ড. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস-সুহাইম

অনুবাদক : জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের  সম্পাদনা : প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ইহসান এর একটিমাত্র রোকন বা স্তম্ভ, আর তা হচ্ছে: আপনি আল্লাহর ইবাদাত এমনভাবে করবেন, যেন আপনি তাঁকে দেখছেন। আর যদি এমনটি মনে করা সম্ভব না হয়, তবে একথা জেনে রাখবেন যে, নিশ্চয় তিনিই আপনাকে দেখছেন। অতএব, এই পদ্ধতিতে মানুষ তার রবের ইবাদাত করবে। এটা হচ্ছে তাঁর নিকটে ও তাঁর সামনে নিজেকে উপস্থিত করা। আর তা আল্লাহর ভয়, প্রভাব ও শ্রদ্ধাকে অপরিহার্য করবে এবং তা ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে আন্তরিকতাকে এবং ইবাদাতকে পরিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে আদায় করার জন্য চেষ্টা করাকেও অপরিহার্য করবে।

সুতরাং ইবাদাত করার সময় বান্দা তাঁর প্রভুকে স্মরণ করবে এবং নিজেকে এমনভাবে তাঁর নিকট উপস্থিত করবে যেন সে তাঁকে দেখছে। কিন্তু যদি তার পক্ষে এটা অনুধাবন করা সম্ভব না হয়, তবে তা বাস্তবায়ন করার জন্য সে যেন আল্লাহর ওপর ঈমানের সাহায্য চায় যে, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে দেখছেন। তিনি তার গোপন, প্রকাশ্য, ভিতর, বাহির সব বিষয় জানেন। তার কর্মকাণ্ডের কোনো কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না।[1]

অতএব, আল্লাহর যে বান্দা এই অবস্থানে পৌঁছে, সে আন্তরিকভাবে তার প্রভুর ইবাদাত করে। আর তিনি ব্যতীত আর কারো দিকে সে নজর দেয় না। ফলে সে কোনো মানুষের প্রশংসা শোনার অপেক্ষায় থাকে না এবং তাদের তিরস্কারকেও সে ভয় করে না। বরং তার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তার প্রভু তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং স্বীয় বান্দার তিনি প্রশংসা করবেন। সুতরাং সে এমন একজন মানুষ যার গোপন ও প্রকাশ্য সমান এবং নির্জনে ও প্রকাশ্যে সে তার প্রভুর একজন ইবাদাতাকারী। সে এ ব্যাপারে পূর্ণ দৃঢ় বিশ্বাসী যে, তার অন্তরে যা রয়েছে এবং তার আত্মা যা কুমন্ত্রণা দেয়, তার সবকিছুই আল্লাহ তা‘আলা অবগত আছেন। ঈমান তার অন্তরকে প্রভাবিত করে এবং মনে করে যে, তার প্রভূ তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। যার কারণে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ফলে সে তার প্রভুর অনুগত বান্দা হয়ে এগুলো দ্বারা শুধুমাত্র এমন সব আমলই করে, যা আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন, রবের কাছেই নিজেকে সমর্পন করে।

আর যখন তার অন্তর তার প্রভুর সাথে সম্পৃক্ত হয়, তখন সে আর কোনো সৃষ্টিকুলের নিকট সাহায্য চায় না। কেননা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় সে অন্যদের থেকে অভাব-মুক্ত হয়ে পড়ে। সে কোনো মানুষের নিকট অভিযোগ করে না, কারণ সে তার সকল অভাব ও চাহিদা আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে। সাহায্যকারী হিসেবে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। সে কোনো স্থানে নির্জনতা অনুভব করে না এবং কাউকে ভয়ও করে না। কারণ সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তার সঙ্গে আছেন। তিনিই তার জন্য যথেষ্ট এবং সর্বোত্তম সাহায্যকারী। আল্লাহ তাকে যে আদেশ করেছেন তা সে পরিত্যাগ করে না এবং আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কোনো গুনাহের কাজও করে না। কারণ সে আল্লাহকে ভীষণ লজ্জা পায়। তিনি যখন তাকে আদেশ করেছেন তখন সে তা নষ্ট করবে অথবা তিনি যখন তাকে নিষেধ করেছেন তখন সে তা করবে, এটাকে সে অপছন্দ করে। সে কোন সৃষ্টি জীবের প্রতি যুলুম বা বাড়াবাড়ি করে না। অথবা সে কারো হক্বও ছিনিয়ে নেয় না, কারণ সে জানে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার সবকিছু অবগত আছেন। পাক-পবিত্র আল্লাহ তা‘আলা অচিরেই তার হিসাব নিবেন। সে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, কারণ সে জানে, এর মধ্যে যা কিছু মঙ্গলময় বস্তু রয়েছে তার সবকিছুর মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। তিনি সেগুলোকে তাঁর সৃষ্টজীব মানুষের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে করে তারা তাদের প্রয়োজন মাফিক তা হতে গ্রহণ করে। আর এগুলোকে তার জন্য সহজ করে দেয়ার কারণে সে আপন রবের শুকরিয়া আদায় করে।

***

এ কিতাবে আপনার সামনে এতক্ষণ যা উপস্থাপন করা হলো তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং ইসলামের মহান রোকন বা স্তম্ভ। আল্লাহর কোনো বান্দা যদি এ সমস্ত রোকনের ওপর ঈমান রাখে এবং তা পালন করে তবে সে মুসলিম হয়ে যাবে। তা না করলে সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় ইসলাম হচ্ছে দীন-দুনিয়া, ইবাদাত ও জীবনের পথ বা পন্থা। আর তা আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক জীবনব্যবস্থা যা পরিপূর্ণ ও ব্যাপক। যার বিধানের মধ্যে সার্বিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সমানভাবে ব্যক্তি ও সমাজের প্রত্যেকের যা প্রয়োজন তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চাই তা আকীদাহ-বিশ্বাসগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইত্যাদি যেকোনো বিষয়কই হোক না কেন। মানুষ এর মধ্যে এমন অনেক নিয়ম-নীতি ও হুকুম-আহকাম পাবে যা নিরাপত্তা, যুদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় অধিকারসমূহকে সুশৃঙ্খল করে। মানুষের সম্মান, পশু-পাখি, জীব-জন্তু এবং তার চার পাশের পরিবেশকে সংরক্ষণ করে। তার নিকট মানুষ, জীবন, মৃত্যু এবং মরণের পর পুনরুত্থানের হাকীকত বা প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সে আরও পাবে: তার চার পাশে যেসব মানুষ রয়েছে তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করবে তার সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَقُولُواْ لِلنَّاسِ حُسۡنٗا﴾ [البقرة: ٨٣]

“আর তোমরা মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৮৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:

﴿ وَٱلۡعَافِينَ عَنِ ٱلنَّاسِۗ﴾ [ال عمران: ١٣٤]

“আর যারা মানুষদেরকে ক্ষমা করে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪]

তিনি আরও বলেন,

﴿ وَلَا يَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنَ‍َٔانُ قَوۡمٍ عَلَىٰٓ أَلَّا تَعۡدِلُواْۚ ٱعۡدِلُواْ هُوَ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۖ ٨﴾ [المائ‍دة: ٨]

“কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে এর প্রতি উদ্যত না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার করবে না, তোমরা ন্যায়বিচার কর, এটা তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮]

দীনের স্তরসমূহ ও তার প্রতিটি স্তরের রোকনসমূহের আলোচনার পর এ পর্যায়ে সংক্ষিপ্তভাবে দীন ইসলামের কতিপয় আদর্শ বা গুণাবলি আলোচনা করা ভালো মনে করছি।

 

[1] দেখুন: জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম, পৃ. ১২৭।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন