মূল: আরজ আলী সমীপে । লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

জীবাশ্ম হল, একটি বিলুপ্ত প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ দেহ বা তার অংশবিশেষ, যা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত থেকে যায় । এসব জীবাশ্ম থেকে কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া বা অতীতে থাকা বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে আমরা জানতে পারি ।এখন বিবর্তনবাদীদের তত্ত্ব অনুসারে, প্রাণীর বিবর্তন ঘটেছে অত্যন্ত ধীরগতিতে । যেমনঃ একটা মাছের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আসতে আসতে সেটা একসময় ভিন্ন আরেকটা প্রজাতির প্রাণীতে বিবর্তিত হয়েছে । এখন যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রকৃতিতে এরকম অসংখ্য মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা যার অর্ধেক মাছ, অর্ধেক অন্য প্রজাতির । রূপকথার গল্পের মৎস্যকন্যার কথা মনে আছে ? সেই মৎস্যকন্যাকে একটা উৎকৃষ্ট মিসিং লিঙ্ক হিসেবে কল্পনা করা যায় ।

[উল্লেখ্য, কিছু কিছু বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, মাছ থেকেই মানুষের বিবর্তন ঘটেছে । যদি তাই হয়, তাহলে মৎস্যকন্যার মতো মিসিং লিঙ্ক থাকা আবশ্যক । যদি মাছ থেকে মানুষ বিবর্তিত হয়, তাহলে তো আর এক লাফে মানুষ মাছ থেকে বিবর্তিত হয়ে যায় নি । বরং, মাছে ধিরে ধিরে মানুষের মত পা গজিয়েছে, হাত গজিয়েছে । এরপর মানুষের মতো চোখ, নাক, কান….. এভাবেই সে একটা সময় পরে গিয়ে মানুষ হয়েছে । ঘটনা যদি এটাই হয়, তাহলে এই সময়ের কোন এক পর্যায়ে সেই মাছের মানুষের মতো মাথা আর মাছের মত লেজ থাকা স্বাভাবিক । সে দৃষ্টিকোণ থেকে মৎস্যকন্যা কোন রূপকথার চরিত্র নয়, বরং বৈজ্ঞানিক চরিত্র বটে ]

এখন বিবর্তনবাদতত্ত্বকে যদি প্রমাণ করতেই হয়, তাহলে প্রকৃতিতে মৎস্যকন্যার মত এরকম অসংখ্য মিসিং লিঙ্ক মজুদ থাকার কথা । কিন্তু বিবর্তনবাদীদের জন্য বড়ই আফসোস এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, বিবর্তনবাদীদের দাবী প্রমাণ করে এমন মিসিং লিঙ্ক প্রকৃতিতে নেই ।যদি তাদের দাবি অনুযায়ী, ধীরগতি বিবর্তন হয়েও থাকে, তাহলে প্রকৃতিতে হাজার বা কোটি কোটি নয়, মিলিয়ন মিলিয়ন মিসিং লিঙ্ক পৃথিবীতে মজুদ থাকার কথা । পৃথিবীতে যত প্রজাতির প্রাণী আছে, তারচেয়ে কয়েক কোটি গুণ বেশি হওয়ার কথা মিসিং লিঙ্কের সংখ্যা । কিন্তু আছে কি ? নেই ।এই মিসিং লিঙ্কের যে বিবর্তনবাদের জন্য মর ফাঁদ হতে পারে, সেটা স্বয়ং চার্লস ডারউইনও জানত । তাই তিনি তার লেখা Origin of species: By means of natural selection বইয়ের Difficuilties of the Theory অধ্যায়ে ব্যাপারটা অকপটে স্বীকার করে বলেছেন যে,

“আমার তত্ত্ব যদি সত্য হয়, তাহলে সমগোত্রীয় প্রজাতিগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী অসংখ্য প্রজাতির অস্তিত্ব থাকার কথা । এদের অস্তিত্বের প্রমাণ শুধু জীবাশ্মের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে”

একই অধ্যায়ে তিনি আরো লিখেছেন,

“যদি এক প্রজাতি অন্য প্রজাতি থেকে সুন্দর ক্রমান্বয় অনুসরণ করে বেরিয়ে আসে, তবে কেন আমরা চারদিকে অসংখ্য মধ্যভর্তি প্রজাতির দেখা পাই না ? কেন প্রজাতিসমূহের প্রকৃতি এলোমেলো হওয়ার পরিবর্তে সুগঠিত ? তত্ত্বনুসারে যেহেতু অসংখ্য মধ্যবর্তী প্রজাতি অস্তিত্ব থাকার কথা, কেন পৃথিবীর স্তরে স্তরে সেসবের চিহ্ন অবশিষ্ট নেই? এই সমস্যাটি আমাকে খুব ভাবায়”

ডারউইন মনে করেছিলেন, তার সময়ের বিজ্ঞানের তেমন উন্নতি সাধিত হয় না হওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবাশ্মের সন্ধান মেলেনি । তিনি আশাবাদী ছিলেন যে, একটা সময়ে জীবাশ্মগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মিসিং লিঙ্কের সন্ধান মিলবে । কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এই যে, ডারউইনের মৃত্যুর দেড়’শ বছর অতিক্রম করলেও আজ অব্দি এমন কোনো মিসিং লিঙ্কের সন্ধান বিবর্তনবাদীরা বের করতে পারেনি, যা তাদেরকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে । জীবাশ্ম রেকর্ডে মিসিং লিঙ্কের এই ‘শূন্যতা’ দেখে হতাশ হয়ে বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Derek V. Ager বলেছেন, আমরা যদি জীবাশ্ম রেকর্ড খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষন করে দেখি, তাহলে ঘুরেফিরে যে বিষয়টা সামনে আসে তাহলো- একদলের হঠাৎ বিলুপ্তি ও অন্যদলের বিস্ফোরণ কোন ধীর বিবর্তনের ফল নয় ।

আরেক বিবর্তনবাদী জীবাশ্মবিদ Mark Czarnecki আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন,

“বিবর্তনবাদতত্ত্ব প্রমানের একটি বড় অসুবিধা হলো এই জীবাশ্ম রেকর্ড । পৃথিবীর পরতে পরতে সংরক্ষিত বিলুপ্ত প্রজাতিসমূহের ছাপ । এই জীবাশ্ম রেকর্ড কখনই ডারউইনের প্রস্তাবিত অন্তবর্তীকালীন রূপে দেখা মেলেনি । এই পরিবর্তে আমরা যা পেয়েছি তাহলো, প্রজাতিসমূহ একদম হঠাৎ করেই আগমন করেছে আবার হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে । আর এই জিনিসটাই সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের এই কথা বলতে ইন্ধন জুগিয়েছে যে, প্রত্যেক প্রজাতিই স্রষ্টার সৃষ্টি ।”

মিসিং লিঙ্কের এই শুন্যতা বিবর্তনবাদীরাও জানে । কিন্তু সাধারণ মানুষকে তো আর এসব জানানো যাবে না । জানালে তো থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে । এ জন্যই বিবর্তনবাদীরা প্রায়ই কল্পিত মিসিং লিঙ্ক তৈরি করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলে । তারা বিভিন্ন মিসিং লিঙ্কের ছবি কম্পিউটারে ফটোশপ করে, একে পাঠ্যবইয়ে এমনভাবে ছাপায়, যেন এটা একেবারে গ্রাভিটির মতো কোনো বিষয় । আদতে বিবর্তনবাদীরা জালিয়াতি, প্রতারণা করে এসব মিসিং লিংক বানিয়ে মানুষকে ধোকা দেয় । তারা তাদের ইচ্ছা এবং কল্পনামাফিক প্রাণীদের নাক, কান, চুল ইত্যাদি অঙ্কন করে পাঠ্যপুস্তকে ছাপায় । অথচ এসবের কোনকিছুই জীবাশ্ম রেকর্ডে পাওয়া যায় না । তাহলে ওরা কিভাবে আকে ? স্রেফ কল্পনা । এভাবে তারা এক প্রাণীর হাড়, অন্য প্রাণীর নাক, আর একটা প্রাণীর চোয়াল এনে জোড়াতালি দিয়ে একটা কল্পিত মিসিং লিঙ্ক তৈরি করে এবং বিবর্তনবাদী ও বস্তুবাদী মিডিয়া সেটাকে ফলাও করে প্রচার করে বেড়ায় ।এবার আমরা সেরকম কিছু ইতিহাস জানবো, যেখানে বিবর্তনবাদীরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েও ধরা খেয়েছে বার বার ।

কিছু ধাপ্পাবাজির গল্প

এক ফোটা উল্লুক এবং দুই ফোঁটা ওরাংওটাং মিলে হয় একটি পিল্টডাউন মানব ।

১৯১২ সালে ইংল্যান্ডের পিল্টডাউন শহরে একটি জীবাশ্ম পাওয়া যায় বলে চারদিকে শোরগোল পড়ে । একটা খনির মধ্যে চোয়ালের কিছু হাত এবং করোটির কিছু টুকরো পাওয়া যায় । চোয়ালে হাড়টা উল্লুকের মতো হলেও, করোটির টুকরোগুলো মানুষের খুলির মতো । প্রাপ্ত এই নমুনা গুলোর নাম দেওয়া হল ‘Piltdown Man’ বা পিল্টডাউন মানব । এই পিল্টডাউন মানবের বয়স দেখানো হলো ৫,০০,০০০ বছর । রাতারাতি পিল্টডাউন মানবকে নিয়ে বিবর্তন পাড়ায় হইচই শুরু হয়ে গেল । এটাকে বলা হল, মানুষ এবং এপের মধ্যকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ । এই পিল্টডাউন মানব নিয়ে বিজ্ঞান সাময়িকে লেখা হয় অসংখ্য প্রবন্ধ, অসংখ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলে আসে চারদিকে থেকে । এটাকে উল্লেখ করা হয়েছে বিবর্তনবাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে । এই জীবাশ্মের উপরে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য ৫০০ টিরও বেশি থিসিস লেখা হয়েছিল ।

১৯২১ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়াম পরিদর্শন করতে গিয়ে নৃতত্ত্ববিদ Henry Fairfield Osborn বলেন,

‘পিল্টডাউন মানব মানুষের প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার’

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল সহ নামকরা সব বিজ্ঞান-সাময়িকী, ম্যাগাজিন, পিয়ার রিভিউ জার্নালে দিন রাত এই পিল্টডাউন মানবকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হতো ।কিন্তু ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্বরত জীবাশ্মবিদ, Kenneth Oakley ফ্লুরিন পরীক্ষা করলেন । উল্লেখ্য ফ্লুরিন টেস্ট হলো জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণের নতুন পদ্ধতি  । Kenneth Oakley যখন পিল্টডাউন মানবের উপর ফ্লুরিন টেস্ট করলেন, উক্ত টেস্ট শেষে তিনি যা ফলাফল পেলেন তা রীতিমতো চমকে যাওয়ার মত । উনি দেখতে পেলেন যে, পিল্টডাউন মানবের চোয়ালের কোন ফ্লুরিন নেই । এতে বোঝা গেল যে, এটি মাত্র কয়েক বছর ধরে মাটির নিচে ছিল । পিল্টডাউন মানবের খুলিতে খুব অল্প পরিমাণে ফ্লুরিন পাওয়া গেলে, যা প্রমাণ করে যে এটা মাত্র কয়েক বছর আগে সমাধিস্থ কোন খুলি ।প্রমাণ হলো যে, পিল্টডাউন মানবে চোয়াল এবং দাঁতের অংশটা মূলত ওরাংওটাং নামে আলাদা একটা প্রাণীর । এগুলোকে ঘষে-মেজে, পুরনো বানিয়ে জোড়াতালি দিয়ে পিল্টডাউন মানব বলে চালানো হয়েছে ।এরপর Joshep Weiner এর পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষনের পরে, ১৯৫৩ সালে পিল্টডাউন মানব নিয়ে জালিয়াতির ব্যাপারটা সকলের সামনে চলে এলো । প্রমান হল যে, পিল্টডাউন মানবের মাথার খুলিটি পাচ’শ বছর আগে মারা যাওয়া একজন মানুষের এবং চুয়াল আর দাঁত সম্প্রতি মারা যাওয়া একটি উল্লুকের । সেগুলোকে ঘষে-মেজে, কৃত্রিম উপায়ে পুরনো একটা আমেজ তৈরি করে, জোড়া তালি দিয়ে বানানো হয়েছিল এই পিল্টডাউন মানব । এভাবেই দীর্ঘ চল্লিশ বছর ভুয়া, নকল এবং জালিয়াতিপূর্ণ এই জিনিস বিজ্ঞানমহলে বিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত ছিল । জালিয়াতি ধরা পড়ার পর রাতারাতি সেটাকে ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে সরিয়ে ফেলা হয় ।পিল্টডাউন মানব নিয়ে এরকম জালিয়াতি দেখে Sir Wilfred Le Gros Clark বলেন, “কৃতিম ঘষামাজার চিহ্নগুলো খুব সহজেই নজরে এলো । বাস্তবিক অর্থেই, কৃতিম সংযোজনগুলো এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, প্রশ্ন করা যেতে পারে, এগুলো এতদিন নজর এড়িয়ে ছিল কিভাবে ?”

পাঠক এই হল বিজ্ঞানমহলে সেসব বিজ্ঞানীদের ভেতরের গল্প, যাদের আমরা চোখ মুখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে ফেলি । একটা মতবাদকে দাঁড় করানোর জন্য তারা কি পরিমান যে অসততার আশ্রয় নিতে পারে, সেটা রীতিমত অবাক করার মতো । এতো গেলো এক কাহিনী । এরকম আরও কাহিনী আছে, যা শুনলে আপনার পিলে চমকে উঠবে ।

নেব্রাস্কা ম্যান -একটি শুকরের দাঁত থেকে একগুচ্ছ গল্প

বিবর্তনবাদীরা তাদের কল্পিত বিবর্তনবাদকে প্রমাণ করার জন্যে যেসব জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে, নেব্রাস্কা মানবের ঘটনা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য । ১৯২২ সালে American Museum of Natural History এর পরিচালক Henry Fairfield Osborn দাবি করলেন যে, তিনি স্নেইক ব্রুক(snake brook) এর কাছাকাছি অঞ্চলে, পশ্চিম নেব্রাসকায় প্লাইওসিন যুগের মাড়ির একটি দাত পেয়েছেন । আরো দাবি করা হলো, এতে নাকি মানুষ এবং উল্লুক উভয়ের বৈশিষ্ট্য রয়েছে । ব্যস, এই দাতটির নাম দেওয়া হল নেব্রাস্কা মানব । কেউ কেউ দাবি করল এটা আসলে পিথেক্যানথ্রোপাস ইরেক্টাস, আবার কেউ কেউ দাবি করল এটা আসলে মানুষের নিকটবর্তী কোন প্রজাতির । রাতারাতি এই নেব্রাস্কা মানব এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হল Hesperopithecusharoldcooki ।এটি একটি দাঁতের উপর ভিত্তি করে বিবর্তনবাদীরা নেব্রাস্কা মানবের পুরো একটি দেহ একে ফেলল রাতারাতি । শুধু কি নেব্রাস্কা মানবের দেহ ? ওই একটি দাঁতের উপর ভিত্তি করে তারা নেব্রাস্কা মানবের স্ত্রী, সন্তানসহ পুরো পরিবারের চিত্র এবং নেব্রাস্কা মানব যে পরিবেশে বেঁচে ছিল, সেই পরিবেশের উপর ছবি পর্যন্ত একে ফেলল । চিন্তা করে দেখুন, এদের কল্পনাশক্তি কত প্রখর । একটিমত্র দাত থেকে তারা বংশতালিকা বের করে ফেলেছে । সাধারন বোধসম্পন্ন যে কারো কাছে এটা রূপকথার গল্প বলে মনে হলেও, বিজ্ঞানের ঠিকাদারদের কাছে এটাই বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বলে পরিচিত ।সে যাই হোক, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা Osborn সাহেবের এই কল্পিত চিত্রকর্মকে খাটি বিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দিয়ে দিলেন । বিবর্তন মহলে তখন খুশির আমেজ । এতদিন পর মিলেছে পরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর সন্ধান । কিন্তু William Bryan নামের একজন গবেষক বেঁকে বসলেন । একটি মাত্র দাঁতের উপর ভিত্তি করে কোন বংশতালিকা প্রণয়ন এবং বিবর্তনবাদীদের চিত্রকর্মে তিনি খুশি হতে পারলেন না দাবি জানালেন যে, এটা নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাওয়া ঠিক হবে না ।  এটা নিয়ে আরো গবেষণা করা উচিত । কিন্তু কে শোনে কার কথা । বিবর্তনবাদীদের কি আর সেই সময় আছে ? তারা উল্টো William Bryan সাহেবকে নানা দিক থেকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করতে লাগলেন ।মজার ব্যাপার হলো, এর কিছু বছর পরে, অর্থাৎ ১৯২৭ সালে ওই দাঁতটি যে প্রাণীর ছিল, গবেষকরা সেটার পুরো কঙ্কালটাই খুঁজে বের করতে সমর্থ হয় । কঙ্কালটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেলো, এটা না মানুষ ছিল, না উল্লুক । বরং, এটা দাঁতটি ছিল আমেরিকার বিলুপ্ত হওয়া  একপ্রকার শূকরের ।বিবর্তনবাদীরা একটি শুকরের দাঁতকে জালিয়াতি করে মানুষ এবং এর মধ্যবর্তী প্রজাতির বলে ঘোল খাইয়েছিল । পরে যখন প্রমাণ হয় যে এটা আসলে শূকরের দাত, তখন তারা তড়িঘড়ি করে তাদের বিবর্তনবাদের সব সাইট থেকে এই নেব্রাস্কা মানবের ইতিহাস নামিয়ে ফেললো । বিজ্ঞানী William Gregory এই ঘটনার ওপরে Science ম্যাগাজিনে নিবন্ধ লিখেছেন ‘Hesperopithecus: Not an Ape not a Man’ শিরোনামে ।

ওটা বেঙ্গা -খাচার ভেতর অচিন মানুষ

উহু, বিবর্তনবাদী জালিয়াতি কিন্তু এখানেই থেমে যায়নি । চার্লস ডারউইন মনে করতেন, এক ধরনের উল্লুকের মতো প্রাণী থেকে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি হয়েছে । তিনি তার The Decent of Man বইতে এমনটাই দাবি করেছিলেন । এই কল্পনানির্ভর চিন্তা অনেক বিবর্তনবাদীদের মনে দাগ কাটে । তারা ভাবলো, যেহেতু উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকেই আধুনিক মানুষের উৎপত্তি, এখনো তাহলে পৃথিবীতে কিছু ‘অর্ধেক উল্লুক অর্ধেক মানুষ’ জাতীয় প্রাণী সন্ধান মিলতে পারে । এই ধারনার বশবর্তী হয়ে তারা ‘উল্লুক মানুষ’ খোঁজার মিশনে পড়ে । ১৯০৪ সালে একজন বিবর্তনবাদী আফ্রিকার কঙ্গো থেকে ‘ওটা বেঙ্গা’ নামের একজন পিগমি (পিগমি হল আফ্রিকা মহাদেশের অধিবাসীদের একটি দল । এরা খুব ধরনের হয়ে থাকে । এজন্য এদের সাধারণ মানুষদের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন মনে হয়) সম্প্রদায়ের লোককে ধরে আনা হয় । দাবি করা হয় ওই ওটা বেঙ্গা নাকি উল্লুক এবং মানুষের মধ্যবর্তী কোন প্রজাতি । তাকে বিবর্তনবাদীরা শিকল দিয়ে বেঁধে আমেরিকায় নিয়ে আসে । St. Louis world fair নামক মেলায় তাকে অন্যান্য উল্লকের সাথে মানুষ এবং উল্লুকের মধ্যবর্তী রূপ হিসেবে প্রদর্শন করা হয় । দুই বছর পরে তাকে নিউইয়র্কের ব্রংক্স চিড়িয়াখানাতে প্রদর্শন করা হয় মানুষের প্রাচিন পূর্বপুরুষ হিসেবে । চিরিয়াখানায় ওটা বেঙ্গাকে রাখা হয় কিছু শিম্পাঞ্জী, ডাইনাহ নামের একটি গরিলা ও ডোহাং নামের একটি ওরাংওটাং এর সাথে । তার সাথে এমন আচরন করা হয় যেন সে একটি পশু । বেচারা এই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে বসে । খবর পাওয়া যায়, তার এক স্ত্রী ও দুই সন্তান ছিল ।এভাবে বিবর্তনবাদীদের জালিয়াতির সাক্ষী হতে গিয়ে প্রাণ হারায় ‘পিগমি’ সম্প্রদায়ের এই মানুষটিকে । অপরাধ হলো শারীরিকভাবে সে একটু বেটে ।

জোড়াতালির জোয়ার

১৯৭২ সালে কেনিয়ার রুডলফে কিছু টুকরো জীবাশ্ম পাওয়া যায় । এগুলোর নাম হয় Homo Rudolfensis । এই জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী রিচার্ড লেকি । তিনি এই জীবাশ্মের খুলির নাম দেন ‘KNM-ER-1470’ । রিচার্ড লেকির মতে, এই জীবাশ্মের বয়স ২৮ লক্ষ বছর এবং এটি নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার । রিচার্ড লেকির মন্তব্যকে  অনেক নৃতত্ত্ববিদ সমর্থন করে বললেন, এই হোমো রুডলফেনসিসের সাথে হোমো হ্যাবিলিসের কোন পার্থক্য নেই ।রিচার্ড লেকির দাবি ছিল, এই হোমো রুডলফেনসিসের করোটির আকৃতি অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মত এবং এর মুখের আকৃতি আধুনিক মানুষের মত । ব্যস ! রিচার্ড লেকি সিদ্ধান্ত দিয়ে বসলেন যে, এই হোমো রুডলফেনসিস মানুষ এবং অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মধ্যকার প্রজাতি ।কিন্তু ১৯৯২ সালে কম্পিউটার সিমুলেশন এর মাধ্যমে বিজ্ঞানী Tim Bromage হোমো রুডলফেনসিসের উপর গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে, রিচার্ড লেকি হোমো রুডলফেনসিসের যে খুলির নাম ‘KNM-ER-1470’ রেখেছিলেন, সেই খুলিটি আসলে জোড়াতালি দিয়ে লাগানো । খুলিটি মূলত একটি মানুষের । বিজ্ঞানী J.E Cronin, মিশিগান ইউনিভার্সিটির এবং জণ হপকিনস ইউনিভার্সিটির Alan Walker সহ প্রথম সারির সকল নৃতত্ত্ববিদরা একমত হলেন যে, এই ‘KNM-ER-1470’ আসলে মানুষ এবং অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মধ্যবর্তী কোন প্রজাতি নয়; বরং এটি অস্ট্রোলোফিথেসাইনের গ্রুপেরই সদস্য ।এরপর, যেসব বিবর্তনবাদী সাময়িকী, বিবর্তনবাদের প্রমাণ বলে পোস্টার টাঙিয়েছিল, তারা সকলেই তাদের পোস্টার নামিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

Ida-তাদের মোনালিসার উত্থান-পতন

২০০৯ সাল । বিবর্তনবাদ মহলে ঈদের আমেজ । তাদের মতে, তারা তাদের বিবর্তনবাদকে সত্য প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি পেয়ে গেছে । কি নাম সেটার? সেটার নাম হল Ida । Ida নামের একটি ফসিলকে বিবর্তনবাদীরা তাদের পক্ষে ইতিহাস-বিখ্যাত প্রমাণ বলে চালাতে লাগলো । কেউ কেউ এটাকে বলল, ‘The Eight Wonder of the World’ । আবার কেউ কেউ এটাকে ‘Our Monalisa’ খেতাবও দিয়ে ফেলেছে ততক্ষণে । তারা জোর গলায় বলতে লাগলো, ‘আজ থেকে কেউ যদি দাবী করে যে, বিবর্তনবাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, তাহলে তারা যেন এই Ida প্রমাণস্বরূপ উপস্থিত করে ।’ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, হিস্ট্রি, ডিসকভারিসহ সব বিবর্তনবাদী মিডিয়ায় দিনরাত ফলাও করে প্রচার করা হলো  তথাকথিত মিসিং লিঙ্ক Ida’র খবর ।কিন্তু মাত্র তিন বছর পরেই ২০১০ সালের বিবর্তনবাদীদের কান্নার জলে ভাসিয়ে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো এবং ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মিলে প্রমাণ করে দেখালেন যে আসলে কোন মিসিং লিঙ্ক নয়; বরং এটি Lamour নামক একটি প্রাণীর ফসিলমাত্র ।ব্যস ! সাথে সাথে বিবর্তনবাদ দুনিয়া থেকে Ida’র সব রকম চিহ্ন মুছে ফেলা হলো । এতো বড় জালিয়াতির পরেও তারা তাদের কল্পিত তত্ত্ব থেকে কোনোভাবে বিশ্বাস হারালো না । এ রকম জালিয়াতি, কপটতা, অসততার পরেও বীরদর্পে বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানীমহলে কেন টিকে আছে পাঠক নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন ।

মানুষের বংশ তালিকার ব্যবচ্ছেদ

এবার আমরা দেখে নেবো বিবর্তনবাদীদের দাবিকৃত বংশতালিকার ঘাপলাটি । উল্লেখ্য, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব জীবাশ্মবিদ এবং জীববিজ্ঞানীদের দোহাই দিয়ে আধুনিক মানুষকে ৩০ হাজার বছর পূর্বের এবং মনুষ্য প্রজাতিটিকে লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বের বলে বিবর্তনের একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনাকে সত্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন । যদিও তিনি বিস্তারিত কোনো আলোচনা করেননি এ বিষয়ে ।বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগে, এক প্রকার উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকে আধুনিক মানুষের বিবর্তন শুরু হয় । সেইক্রম অনুসারে বিবর্তনবাদীরা মানুষের বংশ তালিকাটিকে মৌলিক চার ভাগে ভাগ করে । সেগুলো হলো-

১. অস্ট্রোলোফিথেসাইন

২. হোমো হাবিলিস

৩. হোমো ইরেক্টাস

৪. হোমো স্যাপিইয়েনস বা আজকের আধুনিক মানুষ ।

অর্থাৎ, বিবর্তনবাদীদের দাবি অনুসারে, আজ থেকে চল্লিশ হাজার বছর আগে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন নামক এক প্রকার উল্লুকজাতীয় প্রাণী  থেকেই মানুষের বিবর্তন শুরু হয় । সে অনুসারে, অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মাঝে হালকা কিছু মানুষের বৈশিষ্ট্য প্রথম দেখা যায় । অস্ট্রোলোফিথেসাইনের থেকেই মানুষের বিবর্তন সূত্রপাত ধরে নিলেও, তারা অস্ট্রোলোফিথেসাইনের কে হোমো (মানুষ) ক্যাটাগরিতে ফেলল না । তাদের দাবি অস্ট্রোলোফিথেসাইনের উল্লুক শ্রেণীর হলেও এরা মানুষের মতো দুপায়ে হাঁটত যা সাধারণ উল্লুক পারে না । তারা মনে করে, দু পায়ে হাঁটতে পারাটাই অস্ট্রোলোফিথেসাইনের মানুষের বিবর্তিত হবার প্রথম পদক্ষেপ । এজন্য তারা তাদের বংশতালিকার একেবারে সামনে রাখে এই অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে । এরপর সেই অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকে যেসব প্রজাতি বের হয়েছে, তাদের সবাইকে তারা ‘হোমো’ ক্যাটাগরিতে ফেলল । যেমন- হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেক্টাস । প্রথমে দেখে নেওয়া যাক অস্ট্রোলোফিথেসাইন কি আসলেই দুই পায়ে হাঁটত কি না ।অস্ট্রোলোফিথেসাইন যে দুই পায়ে হাঁটত, এই দাবি প্রথম উত্থাপন করে Richard Leakey এবং Donald C. Johanson । কিন্তু এরপরে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার দুজন বিশ্ববিখ্যাত জীবদেহ বিশেষজ্ঞ Solly Zuckerman, Prof. Charles Oxnard অস্ট্রোলোফিথেসাইনের বিভিন্ন প্রজাতির উপর ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ করেছেন যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন কখনই মানুষের মত সোজা হয়ে হাঁটত না ।একজন বিবর্তনবাদী হয়েও, Solly Zuckerman (Solly Zuckerman, Beyond the Ivory Tower, New York, Troplinger Publications, P-75-94) পাঁচ সদস্যের একটি গবেষকদল সরকারের সহায়তায় পনের বছর ধরে অস্ট্রোলোফিথেসাইনের উপর গবেষণা পরিচালনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন কখনোই দুই পায়ে হাঁটত না এবং তাদের বৈশিষ্ট্য আর সাধারণ উল্লুকদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোন ফারাক নেই ।

এবং এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী, Charles E. Oxnard অকপতে স্বীকার করেন যে- অস্ট্রোলোফিথেসাইনরা দুই পায়ে হাঁটত না । বরং তাদের গঠন বর্তমানের ওরাংওটাং প্রাণীর মতই ।তাহলে বিবর্তনবাদীরা যে অস্ট্রোলোফিথেসাইনকে ‘দু পায়ে হাঁটার বৈশিষ্ট্য’ এর জন্য মানুষকে পূর্ব প্রজাতির বলে দাবি করে, সেই দাবিটা মিথ্যা, ভুল ।কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, উল্লুক জাতীয় প্রাণী থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের আবির্ভাব প্রমাণের জন্য কতগুলো বিভিন্ন আকৃতির কঙ্কাল বা ক্রমান্বয়ে বড় আকৃতির করোটি দেখিয়ে দেয় কি যথেষ্ট ? কেউ যদি একটি উল্লুক এবং একজন মানুষের ছবি সামনে রেখে কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে পার্থক্যের একটি বড় তালিকা তৈরি করে ফেলতে পারবে । যেমন- চার পায়ের পরিবর্তে দুটি পা, হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, হাতের আকৃতি, লেজের অনুপস্থিতি, গায়ের পশম, ত্বকের রং, মাথা আকার, কথা বলার যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা, ইত্যাদি অনেকগুলো পার্থক্যে মানুষ বিশেষায়িত ।অন্যদিকে আমরা জানি, একটি প্রজাতি সবগুলো অঙ্গ পারস্পরিক সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কাজ করে । সে হিসেবে এক প্রজাতিকে অন্য প্রজাতিতে পরিণত হতে হলে অনেকগুলো অঙ্গে একই সঙ্গে পরিবর্তন আসতে হবে । কোন একটি অঙ্গে পরিবর্তন হলে, অন্য একাধিক অঙ্গে আনুষঙ্গিক পরিবর্তন যদি না আসে, তাহলে উক্ত প্রজাতিটি বেঁচে থাকার সংগ্রামে টিকে থাকতে পারবে না ।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি একটি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কথা চিন্তা করি –একটি উল্লুকজাতীয় প্রাণীর বৃদ্ধাঙ্গুলি থেকে মানুষের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে পরিবর্তিত হতে হলে কবজির সাথে বৃদ্ধাঙ্গুলি সন্ধিতে (জয়েন্ট) পরিবর্তন আসতে হবে, হাড়ের উচ্চতায় পরিবর্তন আসতে হবে, বৃদ্ধাঙ্গুলির সাথে সংশ্লিষ্ট মাংসপেশির সংখ্যা ও সংযোগস্থলে পরিবর্তন আসতে হবে, সংশ্লিষ্ট স্নায়ুর রক্তনালীতে পরিবর্তন আসতে হবে এবং মস্তিষ্কের যে অংশ হাতের নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশে পরিবর্তন আসতে হবে । অর্থাৎ শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির জন্যই মানব শরীরের তিনটি পৃথক তন্ত্রে সুনির্দিষ্ট ও যুগ্ম পরিবর্তন আসতে হবে । সুতরাং যখন উপরে উল্লেখিত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনা হবে, তখন উল্লুকজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের বিবর্তনের গল্পটি রূপকথাকেও ছাড়িয়ে যায় ।এছাড়াও প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মানুষের মতো চিন্তা ভাবনার ক্ষমতাসম্পন্ন মস্তিষ্কের কোন প্রয়োজন নেই । কারন, বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্য দরকার অধিক প্রজনন ক্ষমতা । অথচ মানুষের উন্নত মস্তিষ্ক এমন একটি অঙ্গ যা খাদ্য উপাদান থেকে সংগৃহীত শক্তির একটা বড় অংশ খেয়ে ফেলে । যার ফল হলো, প্রজনন ক্ষমতার ব্যবহার কমে যাওয়া । অর্থাৎ, বেঁচে থাকার সংগ্রামে উন্নত চিন্তাশক্তিসম্পন্ন মস্তিষ্ক কোন ‘সারভাইভাল বেনিফিট’ দেয় না । সুতরাং বিবর্তনবাদ মানুষের উন্নত মস্তিস্কের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না । এটা আমাদের কথা না । স্বয়ং বিবর্তনবাদিরাই একথা বলেছেন । ডিএনএ-এর গঠন আবিষ্কারকদের একজন, বিবর্তনবাদী নাস্তিক ফ্রান্সিস ক্রিক বলেন,

“সর্বোপরি আমাদের অত্যন্ত বিকশিত মস্তিষ্ক বৈজ্ঞানিক সত্য আবিস্কারের জন্য বিবর্তিত হয়নি; বরং কেবল এই বেঁচে থাকা ও বংশধর রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের যথেষ্ট দক্ষ করে তুলতে বিবর্তিত হয়েছে”

অস্ট্রোলোফিথেসাইনের পরে এলো হোমো হাবিলিসের পালা । অস্ট্রোলোফিথেসাইনের পরের ধাপ হলো গিয়ে হোমো ইরেকটাস । এখন অস্ট্রোলোফিথেসাইন থেকে সরাসরি হোমো ইরেক্টাসে লাফ দেওয়া কিন্তু সম্ভব না । কারণ, অস্ট্রোলোফিথেসাইন ‘হোমো’ অর্থাৎ মানুষের ক্যাটাগরি না । এখন উল্লুকশ্রেণির একটি প্রাণী ধপাস করেই যে হোমো ক্যাটাগরির কোন পাপ দেবে, এটা স্বয়ং বিবর্তনেরই নীতিবিরুদ্ধ । তাহলে কি করা যায় ? সমাধান হলো মাঝখানে নতুন কোন গল্প ফাঁদা । মাঝখানের সেই গল্পটির নাম হল ‘দ্য স্টোরি অফ হোমো হাবিলিস’ ।১৯৬০ সালের দিকেই প্রথম হোমো হাবিলিস এর ধারণা প্রবর্তন করা হল । বলা হল, এদের কোনটির আকৃতি আপেক্ষিকভাবে বড়, এরা সোজা হয়ে হাঁটতে পারত এবং এরা কাঠের সরঞ্জামাদি ব্যবহার করত । এজন্যই এরা মানুষের পূর্বপুরুষ ।কিন্তু ১৯৮০ সালের দিকেই নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কার হওয়ার পরে এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে পালটে গেল । Bernard Wood এবং C. Loring Brace এর মত গবেষকরা নতুন জীবাশ্মগুলো পরীক্ষা করে জানালেন, হোমো হাবিলিসকে আসলে ‘হোমো হাবিলিস’ না বলে ‘অস্ট্রোলোফিকেথাস হাবিলিস’ বলা উচিত । অর্থাৎ এটাকে মানুষ ক্যাটাগরিতে না ফেলে বরং উল্লুকের ক্যাটাগরিতে ফেলাই অধিক যুক্তিযুক্ত এবং পরীক্ষিত । অস্ট্রোলোফিথেসাইন প্রজাতির উল্লুকের সাথে ছিল এদের প্রচুর মিল । এদের লম্বা হাত, খাট পা, উল্লুকের মতো কঙ্কালের গঠন -সবকিছুই অস্ট্রোলোফিথেসাইন প্রজাতীর সাথেই মিল । এবং এদের হাত এবং পায়ের আঙ্গুল ছিল গাছে চরার উপযোগী । এদের করোটিকার ধারনক্ষমতা ছিল ৬০০ ঘন সেন্টিমিটার । এদের ছিল উল্লুকের মত চুয়াল । মোদ্দাকথা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গবেষকরা বললেন, হোমো হাবিলিস আসলে হোমো ক্যাটাগরির কিছু না । এটা অস্ট্রোলোফিথেসাইন ক্যাটাগরির উল্লুক ।১৯৯৪ সালে হলি স্মিথ নিখুঁত গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, হোমো হাবিলিস আসলে হোমোই না, বরং এটা অস্ট্রোলোফিথেসাইন জাতের উল্লুক । অস্ট্রোলোফিথেসাইন, হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেকটাস এবং হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিসের দাঁতের উপরে গবেষণা করে তিনি বলেন,

“দাঁতের উপর বিস্তারিত গবেষণা এটাই প্রমাণ করে যে, অস্ট্রোলোফিথেসাইন এবং হোমো হাবিলিস আফ্রিকান উল্লুকশ্রেণীর”

তাহলে এটাও স্পষ্ট যে, হোমো হাবিলিস আদতে ‘হোমো’ ক্যাটাগরির কোন প্রাণী নয়; বরং এটি উল্লুকশ্রেণীর প্রাণীবিশেষ ।এরপর বিবর্তনবাদী গল্পগুলো সরাসরি ‘হোমো’ ক্যাটাগরিতে ঢুকে পড়ে । পরের গল্পগুলো তারা এভাবে সাজায়- হোমো ইরেকটাস, হোমো স্যাপিয়েনস এবং নিয়ান্দারথাল মানব হোমো স্যাপিয়েন্স । এই প্রজাতিগুলো বৈশিষ্ট্যের সামান্য বৈসাদৃশ্যের কারণে বিবর্তনবাদী গোষ্ঠীগুলোকে একটা আলাদা আলাদা শ্রেনিতে ফেলে দেয় । আদতে এরা সবাই মানুষ ছিল । এরা ছিল মানব প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী । আফ্রিকান একটি জনগোষ্ঠীর সাথে ইউরোপের একটি জনগোষ্ঠীর যে পার্থক্য, একজন পিগমি শ্রেনির মানুষের সাথে একজন রেড ইন্ডিয়ান শ্রেণীর যে পার্থক্য, এখানেও পার্থক্যগুলো ঠিক সেরকম । তাই বলে, একজন পিগমি সম্প্রদায়ের লোককে ইউরোপের একটি জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ বা পূর্বজাতি বলা কতটুকু সমীচীন?যেমন- হোমো ইরেকটাসের কথাই ধরুন । ‘হোমো ইরেকটাস’ শব্দের অর্থ হল ‘খাড়া হয়ে হাটা মানুষ’ । বিবর্তনবাদীরা এই হোমো ইরেকটাসকে অন্যান্য জীবাশ্ম থেকে আলাদা করেছে একটিমাত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে, সেটা হল খাড়া হয়ে হাঁটতে পাড়ার বৈশিষ্ট্য ।মূলত যে মৌলিক কারণ দেখিয়ে বিবর্তনবাদীরা হোমো ইরেকটাসকে আদিম মানব বানিয়ে দেয়, তাহল এটার করোটির ধারণক্ষমতা এবং বাইরের দিকে বের হয়ে আসা ভ্রূণ ।হোমো ইরেকটাসের করোটির ধারণক্ষমতা ৯০০-১১০০ সিসি যা আধুনিক মানুষের ধারণক্ষমতার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম।কিন্তু কি ধারণক্ষমতা স্বল্পতা এবং বাইরের দিক থেকে বাইরের দিকে বের হয়ে আসা ভ্রুনের ভিত্তিতে একটি জীবাশ্মকে ‘আদিম’ রূপ বলে চালিয়ে দেওয়া আদৌ কি ন্যায়সঙ্গত ?হোমো ইরেক্টাসের সমান খুলিবিশিষ্ট মানুষতো বর্তমানেও আছে । যেমন- আফ্রিকার পিগমি সম্প্রদায় । এদের কোনটি ধারণক্ষমতা সাধারণ মানুষের তুলনায় গড়পরতা হারে কম । আবার বাইরের দিকে বের হয়ে আসা ভ্রূণসমৃদ্ধ মানুষও আজকাল দেখা যায় । যেমন- অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় অধিবাসী । এদের ভ্রূণ বাইরের দিকে বের হওয়া । এখন এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা কি বলব যে আফ্রিকার পিগমি এবং অস্ট্রেলিয়ার অধিবাসীরা মানুষের পূর্বপ্রজাতি ? আদিম মানব ?আরও মজার ব্যাপার, বিবর্তনবাদীরা মনে করে, করোটির ধারণ ক্ষমতার উপর মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে । হোমো ইরেকটাসের করোটি যেহেতু তুলনামূলকভাবে ছোট, এ জন্য বিবর্তনবাদীরা অনুমান করে নিয়েছে যে, তাহলে হোমো ইরেকটাস প্রজাতি বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়েও মনে হয় আধুনিক মানুষের চেয়ে পিছিয়ে ।অথচ আজকের আধুনিক বিজ্ঞান এ কথা অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে যে, করোটির ধারণক্ষমতা বা আয়তনের উপর বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে না । বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের গঠনের উপর ।

বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানী Richard Leakey বলেছেন,

“আলাদা আলাদা মানবসম্পদের পার্থক্যের মতোই হোমো ইরেকটাস আর  আধুনিক মানুষের মাঝে পার্থক্য”

অথচ এ কথা সকলেই জানি যে, আলাদা আলাদা শারীরিক গঠন মূলত লম্বা সময় ধরে ভোগলিক দূরত্বে অবস্থানের কারণে হয়ে থাকে ।এখন এই ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে কিছু শারীরিক বৈসাদৃশ্যের কারণে একটা সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা সম্প্রদায়ের বলে চালানো কতটুকু বৈজ্ঞানিক ?হোমো ইরেকটাস এর অস্তিত্ব নিয়ে ২০০০ সালে বিজ্ঞানীদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । Senckenberg সম্মেলনে সেই বিতর্কের বিষয় ছিল হোমো ইরেকটাস বলে কোন শ্রেণি আছে কি না । তর্কাতর্কির পরে সেই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, প্রজাতি হিসেবে হোমো ইরেকটাস বলে আসলে কিছু ছিল না । প্রজাতি হিসেবে বিশ লক্ষ বছর থেকে বিস্তৃত একমাত্র প্রজাতি হোমো স্যাপিয়েন্সেরই অন্তর্ভুক্ত ।কিন্তু যত যাই বলো না কেনো, বিবর্তনবাদী গোড়া সম্প্রদায় তাদের মত এবং কল্পনাপ্রসূত ধারণার মধ্যে অনড় থাকবে । বিচার মানবে কিন্তু তালগাছ তাদের ।আমরা দেখতে পেলাম যে বিবর্তনবাদী দৃশ্যপটের প্রত্যেক পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ধাপ্পাবাজি আর জালিয়াতি গল্প । এই গল্প গুলো কেউ তুলির আঁচরে আঁকে, কেউ জোড়াতালি লাগায় এবং কেউ মিডিয়া এবং পাঠ্যপুস্তকে মুখরোচক করে উপস্থাপন করে।বস্তুবাদীর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে হলে মানুষের উচিত বিজ্ঞানকে দেবতার আসন থেকে সরিয়ে দেওয়া । বস্তুবাদী ধর্মহিন পৃথিবী গড়ার যে মিশন নিয়ে নেমেছে, বিবর্তনবাদ সেই মিশনের অন্যতম একটি হাতিয়ার । এই বস্তুবাদীর হাত থেকে বিজ্ঞান এবং ধর্মকে বাঁচাতে হলে চাই আসল বিজ্ঞানের চর্চা ।জীবাশ্ম

আরজ আলী মাতব্বর যেমন কোন তথ্য উপাত্ত ছাড়াই একচেটিয়াভাবে মানুষকে ৩০ হাজার বছর আগের বলে চালিয়ে দিয়ে ‘বিবর্তন তত্ত্বকে’ গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে আদম আলাই সাল্লামকে আদি মানবের লিস্ট থেকে তাড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন, ঠিক সে রকম বিবর্তনবাদী দুনিয়াও বিজ্ঞানকে অপব্যাখ্যা, বিকৃত এবং অর্ধসত্য জিনিসকে প্রচার করে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।  বিবর্তন আসলে সল্প আলোচনার কোন বিষয় নয় । তবুও সল্প আলোচনার মধ্যে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, বিবর্তনবাদীদের বলে বেড়ানো, প্রচার করা তথ্যগুলো কতটা সত্যি ? তাদের আষাঢ়ে গল্পগুলো সাধারণ মানুষ জানতে পারে না । সাধারন মানুষ তাদের দেবতা জ্ঞান করে । তারা যা বলে তা-ই বিশ্বাস করে নেয় । এই সুযোগেই তারা তাদের কাল্পনিক গল্পগুলো আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে ।

শেষ কথা

ইসলাম কখনই আচারসর্বস্ব কোন ধর্মের নাম নয় যে এটাকে কিছু তন্ত্র-মন্ত্র, দোয়া-দুরুদ আর কিছু উৎসব-আনন্দের গণ্ডির মধ্যে ফেলে বিচার করতে হবে ।ইসলাম একটি দ্বিনের নাম । দ্বিন অর্থ যতখানি না ধর্ম, তার চেয়েও বেশি পরিপূর্ণ জীবনবিধান । ইসলামে এমন একটি নীতিও নেই, এমন একটি কথাও নেই যা একজন মানুষের কাছে অসম্ভব, অযৌক্তিক ঠেকতে পারে ।অজ্ঞেয়বাদী এবং নাস্তিকেরা যে ভুলটি করে তা হল, তারা ভাবে পৃথিবীতে একত্ববাদের ডাক মনে হয় সর্বপ্রথম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম দিয়েছিলেন  । এর আগে মনে হয় পৃথিবীতে একত্ববাদী কেউ ছিলনা । পুরো পৃথিবী মনে হয় খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু ইত্যাদিতে ভরা ছিল । এমনটি যারা ভাবে, তারা খুব ভুল ভাবে এবং ভুল জানে । সৃষ্টিলগ্ন থেকেই পৃথিবীর মধ্যে একত্ববাদের অস্তিত্ব ছিল এবং সেটা চিরকালই থাকবে । আরজ আলী মাতুব্বর  সাহেব উনার জানার গন্ডির মধ্যে থেকে যে সকল প্রশ্ন, যে সকল যুক্তি আস্তিক তথা মুসলমানদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছেন, তা শিক্ষিত, ধর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন, বোঝেন, তার কাছে নিতান্তই শিশুসুলভ মনে হবে ।

আবার যার ধর্ম জ্ঞান নেই এবং নেই বিজ্ঞান নিয়ে পর্যাপ্ত পড়াশোনা, তার কাছে আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের প্রশ্নগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক মনে হতে পারে ।আরজ আলী সাহেবের বই পড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা এদের ক্ষেত্রেই বেশি ।বাস্তব জীবনে অনেকেই আরজ আলী সাহেব কতৃক প্রভাবিত হয়ে নিজের বিশ্বাস নিয়ে সন্দিহান, দোদুল্যমান অবস্থায় থাকতে দেখেছি । আরজ আলী সাহেবের যুক্তিগুলো কে রেফারেন্স হিসেবে ধরে অনেকে দেখেছি তর্ক-বিতর্ক করতে । অনেকই উনার প্রশ্নের উত্তর, যুক্তির বিপরীতে যুক্তি চাইতো । মূলত এই শ্রেণীকে টার্গেট করেই রচিত এই বই ।

আরজ আলী সমীপে–বইটির সকল লেখনী পড়তে নিন্মের লিঙ্ক সমূহে ভিজিট করুনঃ

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন