জার্নালিস্ট লরেন বুথের নওমুসলিম হবার গল্প-টু

আন্তরিক হাসিতে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠত। বাহ! আপনি তো  ভালোই আরবি জানেন। হুম, তাহলে তো ইসলাম সম্পর্কেও অনেক কিছু জানেন। আচ্ছা ঐ ঘটনাটি কী জানেন? ওই যে আমাদের নবি ﷺ উনার স্ত্রী আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন…’

এভাবে তারা কুরআন হাদিসের নানা বাণী আমার সাথে শেয়ার করতেন। তত দিনে আলাপচারিতার ফাকে ফাকে আমার মনটা ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছিল।

আমি জানি আমাদের কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখা উচিত, কুরআন পড়া উচিত। কিন্তু কেন জানি ইসলাম কবুলের আগে কুরআন নিয়ে আমি খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না।

জেরুজালেমের একজন তরুণ আমাকে একটা কুরআন উপহার দিয়ে বলেছিল, ‘ম্যাডাম, এটা ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য উপহার। আমাদের কখনো  ভুলে যাবেন না।

তার সাথে এর আগে পরে আমার আর কখনো  দেখা হয়নি। আমি বাসায় ফিরে কুরআন পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। প্রথম সূরা, সূরা ফাতিহার তেমন কিছুই বুঝিনি। এরপরে আরও কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল অতি কত্রিত্তশালী কেউ একজন গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ করছেন, পরকালের কঠোর ভয় দেখাচ্ছেন। মনে মনে আমি কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। কুরআনের সে কপি যত্ন সহকারে বুকসেলফে তুলে রেখেছিলাম। ইসলাম কবুলের আগে তা আর কখনো  খুলে দেখিনি।

আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, তিনি মানুষের সম্পর্কে সবই জানেন। যদি কারও মন চরম অবিশ্বাসে ভরা থাকে কিংবা কারও মন যদি কুরআনের জন্য প্রস্তুত না হয়, তাহলে হয়তো কুরআনের আবেদন সে সত্যিকারে অনুভব করতে পারে না।

২০০৮ সালে আমি একটা ইমেইল পাই। এই ইমেইল আমার জীবনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল। ইমেইলে দুটো কথা ছিল, ‘আপনি কি সাগর পথে গাজায় যেতে চান? আপনি কি গাজার পথে সাগর পাড়ি দিতে এই নম্বরে ফোন করবেন? ইমেইলে একাধিক ফোন নম্বর দেয়া ছিল।

ইমেইলটা ছিল অদ্ভুত। গত ৪৪ বছরে সাগর পথে কেউ গাজায় ভিড়তে পারেনি। কারণ, ৭০-এর দশকে এমনই একটি জাহাজ গাজায় ভেড়ার চেষ্টা করলে ইজরাইল বোমা মেরে তা উড়িয়ে দেয়। এতে অনেক মানুষ হতাহত হয়।

কিন্তু সে বছর আমেরিকার কিছু মানবতাবাদী সংগঠন এমনই এক সফরের আয়োজন করে। সাগরে জাহাজ ছিল দুটো। কথা ছিল, আমেরিকার সাইপ্রাস থেকে যাত্রা করে গাজায় নোঙ্গর করবে। তখন গাজায় নিষ্ঠুরতম অবরোধ চলছিলো।নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবাই খাদ্য পানীয়, নিত্য প্রয়োজনীয় ঔষধের তীব্র সংকটে ভুগছিলেন। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল, গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানো।সমসাময়িক কলের নিষ্ঠুর এই অবরোধের প্রতিবাদ জানানো।

নাম আমার বাচ্চাদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর চড়ে বসলাম গাজাগামি জাহাজে। টানা ৩৬ ঘণ্টা এক নাগাড়ে পথ চলেছি আমরা। চারদিকে ঘনকুয়াশা, আশেপাশে কিছুই দেখা যায় না। হঠাৎই কুয়াশার চাদর ছুঁড়ে ভেসে ওঠল গাজার ভূখণ্ড। সে এক রোমাঞ্চকর দৃশ্য! আমরা যতই কাছে আসছিলাম

হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম। তারা আমাদের দেখে চিৎকার দিয়ে উঠেছিল ‘আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!

আমাদের কথা ছিল, আমরা মোট তিনদিন থাকব। আমার কী হয়েছিল জানি না,ত্রিতিও দিন বিকেলে গাজার তীরে দাঁড়িয়ে আমি সে ত্রাণবাহী জাহাজকে বিদায় জানালাম।আমি রয়ে গেলাম গাজার ভূখণ্ডে। সে সময় গাজা থেকে নৌপথ ছাড়া আর অন্য কোনো পথ দিয়ে ফিলিস্তিন থেকে বের হবার উপায় ছিল না।

আমার কাছে আজও এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, কেন আমি কী বুঝে সেদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাজায় রয়ে গিয়েছিলাম। সম্ভবত আমাকে হিদায়াতের পথে শয়ে আসার জন্য এটা ছিল আল্লাহ তায়ালারই সুমহান পরিকল্পনার অংশ।

সে বার আমাকে প্রায় ত্রিশ দিন ফিলিস্তিনে থাকতে হয়েছিল। তিন দিনের জন্য এসে ত্রিশ দিন, ভাবা যায়! একদিকে ইসরাইলি সীমান্ত, অন্যদিকে মিসর সীমান্তে তাদের সৈন্যদল। কোনোদিক দিয়েই আমার বের হবার কোনো পথ ছিল না। বলতে গেলে আমি ফাঁদেই আটকা পড়েছিলাম।

সে সময়টা ছিল রমজান মাস। গাজার মুসলমানদের তখন দারুণ দুঃসময়। সুবহানাল্লাহ! ঠিক এমন একটা সময়ে তাদের মাঝে থেকে আমি যা শিখেছিলাম, যা অনুভব করেছিলাম, তা কখনোই  ভোলার নয়। আমি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলাম, তাদের বলা ‘আলহামদুলিল্লাহ’-এর শক্তি কতখানি।।

এক সন্ধ্যায় ‘রাফার’ এক আশ্রয় শিবিরে যাই। পনেরো  বছরের সেই ফিলিস্তিনি বালক, ফারেস উদে ছিল এমনই এক আশ্রয় শিবিরের সন্তান। আমি এক পরিবারের সাথে দেখা করি। তখন ইফতারের সময় হয়ে এসেছিল।

পরিবারের মুসলিম নারীটি আমাকে দরজা খুলে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ বলে অভিবাদন জানালেন। তার শান্ত চেহারায় পরম প্রশান্তি খেলা করছিল।

চারদিকে দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। আশ্রয় শিবিরে দারুণ দরিদ্রতার মধ্যে থেকে একজন মুসলিম মহিলার মুখ এতখানি প্রশান্তি মাখা হয় কী করে, আমার জন্য তা ছিল বিরাট রহস্য।

আমি কিছুটা ক্ষোভের সাথেই বললাম, “রমজানে কী বুঝে আপনারা রোজা রাখছেন আমি বুঝতে পারছি না। আপনাদের রব আপনাদের এমন অবস্থায় ফেলেছেন, আজ আপনাদের পর্যাপ্ত খাবার নেই, পানি নেই। বলতে গেলে প্রায় অভুক্ত থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আলাদা করে রোজা রাখার মানে কী? তিনি আমার দিকে ফিরলেন। তার সমস্ত চেহারা নূরের আভায় ঝকমক করছিল। ‘আমি রমজানে এই কারণে রোজা রাখি, যাতে দরিদ্র মানুষের কষ্ট বুঝতে পারি। আমার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। তিনি নিজে এত দরিদ্র, এত অভাবী, অথচ তিনি কিনা অন্যের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করছেন! তার নিজের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। নেই কোনো অনুভূতি। বরং তিনি সার্বিক অবস্থার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে চলেছেন। কী এক আবেগে আমার হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এই যদি হয় ইসলামের শিক্ষা, এই যদি হয় ইসলামের সৌন্দর্য, তবে কারও জীবনে এর চেয়ে উত্তম কিছু আর কী হতে পারে! যদিও ওই আশ্রয় শিবির থেকে বেরিয়ে আসার পর আমার এ অনুভূতি বেশিক্ষণ থাকেনি। কিন্তু আমার আল্লাহ ঠিকই আমাকে মনে রেখেছেন। দুবছর পর এমনই এক রমজানে আমি মসজিদে গেলাম। আমার মন এক সুখময় অনুভূতিতে ভরে উঠল। আমি অনুভব করলাম, ইসলামই আমার জন্য সঠিক পথ। সাত দিন পরে আমি আরেকটি মসজিদে গেলাম। উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে উচ্চারণ করলাম, ‘আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না। মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।’ আমি হয়ে গেলাম মুসলিম। আমি আর আমার মেয়ে এখন একসাথে সিয়াম পালন করি। আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের জীবন আজ পরিপূর্ণ। আমাদের জীবন আজ কৃতজ্ঞতায় ভরপুর। কৃতজ্ঞতা মহান আল্লাহর প্রতি, যিনি আমাদের এত চমৎকার একটি ধর্মে, এত চমৎকার পথে পরিচালিত করছেন। কৃতজ্ঞতা আপনাদের প্রতি, যারা আমাদের আপন ভাই হিসেবে, বোন হিসেবে আপন করে নিয়েছেন।

দোয়া করি, আপনারাও যাতে আমার মতো  ‘আলহামদুলিল্লাহ’-এর শক্তি উপলব্ধি করতে পারেন। এটি এমন একটি শব্দ, যেটি আমাদেরকে সকল সমস্যা, চিন্তা ও ভয় থেকে মুক্তি দেয়। আসুন আমরা বেশি বেশি করে পড়ি ‘আলহামদুলিল্লাহ। কারণ, আপনি আমি সৌভাগ্যবান, এত চমৎকার একটি দ্বীন পেয়েছি। আসুন প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সময় আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের কথা স্মরণ করে বার বার বলি- ‘আলহামদুলিল্লাহ।

পরিচিতি

লরেন বুথের জন্ম উত্তর লন্ডনে, ১৯৬৭ সালে। তিনি ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারের সৎবোন। পেশায় সাংবাদিক লরেন বুথ বেশ কয়েকবার ফিলিস্তিনে যান পেশাগত কারণে। সেখানকার মুসলিমদের আচরণ ও মানসিকতায় তিনি মুগ্ধ হন। ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করার এক পর্যায়ে ২০১০ সালে এসে তিনি ইসলাম কবুল করেন।

পেশাগত জীবনে লরেন বুথ New Statesman, The Mail on Sunday সহ বেশ কিছু পত্রিকায় সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করেছেন। British Muslim TV ও Al Jajeera সহ বেশ কিছু টিভি চ্যানেলেও তিনি সুনামের সাথে কাজ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি যুদ্ধবিরোধী নানা আন্দোলন, প্রচারণার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন।

এই কাহিনিটি মালয়েশিয়ান এক টিভিতে দেয়া তার এক সাক্ষাৎকারের রূপান্তর।

পদটিকা

আজা অবরোধ : গাজা ভূমধ্যসাগরের তীরে ফিলিস্তিনের একটি শহর। এর এক পাশে মিসর সীমান্ত। ২০০৬ সালে এক নির্বাচনে হামাস বিজয়ী হয়। পরবর্তী সময়ে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার নেতৃত্বে হামাস ও ফাতাহ দল মিলে একটা কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। হামাস অত্র ফিলিস্তিন ও গাজার নেতৃত্বভার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার পর ইজরাইল ও মিসর একযোগে গাজা অবরোধ করে রাখে। গাজা দিয়ে কারও ফিলিস্তিনে আসা যাওয়া ছিল বন্ধ। এনাকি জরুরি খাদ্য, ওষুধ সামগ্রীও ভেতরে আসতে পারেনি। মিসর আর ইজরাইলের অভিযোগ ছিল, গাজার সীমান্ত বন্ধ না রাখলে সন্ত্রাসীরা তাদের দেশে ঢুকে হামলা চালাবে।

সে সময় গোটা ফিলিস্তিনের মানুষদের দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তরজাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর তীব্র নিন্দা জানায়। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি এতে বর্ণনা করে সমন্বিত সর্বাত্মক শাস্তি হিসেবে।।

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন