস্টাব্দে সম্রাট মারা যান। এভাবে যিনি তার রাজত্বের অধিকাংশ সময় একত্ববাদের সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন

চালিয়েছিলেন, তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার হাতে যারা নিহত হয়েছিল তাদেরই ধর্ম গ্রহণ করে মারা যান।

খৃষ্টধর্মের ইতিহাসে আরিয়াস এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কনস্টানটাইনের খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণের পিছনে তিনি যে বড় ভূমিকা পালন করেন শুধু তাই নয়, যারা যীশুর প্রদর্শিত সত্য পথ খোলাখুলি অনুসরণে সচেষ্ট ছিল তিনি তাদেরও প্রতিনিধি ছিলেন। যখন যীশুর শিক্ষা মারাত্মকভাবে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছিল, যখন প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত মানুষ হিসেবে যীশুর স্মৃতি ঝাপসা হয়ে উঠছিল, আরিয়াস তখন অটল পাহাড়ের দৃঢ়তা নিয়ে তার মোকাবেলা করেন এবং কোনো ঘটনাই তাকে তার ভূমিকা থেকে এক চুলও টলাতে পারে নি।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর মাত্র একজনই এবং এ বিশ্বাস ছিল খুবই সহজ-সরল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর কারো সৃষ্ট নন, তিনি চিরন্তন, তার কোনো শুরু নেই, তিনি সর্বোত্তম, তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি অপরিবর্তনীয়, তার কোনো বিকৃতি নেই এবং তার সত্ত্বা প্রতিটি সৃষ্ট প্রাণীর বর্হিমুখী দৃষ্টি থেকে এক চিরন্তন রহস্যের মধ্যে ঢাকা। তিনি ঈশ্বরের প্রতি মানবিকত্ব আরোপের যে কোনো ধারণার বিরোধী ছিলেন।

আরিয়াস সুষ্পষ্টভাবে যীশুর শিক্ষা অনুসরণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ঈশ্বরের পৃথক সত্ত্বা ও তার একত্বের সাথে সংগতিপূর্ণ প্রতিটি গুণের প্রকাশ তার মধ্যে ঘটুক, এটাই তিনি কায়মনোবাক্যে চাইতেন। কিন্তু বহু- ঈশ্বরের কোনো প্রকার ধারণার সাথে তিনি আপোশ করেন নি। আর এ কারণেই তিনি যীশুকে ঈশ্বর হিসেবে গ্রহণকারী যে কোনো মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য ছিলেন। যেহেতু ঈশ্বরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য যে, তিনি কারো দ্বারা কখনোই সৃষ্ট নন। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই কোনো ধারণায়ই ঈশ্বরের কোনো সন্তান থাকতে পারে না।

তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ঈশ্বরের ওপর যদি সন্তান জন্মদানের কার্য আরোপ করা হয় তাহলে তা তার একত্বকে ধ্বংস করে। এ ছাড়া তা ঈশ্বরের ওপর শারীরিক অস্তিত্ব ও আবেগও আরোপ করে যা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই আরোপযোগ্য। উপরন্তু তা ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তার কথাও বুঝায় যা তার নেই। সুতরাং কোনো অবস্থাতেই ঈশ্বরের ওপর জন্মদানের কার্য আরোপ করা সম্ভব নয়।

আরিয়াস আরো বলেন যে যেহেতু যীশু ছিলেন সীমাবদ্ধ সে কারণে তিনি ঈশ্বর নন, অন্যকিছু, কারণ ঈশ্বর চিরন্তন। এমন একটি সময় ছিল যখন যীশুর অস্তিত্ব ছিল না, যা থেকে পুনরায় প্রতীয়মান হয় যে, যীশু ঈশ্বর ছাড়া অন্যকিছু। যীশু ঈশ্বরের সত্ত্বা নন, তিনি ঈশ্বরের এক সৃষ্টি, অবশ্যই অন্যান্য সৃষ্ট মানুষের মতই, তবে নবী হওয়ার কারণে মানুষদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে অনন্য। ঐশ্বরিক সত্ত্বার অংশীদার তিনি নন, তিনি পরিচালিত হতেন ঐশী নির্দেশে। তিনি অবশ্যই অন্যান্য সৃষ্টির মত ঈশ্বরের করুণা ও সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, পক্ষান্তরে ঈশ্বর কোনো কিছুর ওপরই নির্ভরশীল নন। সকল মানুষের মত তারও ছিল স্বাধীন ইচ্ছা ও স্বভাব যা তাকে ঈশ্বরের কাছে সন্তোষজনক বা অসন্তোষজনক কর্ম সম্পাদনে ক্ষমতা দিয়েছিল। যদিও ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হন এমন কাজ করার ক্ষমতা যীশুর ছিল, কিন্তু তার নৈতিক শুদ্ধতাই তাকে সেরকম কিছু করা থেকে বিরত রেখেছিল।

আরিয়াসের ধর্ম বিশ্বাসের এই মৌলিক মতবাদগুলো এখন পর্যন্ত টিকে আছে এবং বহু একত্ববাদী খৃষ্টানের ধর্ম বিশ্বাসের তা মূল ভিত্তি।

৩৩৭ খৃস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইনের মৃত্যুর পর পর পরবর্তী সম্রাট কনষ্টানটিয়াসও আরিয়াসের ধর্মমত গ্রহণ করেছিলেন এবং একত্ববাদে বিশ্বাসই গোঁড়া খৃষ্টান ধর্ম হিসেবে সরকারীভাবে গৃহীত হওয়া অব্যাহত ছিল। ৩৪১ খৃস্টাব্দে এন্টিওকে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে একত্ববাদই খৃষ্টান ধর্মের প্রকৃত ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়। ৩৫১ খৃস্টাব্দে সিরমিয়ামে অনুষ্ঠিত আরেকটি সম্মেলনে তৎকালীন সম্রাটের উপস্থিতিতে পুনরায় পূর্বের সিদ্ধান্তকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। এভাবে আরিয়াস যে শিক্ষা ধারণ করেছিলেন তাই খৃষ্টান সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশগ্রহণ করে। সাধু জেরোম ৩৫৯ খৃস্টাব্দে লিখেছিলেন যে, “সারা বিশ্বই নিজেকে আরিয়াসের ধর্মমতের অনুসারী হিসেবে দেখতে পেয়ে বেদনার্ত ও বিস্মিত হয়েছিল।২৯ এর পরবর্তী বছরগুলোতে ত্রিত্ববাদীদের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ৩৮১ খৃস্টাব্দে কনস্টানটিনোপলে সম্রাটের সরকারী ধর্ম হিসেবে আরিয়াসের ধর্মমতের কথাই ঘোষণা করা হয়। যা হোক, পাশ্চাত্যে খৃষ্টধর্মের ভিত্তি হিসেবে ত্রিত্ববাদ ধীরে ধীরে গৃহীত হতে থাকে। বিভিন্ন ‘সভার’ বৈঠকের বিষয় ও গৃহীত ‘সরকারী’ প্রস্তাবমালা থেকে দেখা যায় যে পাশ্চাত্যের গোঁড়া খৃষ্টান সমাজ যীশুর শিক্ষা থেকে কতখানি দূরে সরে গিয়েছিল। যীশু নিজে কখনোই এ ধরনের সংস্থা গঠন করেন নি যা শাসকদের রাজ-দরবারগুলোতে সাধারণত দেখা যেত।

৩৮৭ খৃস্টাব্দে জেরোম তার বিখ্যাত ল্যাটিন বাইবেল (Vulgate Bible) অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেন। মূল হিব্রু থেকে গ্রীক ভাষায় যেসব ধর্মগ্রন্থ অনুদিত হয়েছিল, তারই কয়েকটির প্রথম ল্যাটিন অনুবাদ ছিল জেরোমের বাইবেল। এখন যা ওল্ড টেস্টামেন্ট বলে পরিচিত, সেটিও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যান্য ভাষায় যেসব বাইবেল অনুবাদ করা হয়, জেরোমের বাইবেল সেগুলোর ভিত্তি হিসেবে পরিণত হয়। এই বাইবেলেই রোমান ক্যাথলিক এবং পরে প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ কর্তৃক সরকারী ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গৃহীত হয়। আর যখন তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল তখন জেরোমের সংকলনে ছিল না এমন সকল গসপেল ও পবিত্র গ্রন্থ এ দু’টি চার্চ কর্তৃক আগে বা পরে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়। এভাবে প্রকৃত যীশুর সাথে সকল সংযোগ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়া অব্যাহত থাকে।

পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন পোপ অনারিয়াস (Honorius) মহানবী মুহাম্মাদ স. এর সমসাময়িক এ ব্যক্তিটি ইসলামের উত্থানের জোয়ার প্রত্যক্ষ করেন যার সাথে আরিয়াসের ধর্মমতের বিপুল সাদৃশ্য ছিল। খৃষ্টানদের পারস্পরিক হানাহানি তার মনে তখনও তরতাজা স্মৃতি হিসেবে জাগরূক চিল। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, ইসলাম সম্পর্কে তিনি যা শুনেছেন তা খৃষ্টানদের মধ্যকার বিভেদ দূর করার জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে। তিনি তার পত্রগুলোতে ত্রিত্ববাদের মধ্যে ‘এক মন’ (One mind)- এর মতবাদ সমর্থন করতে শুরু করেন। তিনি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। যুক্তির উপসংহারে তিনি এক ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন।

৪৫১ খৃস্টাব্দে চ্যালসিডনের সভা ঘোষণা করেছিল যে, খৃষ্টের স্বভাব অবিভাজ্য। এ সিদ্ধান্ত অনারিয়াসকে খৃষ্টের ‘এক মন’ সংক্রান্ত তার মতের ব্যাপারে উৎসাহিত করে তোলে। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, খৃষ্ট আদি পাপের অভিশাপ থেকে মুক্ত একজন মানুষের রূপ ধারণ করেছিলেন। এই মত অনুযায়ী খৃষ্টের একটি মানবিক ইচ্ছা ছিল। এভাবে পলীয় খৃষ্টানধর্মের মধ্যেই পরোক্ষভাবে এক ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসকে সমর্থন করা হয়। পলের উদ্ভাবিত ধর্মমত কতটা জেঁকে বসেছিল ও জন-মানসকে বিভ্রান্ত করেছিল, এ ধরনের বৈপরীত্য থেকে তার আভাস পাওয়া যায়। পোপ অনারিয়াস ৬৩৮ সনে পরলোকগমন করেন। একই বছর সম্রাট হেরাক্লিয়াস অনারিয়াসের ধর্মমতকে সরকারীভাবে গ্রহণ করেন এবং তিনি এক ফরমান জারি করেন এই বলে যে, “সম্রাটের সকল প্রজাকেই যীশুর এক মনের কথা স্বীকার করতে হবে।”৩০ ৬৩৮ খৃস্টাব্দে অনুষ্ঠিত কনস্টান্টিনোপলের যাজকসভায় অনারিয়াসের ধর্মমতকে “যীশুর শিষ্যদের প্রচারিত শিক্ষার সাথে প্রকৃত সংগতিপূর্ণ” আখ্যায়িত করে সমর্থন জানানো হয়।৩১ আরিয়াসের মতবাদ প্রায় অর্ধ শতক পর্যন্ত কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় নি। ৬৮০ খৃস্টাব্দে তার মৃত্যুর ৪২ বছর পর কনস্টান্টিনোপলে এক যাজক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে পোপ অনারিয়াসকে অভিশাপ দেওয়া হয় এ কারণে যে, তিনি “ধর্ম বিরোধী শিক্ষার আগুনকে শুরুতেই নির্বাপিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং অবহেলা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাকে আরো বিস্তার লাভ করতে দিয়েছেন” এবং তারপর “পবিত্র ধর্মকে কলঙ্কিত হতে দিয়েছেন।”৩২ চার্চের সমর্থনে একজন পোপকে তার উত্তরসূরি কর্তৃক নিন্দা করা পোপীয় ইতিহাসে এক অভিনব ঘটনা।

এরপর পলীয় চার্চ অথবা রোমান ক্যাথলিক চার্চ অনুসারীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি ও শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এর বড় কারণ ছিল রোমান সম্রাটদের সাথে চার্চের সম্পৃক্ততা। পোপ ও যাজকেরা শাসকদের সাথে যত বেশি হাত মেলালেন ততই চার্চ ও শাসকেরা অভিন্ন হয়ে উঠতে থাকল। অষ্টম শতাব্দীতে রোমন ক্যাথলিক চার্চ জেরুজালেম নয়, রোমকে সদর দফতর করে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রোম নগরীর ভিতরে ও বাইরে বিপুল পরিমাণ ভূমি ও সম্পদ চার্চের হস্তগত হয়। এ সম্পদ সম্রাট “কনস্টানটাইনের দান” হিসেবে পরিচিত ছিল।

রোমান ক্যাথলিক চার্চের মতের বিরোধিতা করা বিপজ্জনক ছিল। কারণ চার্চের নিজস্ব ক্ষমতার পাশাপাশি ছিল সেনা বাহিনীর সমর্থন। ৩২৫ সনের পর ক্যাথলিক চার্চের ধর্মমত গ্রহণ না করা ১০ লাখেরও বেশি খৃষ্টানকে হত্যা করা হয়। কার্যত এই ছিল এক অন্ধকার যুগ বা কালো অধ্যায়। এ সময় প্রকাশ্যে একত্ববাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশের সাহস ইউরোপে খুব কম লোকেরই ছিল।

ক্যাথলিক চার্চ যখন ধর্মীয় ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণকারীদের “ধর্ম বিরোধী” আখ্যা দিয়ে তাদের নির্মূল করতে ব্যস্ত ছিল, ততদিনে মুসলিমরা খৃষ্টান জগতে তাদের পরিচিতি বিস্তার করতে শুরু করেছিল। উত্তর আফ্রিকার প্রায় সকল যীশু অনুসারীই ইসলামকে তাদের প্রভূর তরফ থেকে পুনঃবার্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল যা সরাসরি তাদের ধর্মকে অনুসরণ ও অতিক্রম করে গিয়েছিল। তারা ইসলাম গ্রহণ করল। ফলে শুধু ইউরোপেই খৃষ্টান ধর্ম বহাল রইল।

ভ্যাটিকানের নেতৃবৃন্দ অবশ্যই ইসলাম এবং আরিয়াসের প্রচারিত একত্ববাদের মধ্যে সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছিলেন। উভয়েই বিশ্বাসী ছিল এক স্রষ্টায়- ইসলামের ভাষায় এক আল্লাহ এবং আরিয়াসের ভাষায় এক ঈশ্বরে। উভয়ের কাছেই যীশু ছিলেন একজন নবী। আরিয়াসের ভাষায় যিনি যীশু ইসলামের ভাষায় তিনি ঈসা আলাইহিস সালাম উভয়ের কাছেই তিনি ছিলেন একজন মানুষ। ইসলাম ও আরিয়াস উভয়েই মেরীকে কুমারী বলেছে এবং যীশুর পবিত্রতায় উভয়েই বিশ্বাসী। উভয় ধর্মেই পবিত্র আত্মাকে গ্রহণ করা হয়েছে। উভয়েই যীশুর ওপর ঈশ্বরত্ব আরোপকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আরিয়াসের প্রতি যে ঘৃণা পলীয় চার্চ পোষণ করছিল এখন তার লক্ষ্য হলো মুসলিমরা। এদিক থেকে দেখলে চার্চের ইতিহাসে ক্রুসেডগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না, বরং পলীয় চার্চ ক্রুসেডকে আরিয়াসপন্থীদের গণহত্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে।

এ সময়কালে চার্চ তার অভ্যন্তরে যে কোনো বিরোধিতাই হোক না কেন, উপেক্ষা করত না। চার্চের প্রতিষ্ঠিত মতবাদ থেকে যে কোনো ধরনের বিচ্যুতি বা ভিন্নমত তদন্ত করে দেখা ও তা নির্মূলের জন্য ‘তদন্ত ও জেরা’ নামে একটি সংস্থা (Inquisition) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সংস্থা কর্তৃক কত লোককে যে হত্যা করা হয়েছিল তার প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না। তবে নিশ্চিতভাবে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের শিকার হয়ে নির্মূল হয়েছিল।

সংস্কারের (Reformation) ঘটনাবলি এবং পাশাপাশি প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের প্রতিষ্ঠার কারণে ত্রিত্ববাদ আরো দৃঢ় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যদিও “কনস্টানটাইনের দান” শীর্ষক দলিলের বৈধতা নিয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট ও রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা ছিল। কিছু পণ্ডিত এ দলীলটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেন এবং এটি জাল ছিল বলে দেখতে পান। তখন থেকে ভ্যাটিকান এ দলিল সম্পর্কে দম্ভোক্তি বন্ধ করে। প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে বিখ্যাত ৩০ বছরের যুদ্ধ (Thirty Year War) থেকে প্রমাণিত হয় যে, যীশুর প্রকৃত শিক্ষার প্রতিষ্ঠা করা এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। আরিয়াসের অনুসারীগণ ও পরে মুসলিমদের প্রতি পলীয় চার্চের আগ্রাসী নীতি থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, চার্চ যা চেয়েছিল তা হলো ক্ষমতা। এই তিনটি ঘটনার সবকটিতেই চার্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার নিজের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা রাখার জন্যই লড়াই করেছে, যীশুর শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে নয়।

ইসলামের বিস্তার অব্যাহত থাকার প্রেক্ষিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য থেকে মুসলিমদেরকে আক্রমণের এক মহা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এ পরিকল্পনায় তারা ভারতের একজন কিংবদন্তির খৃষ্টান রাজার বাহিনীর সাথে যোগ দেওয়ার এবং তার সাহায্যে সারা বিশ্ব জয় করার আশা করেছিল। ভারতে পৌঁছার প্রচেষ্টায় কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন এবং ভাস্কোডাগামা ভারতে যাওয়ার নতুন পথ খুঁজে পান। এ দু’টি আবিষ্কারই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়। খৃষ্টানরা ভারতের কিংবদন্তির রাজাকে আবিষ্কার করে নি বা তারা ইসলামকেও নির্মূল করতে পারে নি। কিন্তু তারা বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল এবং ফলশ্রুতিতে তাদের নেতৃবৃন্দ ও বণিকরা অত্যন্ত সম্পদশালী হয়ে ওঠে।

রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট চার্চের প্রচণ্ড ক্ষমতা সত্ত্বেও তারা একত্ববাদে বিশ্বাসকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়েছে। একে আরিয়াসবাদ অথবা সোকিয়ানবাদ (Sociamsim) অথবা একত্ববাদ (Unitariansim) যাই বলা হোকনা কেন, খৃষ্টানদের সকল দমন- নিপীড়নের মধ্যেও আজ পর্যন্ত টিকে আছে। পরবর্তী অধ্যায়ে বর্ণিত স্পষ্টভাষী একত্ববাদীদের সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচিতি থেকে তার প্রমাণ মিলবে।