ড. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস-সুহাইম

অনুবাদক : জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের  সম্পাদনা : প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

মানবসমাজ ধর্মের দিক দিয়ে দু’ ভাগে বিভক্ত:

এক প্রকার, যাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব রয়েছে। যেমন, ইয়াহূদী, খ্রীষ্টান ও মুসলিম। কিন্তু ইয়াহূদী ও খ্র্রীষ্টানগণ তাদের কিতাবে যা বর্ণিত হয়েছে তা অনুযায়ী আমল না করায়, আল্লাহকে ছেড়ে মানুষকে তাদের প্রভু বানিয়ে নেয়ায় এবং দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া ইত্যাদি কারণে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের নবীগণের ওপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছিলেন তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখন পাদ্রী বা পুরোহিতরা তাদের জন্য কিছু কিতাব লিখে দেয় আর ধারণা করে যে, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। বরং এগুলো বাতিলপন্থীদের তৈরী করা এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি মাত্র।

পক্ষান্তরে মুসলিমদের কিতাব মহাগ্রন্থ ‘আল-কুরআন’ হচ্ছে সময়ের দিক দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ কিতাব এবং হিফাযতের দিক দিয়ে অধিকতর মজবুত। কারণ এর হিফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, এর দায়িত্ব কোনো মানুষের ওপর তিনি ছেড়ে দেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩﴾ [الحجر: ٩]

“নিশ্চয় আমরা কুরআন অবতীর্ণ করেছি আর আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯]

এ কুরআন বহু মানুষের বক্ষে (মুখস্থ) এবং কিতাবের আকৃতিতে (লিখিত) সংরক্ষিত রয়েছে। কারণ এটি এমন এক সর্বশেষ কিতাব, যার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা এই মানবজাতির জন্য হিদায়াত নিশ্চিত করেছেন। আর এটিকে কিয়ামত পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ স্থির করেছেন এবং একে স্থায়ী করেছেন। আর প্রত্যেক যুগে যে ব্যক্তিই এর সীমারেখা ও বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করবে, এর শরী‘আত মোতাবেক আমল করবে এবং এর প্রতি ঈমান আনবে, তার জন্য তা সহজ করে দিয়েছেন। এই মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা পরবর্তী অনুচ্ছেদেই আসছে।[1]

আর দ্বিতীয় প্রকার হলো, যাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কোনো কিতাব নেই। যদিও তাদের নিকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এমন কিতাব রয়েছে, যাকে তাদের ধর্মগুরুর দিকে সম্বন্ধ করা হয়। যেমন- হিন্দু, অগ্নিপূজক, বৌদ্ধ, কনফূশী এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বের আরব।

বস্তুত প্রত্যেক জাতির নিজস্ব এমন কিছু জ্ঞান ও কর্ম রয়েছে যার ভিত্তিতে তারা তাদের পার্থিব জগতের কল্যাণ সম্পাদন করে। এটি হচ্ছে ঐ সাধারণ হিদায়াত বা পথ দেখানোর অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মানুষকে দেন, বরং প্রত্যেক প্রাণীকে দেন। যেমন তিনি প্রাণীকে পথ দেখান এমন জিনিস অর্জন করার, যা খেলে ও পান করলে তার উপকার হবে এবং এমন বস্তু দূর করার যা তার ক্ষতি করবে। আবার আল্লাহ তা‘আলা এদের মধ্যে এগুলোর কোনো বস্তুর আসক্তি, অপর কোনো বস্তুর প্রতি অনীহাও সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿سَبِّحِ ٱسۡمَ رَبِّكَ ٱلۡأَعۡلَى ١ ٱلَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ ٢ وَٱلَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ ٣﴾ [الاعلى: ١،  ٣]

“আপনি আপনার সুমহান রবের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন, যিনি সৃষ্টি করেন অতঃপর সুঠাম করেন। আর যিনি নির্ধারণ করেন অতঃপর পথনির্দেশ করেন।” [সূরা আল-আ‘লা, আয়াত: ১-৩]

মূসা ‘আলাইহিস সালাম ফির‘আউনকে লক্ষ্য করে বলেন,

﴿قَالَ رَبُّنَا ٱلَّذِيٓ أَعۡطَىٰ كُلَّ شَيۡءٍ خَلۡقَهُۥ ثُمَّ هَدَىٰ ٥٠﴾ [طه: ٥٠]

“তিনি বলেন, আমাদের রব তিনিই, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যথার্থ আকৃতি দান করছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৫০]

আর ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম বলেন,

﴿ٱلَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهۡدِينِ ٧٨﴾ [الشعراء : ٧٨]

“যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন।” [সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত: ৭৮][2]

প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি যারা সামান্যতম চিন্তা-ভাবনা করেন, তারা জ্ঞাত আছেন যে, কল্যাণকর জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সৎকর্ম সম্পাদন করার ক্ষেত্রে যারা ধর্মাবলম্বী নয় তাদের চেয়ে ধর্মাবলম্বীরা শ্রেষ্ঠতম। সুতরাং ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অমুসলিমদের কাছে যেসব কল্যাণকর বস্তু পাওয়া যায়, তার চেয়ে অধিক পরিপূর্ণ পাওয়া যায় মুসলিমদের কাছে। এর কারণ হলো, জ্ঞান ও কর্ম দুই প্রকার:

প্রথম প্রকার: যা বুদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত, যেমন: গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, কারিগরি বা শিল্পকলা ইত্যাদি। এসব বিষয় ধর্মাবলম্বীদের নিকট যেমন আছে, অন্যদের নিকটেও রয়েছে, বরং এ ব্যাপারে বিধর্মীরাই শ্রেষ্ঠ। পক্ষান্তরে যা শুধুমাত্র বুদ্ধির দ্বারা জানা যায় না, যেমন: আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান এবং দীন সম্পর্কিত জ্ঞান। এগুলো ধর্মাবলম্বীদের জন্য নির্দিষ্ট। এগুলোর মধ্যে এমন কিছু জ্ঞান রয়েছে যার ব্যাপারে বিবেকপ্রসূত যুক্তিগত দলীল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আর রাসূলগণ সৃষ্টিকুলকে যে পথপ্রদর্শন করেছেন ও যে পথে পরিচালিত করেছেন তা হলো, বিবেকগ্রাহ্য যুক্তি প্রমাণ, সুতরাং তাদের সেসব প্রমাণকে বলা হবে, বিবেক ও শরীআতগ্রাহ্য প্রমাণ।

দ্বিতীয় প্রকার: যা রাসূলগণ কর্তৃক প্রদত্ত সংবাদ ছাড়া জানা যায় না। এগুলো ঐসব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যা যুক্তির দ্বারা অর্জন করার কোনো উপায় নেই। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কিত সংবাদ, তাঁর নাম, তাঁর গুণাবলি, যে ব্যক্তি তাঁর অনুসরণ করবে তার জন্য জান্নাতে কী নি‘আমত আছে, আর যে তার অবাধ্য হবে তার জন্য কী শাস্তি রয়েছে, তাঁর শরী‘আতের বর্ণনা এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহের সাথে তাদের নবীদের সংবাদ ইত্যাদি।[3]

[1] দেখুন: এ গ্রন্থের পরবর্তী… পৃষ্ঠাসমূহ।

[2] দেখুন: আল জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ; ৪র্থ খণ্ড, ৯৭ নং পৃষ্ঠা।

[3] দেখুন: শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ প্রণীত: মাজমূ‘ ফাতওয়া; ৪র্থ খণ্ড, ২১০, ২১১ নং পৃষ্ঠা।

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন