মূল:ঈসা মসীহ: ইসলামের এক নবী

চার্চের বিকৃতির এক ঐতিহাসিক আলেখ্য

মুহাম্মাদ আতাউর- রহীম

অনুবাদ: হোসেন মাহমুদ

সম্পাদনা: আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান

ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্বের সর্বত্র আদিম লোকদের প্রাণী ও মূর্তিপূজার ঘটনা সকল ক্ষেত্রেই ছিল মূল একত্ববাদী বিশ্বাস থেকে এক পশ্চাদপসারণ এবং ইয়াহূদী, খৃষ্টান ও দীন ইসলামের একত্ববাদ বহু ঈশ্বরবাদ থেকে উদ্ভূত হওয়ার পরিবর্তে তার বিরোধী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যে কোনো ধর্মেই তার বিশুদ্ধ রূপটি পরিদৃষ্ট হয় তার প্রথমাবস্থায় এবং পরবর্তীতে শুধু তার অবনতিই চোখে পড়ে। আর এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই খৃষ্টধর্মের ইতিহাসকে দেখতে হবে। একত্ববাদে বিশ্বাস নিয়ে এ ধর্মের শুরু হয়েছিল, তারপর তা বিকৃতির শিকার হয়ে পড়ে এবং ত্রি-ঈশ্বরবাদ বা ত্রিত্ববাদ গৃহীত হয়। এর পরিণতিতে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি ও সংশয় যা মানুষকে অধিক থেকে অধিকতর মাত্রায় মূল অবস্থা থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

ঈসা আলাইহিস সালামেরর অন্তর্ধানের পর প্রথম শতাব্দীতে তার অনুসারীরা একত্ববাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে। এর সত্যতা মেলে ৯০ সনের দিকে রচিত ‘দি শেফার্ড অফ হারমাস’ (The Shepherd of Hermas) নামক গ্রন্থটিকে ধর্মীয় পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা প্রদানের ঘটনায়। এ গ্রন্থের ১২টি ঐশী নির্দেশের প্রথমটি শুরু হয়েছে এভাবে:

সর্বপ্রথম বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ (God) এক এবং তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও সেগুলোকে সংগঠিত করেছেন। তার ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং তিনি সবকিছু ধারণ করেন, কিন্তু তিনি নিজে অ-ধারণযোগ্য……।

থিওডোর যায়ন (Theodor Zahn)-এর মতে ২৫০ সন অবধি খৃষ্টধর্মে বিশ্বাসের ভাষা ছিল এ রকম: “আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহে বিশ্বাস করি।” ১৮০ থেকে ২১০ সনের মধ্যে ‘সর্বশক্তিমান’ -এর পূর্বে ‘পিতা’ শব্দটি যুক্ত হয়। বেশ কিছু সংখ্যক চার্চ-নেতা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। এ পদক্ষেপের নিন্দাকীদের মধ্যে বিশপ ভিক্টর (Bishop Victor) ও বিশপ জেফিসিয়াসের (Bishop Zephysius) নামও রয়েছে। কারণ, তারা বাইবেলে কোনো শব্দ সংযোজন বা বিয়োজনকে অচিন্তনীয় অপবিত্রতা বলে গণ্য করতেন। তারা যীশুকে ঈশ্বরের (God) মর্যাদা প্রদানের প্রবণতারও বিরোধী ছিলেন। তারা যীশুর মূল শিক্ষানুযায়ী একত্ববাদের প্রতি অত্যন্ত জোর দেন এবং বলেন যে, যদিও তিনি একজন নবী ছিলেন, তিনি অবশ্যই অন্য দশজন মানুষের মতই একজন মানুষ ছিলেন, যদিও তিনি ছিলেন তার প্রভূর অত্যন্ত অনুগ্রহ ধন্য। উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় গড়ে উঠা বহু চার্চ এই বিশ্বাসের ধারক ছিল।

ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা ক্রমশ বিস্তার লাভের পাশাপাশি তা একদিকে যেমন অন্যান্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের সাথে তার বিরোধ শুরু হয়। এ সময় খৃষ্টধর্ম এসব সংস্কৃতিগুলো কর্তৃক অঙ্গীভূত ও গৃহীত হতে শুরু করে এবং এর ফলে শাসকদের নির্যাতন-নিপীড়নও হ্রাস পায়। বিশেষ করে গ্রীসে প্রথমবারের মত একটি নয়া ভাষায় ব্যক্ত হওয়া এবং এ সংস্কৃতির ধারণা ও দর্শনের সাথে অঙ্গীভূত হওয়া- এ উভয় পন্থায় খৃষ্টধর্মের রূপান্তর ঘটে। গ্রীকদের বহু-ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বিশেষ করে টারসাসের পলের (Paul of Tarsus) মত কিছু ব্যক্তির ঈসা আলাইহিস সালামকে নবী থেকে ঈশ্বরে উন্নীত করার পর্যায় ক্রমিক প্রয়াস ত্রিত্ববাদ (Trinity) সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করে।

৩২৫ সনে ত্রিত্ববাদকে গোঁড়া (Orthodox) খৃষ্টানদের ধর্ম বিশ্বাস বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ ঘোষণায় স্বাক্ষর দানকারীদের মধ্যে কিছু লোক এতে বিশ্বাস স্থাপন করেন নি। কারণ, তারা বাইবেলে এর কোনো ভিত্তি দেখতে পান নি। এই ঘোষণার জনক বলে যাকে বিবেচনা করা হয় সেই এথানাসিয়াসও (Athanasius) নিজে এর সত্যতা সম্পর্কে ততটা নিশ্চিত ছিলেন না। তিনি স্বীকার করেন যে, “যখনই তিনি তার উপলব্ধিকে যীশুর ঈশ্বরত্বের ব্যাপারে জোর করে নিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, তখন তা কষ্টকর ও ব্যর্থ চেষ্টায় পর্যবসিত হয়েছে।” অধিকন্তু তিনি লিখে গেছেন চিন্তা প্রকাশে তার অক্ষমতার কথা। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি লিখে গেছেন, “তিনজন নয়, ঈশ্বর একজনই।” ত্রিত্ববাদে তার বিশ্বাসের পিছনে কোনো দৃঢ় ভিত্তি ছিল না, বরং তা ছিল কৌশল ও আপাত প্রয়োজনীয়তার কারণে।

রাজনৈতিক সুবিধা ও দর্শনের ভুল যুক্তির ভিত্তিতে প্রদত্ত এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন রোমের পৌত্তলিক সম্রাট কনস্টানটাইন (Constantine) যিনি কাউন্সিল অব নিসিয়ার (Council of Nicea) সভাপতিত্ব করেছিলেন। ক্রমবর্ধমান খৃষ্টান সম্প্রদায় ছিল একটি শক্তি যাদের বিরোধিতা তার কাম্য ছিল না। তারা তার সাম্রাজ্য দুর্বল করে দিয়েছিল। সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করতে তাদের সমর্থন তার কাছে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। তাই, খৃষ্টান ধর্মকে নতুন রূপ দিয়ে তিনি চার্চের সমর্থন পাওয়ার আশা করেছিলেন এবং একই সাথে তিনি খৃষ্টধর্ম ও চার্চের মধ্যে সৃষ্ট বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন যেহেতু এটা ছিল তার সম্রাজ্যের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের অন্যতম কারণ।

যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি আংশিকভাবে তার লক্ষ্য হাসিল করতে সমর্থ হয়েছিলেন তা অন্য একটি ঘটনার দৃষ্টান্ত থেকে সুস্পষ্ট হতে পারে। এ ঘটনাটি ঘটেছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) সময়।

একবার মুসলিমদের ঈদ উৎসবের কাছাকাছি সময়ে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিতব্য ঈদের সালাত বিষয়ে টোকিও থেকে জোর প্রচারণা চালানো শুরু হয়। সিঙ্গাপুর তখন জাপানিদের দখলে। এটা হবে এক ঐতিহাসিক ঘটনা- ঘোষণা করল টোকিও। বলল এর প্রভাব সারা মুসলিম বিশ্বে অনুভূত হবে। ঈদের সালাত নিয়ে জাপানিদের এ হঠাৎ মাতামাতি কয়েকদিন পরেই আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন পর একটি খণ্ডযুদ্ধে একজন জাপানি সৈন্য বন্দী হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই উন্মোচিত হয় সব রহস্য। জাপানি সৈন্যটি জানায় যে, জাপান সরকারের প্রধান জেনারেল তোজো আধুনিক কালের একজন শ্রেষ্ঠ মুসলিম সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আধুনিক কালের চাহিদার সাথে ইসলামের শিক্ষার সমন্বয় সাধনের একটি কর্মসূচী ছিল তার। তার মতে, এ কর্মসূচীতে মুসলিমদের সালাতের সময় মক্কার পরিবর্তে টোকিওর দিকে মুখ ফেরানো শুরু করার পরিকল্পনা ছিল যা কিনা তোজোর নেতৃত্বে ইসলামের ভবিষ্যৎ কেন্দ্র হতো। সৈনিকটি জানায়, মুসলিমরা ইসলামের এই প্রাচ্য-কারণের অভিসন্ধি প্রত্যাখ্যান করায় পুরো পরিকল্পনাটিই বাতিল হয়ে যায়। যা হোক, এ ঘটনার পর সে বছর সিঙ্গাপুরে ঈদের সালাত পড়ার অনুমতি দেওয়া হয় নি। তোজো ইসলামের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং তিনি সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা হাসিলের পন্থা হিসেবে ইসলামকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এতে সফল হন নি। কনস্টান্টাইন সফল হয়েছিলেন, ব্যর্থ হয়েছিলেন তোজো। জেরুজালেমের বদলে রোম পল-অনুসারী খৃষ্টানদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

ঈসা আলাইহিস সালামের আসল শিক্ষার এই বিকৃতির অনিবার্য ফল হয়েছিল ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ, কিন্তু তা কখনোই বিনা প্রতিবাদে হয় নি। ৩২৫ সনে যখন সরকারীভাবে বহু ঈশ্বরবাদকে ‘অর্থোডক্স’ খৃষ্টানদের ধর্ম রীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয় তখন উত্তর আফ্রিকার খৃষ্টানদের এক নেতা আরিয়াস (Arius) সম্রাট কনস্টানটাইন ও ক্যাথলিক চার্চের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে দন্ডায়মান হন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ঈসা আলাইহিস সালাম সর্বদাই স্রষ্টার একত্বের কথা ব্যক্ত করেছেন। কনস্টানটাইন তার সর্বশক্তি ও বর্বরতা দিয়ে একত্ববাদের অনুসারীদের নির্মূল করার চেষ্টা চালান। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। পরিহাসের বিষয় যে, কনস্টানটাইন নিজে একজন একত্ববাদে বিশ্বাসী হিসেবে মৃত্যুবরণ করলেও ত্রিত্ববাদ শেষ পর্যন্ত ইউরোপে খৃষ্টীয় মতবাদের ভিত্তি হিসেবে সর কারীভাবে গৃহীত হয়। এই মত মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তাদের অনেককেই বলা হয়েছিল যে, বোঝার কোনো চেষ্টা না করেই এতে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ী বুদ্ধির সাহায্যে নয়া ধর্মমতকে বিচার ও ব্যাখ্যার চেষ্টা করে যা বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। সাধারণভাবে বলতে গেলে, এ সময় তিনটি চিন্তাধারার জন্ম হয়। প্রথমটির প্রবক্তা ছিলেন সেন্ট আগাষ্টাইন (St. Augustine) তিনি চতুর্থ শতাব্দীর লোক ছিলেন। তার অভিমত ছিল যে, ধর্মমতের সত্যতা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু তার ব্যাখ্যা করা যায়। দ্বিতীয় চিন্তাধারার প্রবক্তা ছিলেন সেন্ট ভিকটর (St. Victor)। তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর লোক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ধর্মকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত ও বিশদভাবে ব্যক্ত- উভয়ই করা যায়। তৃতীয় ধারাটির জন্ম হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। এরা বলতেন, ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা বা সত্যতা প্রমাণের অবকাশ নেই, বরং তা অন্ধভাবে গ্রহণ ও বিশ্বাস করতে হবে।

যদিও শেষোক্ত এ মতবাদের তীব্র বিরোধিতা পরিহারের লক্ষে যীশুর শিক্ষাদান সংবলিত গ্রন্থসমূহ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস, লুকিয়ে ফেলা নতুবা পরিবর্তন করা হয়। তারপরও যে গ্রন্থগুলো টিকে ছিল সেগুলোতে যথেষ্ট সত্য অবশিষ্ট ছিল। তাই ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ধর্মগ্রন্থের ভাষ্যের চেয়ে চার্চের নেতাদের ভাষ্যের ওপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ঘোষণা করা হয় যে, “ব্রাইড অব জেসাস” (Bride of Jesus) বা চার্চের জন্য প্রদত্ত বিশেষ প্রত্যাদেশই হলো এ মতবাদের ভিত্তি। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পোপ একটি পত্রে ফ্রা ফুলজেনশিওকে (Fra Fulgention) ভৎর্সনা করে লিখেছিলেন যে, “ধর্মগ্রন্থসমূহের প্রচার একটি সন্দেহজনক বিষয়। যে ব্যক্তি ধর্মগ্রন্থসমূহের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখবে সে ব্যক্তি ক্যাথলিক ধর্মকে ধ্বংস করবে।” পরবর্তী পত্রে তিনি ধর্মগ্রন্থসমূহের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে লিখেছেন- …এ গুলো এমনই গ্রন্থ যে কেউ যদি তা আঁকড়ে ধরে তবে সে ক্যাথলিক চার্চকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করবে।”

ঈসা আলাইহিস সালামেরর শিক্ষাকে কার্যকরভাবে পরিত্যাগের জন্য তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অস্পষ্টতা বিপুলভাবে দায়ী। চার্চ ধর্মকে শুধু ধর্মগ্রন্থ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে নি, ঈসা আলাইহিস সালামকে কল্পিত এক যীশুর সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। আসলে ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, পুনরুজ্জীবিত খৃষ্টে বিশ্বাস করতে হবে। যেখানে ঈসা আলাইহিস সালামের প্রত্যক্ষ অনুসারীরা তার আদর্শের ভিত্তিতে তাদের জীবন গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে পল অনুসারী খৃষ্টানদের আদর্শ ছিল যীশুর কথিত ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরবর্তী জীবন। সেই কারণে ঈসা আলাইহিস সালামের জীবন ও শিক্ষা তাদের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা থেকে চার্চ যত বেশি দূরে যেতে থাকে, চার্চের নেতারা তত বেশি জাগতিক স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়ে জড়িয়ে পড়তে থাকে। ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা এবং চার্চ কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধান অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে ও একটির মধ্যে অপরটি

মিশে যেতে শুরু করে। চার্চ রাষ্ট্র থেকে যতই নিজের পার্থক্যের ওপর জোর দিতে থাকে, ততই ক্রমশ অধিকতরভাবে রাষ্ট্রের সাথে জড়িয়ে যায় এবং একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রথমদিকে চার্চ রাজকীয় শক্তির অধীনে ছিল। কিন্তু যখন তা সম্পূর্ণরূপে আপোষ করে ফেলে তখন পরিস্থিতি উল্টে যায়। ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা ও এই পথভ্রষ্টতার মধ্যে বিরোধিতা সবসময়ই ছিল। চার্চ যতই অধিক মাত্রায় ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে ততই ত্রিত্ববাদে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের জন্য পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি এ জন্য মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া শরু হয়। যদিও লুথার রোমার চার্চ পরিত্যাগ করেন, তার বিদ্রোহ ছিল শুধু পোপের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে, রোমান ক্যাথলিক চার্চের মৌলিক ধর্মমতের বিরুদ্ধে নয়। এর ফল হলো এই যে, তিনি একটি নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তার প্রধান হলেন। খৃষ্ট ধর্মমতের সকল মৌলিক বিষয়ই তাতে গৃহীত ও বহাল রয়ে গেল। এর ফলে বেশ কিছু সংখ্যক সংস্কারকৃত চার্চ ও গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা ঘটে, কিন্তু সংস্কার পূর্ববতী খৃষ্টধর্ম পূর্বাবস্থায়ই রয়ে যায়। পলীয় চার্চের এ দু’টি প্রধান শাখা এখন পর্যন্ত টিকে রয়েছে।

উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আরিয়াসের শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। পরে সেখানে ইসলামের আগমন ঘটলে তারা সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করে। কারণ, তারা একত্ববাদী মতবাদের এবং ঈসা আলাইহিস সালামের প্রকৃত শিক্ষার অনুসারী ছিল। তাই তারা ইসলামকে সত্য ধর্ম হিসেবে স্বীকার করে নেয়।

ইউরোপে খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে একত্ববাদের সূতাটি কখনো ছিন্ন হয় নি। কার্যত এ আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং অতীত ও বর্তমানে স্থাপিত চার্চের অব্যাহত নির্মম নির্যাতন সত্ত্বেও তার অবসান হয় নি।

আজকের দিনে ক্রমশই বেশি সংখ্যক লোক এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছে যে, ঈসা আলাইহিস সালামের মূল শিক্ষার সাথে বর্তমান খৃষ্টান ধর্মের ‘রহস্যে’ বিশ্বাস স্থাপনের অবকাশ নেই বললেই চলে। বরং প্রমাণিত সত্য এই যে, ইতিহাসের ঈসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে চার্চের খৃষ্টের কোনো সম্পর্ক নেই। চার্চের যীশু খৃষ্টানদের সত্যের পথে কোনো সাহায্য করতে পারেন না। খৃষ্টানদের এই বর্তমান উভয় সংকট এ শতকের চার্চ ঐতিহাসিকদের লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। এডলফ হারনাক (Adlof Harnac) যে মৌলিক অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন তা এই যে, “চতুর্থ শতক নাগাদ গসপেল গ্রীক দর্শনের মুখোশে আবৃত হয়। এই মুখোশ খুলে ফেলা এবং মুখোশের নিচে খৃষ্টধর্মের প্রকৃত সত্যের সাথে তার পার্থক্য প্রকাশের দায়িত্ব ছিল ঐতিহাসিকদের।” তবে হারনাক এই দায়িত্ব পালনের অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে যে দীর্ঘকাল ধরে জেঁকে বসা ধর্মমতের মুখোশ উন্মোচন ধর্মের রূপকেই পাল্টে দিতে পারত:

এ মুখোশ তার নিজস্ব জীবনী শক্তি অর্জন করেছিল। ত্রিত্ববাদ, খৃষ্টের দ্বৈত সত্ত্বা, অভ্রান্ততা এবং এ সব মতবাদের সমর্থনসূচক প্রস্তাবাদি ছিল ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতির সৃষ্টি যা সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল তা সত্ত্বেও আগের বা পরের এই সৃষ্ট পরিবর্তিত শক্তি, এই মতবাদ, প্রাথমিক অবস্থার মতই বজায় ছিল, এ বুদ্ধিবাদিতা ছিল এক বদভ্যাস যা তিনি যখন ইয়াহূদীদের কাছ থেকে পালিয়ে আসেন সে সময় খৃষ্টানরা গ্রীকদের কাছ থেকে লাভ করেছিল।

হারনাক তার অন্য একটি গ্রন্থে এ বিষয়টি বিশদ আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন:

…৪র্থ গসপেল (Gospel) ধর্ম প্রচারক জন থেকে উদ্ভূত নয় বা উদ্ভূত হওয়ার কথা বলে না। কারণ, ধর্ম প্রচারক জন ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে গণ্য হতে পারেন না…. চতুর্থ গসপেলের লেখক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন, ঘটনাবলীর পরিবর্তন ঘটিয়েছেন এবং সেগুলোকে অচেনা আলোয় আলোকিত করেছেন। তিনি নিজেই আলোচনা পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন এবং কাল্পনিক পরিস্থিতিতে মহৎ চিন্তাগুলো সন্নিবেশ করেছেন।

হারনাক পুনরায় বিখ্যাত খৃষ্টান ঐতিহাসিক ডেভিড ষ্ট্রস (David Strauss) এর গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। স্ট্রসকে তিনি শুধু চতুর্থ নয়, প্রথম তিনটি গসপেলের ঐতিহাসিক সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংসের জন্যও দায়ী করেছেন।

অন্য ঐতিহাসিক জোহানেস লেহমানের (Johannes Lehmann) মতে ৪টি গৃহীত গসপেলের লেখকরা ভিন্ন এক যীশুর বর্ণনা করেছেন যিনি ঐতিহাসিক বাস্তবতার দ্বারা পরিচিত ঈসা আলাইহিস সালাম নন। এর পরিণতি বা ফলাফল যিনি উল্লেখ করেছেন সেই হেইঞ্জ জাহরনট (Heinz Zahrnt)- কে উদ্বৃত করে লেহমান বলেন,

ঐতিহাসিক গবেষণা যদি প্রমাণ করতে পারে যে, ইতিহাসের ঈসা আলাইহিস সালাম ও প্রচারিত যীশুর মধ্যে মীমাংসার অযোগ্য পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে এবং যীশুতে বিশ্বাস স্থাপনের মত সমর্থন স্বয়ং ঈসা আলাইহিস সালামের মধ্যেই নেই, তাহলে সেটা তাত্ত্বিকভাবে শুধু মারাত্মক ভুলই হবে না, বরং এন. এ. জাহল (N.A. Jahl) যেমনটি বলেন, তার অর্থ দাঁড়াবে খৃষ্টীয় ধর্ম-দর্শনের অবসান। তবুও আমার বিশ্বাস, আমরা ধর্মতত্ত্ববিদরা এ থেকে নিষ্কৃতির পথ বের করতে পারব, কোনো সময়ই আমরা যা পারি নি; তবে আমরা হয় এখন মিথ্যাচার করছি, নয় তখন করব। উপরোক্ত ক্ষুদ্র কয়েকটি উদ্ধৃতি থেকে একদিকে আজকের খৃষ্টধর্মের উভয় সংকট যেমন প্রকাশিত হয় অন্যদিকে জাহরন্ট-এর বক্তব্যও অনেক বেশি গুরুতর কিছুর আভাস দেয়। সেটা এই যে, ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা, চার্চের ভূমিকা ও তার অনুসারীদের বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তার শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য উপেক্ষিত অথবা বিলুপ্ত হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে থিওডোর যায়ন চার্চের মধ্যকার তিক্ত বিরোধের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন যে, রোমান ক্যাথলিক চার্চ গ্রীক অর্থোডক্স চার্চকে ভালো ও মন্দ উদ্দেশ্য সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে পবিত্র গ্রন্থ পুনর্বিন্যাসের জন্য অভিযুক্ত করে। অন্যদিকে গ্রীকদের পালটা অভিযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন স্থানের ক্যাথলিকরা নিজেরাই মূল বাইবেল থেকে দূরে সরে গেছে। তবে তাদের এই বিভেদ সত্ত্বেও তারা উভয়ে মিলে যেসব খৃষ্টান গির্জার অনুসারী নয় তাদের সত্যপথ থেকে বিচ্যুত বলে অভিহিত এবং তাদের

ঈশ্বরদ্রোহী বলে নিন্দা করে। অন্যদিকে ঈশ্বরদ্রোহী বলে আখ্যায়িত খৃষ্টানরা পাল্টা জবাবে ক্যাথলিকদের সত্যের জালিয়াতি করার জন্য অভিযুক্ত করে। যায়ন বলেন, প্রকৃত ঘটনা থেকে এসব অভিযোগের সত্যতা কি প্রমাণিত হয় না?

ঈসা আলাইহিস সালাম স্বয়ং সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত। যারা ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে সচেতন এবং সর্বান্তঃকরণে তার মূল আদর্শে প্রত্যাবর্তন করে জীবন অতিবাহিত করতে চায়, তারা তা করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ ঈসা আলাইহিস সালামের প্রকৃত শিক্ষা ও আদর্শ আজ সম্পূর্ণরূপে অন্তর্হিত হয়েছে এবং তার পুনরুদ্ধারও সম্ভব নয়।

এরাসমাস (Erasmus) এর বক্তব্য হলো:

ঐশী বিষয় সমূহে প্রাচীনদের জ্ঞান ছিল সামান্যই। ধর্ম আগে বাহ্যিক আচরণ নয়, অন্তরের বিষয় ছিল। ধর্ম যখন অন্তরের বদলে লিখিত রূপে এল, তখন তা প্রায় সর্বাংশে যত মানুষ তত ধর্মমতের রূপ গ্রহণ করল। খৃষ্টের ধর্মমত, যা প্রথমে কোনো প্রভেদ জানত না, তা দর্শনের সাহায্য- নির্ভর হয়ে পড়ল। চার্চের পতনের এটাই ছিল প্রথম পর্যায়।

এভাবে চার্চ বাধ্য হলো কথায় কি প্রকাশ করা যাবে না তা ব্যাখ্যা করতে। উভয় পক্ষই সম্রাটের সমর্থন আদায় করতে কৌশল গ্রহণ করে। এরাসমাস বলেন,

এ ব্যাপারে সম্রাটের কর্তৃত্বের প্রয়োগ ধর্মের প্রকৃত কোনো সাহায্যে আসে নি…… যখন ধর্ম অন্তরের উপলব্ধি না হয়ে মুখের বুলিতে পরিণত হয়েছে, তখন পবিত্র বাইবেলের প্রকৃত শিক্ষা বিলুপ্ত হয়েছে। তারপরও আমরা মানুষকে তারা যা বিশ্বাস করে না তা বিশ্বাস করার জন্য, তারা যা ভালো বাসে না তা তাকে ভালো বাসার জন্য, তারা যা জানে না তা জানার জন্য তাদের বাধ্য করছি। যাতে বল প্রয়োগ করা হয় তা আন্তরিক হতে পারে না।

এরাসমাস বলেন, ঈসা আলাইহিস সালামের প্রত্যক্ষ অনুসারীরা একত্ববাদকে স্বীকার করেছিলেন যা কখনোই তাদের ব্যাখ্যা করতে হয় নি। কিন্তু যখন ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ল এবং চার্চের মধ্যে বিরোধ দেখা দিল, তখন জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাদের তত্ত্বজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হন। এর পর তারা যীশুর শিক্ষা সামগ্রিকভাবে হারিয়ে ফেলেন, তার সাথে সাথে একত্ববাদও হারিয়ে যায়। তাদের একমাত্র আশ্রয় ছিল কিছু শব্দ ও গ্রীক দর্শনের পরিভাষা যার দৃষ্টি ছিল একত্ববাদ নয়, ত্রিত্ববাদের প্রতি। এভাবে বাস্তবতার প্রতি সহজ ও বিশুদ্ধ আস্থা এমন একটি ভাষায় স্থাপিত হলো যা ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে ছিল অপরিচিত এবং তা ঈসা আলাইহিস সালাম ও পবিত্র আত্মাকে উপেক্ষা করে জন্ম দেয় ত্রিত্ববাদের। একত্ববাদে বিশ্বাস হারানোর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মানুষের মধ্যে দেখা দিল বিভ্রান্তি ও বিভেদ।

যারা জানতে চান যে, যীশু কে ছিলেন এবং আসলে তিনি কী শিক্ষা দান করেছিলেন তা জানার জন্য এ উপলব্ধিটি যে কোনো ব্যক্তির জন্যই অত্যাবশ্যক। সে সাথে এ কথাও জানা প্রয়োজন যে, মানুষ ত্রিত্ববাদেই বিশ্বাস করুক অথবা মুখে একত্ববাদের কথাই বলুক, তাদের কাছে যদি একজন নবীর দৈনন্দিন কার্যাবলী (যা তার শিক্ষার মূর্ত প্রতীক) সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কোনো উপায় না থাকে তখন তারা ক্ষতিগ্রস্তই হয়।