গল্পে জল্পে ডারউইনিজম -পাট ওয়ান

‘হিটলারের ঘটনা আমরা সকলেই জানি। প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদী খুন করার মাধ্যমে সে পৃথিবী থেকে ইহুদী-জাতিকে বিলুপ্ত করে দিতে চেয়েছিল। নিঃসন্দেহে, এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বোরোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম। ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও হিটলার হয়ে ওঠে একজন বিধ্বংসী নাস্তিক। তার দৃষ্টিতে ইহুদীরা ছিল নিচু জাত, ম্লেচ্ছ। যারা ম্লেচ্ছ, তাদের বেঁচে থাকার কোনোঅধিকার থাকতে পারে না—এটাই ছিল হিটলারের চিন্তাধারা। এই চিন্তাধারার বীজ কোথায় প্রোথিত আমরা কি তা জানি? এই চিন্তাধারার বীজ প্রোথিত ছিল ডারউইনের সেই ‘Natural Selection থিওরিতে। হিটলার তার Mein Kampf তথা My Struggle নামের আত্মজীবনীতে লিখেছেন,
‘If nature doesn’t wish that weaker individuals should mate with the stronger, she wishes even less that a superior race should intermingle with an inferior one; because in such cases all her efforts, throughout hundreds of thousands of years, to establish an evolutionary higher stage of being, may thus be rendered futile.

But, such a preservation goes hand-in-hand with the inexorable law that it is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure. he who would live, must fight. he who doesn’t wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasn’t the right to exist.”[১]

হিটলারের আত্মজীবনীর এই কথাগুলো খুব মনোযোগের সাথে যদি আমরা খেয়াল করি, তাহলে দেখব যে—এখানে ঠিক সেই কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যা আমাদের চার্লস ডারউইনের ‘ন্যাচারাল সিলেকশান’ শেখায়। হিটলার বলেছে If nature doesn’t wish, এখানে ‘Nature’ বলতে হিটলার কী বুঝিয়েছে? চার্লস ডারউইনের সেই ন্যাচারাল সিলেকশান নয়তো? হিটলার খুব স্পষ্ট করেই দুটি ধারার কথা বলেছেন। একটি হলো superior race, অন্যটি হলো Inferior race. অর্থাৎ সবল আর দুর্বলের মধ্যে একটি সংঘাত, একটি লড়াই যে প্রকৃতিতে বলবৎ, সেটি হিটলার খুব স্পষ্ট করেই লিখেছেন। ঠিক একই কথাগুলো আমরা ন্যাচারাল সিলেকশান তথা প্রকৃতির বাছাইকরণ পদ্ধতির মধ্যেও দেখতে পাই।

হিটলার আরো লিখেছেন, ‘It is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure.’ হিটলার বলতে চেয়েছেন সবলরাই প্রকৃতিতে টিকে থাকবে এবং এটাই হওয়া উচিত। অন্যদিকে, দুর্বলদের ক্ষেত্রে কী হবে সে ব্যাপারে বলতে গিয়ে হিটলার লিখেছেন ‘He who doesn’t wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasn’t the right to exist’.

খুবই স্পষ্ট কথা। হিটলার বলেছে, ‘সংগ্রামই যেখানে law of life, সেখানে যারা এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে না, তাদের প্রকৃতিতে টিকে থাকার কোনোঅধিকার নেই।

হিটলারের উদ্ধৃত কথাগুলো ডারউইনের ‘ন্যাচারাল সিলেকশানের সাথে খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি, হিটলার ‘Evolutionary higher stage’ এর কথাও উল্লেখ করেছেন।

হিটলার ভাবত ইহুদীরা যেহেতু ম্লেচ্ছ এবং প্রকৃতিতে সংগ্রাম করে টিকে থাকার যোগ্য নয়, তাই সে প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করে বসে।

সৌরভ খুব অবাক হলো। সে এতদিন ভাবত হিটলার একজন গোঁড়া খ্রিষ্টান হয়ে পড়েছিল, যার কারণে সে ইহুদীদের প্রতি চরম বিদ্বেষী হয়ে ওঠে; কিন্তু ঘটনার পরম্পরা যে এত গভীরে সে আসলে কখনোভাবতেও পারেনি। সৌরভ ভাবল, ‘আচ্ছা, হিটলার কি সত্যিই ডারউইনিয়ান এভুলুশান পড়েই এতদূর এগিয়েছে? সে ডায়েরিটার পরের পৃষ্ঠা উল্টাল। পরের পাতাগুলোও বেশ ভর্তি। সে খুব মনোেযোগ দিয়ে আবার পড়া শুরু করে দেয় :

‘এখানে কেবল হিটলারের ঘটনা দিয়ে ইতি টেনে দিলে ব্যাপারটির প্রতি অন্যায় করা হবে। শুধু হিটলারকেই নয়, ডারউইন প্রভাব ফেলেছিলেন আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির ওপরেও। এই তালিকায় আছে কার্ল মার্ক্স, লেলিন এবং স্ট্যালিন।

কার্ল মার্ক্সকে সমাজতন্ত্রের জনক হিশেবে গণ্য করা হয়। সমাজতন্ত্র হিশেবে আমাদের যা বলা হয় বা যা শেখানোহয় তা হলো, সমাজতন্ত্র সমাজের শ্রেণি-বৈষম্য নিয়ে কাজ করে। আদতে, এখানেও একটি শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। সমাজতন্ত্রের আগাগোড়াজুড়ে রয়েছে ডারউইনিজম। আর ডারউইনিজম সম্পর্কিত নাস্তিকতার সাথে। সুতরাং,

সমাজতন্ত্রকে বলতে গেলে নাস্তিকতার প্রতিরূপ হিশেবে কল্পনা করা যায়।

যাই হোক, কার্ল মার্ক্সের সাথে ডারউইনিজমের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় আসা যাক। মূলত, কমিউনিজম তথা সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হলেন দুজন। কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। কমিউনিজমের ওপরে কার্ল মার্ক্সের লিখিত বিখ্যাত একটি বই আছে। এটিকে সমাজতন্ত্রের বাইবেল বলা যেতে পারে। বইটির নাম Das Capital. খুবই মজার ব্যাপার হচ্ছে, কার্ল মার্ক্স নিজে এই বইটি উৎসর্গ করেছিলেন বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনকে। ডারউইনকে দুজনে এত বেশিই পরিমাণে পছন্দ করতেন যে, ডারউইনের প্রথম বই ‘Origin of species বের হলে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এক চিঠিতে কার্ল মার্ক্সকে লেখেন, ‘Darwin, whom I am just now reading, is splendid.[২] এঙ্গেলসের চিঠির প্রত্যুত্তরে মার্ক্স লিখেছেন, “This is the book which contains the basis of natural history of our view.”[৩]

মার্ক্স বলেছেন যে, তারা ন্যাচারাল হিস্ট্রি সম্পর্কে যে-ধারণা পোষণ করে থাকে, সেটার পূর্ণ প্রতিফলন আছে ডারউইনের বইতে। সুতরাং, ডারউইনিজম আর মার্ক্সিজম তথা সমাজতন্ত্র যে—মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কাহিনির এখানেই অবশ্য শেষ নয়। লেবেল নামের এক বন্ধুকে কার্ল মার্ক্স চিঠিতে লিখেছেন, ‘Darwin’s book is very important and serves me as a basis in natural science for the class strugle in history.[৪]

শ্রেণি-সংগ্রামের যে-ভিত্তি এবং প্রকৃতির সবখানে যে সেটি বলবৎ, ডারউইনের রচনাবলি পড়ার পরে সেটি কার্ল মার্ক্স আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করেন। এই কথার সত্যতা পাওয়া যায় কার্ল মার্ক্সের বন্ধু এঙ্গেলস লিখিত একটি বইয়ে। এঙ্গেলস ডারউইন এবং কার্ল মার্ক্সকে একই সমান্তরালে এনে লেখেন, ‘Just as Darwin discovered the law of Evolution in organic nature, so Marx discovered the law of nature in human history.[৫]

অর্থাৎ ডারউইন উদ্ভিদ এবং প্রাণীর অর্গানিক ফিল্ডের যে ‘ল’ আবিষ্কার করেছেন, মার্ক্স সে রকম ‘ল’ আবিষ্কার করেছেন মানবজাতির ইতিহাসের। আরও সহজভাবে, ডারউইন যে-শ্রেণি-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে উদ্ভিদ এবং প্রাণিজগতের আবির্ভাবের কথা বলেছেন, ঠিক সেই একই শ্রেণি-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে মানবজাতির ইতিহাসের বিবর্তনের কথা বলেছেন মার্ক্স।

ডারউইনিজম এবং কমিউনিজমের মধ্যকার সুগভীর সম্পর্ক বোঝতে কার্ল মার্ক্সের একটি জীবনীতে লেখা হয়েছে, ‘Darwinism presented a whole string of truth supporting Marxism and proving and developing the truth of it. The spread of Darwinist evolutionary ideas created a fertile ground for Marxist ideas as a whole to be taken on board by the working class… Marx, Engels, and Lenin attached great value to the ideas of Darwin and pointed to their scientific importance and in this way the spread of these ideas was accelerated.[৬]

অর্থাৎ মার্ক্সিজম তথা কমিউনিজম যে একটি অন্যটির পরিপূরক, সে-কথা এই বক্তব্যগুলোতে একদম সুস্পষ্ট। আরও বলা হয়েছে, ডারউইনের আইডিয়া থেকে মার্ক্স, এঙ্গেলস এবং লেনিনরা উপকৃত হয়েছে এবং সেগুলো কাজেও লাগিয়েছে।

সৌরভ যেন খুব চিন্তায় পড়ে গেল। এই তো কয়েকদিন আগে সৌরভদের ডিপার্টমেন্টের এক বড়ভাই তার কাছে কমিউনিজমের দাওয়াত নিয়ে এসেছিল। রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার থেকে উঠে আসা ধার্মিক যুবক সৌরভ তখন মাত্র ক্যাম্পাসে পা দিয়েছে। তার কাছে বিভাস মণ্ডল নামের একজন কমিউনিস্ট ছাত্র আন্দোলনের নেতা কমিউনিজমের ব্যাপারে একথা-সেকথা বলতে এলে সৌরভ প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা, কমিউনিজম কি নাস্তিকতা-ঘেঁষা কোনোকিছু?

পদটিকা:
[১]Mein Kamp, Hitler, Page : 239-240

[২]Evolution, Marxian Biology & the social scene, Page : 85-87

[৩]Evolution, Marxian Biology & the social scene, Page : 85-87

[৪]Evolution, Marxian Biology & the social scene, Page : 85-87

[৫]Evolution, Marxian Biology & the social scene, Page : 85-87

[৬]The Biography Of Karl Marx, Oncu Yayinevi, Page : 368

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন