ড. জেফরি ল্যাং-পাট থ্রি

ভেতরে দুজন ছাত্র বসা ছিল।

তাদেরই একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?

নার্ভাসনেস আবার ফিরে এল শরীরে। আমি আমার পরিচিত কয়েকটা মুসলিম নাম বলে গেলাম, এখানে কি মাহমুদ, সারাস কিংবা উমর আছে?

তারাও আমার দিকে চারচের ঝারুদারের মতো তাকিয়ে রইল ‘ন…না… এই নামে এখানে কেউ নেই।

আমি দুঃখিত। আমি মনে হয় ভুল জায়গায় এসে পড়েছি আমি পেছন ফিরলাম ফরে যাবার জন্য। এমন সময় দরজা দিয়ে এক মালয়েশিয়ান ছেলে ঢুকল। পরনে তার ঐতিহ্যবাহী মালয়েশিয়ান পোশাক। পরে জেনেছি, তার নাম আবু হানান।

সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি ইসলাম সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইছেন?

আমি কিছুটা আত্মস্থ হলাম ‘হা! আসলেই তাই। দয়া করে জুতা খুলে ভেতরে আসুন। এখানে আমরা নামাজ পড়ি তো…’

আমি জুতা খুলে ভেতরে এসে বসলাম।

‘আপনি ইসলাম সম্পর্কে আসলে কী জানতে চাইছেন?

আমি আমার কুরআন পড়ার কথা বললাম।

আবু হানান তিন মিনিট ধরে নিজের মতো করে কী কী যেন বলে গেল, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। এরপরে সে বলা শুরু করল, মানুষ যখন মারা যায়, তখন ফেরেশতারা তার আত্মা নিয়ে যায়। পাপী হলে পেটাতে থাকে…’

একে তো নিচে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে গা ছমছমে পরিবেশ, তার উপর মৃত্যুর পরে ফেরেশতাদের মারপিটের আলোচনা। আমি একটু উসখুস করে বলে উঠলাম, ‘ইয়ে, আমার অফিসে একজনের সাথে দেখা করার কথা। আমি তাহলে যাই।

আমি বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম, এমন সময় আবার দরজা খুলে গেল। ততক্ষণে দরজার বাইরে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। যিনি মসজিদে ঢুকলেন তার মুখে লম্বা দাড়ি, মাথায় আরবদের মতো বাধা চাকতি। চোখে ছিল ঝকঝকে সানগ্লাস, হাতে লাঠি। তার গায়ের জুব্বা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা।

পেছনে অস্তগামী সূর্য, তার সামনে এমন একটা মানুষের আবির্ভাব। আমার মনে হচ্ছিল বাইবেলের নবি মুসা বুঝি সিনাই পর্বত থেকে আমার সামনে এসে উদয় হলেন।

তিনি ভেতরে এসে একপাশে এসে বসলেন। তারপর হাত তুলে এক মনে বিড়বিড় করে কী জানি কী দোয়া পড়ে গেলেন। দুচোখ তার বন্ধ। দোয়া শেষে ইউসুফ নামে এক ছাত্রের সাথে আরবিতে কী সব বলে গেলেন, আমি তার এক বিন্দু বিসর্গও বুঝিনি।

শেষে ইউসুফ আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলল ‘প্রফেসর,

তিনি আমার দিকে কিছুটা কৌতূহলি দৃষ্টিতে চাইলেন প্রফেসর’ তারপর আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তার নাম ছিল খাসান। এই মসজিদে তিনি ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আমেরিকার তাবলীগ জামায়াতের অন্যতম আমীর। যদিও বয়সে খুবই তরুণ। পেশায় ছাত্র।

খাসান আমার কাছে এসে বসলেন। আমার নার্ভাসনেস দেখে গায়ে হাত দিয়ে আমাকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার নাম কী?’ এই প্রথম কেউ আমার নাম জানতে চাইলেন।

‘জেফ ল্যাং। ‘আপনি কী করেন? ‘আমি এখানকার গণিত বিভাগে শিক্ষকতা করি। ‘আপনি কি গণিতের প্রফেসর?

‘জি’।

তিনি আশপাশের দুজনের দিকে সম্মতির ভঙ্গিতে তাকালেন। তারপরে আমাকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “শুনলাম আপনি ইসলাম নিয়ে কিছু জানতে চাইছিলেন?

আমি কুরআন ও অন্যান্য বইপত্র ঘেঁটে ইসলাম নিয়ে যা জানতাম, তা বলে গেলাম। আমার উত্তর শুনে তিনি কিছুটা মুগ্ধ হলেন। তিনিও আমাকে ইসলামের বেশ কিছু নিয়মকানুন, বিধি-নিষেধ ইত্যাদি নিয়ে এক নাগাড়ে বলে গেলেন। কঠিন কঠিন সব কথা শুনে আমি কিছুটা আলোচনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলাম ।

শেষে আমি বললাম, আমার আসলেই এখন যাওয়া দরকার। তিনি আমার দিকে কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চাইলেন, আপনার কি ইসলাম সম্পর্কে আর কোনো কিছুই জানার নেই?

আমি উঠতে যাচ্ছিলাম, তেমন একটা না। আচ্ছা আপনি কি আমাকে বলতে পারেন, মুসলিম হবার অনুভূতি আসলে কেমন? একজন মুসলিম হিসেবে মনের ভেতরে আসলে আলাদা করে কী অনুভূতি হয়? খানিক্ষণের নীরবতা। খাসান মানুষ হিসেবে যেমন ছিলেন ধার্মিক, ঠিক তেমনি দাওয়াহর কাজে তার বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। কিন্তু আমার এই প্রশ্ন শুনে তিনি কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলেন। হয়তো এমন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি এর আগে কখনো হতে হয়নি তাকে।।

তিনি মাথা নিচু করে বেশ কিছুক্ষণ ভাবলেন। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কিছু দোয়া পড়ে গেলেন। সম্ভবত আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছিল, যাতে সুন্দর কোনো জবাব দেয়া যায়। তারপর আস্তে আস্তে কথা বলা শুরু করলেন। এত ধীরে আর এত গভীরে ডুবে গিয়ে… আমি আজও সে দৃশ্য ভুলতে পারিনি।

চোখ বন্ধ করে তিনি বলে চললেন, ‘আল্লাহ…তিনি অত্যন্ত দয়ালু মেহেরবান। একজন মা তার নবজাতক শিশুকে যতটা ভালোবাসেন, আমাদের প্রতি তার ভালোবাসা তার চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি। আমরা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই করতে পারি না। আমরা শ্বাস নেই আল্লাহর ইচ্ছায়, আমরা নিশ্বাস ছাড়ি, সেটিও তার ইচ্ছায়। এমনকি আমরা যখন মাটিতে হাঁটার জন্য পা তুলি, তখনো তার ইচ্ছা ছাড়া পা পড়ে না। বিশাল গাছের অতি ক্ষুদ্র একটি পাতাও যখন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে মাটির দিকে আসে, তখন প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর আদেশ তার সঙ্গী হয়।

আমরা মুসলিমরা যখন মাটিতে মাথা ছুঁয়ে নামাজ পড়ি, তখন আমরা হৃদয়ে পরম তৃপ্তি, সুখ আর প্রশান্তি অনুভব করি। এ এমনই এক অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ভালোভাবে বুঝতে চাইলে আপনার নিজেকে সে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তিনি কথা শেষ করে চোখ মেললেন। তাকে খুব হতাশ দেখাচ্ছিল। হয়তো তার নিজের কাছেও জবাবটা পরিপূর্ণ মনে হয়নি।

কিন্তু আমি তার চোখেমুখে দেখতে পেলাম, স্রষ্টার সামনে আনুগত্যের মস্তক নত করার আকাঙ্ক্ষা, নিজের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-যাতনা তুলে ধরার মিনতি, আল্লাহর সামনে নিজের সর্বস্ব সপে দেয়ার পরম পরিতৃপ্তি । তিনি আমার দিকে ফিরে হঠাৎ করেই বলে উঠলেন ‘তো, আপনি মুসলিম হতে চান?

আমি উচ্চস্বরে হেসে বললাম, আপনার কী মাথা খারাপ হয়েছে নাকি? আরে নাহ! আজকে আমি তো এসেছি সামান্য কিছু প্রশ্ন করতে। আমার শরীর ভারী হয়ে উঠেছিল, ঘামে ভিজে উঠেছিল আমার কপাল, ঘাড়। মূলত হাসি দিয়ে আমি নিজেকে হাল্কা করতে চাচ্ছিলাম।

তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, আমার মনে হয়। আপনি মনে মনে বিশ্বাস করেন। তাহলে সত্যকে স্বীকার করেই দেখুন না…’

আমার মাথার ভেতর ঘুরছিল, আমি যদি মুসলিম হই, তবে আমার ক্যাম্পাস, আমার পরিচিত আত্মীয়, বন্ধু মহলে বেশ একটা হাসাহাসি পড়ে যাবে। কল্পনার চোখে আমি দেখতে পারছিলাম, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে, আর আমি ইনিয়ে-বিনিয়ে আমার যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমি যেন সবার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ নিজ কানে শুনতে পাচ্ছিলাম।

খাসানের সর্বশেষ কথা শুনে আমার এতক্ষণের কল্পলোকের সব আওয়াজ থেমে গেল। আমি শান্ত হয়ে বসলাম। আমার হৃদয় অনুভূতিশূন্য হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল আমার মায়ের কথা। মা বলতেন বাবা! জীবনে যা-ই কিছু তুমি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করবে, যা-ই তুমি সত্য বলে জানবে, তা-ই তুমি ধারণ করতে চেষ্টা করবে। সে সত্যকে গ্রহণ করতে কখনো পিছপা হয়ো না। এমনকি যদি সারা পৃথিবীও তোমার বিরুদ্ধে থাকে, তবুও…’ জানি, মায়ের কথাটা অনেকটা নীতি বাক্যের মতো শোনাচ্ছে। কিন্তু ঐ মুহূর্তে মায়ের এই কথাটাই মনে পড়ে গিয়েছিল আমার।

আমাদের আলাপের ফাকে আরও দুজন এসে যোগ দিয়েছিলেন। পাঁচ জনের দিকে ফিরে আমি মাথা দোলালাম, হ্যা, আমি মুসলিম হতে পারি…’

আপনি যদি তাদের চেহারা দেখতেন! দেখে মনে হচ্ছিল, তারা একেকজন চাঁদে যাওয়া প্রথম মানুষ। খুশিতে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছিলেন, হাতে হাত মিলাচ্ছিলেন। মুখ থেকে হাসির রেখা যাচ্ছেই না। তাদের অভিব্যক্তি দেখে আমি কিছুটা অভিভূত হলাম।।

এর মধ্যেই খাসানের মতো আরেক বাইবেলিয় চরিত্র এসে হাজির। সেই লম্বা জুব্বা, লম্বা দাড়ি। তার বিশাল পেট ছিল অনেকটা সান্তা ক্লজের মতো।

একজন তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন মোস্তফা ভাই! ইনি মুসলিম হতে যাচ্ছেন।


আগের অংশ টুকু পড়তে
[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন