ড. জেফরি ল্যাং

উপস্থিত ভাই ও বোনেরা, আপনাদের সবাইকে সালাম। আপনাদের সবার উপর আল্লাহ তায়ালার রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

যেকোনো ঘটনা শুরু করার আগে একটা ভূমিকা থাকে। আমি নিজের পরিচয় দিয়ে শুরু করতে চাই।

আমি ড. জেফরি ল্যাং। আমেরিকার কানসাস ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর। মূলত অঙ্ক পড়ানোই আমার কাজ। তবে এখানে এসেছি আপনাদের সাথে আমার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা শেয়ার করতে।

অনেকের ধারণা, আমি একজন খ্রিষ্টান থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম। মূলত আমি খ্রিষ্টান ছিলাম না। আমি ছিলাম স্রষ্টার অনস্তিত্বে বিশ্বাসি একজন নাস্তিক।

আমার জন্ম আমেরিকার কানেক্টিকাটের এক রোমান ক্যাথলিক পরিবারে। জীবনের প্রথম ১৮ বছরের অধিকাংশ সময়ই কেটেছিল ক্যাথলিক স্কুলে। স্কুলে থাকতেই আমার মনে অনেক প্রশ্নের উদয় হতো, যার কোনো সদুত্তর খুঁজে পেতাম না। দিনে দিনে রোমান ক্যাথলিক চার্চসহ যত প্রতিষ্ঠান ছিল, সবকিছুর উপর আমার অনীহা চলে এসেছিল।

বয়স ১৮ হতেই আমার মনে হয়েছিল, ‘ঈশ্বর বলে আসলে কেউ নেই। ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন, তিনি যদি দয়ালুই হবেন, তবে কেন পৃথিবী জুড়ে এত অশান্তি, হতাশা, দুঃখ, কষ্ট? কেন তিনি আমাদের সবাইকে স্বর্গে তুলে নিয়ে যান ? কেন তিনি আমাদেরকে এত দুঃখ ভোগ করার জন্য পৃথিবীতে পাঠালেন?

একসময় রোমান ক্যাথলিক ধর্ম ছেড়ে আমি পুরদস্তুর নাস্তিক হয়ে যাই। শিক্ষা জীবনে আমি পারডু ইউনিভার্সিটি থেকে প্রথমে মাস্টার্স ও পরে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। পড়া শেষে সানফ্রান্সিস্কো ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিই শিক্ষক হিসেবে। সেখানে অনেক মুসলিম ছাত্রের সাথে আমার পরিচয় হয়। অনেকের সাথে আমার ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলাপ আলোচনা হতো। ইউনিভার্সিটিতে প্রায় সময় আমি আমার রুম খোলা রেখে যেতাম। আমি ছিলাম আত্মভোলা টাইপের। আমি জানতাম, দরজায় তালা লাগিয়ে গেলে আমি নির্ঘাত চাবি হারিয়ে ফেলব। তার চেয়ে এই ভালো, রুম খোলা রাখা; যাতে যখন তখন নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করা যায়। আমার ছাত্র-ছাত্রীরাও এসে বিভিন্ন সময় তাদের এসাইনমেন্ট জমা রেখে যেত।

একদিন আমার রুমে ঢুকে দেখি টেবিলের উপর একটা সবুজ মলাটের বই রাখা। ভাবলাম, হয়তো কোনো ছাত্র বইটা ভুলে রেখে গেছে। কাছে গিয়ে খেয়াল করে দেখি, বইটার উপরে লেখা পবিত্র কুরআন। সাথে ইংরেজি অনুবাদ। প্রথমটায় আমি কিছুটা অবাকই হয়েছিলাম, কী ব্যাপার! এই জিনিস কে এখানে রেখে গেল? একটু ভাবতেই আঁচ করতে পারলাম, আমার পরিচিত এক মুসলিমই বোধহয় রেখে গেছেন। কিন্তু তিনিও বা কী বুঝে আমাকে কুরআন। দিয়ে গেলেন? তিনি কি আমাকে তার ধর্মে দীক্ষিত করতে চাইছেন? অথচ তিনি নিজেইতো তেমন একটা ধার্মিক নন।

পরে ভাবলাম, আমি নিজে একজন সন্দেহবাদী মানুষ। তাই হয়তো আমার সাথে তিনি ইসলাম নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলতে চাইছেন না। হয়তো নিরবেই বলতে চাইছেন, আপনি তো আমাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলেন। এই নিন আমাদের কুরআন। এটা পড়লেই আমাদের ধর্ম সম্পর্কে আপনার ভালো একটা ধারণা হবে। আমি তার সাথে দেখা হলে এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করিনি। আমি আমার ফ্ল্যাটের বুক শেলফে কুরআনের কপিটা রেখে দিয়েছিলাম। দু সপ্তাহ পরের কথা। পারডু ইউনিভার্সিটিতে থাকতেই আমার সব বই সানফ্রান্সিস্কোর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তত দিনে বইগুলো এসে পৌঁছায়নি। তাই আমার কাছে পড়ার মতো তেমন কিছুই ছিল না। একটা ম্যাগাজিন ছিল, তাও দু-দুবার পড়া শেষ। এক রাতে ফ্ল্যাটে বসে অলস সময় কাটাচ্ছিলাম। টিভি দেখতে বসেও একঘেঁয়েমি লাগছিল। তাই বন্ধ করে দিলাম। তাহলে কী করা যায়? আমি এদিক-সেদিক তাকালাম। হঠাৎ করে টেবিলের এক কোণে রাখা কুরআনের অনুবাদটা চোখে পড়ল।

আমি উদাসীন ভঙ্গিতে কুরআনটি হাতে তুলে নিলাম। জানি, এই বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা পড়লেই আমার একঘেঁয়েমি চলে আসবে। এমনকি, পড়তে পড়তে ঘুমিয়েও পড়তে পারি । হাতে যখন কিছুই করার নেই, দু-এক পৃষ্ঠা উল্টেই দেখা যাক। কুরআন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এর আগেও আমি বেশকিছু ধর্মগ্রন্থ পড়েছিলাম। সেগুলোতে সাধারণত নানা গল্প, পৌরাণিক ঘটনা থাকে। ভাবলাম এটাও হয়তো তেমনই কিছু একটা হবে। আমি আস্তে আস্তে পাতা উল্টানো শুরু করলাম। প্রথম পৃষ্ঠা, প্রথম সূরা। সূরা ফাতিহা। শুরুটা এরকম, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। তিনি বড় দয়ালু ও দয়াময়। তিনি বিচার দিবসের মালিক।

আমি ভাবলাম, খারাপ কী? এটা বোধহয় বাইবেলের Psalm তথা গীত সংহিতার মতো। মুসলমানরা যাকে জবুর বলে চিনে। এই Psalm তথা গীত সংহিতা ঈশ্বরের নানা প্রশংসা বাণীতে ভরপুর। আমার মনে হলো, কুরআন বোধহয় তেমনই কিছু একটা।

কয়েক লাইন পড়ে আমি কিছুটা চমকে গেলাম। ঈশ্বরের প্রশংসা পরবর্তী লাইনগুলোর সুর আমূল বদলে গেল। সেখানে পথ নির্দেশের জন্য প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে, আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ দেখাও। এমন পথে পরিচালিত কর, যে পথ তোমার পছন্দের, যে পথ তোমার প্রিয় বান্দাগণ অনুসরণ করে গেছেন। এমন পথে আমাদের নিও না, যে পথ অভিশপ্ত, পথভ্রষ্ট। ‘বাহ, উপস্থাপনাটা তো দারুণ’ আমি কিছুটা চমকৃত হয়েছিলাম, ‘প্রশংসা করতে করতে লেখক আমাকে কী সুন্দর সঠিক পথের দিশার জন্য প্রার্থনার দিকে নিয়ে গেছেন। আমি অবশ্য তখন মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম, এটা কোনো মানুষেরই লেখা। আমি পরের সুরাতে গেলাম। সুরা আল বাকারা। প্রথম দিকেই লেখা ছিল ‘আলিফ-লাম-মিম। নিঃসন্দেহে এই বইটাই হলো সত্যিকারের পথ-নির্দেশ।তাদের জন্য যারা অদৃশ্য জিনিসের উপর ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। পড়তে পড়তে আমি ভাবছিলাম, কী ব্যাপার! এই বই কি আমার সাথেই কথা বলছে? একটু আগেই তো আমার মনে সঠিক পথ নিয়ে প্রশ্ন জেগেছিল। আর এখন দেখি সে প্রশ্নের উত্তর সাথে সাথে পেয়ে গেলাম। কুরআনের বাচনভঙ্গি এমন,যেন ঈশ্বর সরাসরি তার পাঠকের সাথে কথা বলছেন। আমি তো ধারণা করেছিলাম- ধর্মগ্রন্থ হবে ইতিহাস, ঘটনা, ভূগোল ইত্যাদি আলোচনায় ভরপুর। যেমনটা আমি ইতোপূর্বে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে পেয়েছিলাম।

কিন্তু এই বইয়ের ধরন-ধারণ তো পুরোপুরিই আলাদা। দেখে মনে হচ্ছে, ঈশ্বর এই গ্রন্থের লেখককে সরাসরি কিছু বলছেন। আর তিনি ঈশ্বরের ভাষাতেই তা বর্ণনা করছেন। এর মাঝে কোনো বিকৃতি কিংবা কারও নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই। সত্যিকারের ওহীর বাণী যেমন হবার কথা, ঠিক তেমনই।

কুরআন পড়লে মনে হয় যে, পাঠকের সাথে কোনো সংলাপ চলছে। এক জায়গায় কিছু প্রশ্ন করা হচ্ছে, মনে জিজ্ঞাসা জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। আবার অন্যখানে তার জবাব দিয়ে দেয়া হচ্ছে। আবার কিছু প্রশ্ন, আবার উত্তর। কুরআন তার পাঠককে কখনই অমনোযোগী হতে দেয় না। নিজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। এ এমনই এক রহস্যময় কিতাব!

কুরআন পড়তে পড়তে আমার অনুভূতি ছিল এমনই। একটু পড়ি… হয়তো মনে একটা প্রশ্ন জাগে। কিছুদূর গেলে আবার তার জবাব পেয়ে যাই। আমি কুরআন পড়ে চললাম। এই বইয়ের কথা বলার ধরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

পড়তে পড়তে আমি সেখানটায় চলে এলাম, যেখানে মানব সৃষ্টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। এটা ছিল সূরা বাকারার ৩০ নং আয়াত। শুরুটা এমন ‘…আর যখন তোমার রব ফেরেশতাদের মাঝে ঘোষণা করলেন, আমি পৃথিবীতে খলিফা (প্রতিনিধি) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি…’ তার মানে সৃষ্টিকর্তা মানুষ বানিয়ে দুনিয়াতে পাঠাচ্ছেন বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে।

আমার এত দিনকার জেনে আসা শিক্ষা ভালোই ধাক্কা খেল। এ কেমন কথা? কুরআন বলছে মানুষকে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে এক সুমহান দায়িত্ব দিয়ে। অথচ বাইবেল বলছে, আদি পিতা আদমের পাপের শাস্তিস্বরূপ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। দুনিয়ার মানুষের আগমনের কারণ, এভাবেই তো বুঝে এসেছি এত দিন। না, এই বইয়ের লেখক বড় ধরনের ভুল করছেন।

তারপর আমি পড়ে চললাম, তখন ফেরেশতারা বলল, আপনি কি এমন কাউকে পাঠাতে চাইছেন যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করবে, রক্তারক্তি করবে? আমরা ফেরেশতারাই তো আছি আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে। আমি রীতিমতো চমকে উঠলাম। আমার ভেতরকার সেই পুরোনো রাগ-ক্ষোভ আবার ফিরে এল। ফেরেশতারা যেন ঈশ্বরকে বলতে চাইছিলেন- ‘আপনি এই নিকৃষ্ট সৃষ্টি বানাতে চান? পাঠাতে চান দুনিয়ায় যারা খুনোখুনি আর রক্তারক্তি করবে, পৃথিবীটা হানাহানিতে ভরিয়ে দিবে? যাদের মননে আছে হিংস্রতা, বিধ্বংসী মানসিকতা।

পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন