ড. জেফরি ল্যাং-পাট টু

অথচ আমরা তো এসব নেতিবাচক গুণাবলি থেকে মুক্ত। আমরাই তো আপনার গুণগান গাইছি। তবে কেন শুধু শুধু পৃথিবীতে মানুষ পাঠানো? আরে! এ প্রশ্ন তো আমারও। আমি নিশ্চিতভাবেই জানতাম, এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। এই প্রশ্নই তো আমার জীবন, আমার শৈশব অন্য রকম করে গড়ে তুলেছিল। মনে হলো, এই বইয়ের লেখক তো আগ বাড়িয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন। নিজ থেকে এমন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এলেন, যার কোনো উত্তর নেই। যে প্রশ্ন মানুষের মনে সন্দেহ, সংশয় ও অবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। আমি বুঝলাম না, মানব সভ্যতার ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে ভয়ংকর এই প্রশ্ন লেখক কেন এভাবে করতে গেলেন? এ এমন এক প্রশ্ন, যার কোনো যুক্তিসঙ্গগত জবাব কারও কাছে নেই।

আমার সারা জীবন বয়ে বেড়ানো এই প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে? কৌতূহলী মন নিয়ে আমি আরও বেশি কুরআনের মাঝে ডুবে গেলাম। আরও বেশি কুরআন আমাকে নিজের মাঝে আকৃষ্ট করে রাখল। যখন কুরআন পড়া শেষ হলো, স্রষ্টার অবিশ্বাসের পেছনে আমার এত দিনকার যত যুক্তি, যত ভাবনা- সব ধূলিস্মাৎ হয়ে গেল। ঈশ্বরে অবিশ্বাস করার মতো আমার কাছে আর কোনো যুক্তিই অবশিষ্ট রইল না। তবে অবিশ্বাসী হবার যুক্তিগুলো খণ্ডন হলেও এর মানে এই না, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধার্মিক হয়ে গেলাম। আমার মেয়ের সাথে একদিন আমি বাগানে হাঁটছিলাম। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল ‘আচ্ছা বাবা! কুরআন পড়ে তোমার নাস্তিকতার পেছনের যুক্তিগুলোর উত্তর পেয়েছ, তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু ঠিক কবে থেকে তুমি ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস করা শুরু করলে? খুবই বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন। কারণ, সে বুঝতে পেরেছিল, কোনো কিছুর বিরুদ্ধে যুক্তি খুঁজে না পাওয়ার মানে এই নয় যে, আমি সেটা বিশ্বাস করি। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।

আমি উত্তর দিলাম, “মা রে! ওইভাবে আসলে বলা মুশকিল। তবে কুরআন পড়া শুরু করার পর থেকে নাস্তিকতার যে দুর্গ আমি গড়ে তুলেছিলাম, যে দেয়াল আমি তৈরি করেছিলাম সযত্নে, সচেতন মনে… এক এক করে তার সব ইট খসে পড়েছে।

দিকে দিনে নাস্তিকতার উপর বিশ্বাস আমার দুর্বল হয়ে পড়ল। যত বেশি নাস্তিকতার উপর আস্থা হারাতে থাকলাম, তত বেশি কুরআন আমার মনের উপর, চিন্তা-চেতনার উপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকল।

কুরআন লেখা হয়েছে খুবই চমৎকারভাবে। শুরুর দিকে অনেক নিয়মকানুন, আইন-কানুনের বর্ণনা। মাঝখানে মজার মজার সব ঘটনা, সুন্দর সুন্দর সব উপমা আর রূপক কথামালা। শেষের দিকে চমৎকার বর্ণনা আর অনুপম ভাষাশৈলি পাঠকের মনে অনুভূতির ঝড় তোলে। থরথর আবেগে বিস্ফোরণমুখ হয়ে ওঠে তার সমস্ত সত্তা, সমস্ত হৃদয়। এত চমৎকার, এত দারুণ, এত মনোমুগ্ধকর সে অনুভূতি! আমার মনের ভেতরকার অবিশ্বাসের দেয়াল কী করে যে ভেসে গেল, আমি নিজেও টের পাইনি। পড়তে পড়তে আমার ভেতরটা এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল।

মনে আছে, আমি যখন সূরা দোহা শেষ করি, ‘শপথ আলোকোজ্জ্বল প্রভাতের, শপথ রাতের অন্ধকারের। তোমার প্রভু তোমাকে ভুলেও যাননি, তোমার থেকে মুখও ফিরিয়ে নেননি… তুমি তো পথহারা ছিলে, তিনি তোমাকে পথ দেখিয়েছেন…’ আমি প্রায় বিশ মিনিট শিশুর মতো কেঁদেছিলাম। মনে হচ্ছিল এ যেন আমারই কথা, এ যেন আমাকেই উদ্দেশ্য করে বলা। অথচ আমি ছিলাম ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নাস্তিক। আমি কোনোভাবেই এ অনুভূতি ভুলতে পারিনি। সর্বক্ষণ আমার মনের ভেতর গুনগুন গুঞ্জরণ বয়ে চলছিল।

কুরআন পড়া শেষে নাস্তিকতা নিয়ে দ্বিধা চরম রূপ ধারণ করল। কিন্তু আমি জানতাম না, আমার এখন কী করা উচিত।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। কুরআনের প্রভাবে আমার মন-মস্তিষ্ক ও হৃদয় আচ্ছন্ন। কখনো আমি ঘুমাতে পারতাম না। কখনো আমি এলেমেলো উদাসিন হাঁটতাম। কুরআনের প্রশ্ন, কুরআনের বক্তব্য প্রতিনিয়ত আমাকে ভাবিয়ে তুলত। নিজের কাছে নিজেকেই অচেনা লাগত। ভাবতাম, আমি তো একজন নাস্তিক। অন্তত বাইরের পৃথিবীর সবাই তাই জানে। আমার তো এমন অনুভূতি হবার কথা নয়।

মনের এই অবস্থা নিয়ে কারও সাথে আলাপ করা দরকার, শেয়ার করা দরকার। কিন্তু আমি কার কাছে যাব?

যে মুসলিম পরিবারের সাথে আমার পরিচয় ছিল, তাদের সাথেও কথা বলতে পারছিলাম না। কারণ, তাদের নিজেদেরই ইসলাম নিয়ে জ্ঞান অত গভীর ছিল না। আমি শুনেছিলাম ক্যাম্পাসে মুসলিমদের মসজিদ আছে। ভাবলাম, সেখানে গিয়ে আলাপ করা যেতে পারে।।

অনেক আগে আমার এক ইহুদি ছাত্রীর সাথে, একবার চার্চের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। সে আমাকে বেইজমেন্টের একটা জায়গা দেখিয়ে বলেছিল, এর নিচে মুসলিমদের মসজিদ। তারা ওখানে প্রার্থনা করে।’

আমি নিচে তাকালাম। জায়গাটা চার্চের সিড়ি বেয়ে অনেক নিচে। কিছুটা অন্ধকার।

আমার সেই পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল। ভাবলাম, সেখানে গিয়ে মুসলিমদের সাথে আলাপ করি। হতে পারে, তাদের সাথে কথা বলে এমন কোনো উত্তর। পাব, যাতে আমার মনে সন্তুষ্টি আসবে।

আমি চিন্তা করছিলাম রবিবারে যাব। কিন্তু একদিন একদিন করে দিন পার হয়ে। গেল, যাওয়া আর হয়ে উঠছিল না। বলতে গেলে ঠিক সাহস করে উঠতে পারছিলাম না।

শেষে একদিন বুকে সাহস এনে বেইসমেন্টের সিঁড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুব নার্ভাস লাগছিল। আমার হাত-পা কাঁপছিল। একবার মনে হলো নিচে যাই। আবার মনে হলো, আচ্ছা দেখি এই রাস্তা ছাড়া অন্য কোনো পথ আছে কিনা। একটু জেনে আসি, আসলেই এখানে মুসলিমরা নামাজ পড়ে কিনা।

আসলে আমি নিজের কাছ থেকেই নিজে পালাতে চাচ্ছিলাম। চার্চের আশেপাশে কতক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। না, এই পথ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই। চার্চের ভেতরে এক ঝাড়দার ঝাড় দিচ্ছিল। আমি গিয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, তুমি কি বলতে পার, মসজিদটা কোন দিকে? লোকটা এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন ঝাড় দিয়ে আমার মুখে একটা বাড়ি মারবে। কী বললে? তোমার কি মাথা খারাপ হলো নাকি? চার্চের ভেতরে এসে মসজিদের খোজ করছ?

আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। বেলা পড়ে এসেছে। আমি মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দিলাম, ‘এত ভয়ের কী আছে। সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে গিয়েই দেখা যাক না!’

আমি আবার সিঁড়ির গোড়ায় ফিরে এলাম। আবার সাহস হারিয়ে ফেললাম। দাড়িয়ে রইলাম কয়েক সেকেন্ড। যতই আমি নিচের দিকে যাচ্ছিলাম ততই আমার হাটু দুর্বল হয়ে আসছিল, পা হয়ে আসছিল ভারী। দরজার কাছে পৌছাতে পৌছাতে আমি রীতিমতো কাঁপছি। কী মনে করে পেছন ফিরে দিলাম ছুট। একেবারে ঠিক সিঁড়ির মাথায় গিয়ে থামলাম।

‘জেফ! তুমি একটা আস্ত গর্দভ!’ আমি নিজেকে নিজে ধিক্কার দিচ্ছিলাম, তুমি প্রতিদিন এই ইউনিভার্সিটির মধ্য দিয়ে হেঁটে বেড়াও। অথচ তুমি এই নিচে নামতে ভয় পাচ্ছ। এত ভয়ের কী আছে? হতে পারে মসজিদে কেউ নেই। আর থাকলেও তো সব ছাত্ররাই আছে।

আমি আবার ঘুরলাম। আবার একই ঘটনা। ঘামে আমার সারা শরীর ভিজে উঠেছিল। আমি কিছুক্ষণ দম নিয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে উপরে আকাশের দিকে তাকালাম। আমি জানি না, আমরা মানব সন্তানেরা বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে এই কাজ কেন করি।

আকাশটা দেখতে লাগছিল রাজকীয়। শূন্যে ভেসে যাওয়া মেঘ, তার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের আলো নরম হয়ে মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

বহু বছর ধরে আমি যা করিনি, আমি তাই করলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করলাম, “ইয়া খোদা! তুমি যদি সত্যিই থেকে থাক, তবে আমাকে সাহস যোগাও। যাতে আমি নিচে গিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে পারি।’

কিছুক্ষণ আমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখি, যদি কোথাও অলৌকিক কোনো নিদর্শন দেখতে পাই। হঠাৎ করে হয়তো আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। কিংবা একটা পাখি এসে বসল আমার কাঁধের উপরে। এমনকি হয়তো কোনো ভূমিকম্প হলো। এই পৃথিবীতে কত সহস্র ভূমিকম্পই তো হয় প্রতিদিন। আমি অলৌকিক কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। শুনতে এখন হয়তো গাধামি মনে হচ্ছে, কিন্তু তখন আমার অনুভূতিটা এমনই ছিল। কোনো কিছুই ঘটল না। আমি পেছন ফিরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম নিচে।

আলতো ছোঁয়ায় দরজা খুললাম, উঁকি দিলাম ভেতরে…।

আগের অংশ টুকু পড়তে
[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন