মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২ । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

সকালবেলার ক্যাম্পাস অন্যরকম সৌন্দর্যে ভরে ওঠে৷ দোয়েল চত্বরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া ফুলগাছটির মগডাল দেখলে প্রথমেই আগুনের গোলা ভেবে যে-কেউ ভুল করতে পারে। মন্টু দার দোকানের পেছনে এঁকেবেঁকে উঠে যাওয়া অর্কিডের গাছ আর রাস্তার দুপাশে সেনাপতির মতো দাঁড়িয়ে থাকা বকুল, সবমিলিয়ে ক্যাম্পাসটি যেন পৃথিবীর বুকেই এক টুকরো স্বর্গ।

সকালে বুক ভরে মুক্ত বাতাস গ্রহণের তাগিদে এই তল্লাটে অনেকের আগমন ঘটে থাকে। পিজি হাসপাতালের রোগী থেকে শুরু করে বিজি বিজনেসম্যান, পড়ুয়া ছাত্র থেকে শুরু করে পড়ানোশিক্ষক—সকালবেলা সবাই খুব ফুরফুরে মন নিয়ে এদিকটায় হেঁটে যায়।।

আজ রবিবার। আমার আর সাজিদ, দুজনের একজনেরও ক্লাস নেই। এদিনটায় আমরা সাধারণত আড্ডা দিয়ে থাকি। খুব ভোরবেলায় সাজিদ রুম থেকে বের হয়েছে। এখনো ফেরার নামগন্ধ নেই। চোখ কচলাতে কচলাতে গতরাতে করা অ্যাসাইনমেন্টের ওপরে ফাইনাল রিভিশন দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পাশের যে রুমে পার্থরা থাকে, সেখান থেকে জোর ভলিউমে রবীন্দ্রনাথের গান ভেসে আসছে।

খেয়াল করলাম বাইরে থেকে গানের আওয়াজ ছাড়াও কিছু কর্কশ চিৎকার আর আওয়াজের শব্দ ভেসে আসছে। কাছাকাছি কোনোজায়গা থেকেই যে এই শব্দ আসছে সেটি নিশ্চিত। অ্যাসাইনমেন্ট পেপার ভাঁজ করে টেবিলে রেখে গায়ে শাল

জড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ফাগুনের এ সময়টায় ভোরবেলা মৃদুমন্দ শীত পড়ে। এই শীতে গায়ে শাল জড়ানোর দরকার পড়ে না অবশ্য; কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে লুকোনোজ্বর আর সর্দিতে কাহিল হয়ে ওঠা শরীর এই শীতকেও প্রচণ্ড রকম ভয় পাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে গায়ে শাল তোলা। যাই হোক, রুম থেকে বেরিয়ে দূর থেকে আসা চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ লক্ষ্য করে এগোতে থাকলাম। দেখতে পেলাম, পূর্বপাশে অবস্থিত থার্ড বিল্ডিংটার নিচে ছোটখাটো একটি জটলা হয়ে গেছে। ওই বিল্ডিংয়ের সবাইকেই চিনি না আমি। কোনোএকটি ব্যাপার নিয়ে তারা বেশ তর্কাতর্কি আর হট্টগোল শুরু করেছে বুঝতে পারছি।

আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম জটলাটার দিকে। খুব কাছে না গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে এসে দাঁড়ালাম। কোনোএকটি জায়গায় যখন সব মানুষ একসাথে কথা বলে, তখন সম্ভবত কেউই কারও কথা শুনতে পায় না। শুনতে না পেলেও মানুষগুলো অনর্গল কথা বলেই যায়। বলে আনন্দ পায়। তারা ভাবে, তাদের কথা অন্যরা খুব আগ্রহভরে শুনছে। এরকম দূরত্বে থেকে আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না আসলে ঘটনা কী।

মধ্যবয়স্ক গোছের একজন লোককে এগিয়ে আসতে দেখে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আঙ্কেল, একটু কথা বলা যাবে? ভদ্রলোক বেশ বিরক্ত হলেন বলে মনে হলো। বিরক্তি কোনোরকমে চেপে রেখে। বললেন, ‘কী কথা?’

‘এখানে কী নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে?

‘গিয়া দেখলেই তো পারেন। আমারে জিগান ক্যা?’

লোকটার ত্বরিত উত্তর শুনে আমার মনের ভেতরে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা সব আশার প্রদীপ যেন ধপ করেই নিভে গেল। আমার ওপরে অকারণ চটে বসার কোনোযৌক্তিক কারণ আমি খুঁজে পেলাম না। আমি বেশ ফ্যাকাশেমুখ করে বললাম, ‘ধন্যবাদ।

আমার ধন্যবাদ পেয়েও তার চেহারার মধ্যে খুব বেশি পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। সম্ভবত তিনি ধরে নিয়েছেন, এই ‘ধন্যবাদ দিয়ে আমি তাকে কোনোভাবে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছি। আমার পাতা ফাঁদে পা দেবেন না এই বিশ্বাস নিয়ে তিনি যে-গতিতে হেঁটে এসেছিলেন, ঠিক সেই গতিতে হেঁটে চলে গেলেন।

কিন্তু আমিও কোনোভাবেই দমে যাওয়ার পাত্র নই। এই রহস্যের সমাধান না করে তো থামছি না। ধীরে ধীরে জটলার দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছে এসে দেখতে পেলাম এখানে এলাহি কাণ্ড! লোকজনের কথাবার্তা শুনে যা বোঝা গেল তা হলো, এই বিল্ডিংয়ের কেউ কেউ রোজ রাতে মদ খেয়ে মাতলামি শুরু করে। মাতলামির পর্যায় এমন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছায় যে, বিল্ডিংয়ের অন্যান্য লোকজন এই ব্যাপারটি নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তারা নাকি দফায় দফায় ওয়ার্নিং দিয়েও এই মাতালদের দমাতে পারেননি। আজ সকালবেলাতেও নাকি এই মাতালের দলের চিৎকার-চেঁচামেচির জন্যে ফজরের সালাত পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল কারও কারও। ধার্মিকশ্রেণির লোকেরা এই মাতালদের একটি বিহিত করার জন্যেই এখানে একত্র হয়েছে। ওদিকে মাতাল না হয়েও মাতালদের দলে যোগ দিয়েছে আরও কিছু লোক। তাদের দাবি হচ্ছে, কে মদ খাবে আর কে খাবে না এটি ব্যক্তির একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। মদ খেলে মাতলামি করবে, এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে ধার্মিক লোকগুলোর এত জ্বালাপোড়া হবে কেন?

এরকম কথা বলা লোকগুলো বোধ করি নাস্তিক হয়ে থাকতে পারে। তারা ডিফেন্ড করছে মাতালগুলোকে। ধার্মিক আস্তিকগুলো এত যুক্তিতর্ক শুনতে নারাজ। তারা চায়, হয় এরা মদখাওয়া ছাড়বে, না-হয় বিল্ডিং ছাড়বে।

এই তর্ক এরকম স্রেফ সাধারণ তর্কে স্থির থাকলে একটি কথা ছিল; কিন্তু এটি আর কোনোসাধারণ তর্কে থেমে নেই। এই তর্ক রীতিমতো ‘থিওললাজিক্যাল ডিবেট’ তথা ধর্মকেন্দ্রিক তর্কাতর্কিতে রূপ নিয়েছে। নাস্তিককুলের দাবি হলো, কুরআনে নাকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জান্নাতে পুরস্কার হিশেবে মদ খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে মদখাওয়া ব্যাপারটাকে খারাপভাবে দেখা হবে কেন—এটাই এক নাস্তিকের প্রশ্ন।

এক আস্তিক বেশ জোরালো গলায় বলল, ‘কখনোই নয়। কুরআনে এরকম কোনোকথা থাকতেই পারে না।’

আস্তিকটার কথা শুনে হা-হা-হা করে খেকিয়ে হেসে উঠল এক নাস্তিক। বলল, ‘বোকা ধার্মিক। কুরআনে কী আছে সেটাও ভালোমতো জানে না। যাও, আগে নিজের ধর্মগ্রন্থ পড়ো গিয়ে।

এভাবেই পাল্টা তর্কবিতর্ক চলছে। এরকম সিচুয়েশান গুলোতে সাজিদ থাকলে আমার বেশ মজা লাগে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে কীভাবে দাবার খুঁটি উল্টে দিতে হয় সেটি সাজিদ খুব ভালো করেই জানে। এরকম অবস্থায় সে প্রথমে একবার গলা খাঁকারি দেবে। সামনে যদি কোনোপানির গ্লাস থাকে, সে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি পেটে ভরে বলবে, শুনি তো আপনাদের প্রশ্ন।

হঠাৎ আমার কাঁধে কারও হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি আমার পেছনে সাজিদ দাঁড়িয়ে আছে। লেব্বাবাহ! তার কথা ভাবতে-না-ভাবতেই হাজির! এত দ্রুত আলাদিনের জাদুর চেরাগে থাকা জিনটাও হাজির হতে পারে কি না সন্দেহ আছে। সাজিদ কিছু বলার আগেই প্রশ্ন করলাম, ‘তুই এখানে? ‘রুমেই ফিরছিলাম। হট্টগোলের শব্দ শুনে এদিকটায় এসে দেখি তুই দাঁড়িয়ে আছিস। কী সমস্যা হয়েছে এখানে?

মনে মনে আমি যে তাকেই খুঁজছিলাম সেটি আর খোলাসা করিনি। হট্টগোলের ব্যাপারটি পুরোটাই খুলে বললাম। সবটুকু শুনে সে বলল, “ও আচ্ছা। তার ও আচ্ছা’ বলার ধরন দেখে মনে হলো যেন সে এরকম ঘটনা চারপাশে অহরহ দেখছে। এরকম ঘটনা দেখতে দেখতেই যেন সে ঘুম থেকে জাগছে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। তার এরকম গা-ছাড়া ভাব দেখলে রীতিমতো আমার পিত্তি জ্বলে যায়।

ধীর পায়ে হেঁটে সাজিদ জটলার মধ্যে মিশে গেল। তাকে অনুসরণ করে আমিও এগিয়ে গেলাম। এখনো বিতর্ক শেষ হয়নি। আস্তিক লোকটিকে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠতে দেখা গেল। সাজিদ তার কাছে গিয়ে বলল, “ভাই, একটু থামুন। এভাবে উত্তেজিত হলে তো চলবে না। সমস্যার সমাধান করতে হলে সবার আগে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।”

আমি তো মনে মনে “ইয়া নাফসি’ জপ শুরু করেছি। না জানি সাজিদের দার্শনিকসুলভ আলাপ শুনে লোকটি সাজিদকে আবার নাস্তিক ভাবা শুরু করে।

কিন্তু না। সে-রকম হয়নি। সাজিদের কথা শুনে আস্তিক লোকটার গলার আওয়াজ ছোট হয়ে এলো। সাজিদ আরেকবার পুরো ঘটনাটি শুনে নিল বিতর্ককারীদের কাছ থেকে। প্রথম দিকে ঝগড়ার টপিক ছিল মদ পান করে এই বিল্ডিংয়ে হট্টগোল করা যাবে কি যাবে না; কিন্তু এখন ঝগড়ার মূল টপিক এসে দাঁড়িয়েছে জান্নাতে পুরস্কার হিশেবে কুরআন মদের কথা বলছে কি না…।

সাজিদ নাস্তিক লোকটার দিকে ফিরল। এত ঝগড়ার মধ্যেও টাকওয়ালা লোকটিকে এখনো বেশ সতেজ এবং স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। সম্ভবত আস্তিক লোকটিকে রাগিয়ে দিতে পেরে এই লোক বেশ মজা পেয়েছে।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন