কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের।। সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:  ﴿فَأَمَّا ٱلَّذِينَ شَقُواْ فَفِي ٱلنَّارِ ١٠٨﴾ “অতঃপর যারা হয়েছে দুর্ভাগা, তারা থাকবে আগুনে।”

  প্রশ্ন: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿فَأَمَّا ٱلَّذِينَ شَقُواْ فَفِي ٱلنَّارِ لَهُمۡ فِيهَا زَفِيرٞ وَشَهِيقٌ ١٠٦ خَٰلِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ ٱلسَّمَٰوَٰتُ وَٱلۡأَرۡضُ إِلَّا مَا شَآءَ رَبُّكَۚ إِنَّ رَبَّكَ فَعَّالٞ لِّمَا يُرِيدُ ١٠٧ ۞وَأَمَّا ٱلَّذِينَ سُعِدُواْ فَفِي ٱلۡجَنَّةِ خَٰلِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ ٱلسَّمَٰوَٰتُ وَٱلۡأَرۡضُ إِلَّا مَا شَآءَ رَبُّكَۖ عَطَآءً غَيۡرَ مَجۡذُوذٖ ١٠٨﴾ [هود: ١٠٦،  ١٠٨] “অতঃপর যারা হয়েছে দুর্ভাগা, তারা থাকবে আগুনে। সেখানে থাকবে তাদের চীৎকার ও আর্তনাদ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে, যতদিন পর্যন্ত আসমানসমূহ ও জমিন থাকবে[1], অবশ্য তোমার রব যা চান[2]। নিশ্চয় তোমার রব তা-ই করে যা তিনি ইচ্ছা করেন। আর যারা ভাগ্যবান হয়েছে, তারা জান্নাতে থাকবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে যতদিন পর্যন্ত আসমানসমূহ ও জমিন থাকবে, অবশ্য তোমার রব যা চান,[3] অব্যাহত প্রতিদানস্বরূপ।” [সূরা আল-হুদ, আয়াত: ১০৬, ১০৮ ] এর ব্যাখ্যা কি? এ আয়াত থেকে কি এ কথা বুঝা যায় যে, যখন কোন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে আল্লাহ চাইলে সে জান্নাত থেকে বের হবে? নাকি কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা আয়াত দু’টি রহিত? কারণ, আয়াত দু’টি মক্কায় অবতীর্ণ।

উত্তর: আয়াত দু’টি রহিত নয় বরং আয়াত দু’টি মুহকাম—স্পষ্ট। তবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী—﴿إِلَّا مَا شَآءَ رَبُّكَ﴾  “অবশ্য তোমার রব যা চান” —এর অর্থ কি? এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। যদিও তারা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, জান্নাতের নি‘আমত স্থায়ী তা কখনো বন্ধ ও শেষ হবে না এবং জান্নাতীরা জান্নাত থেকে কখনো বের হবে না। জান্নাত থেকে বের হওয়া বিষয়ে কতক মানুষের ধারণাকে দূরীভূত করার জন্য আল্লাহ বলেন,  ﴿عَطَآءً غَيۡرَ مَجۡذُوذٖ﴾ “অব্যাহত প্রতিদানস্বরূপ।” তার জান্নাতে চিরস্থায়ী হবেন—কখনোই বের হবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٍ ٤٥ ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَٰمٍ ءَامِنِينَ ٤٦﴾ [الحجر: ٤٥،  ٤٦] “নিশ্চয় মুত্তাকীগণ থাকবে জান্নাত ও ঝর্ণাধারাসমূহে।‘তোমরা তাতে প্রবেশ কর শান্তিতে, নিরাপদ হয়ে’।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৪৬, ৪৫] অর্থাৎ মৃত্যু থেকে নিরাপদ, জান্নাত থেকে বের হওয়ার বিষয়ে নিরাপদ এবং অসুস্থতা থেকে নিরাপদ। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা এর পর বলেন, ﴿وَنَزَعۡنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنۡ غِلٍّ إِخۡوَٰنًا عَلَىٰ سُرُرٖ مُّتَقَٰبِلِينَ ٤٧ لَا يَمَسُّهُمۡ فِيهَا نَصَبٞ وَمَا هُم مِّنۡهَا بِمُخۡرَجِينَ ٤٨﴾ [الحجر: ٤٧،  ٤٨]  “আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ বের করে ফেলব, তারা সেখানে ভাই ভাই হয়ে আসনে মুখোমুখি বসবে। সেখানে তাদেরকে ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না। তারা তাতে চিরস্থায়ী, তারা বের হবেন না এবং তাতে তারা মৃত্যু বরণ করবে না।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৪৭, ৪৮] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  ﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٖ ٥١ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٖ ٥٢ يَلۡبَسُونَ مِن سُندُسٖ وَإِسۡتَبۡرَقٖ مُّتَقَٰبِلِينَ ٥٣ كَذَٰلِكَ وَزَوَّجۡنَٰهُم بِحُورٍ عِينٖ ٥٤ يَدۡعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَٰكِهَةٍ ءَامِنِينَ ٥٥ لَا يَذُوقُونَ فِيهَا ٱلۡمَوۡتَ إِلَّا ٱلۡمَوۡتَةَ ٱلۡأُولَىٰۖ وَوَقَىٰهُمۡ عَذَابَ ٱلۡجَحِيمِ ٥٦ فَضۡلٗا مِّن رَّبِّكَۚ ذَٰلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ٥٧﴾ [الدخان: ٥١،  ٥٧]  “নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, বাগ-বাগিচা ও ঝর্নাধারার মধ্যে, তারা পরিধান করবে পাতলা ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং বসবে মুখোমুখী হয়ে। এরূপই ঘটবে, আর আমি তাদেরকে বিয়ে দেব ডাগর নয়না হূরদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্তচিত্তে সকল প্রকারের ফলমূল আনতে বলবে। তোমার রবের অনুগ্রহস্বরূপ, এটাই তো মহা সাফল্য।” [সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ৫১, ৫৭] প্রথম মৃত্যুর পর সেখানে তারা আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন। আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দেন যে, জান্নাতীরা নিরাপদ স্থানে থাকবে— তাদের কোন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে না, তাদের ক্ষয় হবে না এবং তারা পরিপূর্ণ নিরাপদ। তাদের মৃত্যু বরণ করা, রোগী হওয়া এবং জান্নাত থেকে বের হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। তারা কখনোই মৃত্যু বরণ করবে না।

আল্লাহর বাণী:  ﴿إِلَّا مَا شَآءَ رَبُّكَ﴾“অবশ্য তোমার রব যা চান” এর ব্যাখ্যায় কোন কোন আলেম বলেন, এ আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাত নয় এ আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য কবরের অবস্থান। কবর যদিও জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান কিন্তু তা পুরোপুরি জান্নাত নয় জান্নাতের অংশ। মু‘মিন ব্যক্তি যখন কবরে অবস্থান করবে তখন তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের সু-বাতাস, সু-ঘ্রাণ ও নি‘আমতসমূহে তার কবরে আসতে থাকবে। তারপর তাকে সাত আসমানের উপরে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ আসল জান্নাতে স্থানান্তর করা হবে।

কেউ কেউ বলেন এ  ﴿إِلَّا مَا شَآءَ رَبُّكَ﴾“অবশ্য তোমার রব যা চান” আয়াতটির দ্বারা কবর থেকে পুনরুত্থানের পর কিয়ামতের মাঠে হিসাব ও বিচারের জন্য অবস্থানের সময়কে বুঝানো হয়েছে। কারণ, তারপর মানুষকে জান্নাতে স্থানান্তর করানো হবে।

আবার কেউ কেউ বলেন, সামগ্রিকভাবে তাদের কবরের অবস্থান, হাশরের মাঠের অবস্থান এবং পুলসিরাতের উপর দিয়ে তাদের অতিক্রম করার সময় স্থায়ী নয় এবং তারা এ সময়টিতে জান্নাতে নয়। তবে তাদেরকে এ থেকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে।

এ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, এখান অবস্থান দ্বারা উদ্দেশ্য স্পষ্ট। তাতে কোন সন্দেহ, সংশয় ও অবকাশ নেই। জান্নাতীরা জান্নাতে চিরকাল থাকবে তাতে তাদের কোন মৃত্যু হবে না, অসুস্থ হবে না, বের হবে না, মহিলাদের হায়েয-নিফাস হবে না, দুশ্চিন্তা থাকবে না। তারা স্থায়ী ও উত্তম নে‘আমতসমূহে অবস্থান করবে। অনুরূপভাবে জাহান্নামীরা জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে তা থেকে তারা কখনোই বের হবে না। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিষয়ে বলেন, . ﴿ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَهُمۡ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقۡضَىٰ عَلَيۡهِمۡ فَيَمُوتُواْ وَلَا يُخَفَّفُ عَنۡهُم مِّنۡ عَذَابِهَاۚ كَذَٰلِكَ نَجۡزِي كُلَّ كَفُورٖ ٣٦ ﴾ [فاطر: ٣٦] “আর যারা কুফরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোন ফয়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে, এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৬] এ বিষয়ে আল্লাহ  তা‘আলার বাণী একাধিক।

তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:  ﴿إِلَّا مَا شَآءَ رَبُّكَ﴾“অবশ্য তোমার রব যা চান” এর অর্থ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ হলো যখন তারা কবরে অবস্থান করবে আবার কেউ কেউ বলেন, হাশরের মাঠ। তারপর তাদের জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে এবং তাতে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। যেমন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা সূরা বাকারায় বলেন, ﴿َذَٰلِكَ يُرِيهِمُ ٱللَّهُ أَعۡمَٰلَهُمۡ حَسَرَٰتٍ عَلَيۡهِمۡۖ وَمَا هُم بِخَٰرِجِينَ مِنَ ٱلنَّارِ ١٦٧﴾ [البقرة: ١٦٧] “এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। আর তারা আগুন থেকে বের হতে পারবে না” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৭] এবং সূরা আল-মায়েদাতে বলেন, ﴿يُرِيدُونَ أَن يَخۡرُجُواْ مِنَ ٱلنَّارِ وَمَا هُم بِخَٰرِجِينَ مِنۡهَاۖ وَلَهُمۡ عَذَابٞ مُّقِيمٞ ٣٧﴾ [المائ‍دة: ٣٧] “তারা চাইবে আগুন থেকে বের হতে, কিন্তু তারা সেখান থেকে বের হবার নয় এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৩৭] এ বিষয়ে আরো বহু আয়াত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলাই তাওফীক দাতা।

শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

[1] ‘যতদিন পর্যন্ত আসমানসমূহ ও জমিন থাকবে’- এ কথা দ্বারা আরবী ভাষায় চিরস্থায়ীত্বের উদাহরণ দেয়া হয়ে থাকে।

[2] অর্থাৎ শাস্তিভোগ শেষে জাহান্নাম থেকে যে গুনাহগার মুমিনদেরকে তিনি বের করে জান্নাতে নিতে চান তাদের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

[3] অর্থাৎ আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দিতে পারেন। তবে তিনি তা করবেন না। কেননা তিনি নিজেই তাদের স্থায়ীত্বের ঘোষণা দিয়েছেন।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন