মূল:নারীর হজ ও উমরাহ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

১- তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা শর্ত। কোনো মহিলা হায়েয বা নিফাস অবস্থা অথবা বিনা অজুতে তাওয়াফ করতে পারবে না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা তাঁর হজের সময় হায়েয এসে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন:

«افعلي كما يفعل الحاج، غير أن لا تطوفي حتى تطهري».

“হাজীরা যা করে তুমিও তা করো, তবে পবিত্র না হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করো না”।[1]

২- মহিলা হাজী সাহেবা ‘রামল’ করবে না। রামল হলো উমরার তাওয়াফ এবং হজের তাওয়াফে কুদুমের প্রথম তিন চক্করের সময় ঘন ঘন পা ফেলে শক্তি প্রদর্শন করে তাওয়াফ করা। এটি পুরুষদের জন্য সুন্নাত। মহিলাদের জন্য নয়।

৩- অনুরূপভাবে মহিলা হাজী সাহেবগণ ‘ইযতেবা’ও করবে না। ‘ইযতেবা’ হলো, উমরার তাওয়াফ এবং হজের তাওয়াফে কুদুমের প্রথম তিন চক্করের সময় গায়ের চাদরকে ডান বগলের নীচে দিয়ে নিয়ে কাঁধের ওপর এমনভাবে রাখা যেন ডান কাঁধ খোলা থাকে। এটিও শুধু পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য, নারীদের জন্য নয়।

৪- মহিলাদের উচিৎ ভিড়ের সময় কা‘বার পার্শ্বদেশ থেকে একটু দূর দিয়ে তাওয়াফ করা যাতে পুরুষদের সাথে ধাক্কাধাক্কি বা মিলেমিশে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে।

৫- হাজারে আসওয়াদের নিকট পুরুষদের সাথে মেলা-মেশা থেকে মহিলাদের বিরত থাকতে হবে এবং হাজারে আস্ওয়াদে চুমো খাওয়ার জন্য পুরুষদের সামনে মুখ খোলা জায়েয হবে না। কেননা, এটি গুরুতর অন্যায় এবং বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

৬- তাওয়াফ, সা‘ঈ এবং অন্যান্য সময় পর পুরুষের সামনে মুখ খোলা রাখা, পর্দাহীন অবস্থায় থাকা এবং সাজ-সজ্জা প্রকাশ করা নিঃসন্দেহে গুনাহের কাজ। বিশেষ করে হাজারে আসওয়াদে চুমো দেওয়ার সময়।

লক্ষণীয় যে, হারামের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করা সবচেয়ে বড় গর্হিত কাজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يُرِدۡ فِيهِ بِإِلۡحَادِۢ بِظُلۡمٖ نُّذِقۡهُ مِنۡ عَذَابٍ أَلِيمٖ﴾ [الحج: ٢٥]

“আর যে সেখানে সীমালংঘন করে পাপ কাজের ইচ্ছে করে, তাকে আমি আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৫] অনেক মহিলা এভাবে বেপর্দা হয় চলার জন্য হারামের মত স্থানে নিজেও  গুনাহগার, হয়, অন্যদেরকেও  গুনাহগার, করে।

৭- যে সময়গুলোতে পুরুষরা কা‘বার পাশে কম থাকে, সে সময়গুলোতে তাওয়াফ করতে মহিলাদের চেষ্টা চালাতে হবে। আতা ইবন আবি রাবাহ্ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী-গণ তাওয়াফের সময় পুরুষদের সাথে মিশতেন না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন তাওয়াফ করতেন, তখন তিনি পুরুষদের থেকে দূরে থাকতেন। এক মহিলা তাকে বলল, চলুন, আমরা হাজারে আসওয়াদের নিকট যাই। তখন তিনি বললেন: ‘আমার কাছ থেকে চলে যাও।’ তিনি যেতে রাজি হননি।[2] উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মহিলাদের পুরুষদের সাথে মিশতে মানা করেছিলেন। একদা দেখলেন, এক পুরুষ মহিলাদের সাথে তাওয়াফ করছে। তখন তিনি তাকে ছড়ি দিয়ে মারলেন।[3]

তারপর সা‘ঈ করার স্থানে যাবে এবং যখন সাফা পাহাড়ের কাছে পৌঁছাবে তখন বলবে:

﴿إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّهِۖ فَمَنۡ حَجَّ ٱلۡبَيۡتَ أَوِ ٱعۡتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَاۚ وَمَن تَطَوَّعَ خَيۡرٗا فَإِنَّ ٱللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ ١٥٨﴾ [البقرة: ١٥٨]

উচ্চারণ: “ইন্নাস্ সাফা ওয়াল মার্ওয়াতা মিন শা‘আ’ইরিল্লাহি ফামান হাজ্জাল বাইতা আও ই‘তামারা ফালা জুনাহা ‘আলাইহি আন ইয়াত্তাওয়াফা বিহিমা ওয়ামান তাত্বাওওয়া‘আ খাইরান ফা ইন্নাল্লাহা শাকিরুন ‘আলীম।” [সূরা আল-বাকারাহ আয়াত: ১৫৮]

এ প্রথমবারই শুধু এ দো‘আ পড়তে হবে। তারপর হাজী সাহেবা কা‘বার দিকে মুখ করে দাঁড়াবেন এবং দু’হাত উপরে উঠিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করবেন এবং যা ইচ্ছা দো‘আ করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময়ে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন তারপর যে দো‘আ করতেন তা হলো,

«لآ إلَهَ إلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٍ، لآ إلَهَ إلَّا اللهُ وَحْدَهُ، أنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ».

উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুল্কু ওয়ালাহুল হাম্দু ওয়াহুওয়া ‘আলা কুল্লি শাই’ইন ক্বাদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু, আনজাযা ওয়া‘দাহু ওয়া নাসারা ‘আব্দাহু ওয়াহাযামাল আহ্যাবা ওয়াহ্দাহু।”

তারপর মারওয়ার দিকে যাবে। মারওয়ায় পৌঁছার সাথে সাথে তার এক চক্কর পূর্ণ হয়ে যাবে। তারপর এভাবে সাফা এবং মারওয়ার মাঝে সাত চক্কর লাগাবে। সা‘ঈর সময়ে মনে যা ইচ্ছে হয় দো‘আ করবে। ইচ্ছা করলে সুন্নাত মোতাবেক যিকির, কুরআন পাঠও করতে পারে।

মনে রাখা দরকার যে,

সা‘ঈর জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়, তবে পবিত্র থাকা মুস্তাহাব।

মহিলা হাজী সাহেবাগণ দুই সবুজ চি‎‎হ্নর মাঝখানে দৌড়াবেন না। কারণ মহিলাগণ দৌড়ালে তা তাদের জন্য বেপর্দা হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনুরূপভাবে মহিলা হাজী সাহেবগণ সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের উপরেও উঠবেন না। ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, “মহিলাগণ সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে চড়বে না এবং উচ্চ স্বরে তালবিয়াও পাঠ করবে না”[1]

সা‘ঈ শেষ করার পর মহিলাগণ তাদের চুলের সমস্ত বেণি হতে এক অঙ্গুলির মাথা পর্যন্ত (এক সেন্টিমিটার পরিমাণ) ছোট করবেন।

আর এভাবেই মহিলা হাজী সাহেব তার উমরার কাজ সমাধা করার মাধ্যমে হালাল অবস্থায় উপনীত হবেন এবং পূর্বে যা যা তার ওপর হারাম ছিল তা আবার হালাল হয়ে যাবে।

তবে মনে রাখতে হবে যে, মহিলাগণ যেন তাদের চুল কাটার জন্য কোনো বেগানা পুরুষের সামনে তা না করে। বরং এমনভাবে করবে যাতে কেউ তার চুল না দেখে।

তামাত্তু হজকারী হাজী সাহেবার জন্য হজের কার্যাবলী:

যিলহজ মাসের আট তারিখ চা-শতের সময় মহিলা হাজী সাহেবা যে যেখানে আছে সেখান থেকেই হজের ইহরাম বাঁধবেন। ইতিপূর্বে উমরাহ এর ইহরাম বাধার পূর্বে যা যা করেছেন এখনও তাই করবেন। অর্থাৎ গোসল, সুগন্ধি এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা লাভ করার পর হজের জন্য দৃঢ় সংকল্প করে বলবেন: لبيك حجاً অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি হজের জন্য হাযির। হাযির।

তারপর নিম্নোক্ত তালবিয়া পাঠ করবেন:

«لَبَّيْكَ اَللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ».

“লাববাইকা আল্লাহুম্মা লাববাইক, লাববাইকা লা শারীকা লাকা লাববাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান-নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাকা”।[2]

অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি যে জন্য আমাকে আসার আহবান জানিয়েছেন আমি সে জন্য হাযির সদা হাযির। আমি সদা উপস্থিত, আমি ঘোষণা করছি যে, আপনার কোনো শরীক নেই। আমি এও ঘোষণা করছি যে, যাবতীয় হামদ তথা সগুণে প্রশংসার অধিকারী হিসেবে প্রাপ্য প্রশংসা শুধু আপনারই, অনুরূপভাবে যাবতীয় নিয়ামতও আপনার। যেমনিভাবে সব ধরনের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি আপনারই। আপনার কোনো শরীক নেই। আপনি ব্যতীত আর কেউ এগুলো পেতে পারে না।

তারপর যদি তিনি মিনার বাইরে অবস্থানকারী হন তবে মিনায় চলে যাবেন সেখানে জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ফজরের সালাত আদায় করবেন। জোহর ও আসর এবং ইশার সালাতকে কসর হিসেবে দু’রাকাত পড়বেন।

তারপর নয় (৯) তারিখ (‘আরাফাতের দিন) সূর্য উদয়ের পর মিনা থেকে ‘আরাফাতে রওনা দেবেন। নামীরা- নামক স্থানে যদি সম্ভব হয় তবে সূর্য হেলে যাওয়া পর্যন্ত ওখানে অবস্থান করা সুন্নাত। সম্ভব না হলে আরাফাতেই চলে যান। ‘আরাফাতে সূর্য ডোবা পর্যন্ত অবস্থান করতে হবে এবং জোহর ও আসরের সালাত একসাথে কসর অর্থাৎ দু’রাকাত করে জোহরের সময়ে আদায় করুন। (জোহরের আজান দিলে জোহরের দু’রাকাত সালাত আদায় করার পর আবার আসরের ইকামত দিয়ে আসরের সালাত জোহরের সাথে দু’রাকাত আদায় করুন। এ দুই সালাতের মাঝখানে কোনো সুন্নাত সালাত নেই)

মনে রাখা আবশ্যক যে, দু’সালাত একসাথে আদায় করা এবং কসর তথা চার রাকা‘আতের ফরয সালাত দুরাকাত পড়া নারী-পুরুষ সকল হাজী সাহেবদের জন্য প্রযোজ্য। এমনকি যদি কোনো হাজী মক্কা বাসীও হন।

‘আরাফাতে অবস্থান করতে হলে পবিত্রতার প্রয়োজন হয় না। ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হায়েয হিসেবে ‘আরাফাতে অবস্থান করেছিলেন।

‘আরাফাতে পৌঁছানোর পর বেশি বেশি করে দো‘আ, যিকির-আযকার এবং কুরআন তিলাওয়াত করুন। আর ‘আরাফাতের দিনের দো‘আই সর্বোত্তম দো‘আ। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “সর্বোত্তম দো‘আ হল আরাফাতের দিনের দো‘আ, আর আমি এবং আমার পূর্বের নবীগণ যা বলেছি এর মধ্যে সর্বোত্তম হল:

«لآ إلَهَ إلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٍ»

উচ্চারণ: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুল্কু ওয়ালাহুল হাম্দু ওয়াহুওয়া ‘আলা কুল্লি শাই’ইন ক্বাদীর।”

অর্থাৎ “একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ্ বা মা‘বুদ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, যাবতীয় ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও রাজত্ব তাঁরই, তিনি সমস্ত প্রশংসার অধিকারী এবং তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”[3]

দো‘আ করার সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা দরকার:

কিবলামুখী হওয়া।

হাত তুলে দো‘আ করা।

দো‘আ করার সময় মন থেকে করা।

বুঝে দো‘আ করা।

বার বার দো‘আ করা, তবে এমন কিছু না চাওয়া যা চাওয়া জায়েয নেই।

সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত ‘আরাফাতে অবস্থান করা ওয়াজিব। এ জন্য অবস্থান করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেছেন আর অন্ধকার যুগের লোকেরা সূর্য ডোবার আগেই চলে যেত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ডোবার পরে যেতেন। তাই আমাদের সূর্য ডোবার পরে যেতে হবে।

বিশেষ জ্ঞাতব্য যে, কেউ যদি সূর্য ডোবার আগে ‘আরাফা ত্যাগ করে, তবে তার ওপর ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার কাফ্ফারা হিসেবে দম তথা একটি ছাগল মক্কার হারাম এলাকায় জবাই করে সদকা করে দিতে হবে।

যখন সূর্য ডুবে যাবে, তখন তালবিয়া পড়তে পড়তে এবং আল্লাহর যিকির করতে করতে মুযদালিফার দিকে রওনা হবেন। যখন মুযদালিফায় পৌঁছবেন তখন মাগ্রিব এবং এশাকে জমা’ একত্রিত করে ইশার সময় আদায় করবেন। আযান দিয়ে প্রথমে মাগরিবের সালাত তিন রাকাত এবং পরে ইশার সালাত দু‘রাকাত আদায় করুন। এ দুই সালাতের মাঝখানে কোনো সুন্নাত সালাত নেই।

পুরুষদের মতো মহিলাদের জন্যও মুযদালিফায় অবস্থান করা জরুরি। তবে মহিলাদের জন্য মধ্য রাত্রির পরে মিনার দিকে জামরা ‘আকাবা তথা বড় জামরাতে পাথর নিক্ষেপের জন্য যাওয়া শয়ী‘আত অনুমোদন করেছে। যাতে করে তারা পুরুষদের ভিড়ের আগেই পাথর নিক্ষেপ করতে পারে। ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, “উম্মুল মুমিনীন সাওদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সুবহে সাদেকের পূর্বে মুযদালিফা ছেড়ে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করেন। কারণ, তিনি মোটা শরীরের জন্য ধীর-চলার মহিলা ছিলেন।[4]

মহিলাদের সাথে তাদের মাহরাম এবং দুর্বল ব্যক্তিরাও যেমন ছোট বাচ্চা, অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক পুরুষরা সুবহে সাদিকের আগেই মুযদালিফা থেকে বের হতে পারবে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে দুর্বল ব্যক্তিদের সাথে সুবহে সাদিকের আগে মিনার দিকে পাঠিয়েছিলেন।”[5]

মহিলাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির উচিৎ তাদের নিরাপত্তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা। আর সেজন্য মহিলার কারণে তাদের অভিভাবকরাও প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেরি করার অবকাশ রাখেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল, এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার পাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। …একজন পুরুষ তার পরিবারের ওপর রাখাল স্বরূপ। সুতরাং তাকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”[6]

মুয়াত্তায় এসেছে, “আব্দুল্লাহ্ ইবন উমরের স্ত্রী সাফিয়্যা বিনত্ আবী উবাইদ তার এক নিকটাত্মীয়াসহ মুযদালিফায় কোনো কারণে এতই দেরি করেছিল যে, সূর্য ডুবে গিয়েছিল। তারপর মিনায় আসার পরে আব্দুল্লাহ্ ইবন উমর তাদের উভয়কে পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন, এবং তাদের ওপর অতিরিক্ত কোনো কিছু ওয়াজিব মনে করেননি।”[7] এ থেকে বুঝা গেল যে, ভিড় অথবা সমস্যার কারণে মহিলা ও তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে যারা আছে তারাও পাথর নিক্ষেপের জন্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবেন। যাতে করে ইবাদতটি অত্যন্ত শান্তি-শৃঙ্খলার সাথে আদায় করা যায় এবং ভিড় ও বেপর্দা হওয়ার সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। শাইখ ইবন উসাইমীন রহ. বলেন, ‘যদি কারও জন্য দিনের বেলায় পাথর নিক্ষেপ সম্ভব না হয়, তবে সে যেন রাতে পাথর নিক্ষেপ করে। আর যদি দিনের বেলায় পাথর নিক্ষেপ করা কষ্ট ও সমস্যাসহ সম্ভব হয়, কিন্তু রাতের বেলায় নিক্ষেপ করলে অধিক সহজ, সুশৃঙ্খল ও সঠিক পদ্ধতিতে আদায় করা সম্ভব হয়, তবে সে যেন রাতেই নিক্ষেপ করে। কেননা, সময়ের ফযীলতের চেয়ে সঠিক পদ্ধতিতে এবাদত করার ফযীলত বেশি হওয়ায় তার প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি।’[8]

বিশেষ জ্ঞাতব্য

অনেকে মনে করে থাকে মিনায় পাথর নিক্ষেপ করার জন্য যেসব পাথর দরকার তা মুযদালিফা থেকে সংরক্ষণ করতে হবে সালাতের আগে এবং তা বিধিবদ্ধ নিয়ম। এটি ভুল ধারণা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় পাথর কুড়োনোর জন্য বলেননি। তিনি পাথর কুড়িয়েছিলেন মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে। আর যেদিক থেকেই পাথর নেওয়া হোক না কেন তা জায়েয হবে। মুযদালিফা থেকেই পাথর নিতে হবে এরকম কোনো কথা নেই। মিনা থেকেও পাথর নেওয়া যাবে।

সুন্নাত হলো প্রথম দিন সাতটি পাথর নিয়ে জাম-রাতুল ‘আকাবা তথা বড় জামরায় নিক্ষেপ করবেন এবং বাকি তিন দিনের প্রত্যেক দিন মিনা থেকে একুশ (২১)টি করে পাথর নিয়ে তিন ‘জামরা’য় নিক্ষেপ করবেন।

আবার অনেকে মনে করে থাকেন যে, পাথর ধুয়ে তারপর নিক্ষেপ করতে হবে। এটিও ভুল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবায়ে কেরাম কেউই এ কাজ করেন নি।

যে পাথর একবার নিক্ষেপ করা হয়েছে তা আবার নিক্ষেপ করা যাবে না।

যখন মহিলা হাজী সাহেবা যিলহজের দশ (১০) তারিখ ঈদের দিন মিনায় পৌঁছাবেন, তখন প্রথমেই বড় ‘জামরা’র নিকট যাবেন। তারপর এতে সাতটি পাথর পরপর নিক্ষেপ করবেন। প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন এবং প্রথম পাথর নিক্ষেপের সময়ে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করবেন। এরপরে আর তালবিয়া নেই। এর পরিবর্তে বেশি বেশি করে ঈদের তাকবীর পাঠ করবেন। ঈদের তাকবীর হল:

«اَللهُ أَكْبَرْ اَللهُ أَكْبَرْ، لآ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرْ، اَللهُ أَكْبَرْ وَلِلهِ الْحَمْدُ».

উচ্চারণ: “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ।”

তাছাড়া অন্যান্য দো‘আ ও যিকির করতে পারেন।

জাম-রাতুল আকাবা বা বড় জামরাতে পাথর নিক্ষেপের পর মহিলা হাজী সাহেবা তার মাহরাম বা অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে হাদী উট হলে নাহর, আর গরু-ছাগল হলে জবাই করাবেন। মহিলা হাজী সাহেবা ইচ্ছা করলে তার হাদী জবাই করার কাজটি তিনদিন অর্থাৎ, ঈদের দিন এবং এর পরে তিনদিন পর্যন্ত দেরি করতে পারেন। আইয়ামে তাশরীকের তৃতীয় দিনের সূর্য ডোবার আগে যে কোনো সময় জবাই করলেই তা আদায় হয়ে যাবে।

তারপর হাজী সাহেবা তার সমস্ত চুলের বেণি হতে এক আঙ্গুলের মাথা (প্রায় এক সেণ্টিমিটার) পরিমাণ কেটে নেবেন। এটা খেয়াল রাখা দরকার যে, যাতে কোনো বেগানা পুরুষের সামনে বা বেগানা পুরুষ দ্বারা তার মাথার চুল না কাটা হয়।

আর এ কাজটি সম্পন্ন করার মাধ্যমেই ইহরামের কারণে যা তার জন্য হারাম ছিল সেসব কিছু তার জন্য পুনরায় হালাল হয়ে যাবে। কিন্তু স্বামী সহবাস করা যাবে না। এটাকে শরী‘আতে “আত-তাহাল্লুল আল-আউয়াল” বা “প্রাথমিক হালাল” বলা হয়।

এরপর হাজী সাহেবা মক্কায় যাবেন এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবেন। এটি হজের তাওয়াফ, যাকে আমরা তাওয়াফে যিয়ারত বা তাওয়াফে ইফাদাও বলে থাকি। এ তাওয়াফ কাজ শেষ করে সম্ভব হলে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দাঁড়িয়ে মাকামে ইবরাহীম ও কা‘বাকে সামনে রেখে দু’রাকাত সালাত আদায় করবেন। আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে এ দু’রাকাত সালাত আদায় করতে পারেন।

এরপর পূর্ব বর্ণিত নিয়মে উমরার জন্য যেভাবে সা‘ঈ করেছেন সেভাবেই হজের সা‘ঈ আদায় করবেন।

জ্ঞাতব্য:

যদি কোনো হাজী সাহেবা তাওয়াফে ইফাযা বা হজের তাওয়াফের পূর্বে হায়েয এসে যায় তবে তিনি তাওয়াফের জন্য পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। কারণ, হায়েয অবস্থায় আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করা জায়েয নেই।

কিন্তু যদি অবস্থা এমন হয় যে, হাজী সাহেবার পক্ষে মক্কায় অবস্থান করা দুষ্কর হয়ে পড়ে তবে তিনি ইচ্ছা করলে এ অবস্থায় মক্কা ছেড়েও যেতে পারেন। তবে হালাল হওয়া মাত্রই মক্কায় এসে তার হজের বাকি কাজ তাওয়াফে ইফাযা বা তাওয়াফে যিয়ারত তথা হজের তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন। তবে এ সময়টুকুতে তিনি স্বামী সহবাস থেকে দূরে থাকবেন।

আর যদি অবস্থা এমন হয় যে, হাজী সাহেবার পক্ষে আর মক্কায় ফিরে আসা সম্ভব না হয় যেমন বিদেশি হোন এবং ভিসা, অর্থ ও সঙ্গী পাওয়া সংক্রান্ত জটিলতা থাকে তখন তার জন্য হায়েয অবস্থা থাকলেও হজের তাওয়াফ করা জায়েয হবে। তিনি তার সুনির্দিষ্ট স্থানে কাপড়ের পট্টি বেধে নেবেন এবং তাওয়াফ করবেন। যাতে মসজিদ অপবিত্র না হয়ে পড়ে।

কোন কোনো হাজীদেরকে দেখা যায় যে, তারা হজের সা‘ঈকে ৮ তারিখ একটি নফল তাওয়াফ করে তারপর অগ্রিম আদায় করে থাকেন। এ ধরনের কোনো নিয়ম শরী‘আত সমর্থিত নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সেটা করেননি। সাহাবায়ে কেরামও সেটা করেননি। ইমামদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য কোনো ইমামও সেটা করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। তাই অগ্রিম সা‘ঈ করার প্রবণতা বন্ধ করা উচিৎ।

তাওয়াফ শেষ করার পর হাজী সাহেবা আবার মিনায় ফিরে যাবেন। কেননা, তাকে মিনায় আইয়ামে তাশরীকের প্রথম ও দ্বিতীয় রাত মিনায় কাটাতে হবে। এরপর যদি কেউ তা‘জীল বা তাড়াতাড়ি করে চলে যেতে চায় তিনি যেন দ্বিতীয় দিন সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা ত্যাগ করে চলে যান। আর যদি আইয়ামে তাশরীকের তৃতীয় দিন পাথর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে দেরি করে কেউ যেতে চায় তবে তিনি আইয়ামে তাশরীকের তৃতীয় রাত্রিও সেখানে কাটাবেন এবং পরদিন জোহরের পরে পাথর নিক্ষেপের পরে সেখান থেকে বিদায় নেবেন। আর এটা অধিক উত্তম, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় দিন জোহরের পরে পাথর নিক্ষেপ করে তারপর মক্কায় ফিরে গিয়েছিলেন।

মহিলা হাজী সাহেবা আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে অর্থাৎ এগারো, বার এবং যারা তেরো তারিখ পর্যন্ত দেরি করতে চায় তারা সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে যাওয়ার পর প্রত্যেক জামরায় সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন এবং প্রত্যেক পাথর নিক্ষেপের সাথে সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন। মধ্য ‘জামরা’ এবং ছোট ‘জামরা’র পর নিজের মত করে দো‘আ করবেন, কিন্তু জাম-রাতুল আকাবা বা বড় ‘জমরা’র পর দো‘আ করবেন না। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র মধ্য এবং ছোট জামরার পর দো‘আ করেছিলেন। বড় জামরার পর দো‘আ করেননি। আর জামরায় পাথর নিক্ষেপ করতে হবে পর্যায়ক্রমে প্রথমে ছোট, তারপর মধ্য এবং সবচেয়ে শেষে বড় জামরায় পাথর নিক্ষেপ করতে হবে।

বিশেষ জ্ঞাতব্য:

মহিলাদের উচিৎ এমন সময় পাথর নিক্ষেপ করা, যখন ভিড় কম থাকে। যেমন, রাতের বেলায়।

যদি কোনো মহিলা হাজী সাহেবা দ্রুত চলে যেতে চান, তবে যিলহজের ১২ তারিখে পাথর নিক্ষেপের পর সূর্য ডোবার আগে মিনা ত্যাগ করতে পারেন।

যিলহজের বার (১২) তারিখে সূর্য ডোবার আগে যদি কেউ মিনা ত্যাগ করতে না পারেন, তবে সেখানে আরও একদিন অবস্থান করতে হবে এবং ১৩ তারিখে সূর্য হেলে যাওয়ার পর তিন জাম্রায় পাথর নিক্ষেপ করে তারপর মিনা ত্যাগ করতে হবে।

মিনার কাজ শেষ করে হাজী সাহেবা যখন মক্কায় ফিরে যাবেন তখন তিনি যদি মক্কা ছেড়ে চলে যেতে চান তবে বিদায় তাওয়াফ করবেন। আর যদি মক্কায় কিছুদিন অবস্থান করেন তবে মক্কা ছেড়ে যাওয়ার ঠিক আগ মূহুর্তে বিদায় তাওয়াফ করবেন। সে সময় যদি কোনো মহিলা হাজী সাহেবার হায়েয বা নেফাস থাকে তবে তার বিদাই তাওয়াফ করা লাগবে না।

এ কাজগুলোর মাধ্যমে তামাত্তু হজ আদায়াকারী মহিলার তামাত্তু হজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।


[1] দারু কুতনীঃ ২/২৫৯, বাইহাকীঃ ৮৮২১

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৭৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪।

[3] তিরমিজি : ৩৫৮৫

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৯০

[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৯৩।

[6] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮২৯।

[7] মুয়াত্তা, হাদীস নং ৯৩৭।

[8] আশ-শার্হুল মুম্তি‘: ৭/৩৮৬


[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১১।

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৩৯।

[3] ফাকেহী: আখবারু মাক্কাঃ ১/২৫২