কুরআন কি নারীদের শস্যক্ষেত্র বলেছে-ওয়ান

ব্যবহার করার অনুমতিও দিচ্ছে, তাই না?

নীলু দা লল, “তা নয়তো কী?

হাল সাজিদ। হেসে বলল, “দেখা যাক কুরআন আসলে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছে। আচ্ছা নীলু দা, তোমাকে একটি প্রশ্ন করি। তুমি কি জাননা, কুরআন কার ওপর নাযিল হয়েছিল?

নীলু দা বলল, ‘নবী মুহাম্মদের ওপর। ‘এক্সাক্টলি। তাহলে কুরআনকে আমাদের ঠিক সেভাবেই বুঝতে হবে, যেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝেছেন এবং বুঝিয়েছেন, তাই না?

মাথা নাড়ল নীলু দা। সাজিদ তার বক্তব্য চালিয়ে গেল, কুরআনের আয়াতগুলো বুঝতে হলে সবার আগে সেগুলো নাযিলের প্রেক্ষাপট, অবস্থা এবং ঘটনার পরম্পরা বুঝতে হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো এই অংশ দিয়ে কি সত্যিই নারীদের ওপর পুরুষের যেমন ইচ্ছা যৌন-ক্ষুধা নিবারণের নির্দেশ কুরআন দেয় কি না এটা জানার আগে তোমাকে তৎকালীন আরবে ইহুদীদের একটি কুসংস্কার সম্পর্কে জানাই। সেটি হচ্ছে, তৎকালীন আরবের ইহুদীরা বিশ্বাস করত যে, যদি স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের সাথে পেছনের দিক হতে সহবাস করে তাহলে উক্ত মিলনের ফলে তাদের গর্ভে ট্যারা সন্তানের জন্ম হবে। অর্থাৎ পেছনের দিক হতে সহবাস করাটা তৎকালীন ইহুদীরা নাজায়েয মনে করত। তারা ভাবত এতে করে নাকি ট্যারা সন্তান ভূমিষ্ট হয়। ইমাম ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ তার বিখ্যাত তাফসীর তাফসীরে ইবনে কাসীর-এ এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এসম্পর্কিত বেশকিছু বিশুদ্ধ হাদীসের রেফারেন্স টেনেছেন। সেখানে একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, একবার ইবনু উমার কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে তিনি যখন এই আয়াতে, অর্থাৎ তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্রস্বরুপ। সুতরাং, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো’-তে এলেন, তখন পাশের একজন সাহাবীকে ডেকে বললেন, ‘নাফী! এইমাত্র আমি যে আয়াত তিলাওয়াত করলাম সেটি নাযিলের প্রেক্ষাপট কি তুমি জাননা?

ইবনু উমারের প্রশ্নের জবাবে ওই সাহাবী বললেন, না। আমি জানি না। তখন ইবনু উমার বললেন, “আমরা স্ত্রীদের সাথে পেছনের দিক হতে সহবাস করতাম;

কিন্তু যখন আমরা মদীনায় হিজরত করলাম এবং সেখানে যখন আমরা আনসারী নারীদের বিয়ে করলাম, আমরা তাদের সাথেও একইভাবে মিলিত হতে চাইতাম; কিন্তু আনসারী নারীরা, যারা একসময় ইহুদী ছিল, তারা এটা পছন্দ করত না। তারা এতকাল মেনে আসা ইহুদী রীতিই মেনে চলতে চাইল। তখনই আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন, “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্রস্বরূপ। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো।

এতটুকু বলা শেষ করে সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, এই ঘটনা থেকে কী বোঝা গেল? বোঝা গেল যে, এই আয়াত নারীদের ওপর পুরুষের অবাধ যৌন-কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি নয়; বরং ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত একটি কুসংস্কার উঠিয়ে দিতেই নাযিল হয়েছে। ইহুদীরা বিশ্বাস করত, স্ত্রীদের সাথে পেছন দিক থেকে সহবাস করলে ট্যারা সন্তান হয়। এই কুসংস্কার দূরীকরণার্থেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন— “তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো। অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে যেভাবে ইচ্ছা সহবাস করো। একটি কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করতেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে। এখানে নারীদের সাথে যখন যেভাবে ইচ্ছা মিলিত হওয়াটা গৌণ, মূলত কুসংস্কারের পতন ঘটানোই ছিল মুখ্য।

নীলু দা তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ টেনে বলল, ‘আরও সহজ করে বলত ভাই। আমি এত প্যাঁচগোছ বুঝি না।

নীলু দার কথা শুনে সাজিদ আবারও হাসল। বলল, “ঠিক আছে, আমি সহজ করেই বলছি। আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটি কুসংস্কার চালু আছে। সেটি হলো—যখন চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয়, তখন যদি কোনো গর্ভবতী নারী শরীর বাঁকা করে দাঁড়ায়, তাহলে নাকি পেটের সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মায়। এখন এই কুসংস্কার দূর করতে কেউ যদি বলে, “সুর্যগ্রহণের সময়ে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা দাঁড়িয়ে থাকো, তাহলে এই কথার দ্বারা কি এটাই বোঝানো হয় যে, নারীদের কেবল দাঁড়িয়েই থাকতে হবে? বসতে পারবে না? হাঁটতে পারবে না? আর এই দাঁড়িয়ে থাকতে বলায় কি নারীদের অপমান-অপদস্থ করা হয়? না। বরং এই কথার উদ্দেশ্য হলো—সূর্যগ্রহণের সময় বাঁকা হয়ে দাঁড়াও বা সোজা হয়ে, হাঁটো কিংবা বসো, যা-ই ইচ্ছা করো—কোনো সমস্যা নেই। এতে গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হবে না। এই কথার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করা। আর কিছু নয়।

নীলু দা কিছুনা বলে চুপ করে আছে। সাজিদ আবার বলতে লাগল, ‘ঠিক সেরকম, কুরআনের ওই আয়াতের উদ্দেশ্য কিন্তু পুরুষদের অযাচিতভাবে নারীদের ওপর যৌন-ক্ষুধা মেটানোর নির্দেশনা নয়; বরং একটি কুসংস্কারের মূলোৎপাটন।

বিকেলের সূর্যটা আরও কিছুটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। রোদের তীব্রতাও কমে এসেছে অনেকটা। এরকম পড়ন্ত বিকেলে ধোঁয়া-ওড়া চায়ের কাপ হাতে যদি শরতের বইতে মগ্ন হওয়া যেত তাহলে বেশ হতো; কিন্তু দুই বন্ধুর এই জ্ঞানমূলক তর্ক-বিতর্ক ছেড়েও উঠে যাওয়া যাবে না।

নীলু দা বলল, ‘তা না-হয় বুঝলাম; কিন্তু নারীদের যে শস্যক্ষেতের সাথে তুলনা করল, সেটির ব্যাপারে কী বলবি?’

সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, “কুরআনের অনন্যতার একটি বড় দিক হচ্ছে— চমৎকার ভাষাশৈলী। কিছু কিছু ব্যাপার সহজে বোঝানোর জন্য কুরআনে মাঝে মাঝে উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনে ব্যবহৃত উপমাগুলো এতই সুন্দর, প্রাসঙ্গিক আর চমৎকার যে, সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে তুমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে।

নীলু দা গাল বাঁকা করে বলল, তার মানে তুই বলতে চাচ্ছিস যে নারীদের শস্যক্ষেত্র বলাটা একটি উপমা? নারীদের শস্যক্ষেত্র বলে কুরআন মূলত উপমা দিয়েছে?

সাজিদ বলল, “হ্যাঁ।

হাসল নীলু দা। বলল, ‘মাই গুডনেস! এই ‘শস্যক্ষেত্র’ শব্দটির মধ্যে তুই উপমা খুঁজে পাচ্ছিস সাজিদ! তুই এতটা অন্ধবিশ্বাসী হয়ে বসলি কবে থেকে?

মুচকি হেসে সাজিদ বলল, শস্যক্ষেত্র শব্দটি কি ‘ঝলসানো রুটি’ শব্দের চেয়ে খারাপ?

নীলু দা চোখ কপালে তুলে বলল, ‘মানে কী?

‘মানে হলো, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যখন পূর্ণিমার চাঁদকে ‘ঝলসানো রুটির সাথে তুলনা করে উপমা দেয়, তখন কিন্তু তোমাদের কাছে বেখাপ্পা লাগে না; কি কুরআন কেন নারীদের শস্যক্ষেত্র বলেছে সেটি নিয়ে তোমাদের ঢের আপত্তি। জা গেল-জাত গেল অবস্থা!

চুপ মেরে গেল নীলু দা। সম্ভবত সাজিদের যুক্তির কাছে কুপোকাত হয়ে গেছে মনে মনে। নীলু দা মুখ খুলে কিছু বলার আগেই সাজিদ আবার বলতে লাগল, শস্যক্ষেতের উপমা দিয়ে কুরআন তো নারীদের অপমান করে-ই-নি, বরঞ্চ, প্রকৃতিগতভাবে নারীর যে অবস্থান আর সম্মান, কুরআন তাকে ঠিক সেভাবেই তুলনা করেছে।

‘এই উপমার মধ্যে তুই নারীর জন্য সম্মান খুঁজে পাচ্ছিস? বাহ! তোর যুক্তির তো তারিফ করা লাগে, সাজিদ। উপহাসের সুরে বলল নীলু দা।

সাজিদ বলল, “দেখো নীলু দা, নারী হচ্ছে এমন—যে সন্তান জন্ম দেয় এবং তাদের বুকে আগলে রাখে এবং যার বুকের দুধ পান করে সন্তান বেড়ে ওঠে। একজন নারী তার সবটুকু দিয়ে নিজের সন্তানের জন্য লড়ে যায়। তাহলে চিন্তা করো তো, আমরা যদি সন্তানদের শস্য তথা ফসলের সাথে মিলিয়ে দেখি, একজন নারী কি তখন শস্যক্ষেতের ভূমিকায় থাকে না? শস্যক্ষেতের বুক থেকে যেমন চারাগাছগুলো পানিসহ যাবতীয় উপাদান গ্রহণ করে বেঁচে থাকে, মায়ের বুকের দুধ পান করে একজন শিশুও কি ঠিক সেভাবে বেড়ে ওঠে না? তাহলে এই উপমাতে ভুল কী আছে বলো?

নীলু দা বলল, “যত যুক্তিই থাকুক না কেন, শস্যক্ষেত্র শব্দটি নারীর জন্য যথেষ্ট অপমানজনক এবং অসম্মানের বলে মনে করি।

‘একজন কৃষক এবং তার শস্যক্ষেত্র নিয়ে ভুল ধারণা থাকলেই কেবল এই উপমাটিকে অপমানজনক বলা যায়। একজন কৃষকের কাছে তার শস্যক্ষেত্রের চেয়ে বেশি আপন আর কী হতে পারে? একজন কৃষক কতটা যত্নের সাথে, পরিচর্যার সাথে তার শস্যক্ষেতের দেখভাল করে তুমি জাননা? তাছাড়া, এখানে শস্যক্ষেত্রের উপমাটি এজন্যেই টানা হয়েছে; কারণ, একজন কৃষক তার শস্যক্ষেত্রকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে চাষ করতে পারে। সে চাইলে লম্বালম্বি চাষ করতে পারে, অথবা আড়াআড়িভাবে চাষ করতে পারে। এতে কিন্তু ফসলের কোনোই ক্ষতি হয় না। কুরআনও ঠিক একই উপমা টেনে বলছে—“তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে যেভাবে ইচ্ছা সহবাস করো। সামনের দিক হতে অথবা পেছনের দিক হতে। এতে করে তোমাদের সন্তানেরা অবশ্যই ট্যারা হয়ে জন্মাবে না। এটা একটি কুসংস্কার। এই কুসংস্কার থেকে তোমরা বেরিয়ে আসো৷ কুরআন পুরুষদের কৃষক বানিয়ে বলছে-‘নারীরা হলো তোমাদের শস্যক্ষেত্রস্বরুপ। তোমাদের শস্যক্ষেত্রের জন্য যেমন তোমরা উত্তম বীজ, উত্তম সার, উত্তম পরিচর্যার ব্যবস্থা করে থাকো, ঠিক

সেভাবেই তোমাদের স্ত্রীদের সাথেও তোমরা উত্তম ব্যবহার, উত্তম আচরণ, উত্তম কর্ম সম্পাদন করবে।

সাজিদের কথা শুনে নীলু দা আবারও চুপ হয়ে গেল। সাজিদ বলতে লাগল, ‘নারীদের ‘শস্যক্ষেত্র’ বলে কুরআন যদি তাদের অপমান করে থাকে, তাহলে একই সূরার ১৮৭ নাম্বার আয়াতে যে বলা আছে-‘They (your wives) are clothing for you and you are clothing for them. অর্থাৎ “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য বত্রস্বরূপ, আর তোমরা তাদের জন্য বস্ত্রস্বরূপ। এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পুরুষদের নারীর বস্ত্রের সাথে তুলনা করেছেন। বলো তো, কাপড়ের মতো খুবই তুচ্ছ জিনিসের সাথে তুলনা দিয়ে কুরআন কি তাহলে পুরুষদের অপমান করেছে? একদমই না। মূলত এই উপমা দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বুঝিয়েছেন যে—‘স্বামী আর স্ত্রী একে-অপরের খুবই কাছের। তারা এতই কাছের যেভাবে কাপড় শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে।

মাগরিবের আযান পড়তে শুরু করেছে। এতক্ষণ পরে নীলু দা আমার দিকে তাকাল। আমি তখনো মন খারাপ করে বসে আছি। নীলু দা আমার পিঠে হালকা চিমটি কেটে বলল, ‘কবি ভাই, আপনার কবিতার জন্য কিন্তু আমি অপেক্ষা করে আছি এখনো।

আমার মনে পড়ল নীলু দাকে কবিতার একটি পাণ্ডুলিপি দেবো বলেছিলাম। পরীক্ষার চাপে সে কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি আমি। নীলু দার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করে বললাম, “পেয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

আমার কথায় মুচকি হাসল নীলু দা। বলল, “দেখো ভাই, সুনীলের কবিতার মতো হয়ে যেয়ো না যেন!

বললাম, ‘সুনীলের কোন কবিতা?

‘ওই যে, কেউ কথা রাখেনি’…। হা-হা-হা।

নীলু দার কথা শুনে আমরা তিনজনই হেসে উঠলাম। নীলু দাকে বিদায় জানিয়ে সালাত পড়ার জন্যে আমরা ছুটে এলাম সেন্ট্রাল মসজিদে। প্রথম রাকআতে ইমাম সাহেব তিলাওয়াত করছেন সূরা দোহা। সুললিত কণ্ঠের তিলাওয়াতে পুরো মসজিদ এক অপূর্ব সুরের মূর্ঘনায় ছেয়ে গেছে।

সমাপ্ত

আগের অংশ টুকু পড়তে
[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন