ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

তা‘যীর শাস্তি

৬৪. তা‘যীর (التعزير) এর আভিধানিক অর্থ শিক্ষামূলক শাস্তি (التأديب) শরী‘আতের পরিভাষায় সেসব অন্যায় ও পাপ কর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়াকে তা‘যীর বলে যে ব্যপারে নির্ধারিত শাস্তি নেই।[1] যেসব অপরাধে তা‘যীর ওয়াজিব হয় সেগুলো হচ্ছে শরী‘আত কতৃক ঐসব নিষিদ্ধ কাজ যার জন্য ইসলামী শরী‘আতের পক্ষ থেকে কোনো শাস্তি নির্ধারিত নেই। যেমন, বেগানা মহিলার সাথে একান্তে থাকা, সুদ খাওয়া, ইয়াতিমের মাল আত্মসাৎ করা, আমানতের খিয়ানত করা, মৃত প্রাণি ভক্ষণ করা, ব্যাভিচার বাদে অন্য কোনো বিষয়ে অপবাদ দেওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, ঘুষ খাওয়া ও অন্যান্য যেসব কাজ শরী‘আত হারাম করেছে তা করা কিংবা শরী‘আত যা অবশ্য পালনীয় করেছে তা ত্যাগ করা।

তা‘যীরের প্রকারভেদ

৬৫. কষ্ট ও পীড়াদায়ক যে কোনো কথা, কাজ অথবা বর্জনের মাধ্যমে তা‘যীর শাস্তি হয়ে থাকে। কাউকে উপদেশ দিয়ে, কাউকে সতর্ক করে এবং কারো বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বনের মাধ্যমে তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। কোনো কোনো অপরাধী তওবা না করা পর্যন্ত কিংবা অপরাধ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার সাথে সালাম-কালাম বন্ধ ও সংশ্রব বর্জন করে তা‘যীর দণ্ড দেওয়া হয়। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে তিন ব্যক্তির সাথে এরূপ আচরণ করেন পেশাগত দায়িত্ব বা চাকুরি থেকে অপসারণের মাধ্যমেও তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলে এ রকম শাস্তি দেওয়ার প্রমাণ আছে। কখনও অপরাধী যে শহরে বাস করে সেখান থেকে অন্য শহরে বহিষ্কার করে কিংবা তার মাথার চুল ন্যাড়া করে তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। আবার কখনও প্রহার করে বা চাবুক মেরে বা বন্দী রেখে কিংবা মুখে চুনকালি মাখিয়ে তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। কখনও আর্থিক দণ্ডের মাধ্যমে তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে এরূপ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যেমন, মদ তৈরির মটকা ও মদ রাখার পাত্র তিনি ভেঙ্গে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অনুরূপ খায়বর যুদ্ধে গাধার গোস্ত রান্না করার ডেক উপুড় করে গোস্ত ফেলে দেওয়ার আদেশ দেন। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করেও তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই মসজিদে দ্বিরার ভেঙ্গে দেন এবং উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মদ বিক্রির দোকান গুড়িয়ে দেন। মাল নষ্ট করার করার দ্বারাও তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। যেমন, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বিক্রি করার জন্য পানি মিশ্রি্ত দুধ রাস্তায় ঢেলে দেন। কখনও সম্পদের একটি অংশ বাজেয়াপ্ত করে নিয়েও তা‘যীর শাস্তি দেওয়া হয়। যেমন, যাকাত দিতে অস্বীকারকারীর অর্ধেক সম্পত্তি তা’যীরের উদ্দেশ্যে সরকার বাজেয়াপ্ত করে থাকে।

তাযীরের সর্বোচ্চ পরিমাণ

৬৬. তা‘যীর শাস্তির সর্বোচ্চ পরিমাণ সম্পর্কে ফকীহগণের মধ্যে বিভিন্ন মত আছে। তন্মধ্যে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য সর্বোত্তম মতটি এখানে উল্লেখ করা হলো। তা‘যীর নির্ধারণের সময় দেখতে হবে যে, যে জাতীয় অপরাধে তা‘যীর দেওয়া হচ্ছে ঐ জাতীয় অপরাধের জন্য শরী‘আতে শাস্তির কোনো পরিমাণ নির্দিষ্ট আছে কিনা। থাকলে তা’যীরের শাস্তি ঐ নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত উঠানো যাবে না -তার চেয়ে নিচে রাখতে হবে। তবে ভিন্ন জাতীয় অপরাধে নির্দিষ্ট শাস্তির চেয়ে অধিক হলেও কোনো দোষ নেই। যেমন, নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণ মাল চুরি করলে তাকে তা‘যীর শাস্তি হিসেবে হাত কর্তনের শাস্তি দেওয়া যাবে না। অবশ্য বেত্রাঘাতের তা‘যীর দিলে তার পরিমাণ হদ্দে কযফ বা অপবাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট শাস্তির পরিমাণের চেয়ে অধিক হলেও কোনো আপত্তি নেই। অনুরূপ ব্যভিচার সংঘটিত না হলে অন্য কুকর্মের জন্য তা‘যীর হিসেবে হদ্দে যিনা বা ব্যভিচারের নির্ধারিত শাস্তি দেওয়া যাবে না। তবে তা‘যীর হিসেবে তাকে বেত্রাঘাত দিলে তার পরিমাণ হদ্দে কযফের পরিমাণের চেয়ে বেশিও থেকে পারে।

তাযীর হিসেবে হত্যা করা

৬৭. হত্যার দ্বারা তা‘যীর শাস্তি দেওয়া বৈধ কিনা? ইমাম মালিক (রহ) এর মতে বৈধ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর একদল অনুসারী ও ইমাম শাফে‘ঈ (রহ) নীতিগতভাবে এ মত সমর্থন করেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে মতভেদও আছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতাকারী বিদ‘আত প্রথার দিকে আহবানকারীকে হত্যা করার ব্যপারে সবাই একমত। কিন্তু মুসলিম গুপ্তচর হত্যার ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম মালিক ও কতিপয় হাম্বলী আলমের মতে হত্যা করা বৈধ। পক্ষান্তরে ইমাম শাফে‘ঈর মতে অবৈধ। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মতে হত্যার দ্বারা তা‘যীর শাস্তি দেওয়া জায়েয। এরূপ হত্যা হানাফীগণের নিকট রাজনৈতিক হত্যা (القتل بالسياسة) নামে অভিহিত।[2]

৬৮. তা‘যীর শাস্তি হিসেবে অপরাধীকে হত্যা করা যদি অত্যাবশ্যক হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে হত্যা করা ব্যতীত অন্য কোনো উপায় না থাকে, এমতাবস্থায় বিশুদ্ধ বিবেচনা মতে হত্যা করা বৈধ। সুন্নতে নববী থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من أتاكم وأمركم جميع على رجل واحد يريد أن يشق عصاكم أو يفرق جماعتكم فاقتلوه»

“কেউ যদি তোমাদের একক নেতৃত্বে ফাটল ধরাতে বা দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করতে তৎপর হয়, তবে তাকে হত্যা কর।”

এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যার ফিৎনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তাকে হত্যা করা ব্যতীত অন্য কোনো পথ না থাকে তাকে হত্যা করা বৈধ। অপর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যার মদ্যপান করার অভ্যাস কোনো ক্রমেই বন্ধ করা যায় না। জবাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من لم ينته عنها فاقتلوه»

“যে ব্যক্তি এহেন কাজ থেকে বিরত না হয় তাকে হত্যা কর।”

 

তাযীর দণ্ড নির্ধারণে বিচারকের ক্ষমতা

আমাদের পূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, তা‘যীর দণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচারকের ক্ষমতা ব্যাপক। তিনিই তা‘যীর পর্যায়ের অপরাধসমূহের মধ্য থেকে যে কোনো অপরাধের যুক্তিসঙ্গত দণ্ড নির্ধারণ করেন। শরী‘আতে তা‘যীর জাতীয় যেসব দণ্ডের বর্ণনা দেওয়া আছে -বিচারক তার মধ্যেই ক্ষমতা সীমিত রাখবেন, এর বাইরে যাবেন না। উল্লেখ্য সর্বনিম্ন দণ্ড সতর্ক করা এবং সর্বোচ্চ দণ্ড মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। যে ধরণের দণ্ড তিনি নির্ধারণ করবেন তার পরিমাণও তিনি নির্ধারণ করে দিবেন। যদি বেত্রাঘাতের দণ্ড নির্ধারণ করেন তাহলে বেত্রাঘাতের পরিমাণও ঠিক করে দিবেন। দণ্ড নির্বাচনে ও পরিমাণ নির্ধারণে বিচারক তার প্রবৃত্তি, স্বেচ্ছাচারিতা, আক্রোশ ও প্রতিশোধস্পৃহা এবং যুক্তিহীন ও তড়িঘড়ি করে অদূরদর্শিতার সাথে রায় দিবেন না। দণ্ড নির্বাচনে তিনি নির্ধারিত বিধিবিধানের আলোকে ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। যেসব বিধি-বিধান সামনে রেখে তিনি দণ্ড নির্ণয় করবেন তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – অপরাধের প্রকৃতি, ক্ষতির পরিমাণ ও প্রভাব, অপরাধীর অবস্থা –সে কি অপরাধের সহযোগী না সংগঠক। তিনি আরও বিবেচনা করবেন -অপরাধের বিস্তৃতি-ব্যাপকতা কেমন এবং তাতে লোকের সংশ্লিষ্টতার পরিমাণ কত এবং কোনো ধরণের দণ্ড অপরাধীকে সংযত রাখতে ও অন্যদেরকে সতর্ক করতে কতটুকু সহায়ক হবে। অপরাধ যদি এমন পর্যায়ের হয় যে, পর্যাপ্ত পরিমাণ লোক সে অপরাধে জড়িত তবে বিচারক দণ্ডের মাত্রা বাড়িয়ে দিবেন। অপরাধী যদি ভদ্র, সচ্চরিত্রবান হয় এবং জীবনে প্রথমবারই এ অপরাধে জড়িয়ে থাকে তবে তার লঘু দণ্ড হবে, পুনরাবৃত্তিকারীর হবে গুরুদণ্ড এবং এভাবেই অপরাধ করার সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে দণ্ডের মাত্রাও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। মোটকথা তা‘যীরমূলক অপরাধে দণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপরাধীর ব্যক্তিত্ব ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনার গুরুত্ব অপরিসীম।

বর্তমান যুগে তাযীর ব্যবস্থার গুরুত্ব

      সমাজে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধ তা‘যীর ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। কেননা হুদূদ, কিসাস ও দিয়াত ব্যতীত অন্য কোনো অপরাধের শাস্তি শরী‘আত নির্ধারণ করে দেয় নি। কিন্তু এসব অপরাধ তা’যীরের অপরাধের তুলনায় অনেক কম। শরী‘আত তা‘যীর শাস্তি নির্ধারণের দায়িত্ব সরকার তথা বিচারপতিদের ওপর ন্যাস্ত করেছে। তারা শরী‘আতের আইন ও মূলনীতির আলোকে সেসব শাস্তি ধার্য করেন যার বিস্তারিত বিবরণ শরী‘আতে বিদ্যমান রয়েছে। সন্দেহ নেই, এ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক ও অপরিসীম। যেহেতু এটা সেই সমুদয় অপরাধের সুষ্ঠু মীমাংসা করে যার নির্ধারিত শাস্তি শরী‘আতে নেই। সুতরাং শরী‘আত বিরোধী যে কাজই হোক তার ওপর তা‘যীর অবধারিত। অনুরূপ যেসব কাজ শরী‘আতের মাপকাঠিতে সমাজের জন্য নিশ্চিত ক্ষতিকর সেগুলোও তা’যীরের আওতায় আসবে। যদিও এসব ক্ষতিকর কাজের মধ্য থেকে কিছু কিছু কাজ মূলের দিক থেকে মুবাহ বা নির্দোষ, কিন্তু স্থান কাল ভেদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বলা বাহুল্য, শরী‘আতের গণ্ডির মধ্যে ক্ষতির কোনো অস্তিত্ব নেই, ক্ষতি শরী‘আতে নিষিদ্ধ (إن الضرر مدفوع في الشريعة ومنهي عنه)। কারণ ক্ষতি যুলুমের অন্তর্ভুক্ত আর যুলুম হারাম। সুতরাং মুবাহ কাজ যখন কোনো কারণবশতঃ ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়, তখন শরী‘আতে তা নিষিদ্ধ হয় এবং তা বর্জন করা হয় ওয়াজিব। সে কাজ যে করে তাকে তা‘যীর শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا ضرر ولا ضرار».  

“ক্ষতি করাও অপরাধ, ক্ষতির বিপরীতে ক্ষতি করাও অপরাধ।”

তবে সমাজের ওপর ক্ষতির প্রভাব কতটুকু, তার সাথে সঙ্গতি রেখে তা‘যীর শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে সুচিন্তিত ও যুলুমমুক্ত মন নিয়ে। কেননা যালিমের  যুলুম  হারাম । এছাড়া উক্ত কর্মের ক্ষতি নিরূপণ করতে হবে শরী‘আতের নিক্তি দিয়ে, কু-প্রবৃত্তি ও কু-ধারণার বশবর্তী হয়ে নয়।

আল্লাহ সত্য বলেন, সঠিক পথ প্রদর্শণ করেন। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট ও উত্তম অভিভাবক। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবীগণের প্রতি দুরূদ ও সালাম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর নিমিত্ত, যিনি সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক।


[1]  আল আহকামুস সুলতানিয়াহ লি ইবন ইয়া’লা আলহাম্বালী;  তাবসিরাতুল হুক্কাম লি ইবন ফারহুন ২য় খণ্ড, পৃ-২৫৮।

[2]  আসসিয়াসাতুশ শরয়িয়্যাহ লি ইবনি তায়মিয়্যাহ, পৃ-৮৫।